মুহাররম ১৪৪২   ||   সেপ্টেম্বর ২০২০

ছোট বলে অবহেলা নয়

মাওলানা শিব্বীর আহমদ

আমাদের একটি স্বাভাবিকতা- আমরা ছোট কোনোকিছুকে অবহেলার দৃষ্টিতে দেখি। অর্থবিত্তে ছোট, প্রভাবপ্রতিপত্তিতে ছোট, বংশমর্যাদায় ছোট, সামাজিক সম্মানের বিবেচনায় ছোট, শিক্ষাদীক্ষায় ছোট, বয়সে ছোট- এমন যত ‘ছোট’ রয়েছে সাধারণত সবই আমাদের দৃষ্টিতে অবহেলার পাত্র। অনেক সময় বয়সে বড় যারা তারা বয়সে ছোটদের অবহেলা করে, সম্পদশালীরা দরিদ্রদের তাচ্ছিল্য করে, বিদ্যাবুদ্ধিতে অগ্রসর যারা, তারা এক্ষেত্রে অনগ্রসরদের ছোট করে দেখে। সন্দেহ নেই, এ তাচ্ছিল্য ও অবহেলার দৃষ্টি অবশ্যই নিন্দনীয় এবং এতেও সন্দেহ নেই, নিন্দনীয় এ বিষয়টি সমাজের সকল স্তরে ‘যত্নসহ লালন’ করা হচ্ছে। 

সে যাই হোক, এ তাচ্ছিল্য আমার আজকের আলোচ্য বিষয় নয়। আমি বলতে চাই- আমাদের জীবনচলার পথে পথে, ঘরে-বাইরে নানা জায়গায় ছোট ছোট পুণ্যময় এমন অনেক কিছু ছড়িয়ে আছে, যেগুলো নিজ নিজ ক্ষুদ্রতাসহই আমাদেরকে সফলতার পথে পৌঁছে দিতে পারে অনেক দূর। আবার এমন অনেক ছোট ছোট পাপের কাজও রয়েছে, যেগুলো ক্ষুদ্র হলেও আগুনের ফুলকির মতো জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছাই করে দিতে পারে আমাদের ঈমান-আমল সবকিছু। দৃশ্যত ক্ষুদ্র এসব পাপ-পুণ্য নিয়েই আমার আজকের আলোচনা।

পবিত্র কুরআনের ঘোষণাটি লক্ষ করুন-

فَمَنْ یَّعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَیْرًا یَّرَهٗ، وَ مَنْ یَّعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا یَّرَهٗ.

কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে সে তা দেখবে এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলে সে তা-ও  দেখবে। -সূরা যিলযাল (৯৯) : ৭-৮

কিয়ামতের ময়দানের কথা এখানে বলা হচ্ছে। দুনিয়াতে ছোট-বড় যে কাজই মানুষ করুক, তা পাপের হোক আর পুণ্যের হোক, গোপনে হোক কিংবা প্রকাশ্যে, নিজ নিজ আমলনামায় মানুষ সেদিন সবকিছুই দেখতে পাবে। বড় বড় পাপ কিংবা পুণ্যের একটা সাধারণ হিসাব তো মানুষের থাকে। কিন্তু ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর এমন অনেক কিছুই সেদিন আমলনামায় মানুষ দেখতে পাবে- যার প্রকাশ সে কল্পনাও করতে পারেনি। আমলনামার এ ব্যাপকতা দেখে মানুষের চোখমুখ থেকে তখন ঝরতে থাকবে বিস্ময়। বিশেষত যারা অপরাধী, পাপ ও অন্যায় যাদের বেশি, নিজেদের কৃতকর্মের এমন ধারণাতীত সংরক্ষণ দেখে তাদের মুখে উচ্চারিত হবে হতাশার সুর। কুরআনের ভাষায়-

وَ وُضِعَ الْكِتٰبُ فَتَرَی الْمُجْرِمِیْنَ مُشْفِقِیْنَ مِمَّا فِیْهِ وَ یَقُوْلُوْنَ یٰوَیْلَتَنَا مَالِ هٰذَا الْكِتٰبِ لَا یُغَادِرُ صَغِیْرَةً وَّ لَا كَبِیْرَةً اِلَّاۤ اَحْصٰىهَا،   وَ وَجَدُوْا مَا عَمِلُوْا حَاضِرًا،     وَ لَا یَظْلِمُ رَبُّكَ اَحَدًا.

