শীতকাল মুমিনের বসন্ত
হামদ ও সালাতের পর...
আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের বড় মেহেরবানী, তিনি আমাদেরকে আবারও দ্বীনী মজলিসে একত্র হওয়ার তাওফীক নসীব করেছেন, আলহামদু লিল্লাহ।
আল্লাহ তাআলার নিআমতের কোনো শেষ নেই। কুরআন কারীমে ইরশাদ হয়েছে–
وَ اِنْ تَعُدُّوْا نِعْمَةَ اللهِ لَا تُحْصُوْهَا.
অর্থাৎ, তোমরা সবাই মিলেও যদি আল্লাহর নিআমত গণনা শুরু কর, আয়ত্ত করতে পারবে না। –সূরা ইবরাহীম (১৪) : ৩৪
পুরো দুনিয়াটাই আল্লাহর নিআমত। পুরো বিশ্বজগৎ আল্লাহর সৃষ্টি ও নিআমত। কোন্টা কীভাবে নিআমত, কোন্ নিআমত কীভাবে হাসিল করতে হবে, সেটি ভিন্ন একটা বিষয়।
এই যে দিন-রাত, দিন বড় হওয়া রাত ছোট হওয়া, রাত বড় হওয়া দিন ছোট হওয়া, সবই আল্লাহর কুদরত ও নিআমত। দিনের প্রতিটা ভাগ, রাতের প্রতিটা ভাগ আল্লাহর নিআমত। মৌসুমের পরিবর্তন আল্লাহ তাআলার নিআমত। শীত এসেছে। রাত বড় হয়েছে। দেড়-দুই মাস আগে ফজরের নামায জামাতে পড়ার জন্য যে সময় আমরা উঠতাম, সেই সময় যদি এখন উঠি, তাহলে সুন্দরভাবে চার-ছয় রাকাত তাহাজ্জুদের নামায আদায় করা যাবে। এজন্য শীতকাল মুমিনের জন্য বাড়তি এক নিআমত। দিন-রাতের প্রতিটা মুহূর্তই আল্লাহর নিআমত। কিন্তু শীতকালের দিন ও রাত বাড়তি নিআমত।
শীতকাল মুমিনের জন্য গনীমত– এই অনুভূতি নতুন কিছু নয়, আগে থেকেই ছিল। হাদীস শরীফে যেমন পাওয়া যায়, সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীনের বাণীতেও পাওয়া যায়। অর্থাৎ শীতকালে আলাদা কোনো আয়োজন, চেষ্টা ও কষ্ট ছাড়া এমনিতেই অনেক ফায়েদা ও সুবিধা পাওয়া যায়। বলা হয়েছে–
الشِّتَاءُ رَبِيعُ الْمُؤْمِنِ.
)قال الهيثمي : رواه أحمد وأبو يعلى، وإسناده حسن(.
শীতকাল মুমিনের জন্য বসন্ত! –মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১১৭১৬; মুসনাদে আবু ইয়ালা, হাদীস ১০৬১; মাজমাউয যাওয়ায়েদ, হাদীস ৫২১৭
শীতকালে রোযা ও তাহাজ্জুদ
শীতকালের অনেক ফায়েদা রয়েছে। মৌলিক দুইটা আমল খুব সহজে করা যায়। দিনে রোযা রাখা এবং রাতে তাহাজ্জুদ পড়া। উপরোক্ত বর্ণনা বায়হাকীর সুনানে কুবরা ও শুআবুল ঈমানে এই ভাষায় এসেছে–
الشِّتَاءُ رَبِيعُ الْمُؤْمِنِ، ﻗَﺼُﺮَ ﻧَﻬَﺎرُه ﻓﺼَﺎمَ، وَطَالَ لَيلُه فقَامَ.
