সফর ১৪৪১   ||   অক্টোবর ২০১৯

প্রথম আলো

মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম

সমগ্র বিশ্ব গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত। মানুষ তার সৃষ্টিকর্তাকে চেনে না। সে দুনিয়ায় কেন এসেছে তা জানে না। জীবনের পরিণাম সম্পর্কে সে সম্পূর্ণ উদাসীন। আরও হাজারও জীবজন্তুর মত সেও এক জীব মাত্র। তার বুদ্ধি-বিবেক আছে, কিন্তু তার যথার্থ ব্যবহার করে না। তার ব্যবহার জৈবিক চাহিদা পূরণেই সীমাবদ্ধ। সে তা পূরণও করে অন্যান্য জীবজন্তুর মত। পেশিশক্তিই সব। যার গায়ে যত জোর, সব সুযোগ-সুবিধায় তার তত অধিকার। অন্যের সবকিছুতে তার অবাধ মালিকানা। সুচিন্তা ও সুবোধ উপেক্ষিত। ভালো-মন্দের পার্থক্যবোধ বেজায় নির্বুদ্ধিতা। সর্বত্র জাহালাত ও অজ্ঞতার জয়জয়কার এবং জাহিলিয়াত ও দুষ্কর্মের আধিপত্য। এভাবে চাপ চাপ অন্ধকারে আচ্ছন্ন সারা জগৎ। সে অন্ধকার শত শত বছরের। মানুষ তাতে পুরোপুরি অভ্যস্ত হয়ে গেছে। ফলে তা থেকে মুক্তির কোনও উদ্যোগ নেই। নেই মুক্তিলাভের চিন্তা ও প্রয়োজনবোধও। এরকম পাশব জীবনচর্চার পরিণতি মনুষ্য জীবনের বিলুপ্তি ছাড়া আর কিছুই নয়। সে বিলুপ্তির কিনারায় তারা ইতোমধ্যে পৌঁছেই গেছে। কিন্তু এখনই তাদের বিলোপ করা চলে না। যে অমিত সম্ভাবনা মানবস্বভাবের মধ্যে নিহিত তার পরিপূর্ণ বিকাশের এখনও অনেক বাকি। মানুষকে তার বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় আরও বহুদূর এগিয়ে যাওয়ার রয়েছে। শুভবুদ্ধির অনুশীলন ও মানবিক গুণাবলীর বিকাশ সাধনের মাধ্যমে অকল্পনীয় উচ্চতায় তার পৌঁছার রয়েছে, যেখানে উপনীত এই মর্ত্যরে মানুষকে স্বাগত জানানোর জন্য জান্নাতুল ফিরদাউস উদ্গ্রীব হয়ে ওঠে। এমনকি খোদ এই মাটির পৃথিবীও জান্নাতের শান্তি ও স্বস্তির নমুনায় পরিণত হয়ে যায়।

সেই দূরবিস্তৃত সম্ভাবনার বাস্তবায়নকল্পে মানুষকে আরও অনেক কাল বেঁচে থাকতে হবে। কিন্তু যে গভীর অন্ধকারে সে নিমজ্জিত, তাতে তার পক্ষে কতদূর কী করা সম্ভব? তার সামনে কোনও পথ নেই। তার চোখ অন্ধ। তার মস্তিষ্ক স্থবির। তার অন্তকরণে মরিচা পড়ে গেছে। এক প্রাণশক্তিহীন জড়পদার্থে পর্যবসিত এ মানুষ কী-ই বা করতে পারবে? তার কিছু করতে হলে এবং তাকে দিয়ে কিছু করাতে চাইলে চাই তার প্রাণশক্তির উজ্জীবন।

মানুষের সে উজ্জীবন ও প্রকৃত হায়াত লাভের একমাত্র উপায় ঐশ্বরিক আলোর স্পর্শ। এমন এক আলো, যা পাওয়া সম্ভব কেবল আল্লাহ তাআলার তরফ থেকেই। তিনিই যখন চান এবং যাকে চান, নিজের সে আলো দ্বারা উদ্ভাসিত করে থাকেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-

یَهْدِی اللهُ لِنُوْرِهٖ مَنْ یَّشَآءُ.