এবং আমলনামা উপস্থিত করা হবে। এতে যা লিপিবদ্ধ আছে তার কারণে তুমি অপরাধীদেরকে দেখবে আতঙ্কগ্রস্ত এবং তারা বলবে-হায়! দুর্ভাগ্য আমাদের! এটা কেমন গ্রন্থ! এ তো ছোট-বড় কোনোকিছুই বাদ  দেয় না, বরং তা সবকিছুরই হিসাব রেখেছে।’ তারা তাদের কৃতকর্ম সামনে উপস্থিত পাবে। তোমার প্রতিপালক কারও প্রতি জুলুম করেন না। -সূরা  কাহফ (১৮) : ৪৯

এখানে তো  কেবলই অপরাধীদের কথা বলা হয়েছে। আর সূরা যিলযালের উপরোক্ত আয়াতদুটিতে বলা হয়েছে ছোট ছোট পাপ-পুণ্য উভয়ের কথা। পাপের  যখন এমন হিসাব হবে, পুণ্য ও নেককাজের এ হিসাব তো ইনসাফের দাবি। আর আল্লাহ তো ইনসাফের বদলে ‘ইহসান’ ও দয়া করে নেকআমলকারীদের বেহিসাব প্রতিদানে পুরস্কৃত করবেন। কেমন ইহসান? আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

مَنْ هَمّ بِحَسَنَةٍ فَلَمْ يَعْمَلْهَا، كُتِبَتْ لَهُ حَسَنَةً، وَمَنْ هَمّ بِحَسَنَةٍ فَعَمِلَهَا، كُتِبَتْ لَهُ عَشْرًا إِلَى سَبْعِ مِائَةِ ضِعْفٍ، وَمَنْ هَمّ بِسَيِّئَةٍ فَلَمْ يَعْمَلْهَا، لَمْ تُكْتَبْ، وَإِنْ عَمِلَهَا كُتِبَتْ.

যে ব্যক্তি কোনো নেক আমলের ইচ্ছা করল, কিন্তু এখনো তা আমলে পরিণত করেনি; (এ ইচ্ছার কারণে) তার আমলনামায় একটি নেকি লেখা হবে। আর যে ব্যক্তি এ ইচ্ছাকে আমলে পরিণত করল তার আমলনামায় দশ থেকে সাতশ পর্যন্ত নেকি লেখা হবে। আর যদি কোনো গুনাহের ইচ্ছা করে; কিন্তু গুনাহটি না করে; তার আমলনামায় কিছুই লেখা হবে না। যদি গোনাহটি করে বসে, তাহলে কেবল তা-ই (অর্থাৎ একটি গোনাহ) লেখা হবে। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৩০

যাইহোক, হিসাব যখন সবকিছুরই হবে, ছোট কোনো বিষয়কে তাচ্ছিল্য করা তাহলে আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী কোনো সুস্থ বিবেকের কাজ হতে পারে না।

আমাদের এ দুনিয়ার জীবনেও চোখ বুলালে আমরা দেখব- কত ক্ষুদ্র বিষয় কতভাবে আমাদের জীবনটাকে সাজিয়ে তুলছে, আমাদেরকে মুগ্ধ ও আনন্দিত করছে! হাড়িভর্তি খাবারের স্বাদ স্বাভাবিক রাখার জন্যে লবণ দিতে হয় খুব সামান্যই। সামান্য এ লবণটুকুর অভাবে দামি দামি খাবারের স্বাদ যেমন বিস্বাদে পরিণত হতে পারে, আবার প্রয়োজনীয় বলে কেউ যদি এ লবণের পরিমাণ অনেক বাড়িয়ে দেয় তবে সে খাবারও চেখে দেখার সাধ্য হবে না কারও। একইভাবে নিভু নিভু দুর্বল একটু আগুন থেকেও অসতর্কতাবশত সৃষ্টি হতে পারে বড় অগ্নিকাণ্ড, জ্বলে-পুড়ে ছাই হতে পারে ঘর-বাড়ি-এলাকা, সামান্য একটু অসতর্কতায় হারিয়ে যেতে পারে কোটি টাকার সম্পদ, চোখের সামনে নাই হয়ে যেতে পারে বছরের পর বছর ধরে চালানো অবিরাম সাধনার ফল। ছোট বলে তাই কোনোকিছুকেই তাচ্ছিল্য ও অবজ্ঞা করার সুযোগ নেই।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