শীতকাল মুমিনের জন্য বসন্ত। এর দিন ছোট, ফলে মুমিন রোযা রাখে এবং রাত বড়, তাতে কিয়াম (তাহাজ্জুদ আদায়) করে। –সুনানে কুবরা, বায়হাকী, হাদীস ৮৪৫৬; শুআবুল ঈমান, বায়হাকী, হাদীস ৩৬৫৫
রমযানের এক মাস ফরয রোযা। এর বাইরে পাঁচ দিন ছাড়া বাকি এগারো মাসেই নফল রোযা রাখা যায়। কিন্তু দিন লম্বা হয়ে গেলে নফল রোযা রাখতে একটু কষ্ট হয়। একদিকে গরম আবার দিন লম্বা; সব মিলিয়ে অনেকেরই রোযা রাখতে কষ্ট হয়। কিন্তু এই মৌসুমে রোযা রাখলে টেরই পাওয়া যায় না। বোঝাই যায় না, কখন রোযা শুরু হল, কখন শেষ হল! কারণ সময় কম, আবার শীতের কারণে পিপাসা ও ক্লান্তিও হয় কম।
দুইটা আমলই এই মৌসুমে পালন করা খুব সহজ। কাজেই এই নিআমতের শোকর আদায় করা দরকার।
যদি আমি রাতের দশটা, সাড়ে দশটা এমনকি এগারোটার মধ্যেও শুয়ে পড়ি, তাও সুবহে সাদিকের আধা ঘণ্টা আগে ঘুম পুরো হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ। দশটার মধ্যে শুয়ে পড়লে তো ছয় ঘণ্টারও বেশি ঘুম হবে। ছয় ঘণ্টার বেশি ঘুমিয়ে সুবহে সাদিকের আগে আগে উঠে তাহাজ্জুদ পড়া যাবে। এগারোটা বাজে ঘুমালেও সুবহে সাদিক পর্যন্ত ছয় ঘণ্টার কাছাকাছি হয়ে যাবে। কিন্তু দরকার হল নিয়ত ও হিম্মত।
আসলে তাহাজ্জুদের অভ্যাসটা আমাদের কম, কিন্তু আল্লাহর অনেক নেক বান্দার মধ্যেই এই আদত আছে। যাদের তাহাজ্জুদের অভ্যাস নেই, তাদের কারও মনোভাব হল তাহাজ্জুদ তো আমাদের ওপর ফরয নয়। বিতিরের নামাযের মতো ওয়াজিবও নয়। ফজরের আগে দুই রাকাত সুন্নতে মুআক্কাদা, যোহরের আগে চার রাকাত সুন্নতে মুআক্কাদা সেরকমও নয়। যদিও সুন্নতে মুআক্কাদা হওয়ারও একটা বক্তব্য আছে, কিন্তু অধিকাংশ ফকীহ ইমামের মতামত হল, তাহাজ্জুদ সুন্নতে মুআক্কাদা নয়; বরং নফল। সেজন্য কিছুটা উদাসীনতা, কিছুটা অলসতা আর কিছুটা হল ‘এটা নফলই তো’– এই মানসিকতা। সব মিলিয়ে এই নামাযটা আমাদের অনেকের কাছে গুরুত্ব পায় কম। আজ এই বিষয়ে আলোচনা করার উদ্দেশ্য হল, শীতকালে রাতটা যখন দীর্ঘ ও বড় হয়ে গেল, কমপক্ষে এই সুযোগটা আমরা গ্রহণ করার চেষ্টা করি!
নিয়ত ও হিম্মত করুন : নিজেকে উদাসীন ছেড়ে দেবেন না
মানুষ যদি নিয়ত না করে তাহলে পরিবর্তন আসে না। আমি যদি আমার মধ্যে পরিবর্তন ঘটাতে চাই, আমলে তারাক্কী ও উন্নতি চাই, তবে আমাকে নিয়ত ও হিম্মতের পরিচয় দিতে হবে। আমার রুটিনে নেই, রুটিন ও হিম্মত ছাড়া এমন নেক আমল করা কঠিন। অভ্যাসে পরিণত হবে না, যদি আমি হিম্মত না করি, রুটিন মতো না চলি। নিজেকে উদাসীন ছেড়ে দিলে সেভাবেই চলতে থাকবে। আর যদি নিজেকে একটু অভ্যস্ত করে তুলতে চাই, তাহলে অবশ্যই হিম্মতের পরিচয় দিতে হবে। সকল নফল এক স্তরের নয়। নফল বলেই তার ফায়েদা ও সওয়াব কম, এমনও নয়।
ফরযের গুরুত্ব সবার আগে
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নিকট সবচেয়ে প্রিয় হল, ফরয বিধানগুলোর গুরুত্ব দেওয়া। আল্লাহ যা ফরয করেছেন তার গুরুত্ব দেওয়া। আকীদার লাইনে যা ফরয, ইবাদতের লাইনে যা ফরয, লেনদেনের মধ্যে যা ফরয, আমার মুআশারাত ও স্বাভাবিক চালচলন ও আচার-আচরণের মধ্যে যা ফরয, সব ঠিকঠাক আদায় করা। আল্লাহর সমস্ত হক ও মানুষের সমস্ত হক আদায় করা, সকল ফরযের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া।
হককে মুস্তাহাব মনে করা হলে অনেক সময় সেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ‘হক’ শব্দের মধ্যেই অনিবার্যতার অর্থ আছে। আমার ওপর অন্যের যে হক রয়েছে, সেটি ফরয-ওয়াজিবের নিচে কিছু নয়। নতুবা এর নাম ‘হক’ হল কেন? হক মানেই তো দায়িত্ব-কর্তব্য এবং অন্যের অধিকার।
ফরয : আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রধান মাধ্যম
যে লাইনে যেটা ফরয, সেটা আদায় করাই আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করার প্রথম ও প্রধান মাধ্যম। একটি হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন–
...وَمَا تَقَرَّبَ إِلَيَّ عَبْدِي بِشَيْءٍ أَحَبَّ إِلَيَّ مِمَّا افْتَرَضْتُ عَلَيْهِ، وَمَا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبَّه.