আল্লাহ যাকে চান নিজ আলোর দিশা দিয়ে থাকেন। -সূরা নূর (২৪) : ৩৫

তিনি না দিলে কারও পক্ষে কোনওভাবেই সে আলোর সন্ধান পাওয়া সম্ভব নয়। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন-

وَ مَنْ لَّمْ یَجْعَلِ اللهُ لَهٗ نُوْرًا فَمَا لَهٗ مِنْ نُّوْرٍ.

বস্তুত আল্লাহ যাকে আলো না দেন, তার নসীবে কোনও আলো নেই। -সূরা নূর (২৪) : ৪০

এ আলো আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে নিজ নবী-রাসূলগণের মাধ্যমে পৃথিবীতে পাঠিয়ে থাকেন। গাছপালা, তরুলতা যেমন সূর্যালোকের ছোঁয়ায় জীবন পায় এবং প্রাণীকুল যেমন এ আলোকস্পর্শে সঞ্জীবিত ও পরিপুষ্ট হয়, তেমনি মানবাত্মার সঞ্জীবন ও পরিপুষ্টির একমাত্র অবলম্বন ঐশ্বরিক আলোকধারা। হযরত ঈসা মাসীহ আলাইহিস সালামের পর কয়েক শতাব্দী যাবৎ তো সে আলোর প্রবাহ বন্ধ রয়েছে। এমনিতেও তা কার্যকর ছিল গোত্রবিশেষের জন্য; কেবলই বনী ইসরাঈলের জন্য। এমনিভাবে বিশে^র যেখানেই যে-কোনও কালে নবুওয়াতের আলো প্রজ্বলিত হয়েছে, তা সেই এলাকায় সীমিত কালের জন্যই কার্যকর থেকেছে। তারপর সে অঞ্চল ডুবে গেছে গভীর অন্ধকারে। সুতরাং এখন অন্ধকারাচ্ছন্ন কেবল শাম ও আরবই নয়, নয় কেবল প্রাচ্য এবং কেবল পাশ্চাত্য; বরং সমগ্র পৃথিবীই অন্ধকারে নিমজ্জিত। এখন সময় এসেছে এমন এক নবুওয়াতী সূর্যের, যার আলো ছড়িয়ে পড়বে বিস্তীর্ণ এ ভুবনের সবখানে। কেবল ভূমধ্য সাগরের এপার-ওপার বা লোহিত সাগর বিধৌত উভয় প্রান্তের লোকালয়ই নয়; বরং প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগর এবং আটলান্টিকের উজান ভাটির সব জনপদ সমানভাবে সে আলোকধারায় ¯œাত হতে থাকবে। লওহে মাহফূযে এ মহা আলোর ধারক-বাহকরূপে যে মহা নক্ষত্রের উদয় নির্ধারিত ছিল, তিনি আর কেউ নন, খতমে নবুওয়াতের ধারক মহানবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র সত্তা। এ নির্ধারণ সম্পন্ন হয়েছিল মানবসৃষ্টির সূচনাকালে। এমনকি মানব অস্তিত্বহীন সেই আদি পর্বে, যখনও পর্যন্ত প্রথম মানুষ হযরত আদম আলাইহিস সালাম সৃষ্টিই হননি।

إِنِّىْ عِنْدَ اللهِ فى أول الكتاب لَخَاتَمُ النّبِيِّيْنَ، وَإِن اۤدَم لَمُنْجَدِلٌ فِىْ طِيْنَتِه.

