রবিউল আখির ১৪৪৫   ||   নভেম্বর ২০২৩

গাজায় ইসরাইলের বর্বরতা
গাজাবাসীর জন্য দুফোঁটা অশ্রু!

মাসের শুরুতেই পাঠকের হাতে আলকাউসার তুলে দিতে আগের মাসের ২১ তারিখেই পত্রিকা প্রেসে চলে যায়। মাঝে মাঝে এর ব্যত্যয় ঘটলেও সাধারণত এই নিয়ম রক্ষার চেষ্টা করা হয়। সেই হিসেবে অক্টোবরের শুরু থেকেই নভেম্বর ২০২৩ সংখ্যাটির কাজ পুরোদমে চলছিল। অনেক দূর অগ্রসরও হয়ে গিয়েছিল। এরইমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে ঘটে যায় ঐতিহাসিক ঘটনা। সংঘটিত হয় ফিলিস্তিনী মুক্তিকামী সংগঠন হামাসের সামরিক অভিযান তূফানুল আকসা। তারপর থেকে চলছে ফিলিস্তিন জাতি নিধনে দখলদার ইসরাইলের বর্বর গণহত্যা। তারা মুহুর্মুহু বোমা হামলায় গাজাবাসীর কেবল ঘর-বাড়ি-বসতভিটাই ধ্বংস করছে না; বরং হত্যা করছে নারী-শিশুসহ হাজার হাজার নিরপরাধ বেসামরিক লোকজনকে।

এমন পরিস্থিতিতে মনে হল, আলকাউসারের পাঠকদের মনও তো সাধারণ মুসলমানদের মতো ব্যথিত ও ব্যাকুল-বেচাইন থাকবে। তাই চলতি সংখ্যাটি ফিলিস্তিনী ভাই-বোনদের উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত হল। সে অনুযায়ী অল্প কদিনের মধ্যেই কাজ অগ্রসর হল। হাতে কম সময় থাকা সত্ত্বেও ফিলিস্তিন, হামাস, ইসরাইল ও প্রাসঙ্গিক বিষয়ে কিছু লেখা পেশ করার চেষ্টা করা হয়েছে। পত্রিকার কলেবরও ৮ পৃষ্ঠা বৃদ্ধি করা হয়ছে। মূল্য অপরিবর্তিতই থাকছে। এখনো আরও অনেক লেখা জমা রয়ে গেছে। আগামী সংখ্যাগুলোতে দেওয়ার চেষ্টা থাকবে ইনশাআল্লাহ।

ইতিমধ্যে বিশ্ববাসী লক্ষ করেছেন, একটি মুসলিম দেশের মানুষকে শুধু ঘর-বাড়ি থেকেই বিতাড়িত করা হয়নি বা শুধু নিজ এলাকায় বন্দি করে রাখা হয়নি; বরং প্রকাশ্যে হত্যা করে চলেছে জালেম ইসরাইল বাহিনী। কিন্তু আরব-আজমসহ পুরো মুসলিম বিশ্বের শাসক শ্রেণি নীরব। তারা যশ-খ্যাতি, ভোগ-বিলাস, প্রচার-প্রচারণা ও গদি-ক্ষমতা ইত্যাদি রক্ষা নিয়ে এতই ব্যস্ত যে, ফিলিস্তিনীদের সম্পর্কে কেবল দু-এক শব্দ বলেই দায়িত্ব শেষ! কেউ তো সে কাজটুকুও করছে না; যেন এ নৃশংস গণহত্যার খবরও তারা জানে না!

উল্টোদিকে তাবৎ কুফরি শক্তি একাট্টা হয়ে ফিলিস্তিনীদের জাতিগত নিধনের এই কাজে জালেম ইসরাইলীদের অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। ফলে সংগত কারণেই সাধারণ মুসলিমদের হৃদয়ে ক্ষোভ জন্মাচ্ছে। কেউ হতাশও হচ্ছেন- এর বুঝি কোনো সমাধান বা অবসান নেই!