বান্দার ওপর আমি যে আমল ফরয করেছি, আমার নৈকট্য লাভের জন্য এর চেয়ে প্রিয় কোনো বিষয় নেই। আর বান্দা নফলের মাধ্যমে আমার কাছাকাছি হতে থাকে, একপর্যায়ে আমি তাকে আমার মাহবুব ও প্রিয় বানিয়ে নেই। –সহীহ বুখারী, হাদীস ৬১৩৭
অর্থাৎ ফরয আমলই হল আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জনের প্রধান মাধ্যম। বোঝা গেল, ফরযের গুরুত্ব সবার আগে।
ফরযের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করার প্রক্রিয়া হল, আল্লাহ যা ফরয করেছেন, তা আদায় করা এবং আল্লাহ যা হারাম করেছেন, তা থেকে বিরত থাকা। ফরযগুলো আদায় করতে হবে এবং গুনাহ ছাড়তে হবে। এটা হল আল্লাহর কাছে তার নৈকট্য অর্জনের সবচেয়ে প্রিয় পন্থা। আর অতিরিক্ত নৈকট্য অর্জন হয় নফলের মাধ্যমে। তাছাড়া ফরযের মাধ্যমে নৈকট্য অর্জন করতে গেলে অজান্তেই কিছু না কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়ে যায়। সেই ত্রুটিবিচ্যুতির ঘাটতি পূরণ হবে নফলের মাধ্যমে।
নফলের রয়েছে বহু ফায়েদা
সব নফলের মধ্যেই অনেক ফায়েদা, অনেক ফযীলত এবং অনেক সওয়াব। তার পরও নফলে নফলে পার্থক্য আছে। কিছু নফল এমন যে, বিধান হিসেবে আল্লাহ তাআলা নফল রেখেছেন এবং সেটা আল্লাহ তাআলার রহমত, না হয় তার গুরুত্ব অনেক বেশি। যদি সকল নফল ও মুস্তাহাব আমলগুলোকে আল্লাহ তাআলা ফরয করে দিতেন, আমাদের কী দশা হত?! কঠিন হয়ে যেত। নফল আমল যদি হয় হাজারটি, ফরয হবে শত। সকল নফলকে যদি আল্লাহ তাআলা ফরয বানিয়ে দিতেন, আমাদের জন্য কঠিন হয়ে যেত। কিন্তু আল্লাহ তাআলা আমাদের জন্য কঠিন চাননি।
নফল আমলের বিধান ঐচ্ছিক রাখা হয়েছে, ফরয বা ওয়াজিবের মতো আবশ্যিক করা হয়নি। কিন্তু আল্লাহ তাআলা নফলের এই দরজা ও ধারা কেন খুলেছেন, সেটি আমাকে বুঝতে হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের জন্য নফলের দরজা একেবারে পুরো খুলে দিয়েছেন। কেন খুলে দিয়েছেন? আমাদের ফায়েদার জন্য। ফরযের ঘাটতি পূরণ করা এবং অতিরিক্ত ফায়েদা অর্জন করার জন্য। এছাড়া আরও অনেক ফায়েদা রয়েছে। ঈমানী ফায়েদা। অন্তর পবিত্র করার ফায়েদা। হিম্মত বাড়ানো ও শক্তিশালী করার ফায়েদা। আখলাকের ফায়েদা। এভাবে অনেক ফায়েদা হাসিল হবে, যদি আমলটি আমি গুরুত্বের সাথে করি। আমল করতে হবে ইখলাস ও তাকওয়ার সাথে। তবেই ফায়েদা পাওয়া যাবে প্রতিটা নফলের মাধ্যমে।
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন–
إِنَّ أَبْوَابَ الْخَيْرِ لَكَثِيرَةٌ: التَّسْبِيحُ، وَالتَّحْمِيدُ، وَالتَّكْبِيرُ، وَالتَّهْلِيلُ، وَالْأَمْرُ بِالْمَعْرُوفِ، وَالنَّهْيُ عَنِ الْمُنْكَرِ، وَتُمِيطُ الْأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ، وَتُسْمِعُ الْأَصَمَّ، وَتَهْدِي الْأَعْمَى، وَتُدِلُّ الْمُسْتَدِلَّ عَلَى حَاجَتِه، وَتَسْعَى بِشِدَّةِ سَاقَيْكَ مَعَ اللَّهْفَانِ الْمُسْتَغِيثِ، وَتَحْمِلُ بِشِدَّةِ ذِرَاعَيْكَ مَعَ الضَّعِيفِ، فَهَذَا كُلُّه صَدَقَةٌ مِنْكَ عَلى نَفْسِكَ.