لاَ تَحْقِرَنّ مِنَ الْمَعْرُوفِ شَيْئًا، وَلَوْ أَنْ تُعْطِيَ صِلَةَ الْحَبْلِ، وَلَوْ أَنْ تُعْطِيَ شِسْعَ النّعْلِ، وَلَوْ أَنْ تَنْزِعَ مِنْ دَلْوِكَ فِي إِنَاءِ الْمُسْتَسْقِي، وَلَوْ أَنْ تُنَحِّيَ الشّيْءَ مِنْ طَرِيقِ النّاسِ يُؤْذِيهِمْ، وَلَوْ أَنْ تَلْقَى أَخَاكَ وَوَجْهُكَ إِلَيْهِ مُنْطَلِقٌ، وَلَوْ أَنْ تَلْقَى أَخَاكَ فَتُسَلِّمَ عَلَيْهِ، وَلَوْ أَنْ تُؤْنِسَ الْوَحْشَانَ فِي الأَرْضِ، وَإِنْ سَبّكَ رَجُلٌ بِشَيْءٍ يَعْلَمُهُ فِيكَ، وَأَنْتَ تَعْلَمُ فِيهِ نَحْوَهُ، فَلاَ تَسُبّهُ فَيَكُونَ أَجْرُهُ لَكَ وَوِزْرُهُ عَلَيْهِ.

ভালো কোনো কাজকেই তুচ্ছ মনে করবে না। সে কাজটি কাউকে এক টুকরো রশি দিয়ে সহযোগিতা করে হোক, কাউকে একটি জুতার ফিতা দিয়ে হোক, তোমার পানির পাত্র থেকে পানিপ্রত্যাশী কারও পাত্রে সামান্য পানি ঢেলে দিয়ে হোক, মানুষের চলার পথ থেকে কষ্টদায়ক কোনোকিছু সরিয়ে দেয়ার মধ্য দিয়ে হোক, হাসিমুখে তোমার ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের মাধ্যমে হোক, তোমার ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের  পর সালাম দিয়ে হোক, পৃথিবীতে কোথাও কারও একাকীত্ব দূর করে দিয়ে হোক- কোনো কিছুকেই তুমি তুচ্ছ মনে করবে না। তোমার কোনো অন্যায়ের কথা জেনে কেউ যদি তোমাকে গালি দেয় আর তুমি জান- তার মধ্যেও এ দোষটি রয়েছে, তখন তুমি তাকে  গালি  দেবে না; এতে তার প্রতিদান তুমি পেয়ে যাবে, আর তার গোনাহ তার কাঁধেই থাকবে। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৫৯৫৫

আরেক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশনা বর্ণিত হয়েছে এভাবে-

إِيّاكُمْ وَمُحَقّرَاتِ الذّنُوبِ، فَإِنّمَا مَثَلُ مُحَقّرَاتِ الذّنُوبِ كَمَثَلِ قَوْمٍ نَزَلُوا بَطْنَ وَادٍ، فَجَاءَ ذَا بِعُودٍ، وَجَاءَ ذَا بِعُودٍ، حَتّى حَمَلُوا مَا أَنْضَجُوا بِهِ خُبْزَهُمْ، وَإِنّ مُحَقّرَاتِ الذّنُوبِ مَتَى يَأْخُذْ بِهَا صَاحِبُهَا تُهْلِكْهُ.

তুচ্ছ মনে করা হয়- এমন সকল পাপ থেকে তোমরা বেঁচে থেকো। তুচ্ছ এসব পাপের দৃষ্টান্ত তো এমন- যেমন কিছু মানুষ একটি উপত্যকায় যাত্রাবিরতি করল। তখন তাদের একজন একটি লাকড়ি নিয়ে এল। আরেকজন আরেকটি লাকড়ি নিয়ে এল। এভাবে তাদের এ পরিমাণ লাকড়ি সংগ্রহ হয়ে গেল, যা(র আগুন) দিয়ে তারা তাদের রুটি সেঁকে নিতে পারে। সন্দেহ নেই, এ তুচ্ছ পাপগুলোতে যখন কেউ লিপ্ত হয় সেগুলো তাকে তখন ধ্বংস করে দেয়। -আলমুজামুল কাবীর, তবারানী, হাদীস ৫৮৭২; মাজমাউয যাওয়ায়েদ, হাদীস ১৭৪৬২; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২২৮০৮