এহেন পরিস্থিতিতে আমাদেরও ভাবনার বিষয় আছে। যাদের প্রতি আমাদের এত অনুযোগ ও অভিযোগ- কেন তারা কিছু করছে না! তার আগে আমাদের নিজেদের ব্যাপারেও ভাবতে হবে। প্রথমত নিজেকে যেমন শুধরাতে হবে, নিজের চারপাশের লোকদেরও সত্যিকারের মুসলিম হিসেবে গড়ে তোলার চিন্তা ও চেষ্টা থাকতে হবে। আমি যদি পূর্ণ ইসলামের ওপর চলতাম, সত্যিকারের মুসলিম হতাম, তাহলে এ পরিস্থিতিতে মুসলিম  শাসকদের অধীনে জনগণের অর্থে গড়া সৈন্যবাহিনী এমন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কাজে লাগানোর ব্যবস্থা ও সুযোগ তৈরি হত। অথচ আমরা দেখছি, দেশে দেশে মুসলিম বড় বড় সমরশক্তিকে তেমন কোনো কাজেই লাগানো হচ্ছে না। অন্যদিকে অমুসলিম দেশের সৈন্যবাহিনীর রনতরী নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য ইসরাইলে ছুটে যাচ্ছে, তেমনি পৃথিবীর আনাচে-কানাচেও ছুটছে। কিন্তু আমাদের মুসলিম দেশগুলো কী করছে? যেন একটা টু-শব্দ করার ক্ষমতা নেই তাদের! কোনো কোনো মুসলিম দেশের হাতে পারমাণবিক অস্ত্রও রয়েছে। এমন দুর্দিনে তারা কী ভূমিকা রাখছে? না, আমরা তা ব্যবহারের কথা বলছি না, কিন্তু এর প্রভাব তো থাকতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্র সৌদি আরবের পত্রিকা নিয়মিত পড়া হয়। সেসব পত্রিকা খুললে মনে হয়, পৃথিবীতে কিছুই ঘটছে না! ইসরাইলের বর্বরতার কথা খোলামেলাভাবে তারা বলতেও চায় না। তাহলে কি এটাই ঠিক যে, হামাসের তূফানুল আকসা না হলে এত দিন সৌদি-ইসরাইল কুটনৈতিক সম্পর্ক প্রকাশ্যে এসে যেত! অথচ যা ঘটছে সব তাদের খুব কাছেই ঘটছে। কিন্তু সৌদি যুবরাজের ভাব এমন, আমার ওপর দিয়ে তো কিছু যাচ্ছে না! অথচ মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সৈন্যরাও বিভিন্ন দেশে শান্তি মিশনে যায়। সেখানে বিবদমান গোষ্ঠীগুলোকে শান্ত করতে চেষ্টা করে। তো নিজেদের ভাই-বোনদেরকে যারা মেরে মেরে শেষ করছে, তাদেরকে শান্ত করতে কি কেউ যাচ্ছে?

দেশে দেশে মুসলিম শাসকদের এই নীরবতার দায় আমাদের ওপরও বর্তায়। আমাদের নিজেদের দিকেও তাকাতে হবে। এই যে আমরা দুই শ কোটির মতো মুসলিম দুনিয়ায় রয়েছি। আমাদের আম জনতার ঈমানী অবস্থা কী? আমরা কি ক্ষমতাসীনদের ওপর সেই প্রভাব সৃষ্টি করতে পারছি? যদি আমাদের ঈমানী অবস্থা মজবুত হয় এবং বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান ঈমানের দিক থেকে মজবুত হয়ে ওঠে, নিঃসন্দেহে একসময় জালেম ও কাফেরদের সেবাদাস শাসক শ্রেণির নীল নকশা ভেস্তে যাবে; বরং ভেস্তে যেতে বাধ্য হবে। তখন আল্লাহর নেক বান্দারাই রাষ্ট্রের পবিত্র আমানত পরিচালনা করবে এবং আমাদের সোনালী অতীত ফিরে আসবে ইনশাআল্লাহ।

যাহোক, এমন অসচেতন, জটিল ও নির্বিকার মুহূর্তে গাজাবাসীর জন্য দুফোঁটা অশ্রুই সম্বল। কবির ভাষায়-

نہ ہم بدلے نہ تم بدلے نہ دل کى آرزو بدلى

مىں کىسے آرزوئے انقلاب  آسماں کر لوں!

না আমি বদলেছি, না বদলেছ তুমি, না বদলেছে মনের আকাক্সক্ষা

কী করে পরিবর্তনের আশা করি আসমানী ফয়সালা।

আল্লাহ তাআলা বিশ্ব মুসলিমের সেই অবস্থা ফিরিয়ে আনুন, আমাদের ফিলিস্তিনী ভাইদের প্রতি রহম করুন, তাদের চূড়ান্ত কামিয়াবি দান করুন- এটাই কামনা। দুফোঁটা অশ্রু ঝরানো ছাড়া তাদের জন্য তো আপাতত  আমরা আর কিছুই করতে পারছি না।

 

 

advertisement