কল্যাণের দরজা অগণিত : তাসবীহ–‘সুবহানাল্লাহ’ বলা তথা আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করা; তাহমীদ–‘আলহামদু লিল্লাহ’ বলা তথা আল্লাহর প্রশংসা করা; তাকবীর–‘আল্লাহু আকবার’ বলা তথা আল্লাহর বড়ত্বের ঘোষণা দেওয়া; তাহলীল–‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলা তথা আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষ্য দেওয়া; ভালো কাজের আদেশ করা; মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা; পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া; হেদায়েত-বিমুখ বধিরকে হেদায়েতের কথা শোনানো; সত্য পথহারা অন্ধকে সত্যের পথ দেখানো; প্রয়োজনগ্রস্ত উপায় অন্বেষণকারীকে রাস্তা বাতলে দেওয়া; বিপদগ্রস্ত সাহায্যপ্রার্থীর প্রতি দৃঢ়পদে এগিয়ে যাওয়া; দুর্বলের বিপদে শক্ত ঢাল হয়ে দাঁড়ানো। এই সবই তোমার পক্ষ থেকে তোমার নিজের জন্য সদাকা। –সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ৩৩৭৭
আল্লাহ তাআলা শব্দ ব্যবহার করেছেন বহুবচনের। অর্থাৎ নেকীর দরজাসমূহ অনেক অনেক বেশি।
কী কী? যেমন আল্লাহর তাসবীহ পাঠ করা। আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা সম্বলিত যেকোনো তাসবীহ পাঠ করা নেকীর একটি দরজা। তাসবীহ পাঠ করা নেক আমলের একটি দরজা।
তাসবীহের আবার বিভিন্ন পাঠ আছে–
سُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِه، سُبْحَانَ اللهِ الْعَظِيمِ.
বা শুধু–
سُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِه.
অথবা–
سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيمِ.
سُبْحَانَ رَبِّيَ الْأَعْلَى.
এরকম আপনি তালাশ করলে তাসবীহের অনেক দুআ ও যিকির পেয়ে যাবেন।
তাহাজ্জুদ নফল হলেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ আমল
‘নফল’ শব্দের অধীনে আল্লাহ তাআলা হাজারো নেকীর দরজা খুলে দিয়েছেন। যেন বান্দার সুবিধা অনুযায়ী যখন যা সহজ হয় করতে পারে। নিজের আমলনামাকে বাড়াতে পারে এবং নেকীর পাল্লা ভারী করতে পারে। গুনাহ হয়ে গেলে ক্ষমা চেয়ে নিতে পারে। এজন্য আল্লাহ তাআলা নফলের দরজাগুলো উন্মুক্ত রেখেছেন।
উন্মুক্ত রাখা হয় সহজতার জন্য। যেন কোনো বাধার সম্মুখীন না হতে হয়। শত শত নফল এমন রয়েছে, যার জন্য ওযু করতে হয় না। কেবলামুখী হতে হয় না। হাঁ, নফল নামাযের জন্য ওযু করতে হয়, কেবলামুখী হতে হয়। নামায তো বিশেষ ইবাদত। তার পরও সহজ। কারণ দুই রাকাত নামায পড়ার জন্য কি ফরয-ওয়াজিব একশ’টা? না, বরং হাতে গোনা অল্প কয়টা। ইবাদত সবচেয়ে বড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আর এই ইবাদতের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল নামায। সেই নামাযের মধ্যেও ফরয কাজের সংখ্যা খুবই কম।
কুরআন কারীমে ইরশাদ হয়েছে–
یُرِیْدُ اللهُ بِكُمُ الْیُسْرَ وَ لَا یُرِیْدُ بِكُمُ الْعُسْرَ.
[অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য সহজতা চান, কাঠিন্য চান না। –সূরা বাকারা (০২) : ১৮৫]
তাই সবকিছু সহজ করে দিয়েছেন, কঠিন করেননি।
বলেছি, নফল আদায় করা সহজ। সহজ করা হয়, যেন বেশি পরিমাণে করা যায়। এজন্য নয় যে, অলসতা করে ছেড়ে দেওয়া হবে। অলসতা করে ছেড়ে দিলে গুনাহ যদিও হচ্ছে না, কিন্তু আমি নেকী তো পাচ্ছি না। সহজের কারণে আমরা বেশি বেশি করব। যখনই সুযোগ পাব তখনই করব। নফল আমলের মধ্যে রোযা ও তাহাজ্জুদ, বিশেষত তাহাজ্জুদ নফল হলেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ আমল। আবারও বলছি, নফলের মধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ আমল হল তাহাজ্জুদ। এই তাহাজ্জুদও সহজ আমল।
তাহাজ্জুদের প্রথম স্তর
