মুহাররম ১৪৪২   ||   সেপ্টেম্বর ২০২০

সালাফের পথ ও মাসলাকে দেওবন্দ

মাওলানা আবু সাবের আব্দুল্লাহ

ইসলাম হল আল্লাহ তাআলার মনোনীত একমাত্র দ্বীন, নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক উপস্থাপিত সামগ্রিক ও সার্বজনীন শরীয়ত ও সুন্নত; যার আল্লাহপ্রদত্ত দলীল হল, কুরআন মাজীদ ও হাদীস শরীফ। আর এর বাস্তবরূপ নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে কেরাম ও তাঁদের অনুসারী আকাবিরে উম্মতের জীবনধারা।

সালাফ’ বলতে প্রধানত সাহাবায়ে কেরাম উদ্দেশ্য। তাঁদের অনুসারী হিসাবে তাবেয়ী এবং তাবেতাবেয়ীও সালাফের মধ্যে শামিল। আর ব্যাপক অর্থে তাঁদের যোগ্য উত্তরসূরীগণও আমাদের জন্য সালাফ। তাঁরা ইসলামকে আপন আপন জীবনে প্রতিফলিত করে ধন্য হয়েছেন, কামিয়াব হয়েছেন। যুগে যুগে যে যতটুকু ما أنا عليه وأصحابي (আমি ও আমার সাহাবীরা যে মত ও পথের উপর আছি- অনুযায়ী) ইসলামের উপর আমল করেছে, সে ততখানি সফল হয়েছে। আর যে যতটা দূরে সরে অন্য কিছু আমলে নিয়েছে, সে ততটাই গোমরাহ ও বরবাদ হয়েছে।

 

আকাবির ও আসলাফের  প্রতি মহব্বত

মূলত পূর্বসূরী সালাফে সালেহীন ছিলেন কুরআন-সুন্নাহ্র জীবন্ত নমুনা। তাঁদের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা আমাদের পর্যন্ত দ্বীন পৌঁছিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা সেই সালাফের জন্য মাগফিরাত কামনা করার এবং তাঁদের ব্যাপারে অন্তর সাফ-সুতরা রাখার আদেশ করে দুআ শিখিয়েছেন-

رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَ لِاِخْوَانِنَا الَّذِیْنَ سَبَقُوْنَا بِالْاِیْمَانِ وَ لَا تَجْعَلْ فِیْ قُلُوْبِنَا غِلًّا لِّلَّذِیْنَ اٰمَنُوْا رَبَّنَاۤ اِنَّكَ رَءُوْفٌ رَّحِیْمٌ.

হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এবং ঈমানে অগ্রণী আমাদের ভ্রাতাগণকে ক্ষমা করে দিন। আর ঈমানদারগণের বিষয়ে আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রেখেন না। আমাদের মালিক! আপনি বড় ¯œহময়, বড় দয়ালু। -সূরা হাশর (৫৯) : ১০

যাদের ইনাবাত ইলাল্লাহ রয়েছে, তাঁরা আমাদের জন্য আদর্শ। আল্লাহ তাআলা ঈমানদারকে বলেন-

وَّ اتَّبِعْ سَبِیْلَ مَنْ اَنَابَ اِلَیَّ  ثُمَّ اِلَیَّ مَرْجِعُكُمْ فَاُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُوْنَ.

তুমি পথ অনুসরণ কর, যে শুদ্ধচিত্তে আমার অভিমুখী, এরপর তোমাদের প্রত্যাবর্তন আমার কাছেই। তখন জানিয়ে দিব- তোমরা কী আমল করতে! -সূরা লুকমান (৩১) : ১৫

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও উম্মতকে দুআ শিখিয়েছেন-

اللَّهُمَّ إِنِّيْ أَسْأَلُكَ حُبَّكَ، وَحُبَّ مَنْ يُحِبُّكَ، وَالعَمَلَ الَّذِي يُبَلِّغُنِيْ حُبَّكَ.

হে আল্লাহ! আমাকে দাও তোমার ভালবাসা, যে তোমাকে ভালবাসে তার প্রতি ভালবাসা এবং এমন কাজের তাওফীক, যা আমাকে তোমার ভালবাসায় উত্তীর্ণ করবে। -জামে তিরমিযী, হাদীস ৩৪৯০

 

আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর অনুসরণ

কুরআন হল দ্বীনে ইসলামের প্রথম দলীল এবং নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাহ হল কুরআনের বাস্তব ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা এবং শরীয়তের দ্বিতীয় দলীল। আর সাহাবায়ে কেরাম হলেন কুরআন-সুন্নাহ্র প্রকৃত অনুসারী, সংরক্ষক ও পরিবাহক।

তাঁরা কুরআন-সুন্নাহ শিখেছেন নবীজীর কাছ থেকে। তাঁদের আকীদা-ইবাদত, মুআমালা-মুআশারা ও আখলাক গঠিত হয়েছে কুরআন-সুন্নাহ্র আলোকে, সরাসরি নবীজীর সোহবতে। তাঁদের দ্বীনী বুঝ-সমঝ, চিন্তা-চেতনা, রুচি-প্রকৃতি ছিল নববী মেযাজেরই প্রতিবিম্ব ও প্রতিচ্ছবি। তাই তাঁরা আকীদা-আমল সবক্ষেত্রে পরবর্তীদের জন্য হক-বাতিল নির্ণয়ের মাপকাঠি। তাঁদের ইজমা শরীয়তের অকাট্য দলীল। কোনো বিষয়ে তাদের একাধিক মত হলে ঐ মতগুলোর মাঝে সীমাবদ্ধ থেকে কোনো মত অবলম্বন করা শরীয়তের হুকুম। একেই নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-মা-আনা আলাইহি ওয়া আসহাবী’- ফেরকায়ে নাজিয়া তথা মুক্তিপ্রাপ্ত জামাত হবে সেটি, যে জামাত ‘আমি ও আমার সাহাবীরা যে আকীদা-আমলের উপর আছি’ তার উপর থাকবে।

শরীয়তে ‘আলজামাআহ’ (মুসলমানদের বৃহত্তম ঐক্য) আঁকড়ে ধরতে এবং ‘ছাওয়াদে আজম’ (অধিকাংশ মুসলিম)-এর সাথে থাকতে হুকুম করা হয়েছে। ‘সাবীলুল মুমিনীন’ (মুমিনদের মত ও পথ)-এর অনুসরণ করতে বলা হয়েছে এবং ‘শিকাক’ (বিভেদ), ‘শুযূয’ (বিচ্ছিন্নমত) ও ‘ফুরকাহ’ (অনৈক্য) সৃষ্টি থেকে নিষেধ করা হয়েছে। এখানে ‘ছাওয়াদে আজম’, ‘আলজামাআহ’ ও ‘সাবীলুল মুমিনীন’ দ্বারা উদ্দেশ্য জামাতে সাহাবার অনুসরণ এবং ইজতিহাদী ও সিয়াসী ক্ষেত্রে জুমহুর উলামায়ে উম্মতের অনুসরণ, মুসলমানদের ঐক্য সংরক্ষণ।

সুতরাং ‘আহলুস সুন্নাহ’ মানে কুরআন-সুন্নাহ্র অনুসারী। ‘আলজামাআহ’ হল সাহাবায়ে কেরামের জামাত, উলামায়ে উম্মতের ইজমা এবং মুসলমানদের ঐক্য। তাই যারা কুরআন-সুন্নাহ্র অনুসারী, জামাতে সাহাবার অনুসারী, জুমহুর উলামায়ে উম্মতের অনুসারী, মুসলমানদের ঐক্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং সব ধরনের বিদআত বিশেষভাবে আকীদা ও তাহযীব বিষয়ক সকল বিদআত ও জাহেলী রীতি-নীতি থেকে দূরে থাকে- তাদের নাম ‘আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ’। এইসব বৈশিষ্ট্য ধারণকারী মনীষীদের মাঝে যারা আহলে ইলম এবং শরয়ী তারীকায় জিহাদ ফী সাবিলিল্লাহ্র দায়িত্ব পালন করেন- তাদেরকে ‘ত্ব-ইফায়ে মানসূরাহ’ বলা হয়।

তো আমরা যেমন কুরআন-সুন্নাহ্র অনুসারী, তেমনি কুরআন-সুন্নাহ্র সমঝ-ফাহম ও জীবন্ত রূপ প্রত্যক্ষকরণ ও পরিগ্রহণের ক্ষেত্রে আমরা সালাফে সালেহীনের উত্তরসূরী। ঈমান ও ইসলামের প্রায়োগিক ময়দানে তাঁরা আমাদের পূর্বসূরী।

 

উপমহাদেশে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ

আল্লাহ্র শোকর- আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর বৈশিষ্ট্যসমূহের ধারক-বাহক উলামা ও মাশায়েখের জামাত পয়দা করেছেন। পৃথিবীর যেখানে যেখানে ইলমে দ্বীনের যথাযথ চর্চা ছিল বা আছে, সেসব জায়গায় আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর তরজুমান আহলে ইলম ছিলেন এবং আছেন। যাদের

মূল কাজ হল, ‘ইহইয়ায়ে সুন্নাত ওয়া ইমাতাতে বিদআহ’ তথা সুন্নাত জিন্দা করা এবং বিদআত খণ্ডন করা।

উলামায়ে দেওবন্দের জামাত মূলত এরই ধারাবাহিকতা মাত্র।

এই উপমহাদেশে ‘মা-আনা আলাইহি ওয়া আসহাবী’ তথা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ ও সালাফে সালেহীনের প্রধান তরজুমান আকাবিরে দেওবন্দ। তাঁদের কুরবানীর বদৌলতে এই অঞ্চলে দ্বীনের এশাআত ও হেফাজত হয়েছে সর্ববৃহৎ পরিসরে। এতদঞ্চলে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর আদর্শ মোতাবেক দ্বীনী কাজের বেশির ভাগ আঞ্জাম দিচ্ছেন তাঁরা। উবায়দুল্লাহ আসআদী দা.বা.-এর ভাষায়-

ولكن مما لا شك فيه، أن لهذه الحركة وقادتها فضلا كبيرا في تمسك الشعب الهندي الإسلامي بالدين وشريعة الإسلام وتفانيه في سبيله، والتماسك أمام الحضارة الغربية المادية الإلحادية تماسكا لم يشاهد في بلد إسلامي آخر، تعرض بهذه الحضارة ووقع تحت حكم أجنبي، وكانت ديوبند زعيمة هذا الاتجاه، والمركز الثقافي الديني والتوجيهي الإسلامي الأكبر في الهند.

তবে কোনো সন্দেহ নেই যে, হিন্দুস্তানের মুসলমানকে দ্বীনের সাথে জুড়ে রাখা এবং বস্তুবাদি ও নাস্তিক্যবাদী পশ্চিমা সভ্যতার মোকাবেলার ক্ষেত্রে এই আন্দোলন (সরকারের প্রভাবমুক্ত দ্বীনী মাদরাসা)-এর নেতৃবৃন্দের বিরাট অবদান ও কুরবানী রয়েছে। বিজাতীয় শাসনে আক্রান্ত হওয়ার কারণে যেসমস্ত মুসলিম রাষ্ট্রে পশ্চিমা সভ্যতার অনুপ্রবেশ ঘটেছে, তারা ঐ সভ্যতার মোকাবেলায় হিন্দুস্তানের মতো মজবুতি প্রদর্শন করতে সক্ষম হয়নি। এই সংগ্রামী মানসিকতার নেতৃত্বে ছিল দেওবন্দ। হিন্দুস্তানে ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতির সবচে বড় কেন্দ্র ছিল দেওবন্দ। -দারুল উলূম দেওবন্দ, আসআদী, পৃ. ৮৬

যাইহোক, সাধারণভাবে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ যা, উলামায়ে দেওবন্দও তা। ‘দেওবন্দিয়ত’-এর মাঝে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর বাইরে কিছু নেই, থাকতে পারে না। ‘মা-আনা আলাইহি ওয়া আসহাবী’র সঠিক তাফসীরই মাসলাকে দেওবন্দ। কেউ দেওবন্দী পরিচয় ধারণ করার পর যদি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর খেলাফ কিছু করেন, তবে তিনি মাসলাকে দেওবন্দ থেকে বিচ্যুত এবং তিনি দেওবন্দী পরিচয় ধারণের অযোগ্য। হাকীমুল ইসলাম কারী তায়্যিব রাহ. বলেন-

علماء دیوبند اپنی دینی رخ اور مسلکی مزاج کے لحاظ سے کلیۃ اہل السنہ و الجماعت ہیں نہ وہ کوئی نیا فرقہ ہے نہ نئے عقائد کی کوئی جماعت ہے۔

দ্বীন-ঈমানের মৌলিক বিষয় এবং শরীয়তের শাখাগত বিষয় ও তার রুচি-প্রকৃতির দিক থেকে উলামায়ে দেওবন্দ পরিপূর্ণভাবে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর অনুসারী। তারা নতুন কোনো ফেরকা নয়, নতুন কোনো আকীদা-বিশ্বাসেরও ধারক নয়। -উলামায়ে দেওবন্দ কা দ্বীনী রুখ আওর মাসলাকী মেযাজ, পৃ. ২৩

সাঈদ আহমদ পালনপুরী রাহ. লিখেছেন-

وليس لها دستور أساسي، إنما دستورها القرآن الكريم، والسنة النبوية الطاهرة، وما جرى عليه السلف الصالح من الصحابة والتابعين ومن بعدهم من أئمة الاجتهاد والعلماء الربانيين والأولياء المقربين، فمن يتمسك بالكتاب والسنة الصحيحة الثابتة، ويتجنب البدع والخرافات، ويعمل بظاهر الشريعة تماما، ويهتم بتزكية الباطن خصوصا، فهو ديوبندي حقا، ولو لم يعرف قرية ديوبند، ولو لم يسمع عنها شيئا، ومن كان على خلاف ذلك فهو ليس بديوبندي، ولو كان مسقط رأسه في ديوبند، اللهم إلا النسبة إلى الوطن.

