সফর ১৪৪১   ||   অক্টোবর ২০১৯

পরিণতি

মুহাম্মাদ আশিক বিল্লাহ তানভীর

বড়দের সর্বদা ভক্তি-শ্রদ্ধা ও সম্মান করতে হয়। বিশেষ করে তাদের সাথে যেন কখনও বেয়াদবী না হয়ে যায়- সেদিকে খুব খেয়াল রাখতে হয়। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

ليس منا من لم يرحم صغيرنا ويعرف شرف كبيرنا.

যে ছোটদের স্নেহ করে না এবং বড়দের সম্মান করতে জানে না- সে আমার উম্মত নয়। -জামে তিরমিযি, হাদীস ১৯২০; আল আদাবুল মুফরাদ, হাদীস ৩৫৫; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২৩২৯

শ্রদ্ধা না করার জন্য যদি এত বড় ধমকি আসে, তাহলে বেয়াদবী হয়ে গেলে কী অবস্থা হবে! বড়দের সাথে বেয়াদবী করলে বড়সড় মাশুল গুণতে হয়- দুনিয়াতেও এবং আখেরাতেও।

একটি ঘটনা শোনো-

হযরত সাঈদ বিন যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন অনেক বড় একজন সাহাবী। দুনিয়ার যমিনে বসেই সৌভাগ্যবান যে দশজন নবীজীর পাক যবানে জান্নাতী হওয়ার সুসংবাদ লাভে ধন্য হয়েছিলেন, তিনি ছিলেন তাদের একজন। বুঝতেই পারছ, তিনি কত বড় সাহাবী! কত উঁচু তাঁর মর্যাদা!

এছাড়া তাঁর আরেকটি গুণ হল, তিনি ছিলেন ‘মুস্তাজাবুদ দাওয়াত’। অর্থাৎ আল্লাহর কাছে তিনি যা চাইতেন, আল্লাহ তাআলা তা কবুল করে নিতেন। তাহলে আল্লাহ তাকে কত ভালোবাসতেন!

আরওয়া বিনতে উয়াইস নামের এক নারী ছিল। বেশ ঝগড়াটে স্বভাবের। হযরত সাঈদের জমির পাশেই ছিল তার জমি। কয়েকদিন যাবতই সে হযরত সাঈদের সাথে জায়গা-জমি নিয়ে গায়ে পড়ে বিরোধে জড়াতে চাচ্ছে। নবীজীর এ সাহাবী নাকি তার জমিতে গিয়ে দেয়াল তুলেছেন!

ভারি আশ্চর্যের কথা! যেই শোনে, সেই অবাক হয়। সবার একই কথা- হযরত সাঈদের মতো এমন ভালো মানুষ তোমার জমিতে দেয়াল তুলতে যাবেন কোন্ দুঃখে! মহিলার কথা কেউই মেনে নিতে পারছে না।

কিন্তু না, মহিলা কোনোভাবেই ক্ষান্ত হবার নয়। সে গিয়ে অভিযোগ দায়ের করল তৎকালীন মদীনা মুনাওয়ারার গভর্নর মারওয়ানের কাছে।

মারওয়ান হযরত সাঈদকে জিজ্ঞাসা করলেন- বিষয়টি কী? হযরত সাঈদ কী আর বলবেন! মনের কষ্টে শুধু এতটুকু বললেন, আমি! আমি কিনা তার জমি জবর দখল করে রাখব, যে সরাসরি নবীজী থেকে এ ব্যাপারে হাদীস শুনেছে!

-আপনি নবীজী থেকে কী হাদীস শুনেছেন? মারওয়ান প্রশ্ন করলেন।

: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমি নবীজীকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে এক বিঘত পরিমাণ জায়গা দখল করবে, কিয়ামতের দিন তার গলায় সাত তবক যমিন ঝুলিয়ে দেওয়া হবে। আর যে ব্যক্তি কোনো গোত্রের অনুমতি ব্যতীত তাদের নেতৃত্ব গ্রহণ করবে তার উপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হবে। আর যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করবে আল্লাহ পাক তার ঐ সম্পদে কোনো বরকত রাখবেন না।

-না, একথা শোনার পর আমার আর কোনো প্রমাণের প্রয়োজন নেই।

মারওয়ান লোকদের বলে দিলেন, তোমরা হযরত সাঈদ ও আরওয়ার মধ্যে একটি সমঝোতা করে দাও।

লোকেরা হযরত সাঈদের শরণাপন্ন হলে তিনি বলেন, তোমরাই বল, কী হিসাবে আমি আরওয়ার জমি দখল করতে যাব! নবীজীর হাদীস শুনে ভয়ে তো আগ থেকেই আমি ছয়শ হাত জমি তাকে দিয়ে রেখেছি। তোমরা বিষয়টি রাখ। আল্লাহই এর ফায়সালা করবেন।