তাহাজ্জুদের প্রথম স্তর খুবই সহজ। প্রথম স্তর হল রাতে ঘুমানোর জন্য শোয়ার পরে যখনই আমার ঘুম ভাঙবে, উঠে ওযু করে দুই রাকাত নামায পড়ব। এর নামই তাহাজ্জুদ। শোয়ার পর যখনই আমার ঘুম ভাঙবে, এমনকি যদি এক ঘণ্টা পরেও ঘুম ভেঙে যায়, অনেকসময় তো জরুরতও হয়ে যায়, ঘুম ভাঙার পর মনে হয়, যেন একটু জরুরত অনুভব হচ্ছে, ওয়াশরুমে যখন যাবই, সাথে ওযুটাও করে নিলাম। তারপর দুই রাকাত নামায পড়ে নিলাম। ব্যস, তাহাজ্জুদ হয়ে গেল।
তাহাজ্জুদের সাধারণ স্তর অনেক সহজ। তার জন্য একেবারে শেষ রাত হতে হবে, সুবহে সাদিকের এক ঘণ্টা বা আধা ঘণ্টা আগে হতে হবে, এমন কোনো কথা নয়। এশার নামাযের পর যখন আমি শুয়ে পড়লাম এবং চোখ লেগে গেল, তারপর রাতের যে কোনো সময়ই ঘুম ভাঙবে, উঠে ওযু করে দুই রাকাত নামায পড়লে তার নামই হবে তাহাজ্জুদ। তাহাজ্জুদ শব্দের মধ্যেই একথা আছে। তাহাজ্জুদ শব্দের অর্থ হল ঘুম ত্যাগ করা। তাহাজ্জুদ মানে না ঘুমানো নয়; বরং ঘুম ত্যাগ করা। ঘুম এসেছিল, তারপর নিজেই ঘুম থেকে ওঠার ব্যবস্থা করেছে, অথবা এমনিতেই ঘুম ভেঙে গিয়েছে, তাই উঠে যাওয়া।
কিয়ামুল লাইল অনেক সহজ। আগেই বলেছি, আসলে সহজ করা হয়, যেন গুরুত্ব আরও অনেক বেড়ে যায়। এত সহজ যখন করা হয়েছে, তাহলে আমি কেন ছেড়ে দেব? কিছু হলেও তো করতে পারি! সহজ এজন্য নয় যে, আমি গাফলত আর উদাসীনতার পরিচয় দেব।
প্রসঙ্গ : তাহাজ্জুদ ও কিয়ামুল লাইল
মাগরিব-পরবর্তী নফল নামাযের নাম ‘আওয়াবীন’ হওয়া প্রমাণিত
তাহাজ্জুদের তুলনায় কিয়ামুল লাইল আরও সহজ। কিয়ামুল লাইল মাগরিবের পর থেকে শুরু হয়। রাতে যত নফল নামায পড়বেন সবই কিয়ামুল লাইল। তাই বলে কি শেষ রাতে আর উঠব না? মাগরিবের পরে আমরা আওয়াবীন পড়ি, সেটা কিয়ামুল লাইলের অংশ। অনেকে আগে আমলটি করত। যখন শুনেছে, আওয়াবীনের হাদীস দুর্বল, এখন আমল ছেড়ে দিয়েছে, নাউযুবিল্লাহ।
আচ্ছা, ছয় রাকাত আওয়াবীন নামাযের বিশেষ একটা ফযীলতের কথা আছে। সেই ফযীলতের হাদীসের সনদ যদি দুর্বলও হয়ে থাকে, আপনার নফল নামায কি বৃথা যাবে? নফল নামায তো দিনে পড়লেও সওয়াব! সেখানে আপনি রাতে পড়বেন, যা কিয়ামুল লাইলের অংশ। আওয়াবীন পড়লে কিয়ামুল লাইলের ফযীলত পাওয়া যাবে।
কার কাছে শুনেছে, হাদীসের সনদ যয়ীফ! আরে সনদ যয়ীফ তো বিশেষ একটা ফযীলতের। যে ঘোষণা ছয় রাকাতের, সেটার সনদ যয়ীফ। কিন্তু তার মানে তো এটা মওযু বা জাল বর্ণনা নয়। হাঁ, সনদে দুর্বলতা হয়তো একটু বেশি; কিন্তু এটা যেহেতু কিয়ামুল লাইলের অংশ এবং মাগরিবের পরের অতিরিক্ত যে নফলগুলো আপনি পড়বেন, দুই রাকাত পড়েন আর চার রাকাত পড়েন বা ছয় রাকাত পড়েন কিংবা আরও বেশিও পড়েন, এমনকি এশা পর্যন্ত পড়তে থাকেন, এই পুরো নফল নামাযের নাম যে আওয়াবীন– সেটা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।
ইমাম ইবনুল মুবারক রাহ.-এর ‘কিতাবুয যুহদি ওয়ার রাকাইক’ কিতাবে মুরসাল বর্ণনা আছে–
مَنْ صَلّى مَا بَيْنَ الْمَغْرِبِ إِلَى صَلَاةِ الْعِشَاءِ، فَإِنَّهَا صَلَاةُ الْأَوَّابِينَ.
যে ব্যক্তি মাগরিব থেকে এশার মধ্যবর্তী সময়ে সালাত আদায় করল, তা ‘সালাতুল আওয়াবীন’ তথা আওয়াবীনের নামায। –আযযুহ্দু ওয়ার রাকাইক ১/৪৪৫, বর্ণনা ১২৫৯
এই নামাযের নাম আওয়াবীন। চাশতের নামাযকেও আওয়াবীনের নামায বলা যায়। আভিধানিক অর্থে যে কোনো নফল নামাযই আওয়াবীনের নামায। কারণ ‘আওয়াবীন’ অর্থ যারা আল্লাহর দিকে বেশি বেশি রুজূ করেন। এটা ব্যক্তির গুণবাচক শব্দ। মুমিন ব্যক্তিদের একটা গুণ ও উপাধি হল ‘আওয়াব’, এর বহুবচন ‘আওয়াবূন’ (‘আওয়াবীন’)।
কুরআন কারীমে ইরশাদ হয়েছে–
اِنْ تَكُوْنُوْا صٰلِحِیْنَ فَاِنَّهٗ كَانَ لِلْاَوَّابِیْنَ غَفُوْرًا.
