মুহাররম ১৪৪২   ||   সেপ্টেম্বর ২০২০

ফিরে আসার গল্প
কাদিয়ানী ধর্মমত থেকে মুক্তি

ওসমান ব্যারী, আয়ারল্যান্ড

আমার জন্ম হয়েছে আইরিশ ক্যাথলিক বাবা-মা’র ঘরে। পঁচিশ বছর বয়স থেকেই তুলনামূলক ধর্মতত্ত¡ আমার আগ্রহের বিষয়। মরক্কো ও ভারতে বেশ কয়েক বছর অবস্থানের পর ইসলাম ধর্ম আমাকে কাছে টানতে থাকে। ইসলামের প্রতি মুগ্ধতা ক্রমে তা গ্রহণের ইচ্ছায় পরিণত হলে আমি মুসলমানদের সঙ্গ লাভের প্রয়োজন অনুভব করি।

ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে বসবাসকালে টেলিফোন বুকের পৃষ্ঠায় আমি কেবল একটিমাত্র মসজিদ-আহমদিয়া ইসলামিক মিশন’-এর নাম খুঁজে পাই। এর মানে হল, কোনো স্কুল বা কলেজের জন্য, যারা নিজেদের শিক্ষার্থীদের মসজিদ পরিদর্শন করাতে চান, অথবা আমার মতো নওমুসলিমদের জন্য একমাত্র ‘আহমদিয়া মুসলিম মিশন’ ছাড়া দ্বিতীয় কোনো উপায় ছিল না। যদিও পরবর্তীতে আমি জানতে পেরেছি যে, তুর্কি, মরোক্কী ও পাকিস্তানীদের তত্ত¡াবধানেও এমন স্থান ছিল, যা তারা মসজিদ হিসেবে ব্যবহার করত।

এটা ছিল আহমদিয়া সম্প্রদায়ের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়, যার সংবাদ স্যাটেলাইট টেলিভিশনসহ বিভিন্ন ভাষার পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। মসজিদে সমাগত পাকিস্তানী, ড্যানিশ নওমুসলিমগণ এবং একজন বিখ্যাত সঙ্গীত তারকা শিহাব সাহেব আমাকে অভিনন্দন জানান। ঐ দিনগুলোতে আমি নিজেও সঙ্গীতের সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম।

যদিও আমি তখন পুরোপুরি তাদের দলভুক্ত হইনি, কিন্তু তারা আমাকে নামায পড়া শিখিয়েছে। বিভিন্ন কিতাব পড়তে দিয়েছে। যার মধ্যে কুরআন মাজীদের একটি তরজমাও ছিল। এ তরজমাটি আমার খুব ভালো লাগে। ইতিপূর্বে আমার কাছে ইসলামবিদ্বেষী এৎবড়মব ংধষব লিখিত কুরআন তরজমা ছিল।

ছ’মাস পর্যন্ত কোপেনহেগেনের কাদিয়ানীদের সঙ্গে জুমার নামায আদায় করে লণ্ডন ফিরে আমি যখন দেখতে পাই যে, বার্মিংহামের কাদিয়ানী সম্প্রদায় কোপেনহেগেনের তুলনায় সৌজন্য-শালীনতা, বুদ্ধি-বিবেচনা এবং নিয়ম-শৃঙ্খলার প্রতি কম মনোযোগী; তখন আমি হতাশ হই। মসজিদের ব্যাপারে তাদের ব্যবস্থাপনা খুবই বাজে ছিল। সেখানে খুব কম মানুষ নামায আদায় করতে আসত।

এই ‘সেট আপের’ মোহ ভঙ্গ হবার পর আমি বার্মিংহামের কেন্দ্রীয় মসজিদে যাতায়াত আরম্ভ করি। এখানে আমি জ্যামাইকার কয়েকজন বাসিন্দার দেখা পাই, যাদের অভিজ্ঞতা আমার মতো ছিল। তারাও আহমদিয়া সম্প্রদায়কে মুসলমান মনে করে তাতে শামিল হয়েছিলেন। কিন্তু আসল সত্য জানার পর ইসলাম গ্রহণ করেন। এসময়ই সর্বপ্রথম কেউ একজন আমাকে কাদিয়ানিবাদ এবং ইসলামের ভিন্নতা সম্পর্কে অবগত করেন।

