যিলহজ্ব ১৪৪৫   ||   জুন ২০২৪

নরেন্দ্র মোদি
ভগবানের অবতার থেকে ভগবান হওয়ার অপেক্ষায়

ওয়াসআতুল্লাহ খান

নির্বাচনের ধাপগুলো শেষ দিকে গড়ানোর সাথে সাথে মোদি তোষণে মত্ত ভারতীয় মিডিয়াগুলোও ধীরে ধীরে স্বীকার করছে যে, আব কি বার চার সো পার (অর্থাৎ লোকসভার ৫৪৫টি আসনের ৪০০টিতেই বিজেপি জয়ী হবে।) শ্লোগানটি অসার হয়ে পড়ছে। বিশ্লেষকগণ বলছেন, বিজেপি বৃহত্তর সংসদীয় দল তো হতে পারে, কিন্তু সংবিধানের সেক্যুলার অবকাঠামো পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা হয়তো অর্জন করতে পারবে না।

নির্বাচনের সাতটি ধাপের ইতিমধ্যে ৬টি ধাপ সম্পন্ন হয়েছে। ১ জুন সপ্তম ও সর্বশেষ ধাপ অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু দ্বিতীয় ধাপেই টার্ন আউট কম হওয়ার আঁচ করতে পেরে বিজেপির বাক-ভঙ্গি দ্রুত বদলাতে শুরু করেছে। তারা একদিকে উন্নয়ন, রাম মন্দির ও ৫ ট্রিলিয়ন অর্থনীতির বিজ্ঞাপন প্রচার করছে। আর সবচেয়ে সহজ ও স্থূল পন্থা হিসেবে সংখ্যালঘু মুসলিমদের আক্রমণ করে চলেছে।   

বিজেপি তো তৃতীয় ধাপেই মুসলমানদেরকে তোপের নিশানা বানিয়েছে এবং ভিনদেশী অনুপ্রবেশকারী অধিক সন্তান জন্মদানকারীদের ভারতের গণতন্ত্র ও হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য মারাত্মক হুমকি সাব্যস্ত করার কোনো প্রচেষ্টাই হাতছাড়া করছে না। এর অতিসাম্প্রতিক প্রকাশ হল, গত সপ্তাহে সরকারের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা কাউন্সিলের পক্ষ থেকে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র।

গবেষণাপত্রটিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ১৯৫০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সময়ে ভারতীয় মুসলমানদের সংখ্যা ৪৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির এই সূচকের অর্থ হল, ভারতের হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতা একদিন সংখ্যালঘুতে পরিণত হবে এবং ভারত গেরুয়া শিবির থেকে রূপান্তরিত হয়ে সবুজে পরিণত হবে। এই কাজে বিরোধী দল কংগ্রেসসহ ভারতের তথাকথিত নির্বাচনী ঐক্যজোটে শরীক সকল দলও শামিল আছে। যারা হিন্দুদের সম্পত্তি মুসলমানদের হাতে তুলে দিতে চায়।

গবেষণাটির ভিত্তি হল ধর্মানুসারীদের গণনা ও পরিসংখ্যানকারী আন্তর্জাতিক অনলাইন ডাটাবেজ প্রতিষ্ঠান এসোসিয়েশন অব রিলেজিয়ন ডাটা আর্কাইভ (উর্দু) সার্ভেজরিপটির তথ্যমতে, ৬৫ বছরে মুসলিম জনসংখ্যা ৯.৮৪ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ১৫ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে হিন্দু জনসংখ্যা ৮৪.৬৮ শতাংশ থেকে কমে ৭৮.৫ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ হিন্দু জনসংখ্যা ৭.৮২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। আর এই সময়ে ভারতের খ্রিস্টান জনসংখ্যা সাড়ে ৫ শতাংশ ও শিখ জনসংখ্যা প্রায় পৌনে ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে বৌদ্ধ জনসংখ্যা ০.৫ থেকে বেড়ে ০.৮১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ বৌদ্ধ জনসংখ্যা প্রায় ষোল শ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু ভারতেই নয়; বরং গোটা পৃথিবীর ১৬৬টি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মানুসারী জনসংখ্যার হ্রাস ঘটেছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, ভারতে সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও অধিকার ধীরে ধীরে ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে প্রচার করা হলেও তাদের জনসংখ্যার বৃদ্ধি থেকে এটাই স্পষ্ট হয় যে, ভারতের সংখ্যালঘুরা শুধু ফুলেফেঁপে বৃদ্ধিই পাচ্ছে না; বরং তারা নিজেদেরকে নিরাপদও মনে করে থাকে।