উলামায়ে দেওবন্দের আলাদা কোনো দস্তুর-সংবিধান নেই। তাদের দস্তুর কুরআন-সুন্নাহ এবং যার উপর সালাফে সালেহীন তথা সাহাবা-তাবেয়ী এবং পরবর্তী উলামা-আউলিয়া গুজরে গেছেন তা। সুতরাং যে-ই কিতাব ও সুন্নাহ আঁকড়ে ধরবে, বিদআত-কুসংস্কার বর্জন করবে, পূর্ণ শরীয়তের উপর আমল করবে, আত্মশুদ্ধির বিষয়ে যতœবান হবে, সে দেওবন্দী; যদিও দেওবন্দ কী জিনিস সে তা চেনে না বা জানে না। আর যে এর ব্যতিক্রম করবে, সে দেওবন্দী নয়; যদিও তার জন্ম দেওবন্দে হয়। হাঁ, জন্মভূমি হিসাবে দেওবন্দী হতে পারে, আকীদাগতভাবে নয়। -মুকাদ্দিমা, দারুল উলূম দেওবন্দ, আসআদী, পৃ. ৪৮-৪৯

তো সালাফে সালেহীনের যেসমস্ত গুণ অনুসরণের কারণে উলামায়ে দেওবন্দ সমকালীন বিশ্বে বিরল বৈশিষ্ট্যের অধিকারী, যেসমস্ত দ্বীনী গুণাবলীর কারণে তাদের মকবুলিয়ত আকাশচুম্বী, উত্তরসূরী হিসাবে সেগুলোর অনুসরণ আমাদের জন্য অপরিহার্য। অন্যথায় তাদের উত্তরসূরী বলে পরিচয় দেওয়ার অধিকার আমাদের থাকবে না।

 

মাসলাকে দেওবন্দের পরিচয়

মা-আনা আলাইহি ওয়া আসহাবী’র অনুসারী উলামায়ে দেওবন্দের দ্বীনী ‘রোখ’ (দ্বীনের মৌলিক বিষয়) এবং ‘মাসলাকী মেযাজ’ (শরীয়তের শাখাগত মাসআলা ও তার রুচি-প্রকৃতি) সম্পর্কে দারুল উলূম দেওবন্দের দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের মুহতামিম হাকীমুল ইসলাম কারী তায়্যিব রাহ. স্বতন্ত্র কিতাব লিখেছেন। কিতাবের শেষে ‘সাবআ সানাবিল’ শিরোনামে সাতটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন। সংক্ষেপে তা তুলে ধরা হল :

১. দ্বীনের ভিত্তি ইলমে শরীয়ত তথা কিতাবুল্লাহ, সুন্নতে রাসুল, ইজমায়ে উম্মত ও কিয়াসে মুজতাহিদ-এর উপর রাখা।

২. সালাফে সালিহীনের আকীদা ধারণ করা এবং সহীহ আকীদার উপস্থাপন এবং আহলে বাতেলের জবাবে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআর তরজুমান মাতুরীদী ও আশআরী তরীকা অবলম্বন করা।

৩. যেহেতু এই উপমহাদেশে হানাফী মাযহাবের অনুসরণ হয়ে আসছে তাই ফিকহের ক্ষেত্রে ফিকহে হানাফী অনুসরণ করা এবং অন্য তিন মাযহাবের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা।

৪. তাযকিয়া ও ইহসানের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া এবং এ বিষয়ে সুফিয়ায়ে কেরামের যেসব উসূল কুরআন-সুন্নাহসম্মত তার অনুমোদন করা।

৫. রদ্দে বিদআত, আমর বিল মারূফ নাহি আনিল মুনকার ও ই‘লায়ে কালিমাতুল্লাহ্র কাজে সক্রিয় থাকা।

৬. আকল-নকল, ইলম ও মহব্বত, রেওয়ায়াত-দেরায়াত, কানুন এবং রিজাল ইত্যাদির ক্ষেত্রে জামেইয়্যত (সামগ্রিক সমন্বয়) সৃষ্টি করা।

৭. সবকিছুতে সুন্নত ও উসওয়ায়ে রাসূলের অনুসরণ করা। -উলামায়ে দেওবন্দ কা দ্বীনী রুখ আওর মাসলাকী মেযাজ, পৃ. ১৮১-১৮৯

মুফতী শফী রাহ.-এর মতে-

১. কিতাবুল্লাহ ও রিজালুল্লাহকে একসাথে গ্রহণ করা।

২. তালীম ও তরবিয়তে সমান গুরুত্ব দেওয়া।

৩. বিনয়-যুহদ, আবদিয়্যাত ও সাদেগির সাথে সাথে ইলমী গাম্ভীর্য, ইস্তিগনা ও আত্মসম্মানবোধ, নির্লোভ-অমুখাপেক্ষী জীবন আপন করে নেওয়া।

৪. এবং সবকিছুতে ‘ই‘তেদালে শরঈ’ অবলম্বন- এই চারটি বিষয় আকাবিরে উলামায়ে দেওবন্দের বৈশিষ্ট্য। -দারুল উলূম দেওবন্দ আওর উসকা মেযাজ ও মাযাক, জাওয়াহিরুল ফিকহ ৫/২১৮-২২২, মাকতাবায়ে সীরাতুন্নবি, জামে মসজিদ দেওবন্দ; জামেয়া রশীদিয়া ছাহীওয়াল থেকে প্রকাশিত মাসিক ‘আররশীদ’ ১৩৯৬ হিজরী সফর-রবিউল আউওয়াল-এর দারুল উলূম দেওবন্দ সংখ্যা, পৃ. ১৪২-১৪৮

এছাড়া মুফতী শফী রাহ.-এর দেওবন্দ সফর-নুকুশ ওয়া তাআছছুরাত’-এ আকাবিরে দেওবন্দের মাসলাক ও মাশরাব সম্পর্কে আলোচনা আছে।

মাওলানা মুহাম্মাদ মনযূর নুমানী রাহ. মাসলাকে দেওবন্দের বুনিয়াদি চারটি বিষয় আলোচনা করেছেন :

১. হানাফী মাযহাব অনুসরণের সাথে সাথে হাদীস ও সুন্নাহ চর্চায় গভীর অভিনিবেশ রাখা, অন্য মাযহাব ও মুহাদ্দিসীনের প্রতি আজমত প্রদর্শন করা।

২. ইলমী-ফিকহী বৈশিষ্ট্য রক্ষার সাথে সাথে আহলে হক সুফিয়ায়ে কেরামের নেসবত অর্জনে সচেষ্ট থাকা, অন্তত তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা রাখা।

৩. ইত্তিবায়ে সুন্নত আর শিরক-বিদআতের প্রতি নফরত এবং এর অপনোদনে বিশেষ মজবুতি প্রদর্শন করা।

৪. ই‘লায়ে কালিমাতুল্লাহ্র জযবা লালন করা। -হায়াতুন নবী থেকে সংক্ষেপিত, পৃ. ১৯-২২

দারুল উলূম দেওবন্দের ছদ-সালা অনুষ্ঠানে সায়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী রাহ. উলামায়ে দেওবন্দের প্রধান চারটি দ্বীনী বৈশিষ্ট্য- তাওহীদে খালেস, ইত্তিবায়ে সুন্নত, তাআল্লুক মাআল্লাহ ও ই‘লায়ে কালিমাতুল্লাহ্-এর কথা বিশেষভাবে আলোচনা করেন। (কারওয়ানে যিন্দেগী, ২/৩১০) তখন বহু আকাবিরের সামনে পাকিস্তানের মুফতী মাহমুদ রাহমতুল্লাহি আলাইহি এই বক্তব্যের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন।

উবায়দুল্লাহ আসআদী দামাত বারাকাতুহুমের ভাষায়-

كان هدفها ورسالتها هو استعادة مجد المسلمين، واسترجاع الحكم المغصوب، والمحافظة على التعاليم الإسلامية والعلوم النبوية بكل شعبها ونواحيها.

দেওবন্দের লক্ষ্য এবং পয়গাম হল, মুসলমানদের হারানো শাসন ও সম্মান পুনরুদ্ধার এবং দ্বীনী ইলমের সর্বদিক সংরক্ষণ। -দারুল উলূম দেওবন্দ, আসআদী, পৃ. ১১২

উস্তাযে মুহতারাম সাঈদ আহমদ পালপুরী রাহ. ইহইয়াউস সুন্নাহ, ইমহাউল বিদআহ এবং আততালাক্কী আনিস সালাফ- এই তিনটি বিষয়কে দেওবন্দিয়ত বলে প্রকাশ করতেন। তেমনি তিনি শিয়াদের মোকাবেলায় আহলে সুন্নতের বৈশিষ্ট্য এইভাবে ব্যক্ত করতেন যে, শিয়ারা আহলে বাইতের মহব্বতের ক্ষেত্রে গুলু করে আর আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআত ই‘তেদালে শরঈ-এর উপর অটল থাকে। একইভাবে উপমহাদেশে বেরেলভিরা হুব্বে রাসূল এবং হুব্বে আউলিয়ার ক্ষেত্রে গুলু করে থাকে, কিন্তু দেওবন্দীরা সব বিষয়ের মতো হুব্বে রাসূল এবং হুব্বে আওলিয়ার ক্ষেত্রেও ই‘তেদালে শরঈ-এর উপর অবিচল থাকে।

আল্লামা ইউসুফ বানুরী রাহ. আরব দেশসমূহ সফর করে সেখানকার উলামায়ে কেরামের অবস্থা প্রত্যক্ষ করেন এবং সেই তুলনায় উলামায়ে দেওবন্দের মাঝে বিশেষ বৈশিষ্ট্য অনুভব করেন। তখন তিনি আরবের বিভিন্ন পত্রিকায় উলামায়ে দেওবন্দের বৈশিষ্ট্য-পরিচিতি তুলে ধরে কয়েকটি নিবন্ধ লিখেছিলেন। সেগুলোর সুন্দর গ্রন্থনা হল-

جامعة ديوبند الإسلامية في ضوء المقالات البنورية.

এক্ষেত্রে মাওলনা উবায়দুল্লাহ আসআদী দামাত বারাকাতুহুমের-

دار العلوم ديوبند  : مدرسة فكرية توجيهية، حركة إصلاحية دعوية، مؤسسة تعليمية تربوية.

-কিতাবখানিও সুন্দর। আর শাইখুল হাদীস যাকারিয়া রাহ.-এর ‘আপবীতী’ এক অনন্য ‘ফিকির-সায’ কিতাব। এর মাধ্যমে যওক ও মেযাজ তৈরি হয়।

১৪৩২ হিজরীর জিলকদ মাসে তুরস্কের রাজধানী ইস্তাম্বুলে ‘ইমাম মুহাম্মাদ কাসেম নানুতাবি আন্তর্জাতিক পুরস্কার’-এর বিতরণী অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত শায়েখ নূরে আলম খলীল আমীনী দা. বা.-এর প্রবন্ধটি বেশ সুন্দর। যা ঐ বছর প্রথমে ‘আদদাঈ’ জুমাদাল উলা সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।

এই সময়ে আল্লামা তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম হলেন বিশ্বময় উলামায়ে দেওবন্দের অন্যতম প্রধান তরজুমান। তাঁর রচনাবলি মাসলাকে দেওবন্দের মণিমুক্তায় ভরপুর।

এছাড়া বলাই বাহুল্য, তারীখে দারুল উলূম দেওবন্দ সম্পর্কিত কিতাবসমূহ এবং আকাবিরে দেওবন্দের জীবনীতে মাসলাকে দেওবন্দের আলোচনা থাকে। যেমন উলামায়ে দেওবন্দের প্রথম দুই আকাবিরের জীবন ও কর্ম- হুজ্জাতুল ইসলাম কাসেম নানুতুবি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি (মৃত্যু : ১২৯৭হি.) এবং ফকীহুন নফস রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি (মৃত্যু : ১৩২৩হি.)। এই দুজনের কাছে তরবিয়তপ্রাপ্ত হলেন, শাইখুল হিন্দ মাহমুদ হাসান দেওবন্দী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি (মৃত্যু : ১৩৩৯হি.), খলীল আহমদ সাহারানপুরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি (মৃত্যু : ১৩৪৬হি.) প্রমুখ।

