জুমাদাল আখিরাহ ১৪২৮   ||   জুলাই ২০০৭

তাঁদের প্রিয় কিতাব (তৃতীয় কিস্তি)

হযরত মাওলানা মুফতি তকী উছমানী

(পূর্ব প্রকাশের পর)

৩৪. কওমী এসেম্বলি মে ইসলাম কা মারেকা হযরত মাওলানা আবদুল হক আকুড়াখটক (১৪০৯ হি.)

দেশে যখন এমন কোনো বিষয় পয়দা হয়েছে যার সম্পর্ক একান্তভাবে দ্বীনের সঙ্গে তখন এ সম্পর্কে হযরত মাওলানা রাহ. এসেম্বলিতে তাঁর অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। হযরত এসেম্বলিতে যে বক্তৃতা করেছেন কিংবা যে দাবি-দাওয়া পেশ করেছেন তার কিছু রেকর্ড তাঁর সাহেবজাদা জনাব সামীউল হক সাহেব একটি কিতাবে সংরক্ষণ করেছেন। এ কিতাবটিই কওমী এসেম্বলি মে ইসলাম কা মারেকা নামে প্রকাশিত হয়েছে।’’

৩৫. মানাযিলুল ইরফান ফী উলূমিল কুরআন মাওলানা মুহাম্মাদ মালিক কান্ধলভী (১৪০৯ হি.)

মাওলানার কিতাবসমূহের মধ্যে মানাযিলুল ইরফান উঁচুমানের কিতাব। এ কিতাবে উলূমুল কুরআন বিষয়ক অত্যন্ত মূল্যবান আলোচনা ও তথ্যাদি সন্নিবেশিত হয়েছে। সম্ভবত উর্দু ভাষায় উলূমুল কুরআন বিষয়ে এত দীর্ঘ কিতাব আর নেই। এছাড়া তারীখে হারামাইন এবং উসূলে তাফসীর তাঁর মূল্যবান ইলমী রচনা। এ দুটো গ্রন্থই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অত্যন্ত মূল্যবান রচনা হিসেবে পরিগণিত।

৩৬, ৩৭ ও ৩৮. শাইখ আবদুল ফাত্তাহ রাহ.-এর তাহকীক তালীককৃত কিছু গ্রন্থ

মুকাদ্দিমায়ে ইলাউস সুনান (কাওয়াইদ ফী উলূমিল হাদীস) আল আজবিবাতুল ফাযিলাহ (উলূমুল হাদীসের গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে আল্লামা আবদুল হাই রাহ.-এর রচনা) আররাফউ ওয়াত তাকমীল ফিল জারহি ওয়াত তাদীল, আল্লামা লাখনোভী

এই গ্রন্থগুলোতে তাঁর সন্নিবেশিত মূল্যবান টীকাগুলো তাঁর মুহাদ্দিসসুলভ প্রাজ্ঞতার দলীল।’’

৩৯. ফয়সালাকুন মুনাযারা মাওলানা মুহাম্মাদ মানযুর নুমানী (১৪১৭ হি).

আকাবিরে উলামায়ে দেওবন্দের কিছু কিছু আলোচনাকে কেন্দ্র করে বেরেলভী আলেমরা যেসব কঠিন আপত্তি (মিথ্যা অপবাদ) উত্থাপন করেছে তার বাস্তব অবস্থা অনেকেই উন্মোচন করেছেন। কিন্তু এ বিষয়ে যে গ্রন্থটি আমাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে তা হল মাওলানা মুহাম্মাদ মনযুর নুমানী রাহ.কৃত ফয়সালাকুন মুনাযারা। এ গ্রন্থে মাওলানা মুহাম্মাদ মনযুর রাহ. যেভাবে দলীল-প্রমাণের ভিত্তিতে অত্যন্ত মজবুতভাবে তাঁদের ওই আলোচনাগুলোর সঠিক মর্ম তুলে ধরেছেন তা পড়ার পর কোনো ইনসাফপ্রিয় ইনসানের পক্ষে উলামায়ে দেওবন্দের আকীদা-বিশ্বাস সম্পর্কে সামান্যতম দ্বিধাও থাকতে পারে না।