মহিলা এতকিছুর পরও দমল না। সে তার কোন্দল জিইয়ে রাখার জন্য এদিক সেদিক দৌড়ঝাঁপ অব্যাহত রাখল। বিভিন্ন মজলিসে মজলিসে গিয়ে নবীজীর এ সাহাবীর বিরুদ্ধে কুৎসা রটাতে থাকল।

একবার সে মুহাম্মাদ বিন আমর ইবনে হায্ম-এর নিকট গিয়ে বলে- শুনেছ, সাঈদ বিন যায়েদ আমার জমিতে এসে দেয়াল তুলেছে। তুমি তার সাথে কথা বল। সে যদি জমি ফিরিয়ে না দেয় তবে কিন্তু আমি মসজিদে নববীতে গিয়ে তার নামে বদনাম ছড়িয়ে দিব।

এ শুনে তো মুহাম্মাদ বিন আমরের মাথায় হাত! আরওয়া, তুমি এসব কী বলছ আবোল তাবোল! দেখ আরওয়া, তুমি এমনটি করতে যেও না। নবীজীর সাহাবী তোমার উপর যুলুম করবেন; তোমার জমি দখল করে রাখবেন- এটা হতেই পারে না। তুমি যদি এমন কিছু কর তাহলে তিনি মনে খুব কষ্ট পাবেন। এতে তোমার ভীষণ ক্ষতি হয়ে যাবে।

কিন্তু কে শোনে কার কথা! আরওয়া তার মতোই রইল। মুহাম্মাদ বিন আমরের এত উপদেশে সে কান দিল না। গেল আরেক জায়গায়। সেখানেও সেই একই সুর তুলল- দেখ, সাঈদ কিন্তু আমার জমি দখল করে খাচ্ছে। ভালোয় ভালোয় জমি ফিরিয়ে দিতে বল। না হয় আমি মসজিদে নববীতে তার নামে বদনাম ছড়িয়ে দিব।

সবাই তাকে বোঝাল। দেখ, এমনটি করো না। পরিণাম ভালো হবে না। নবীজীর সাহাবীর বিরুদ্ধে কিছু করতে চাইলে তোমাকেই এর খেসারত দিতে হবে। কিন্তু সে তার জেদে ছিল অনড়। কী আর করার! নবীজীর সাহাবীর মান-ইজ্জত তো হেফাযত করতে হবে!! কয়েকজন মিলে গেল হযরত সাঈদের কাছে। তিনি তখন তার জমিতে কাজ করছিলেন। দূর থেকে দেখেই তিনি বুঝে ফেললেন- তারা কেন আসছে। বললেন,

-তোমরা কী মতলবে এসেছ, আমি বুঝতে পেরেছি।

: জী জী, আরওয়ার বিষয়েই আমরা এসেছি। সে বলে বেড়াচ্ছে যে, আপনি তার জমি দখল করে তাতে দেয়াল তুলে দিয়েছেন। সে হলফ করেছে, তাকে জমি ফেরত দেওয়া না হলে মসজিদে নববীতে  গিয়ে সে আপনার বদনাম রটাবে। বিষয়টি আপনাকে জানিয়ে রাখলে ভালো হবে বলে আমরা আপনার কাছে এসেছি।

-তোমাদের কী মনে হয়! আমি তার জমি দখল করতে পারি?! যে কিনা সরাসরি নবীজীকে বলতে শুনেছে-

‘যে ব্যক্তি দুনিয়ায় কারো জমি এক বিঘত পরিমাণ দখল করে রাখবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার গলায় সাত তবক যমিন ঝুুলিয়ে দিবেন।’

ঠিক আছে, সে আসুক। যতটুকু তার দাবি সবটুকু নিয়ে যাক।

এভাবে হযরত সাঈদ ইবনে যায়েদ রা. ঐ নারীর দাবি অনুযায়ী জমি ছেড়ে দিলেন। কিন্তু হলে কী হবে? এরপর তাঁর ভেতর থেকে যে ‘আহ্’ শব্দটা বেরিয়ে এল তা পৌঁছে গেল সরাসরি আরশে আযীমে। হযরত সাঈদ বললেন, ইয়া আল্লাহ! মহিলাটি বলছে, আমি নাকি তার উপর যুলুম করেছি। যদি সে তার দাবিতে মিথ্যাবাদী হয়, তবে তুমিই এর বিচার কর। হে আল্লাহ, মুসলিম সমাজে প্রমাণ করে দাও যে, আমি তার উপর যুলুম করিনি।

এরপর হল কি শুনবে?

