সফর ১৪২৯   ||   ফেব্রুয়ারি ২০০৮

বীরত্ব, নবী-প্রেম ও মানুষের প্রতি কল্যাণকামিতা

আবু বকর সিরাজী

১.

হযরত আলী রা. একদিন উপস্থিত লোকদের উদ্দেশ্য করে বললেন, হে লোক সকল! সাহাবীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় বীর পুরুষ কে ছিলেন? উপস্থিত লোকেরা উত্তরে বললেন, আমীরুল মুমেনীন আপনিই সবচেয়ে বড় বীর পুরুষ। হযরত আলী রা. বললেন, একথা ঠিক যে, আমি যে দুশমনেরই মোকাবেলা করেছি তার কাছ থেকে আমি আমার হক আদায় করে ছেড়েছি তবে আমি সবচেয়ে বড় বাহাদুর নই। লোকেরা বলল, তাহলে আপনিই বলুন সবচেয়ে বড় বাহাদুর কে? আলী রা. বললেন, সবচেয়ে বড় বাহাদুর হলেন হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা.। বদরের যুদ্ধে আমরা যখন রাসূলের জন্য ছাউনি বানালাম তখন আমরা পরামর্শ করলাম যে, আমাদের মধ্য থেকে কে রাসূলের সাথে অবস্থান করবে, যিনি মুশরিকদের আঘাত প্রতিহত করবেন? আল্লাহর কসম! সে সময় কেউ-ই এ দায়িত্ব গ্রহণের সাহস করেনি। কিন্তু হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. একাই দুশমনের বিরুদ্ধে তরবারি নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। যে কেউ রাসূলের দিকে অগ্রসর হত তিনি তার দিকে ধেয়ে যেতেন এবং তাকে প্রতিহত করতেন। সেদিন প্রমাণিত হয়েছে তিনিই হলেন সবচেয়ে বড় বীর।

২.

হাফেয আবুল কাশেম তাবারানী রহ. হযরত জারীর রা.-এর একটি আশ্চর্য ঘটনা বর্ণনা করেছেন যে, একবার তিনি তার গোলামকে একটি ঘোড়া ক্রয়ের নির্দেশ দিয়েছিলেন। গোলাম তিনশ দেরহামে একটি ঘোড়া ঠিক করল এবং মূল্য পরিশোধের জন্য মালিককে সাথে নিয়ে আসল।

হযরত জারীর রা.কে ঘোড়ার মূল্য সম্পর্কে অবহিত করা হল। কিন্তু ঘোড়া দেখে তিনি অনুমান করলেন, এর মূল্য তিনশ দেরহামের বেশি হবে। তিনি তখন ঘোড়ার মালিককে বললেন, তোমার ঘোড়ার মূল্য তিনশ দেরহামের বেশি হবে, তুমি কি এটা চারশ দেরহামে বিক্রি করবে? বিক্রেতা বলল, সেটা আপনার ইচ্ছা। হযরত জারীর রা. বললেন, তোমার ঘোড়ার মূল্য চারশ দেরহামেরও বেশি, এটাকে পাঁচশ দেরহামে বিক্রি করবে? ঘোড়ার মালিক বলল, আমি রাজি। এভাবে জারীর রা. ঘোড়ার ওই মূল্য আটশ দেরহাম পর্যন্ত বৃদ্ধি করলেন এবং ওই পরিমাণ দেরহাম মালিককে বুঝিয়ে দিলেন।

তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, বিক্রেতা নিজেই তিনশ দেরহামে বিক্রি করতে রাজি ছিল সেখানে আপনি আটশ দেরহাম দিতে গেলেন কেন? হযরহ জারীর রা. বললেন, মূল্য সম্পর্কে ঘোড়ার মালিকের ধারণা ছিল না, আমি তার কল্যাণকামী হয়ে এর যথার্থ মূল্য পরিশোধ করলাম। কেননা আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ওয়াদা করেছিলাম যে, আমি সর্বদা মুসলমানের কল্যাণ কামনা করে যাব। আমি রাসূলের কাছে কৃত ওয়াদা রক্ষা করেছি।

৩.

হযরত ওয়াহাব রা. একজন সাহাবী ছিলেন। মদীনার অদূরে এক গ্রামে বাস করতেন। বকরী চরিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। ওহুদ যুদ্ধের সময় মদীনায় এসে জিজ্ঞাসা করলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোথায় গিয়েছেন? উত্তর এল, তিনি মদীনার অদূরে ওহুদ যুদ্ধে ব্যস্ত আছেন। হযরত ওয়াহাব রা. বকরীগুলো সেখানেই ফেলে রেখে রাসূলের সাথে ওহুদ যুদ্ধে শরীক হলেন। সেখানে তখন ভয়ঙ্কর যুদ্ধ চলছিল। কাফেরদের এক বাহিনী রাসূলের দিকে এগিয়ে এল। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, যে ব্যক্তি এদের প্রতিহত করবে সে আমার সাথে জান্নাতে থাকবে। ঘোষণা শুনে হযরত ওয়াহাব রা. তীব্রভাবে তরবারী চালানো শুরু করলেন এবং কাফেরদেরকে তাড়িয়ে দিলেন। কাফেররা পুনরায় হামলা করলে তিনি আবার বীরবিক্রমে তাদেরকে প্রতিহত করলেন। তৃতীয়বার এমন হল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান করলেন। এই সুসংবাদ শুনতে পেয়ে তিনি কাফেরদের ভীড়ে ঢুকে পড়লেন এবং বীরবিক্রমে যুদ্ধ করতে করতে শাহাদতবরণ করলেন।

হযরত সাদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রা. বর্ণনা করেন, আমি ওয়াহাবের মত বাহাদুর আর কোনো যুদ্ধে দেখিনি। তার শাহাদতের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ইরশাদ করতে শুনেছি, আল্লাহ তাআলা তোমার প্রতি সস্ত্তষ্ট হয়েছেন, আর আমিও তোমার প্রতি সন্তুষ্ট।

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নিজ হাতে দাফন করেছিলেন।

 

 

advertisement