এর পরের সারিতে আছেন, হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানবী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি (মৃত্যু : ১৩৬২হি.), আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি (মৃত্যু : ১৩৫২হি.), মাওলানা ইলিয়াস রাহমাতুল্লাহি আলাইহি (মৃত্যু :   ১৩৬৩হি.), সায়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি (মৃত্যু : ১৩৭৭হি.), শাব্বির আহমদ উসমানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি (মৃত্যু : ১৩৬৯হি.) প্রমুখ।

চতুর্থ তবকায় আছেন, শাইখুল হাদীস যাকারিয়া রাহমাতুল্লাহি আলাইহি (মৃত্যু : ১৪০২হি.), মুফতী শফী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি (মৃত্যু : ১৩৯৬হি.), আল্লামা ইউসুফ বানুরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি (মৃত্যু : ১৩৯৭হি.), কারী তায়্যিব রাহমাতুল্লাহি আলাইহি (মৃত্যু : ১৪০৩হি.), হাবীবুর রহমান আজমী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি (মৃত্যু : ১৪১২হি.), মাওলানা মনযুর নোমানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি (মৃত্যু : ১৯৯৭ঈ.) প্রমুখ- এঁরা এবং এঁদের সমমনা-সমসাময়িক সবাই আমাদের আকাবির। এঁদের তাসনীফ-তালীফ, মালফুযাত, মাকতুবাত ও রাসায়েল ইত্যাদি আমাদের জন্য কাবেলে ইস্তেফাদা।

আর উলামায়ে দেওবন্দ ‘জামেয়া দারুল উলূম দেওবন্দ’-এ সীমাবদ্ধ নন। অতীতে তাঁরা উপমহাদেশজুড়ে ছড়িয়ে ছিলেন, এখনও আছেন। তাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় দেওবন্দী হলেও অবস্থান ও কর্মক্ষেত্র বিশ্বজুড়ে। -দারুল উলূম দেওবন্দ কা দ্বীনী রুখ আওর মাসলাকী মেযাজ, পৃ. ২২

দারুল উলূম দেওবন্দের অল্প সময়ের ইতিহাসে যত বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ব্যক্তিত্ব সৃষ্টি হয়েছেন এবং দেওবন্দী আলেমগণ জাতিগঠন ও সংরক্ষণে যে বিরাট ও বিস্ময়কর অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছেন, সমসাময়িক ও সমবয়সী অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে তার নজির পাওয়া কঠিন। আলী মিয়াঁ রাহ. বলেন-

إن أكبر معهد ديني في الهند، وأكبر جامعة إسلامية، وأكثرها طلابا وأقساما، وأوسعها نطاقا، وإفادة وشهرة، هي جامعة ديوبند التي تعرف في شبه القارة الهندية بدار العلوم ديوبند، وهي التي تلقب وتوصف بأزهر الهند، وجاز توصيفها وتسميتها من كل وجه، بل هي تفوق الجامع الأزهر بمصر من بعض الوجوه والنواحي.

হিন্দুস্তানের সবচে বড় দ্বীনীকেন্দ্র, সর্বাধিক অবদান ও সুখ্যাতিসম্পন্ন, বহুসংখ্যক ছাত্র এবং বিভাগ সম্বলিত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় হল জামেয়া দেওবন্দ বা দারুল উলূম দেওবন্দ। একে বলা হয় হিন্দুস্তানের ‘জামেয়া আযহার’। সব দিক থেকে দারুল উলূম এই নামের উপযুক্তও বটে; বরং মিশরের আযহার থেকেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে দারুল উলূম অগ্রসর। -দারুল উলূম দেওবন্দ, আসআদী, পৃ. ৭৫

আর উলামায়ে দেওবন্দের ইলমী ও ফিকরী সনদের মধ্যে বিশেষভাবে রয়েছেন- শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবি রাহমতুল্লাহি আলাইহি (মৃত্যু : ১১৭৬হি.) ও তাঁর ইলমী খান্দান তথা শাহ আব্দুল আযীয রাহমতুল্লাহি আলাইহি (মৃত্যু : ১২৩৯হি.), শাহ ইসহাক রাহমতুল্লাহি আলাইহি (মৃত্যু : ১২৬২হি.), শাহ আব্দুল গনি রাহমতুল্লাহি আলাইহি (মৃত্যু : ১২৯৬ হি.), শাহ ইসমাঈল শহীদ রাহমতুল্লাহি আলাইহি (মৃত্যু : ১৮৩১ঈ.), শহীদ সৈয়দ আহমদ রায়বেরেলবি রাহমতুল্লাহি আলাইহি (মৃত্যু : ১৮৩১ঈ.) প্রমুখ।

তেমনি শাহ ওয়ালিউল্লাহ রাহমতুল্লাহি আলাইহি-এর উপরের দিকের সকল মকবুল ও মশহুর ফুকাহা, মুহাদ্দিসীন, মুজাহিদীন ও সালেহীন হয়ে তাবে তাবেয়ী, তাবেয়ী ও সাহাবায়ে কেরাম রিযওয়ানুল্লাহি তাআলা আলাইহিম আজমাঈন- এঁদের সবার সাথে মিলিত রয়েছে উলামায়ে দেওবন্দের মজবুত রূহানি রিশতা। আকাবির হিসাবে সবার জীবন ও কর্ম দেওবন্দীদের জন্য আদর্শ।

আর সায়্যিদুল আম্বিয়া, আহমদে মুজতবা, মুহাম্মাদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন সকল আদর্শের শ্রেষ্ঠ উৎস, সর্বোৎকৃষ্ট নমুনা। তাঁর আদর্শই কেবল আদর্শ হওয়ার যোগ্য। তিনি ব্যতীত কোনো ‘উসওয়া-আদর্শ’ কল্পনাই করা যায় না। তাঁর অনুসরণ ব্যতীত মানবাত্মা কখনো প্রশান্তি পেতে পারে না। তিনিই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব। তাঁর আদর্শের উপরই জান-মাল সব কোরবান। আল্লাহ তাআলা সবাইকে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লমের প্রতি ইশক ও মহব্বত নসিব করুন- আমীন।

আসাতেযায়ে কেরাম থেকে যা শুনেছি, আকাবিরের জীবনী, মালফুজাত, মাকতুবাত ও রাসায়েল ইত্যাদির যতটুকু এই বান্দার মুতালাআর সুযোগ হয়েছে, তার আলোকে মাসলাকে দেওবন্দ আরেকটু তফসিলের সাথে তুলে ধরার চেষ্টা করছি। আল্লাহ তাআলা সহীহ লেখার তাওফীক দান করুন- আমীন।

 

উলামায়ে দেওবন্দের কিছু দ্বীনী বৈশিষ্ট্য

১. তাওহীদ ও ঈমানে খালেস

ইসলামের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, এ ধর্মে আকীদা-বিশ্বাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারো আকীদায় সমস্যা থাকবে, আর সে নিজেকে প্রকৃত মুমিন ও মুসলিম দাবি করবে- এই সুযোগ ইসলাম ধর্মে নেই। তাই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর ব্যাখ্যা অনুযায়ী যা কিছু তাওহীদ ও ঈমান পরিপন্থী, উলামায়ে দেওবন্দ তার বিরুদ্ধে আপসহীন। তাওহীদের প্রচার-প্রসারে উলামায়ে দেওবন্দের মেহনত অবিস্মরণীয়। সকল প্রকার কুফর-শিরক থেকে মাসলাকে দেওবন্দ পরিশুদ্ধ।

২. ইত্তিবায়ে সুন্নত-শরীয়ত

উলামায়ে দেওবন্দ শরীয়তের পূর্ণ পাবন্দ, হারাম-মাকরূহ-গুনাহ বর্জন এবং ফারায়েজ-ওয়াজিবাত পালনের সাথে সাথে সুন্নত-মুস্তাহাবের উপরও একনিষ্ঠভাবে আমলকারী। এমনকি ইশকে রাসূল ও মেযাজে শরীয়তের আলোকে নবীজীর সুনানে আদিয়াকেও তাঁরা আমলে নিতে সচেষ্ট।

৩. তাআল্লুক মাআল্লাহ ও তাযকিয়া

আল্লাহ তাআলার সাথে খাস সম্পর্ক তৈরি করা, অন্তরে আল্লাহ তাআলার প্রতি মহব্বত লালন করা, আল্লাহ তাআলার ভয় দিলে জাগরুক রাখা, সবসময় আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অনুভব করা, আল্লাহ তাআলাকে সবচে আপন মনে রাখা, সব কাজে আল্লাহ তাআলার দিকে রুজু করা, যবান যিকিরে তাজা রাখা, অন্তর-জগতের আবিলতা দূর করা, ইখলাসের ছিফাত পয়দা করা, জীবনকে তাকওয়া-পরহেযগারির নমুনা বানানো, সেহেরগুযারি ও রোনাজারির আদত সৃষ্টি করা, ইত্তিবায়ে শরীয়তের মাঝেই প্রশান্তি পাওয়া ইত্যাদি উলামায়ে দেওবন্দের বৈশিষ্ট্য। এর জন্য কোনো মুর্শিদ, মুঈন ও মুরব্বীর তত্ত¡াবধানে শরয়ী তরিকায় মুজাহাদা করা এবং তাদের প্রতি আযমত ও মহব্বত পোষণ করা দেওবন্দীদের বৈশিষ্ট্য।

ভিতরের মন্দ স্বভাব নিয়ন্ত্রণ করা (তাখলিয়া) আর সৎ স্বভাব দ্বারা অন্তর্জগৎ সজ্জিত (তাহলিয়া) করার নাম তাযকিয়া। কুফর-শিরক-বিদআত থেকে অন্তর পরিশুদ্ধ করা, মনের ভিতর অহংকারের পরিবর্তে বিনয় আসা, কপটতার বদলে ইখলাস ও সততা সৃষ্টি হওয়া, কার্পণ্যের স্থলে দানশীলতা জন্ম লাভ করা, পরশ্রীকাতরতার জায়গায় পরোপকারের মানসিকতা সৃষ্টি হওয়া, ইহকালের উপর পরকালকে প্রাধান্য দিতে পারা, এক আল্লাহ্র প্রতি ভয় এবং ইশক-মহব্বত অন্তরে পয়দা করা, সর্বহালে আল্লাহ্র কথা স্মরণ থাকা- তাযকিয়া বলতে এই গুণগুলো অর্জন এবং বিপরীত বিষয় বর্জন করা বোঝায়। এই তাযকিয়া ছিল নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্যতম নববী দায়িত্ব। ওয়ারিসে নবী হিসাবে এই দায়িত্ব এখন আলেমগণের উপর।

তাযকিয়া ও আত্মশুদ্ধির জন্য কিছু মোবাহ উপকরণও ব্যবহার করা হয়। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, ইত্যাদি রূহানী রোগের চিকিৎসার জন্য বিশেষ তরিকায় মোরাকাবা করা; ইখলাস ও মহব্বত হাসিলের জন্য খাস পদ্ধতিতে মুবাহ যিকির করা, স্বাভাবিকের চেয়ে কম খাওয়া, কম ঘুমানো, কম বলা, কম মেশাকুপ্রবৃত্তি দমনের জন্য কঠোর সাধনা করা, ক্ষেত্রবিশেষে মোবাহ কাজেও নফসের বিরুদ্ধে চলা ইত্যাদি- এগুলোকে তাসাউফ-সাধনা বলে, রিয়াযত-মোজাহাদা বলে।

উলামায়ে কেরামের মতে তাসাউফের এজাতীয় বৈধ উপকরণ অবলম্বন জায়েয। কিন্তু মানসূস নয় এমন উপকরণকে মাকসাদ মনে করা, কেউ এগুলো অবলম্বন ছাড়া তাযকিয়া করতে চাইলে তাকে নাকীর করা, এগুলোর সাথে সুন্নাহ্র মতো আচরণ করা, অধিক সওয়াবের বিষয় জ্ঞান করা- ইহদাস ফিদ দ্বীন ও বিদআত। পূর্বের আহলে হক সূফিয়ায়ে কেরাম শরীয়তের এই সীমা রক্ষা করেই তাসাউফ-

সাধনা করেছেন। তাদের পদ্ধতি ফলপ্রসূ হয়েছে। কাজেই তাঁদের ব্যাপারে শ্রদ্ধা ও সুধারণা রাখা মাসলাকে দেওবন্দের অংশ।

অবশ্য অনেক জাহেল সূফি শরীয়তের সীমা লংঘন করেছে এবং বেশরা ফকিরদের মাধ্যমে সমাজে বহু গোমরাহী ছড়িয়েছে। এর সংশোধনে উলামায়ে দেওবন্দ বিশেষত হযরত থানবী রাহ.-এর বিরাট অবদান রয়েছে। তিনি তাসাউফের নামে প্রচলিত বহু বিদআত ও বাড়াবাড়ি অপসারণ করেছেন এবং তাযকিয়ার মাকসাদ ও উপকরণ আলাদা করে তাসাউফকে স্ব-রূপে উপস্থাপন করেছেন।