তোমরা যদি নেককার হয়ে যাও, তবে যারা বেশি বেশি তাঁর দিকে রুজূ হয়, তিনি তাদের ভুলত্রুটি ক্ষমা করেন। –সূরা বনী ইসরাঈল (১৭) : ২৫
আওয়াবূন বা আওয়াবীন কারা
‘আওয়াবীন’ ওই মুমিন বান্দাদের বলা হয়, যারা আল্লাহর দিকে তওবা-ইস্তেগফার ও দুআর মাধ্যমে বেশি বেশি ফেরেন এবং রুজূ করেন এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করতে থাকেন। সেই ‘আওয়াবীন’ ব্যক্তিরা যে নামাযের গুরুত্ব দেয়, তার নামই সালাতুল আওয়াবীন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন নফল নামাযের ক্ষেত্রে বলেছেন, এটা আওয়াবীনের নামায। অর্থাৎ আওয়াবীন ব্যক্তিদের নামায।
তুমি কি আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি বেশি অর্জন করতে চাও? তাহলে এই নামায বেশি বেশি পড়! যে কোনো নফল নামাযই আওয়াবীনের নামায। কিন্তু বিশেষভাবে মাগরিবের পরের নামাযের ব্যাপারে এই নাম বলা হয়েছে। আর চাশতের নামাযের বিষয়ে মুসলিম শরীফে হাদীস আছে।
এশরাক, চাশত ও যাওয়ালের নামায
চাশতের নামাযের দুটো স্তর রয়েছে। এক হল এশরাকের সময় যেটা পড়া হয়। যদি মনে করেন আমি এশরাক ও চাশত দুটোই পড়ে ফেললাম, তাহলেও ঠিক আছে। আসলে এখানে দুটি নিয়ত করলে ভালো হয়–
এক হল, যদি সম্ভব হয় ফজরের পরে নামাযের জায়গায় সূর্য ওঠা পর্যন্ত বসে থাকা। হাঁ, আপনার যদি বাইরে কোনো কাজ থাকে অথবা বাসায় কোনো প্রয়োজন থাকে, তাহলে যেতে পারেন! তাবলীগের গাশত করতে যাবেন; তাও যান। ডাক্তার বলেছে, আপনাকে সূর্য ওঠার আগেই হাঁটতে হবে, তাও যেতে পারেন। মসজিদে ফরয নামায শেষ করে আপনি হাঁটার জন্য বের হয়ে যেতে পারেন। তাতে আপত্তি নেই। কিন্তু যদি এমন কোনো কাজ না থাকে, তাহলে সূর্য ওঠা পর্যন্ত মসজিদে নামাযের স্থানে বসে থাকা। যেখানে আমি নামায পড়েছিলাম সেখানেই বসে থাকব। কোনো প্রয়োজনে মসজিদের ভেতরে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় একটু নড়াচড়া করলে তাও চলে, কিন্তু মসজিদ থেকে বের হব না। বরং নিজের জায়গায় বসে আল্লাহর যিকির-তাসবীহ পাঠ করতে থাকব।
সূর্য উঠে গেলেই হয়, তার পর আরেকটু দেরি করে, অর্থাৎ মোটামুটি আলো পরিষ্কার হয়ে গেলেই আপনি দুই-চার রাকাত নামায পড়তে পারেন। সূর্য পরিপূর্ণ উঠে গেলেই মাকরূহ ওয়াক্ত শেষ হয়ে যায়। তারপর দুই রাকাত নামায পড়ব। তাহলে একটি কবুল হজ্বের সওয়াব পেয়ে যাব, ইনশাআল্লাহ।
হজ্বের জন্য অনেকেই কান্না করে, আহারে ধনীরা কেবল হজ্ব করে, গরিবরা হজ্ব করতে পারে না। এ ধরনের কিছু হজ্ব করে আল্লাহকে দেখান না! আল্লাহ, আমার সাধ্যে যেটা আছে, আমি করছি! যেটা আমি পারছি না– সেটাও আল্লাহ, আপনি আমার জন্য সহজ করে দিন! হয়তো এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা সেই হজ্বের রাস্তাও খুলে দিতে পারেন! একে বলা যেতে পারে এশরাকের নামায। কারণ– أشرقت الشمس অর্থ সূর্য উদিত হয়েছে, আলো ছড়িয়ে পড়েছে। আর এটি হল সেইসময়ের নামায।
