রবিউস সানী-১৪৩২   ||   মার্চ-২০১১

কন্যা সন্তান ও প্রাক-ইসলামী আরব

 


ويجعلون لله البنت سبحنه ولهم ما يشتهون واذا بشر احدهم بالانثى ظل وجهه مسودا وهو كظيم يتوارى من القوم من سوء ما بشر به ايمسكه على هون ام يدسه في التراب الا ساء ما يحكمون.

  তরজমা : ৫৭. তারা আল্লাহর জন্য কন্যা সাব্যস্ত করে। তিনি এ থেকে পবিত্র। আর নিজেদের জন্য স্থির করে যা মনে চায়। ১

৫৮. যখন তাদের মধ্যে কাউকে কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয় তখন দিনভর তার মুখ অন্ধকার হয়ে থাকে এবং মনস্তাপে ক্লিষ্ট হতে থাকে। ২

৫৯. যে খোশখবর সে শুনল, তার দুঃখে, মানুষের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখে। ৩ ভাবে, লাঞ্ছনা স্বীকার করে তাকে রেখে দেবে, না মাটির নিচে তাকে পুঁতে ফেলবে। ৪ শোন, অতি নিকৃষ্ট সিদ্ধান্ত সে গ্রহণ করে। ৫

 

ব্যাখ্যা :

১. অর্থাৎ নিজেদের জন্য কন্যা সন্তানের ভাগ গ্রহণে তারা আদৌ প্রস্ত্তত নয়। প্রার্থনা করলে তা করে পুত্র সন্তানের জন্য।

২. অর্থাৎ এদের কাউকে যদি খবর দেওয়া হয়, তোমার একটি মেয়ে হয়েছে, তো ঘৃণায় ক্ষোভে নাক-মুখ বাঁকিয়ে রাখে এবং সারা দিন তার চেহারাখানা মলিন ও মন বিষণ্ণ থাকে। সে এই দুঃখে মরমে মরে যেতে থাকে যে, কোত্থেকে এই অবাঞ্ছিত বিপদ মাথার উপর এসে পড়ল।

৩. অর্থাৎ জীবিত থাকলে কাউকে জামাই বানাতে হবে এই লোক-লজ্জার কল্পনায় মুখ দেখাতে চায় না। লুকিয়ে লুকিয়ে চলাফেরা করে।

৪. অর্থাৎ দিন, রাত দুশ্চিন্তায় জর্জরিত থাকে। কী সিদ্ধান্ত নেবে সেই ভাবনায় ডুবে যায়। ভাবে, জগতের লজ্জা স্বীকার করে নিয়ে মেয়েটিকে জীবিত থাকতে দেবে, না মাটির নিচে পুঁতে ফেলবে, অর্থাৎ মেরে ফেলবে? যেমন প্রাক-ইসলামী যুগে বহু নিষ্ঠুর কন্যা সন্তানকে মেরে ফেলত বা জ্যান্ত মাটির নিচে পুঁতে ফেলত। ইসলাম এসে এই অমানবিক প্রথার উচ্ছেদ সাধন করে এবং এমনই নির্মূল করে যে, ইসলাম পরবর্তীকালে সমগ্র রাজ্যে এর একটি নযীরও  দেখানো যাবে না।  কেউ কেউ

ايمسكه على هون                 

এর অর্থ করেছেন, কন্যাকে রেখে দেবে হীন ও লাঞ্ছিত অবস্থায়। অর্থাৎ জীবিত থাকলে তার সঙ্গে এমন লাঞ্ছনাকর ব্যবহার করবে যেন সে তার সন্তানই নয়; বরং         মানুষই নয়।

৫. কন্যাদের সম্পর্কে তাদের যে নিষ্ঠুর সিদ্ধান্ত ছিল, তার চেয়ে আরো জঘন্য সিদ্ধান্ত হচ্ছে আল্লাহর প্রতি সন্তান আরোপ করা এবং তাও কন্যা সন্তান, যাকে নিজেদের জন্যই এত ঘৃণা করে। যেন ভালো জিনিস তাদের আর মন্দটা আল্লাহর (নাউযুবিল্লাহ)।-তাফসীরে উসমানী 

 