তো স্বাভাবিক নিয়মে শরীয়ত মোতাবেক চলা, যাবতীয় হারাম, গুনাহ ও সন্দেহযুক্ত জিনিস থেকে বাঁচা, ফরজ-ওয়াজিব-সুন্নতের পাশাপাশি নফল ইবাদতসমূহের প্রতি মনোযোগী হওয়া, কুরআন-হাদীসের ইলম চর্চা, জীবনের সকল ক্ষেত্রে সুন্নতের অনুসরণ, সর্বহালে মাসনূন যিকির ও দুআ পাঠ, সর্বাবস্থায় শোকর ও সবর এখতিয়ার, কুরআন মাজীদ তিলাওয়াত, হক্কানী উলামায়ে কেরামের অনুসরণ ও সোহবত গ্রহণ- এটা তাযকিয়া অর্জনের মাসনূন তরিকা, তাযকিয়া অর্জনের উত্তম ও সহজ পথ।

সাধারণ মানুষের তাযকিয়ার জন্য মুবাহ তরিকার চেয়ে মাসনূন তরিকা নিরাপদ। কারণ তারা মাকসাদ-ওসায়েল (উদ্দেশ্য ও উপকরণ), সুন্নত-বিদআত, মুবাহ-মাসনূন ইত্যাদি পার্থক্য করতে পারে না। তাই অনেক আকাবিরে দেওবন্দ মাসনূন তরিকার বাইরে মুবাহ ওজিফা সাধারণ মানুষকে তালকীন করেন না। (দ্র. বাওয়াদিরুন নাওয়াদির, আশরাফ আলী থানবী ১/২৫৬-২৫৭; ইনআমুল বারী, তাকী উসমানী ১/৫৬৮; ইসলাহী মাজালিস, তাকী উসমানী ৩/৬১)

৪. জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ ও ই‘লায়ে কালিমাতুল্লাহ্র জযবা এবং শাআয়েরে দ্বীন হেফাজতের জন্য কুরবানী

উলামায়ে দেওবন্দ, তাদের আকাবির ও আকাবিরের আকাবির একসময় জিহাদ ফী সাবিলিল্লাহ্র দায়িত্ব পালন করেছেন। বালাকোটের জিহাদ, শামেলীর জিহাদ, সীমান্ত প্রদেশের সংগ্রাম ও রেশমি রুমাল জিহাদ-পরিকল্পনা ইত্যাদি তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ।

তবে শাইখুল হিন্দ মাহমুদ হাসান দেওবন্দী রাহ. মাল্টা থেকে ফেরার পর রাজনৈতিক মুজাহাদার নতুন তরিকা উলামায়ে কেরামের হাতে তুলে দেন। তিনি বলেন-

اگر موجوده زمانہ ميں توپ بندوق ہوائی جہاز كا استعمال مدافعت اعداء كيلئے جائز ہو سكتا ہے باوجوديكہ قرون اولی ميں يہ چيزيں نہ تهيں تو مظاہروں اور قومی اتحادوں اور متفقہ مطالبوں کے جواز ميں بهی تامل نہ ہوگا كيونكہ موجوده زمانہ ميں ايسے لوگوں كيلئے جن كے ہاتھ توپ بندوق ہوائی جہاز نہیں ہيں يہی  چيز ہتھيار ہيں.

যদি শত্রু দমনের জন্য গুলি, কামান, যুদ্ধবিমান ব্যবহার জায়েয হয়; যা প্রথম যুগে ছিল না, তবে বিক্ষোভ-মিছিল, জাতীয় ঐক্য এবং অভিন্ন দাবির প্রেক্ষিতে যৌথ তৎপরতা চালানো জায়েয হওয়ার ব্যাপারেও সংশয় হবে না। কেননা যাদের হাতে গুলি, কামান, যুদ্ধবিমান এখন নেই; তাদের জন্য এগুলোই হাতিয়ার। -নকশে হায়াত ২/৩২২

সুতরাং দুর্বল অবস্থায় বেসামরিক ও নিরস্ত্র তৎপরতার মাধ্যমে দ্বীন রক্ষা, আমর বিল মারূফ নাহি আনিল মুনকার ও নেফাযে শরীয়তের মেহনত-মুজাহাদা মাসলাকে আকাবিরে দেওবন্দের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। শর্ত হল, তা হতে হবে ঈমান-আকীদা হেফাযত করে এবং শরীয়তের বিধি-বিধানের প্রতি লক্ষ রেখে। এজাতীয় মেহনত মুজাদ্দিদে আলফে সানী আহমদ সেরহিন্দী রাহ.-এর কামিয়াব কর্ম-পদ্ধতি থেকেও অনুধাবন করা যায়। তিনি দাওয়াতী কার্যক্রম, চিঠিপত্রের আদান-প্রদান ও ব্যক্তিগত সোহবতের মাধ্যমে এক বিরাট বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন।

৫. গায়রতে ঈমানী

দ্বীনের ক্ষতি হলে বা অসম্মান হলে উলামায়ে দেওবন্দ একইসঙ্গে ব্যথিত ও ক্রুদ্ধ-বেকারার হয়ে ওঠেন, সামর্থ্য অনুসারে প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। আমর বিল মারূফ নাহি আনিল মুনকারের কাজে সাধ্যমতো ঝাঁপিয়ে পড়েন। জুলুম-অবিচার ও বিদআত-কুসংস্কার রোধে সবার আগে সক্রিয় হন। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের জন্য কুরবানী পেশ করেন। বিশ্বের যে কোনো অঞ্চলে ইসলাম ও মুসলমান আক্রান্ত হলে উলামায়ে দেওবন্দ তাদের পাশে দাঁড়ানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। এই জন্যই দেখা যায়, ইহুদী-খ্রিস্টান চক্রান্তে খেলাফতে উসমানী বিলোপের সময় উলামায়ে দেওবন্দের প্রভাবাধীন হিন্দুস্তান উত্তাল হয়ে ওঠে। নবীজীর নামে কটূক্তি হলে সকল মুসলিম অঞ্চলের আগে গর্জে ওঠে এই অঞ্চল। আকীদায়ে খতমে নবুওতের সংরক্ষণে সর্বোচ্চ মেহনত হয় এই উপমহাদেশে। বিশেষত উলামায়ে দেওবন্দের মাধ্যমে। এ প্রসঙ্গে মিশরের ততকালীন ওয়াক্ফ-মন্ত্রী আব্দুল মুনইম আননামির লিখেছেন-

وهؤلاء المجاهدون الذين قاموا بإنشاء دار العلوم ديوبند، التي صارت أكبر معهد ديني عربي في الهند والبلاد الآسيوية الشرقية، وقد واصلوا جهادهم في سبيل حماية المسلمين وأخلاقهم وعقيدتهم من شرور المستعمرين، وتشددوا في ذلك حتى خاصموا كل ثقافة إنجليزية، بل كل ملبس ومظهر إنجليزي، ولا زال هذا المبدأ سائدا في هذه المدرسة وأمثالها للآن، ويعتبر ذلك مثلا حيا في المحافظة على كيان المسلمين.

...এই মুজাহিদগণই দারুল উলূম প্রতিষ্ঠা করেছেন, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচে বড় দ্বীনী প্রতিষ্ঠান। তারা সা¤্রাজ্যবাদীদের ষড়যন্ত্র থেকে মুসলমানদের দ্বীন-ঈমান ও স্বভাব-চরিত্র হেফাজতে অব্যাহত সংগ্রাম চালিয়ে  গেছেন। এক্ষেত্রে তারা অত্যন্ত দৃঢ়তা প্রদর্শন করেছেন। ইংরেজি সংস্কৃতির মোকাবেলা করেছেন। এমনকি ইংরেজি পোশাক-আশাকেরও বিরুদ্ধাচরণ করেছেন। এজাতীয় প্রতিষ্ঠানে সেই চেতনা এখনও বহাল আছে। মুসলমানদের স্বাতন্ত্র্য-বৈশিষ্ট্য রক্ষার এটা উত্তম উদাহরণ। -দারুল উলূম দেওবন্দ, আসআদী, পৃ. ৮৭

বানুরী রাহিমাহুল্লাহ লিখেছেন-

وقصارى القول إن المعهد العظيم دار العلوم ديوبند كما أصبح سببا وحيدا وعاملا قويا بين المسلمين لحفظ علوم الكتاب والسنة، كذلك أصبح سببا لنفخ روح الجهاد في نفوس الأمة، ولا سيما في طوائف العلماء وطلبة العلم، فتنبه لهذه الفكرة السياسية أكابر ديوبند والناس نيام، وخدموا الدين والوطن والمدعون رقود... وكل من يتخرج اليوم من هذه المعاهد نشاهد هذه الروح سارية في عروقه وشرايينه.

মোটকথা, দারুল উলূম নামের এই মহিমান্বিত প্রতিষ্ঠান ছিল মুসলমানদের মাঝে কিতাব ও সুন্নাহ্র ইলম হেফাজতের

একমাত্র ওসিলা। তেমনি এই প্রতিষ্ঠানই ছিল সাধারণ উম্মত, বিশেষত উলামা-তলাবার অন্তরে জিহাদী চেতনা ফুঁকে দেওয়ার যরিয়া। তাই সবাই যখন ঘুমিয়ে ছিল, তখনও এই প্রতিষ্ঠানের আকাবিরগণ রাজনৈতিক চেতনায় প্রজ্জ্বলিত ছিলেন। দ্বীন ও দেশের খেদমত তারা করেছেন, যখন জাতির তথাকথিত কর্ণধারেরা বেঘোর নিদ্রায় অচেতন ছিল। আজও এইসমস্ত প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা গ্রহণকারীদের রক্ত-মাংসে মিশে থাকে এই চেতনা।” -দারুল উলূম দেওবন্দ, আসআদী, পৃ. ২৯৩

আলী মিয়াঁ নদবী রাহিমাহুল্লাহ লিখেছেন-

ومن سمات العلماء والمتخرجين في هذه المدارس الدينية البارزة أنهم كانو في طليعة المناضلين لتحرير البلاد وإجلاء المستعمرين، وفي مركز القيادة في هذه الحركة الشعبية القوية، ومنهم انبثق فكرة النضال ضد الاحتلال في الحقيقة، وقد قاد كثيرا من حركات المقاومة الفعالة والثورات المسلحة بمقدرة وشجاعة، فمنهم من قتل شهيدا، ومنهم من شنق، ومنهم من نفي الى جزائر أندمان، أو إلى جزيرة مالطة، ومنهم من قضى شطرا من حياته في السجون والمعتقلات في داخل البلاد.

এই মাদরাসাসমূহের উলামা-তলাবাদের একটি বৈশিষ্ট্য এই যে, এঁরা আযাদী আন্দোলনে এবং ইংরেজ বিতাড়নে অগ্রসৈনিক ছিলেন, জাতীয় বিপ্লবের কেন্দ্রে ছিলেন। বাস্তবে তাঁদের থেকেই আগ্রাসন প্রতিরোধের চেতনা উত্থিত হয়েছে। তারা সামর্থ্য অনুসারে বীরত্বের সাথে অনেকগুলো সশস্ত্র সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছেন। তারা কেউ শাহাদাত বরণ করেছেন, কেউ ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলেছেন, কেউ মাল্টা-আন্দামানে দীপান্তরিত হয়েছেন। আবার কেউ জীবনের বিরাট অংশ জেলে জেলে পার করেছেন।” -আল মুসলিমূনা ফিল হিন্দ, পৃ. ২৩৭

৬. শিরক-বিদআত, হিন্দুয়ানি ও বিজাতীয় সংস্কৃতির প্রতি নারাজি এবং এবিষয়ে একধরনের আপোষহীন মনোভাব

শিরক-বিদআত, হিন্দুয়ানি ও বিজাতীয় সংস্কৃতির প্রতি নারাজি এবং এবিষয়ে একধরনের আপোষহীন মনোভাব  উলামায়ে দেওবন্দের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। আর শিরক-বিদআতে লিপ্ত অবুঝ মানুষের প্রতি দরদ পোষণ এবং এ থেকে তাদেরকে উদ্ধার করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টায় কসুর না করা দেওবন্দীদের বৈশিষ্ট্য।

৭. জুমহুর উলামায়ে কেরাম ও গণমানুষকে সাথে নিয়ে চলা

জুমহুর উলামায়ে কেরাম ও গণমানুষকে সাথে নিয়ে চলা দেওবন্দীদের বৈশিষ্ট্য। গণবিচ্ছিন্ন হয়ে ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের জন্য সরকারের লেজুড়বৃত্তি করা, জুমহুর উলামায়ে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শায মত-পথ অবলম্বন করা দেওবন্দিয়ত নয়।

৮. ব্যক্তিগত প্রয়োজনের উপর নুসরতে দ্বীনকে প্রাধান্য দেওয়া, সর্বদা দ্বীনী ফিকিরে ব্যস্ত থাকা

ব্যক্তিগত প্রয়োজনের উপর নুসরতে দ্বীনকে প্রাধান্য দেওয়া, অষ্টপ্রহর দ্বীনী ফিকিরে ব্যস্ত থাকা। উলামায়ে দেওবন্দের ইতিহাস এর জ্বলন্ত সাক্ষী। এটি উলামায়ে দেওবন্দের বড় বৈশিষ্ট্য। স্বল্পেতুষ্ট থেকে চরম ত্যাগ-তিতীক্ষা স্বীকার করে যেভাবে তারা মারকাযে ইসলাম থেকে বহু দূরের এতদঞ্চলে স্ব-রূপে দ্বীন উপস্থাপনে সরাসরি মাঠে-ময়দানে মানব-জমিনে কাজ করে যাচ্ছেন, শত বাধা, হাজারো অসহযোগিতা, এমনকি লাঞ্ছনাগঞ্জনা সয়ে তারা দ্বীনের বাতি জ্বালিয়ে রেখেছেন- তার নজির মেলা কঠিন।