আমি ওই সময় আল্লাহর কাছে প্রথম কিতাবে (অর্থাৎ লাওহে মাহফূজে) সর্বশেষ নবী, যখন আদম তার মাটির ভেতর আছেন (অর্থাৎ তাঁর সৃষ্টিই হয়নি)। -সহীহ ইবন হিব্বান, হাদীস ৬৪০৪; মুসনাদুল বাযযার, হাদীস ৪১৯৯; মুসতাদরাকে হাকিম, হাদীস ৪১৭৫; শুআবুল ঈমান, বায়হাকী, হাদীস ১৩২২; শারহুস্ সুন্নাহ, বাগাবী, হাদীস ৩৬২৬; মুসনাদুশ শামিয়্যীন, তবারানী, হাদীস ১৪৫৫

সুতরাং তিনিই নবুওয়াতী আলোর প্রথম ধারক। তিনিই প্রথম, তিনিই শেষ। শত শত বছরের বিরতির পর তাঁর আবির্ভাব। সে আবির্ভাব বিশ্বনবীরূপে। বৈশি^ক নবুওয়াতের তিনিই প্রথম সূর্য আবার সর্বশেষও বটে। তাঁর পর বৈশি^ক তো নয়ই, আর কোনও আঞ্চলিক বা খ-কালীন কোনো নতুন নবীর আগমনের অবকাশ নেই এবং আগমনের প্রয়োজনও নেই।

শত শত বছরের বিরতির পর এবার প্রথম আলোর উদয় হল। সে আলোর স্পর্শে মানবাত্মা প্রাণ পেল। মানুষ তার দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেল। তার সম্মুখ থেকে অন্ধকার দূর হয়ে গেল। সে চোখ মেলে তাকাল। তাকিয়ে দেখতে পেল মুক্তির রাজপথ, যে পথে চলে তার সূচিত করার রয়েছে বুদ্ধির মুক্তি, মনুষ্যত্বের মুক্তি এবং ঘটাতে হবে তার জ্ঞানবত্তার বিকাশ। দেখতে পেল দূরস্থিত গন্তব্যও, যেখানে তাকে পৌঁছাতে হবে।

সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআলার কিতাব কুরআন মাজীদই সেই প্রথম আলো, যা মনুষ্যত্বের পুনর্জীবন ও চূড়ান্ত উৎকর্ষ-দানকল্পে ওহীর ধারাবিরতির প্রায় ছয়শ’ বছর পর আদি কিতাবে মানবসৃষ্টির আগেই নির্ধারিত সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর অবতীর্ণ হয়। অবতীর্ণ হয়ে সে মুমূর্ষুপ্রায় মানবাত্মাকে এই বলে আশ্বস্ত করে যে-

قَدْ جَآءَكُمْ مِّنَ اللهِ نُوْرٌ وَّ كِتٰبٌ مُّبِیْنٌ.

আল্লাহর পক্ষ হতে তোমাদের কাছে এক জ্যোতি ও এমন এক কিতাব এসে গেছে, যা (সত্যকে) সুস্পষ্ট করে। -সূরা মায়িদা (৫) : ১৫

সুতরাং হে মানুষ! তোমরা যদি তোমাদের মৃত আত্মায় প্রাণ সঞ্চার করতে চাও, তবে এ মহা জ্যোতিষ্কের সংস্পর্শে আস। আল্লাহ তাআলা বলেন-

اِسْتَجِیْبُوْا لِلهِ وَ لِلرَّسُوْلِ اِذَا دَعَاكُمْ لِمَا یُحْیِیْكُمْ .

আল্লাহ ও রাসূলের দাওয়াত কবুল কর, যখন তিনি (রাসূল) তোমাদেরকে এমন বিষয়ের দিকে ডাকেন, যা তোমাদেরকে জীবন দান করে। -সূরা আনফাল (৮) : ২৪

যদি আলোর পথ পেতে চাও এবং নিজ আত্মাকে অন্ধকারের আচ্ছাদন থেকে মুক্ত করতে চাও, তবে আল্লাহর পাঠানো এ আলো ও এর ধারককে অবলম্বন কর। ঘোষণা করা হয়েছে-

فَاٰمِنُوْا بِاللهِ وَ رَسُوْلِهٖ وَ النُّوْرِ الَّذِیْۤ اَنْزَلْنَا.