 

দেনমহর ও একটি খবর   

আবু তাশরীফ

কয়েক বছর ধরে এদেশে নারী নির্যাতন ও হয়রানির ঘটনা ঘটছে বেশি মাত্রায়। প্রায় প্রতিদিনের সংবাদপত্রে নারীর প্রতি সহিংসতার খবর পাওয়া যাচ্ছে। দিন দিন এর মাত্রা ও পরিমাণ যেন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। ইভটিজিং নামের একটি শব্দ নারীকে উত্তক্তকরণ এর অর্থে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে। সম্প্রতি অবশ্য হাইকোর্ট থেকে দেওয়া এক নির্দেশনায় ইভটিজিং এর পরিবর্তে যৌনহয়রানি শব্দটি ব্যবহার করতে বলা হয়েছে। সবকিছু দেখেশুনে মনে হচ্ছিল, এদেশে নারীদের জন্য একটি অংশের জন্য চরম দুঃসময় যাচ্ছে। নারীর অধিকার ও নিরাপত্তার অনুকূল পরিবেশটাই শেষ হয়ে যাচ্ছে। এরকম একটি সময়ে গত ২৭ জানুয়ারি ঢাকার একটি দৈনিক পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠার প্রথম কলামে ছাপা হওয়া একটি খবর বেশ আশার সৃষ্টি করেছে। শোভন ও উচিত নয়-এ রকম কিছু কিছু ওই খবরে থাকলেও খবরের মূল বিষয়টি ছিল আকর্ষণীয় ও প্রশংনীয়।

খবরের শিরোনামটি ছিল দেনমোহর মেলা। ওই খবরের প্রথম লাইনটি হচ্ছে-দেনমোহর পরিশোধ করি, যৌতুক পরিহার করি শ্লোগান নিয়ে কুড়িগ্রামের উলিপুরে গতকাল (২৬ জানুয়ারি, বুধবার) দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়েছে দেনমোহর পরিশোধ মেলা। এতে বলা হয়েছে- ৫৪৮ জন ব্যক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে স্ত্রীর দেনমোহর মোট তিন কোটি ১৮ লাখ টাকা পরিশোধ করেন। স্থানীয় একটি সমিতির উদ্যোগে এ মেলাটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে উলিপুরের ইউএন ও ওসি এবং অধিকার নামক সংস্থার স্থানীয় এক কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। মেলা উপলক্ষে সেখানে বিভিন্ন পণ্যের ১৬টি স্টলও ছিল।

মেলা করে দেনমোহর পরিশোধ করার হয়তো কোনোই প্রয়োজন ছিল না। স্বামী ও স্ত্রীর নিজস্ব লেনদেনের বিষয়। ব্যক্তিগত উদ্যোগে ব্যক্তিগত পর্যায়েই এটা পরিশোধের কথা।

তারপরও এ ধরনের অনুষ্ঠানের উপলক্ষ সম্ভবত ঘটেছে এজন্যই যে, এদেশে দেনমোহর স্ত্রীকে পরিশোধ না করাই নিয়মে পরিণত হয়ে গেছে। দেনমোহর হচ্ছে বিবাহিত নারীর শরীয়ত নির্ধারিত আর্থিক অধিকার, যা তার স্বামীর ওপর তাকে পরিশোধ করা কর্তব্য। কিন্তু রেওয়াজ এখন এমনই যে, বিয়ের সময় মোটা অংকের মহর ধার্য্য হয়, বিয়ের পর স্বামী স্ত্রীর কাছে ক্ষমা চায়, অপারগতার কারণে স্ত্রী মৌখিক মার্জনা করে দেয়। মহরের এ টাকা স্বামী আর স্ত্রীকে দেয় না। স্ত্রীর একটি আর্থিক প্রাপ্তি ও অধিকার এভাবেই বিস্মরণে হারিয়ে যায়। মহর যে স্ত্রীর পাওনা, এ সত্যটাই স্বামীরা এক সময় ভুলে যায়। এ জন্য একটি এলাকার বহু মানুষের মহর আদায়ের ঘটনা একটা অনুষ্ঠান ও মেলায় পরিণত করার সুযোগ করে দিয়েছে আয়োজকদের। এতো  রাখঢাক ও সঙ্গীত-নাটিকাও অনুষ্ঠান না করে এজন্য সুন্দর দ্বীনী মজলিস হলে এতে আরো বহু ফায়েদা হত। কারণ মহর আদায়ের ঘটনা হচ্ছে শরীয়তের একটি দাবি পরিশোধের ঘটনা। মহর আদায়ে রাষ্ট্রীয় আইনের চেয়ে শরয়ী নির্দেশনার জোর ও শরীয়ত নির্দেশিত মানবিক প্রেরণার প্রাবল্যই বড়।