আজ এই অঞ্চলে যতটুকু সুনীতি-সুবিচার, মূল্যবোধ-মানবিকতা, আস্তিকতা-পুণ্যচিন্তা, সামাজিক বন্ধন ও পারিবারিক শান্তি বিরাজমান, তা প্রধানত আমাদের আকাবির কর্তৃক প্রবর্তিত ধর্ম-নৈতিকতার চর্চা এবং দ্বীনী দাওয়াত ও শিক্ষার অবদান। আর যত জুলুম-অবিচার, দুর্নীতি-রাহাজানি, ধর্ষণ-নিপীড়ন, অনাচার-পাপাচার, নাস্তিকতা-অসামাজিকতা- সবই শরীয়ত ও সুন্নত থেকে বিমুখতা এবং লর্ড ম্যাকালে নির্দেশিত ইসলাম-বিবর্জিত শিক্ষাব্যবস্থার কুফল।

দ্বীনের হামাগীর ফিকির ও সামগ্রিক চিন্তাধারা সামনে রেখে আকাবিরে দেওবন্দ কাজ করেছেন। দ্বীনের সকল শাখা-শোবায় জাগরণ সৃষ্টি এবং বাতিল প্রতিরোধের জন্য প্রতিষ্ঠা করেছেন হাজারো স্বাধীন দেওবন্দী-কওমী মাদরাসা। ফলে উলামায়ে দেওবন্দ কাদিয়ানীশিয়া, মুনকিরীনে হাদীস, খ্রিস্টান মিশনারি, আরিয়া সমাজ, পাশ্চাত্য সংস্কৃতি, ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা ও রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং ইসলামের নামে যত বিদআতী ও বাতিল ফেরকা- সকল ফেতনার মোকাবেলা করেছেন।

৯. জামিইয়্যত তথা দ্বীনের সকল শাখা জিন্দা করার চেষ্টা ও মানসিকতা

জামিইয়্যত তথা দ্বীনের সকল শাখা জিন্দা করার চেষ্টা ও মানসিকতা। এই জন্য ইলম চর্চা, তাবলীগ, তাযকিয়া, সিয়াসত তারা একইসাথে আঞ্জাম দিচ্ছেন। যদিও আমলিভাবে সব ময়দানে সবাই সমানভাবে সক্রিয় নন, কিন্তু সমর্থনে এবং সময়-সুযোগ মতো অংশগ্রহণে কোনো প্রকৃত দেওবন্দী দ্বিধাগ্রস্ত নন।

ইলমের সর্বোচ্চ চর্চার জন্য যেমন অনেক আলেমের জীবন ওয়াক্ফ করা জরুরি, তাবলীগের জন্যও কিছু আলেমের কোরবান হওয়া প্রয়োজন। তেমনি শরীয়তসম্মত পদ্ধতিতে সিয়াসী মেহনতের জন্যও কিছু আলেম থাকা দরকার। এটা তাকসীমে-কার তথা কর্মবণ্টন প্রসঙ্গ। শরীয়তে তাকসীমে-কার আছে, তাকসীমে ফিকির নেই। সুতরাং কর্মক্ষেত্র ভিন্ন ভিন্ন হলেও সবার ফিকির ও চিন্তাধারা এক হওয়া মাসলাকে দেওবন্দের বৈশিষ্ট্য।

 

উলামায়ে দেওবন্দের কিছু ফিকহী বৈশিষ্ট্য

১. প্রাচীন কাল থেকে হিন্দুস্তানে অধিকাংশ আলেম-উলামা এবং সাধারণ মুসলমান হানাফী মাযহাবের ব্যাখ্যা অনুযায়ী কুরআন-সুন্নাহ্র মুজতাহাদ ফীহ আহকামের উপর আমল করে আসছেন। তাই উলামায়ে দেওবন্দ এতদঞ্চলে প্রচলিত হানাফী মাযহাব থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে এই মাযহাবের বাস্তবসম্মত মজবুতি ও সৌন্দর্য তুলে ধরা এবং স্বীকৃত অন্যান্য মাযহাবকে সাথে নিয়ে চলার নীতি গ্রহণ করেছেন। ইলমী সম্পদ হিসাবে দরস-মুতালাআয় চার মাযহাবেরই চর্চা এবং সমস্ত ফকীহ-মুহাদ্দিসগণের প্রতি আদব-ইহতিরামও উলামায়ে দেওবন্দের বৈশিষ্ট্য।

২.الجمع بين الأدب والنقد  উলামায়ে কেরামের প্রতি আযমত ও মহব্বত বজায় রেখেই তাদের কোনো ভুল ও শায ব্যাখ্যা থাকলে তা পরিহার করা উলামায়ে দেওবন্দের বৈশিষ্ট্য। এজন্য দেখা যায়, আল্লামা শাব্বীর আহমদ উসমানী রাহ. শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবি রাহ. (মৃত্যু : ১১৭৬ হি.) সম্পর্কে বলেন-

شيخ شيوخنا ومقدم جماعتنا.

তিনি আমাদের শায়েখগণের শায়েখ এবং আমাদের জামাতের প্রথম পুরুষ। -মুকাদ্দিমায়ে ফাতহুল মুলহিম ১/২৯০

আবার মাআরিফুস সুনান (৪/৩৮২)-এ ইউসুফ বানুরী রাহ. লিখেছেন-

وله في كتبه آراء مع جلالة قدره يشكل أن يوافق عليها.

শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবি রাহ. মহান ব্যক্তিত্ব হওয়া সত্তে¡ও তাঁর কিতাবাদিতে এমন কিছু বক্তব্য আছে, যাতে একমত হওয়া মুশকিল।

এমনিভাবে শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবি রাহ. ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা’, ‘মুসাউওয়া’, ‘মুছাফফা’ ইত্যাদি কিতাবে বেশ কিছু মাসআলায় হানাফী মাযহাবের বাইরের মত তারজীহ দিয়েছেন। এইসব ক্ষেত্রে দলীলের আলোকে হানাফী মাযহাবের প্রতিষ্ঠিত বক্তব্যকেই তারজীহ দেওয়া হয়েছে-ফয়জুল বারী’, ‘ইলাউস সুনান’, ‘মাআরিফুস সুনান’ ইত্যাদিতে। কিন্তু কোনো এলান-উনওয়ান নেই, ছাব্ব-শাতামের তো নামগন্ধও নেই।

তেমনি হাজী এমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মাক্কী (মৃত্যু : ১৩১৭হি.) রাহ. হলেন আমাদের ‘সায়্যিদুত ত্ব-ইফাহ’, উলামায়ে দেওবন্দের একজন কেন্দ্রীয় মুরব্বি। কিন্তু মুরিদ হওয়া সত্তে¡ও ফকীহুন নফস রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী (মৃত্যু : ১৩২৩হি.) রাহ. বিভিন্ন মাসআলায় হাজী ছাহেব রাহ.-এর কিছু আমল দলীলের আলোকে অনুসরণযোগ্য নয় বলে মত প্রকাশ করেছেন। (বিস্তারিত দ্রষ্টব্য : তাযকিরাতুর রশীদ ১/১১৪-১৩৭)

শাইখুল ইসলাম মাদানী রাহ. এবং ইমামে ইনকেলাব উবায়দুল্লাহ সিন্ধী রাহ. ছিলেন আযাদী অন্দোলনে পরস্পরের সহযোদ্ধা। কিন্তু শেষ বয়সে সিন্ধী রাহ. থেকে এমন কিছু মতও প্রকাশ পেয়েছে, যা বিভ্রান্তিপূর্ণ। মাদানী রাহ. তার কারণ ব্যাখ্যা করে শেষে বলেছেন-

بنا بریں تمام اہل فہم اور ارباب قلم وعلم سے پرزور درخواست ہے کہ مولانا مرحوم کی کسی تحرير کو ديکھ کر اس وقت تک کوئی حتمی رائے نہ فرمائیں جب تک کہ اس کو اصول اور مسلمات اسلاميہ اور ضروريات دين اور عقائد و اعمال اہل سنت و الجماعت کے زریں قواعد وتآلیف پر پرکھ نہ لیں اور علی ہذالقیاس مولانا کے کسی کلام کو حضرت شاہ ولی اللہ صاحب رحمۃ اللہ علیہ حضرت مولانا قاسم صاحب رحمۃ اللہ علیہ حضرت شیخ الہند رحمۃ اللہ علیہ اور دیگر اسلاف و اکابر دیوبند کا مسلک بھی نہ سمجھیں جب تک کہ اس کسوٹی پر اس کو کس نہ لیں۔

-মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধী কে উলূম ও আফকার, সূফী আবদুল হামীদ সুওয়াতী, পৃ. ১৪১

কোনো একটি মাসআলায় শাইখুল ইসলাম হযরত মাদানী রাহ.-এর অভিমতের উপর মুদাল্লাল তাবসেরার পর হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম যা লিখেছেন তা স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখার মতো-

آخر میں یہ گزارش ہے کہ حضرت مولانا حسین احمد مدنی قدس اللہ سرہ العزیز کی عظمت شان، جلالت قدر اور علمی تبحر کے پیش نظر تو اس مسئلہ پر قلم اٹھانے کی جرات کسی بڑے عالم کو بھی نہیں ہونی چاہئے، چہ جائے کہ مجھ جیسا طفل مکتب اس پر کچھ لکھے، لیکن جماعت دیوبند کی خصوصیت اور انہیں بزرگوں کی تعلیم و تلقین نے ہمیں یہ صراط مستقیم دکھائی کہ مسائل شرعیہ میں آزادانہ اظہار رائےۓ ترک ادب نہیں، بلکہ شاگردوں کا اظہار خیال انہیں بزرگوں کا معنوی فیض ہوتا ہے، اس لئے بنام خدا تعالی جو کچھ اس میں  تحقیق سے مجھے واضح ہوا وہ لکھ دیا، اور اللہ تعالی سے پناہ مانگتا ہوں کہ بزرگوں کی شان میں ادنی ترک ادب سے بھی مجھے محفوظ رکھے، آمین۔

-ফিকহী মাকালাত ২/৫৫-৫৬

তেমনি কোনো কোনো আকাবির থেকে যেসমস্ত আপত্তিকর বা মুবহাম কথা পাওয়া যায় সেগুলোর তাকলীদ না করা সম্ভব হলে তাবিল করা আর না হয় তা বর্জন করা- উলামায়ে দেওবন্দের বৈশিষ্ট্য। ফলে দেখা যায়, উলামায়ে দেওবন্দ হাফেজ ইবনে তাইমিয়া রাহ.-কে যেমন গ্রহণ করেছেন, তেমনি ইবনে আরাবী রাহ.-এর প্রতিও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছেন। হুসনে যন এবং তাবিলের মুআমালা উভয়ের সঙ্গেই করেছেন। আর যাল্লাত দুজনের কারোরই গ্রহণ করেননি। হযরত মুআয ইবনে জাবাল রা. এমন নসীহতই করেছেন-

...وَأُحَذِّرُكُمْ زَيْغَةَ الْحَكِيمِ، فَإِنّ الشّيْطَانَ قَدْ يَقُولُ كَلِمَةَ الضّلَالَةِ عَلَى لِسَانِ الْحَكِيمِ، وَقَدْ يَقُولُ الْمُنَافِقُ كَلِمَةَ الْحَقِّ

قَالَ: قُلْتُ لِمُعَاذٍ: مَا يُدْرِينِي رَحِمَكَ اللهُ أَنّ الْحَكِيمَ قَدْ يَقُولُ كَلِمَةَ الضّلَالَةِ وَأَنّ الْمُنَافِقَ قَدْ يَقُولُ كَلِمَةَ الْحَقِّ؟ قَالَ: بَلَى، اجْتَنِبْ مِنْ كَلَامِ الْحَكِيمِ الْمُشْبهاتِ الّتِي يُقَالُ لَهَا مَا هَذِهِ؟ وَلَا يُثْنِيَنّكَ ذَلِكَ عَنْهُ، فَإِنّهُ لَعَلّهُ أَنْ يُرَاجِعَ، وَتَلَقّى الْحَقّ إِذَا سَمِعْتَهُ فَإِنّ عَلَى الْحَقِّ نُورًا.

তোমাদেরকে ‘হাকীম’ ব্যক্তির স্খলনের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে বলব। কারণ শয়তান কখনো হাকীম ব্যক্তির জবানে বিভ্রান্তিপূর্ণ কথা চালিয়ে দেয়। আবার মুনাফিক ব্যক্তিও কখনো হক কথা বলে বসে!