দ্বিতীয় নিয়ত হল, আমরা চাশতের নামায পড়ি, ‘চাশত’ কিন্তু আরবী শব্দ নয়। আরবী শব্দ হল ‘দুহা’ (الضحى)। যদি কেউ এশরাকের দুই রাকাতের সঙ্গে চাশতের নিয়ত করে, তাহলেও হয়ে যাবে।
আরেকটা নামায আছে, রোদ যখন একেবারে প্রখর হয়, জমিনে পা রাখলে অনেক গরম অনুভব হয়, তখন পড়তে হয়। ওই সময়েও একটা নফল নামায আছে। কেউ সেটাকেও চাশত বলে।
মুসলিম শরীফের এক হাদীসে (৭৪৮) এই নামাযকে সালাতুল আওয়াবীন বলা হয়েছে। আলী রা.-এর হাদীসে আছে চার রাকাতের কথা। (দ্র. জামে তিরমিযী, হাদীস ৫৯৮; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ১১৬১)
তাহলে ফজরের পরে সূর্য ওঠা থেকে নিয়ে দুপুরে মাকরূহ সময় হওয়ার আগ পর্যন্ত এই সময়ের মধ্যে কয়েকটি নফল নামায আছে–
১. ইশরাক : [হজ্ব ও ওমরার সওয়াব লাভের জন্য। (দ্র. আলমুজামুল কাবীর, তবারানী, হাদীস ৭৭৪১)]
২. দুহা : [দেহের প্রতিটি জোড়ার পক্ষ থেকে সদাকা। (দ্র. সহীহ মুসলিম, হাদীস ৭২০)]
৩. রোদ প্রখর হওয়ার পরে নামায : [এক হাদীসে এটাকে সালাতুল আওয়াবীন বলা হয়েছে। (দ্র. সহীহ মুসলিম, হাদীস ৭৪৮)]
দৈনিক এই তিন নামাযই না পড়তে পারলে কমপক্ষে প্রথম দুই নামায পড়তে পারি! এতে ওই হাদীসে কুদসী অনুযায়ী আমল হয়ে যাবে, যাতে বলা হয়েছে–
ابْنَ آدَمَ ارْكَعْ لِي مِنْ أَوَّلِ النَّهَارِ أَرْبَعَ رَكَعَاتٍ أَكْفِكَ آخِرَه.
আদমের বেটা! দিনের শুরুতে তুমি আমার জন্য চার রাকাত নামায আদায় কর; তাহলে দিনের শেষ পর্যন্ত আমি তোমার জন্য যথেষ্ট হয়ে যাব। –জামে তিরমিযী, হাদীস ৪৭৫
আওয়াবীন যেমন মাগরিবের পরের নফল নামাযকে বলা হয়েছে, তেমনি সূর্য ঢলে যাওয়ার আগে অর্থাৎ মাকরূহ সময় হওয়ার আগে আবহাওয়া ও জমিন গরম থাকাবস্থায় যে নফল নামায পড়া হয়, মুসলিম শরীফের বর্ণনা অনুযায়ী হাদীস শরীফে তাকেও ‘আওয়াবীন’ বলা হয়েছে। এজন্য যারা অসম্পূর্ণ কথা বলে, তাদের কথায় বিভ্রান্ত হবেন না! একটা কথা বলে দেবে যে, এটা যয়ীফ, আর আপনি আমলটা ছেড়ে দিলেন! না, এমন করা যাবে না। একটু আলেমদের কাছে যান! জিজ্ঞেস করুন! ইন্টারনেটে একটা কিছু পেলেন, কে বলেছে, তাকে হয়তো আপনি চেনেনও না। অথবা চেনেন বা তার আলোচনা শুনেছেন এবং তার নাম জানেন, কিন্তু তার ইলমের গভীরতা কতটুকু, সেটা আপনার জানা নেই। ব্যস, যেখানে যা শুনি, তার ভিত্তিতে একটা আমল ছেড়ে দেওয়া বা তার ভিত্তিতে আরেকটা আমল শুরু করা, এটা সচেতন মুমিনের কাজ নয়। হয়তো কিছু ছেড়ে দিচ্ছে অথবা নতুন কিছু শুরু করছে! এই যে ছেড়ে দেওয়া অথবা নতুন কিছু শুরু করা– এটা হুট করে ফয়সালা করতে নেই।
একটু থামুন! ভালো কোনো আলেমের কাছে যান! তাঁকে জিজ্ঞেস করুন!