যদিও আমি তখন দ্বিধা-দ্বেদ্বর মধ্যে ছিলাম; কিন্তু আমার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষাকারী কাদিয়ানীরা মুসলমানদের বার্মিংহাম মসজিদে আমার যাতায়াতের কঠোর সমালোচনা করে। আমাকে তারা স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে, এধরনের নামায কবুল হবে না। আহমদীরা বলে, একমাত্র তারাই প্রকৃত মুসলমান১  এবং কেবল তাদের দলকেই মধ্যমপন্থী মতাদর্শের কারণে পশ্চিমা বিশ্ব সমর্থন করে।

তারা আরো বলে, আমাদের বিপরীতে একদিকে রয়েছে কবরপূজারী সুন্নীরা। আর অন্যদিকে বোমাবাজ মৌলবাদী গোষ্ঠী। ঠিক ঐ সময়েই আমার সম্মুখে মির্যা কাদিয়ানীর আনুগত্যের হলফনামা স্বাক্ষরের জন্য পেশ করা হয়। যাতে আমি স্বাক্ষর করে ফেলি। যদিও এবিষয়ে আমি অন্তর থেকে রাজি ছিলাম না। আর মদ্যপান ত্যাগ করা ছাড়া আমার সঙ্গীত জীবনও অপরিবর্তিত ছিল।

১৯৮১ সালের ডিসেম্বরে লণ্ডনের কাদিয়ানীদের প্রধান মোবারক আহমদ আমাকে (পাকিস্তানের পাঞ্জাবের) রবওয়ায় (বর্তমান চনাবনগরে) বার্ষিক মাহফিলে অংশগ্রহণ করতে বলে এবং করাচি পর্যন্ত বিমানের টিকিট সংগ্রহ করে দেয়। আমি করাচি থেকে লাহোর হয়ে রবওয়ায় পৌঁছি। সেখানে দু-একজন আরবসহ বিশে^র বিভিন্ন দেশ থেকে আগত কাদিয়ানীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। ইউরোপ থেকে আগত একজন জার্মান এবং আরেকজন বৃটিশ কাদিয়ানীর সঙ্গে আমার সময় অতিবাহিত করি। যাদের উভয়কে কাদিয়ানী নারীর সঙ্গে বিয়ে দিয়ে সুকৌশলে কাবু করা হয়েছিল।

সৌভাগ্যবশত যেহেতু আমি পূর্ব থেকেই বিবাহিত ছিলাম, তাই এ ফাঁদ থেকে রেহাই পাই। আমাকেও এ প্রলোভন দেয়া হয় যে, যেহেতু তোমার স্ত্রী তোমার ধর্মের পথে প্রতিবন্ধক; কাজেই তাকে ত্যাগ করে সুন্দরী কাদিয়ানী নারী বিয়ে করো। আমার তিনটি আদরের কন্যা ছিল। তাদেরকে ছাড়ার কোনো ইচ্ছাই আমার ছিল না।

মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর ইংরেজিতে অনূদিত বইগুলো আমাকে অস্থির করে ফেলে। সেখানে এক ওহী ছিল, যার মধ্যে এ ‘প্রতিশ্রুত মাসীহ’ স্বপ্নে একটি গাছে সাদা রঙ্গের অনেকগুলো পাখি বসে থাকতে দেখেন। এরপর তিনি একটি কন্ঠস্বর শুনতে পান, যে ইংরেজিতে বলছে- ও ংযধষষ মরাব ুড়ঁ ধ ষধৎমব ঢ়ধৎঃু ড়ভ ওংষধস. (অর্থ : ‘আমি তোমাকে ইসলামের একটি বড় জামাত দান করব।’২)

আমি খুব আশ্চর্যবোধ করলাম এই ভেবে যে, নির্ভুল, মানোত্তীর্ণ এবং চমৎকার সাহিত্যপূর্ণ আরবি ভাষায় কুরআনে কারীম অবতীর্ণকারী খোদা ব্যাকরণিক ত্রুটিমুক্ত (ইংরেজি) বাক্য নাযিল করতেও অক্ষম! যখন আমি রবওয়াতে ছিলাম, তখন এ ওহী পুনরায় আমার মনে পড়ে যায়। আমাদের তিন ইউরোপিয়ানকে ওহীর সেই পাখিরূপে পেশ করা হয়!