বর্ণনাকারী বলেন, আমি বললাম, আপনার প্রতি আল্লাহ্র রহমত বর্ষিত হোক! কীভাবে বুঝব, হাকীম ব্যক্তি বিভ্রান্তিপূর্ণ কথা বলে ফেলেছে আর মুনাফিক ব্যক্তি হক কথা বলেছে! তিনি বললেন, অবশ্যই বুঝবে; হাকীম ব্যক্তির যে অপরিচিত উক্তির ব্যাপারে অন্যরা বিস্মিত হয়ে বলে- এ কেমন কথা!- সেটা এড়িয়ে চলবে। বাকি এ কারণে তাঁর থেকে কিছুতেই মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না। হতে পারে তিনি রুজু করবেন! আর তুমি হকটা গ্রহণ করবে। কারণ হকের মাঝে নূর আছে! (সুনানে আবু দাউদ, বর্ণনা ৪৬১১)

তাই সামগ্রিকভাবে যারা আহলে হক, তাদের মাঝে কোনো অসংগতি থাকলে, দালীলিকভাবে দুর্বল কোনো কিছু প্রচলিত থাকলে তার এসলাহ করার ক্ষেত্রে যথাসম্ভব এ’লান-উনওয়ান, ছব্ব-শতম পরিহার করা, সম্পর্কচ্ছেদ না করা, আদব-তাওয়াযুর সাথে এসলাহ করা- উলামায়ে দেওবন্দের বৈশিষ্ট্য। কিন্তু এর বিপরীত নীতিতে চলেন কট্টরপন্থী কিছু সালাফী আলেম বা বিচ্ছিন্ন মতাদর্শ গ্রহণকারী কিছু গবেষক; আজকাল আমাদেরও কারও কারও মাঝে উলামায়ে দেওবন্দের এই গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য অনুপস্থিত দেখা যায়!

মাসলাকে দেওবন্দের উপর আরোপিত কিছু বিষয়

১. কোনো ব্যক্তি বা জামাতকে কাফের বা বিদআতী আখ্যায়িত করার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন আহলে সুন্নতের বৈশিষ্ট্য। অথচ বেরেলভি মতবাদের লোকজন উলামায়ে দেওবন্দকে ওহাবি আখ্যায়িত করে এবং তাদের বক্তব্য কাটছাঁট করে নানান ছুঁতায় তাকফীর করে বেড়ায়। কোনো কোনো  ‘কট্টর’ সালাফী-আহলে হাদীস-গায়রে মুকাল্লিদও দেওবন্দীদের উপর বিভিন্ন অপবাদ আরোপ করে থাকে। আরবকেন্দ্রিক একধরনের লোকজনের মাঝে ‘তাওহীদ ও তাকফীর’ বিষয়ে গুলু ও বাড়াবাড়িপূর্ণ চিন্তাধারা সক্রিয়, আজকাল একে মাসলাকে আকাবিরে দেওবন্দ হিসাবে তুলে ধরারও চেষ্টা চলছে। অথচ এর সাথে আকাবিরে উলামায়ে দেওবন্দের সম্পর্ক নেই।

২. শরীয়া আইনে রাষ্ট্র শাসনকারী শাসকগণ নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিয়াসী খলীফা। উলামায়ে কেরাম হলেন নবীজীর ইলমী ওয়ারিস। আজ পর্যন্ত সামগ্রিকভাবে উলামায়ে কেরাম এ দায়িত্বে অবিচল আছেন। কঠিন পরিস্থিতিতেও তাঁরা দ্বীনের হেফাজত করেছেন। তাদের ওসিলায় এখন পর্যন্ত দুনিয়াতে দ্বীন বাকি আছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে দ্বীন বাস্তবায়ন শাসকদের কাজ, যা তারা উলামায়ে কেরামের পরামর্শ নিয়ে করবেন।

আফসোসের বিষয় হল, উসমানী খেলাফতের পতনের পর থেকে প্রায় একশ বছর যাবৎ অধিকাংশ শাসক রাষ্ট্রীয়ভাবে শরীয়া বাস্তবায়নে কোতাহি করে যাচ্ছেন এবং কুরআন-সুন্নাহ্র বিধান বাস্তবায়ন না করে চরম অন্যায় ও অবিচার করে যাচ্ছেন। ফলে ইসলাম তথা একমাত্র সত্যের মর্যাদা ও বিজয়, সর্বস্তরে দ্বীনী শিক্ষার প্রসার, জিহাদের আয়োজন, শরীয়া আইন বাস্তবায়ন ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা, আমর বিল মারূফ ও নাহি আনিল মুনকার ইত্যাদি সব কাজই বন্ধ প্রায়।

শাসনপদ্ধতিতে পরিবর্তন ছাড়া এ থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। এমতাবস্থায় ইসলামী শরীয়া বাস্তবায়ন এবং জাতীয় পর্যায়ে আমর বিল মারূফ ও নাহি আনিল মুনকারের জন্য এক দল আলেমের বহুমুখী দীর্ঘ মেহনত চালিয়ে যেতে হবে।

জাতির ভিতর ইসলামী শাসনের চেতনা তৈরি, বিদ্যমান শাসক ও শাসনপদ্ধতির উপর কোনো না কোনো স্তরে প্রভাব বিস্তার এবং জাতীয় বিপ্লবের চিন্তা থেকে উলামায়ে দেওবন্দের কেউ কেউ প্রচলিত রাজনীতিতেও অংশ নিয়ে থাকেন। এটা যদি শরয়ী আহকামের প্রতি লক্ষ্য রেখে হয় তাহলে আকাবিরগণ এই অংশগ্রহণ সমর্থন করেন। তাই উলামায়ে কেরামের বর্তমান রাজনৈতিক কার্যক্রমকে ঢালাওভাবে দেওবন্দিয়তের খেলাফ ও নিরর্থক মনে করা বাড়াবাড়ি।

৩. জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ বৃটিশ থেকে স্বাধীন হয়ে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে অনেকটা স্বায়ত্ব শাসন প্রতিষ্ঠা ও ইসলামী তাহযীব-তামাদ্দুনের পূর্ণ হেফাজত-এর সাথে হিন্দুদের নিয়ে ‘বৃহৎ যৌথ-রাষ্ট্র’ গঠন করতে চেয়েছে। শাইখুল ইসলাম মাদানী রাহ. এ মতের উপর শেষ পর্যন্ত কায়েম ছিলেন। কিন্তু বিভাগের পর তিনিও সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের স্বতন্ত্র ভূমি পাকিস্তান (এবং পরবর্তীতে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ)-কে হেফাজত করার আদেশ করেন। ফলে পাকিস্তান-বাংলাদেশে অবস্থানরত মাদানী রাহ.-এর অনুসারীগণও ইসলামী শরীয়া নাফেয করার জোর প্রচেষ্টা শুরু করেন। উপরন্তু মাদানী রাহ. ‘মুশতারাকা হুকুমত’ ও ‘বৃহৎ যৌথ-রাষ্ট্র’, যেখানে ইসলামী শরীয়াকে ‘হাকেম’ বানানো সম্ভব নয়, এমন ধারার রাষ্ট্র গঠনকে চূড়ান্ত মাকসাদ মনে করতেন না, তিনি এই ধাঁচের রাষ্ট্রকে ‘আহওয়ানুল বালিয়্যাতাইন’ আখ্যায়িত করতেন। রামরাজ্য আর ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র- দুটোই মুসলমানদের জন্য বিপদ। কিন্তু রামরাজ্যের চেয়ে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে বিপদ একটু কম। সুতরাং ভারতে যখন ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম সম্ভব হচ্ছে না, তখন কম মন্দ হিসাবে তিনি ‘মুশতারাকা হুকুমত’ গঠনের পলিসি পেশ করেছেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি লিখেছেন-

بلا شبہ اسلامی قوانين ہی دنيا كی امن وسلامت كے ضامن ہيں مشتركہ حكومت ميں ان قوانين كی حاكميت مطلقہ نہ ہوگی نہ حدود شرعيہ جاری ہوگی ليكن يہ خود مسلمانوں كا علمی وعملی فريضہ ہے كہ وه دوسرے قوموں سے اسلامی قوانين كی يہ حيثيت تسليم كرا ليں اہون البلیتین آخری منزل نہیں ہو سكتی۔

নিঃসন্দেহে ইসলামী আইনই কেবল পৃথিবীতে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। তবে মুশতারাকা শাসনে এই আইনের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা নিশ্চিত হবে না, শরয়ী দণ্ডবিধিও জারি হবে না। কিন্তু খোদ মুসলমানের ইলমী ও আমলি দায়িত্ব এই যে, তারা অন্যান্য জাতির কাছ থেকে ইসলামী আইনের এই অবস্থান কবুল করিয়ে নেবে। কারণ তা ‘আহওয়ানুল বালিয়্যাতাইন’ (দুই বিপদের ছোট বিপদ বা কম মন্দ), আখেরি মনযিল হতে পারে না।” (মাকতুবাতে শাইখুল ইসলাম ২/১১২)

অথচ মাদানিয়্যত ও দেওবন্দিয়তের দাবিদার কেউ কেউ বর্তমান মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশের রাজনীতিতে শরীয়তকে হাকেম না বানিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা হওয়া উচিত বলে মনে করে এবং ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থাকে দেওবন্দিয়ত বলে প্রচার করে! ফলে তাদের মতে ইসলামী খেলাফত-প্রত্যাশী জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সমর্থকরা প্রকৃত দেওবন্দী নয়, অখণ্ড ভারতপন্থী জমিয়তে উলামায়ে হিন্দই কেবল দেওবন্দী। আর শাইখুল হিন্দ রাহ.-এরই অন্য শাগরিদ হাকীমুল উম্মত থানবী রাহ.-এর অনুসারীরা দেওবন্দিয়ত থেকে খারিজ! এমনকি বাংলাদেশ ও অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রের ধর্মরিপেক্ষতার বিরুদ্ধে গিয়ে যারা ইসলামী শরীয়া বাস্তবায়নের কোশেশ করছেন, তারা নাকি উগ্রপন্থী ও খারেজী, মওদুদিবাদে বিশ্বাসী! নাউযুবিল্লাহ! এধরনের বেদনাদায়ক বিভাজন এবং আত্মঘাতী আসাবিয়্যাত ও বাড়াবাড়ির সাথে আকাবিরে দেওবন্দের মাসলাকের কোনো সম্পর্ক নেই। বিশেষত হযরত শাইখুল হিন্দ রাহ. ও শাইখুল ইসলাম মাদানী রাহ.-এর আদর্শের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই।

 

এই নিসবত নিয়ে তাআসসুব করাও নিন্দনীয়

আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর অনুসারী হওয়ার সাথে সাথে যার হাদীস-তাসাউফ ইত্যাদির সনদ আকাবিরে দেওবন্দ হয়ে উপরে যায়, উরফে তাকে দেওবন্দী মনে করা হয়। তেমনি যার দ্বীনী রাহবর ও রাহনুমাঁ উলামায়ে দেওবন্দ, তাকেও। তাছাড়া বেরেলবি-রেজবি-বিদআতীদের বিপরীতে উপমহাদেশে আহলে সুুন্নাত ওয়াল জামাআতের অনুসারীমাত্রই দেওবন্দী নামে পরিচিত।

তো যার হাদীস-তাসাউফ ইত্যাদির সনদ আকাবিরে দেওবন্দ হয়ে উপরে যায়নি, কিন্তু তিনি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর অনুসারী, তবে তিনি দেওবন্দী না হয়েও দেওবন্দীদের বন্ধু। কারণ আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর অনুসারী হওয়ার পর দেওবন্দী না হওয়া শরীয়ত মোতাবেক কোনো ত্রুটি নয়। যিনি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর অনুসারী, তিনি দেওবন্দী কি দেওবন্দী না, তা ঘাটতে যাওয়াই ঠিক না। তাই শুধু দেওবন্দী না হওয়ার কারণে এমন ব্যক্তিকে দ্বীনী কাজে ‘পর’ মনে করা- দেওবন্দিয়তের খেলাফ এবং নাজায়েয তাআসসুব বলে গণ্য।

আর ‘অহংকার ও দলাদলির জন্য দেওবন্দী নেসবত ব্যবহার করা নিতান্তই গর্হিত।’ (উলামায়ে দেওবন্দ কা দ্বীনী রুখ আওর মাসলাকী মেযাজ, কারী তায়্যিব রাহ., পৃ. ২৪)

 

দেওবন্দের কদীম দস্তুরে আসাসী

এই দস্তুরের মাঝে দেওবন্দী মাদরাসার উদ্দেশ্য, প্রকৃতি ও কর্মপদ্ধতি ইত্যাদির আলোচনা রয়েছে। দারুল উলূম দেওবন্দ এবং মাসলাকে দেওবন্দ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণার জন্য এই দস্তুর গুরুত্বপূর্ণ।

۔قرآن مجید، تفسیر ،حدیث ،عقائد و کلام اور ان کے علوم کے متعلقہ ضروری اور مفید فنون آلیہ کی تعلیم دینا، اور مسلمانوں کو مکمل طور پر اسلامی معلومات بہم پہنچانا، رشد و ہدایت اور تبلیغ کے ذریعے اسلام کی خدمت انجام دینا

-اعمال و اخلاق اسلامیہ کی تربیت اور طلباء کی زندگی میں اسلامی روح پیدا کرنا

-اسلام کی تبلیغ و اشاعت اور دین کا تحفظ و دفاع، اور اشاعت اسلام کی خدمت بذریعہ تحریر و تقریر بجالانا اور مسلمانوں میں تعلیم و تبلیغ کے ذریعے سے خیر القرون اور سلف صالحین جیسے اخلاق و اعمال اور جذبات پیدا کرنا