ছোট ছোট পুণ্য আর তুচ্ছ পাপ নিয়ে এই হল হাদীসের নির্দেশনা। পবিত্র কুরআনের ভাষ্য আমরা উল্লেখ করেছি- মানুষের আমলনামায় ছোট-বড় সব আমলই সংরক্ষিত থাকবে এবং কিয়ামতের দিন এসব আমলেরই হিসাব হবে। ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর বিষয়েরও হিসাব হবে। হাশরের ময়দানের ভয়াবহতার মাত্রা যে কতটা বেশি হবে, তা তো আর আমাদের ভাষায় আমরা প্রকাশ করতে পারি না। কুরআনে কারীম ও হাদীস শরীফে এর কিছুটা বর্ণনা রয়েছে। যেমন, সূরা আবাসায় বলা হয়েছে এভাবে-

فَاِذَا جَآءَتِ الصَّآخَّةُ، یَوْمَ یَفِرُّ الْمَرْءُ مِنْ اَخِیْهِ، وَ اُمِّهٖ وَ اَبِیْهِ، وَ صَاحِبَتِهٖ وَ بَنِیْهِ، لِكُلِّ امْرِئٍ مِّنْهُمْ یَوْمَىِٕذٍ شَاْنٌ یُّغْنِیْهِ.

যখন কিয়ামত উপস্থিত হবে, সেদিন মানুষ পালিয়ে যাবে তার ভাই থেকে, তার মা ও বাবা থেকে, তার স্ত্রী ও সন্তানাদি থেকে। সেদিন তাদের প্রত্যেকেরই এমন গুরুতর অবস্থা হবে, যা তাকে সম্পূর্ণরূপে ব্যস্ত রাখবে। (আয়াত ৩৩-৩৭)

ভাবা যায়, দুনিয়ার এ ক্ষণস্থায়ী জীবনে যাদেরকে আমরা সবচেয়ে আপন মনে করি, বিপদাপদের আশ্রয় মনে করি, সেই মা-বাবা, ভাই-বোন কারও কথাই সেদিন মনে থাকবে না! এমনকি যে স্ত্রী ও সন্তানাদির জন্যে দুনিয়াতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে আমরা অর্থ উপার্জন করে চলছি, সন্তানের সম্ভাব্য ভবিষ্যত-সুখের আশায় নিজের বর্তমানের নিশ্চিত সুখ বিলিয়ে দিচ্ছি, সে স্ত্রী ও সন্তানাদির কথাও যে মানুষ কেবল ভুলেই যাবে এমন নয়, বরং আয়াতের ভাষ্য হল, এরকম ঘনিষ্ঠ যারা, যাদের জন্যে মানুষ দুনিয়ার আরাম-আয়েশ এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে নীতিনৈতিকতা পর্যন্ত বিলিয়ে দেয়, এ ঘনিষ্ঠদের থেকে সে রীতিমতো পালিয়ে বেড়াবে! কঠিন সেই মুহূর্তে প্রত্যেকেরই থাকবে কেবল নিজেকে নিয়ে চিন্তা- ইয়া নাফসী, ইয়া নাফসী!

এমন  পরিস্থিতিতে সামান্য ক’টি নেকির জন্যেও মানুষ আক্ষেপ করবে। হাদীসে তো এমন কথাও বর্ণিত হয়েছে- দুনিয়াতে মুসলমান বান্দাদের যেসব দুআ কবুল করা হয় না, কিয়ামতের দিন তাকে সেসব দুআর প্রতিদান দেয়া হবে। তখন সে আক্ষেপ করে বলবে, হায়! দুনিয়াতে যদি আমার কোনো দুআই কবুল করা না হতো! এই হচ্ছে দুনিয়া আর আখেরাতের পার্থক্য।