রবওয়ায় আমি কাদিয়ানী জামাতের উচ্চপদস্থ দায়িত্বশীলদের সাথেও সাক্ষাৎ করি। তাদেরকে আমি অতিশয় বাচাল এবং অযোগ্য পাই। তাদের অনৈতিকতার একটি প্রকাশ হচ্ছে, রবওয়ার আশপাশের গরীব কাদিয়ানী কৃষকের সন্তানদের তারা পড়াশোনার ব্যবস্থা স্বরূপ মস্কো অথবা রোমানিয়ায় পাঠিয়ে দেয়। যেখানে শিক্ষা খরচ তুলনামূলক সস্তা। আর তারপরে ঐ ছেলের অনুগ্রহধন্য বৃদ্ধ পিতা, (কঠিন পরিশ্রমের সময় যার ছেলে তার সহযোগী হিসেবে অনুপস্থিত,) তার জমি দানস্বরূপ গ্রহণ করে নেয়। এভাবে তথাকথিত ‘পবিত্র পরিবারের’ রাজত্ব ক্রমে বিস্তৃত হচ্ছে।

মাহফিল শেষে ধর্মীয় প্রয়োজনের তাগিদে আমাকে (ভারতের) কাদিয়ানে গিয়ে মির্যা কাদিয়ানীর কবরে বাধ্য হয়ে উপস্থিত হতে হয়। সেখানে আমি মানুষকে খুবই অমার্জিত এবং বিশৃঙ্খল অবস্থায় দেখি। বেরিয়ে এসে অনেক স্বস্তিবোধ হয়। আমরা তিন ‘সাদা পাখি’ (!) ঐ সময়ের খলিফা মির্যা নাসের আহমদের সঙ্গেও মুলাকাত করি। তার নিকট সবসময় একজন ক্যামেরাম্যান উপস্থিত থাকত। যে কোনো বরেণ্য-বিখ্যাত ব্যক্তির মির্যা নাসেরের সঙ্গে মুসাফাহারত অবস্থার ছবি সে তুলে রাখত।

আমি কাদিয়ানী জামাতের চতুর্থ খলীফা মির্যা তাহের আহমদের সঙ্গেও দেখা করেছি। তিনি তার দীর্ঘ লেকচারে আমাদেরকে জানিয়েছেন যে, পাশ্চাত্যে নৈতিকতা ব্যতীত সবকিছুই খুব উন্নত এবং অসাধারণ। পাশ্চাত্যকে তার নৈতিকতা উন্নত করতে হলে রবওয়ার দিকনির্দেশনা গ্রহণ করতে হবে। বিষয়টি আমার কাছে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক মনে হত।

যাদের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল, আমার দৃষ্টিতে তারা দু’ধরনের। হয়ত তারা এমন মূর্খ লোক, যাদের নিজেদের চারপাশের পরিস্থিতি সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই অথবা তারা এমন দুর্নীতিবাজ ইতর শ্রেণির লোক, যারা ইসলামের নামে পরিচালিত ভণ্ডামি সম্পর্কে জানা সত্তে¡ও নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য জামাতের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত।

সংক্ষেপ কথা, আমি এই বেঈমানী এবং ষড়যন্ত্রের ধর্মের প্রতি এমন বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়লাম যে, তাড়াতাড়ি এ থেকে মুক্তিলাভের সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম। আমি এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলাম যে, যদি আহমদিয়াত-ই প্রকৃত ইসলাম হয়ে থাকে; তবে এমন ইসলাম থেকে তওবা করাই শ্রেয়।

আমি নামায, ধর্মীয় পড়াশোনা এবং ইসলামগ্রহণ করার চিন্তাই মন থেকে মুছে ফেলি। সঙ্গীত ছেড়ে দিয়ে আয়ারল্যাণ্ডে একটি ফার্ম লিজ নেই। কয়েক বছর আমি ইসলাম সম্পর্কে চিন্তাই মাথায় আনিনি। অতঃপর রব্বুল আলামীনের মেহেরবানীতে ডাবলিনে আমি কিছু মুসলিম ভাইয়ের সঙ্গে পরিচিত হই এবং স্বামী-স্ত্রী উভয়ে ১৯৮৪ সালে ডাবলিনের একটি মসজিদে ইসলাম গ্রহণ করি- আলহামদু লিল্লাহ।                                                                 

ভাষান্তর ও টীকা : মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম

 

 

advertisement