অনেক পরিসংখ্যান বিশেষজ্ঞ প্রতিবেদনটির যথার্থতার বিষয়ে চ্যালেঞ্জ করেছেন; বরং তারা এজন্য উদ্বিগ্ন যে, প্রতিবেদনটিতে ইতিপূর্বে পরিচালিত ভারতের জনশুমারিগুলোর ফলাফল থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তুলে ধরা স্বত্ত্বেও শাসকদলের পক্ষ থেকে নির্বাচনী মৌসুমে ভোটারদের মনে প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যেই এটি প্রকাশ করা হয়েছে। সরকারের নির্ভরযোগ্য তথ্য ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৫১ সালের প্রথম জনশুমারি থেকে ২০১১ সালের সর্বশেষ জনশুমারি পর্যন্ত ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা সাড়ে ৩৫ মিলিয়ন থেকে ১৭২ মিলিয়নে পৌঁছেছে। আর একই সময় হিন্দু জনসংখ্যা ৫ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ৩০৩ মিলিয়ন থেকে ৯৬৬ মিলিয়নে দাঁড়িয়েছে।

পরিসংখ্যান বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের নতুন গবেষণাপত্রটি মূলত জনসমর্থনকে তাৎক্ষণিক পরিবর্তন করে দেওয়ার এক নির্বাচনী অপকৌশলমাত্র। যদিও আরএসএস থেকে শুরু করে উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলো নিয়মিতই অপপ্রচার করে যাচ্ছে যে, মুসলমানরা জনসংখ্যা বৃদ্ধির জিহাদ করে চলেছে। অথচ সরকারের নির্ভরযোগ্য রেকর্ড অনুযায়ী, ১৯৯২ থেকে ২০২১ সালের মধ্যবর্তী সময়ে একজন মুসলিম নারীর সন্তান জন্মদানের হার ৪.৪১ থেকে কমে ২.৩৬-এ নেমে এসেছে। অর্থাৎ বিগত ৩০ বছরে মুসলিম শিশু জন্মের হার ভারতের অন্যান্য গোষ্ঠীর তুলনায় সবচেয়ে বেশি হ্রাস পেয়েছে। একই সময়ে হিন্দু শিশু জন্মের হার ৩.৩ থেকে কমে ১.৯৪ -এ নেমে এসেছে। কিন্তু মোদি সরকারের প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই গণনা ও পরিসংখ্যানের কোনো উল্লেখ নেই।

তদুপরি বিজেপি নিজেদের প্রকাশিত প্রতিবেদনকে একটি নির্ভরযোগ্য গবেষণা হিসেবে তার ভোটারদের গেলানোর চেষ্টা করে চলেছে। বিজেপির প্রচার সম্পাদক অমিত মালব্য প্রতিবেদনটিকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, দেশটিকে আবারো কংগ্রেসের হাতে ছেড়ে দেওয়া হলে হিন্দুদের একমাত্র দেশটিও হাতছাড়া হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে প্রভাবশালী এক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক পপুলেশন ফাউন্ডেশন অব ইন্ডিয়া ওই প্রতিবেদনটিকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও বিভ্রান্তিকর আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেছে।

এদিকে নির্বাচনের সপ্তম ও শেষ ধাপ শুরু হওয়ার আগেই মোদিজী নিজেকে ভগবানের অবতার হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন-

মা যতদিন বেঁচে ছিলেন মনে হত আমি হয়তো তাঁর কোলেই জন্ম নিয়েছি। কিন্তু মায়ের চলে যাওয়ার পর আমি যখন জীবনের সব অভিজ্ঞতার ডালা মেলে দেখি তখন বিশ্বাস হয় যে, পরমাত্মা বিশেষ কোনো কাজের জন্যই আমাকে প্রেরণ করেছেন। আমার শক্তি-সামর্থ্য প্রচলিত অন্যান্য সাধারণ মানুষের মতো মনে হয় না। ঈশ্বর হয়তো আমার দ্বারা কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিতে চান। এজন্য আমাকে সে অনুযায়ী শক্তি-সামর্থ্যও দান করেছেন।

ডানপিঠে কোনো মন্তব্যকারী বক্তব্যটি সম্পর্কে বলেছেন, লোকসভার ৪০০ আসন পাওয়ার দেরি, কিন্তু মোদিজী নিজেকে ভগবানের অবতার মনে করার বদলে ভগবান বলতে এতটুকু বিলম্ব করবেন না।

            

একটি বিদেশি দৈনিক থেকে অনূদিত। অনুবাদ : মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ফাহাদ

 

 

advertisement