দুনিয়ার ভালোমন্দ কাজের ফল আমাদেরকে ভোগ করতে হবে আখেরাতে। কাজ ভালো হোক আর মন্দ, ভালো কাজ করা আর মন্দ থেকে বাঁচা বা মন্দ থেকে আল্লাহ্র ক্ষমা লাভ করা- তা করে যেতে হবে এ দুনিয়াতেই। আখেরাতে নতুন করে আমল করার কোনো সুযোগ থাকবে না। দুনিয়ার অর্থবিত্ত, প্রভাব-প্রতিপত্তিও কোনো কাজে আসবে না। কাজে লাগবে একমাত্রই দুনিয়ার আমল। কারও কোনো দেনা শোধ করতে হলেও তা আমলের বিনিময়েই করতে হবে। পরকালীন এ বাস্তবতাকে সামনে রাখলেও সহজে বুঝে আসে- ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আমলকে তাচ্ছিল্য না করার বিষয়টি।

আরেকটি যুক্তির কথা হল, নিয়মিত কোনো আমল যদি ছোটও হয়, ধারাবাহিকভাবে দীর্ঘদিন করার ফলে এ ছোট আমলটির প্রতিদানও হয়ে যায় পাহাড়সম। আর ছোট আমল হলেও তা নিয়মিত করা- আল্লাহ পছন্দ করেন।

ছোট একটি আমলের কথা বলি। প্রতিদিন পাঁচবার আমরা মসজিদে নামায পড়তে যাই। প্রতিবারই মসজিদে প্রবেশের সময় আমাদের জুতা খুলে মসজিদে প্রবেশ করতে হয়, কোনো এক পা দিয়েই আমাদের মসজিদে প্রবেশ করতে হয়। আমরা যদি বাম পায়ের জুতাটা আগে খুলি আর ডান পা দিয়ে মসজিদে প্রবেশ করি, তবে এতে দুটি সুন্নত আদায় হল। একইভাবে বের হওয়ার সময় যদি বাম পা দিয়ে মসজিদ থেকে বের হই আর ডান পায়ের জুতাটা আগে পরি, তবে আরও দুটি সুন্নত আদায় হল। এছাড়া মসজিদে প্রবেশ ও বের হওয়া- দুই সময়েই বিসমিল্লাহ ও দরূদ শরীফ-আসসালাতু ওয়াস সালামু আলা রাসূলিল্লাহ’ পড়া সুন্নত। এতটুকু আদায় করলে দুয়ে দুয়ে আরও চারটি সুন্নত আদায় হল। আর কেউ যদি মসজিদে প্রবেশের দুআ-

اللّهُمّ افْتَحْ لِيْ أَبْوَابَ رَحْمَتِكَ.

আর মসজিদ থেকে বের হওয়ার দুআ-

اللهُمّ إِنِّي أَسْأَلُكَ مِنْ فَضْلِكَ.

শিখে নিতে পারে এবং এর ওপর আমল করে, তবে আরও দুটি সুন্নত আদায় হল। এভাবে প্রতিবার মসজিদে প্রবেশের সময় পাঁচটি আর বের হওয়ার সময় আরও পাঁচটি, মোট দশটি সুন্নত আদায় হয়ে যায়। পাঁচ ওয়াক্ত নামাযে হয় পঞ্চাশটি। এ তো এক দিনের হিসাব। ত্রিশ দিনে হয় তিনশটি। এক বছরে তিন হাজার ছয়শ পঞ্চাশটি। পবিত্র কুরআনের ভাষ্য অনুসারে একটি আমলের জন্য যদি কমপক্ষে দশ গুণ সওয়াবও দেয়া হয় তবে বছরব্যাপী এ ছোট আমলটুকু করতে পারলে আমলনামায় যোগ হবে ছত্রিশ হাজার পাঁচশ নেকি! ছোট এ আমলটুকু যদি কেউ ধারাবাহিকভাবে দশ বছর করতে থাকে, বিশ বছর কিংবা ত্রিশ-চল্লিশ বছর, তবে আমলনামায় কী পরিমাণ নেকি যোগ হবে? এ তো গেল গাণিতিক হিসাব। এর বাইরে আমরা এভাবেও চিন্তা করতে পারি- একটি সুন্নতের উপর আমল করার অর্থ হচ্ছে, মহান আল্লাহ তাঁর যে রাসূলকে আমাদের জন্যে আদর্শ হিসেবে ঘোষণা করেছেন সে রাসূলের নির্দেশিত পথ অনুসরণ ও অনুকরণ করে একটি আমল সম্পাদন করা। সুন্নত মোতাবেক আমলের কবুল হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে অনেক বেশি।