মহরের অর্থ হতে পাওয়া যেমন অধিকার তেমনি বিয়েতে কোনো যৌতুক না থাকা এবং শরীয়াসম্মত উত্তরাধিকারের সম্পত্তি পাওয়াও নারীর অধিকার। নারীর এসব শরয়ী অধিকার তার হাতে পৌঁছানোর জন্য এ বিষয়ে দায়িত্বশীল প্রত্যেকের মনোযোগী হওয়া দরকার। এ ব্যাপারে ব্যক্তিগত উপলব্ধি ও সামাজিক জাগরণ খুবই জরুরি। এ কাজটি দ্বীনদার ও শরীয়তের প্রতি অনুরক্ত ও প্রতিপালনকারীদের হাতে হওয়ার মধ্যেই কল্যাণ নিহীত বেশি।

 

 

 

আল্লাহর যিকির

হযরত য়ুসাইরাহ রা. বর্ণনা করেন, (যিনি ঐসব পুণ্যাত্মা রমনীদের মধ্যে ছিলেন, যারা আল্লাহর পথে হিজরত করেছিল) দোজাহানের সরদার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে (কয়েকজন মহিলাকে সম্বোধন করে) ইরশাদ করেন, তোমরা পাবন্দীর সাথে তাসবীহ (সুবহানাল্লাহ), তাহলীল (লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু) পাঠ কর এবং মহান আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করো এবং তা আঙ্গুল দ্বারা গুণে গুণে পড়ো। কেননা তাকে (আঙ্গুল) জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে এবং জবাব দেওয়ার জন্য উহাকে কথা বলার মতো শক্তি প্রদান করা হবে। এবং তোমরা আল্লাহর যিকির থেকে বিমুখ হয়ো না। অন্যথায় আল্লাহর রহমত থেকে তোমাদেরকে বঞ্চিত করা হবে।

ব্যাখ্যা : দোজাহানের বাদশাহ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  সকল নর-নারীর জন্য প্রেরিত হয়েছেন। তিনি কিয়ামত পর্যন্ত আগমনকারী সকল মানুষের সংশোধনকারী এবং পথপ্রদর্শক। সাধারণভাবে শরীয়তের বিধানাবলি কুরআন ও হাদীস শরীফে বিশেষ রীতিতে পুরুষদেরকে সম্বোধন করে বর্ণনা করা হয়েছে। তবে বিশেষ কিছু আহকাম ছাড়া সব আহকামই পুরুষ এবং মহিলাদের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। সাধারণ সম্বোধনের মধ্যে মহিলারাও অন্তর্ভুক্ত থাকার পরও কুরআন ও হাদীসের বিভিন্ন জায়গায় মহিলাদেরকে বিশেষভাবে সম্বোধন করে সম্মানিত করা হয়েছে। উপরোক্ত হাদীসটি সেই ধারাবাহিকতার অংশ।

মূলত আল্লাহর যিকিরে মশগুল থাকা প্রত্যেক মুসলিম নরনারীর জন্য মাগফিরাত ও দরজা বুলন্দ হওয়ার উপায়। অসংখ্য আয়াত ও হাদীস শরীফে যিকিরের প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। এই হাদীসে বিশেষভাবে মহিলাদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য সম্ভবত এই যে, তাদের মজলিসগুলো যেন সমালোচনা, গীবত, মিথ্যা অপবাদ ইত্যাদি থেকে মুক্ত থাকে এবং যিকিরের নূরে যেন তাদের জীবন আলোকিত হয়ে উঠে।

 

 

 

advertisement