-حکومت کے اثرات سے اجتناب و احتراز اور علم و فکر کی آزادی کو بر قرار رکھنا

-علوم دینیہ کی اشاعت کے لئے مختلف مقامات پر مدارس عربیہ قائم کرنا اور انکا دار العلوم سے الحاق

১. কুরআন মাজীদ, তাফসীর, হাদীস, আকীদা, ইলমে কালাম এবং এসকল ইলমের সাথে সংশ্লিষ্ট মুফিদ ও জরুরি মাধ্যমজাতীয় শাস্ত্রগুলো পাঠ দান করা।

মুসলমানদের কাছে পরিপূর্ণভাবে দ্বীনী মাসায়েল পৌঁছানো, তাবলীগ-নসীহতের মাধ্যমে দ্বীনের খেদমত করা। ইসলামের প্রচার-প্রসার এবং হেফাজত ও সংরক্ষণ করা। দ্বীন প্রচারে লিখনী ও বক্তৃতা কাজে লাগানো।

২. আমল ও আখলাকের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং ছাত্রদের জীবনে ইসলামী রূহ ফুঁকে দেওয়া।

৩. তালীম ও তাবলীগের মাধ্যমে মুসলমানদের ভিতর খাইরুল কুরূন ও সালাফে সালেহীনের মতো আমল-আখলাক ও দ্বীনী জযবা পয়দা করা।

৪. সরকারি প্রভাব থেকে বেঁচে থাকা এবং ইলমী-ফিকরী আযাদী ও স্বাধীনতা অক্ষুণœ রাখা।

৫. দ্বীনী শিক্ষার প্রসারের জন্য বিভিন্ন জায়গায় মাদরাসা কায়েম করা এবং দারুল উলূমের সাথে সংযুক্ত করা। -তারীখে দারুল উলূম দেওবন্দ ১/১৪২

 

দারুল উলূমের প্রাতিষ্ঠানিক উসূলে হাশতেগানা

দারুল উলূম দেওবন্দে হযরত নানুতুবি রাহ. রচিত উসূলে হাশতেগানা অনুসৃত হচ্ছে। মূলনীতি অষ্টকের কোনো কোনোটি ইনতিযামী হলেও বেশ কয়েকটি দারুল উলূম দেওবন্দের মূল মেযাজ ও আদর্শের সাথে সম্পৃক্ত। যেমন :

ক. অবশ্যই মাদরাসার শিক্ষকগণ সমমনা হবেন। ইহকাল-সর্বস্ব শিক্ষিতদের ন্যায় শিক্ষকবৃন্দ অহংকারী এবং একে অপরকে হেয় প্রতিপন্নকারী হবেন না। আল্লাহ না করুন, এমনটা হলে মাদরাসার অস্তিত্ব বিপন্ন হবে।

খ. পাঠের পূর্বনির্ধারিত পরিমাণ বা পরে যা নির্ধারণ হয়, তা যথাসময়ে অবশ্যই সমাপ্ত করবে। নচেৎ মাদরাসা ফলপ্রসূ হবে না।

গ. মাদরাসার পরামর্শক-কর্তৃপক্ষ মাদরাসার পরিচালনা যেন সুষ্ঠু-সুন্দর ও নিয়মতান্ত্রিক হয়, সেই দিক লক্ষ করে আন্তরিকভাবে পরামর্শ দেবেন। কেউ-ই পরামর্শদানে দ্বিধা করবে না এবং স্ব-মত বাস্তবায়নের জন্য বাড়াবাড়িও করবে না। আল্লাহ না করুন, পরামর্শে পরমতসহিষ্ণুতা এবং পরমত গ্রহণের মানসিকতা না থাকলে মাদরাসার বুনিয়াদ টলোমলো হয়ে পড়বে। তাই মুহতামিম অবশ্যই পরামর্শ করে কাজ করবেন। নীতিসম্মত পরামর্শ নিজের মতের বিপরীত হলেও অন্তরের অন্তস্তল থেকে মেনে নেবেন। তবে উপযুক্ত পরামর্শকগণের মধ্য হতে বিশেষ কারো সাথে পরামর্শ করতে না পারলে সেই পরামর্শকের অসন্তুষ্ট হওয়াও কাম্য নয়। হাঁ, মুহতামিম কারো সাথেই পরামর্শ না করলে আপত্তি তোলা যেতে পারে।

ঘ. রাষ্ট্র-সরকার ও (অহংকারী) বিত্তবানদের (পরিচালনা ও অর্থ প্রদানে) অংশিদারিত্ব খুবই ক্ষতির কারণ বলে মনে হয়।

ঙ. ঐসকল লোকের চাঁদা-অনুদান বরকতময়, যারা খ্যাতির আশা করে না। তাই দাতাদের নেক নিয়তই মাদরাসার স্থায়িত্বের কারণ বলে মনে হয়। -তারীখে দারুল উলূম দেওবন্দ ১/১৫২-১৫৪

প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দেওবন্দী ও কওমী নেসবত ও ‘তাশাখখুস’-এর জন্য উসূলে হাশতেগানার অনুসরণ কাম্য মনে করি। পূর্বেকার দ্বীনী প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি অনুদান-নির্ভর হওয়ার কারণে বৃটিশরা প্রতিষ্ঠানগুলো সহজে বন্ধ করতে সক্ষম হয়। তাই অনুচ্ছেদ গ ও ঘ -এর অনুসরণ একান্ত জরুরি।

 

আরও কিছু প্রাতিষ্ঠানিক বৈশিষ্ট্য

১. গণমুখী কর্মধারা, মাঠে-ময়দানে সরাসরি মানুষের মাঝে গিয়ে দ্বীনী কাজ করা। এই মানসিকতা থেকেই দেওবন্দীদের প্রিয় কর্মসূচিগুলোর অন্তর্ভুক্ত হল ওয়াজ মাহফিল, সুলুক ও ইহসানের উমূমী মেহনত, দাওয়াত-তবলীগ, ইমামত-খেতাবত, জরুরিয়াতে দ্বীনের তালিম ও মক্তব কায়েম ইত্যাদি।

২. الجمع بين العلم والعمل والتربية  তালীম-তাযকিয়া, তাহযীব ও আদব-কায়দা শিক্ষা দেওয়া, ছাত্রদেরকে দ্বীনী কাজের ফিকির দেওয়া মাসলাকে দেওবন্দের বৈশিষ্ট্য। দেওবন্দী প্রতিষ্ঠানে ইলমের সাথে সাথে সমান গুরুত্ব দিয়ে ছাত্র-শিক্ষকদের আমলি ও আখলাকি তরবিয়ত করা হয়। এটা দেওবন্দী মাদরাসার মাকাসেদের অন্তর্ভুক্ত। তাকওয়া-তাহারাত, আদব-তাওয়াযুর চর্চা এবং আমলে-আখলাকে, সীরত-সুরতে ‘সিদ্ক’ আনয়ন করা দেওবন্দী প্রতিষ্ঠানের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এখানে দরসে উপস্থিত থাকা যেমন গুরুত্বপূর্ণ নামাযের জামাতে হাজির থাকাও গুরুত্বপূর্ণ। তাসবীহ-তিলাওয়াত, দুআ-মুনাজাত ইত্যাদি- পাঠ্য বিষয়ের মতই জরুরি। লেবাস-পোশাকে সালেহীনের সাদৃশ্য অবলম্বন অত্যাবশ্যক। অথচ পৃথিবীর অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে এর প্রতি প্রায় ভ্রুক্ষেপই করা হয় না।

পশ্চিমা ইংরেজ এবং তাদের দোসররা চায়- এই অঞ্চলের মানুষ হবে রং-রূপে হিন্দুস্তানী আর মন-মেযাজে চাল-চলনে ইউরোপ-আমেরিকার গোলাম! উলামায়ে দেওবন্দ চায়- এই অঞ্চলের মুসলিমরা হবে রং-রূপে হিন্দুস্তানী আর মন-মেযাজে আচার-আচরণে খায়রুল কুরূনের মুসলিমদের মতো মুসলিম!

৩. التفرغ للدينঅর্থাৎ এমন এক জামাত তৈরি করা, যারা সর্বক্ষণ দ্বীনী কাজে মশগুল থাকবে। সায়্যেদ রশীদ রেজা মিশরী রহিমাহুল্লাহ্র আগমন উপলক্ষে আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরীসহ অন্যান্য আকাবিরের সামনে দারুল উলূমের পক্ষ হতে যে স্বাগত বক্তব্য পাঠ করা হয়, তাতে বলা হয়-

إن الملة الإسلامية لا بد لبقائها من أمرين: الأمر الأول: أن تكون فيها جماعة هم حاملوا المذهب، ومبلغوا الشريعة، شغلهم ليلا ونهارا المكابدة في التعليم والإرشاد، والسهر لمطالعة العلوم، والقيام لحق الله تعالى تلاوة وذكرا وفكرا، فهذه الجماعة هي عماد الإسلام، إن فقدت- لا قدر الله- فقد الإسلام، وإن ضعفت ضعف الإسلام، والأمر الثاني: أن يكون طبقة العوام والمشتغلين بأمور المعاش عالمين بأصول دينهم، عاملين بأركان مذهبهم، لا يشغلهم طلب الدنيا والانهماك في العلوم العصرية عن الفرائض والحقوق.

মুসলিম মিল্লাতের টিকে থাকার জন্য দুটো জিনিস প্রয়োজন :

এক. এমন একটি জামাত বিদ্যমান থাকা, যারা হবে দ্বীনের ধারক ও প্রচারক। রাত-দিন তাদের কাজ শুধু তালীম-তাবলীগ, পড়াশোনায় রাত জাগরণ, যিকির-ফিকির ও তিলাওয়াত। এই দলটি ইসলাম সংরক্ষণের বুনিয়াদ। এরা হারিয়ে গেলে ইসলাম হারিয়ে যাবে। এরা দুর্বল হয়ে পড়লে ইসলাম দুর্বল হয়ে যাবে।

দুই. উপার্জন-উৎপাদনে ব্যস্ত সাধারণ মুসলমান দ্বীনের মৌলিক বিষয়ে অবগত থাকবে এবং ইসলামের জরুরি বিধানের উপর আমল করে চলবে। জাগতিক বিদ্যা ও কামাই-রোজগারের অজুহাতে হুকুক ও ফারায়েজ থেকে গাফেল হবে না।” -দারুল উলূম দেওবন্দ, আসআদী, পৃ. ৩২০

৪. উলামায়ে দেওবন্দের মাঝে এন্তেযামী ক্ষেত্রেও কাদীম, মুতাওয়ারাছ ও প্রাচীন বিষয়ের প্রতি আগ্রহ ব্যাপক। জাদীদ ও নতুন মুবাহ কিছু গ্রহণেও ইহতিয়াত ও সতর্কতা অবলম্বন উলামায়ে দেওবন্দের বিশেষ বৈশিষ্ট্য বলে গণ্য।

৫. দেওবন্দী মাদরাসা হল ধর্মীয় শিক্ষার বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান দৃষ্টি থাকে ছাত্রদের মধ্যে সরাসরি দ্বীনী কাজে মশগুল হওয়ার আগ্রহ-যোগ্যতা সৃষ্টি করার প্রতি। তাই এসকল প্রতিষ্ঠানের পাঠ্য-নেসাবে দুনিয়ামুখী বিদ্যা প্রয়োজন পরিমাণ রাখা হয়, যেন ছাত্ররা পাঠ শেষে দ্বীনী কাজে লেগে যায়, অন্য কিছু মাথায় নিতে না পারে। সুতরাং দেওবন্দী মাদরাসার নেসাবে আধুনিক বিষয় প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সংযুক্তি- এজাতীয় মাদরাসার উদ্দেশ্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। বাকি কুরআন, হাদীস ও ফিকহে ইসলামীকে মূল রেখে দ্বীনী ইলমের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রয়োজনীয় সংযোজন-বিয়োজন ও বিভাগবৃদ্ধির প্রচেষ্টা চলমান।

উল্লেখ্য, দ্বীনী জরুরতে মুরব্বীর তত্ত¡াবধানে আধুনিক নির্দিষ্ট কোনো বিষয় শেখা বা তাতে পারদর্শিতা অর্জনেও কোনো বাধা নেই।

৬. দেওবন্দীদের কাছে শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য, আকীদা-আমল দুরস্ত করা। ছাত্রদেরকে সালাফে সালেহীনের ব্যাখ্যার আলোকে কুরআন-সুন্নাহ্র জ্ঞান প্রদান করা। যাতে শিক্ষার্থীরা ইলম, আমল ও আখলাকে এবং বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে ওয়ারিসে নবীর দায়িত্ব পালনে সক্ষম হয় এবং নিজেদের জীবনকে দ্বীন ও শরীয়তের বাস্তব নমুনারূপে গড়ে তোলে, পরকালে আল্লাহ্র নিকট জবাবদিহি করার চেতনা-সমৃদ্ধ মুমিন-মুসলিম ও সুনাগরিকরূপে নিজেকে উপস্থাপন করতে পারে।