একবার দরূদ শরীফ পাঠ করলে আল্লাহ্র পক্ষ থেকে দশটি রহমত নাযিল হয়- এটাও নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘোষণা। সে অনুসারে প্রতিবার মসজিদে প্রবেশ এবং সেখান থেকে বের হওয়ার সময় যে ব্যক্তি দরূদ শরীফ পড়ার আমলটি করে, তার উপর দিনে কতবার রহমত নাযিল হয় শুধু এ আমলটি করার বদৌলতে? পুরো মাসে কতটি রহমত নাযিল হয়? বছরে, দশ বা বিশ বছরে তবে কতটি? আর এ সংখ্যা কমবেশি যাই হোক, আল্লাহ্র রহমত যার উপর নেমে আসে, তার কি আর কোনোকিছুর ভাবনা থাকে! এ হচ্ছে ছোট একটি আমলের আংশিক বিবরণ। এভাবে যে কোনো নিয়মিত আমলের ক্ষেত্রেই এমন হিসাব করা যাবে। কথা হল, আমলটি নিয়মিত করতে পারলে অনেক ভালো। এতে কষ্টও কম হয়, প্রাপ্তিও বেশি হয়। দুদিকেই লাভ।

আবার যদি কেউ ছোট কোনো গুনাহে নিয়মিত জড়াতে থাকে, হাদীসের ভাষ্য অনুসারে, এ কাজ তাকে ধ্বংস করে দিতে পারে। যেমন, মনে করুন, প্রতিদিন একজন ব্যক্তি পাঁচ টাকা অযথা খরচ করে। লোকটি যদি কোটিপতি কিংবা লাখপতিও  হয় তবে এ পাঁচ টাকা তার জন্যে কোনো বিষয়ই নয়। অথচ প্রতিদিনের এ পাঁচ টাকাই মাস শেষে হয়ে যাচ্ছে ১৫০ টাকা, বার মাসে হচ্ছে ১৮০০ টাকা। দশ বছরে এর পরিমাণ হবে ১৮০০০ টাকা! অযথা এ টাকা খরচ করার পাপ কী পরিমাণ হবে তা নির্ভর করবে কাজটি কোন্ পর্যায়ের- হারাম না মাকরুহ- তা নির্ণয় করার ওপর। এর সঙ্গে অর্থহীন কাজে টাকা খরচ করার নিষিদ্ধতা তো রয়েছেই।

এবার আরেক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি আলোচনা করি। হাদীস শরীফে এমন অনেক আমলের কথা বর্ণিত হয়েছে, যেগুলো বাহ্যত খুবই ছোট, একেবারে মামুলি বলা চলে। কিন্তু  ক্ষুদ্র ও মামুলি এ আমলগুলোর জন্যেই ঘোষিত হয়েছে অগণিত পুরস্কার। ছোট সে আমলগুলো যদি নিয়মিত করা যায়, তবে তো উপরের গাণিতিক হিসাবও এখানে যথেষ্ট নয়। লক্ষ করুন, ফজরের নামাযের পর নিজ জায়গায় বসে যদি কেউ ইবাদত-বন্দেগি করতে থাকে, এরপর সূর্য ওঠার পর দুই রাকাত ইশরাকের নামায আদায় করে, তবে সে একটি হজ্ব ও একটি উমরা আদায় করার সওয়াব পাবে। দেখুন, দুই রাকাত নফল নামায, ওয়াজিব কিংবা ফরজ নয়, সুন্নতে মুআক্কাদাও নয়, এমন দুই রাকাত নামাযের বদলায় পাওয়া যাচ্ছে একটি নফল হজ্ব ও একটি নফল উমরার সওয়াব। বছরের পর বছর ধরে যে নিয়মিত ইশরাকের নামায আদায় করে যাচ্ছে, তার পুরস্কারের হিসাব কি নামাযে তিলাওয়াতকৃত সূরাগুলোর অক্ষরসংখ্যা, নামাযের প্রতিটি দুআ ও যিকিরের অক্ষরসংখ্যা ইত্যাদি অনুসারে এখানে করা যাবে? না, তার জন্যে ঘোষিত হয়ে আছে আরও অনেক অনেক বড় পুরস্কার। গাণিতিক হিসাব তাই এখানে অচল। এভাবেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আমলগুলো আমাদের আমলনামাকে সমৃদ্ধ করতে পারে, আমাদের পরকালকে আলোকিত করে তুলতে পারে এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তির ওসিলা হতে পারে।

 

 

advertisement