গ্রন্থটির নাম ফয়সালাকুন মুনাযারা যা থেকে মনে হতে পারে যে, মুনাযারা বলতে সাধারণত যা বুঝায় এটি সেই ধরনের কোনো গ্রন্থ, কিন্তু বাস্তব কথা এই যে, মাওলানার এ কিতাবের সঙ্গে প্রচলিত ধরনের মুনাযারার কোনো সম্পর্ক নেই। বরং এ গ্রন্থটি পড়লে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, নেক নিয়্যতওয়ালা মুনাযারা কাকে বলে। বস্তুত মুনাযারা শব্দের মূল অর্থও তাই। আরবীতে মুনাযারা শব্দের অর্থ হল কোনো একটি বিষয়ে সম্মিলিতভাবে চিন্তাভাবনা করা। মাওলানা তার উপরোক্ত কিতাবে মুনাযারা শব্দের এর মর্মটিই বাস্তবরূপে তুলে ধরেছেন। তাঁর উপস্থাপনা একান্তভাবেই ইতিবাচক, বিশ্লেষণর্ধী এবং প্রমাণনির্ভর। এ উপস্থাপনার উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষকে লাঞ্ছিত করা নয়; বরং সত্য ও সঠিক বিষয়টি বোঝানোর আন্তরিক প্রচেষ্টা।’’

৪০. ক্বাদিয়ানী কেউঁ মুসলমান নেহী’, মাওলানা মুহাম্মাদ মনযুর নুমানী রাহ.

সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সবচেয়ে প্রমাণসমৃদ্ধ, শক্তিশালী এবং হৃদয়স্পর্শী রচনা। এটি প্রথমে মাসিক আলফুরকানে প্রকাশিত হয়েছিল। পরে পাক-ভারতের বিভিন্ন দ্বীনী পত্রিকায়ও তা প্রকাশিত হয়েছে। মাওলানার শক্তিশালী লেখনীর গুণমুগ্ধ আমি আগে থেকেই ছিলাম। কিন্তু তার এই রচনা থেকে অনুমিত হয়েছে যে, পাঠককে নিজের সঙ্গে একাত্ম করে নেওয়ার এক অসাধারণ যোগ্যতা আল্লাহ তাঁকে দান করেছিলেন। কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণাদান সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝির যে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছিল তা দূর করতে তার এই রচনা বিশেষ অবদান রেখেছে।

৪১-৪৭. হযরত মাওলানা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নাদভী রাহ. (১৪২০ হি.)-এর কিছু গ্রন্থ

হযরত মাওলানার সকল গ্রন্থই আমাদের ইসলামী সাহিত্যের মূল্যবান সম্পদ। তবে তারীখে দাওয়াত ওয়া আযীমত ইনসানী দুনিয়া পর মুসলমানোঁ কে উরূজ ও যাওয়াল কা আছর এবং আলমে ইসলাম মে ইসলামিয়াত আওর মাগরীবিয়ত কা কাশমকাশ এই তিনটি কিতাব থেকে অধম বিশেষভাবে উপকৃত হয়েছি। অনেকের জীবনেই এই কিতাবগুলো চিন্তা ও আমলের ক্ষেত্রে বিপ্লব সাধন করেছে।

এছাড়া তাঁর বেশকিছু প্রবন্ধ যা পরবর্তীতে পুস্তিকা আকারে প্রকাশিতে হয়েছে তাতে অভাবনীয় প্রভাব রয়েছে। বিশেষত-