সেইসাথে যুগসচেতনতা ও উন্নত মানসিকতায় ঋদ্ধ-প্রবুদ্ধ, দ্বীন, দেশ ও জাতি-প্রেমিক আত্মত্যাগী মুজাহিদ আলেমে দ্বীন হিসাবে ছাত্রকে গড়ে তোলা, তাবলীগ-তাসনীফ ও রদ্দে বিদআত ও রদ্দে ইলহাদের কাজ শেখানো, আলেম হওয়ার সাথে সাথে পরিবার ও সমাজ পরিচালনারও সমূহ যোগ্যতা ও চেতনা দান করা, কুরআন-সুন্নাহ্র আলোকে জ্ঞানমনষ্কতা, কৃতজ্ঞতাবোধ, সততা-স্বল্পেতুষ্টি ও পরোপকার, উদারতা-দানশিলতা, ইনসাফ-ন্যায়বোধ ও শ্রেয়বোধ, মমতা-কোমলতা, ধৈর্য-বিনয়, বীরত্ব-সাহসিকতা, কর্তব্যজ্ঞান ও দায়িত্ববোধ, অধিকার-সচেতনতা, শ্রদ্ধা-শৃঙ্খলা ও সমঝোতা, স্নেহ-সৌহার্দ ও প্রীতিবোধ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সুশিলতা ও রুচিশিলতা, নম্রতা-কর্মময়তা, যৌন-নির্মলতা-লাজুকতাবিনয়, ধৈর্য, রসবোধ, ভাষাগত শুদ্ধতা, শাস্ত্রীয় পাণ্ডিত্য, বাক-পরিমিতি ইত্যাদি মানবিক ও সুকুমার গুণাবলি প্রত্যেক ছাত্রের মধ্যে বিকশিত করা, প্রত্যেক ছাত্রের মাঝে সুন্দর-অসুন্দরের গভীরতম অনুভব জাগ্রত করা, খেদমতে খালক, শিক্ষকের খেদমত, সাথীদের হক, পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলা ইত্যাদি হল- মাদরাসা শিক্ষার উদ্দেশ্য।

 

উলামায়ে দেওবন্দের কিছু আখলাকি বৈশিষ্ট্য, যা ধরে রাখা দরকার

১. তাকওয়া-তাহারাত, শৃঙ্খলা-সুরুচি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পরিশীলিত ভাষা, ভদ্র-মার্জিত ব্যবহার, মেহমানদারি, সাদেগী-সরলতা ও মেহনত-পছন্দী দেওবন্দী উলামা-তলাবা ও মাদারিসের বৈশিষ্ট্য। দেওবন্দীরা হাসিমুখে কষ্টের জীবন আপন করে নেয়।

২. অবদানের স্বীকৃতি। বিরোধী পক্ষের কোনো অবদান থাকলে তার স্বীকৃতি দেওয়া, বিরোধীদের সঙ্গেও আচরণ-উচ্চারণে ভদ্রতা উলামায়ে দেওবন্দের অনন্য বৈশিষ্ট্য।

৩. স্বাধীনচেতা মনোভাব। এই চেতনায় উলামায়ে দেওবন্দ বেনজির। কেউ যখন মাঠে নেই, তখনও বৃটিশদের বিরুদ্ধে তারাই ছিলেন মাঠে। তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো চির স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। তাদের প্রতিষ্ঠানে ক্ষুধা-দারিদ্র্য কবুল, কিন্তু পরাধীনতা নয়।

৪. নির্ভয়ে-নির্দ্বিধায় সাহসের সাথে হক কথা বলা। নির্ভিকভাবে দ্বীনী কাজ করা, সরকারের তোষামোদি না করা- উলামায়ে দেওবন্দের বৈশিষ্ট্য।

৫. যুহদ-এস্তেগনা, স্বল্পেতুষ্টি, ইখলাস ও লিল্লাহিয়াত- দেওবন্দী আলেম ও প্রতিষ্ঠানের বৈশিষ্ট্য। এ বৈশিষ্ট্য ছাড়া দেওবন্দী প্রতিষ্ঠান টিকতেই পারে না।

 

উলামায়ে দেওবন্দের কিছু ইলমী বৈশিষ্ট্য

১. এ‘তেমাদ আলা ফাহমিস সালাফ। সালাফে সালেহীনের প্রতি বিরক্তি-অনাস্থা গোমরাহীর দরজা খোলে। তাই কুরআন-হাদীসের যে ব্যাখ্যা তাঁরা বুঝেছেন, তার উপর অবিচল থাকা আহলে সুন্নতের বৈশিষ্ট্য। তাঁরা সালাফ থেকে জুযই মাসআলা যেমন গ্রহণ করেন, ‘মানহাজুল এস্তেম্বাত’ও গ্রহণ করেন। কিতাবুল্লাহ ও রিজালুল্লাহ একসঙ্গে নিয়ে চলেন। বা-সনদ ও মুত্তাকী উস্তাযগণের সোহবত থেকে দ্বীন শেখার নীতি অনুসরণ করেন। আহলে ইলম মুরব্বির প্রত্যক্ষ তত্ত¡াবধানে দ্বীনী কাজ করতে পছন্দ করেন।

২.الجمع بين العقل والنقل  অর্থাৎ দ্বীনের ভিত্তি নকলি বিষয়ের উপর, তবে আকল তার খাদেম। শাহ ওয়ালিউল্লাহ রাহ. এবং হযরত নানুতুবি রাহ.-এর রচনায় যুগের চাহিদা অনুসারে দ্বীন উপস্থাপনে ‘আকল’কে খাদেম হিসাবে গ্রহণের বিপ্লবী নজির বিদ্যমান।

৩. ইলমের গভীরতা, দলীলপ্রিয়তা, তাহকীকী মাদ্দাহ। কাজের ময়দানে শরয়ী দলীল সকল আহলে সুন্নতের মতো উলামায়ে দেওবন্দের মূল শক্তি। নিজ ফনের বাইরে অন্য ফনে দখল না দেওয়া তাদের বৈশিষ্ট্য। ইলম চর্চার মাধ্যমে তারা সাতহিয়্যাত থেকে দূরে থাকা জরুরি মনে করে।

৪. এতেদাল। দ্বীনের ব্যাখ্যা, আকীদা, আমল ও আখলাক সকল ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা ও ভারসাম্য বজায় রাখা। ইফরাত-তাফরীত ও বাড়াবাড়ি-ছাড়াছাড়ি থেকে দূরে থাকা। মানসূস আমলে শরীয়ত যতটুকু যা বলেছে, ততটুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকা। আর তাতবীকী ময়দানে বাড়াবাড়ি-শিথিলতা, তাছাহুল-তাশাদ্দুদ থেকে বিরত থাকা।

৫. আসবাবে ইলমের আজমত ও মহব্বত।

৬. উস্তায-শাগরিদ সম্পর্ক। শ্রদ্ধা ও স্নেহে অনন্য কওমী মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক। এখানে আকাবির ও আসাতেজায়ে কেরামের মহব্বতের ঝরনা চির বহমান।

৭. আরবী ভাষা ও সরাসরি হাদীস, তাফসীর, ফিকহে মুদাল্লাল এবং তদসংশ্লিষ্ট ফনের প্রতি উলামায়ে দেওবন্দের আগ্রহ অন্য সব ফনের চেয়ে বেশি।

৮. ভুল জাহির হলে হক গ্রহণে বিব্রত না হওয়া। খলীল আহমদ সাহারানপুরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি লিখেছেন-

إنا لا نتكلم بكلام ولا نقول قولا في الدين إلا وعليه عندنا دليل من الكتاب أو السنة، أو إجماع الأمة، أو قول من أئمة المذهب، ومع ذلك لا ندعي أنا مبرؤون من الخطأ والنسيان في ضلة القلم وزلة اللسان، فإن ظهر لنا أنا أخطأنا في قول، سواء كان من الأصول أو الفروع، فما يمنعنا الحياء أن نرجع عنه، ونعلن بالرجوع، كيف لا؟ وقد رجع أئمتنا رضوان الله عليهم في كثير من أقوالهم،...

فلو ادعى أحد من العلماء أنا غلطنا في حكم، فإن كان من الاعتقاديات فعليه أن يثبت بنص من أئمة الكلام، وإن كان من الفرعيات فيلزم أن يبني بنيانه على القول الراجح من أئمة المذاهب، فإذا فعل ذلك فلا يكون منا إن شاء الله تعالى إلا الحسنى والقبول بالقلب واللسان، وزيادة الشكر بالجنان والأركان.

দ্বীনী বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহ ও ইজমার দলীল ছাড়া, অতঃপর কোনো ইমামে মাযহাবের মত ছাড়া আমরা কথা বলি না। সাথে সাথে এই দাবিও করি না যে, আমরা ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে। যদি প্রকাশ পায়, মৌলিক কিংবা সাধারণ মাসআলার কোনো বিষয়ে আমরা ভুল করেছি, তবে লজ্জার কারণে রুজু করতে এবং তা ঘোষণা করতে আমরা দ্বিধা করি না। কেনই বা দ্বিধা করব? আমাদের ইমামগণও তো বহু মাসআলায় রুজু করেছেন! সুতরাং আমরা ভুল করেছি বলে যদি কোনো আলেম দাবি করেন, তবে আকীদার মাসআলা হলে ইলমুল আকাইদের ইমামগণের মতামতসহ দাবি প্রমাণ করুন। ইজতিহাদী মাসআলা হলে মাযহাবের ইমামগণের অগ্রগণ্য মত দ্বারা প্রমাণ করুন; আমরা সর্বান্তকরণে মেনে নেব এবং শুকরিয়া আদায় করব।” -মুকাদ্দিমা, আলমুহান্নাদ আলাল মুফান্নাদ, পৃ. ৪২-৪৩

 

আকাবিরে দেওবন্দের ইলম ও ইয়াকীন

ইলম, আমল ও আখলাকে কামেল হওয়া আকাবিরে দেওবন্দের বৈশিষ্ট্য। ফকীহুন নফস রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী রাহ. ছিলেন তাসাউফের ময়দানে হাজ্বী এমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী রাহ.-এর মুরিদ। গাঙ্গুহী রাহ. এক পত্রে হাজ্বী ছাহেব রাহ.-কে বলেন, আপনার সান্নিধ্যের ওসিলায় এখন আমার হালত হল :

১. শরীয়তের কোনো বিষয়ে তাআরুজ-বৈপরিত্য অনুভব হয় না।

২. শরীয়ত এখন তবিয়তে পরিণত হয়েছে।

৩. সজ্জনের বাহবা আর নিন্দুকের ছি ছি একরকম লাগে। (তাযকিরাতুর রশীদ ২/২৩ আংশিক)

এই পত্র অনুসারে উলামায়ে দেওবন্দের ইলমী মাকাম এই হবে যে-

১. শরীয়তের কোনো বিষয়ে তাদের দিলে কোনো খটকা থাকবে না। কেউ প্রশ্ন তুলে তাদের আটকাতে পারবে না- এই পরিমাণ ইলমী গভীরতা ও তাহকীক, পড়াশোনা ও চিন্তা-গবেষণা হওয়া উচিত।

২. আমল-ইবাদত তাদের এত প্রিয় যে, শরীয়তের যাবতীয় হুকুম তাদের মনপুত। দ্বীনী বিধান মানার মধ্যেই তাদের প্রশান্তি। তাদের আকল ও তবিয়ত শরীয়ত ও সুন্নাহপরিপন্থী বিষয় কবুল করে না।

৩. তেমনি তাদের মানসিক জগৎ আল্লাহ তাআলা এবং তাঁর হুকুম ব্যতীত আর সবকিছু থেকে বেনিয়ায। তাই দ্বীনী কাজে নিন্দুকের নিন্দায় তাদের কিছু আসে যায় না। কারো সস্তা প্রশংসায় তাঁরা বিভ্রান্ত হন না।

মোটকথা, উলামায়ে দেওবন্দের প্রকৃত উদাহরণ তিনি, যিনি কুরআন-সুন্নাহ বুঝতে ও ব্যখ্যা করতে সক্ষম, সালাফ ও খালাফের ইলমী তাহকীকাত সম্পর্কে যিনি অবগত, যিনি দলীলের আলোকে জীবন-সমস্যার সমাধান করতে পারেন এবং হক ও বাতিল নির্ণয় করে বাতিল খণ্ডন করতে জানেন; যার মাঝে যুহদ-তাকওয়া, আখলাক ও ইনাবত ইলাল্লাহ আছে- এমন জ্ঞানী-গুণী আর পূত-পবিত্র চরিত্রের আদর্শ মানুষকে আলেম বলা হয়। এমন আলেম-ই ওয়ারিসে নবী।

এই হল সালাফে আউয়াল তথা সাহাবায়ে কেরাম, তাঁদের অনুসারী তাবেয়ীন, তাবে-তাবেয়ীন থেকে যুগপরম্পরায় প্রবাহিত আকাবির ও আসলাফের কিছু বৈশিষ্ট্য। দেওবন্দ ও দেওবন্দিয়ত বলতে এসকল যোগ্যতা ও গুণের সমষ্টিকেই বোঝানো হয়ে থাকে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সালাফে সালেহীনের পথে চলার এবং তাঁদের দ্বীনী বৈশিষ্ট্যে নিজেদেরকে সজ্জিত করার তাওফীক দান করুন, মাসলাকে আকাবিরে দেওবন্দের উপর টিকে থাকার হিম্মত নসিব করুন- আমীন।

 

وآخر دعوانا أن الحمد لله رب العلمين.

 

 

 

advertisement