মুমিন তাহাজ্জুদ না পড়ে গাফলতের সঙ্গে শুয়ে থাকতে পারে না
যাইহোক, বলছিলাম, গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারলে একজন মুমিন তাহাজ্জুদ না পড়ে গাফলতের সঙ্গে শুয়ে থাকতে পারে না।
কিয়ামুল লাইল ও তাহাজ্জুদের কথা বলেই আলোচনা সমাপ্ত করতে চাচ্ছি। আমল যদিও নফল, কিন্তু এই নফলের তাসীর ও ফায়েদা অনেক বেশি। একজন মুমিন যদি এই নফলের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারে, সে গাফলতের সঙ্গে শুয়ে থাকতে পারবে না! হাঁ, কারও শারীরিক দুর্বলতা বা তার ঘুমের বেশি প্রয়োজন, ঘুমের বেশি চাপ ছিল, ঘুম ভাঙেনি, এরকম বিভিন্ন ওজর কারও থাকতে পারে। কিন্তু গাফলতের কারণে এই নামায কেউ ছাড়তে পারে না। বিশেষত শীতের মৌসুমে তো নয়ই।
রুটিন মাফিক জীবন তাহাজ্জুদের জন্য সহায়ক
এমনিতে কোনো জরুরি কাজ ছাড়া শীতের মৌসুমেও ঘুমাতে ঘুমাতে আপনি রাতের এগারোটা-বারোটা বাজিয়ে ফেলবেন, সেটা অন্যায়। রুটিন মাফিক জীবন চলা একজন মুমিনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমরা রুটিনটা ঠিকমতো বানাই না, বানালেও যথাযথ মেনে চলি না; বরং নিজের ইচ্ছামতো চলি। মনে হয় যেন আমাদের জীবনে সবচেয়ে কম গুরুত্বের বিষয় সময়! বিনা কারণে বা অযৌক্তিক কারণে বা অতি সামান্য কারণে রাতে ঘণ্টাকে ঘণ্টা সময় নষ্ট করে ফেলি! না, এমন করা যাবে না। সবাইকে সময় সাশ্রয়ে সচেতন হতে হবে।
বাচ্চাদেরকে ঘুম পাড়ানোসহ অন্যান্য কাজগুলো গুছিয়ে আনার জন্য ঘরের লোকদের সহযোগিতা করুন! কথা ঠিক, আপনিও বাইরে থেকে ক্লান্ত হয়ে এসেছেন। সেজন্য পাঁচ-দশ মিনিট একটু বিশ্রাম করে তারপর উঠুন! ঘরের কাজ গোছানোর জন্য সহযোগিতা করুন! যেন সবাই দ্রুত শুয়ে পড়তে পারে! রাতের খাবার আগে আগে শেষ করুন! রাতের খাবার খেতে দেরি করা ঠিক নয়। এগুলো কেবল ডাক্তারদের কথা নয়! ডাক্তাররা তো আজকাল বলেন, উলামায়ে কেরাম আরও আগে থেকে বলে আসছেন!
এভাবে চলতে পারলে আপনার ঘুম সুন্দর হবে, ভালো হবে এবং অল্প ঘুমিয়ে তৃপ্তিও পাওয়া যাবে। সালাফে সালেহীনের কেউ কেউ এই ভাষায় দুআ করতেন–
اللّهُمَّ اشْفِنِيْ مِنَ النَّوْمِ بِيَسِيْرٍ، وَارْزُقْنِيْ سَهَرًا فِيْ طَاعَتِكَ.
আল্লাহ, অল্প ঘুমে আমাকে তৃপ্ত করুন! অল্প ঘুমের মধ্যেই আপনি আমাকে বেশি ঘুমের উপকারিতা ও ফায়েদা দিয়ে দিন! আর আমাকে আপনার ইবাদতের সাথে রাত জাগার তাওফীক দান করুন! (দ্র. মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, বর্ণনা ২৯৫৯৩)
যেখানে রাত জেগে ইবাদতের কথা বলা হয়েছে, সেখানে আপনি পুরো রাত ঘুমিয়ে সুবহে সাদিকের আধা ঘণ্টা আগে অথবা পনেরো-বিশ মিনিট আগে অন্তত উঠুন না! ওযু করে অন্তত দুই রাকাত নামায পড়ুন! এভাবে তাহাজ্জুদের অভ্যাস শুরু করুন! চার রাকাত পড়া, লম্বা সূরা দিয়ে পড়া, দীর্ঘক্ষণ কিয়াম করা, সেগুলো তাহাজ্জুদের আরও উঁচু স্তর। হাদীস শরীফে বলা হয়েছে সামান্য– فواق ناقة
উটনীকে একবার দোহন করার পর দুধ আবার জমে ওঠার জন্য যতটুকু সময় অপেক্ষা করা হয়। অর্থাৎ খুবই অল্প সময়।
কোনো বর্ণনায় আছে– فواق شاة
বকরিকে একবার দোহন করার পর দুধ আবার জমে ওঠার জন্য যতটুকু সময় অপেক্ষা করা হয়। মূলকথা হল, তাহাজ্জুদের জন্য এবং তার ফযীলত পাওয়ার জন্য একেবারে অল্প সময়ই যথেষ্ট।
এখনই শুরু করুন
এই মজলিস থেকে আমরা সবাই এই নিয়ত করে উঠি, তাহাজ্জুদ শুরু করব, ইনশাআল্লাহ। আগে থেকে তাহাজ্জুদের অভ্যাস থাকলে তো কোনো কথাই নেই। অভ্যাস যদি না থাকে, তাহলে এখন শীতের মৌসুমে রাত লম্বা, এখনই অভ্যাস করি!
এটি নফল হওয়া সত্ত্বেও কেন তার এত ফায়েদা, আজ বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু বলা হল না, আল্লাহ তাআলা হায়াতে রাখলে আগামীতে কখনো বলব, ইনশাআল্লাহ।
[মাসিক দ্বীনী মজলিস
মারকাযুদ দাওয়াহ জামে মসজিদ,
হযরতপুর, কেরানীগঞ্জ, ঢাকা
২৮ রবিউল আখির ১৪৪৬ হি.
১ নভেম্বর ২০২৪ ঈ., জুমাবার
শ্রুতলিখন : মুহাম্মাদুল্লাহ মাসুম]