من غار حرا

اسمعوها مني صريحة أيها العرب

ترشيد الصحوة الإسلامية

হল তার এমন কিছু প্রবন্ধ যা হৃদয়কে ঝাঁকুনি দিয়ে চিন্তা ও কর্মের সঠিক পথ দেখিয়েছে। মাওলানা সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী সাহেব মরহুমের চিন্তাধারা ও কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে যে আলিমসুলভ পর্যালোচনা হযরত মাওলানা ‘‘আসরে হাজের মে দ্বীন কী তাফহীম ওয়া তাশরীফ’’- তে করেছেন তা তাঁরই কাজ ছিল। এ গ্রন্থের মাধ্যমে তিনি মাওলানা মওদুদী ও তার চিন্তাধারার ধারক আলিমদের সঙ্গে তাঁর চিন্তাগত অনৈক্য অত্যন্ত ভাব-গাম্ভীর্যের সঙ্গে প্রামাণ্য ও শক্তিশালী উপস্থাপনায় পেশ করে ওই স্খলনগুলো চিহ্নিত করেছেন যেখানে তাদের চিন্তা-চেতনা কুরআন-সুন্নাহর সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে।

হযরত মাওলানার স্বরচিত জীবনী কারওয়ানে জিন্দেগী নামে ছয় খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে। এ গ্রন্থটি থেকে তাঁর ব্যাপক দ্বীনী খিদমত সম্পর্কে কিছুটা অনুমান করা যায়। এই আত্মজীবনীর বৈশিষ্ট্য এই যে, এটা শুধু জীবনের বিভিন্ন ঘটনাবলির ইতিহাস নয়; বরং এতে পাঠকের জন্য চিন্তা ও অভিজ্ঞতার নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।’’

৪৮. তুহফায়ে খাওয়াতীন, মাওলানা আশেকে এলাহী বুলন্দশহরী (১৪২২ হি.)

মাওলানার মাঝে প্রথম থেকেই রচনা ও সংকলনের যওক ছিল। সাধারণ পাঠকদের জন্য লিখিত তার কিতাবগুলো ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে এবং এর দ্বারা সাধারণ মানুষ উপকৃত হয়েছে। সে সময় আলবালাগের সম্পদ সম্পাদনার সকল দায়িত্ব আমার উপর ন্যস্ত ছিল। আমি মাওলানা মরহুমকে আবেদন করেছিলাম, তিনি যেন মহিলাদের জন্য ধারাবাহিকভাবে আলবালাগে লিখেন। মাওলানা খাওয়াতীনে ইসলাম নামে তা শুরু করেন, যা পাঠকদের কাছে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছিল। পরে সেই প্রবন্ধ-নিবন্ধগুলোই তুহফায়ে খাওয়াতীন নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে। গ্রন্থটি মহিলাদের জন্য একটি উত্তম রাহনুমা গ্রন্থ।

৪৯. তাসহীলুল মীরাছ, মুফতী রশীদ আহমাদ লুধিয়ানভী রাহ. (১৪২২ হি.)

ইলমে মীরাছও মুফতী সাহেবের একটি বিষয় ছিল। ‘‘তাসহীলুল মীরাছ’’ নামে তাঁর এ রচনা তালিবে ইলমদের জন্য অত্যন্ত উপকারী ছিল। এজন্য তিনি আমাদেরকে সিরাজীর পরিবর্তে এই কিতাব দ্বারা ইলমে মীরাছ শিক্ষা দিয়েছেন এবং এমনভাবে এর অনুশীলনী করিয়েছেন যে, আমরা সে সময়ই মুনাসাখার দীর্ঘ দীর্ঘ মাসআলা খুব সহজেই সমাধান করতে সক্ষম হতাম। তিনি আমাদেরকে মীরাছের হিসাব বের করার একটি নতুন পদ্ধতি শিখিয়েছিলেন, যার মাধ্যমে মুনাসাখার দীর্ঘ মাসআলা খুব সংক্ষেপে হল হয়ে যেত।

 

 

advertisement