খুব প্লাবন হল। অনেক কিছুই তাতে ভেসে গেল। জমি থেকে মাটিও সরে গেল ঢের। এখন সবাই স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে হযরত সাঈদের জমির নিশানা। কারো আর বুঝতে বাকি রইল না, মহিলাটি ধানাই-পানাই করে জায়গাটা হাতিয়ে নিয়েছে।

হযরত সাঈদ তো জমি যতটুকু ছাড়ার ছেড়েই দিয়েছেন। আরওয়াকে এসে জায়গা নিয়ে নিতে বলেছেন শুনে সে তো খুশিতে বাগবাগ। বুঝল না যে, আজকের এ জায়গাটাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অন্যের কিছু অন্যায়ভাবে ভোগ করা যে কত খারাপ কথা তা আর সে চিন্তা করল না। সম্পদের মোহে অন্ধ হয়ে গেলে যায় হয়! তাড়াতাড়ি গিয়ে সে জমি দখল করল। হযরত সাঈদের দেয়াল ভেঙ্গে দিল। নিজে থাকার জন্য ঘর তৈয়ার করল। তাতে বসবাস আরম্ভ করল। এক দিন-দু’দিন, এক সপ্তাহ-দু’সপ্তাহ; এভাবে একমাস যেতে না যেতেই আসমানী আযাব নেমে এল। এখন সে আর চোখে দেখছে না। দৃষ্টি হারিয়ে অন্ধ হয়ে গেল। এখন তাকে চলতে হয় পরের ভরসায়।

তার এক সেবিকা ছিল। সেই তাকে ধরে ধরে নিয়ে চলত। এক রাতে যা হল- আরওয়ার ঘুম ভাঙ্গল। বাইরে যেতে হবে। সেবিকাকে সে আর জাগাল না। একাকী ঘর থেকে বের হল। ঘরের পাশেই ছিল একটি কূপ। বের হতে না হতেই ধপাস করে পড়ে গেল সেই কূপে। আর তাতেই তার প্রাণপাখি উড়ে গেল জীবনের তরে।

আল্লাহ তাআলা প্রমাণ করে দিলেন, নবীজীর সাহাবী হযরত সাঈদ ছিলেন সত্য ও ন্যায়ের পথে। তিনি কারো উপর কোনো যুলুম করেননি; বরং ছাড় দিয়েছেন বহুত। আর আরওয়া যা করেছে, ঠিক করেনি। তাই তাকে এর জন্য মাশুল দিতে হয়েছে।  আর সাহাবীর সাথে বেয়াদবীর কারণে তা হয়েছে চরম।

[দ্রষ্টব্য : সহীহ বুখারী, হাদীস ২৪৫২, ৩১৫৮ (ফাতহুল বারী); সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৬১০; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৬৪০, ১৬৪২, ১৬৪৯; হিলয়াতুল আউলিয়া ১/৯৭;  সিয়ারু আলামিন নুবালা, সা‘দ ইবনে মালেক ও সাঈদ ইবনে যায়েদ-এর তরজমা দ্রষ্টব্য]

দেখলে তো, কারো কিছু অন্যায়ভাবে ভোগ করা কত খারাপ কথা! আর বড়দের সাথে বেয়াদবীর শাস্তিও কত ভয়াবহ!

চলো আজ থেকে আমরা পণ করি- কখনও অন্যের কোনো কিছু অনুমতি ছাড়া ধরব না। অন্যায়ভাবে কারো কিছু ভোগ করব না। কারো মনে কষ্ট দিব না। কারো কোনো ক্ষতি করব না। সবসময় সবার উপকার করব। আল্লাহর হকের পাশাপাশি বান্দার হকের প্রতিও যত্নবান হব। বড়দের সম্মান করব। ছোটদের স্নেহ করব। বড়দের কথা শুনব। বিশেষ করে তাদের সাথে যেন বেয়াদবী না হয়ে যায় সেদিকে খুব খেয়াল রাখব।

এসো আমরা আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করি- আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সবার সাথে ভালো ব্যবহার করার তাওফীক দিন। ছোটদেরকে আদর- স্নেহ করার তাওফীক দান করুন। বড়দের যথাযথ সম্মান করার তাওফীক দান করুন। কারো মনে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত রাখুন। বিশেষ করে কারো সম্পদে অন্যায় হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকার তাওফীক দিন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এমন ভয়াবহ পরিণতি থেকে হেফাযত করুন- আমীন।

 

 

advertisement