রবিউল আউয়াল ১৪৪৪   ||   অক্টোবর ২০২২

সাম্প্রতিক ইস্যু
অসংযত, অতিউৎসাহী আচরণ থেকে নিবৃত্ত হোন

সম্প্রতি মেয়েদের লেবাস-পোশাক ও সাফ ফুটবলে শিরোপাপ্রাপ্তিকে কেন্দ্র করে একটি মহল থেকে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ন্ত্রিত আচরণ প্রকাশিত হতে দেখা যাচ্ছে। মানুষের আচার-ব্যবহারে অনেক কিছুই প্রকাশিত হয়। শব্দ-বাক্যের চাতুর্য আর উপস্থাপনার কলা-কৌশল দ্বারা সবকিছু ঢাকা যায় না। তাই এই সবকিছুর মধ্য দিয়েও ইসলাম ও ইসলামের সংযত-শালীন জীবনব্যবস্থার প্রতি একশ্রেণির মানুষের চরম বিদ্বেষ প্রকাশিত হয়েই পড়ে।

জীবনের সকল অঙ্গনে ইসলাম মানুষকে সুস্থ-সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করে। সঠিক বিশ্বাস, ভারসাম্যপূর্ণ চেতনা, আল্লাহমুখী জীবনবোধ ও সংযত-শালীন জীবনধারা ইসলামী জীবনব্যবস্থার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। একারণেই ইসলাম ভোগবাদী জীবন-দর্শনের প্রধান শত্রুরূপে পরিগণিত। ইসলাম যতই মানবতার, উদারতার ও সহনশীলতার কথা বলুক- যেহেতু ইসলামী জীবনব্যবস্থার মধ্যেই সংযমী জীবনাচারের অত্যন্ত শক্তিশালী শিক্ষা ও বিধান আছে তাই একশ্রেণির মানুষ কিছুতেই ইসলামের শিক্ষা-দীক্ষাকে সহ্য করতে পারে না। কিন্তু এ তো স্পষ্ট কথা যে, জলাতঙ্ক-রোগে আক্রান্ত কারো কাছে পানি যতই ভীতি ও আতঙ্কের কারণ হোক- এতে পানির কোনো দোষ নেই। ঐ ব্যাধিগ্রস্তের চিকিৎসাই এখানে মুখ্য প্রয়োজন।

দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নানা প্রকারের ভুল ধারণা ও বাতিল মতবাদ প্রচারিত হওয়ার কারণে মুসলিম-সমাজের একটি শ্রেণি অহেতুক ইসলাম-বিরোধী, মুসলিম-বিদ্বেষী হিসেবে গড়ে উঠেছে। শিক্ষা-সংস্কৃতি, সাহিত্য-সাংবাদিকতার বিশাল অঙ্গন জুড়ে ভোগবাদ ও ইহবাদের চাষাবাদ। জীবনের সকল অঙ্গনে এমন সব চিন্তা ও দর্শনের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে, যার শেকড় ইহবাদ ও ভোগবাদের সাথেই সংযুক্ত। এইসব অমানবিক ও অনৈসলামিক চিন্তা ও কাজের বৈধতার বাহানা হিসেবেই বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, নারী-স্বাধীনতা, নারী-মুক্তি প্রভৃতি শব্দকে শ্লোগান হিসেবে ব্যবহার করা হয়। অথচ কে না বুঝবে যে, বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে অগ্রসরতার সাথে অশ্লীলতা ও বেহায়াপনার কোনো সম্পর্ক নেই। তেমনি প্রকৃত নারী-স্বাধীনতা ও নারী-মুক্তির সাথে নারীকে ভোগ্যপণ্যে পরিণত করারও কোনো সংযোগ নেই। প্রতারণাপূর্ণ মিষ্টি কথার দ্বারা যে নারী-পুরুষ কারো প্রকৃত শান্তি অর্জিত হয় না- এর জ¦লন্ত প্রমাণ বর্তমান সময়ের তথাকথিত নারীবাদ।

নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই ইসলামী জীবনব্যবস্থায় রয়েছে প্রকৃত শান্তি ও সম্মান। সংযমী ও আত্মমর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপনের যে নির্দেশনা ইসলামে আছে তার অনুসরণের মাধ্যমেই মানুষের জীবনে শান্তি আসতে পারে- এ সত্য আবারো আমাদের গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে। বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ইত্যাদি বিষয়ে অতিউৎসাহের প্রবণতাও বর্জন করতে হবে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বর্তমান বিশ্ব-ব্যবস্থায় প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে অগ্রসর হওয়া খুবই প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তব দক্ষতা ও অগ্রসরতা এক জিনিস আর অতিউৎসাহ অন্য জিনিস। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, এই অতি প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রেও আমাদের একশ্রেণির মানুষের মধ্যে বাস্তব দক্ষতা অর্জনের চেয়ে অতি উৎসাহী কথাবার্তাই যেন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর না হয়, রোবোটিক যুগে প্রবেশ করা কি উচ্ছ্বাসের ব্যাপার হতে পারে? গোটা পৃথিবী কি এখনো রোবোটিক যুগে প্রবেশ করেনি, না, এইমাত্র প্রবেশ করেছে? রোবোটিক যুগ তো পুরোনো যুগ। ইতিমধ্যে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এর বয়স অনেক হয়ে গেছে? আমাদের তো বলা দরকার ছিল, বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে। আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। পাঠনিমগ্নতা ও গবেষণামুখিতা বাড়াতে হবে। সন্ত্রাস, দুর্নীতি, অনৈতিকতা থেকে শিক্ষাঙ্গন ও শিক্ষা-ব্যবস্থাকে মুক্ত করতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীকে স্পর্শ করতে হলে আমাদের আরো বহুদূর পথ পাড়ি দিতে হবে।

দ্বিতীয় ব্যাপার হচ্ছে, বিজ্ঞান-প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বাস্তব দক্ষতা অর্জনের সাথে পোশাক-পরিচ্ছদে পশ্চিমা বা ইউরোপিয়ান হওয়ার কী সম্পর্ক? আমাদের সমাজের একশ্রেণির মানুষের পশ্চিমা প্রযুক্তির চেয়ে পশ্চিমা পোশাক-আশাক ও পশ্চিমা সংস্কৃতির দিকেই আগ্রহটা মনে হয় বেশি? অথচ পশ্চিমের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যদি দুধতুল্য হয় তাহলে তার সংস্কৃতি হচ্ছে রক্ত ও বিষ্ঠাতুল্য। গাভীর উদরের রক্ত ও বিষ্ঠা থেকে খাঁটি দুধ বের করে নিয়ে আসা একমাত্র আল্লাহর তাওফীকেই সম্ভব।

অনেক মুসলিম দেশে, যেগুলোতে একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত পশ্চিমা ঔপনিবেশিক শাসন ছিল; শিক্ষা-সংস্কৃতির সাথে জড়িত একটি বিরাট শ্রেণির মধ্যে খাঁটি দুধের চেয়ে রক্ত ও বিষ্ঠার দিকেই আগ্রহ যেন বেশি।

আজ একথা উচ্চারণ করাও আশ্চর্যের ব্যাপার হয়ে গেছে যে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সত্যিকার অর্থে মুসলমানেরই সম্পদ। একদা মুসলিমেরাই বিশ্ববাসীকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের পথ দেখিয়েছে। শুধু জ্ঞান-বিজ্ঞানেরই পথ দেখায়নি, বিশ্বাস, সংযম, শালীনতা, মানবিকতা, এককথায় সত্যিকারের আদর্শের পথ দেখিয়েছে। কিন্তু এরপর সেই আদর্শ থেকে বিচ্যুত হওয়ার কারণে মুসলিমেরা শুধু আদর্শবঞ্চিতই হয়নি, জ্ঞান-বিজ্ঞানের মহাসড়ক থেকেও ছিটকে পড়েছে। আজ আমাদের কর্তব্য, ইসলামী আদর্শের দিকে ফিরে আসা। চিন্তা-ভাবনা, শিক্ষা-সংস্কৃতি, ভেতর-বাহির সবক্ষেত্রে ইসলামী শিক্ষার আলোয় আলোকিত হওয়া। তাহলেই আমাদের মধ্যে তৈরি হবে সত্যিকারের জ্ঞানমুখিতা ও বিজ্ঞানমনষ্কতা। যা আমাদেরকে বিজাতির অন্ধ অনুকরণের পরিবর্তে স্বকীয় চেতনায় উদ্ভাসিত সমাজ-সভ্যতা বিনির্মাণের পথে এগিয়ে যেতে সহয়তা করবে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের তাওফীক দান করুন- আমীন।

 

 

advertisement