সুতরাং তোমরা ঈমান আন আল্লাহর প্রতি, তাঁর রাসূলের প্রতি এবং সেই আলোর প্রতি, যা আমি নাযিল করেছি। -সূরা তাগাবুন (৬৪) : ৮

এ আলোর প্রতি ঈমান আনলে এবং এর দেখানো পথে চললে কোনওরকম অন্ধকারে মানবজীবন ঢাকা থাকতে পারে না। জীবনের যে-কোনও অঙ্গন আলোকিত করার একমাত্র উপায় এর হিদায়াতমত চলা। এ আলো হিদায়াত ও পথনির্দেশ করেছে সারা জাহানের সমস্ত মানুষকে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে। মানবজীবন অন্ধকারে ঢাকা পড়ার প্রধান যত কারণ, তার প্রত্যেকটির প্রতি সে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং তার প্রতিকারের পথ বাতলে দিয়েছে।

যুগটা জাহিলিয়াতের। সবকিছু ঘোর অন্ধকারে আচ্ছন্ন। সে অন্ধকারের কারণ সর্বব্যাপী অজ্ঞতা। সুতরাং অন্ধকার থেকে মুক্তি পেতে হলে সর্বপ্রথম কাজ হবে অজ্ঞতা দূরীকরণ। কুরআন তার প্রথম বাণীতে সে বার্তাই মানুষকে দিয়েছে। ইরশাদ হয়েছে-

اِقْرَاْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِیْ خَلَقَ، خَلَقَ الْاِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ،  اِقْرَاْ وَ رَبُّكَ الْاَكْرَمُ، الَّذِیْ عَلَّمَ بِالْقَلَمِ، عَلَّمَ الْاِنْسَانَ مَا لَمْ یَعْلَمْ.

পড় তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি (সবকিছু) সৃষ্টি করেছেন। তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন জমাট রক্ত দ্বারা। পড় এবং তোমার প্রতিপালক সর্বাপেক্ষা বেশি মহানুভব। যিনি কলম দ্বারা শিক্ষা দিয়েছেন, মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন, যা সে জানত না। -সূরা আলাক (৯৬) : ১-৫

এর মোটা দাগের কথা হচ্ছে জ্ঞান আহরণ। লেখা ও পড়া জ্ঞানাহরণের প্রধান মাধ্যম। প্রথম অবতীর্ণ এ আয়াতসমূহে পড়া ও লেখার কথা বলে জ্ঞানাহরণ ও জ্ঞান বিস্তারের তাগিদ করা হয়েছে। অজানা বিষয় জান, জানার উপায় অবলম্বন কর এবং জানা বিষয় অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দাও। নিজ ব্যক্তি ও সমষ্টি থেকে অজ্ঞতা দূর কর। এভাবে গোটা জাতি জ্ঞানী ও বিদ্বান জাতিতে পরিণত হয়ে যাও।

অজ্ঞতা মাত্রই অন্ধকার। অজ্ঞতা দূর হলে অন্ধকার আপনিই দূর হয়। নিজ ব্যক্তিসত্তা ও সমাজ থেকে অন্ধকার দূর করার একমাত্র উপায় সর্বব্যাপী জ্ঞানচর্চা। এ আয়াতসমূহ সে জ্ঞানচর্চারই আহ্বান জানায়।

মানুষের অজ্ঞতা হরেক রকম। তার মধ্যে কিছু আছে মৌলিক। আগে সেগুলো দূর করা চাই। যে মৌলিক বিষয়সমূহ সম্পর্কে মানুষ বেখবর হয়ে আছে, সেগুলো সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হতে পারলে শাখাগত অজ্ঞতা সহজেই মুছে ফেলা সম্ভব। সুতরাং সর্বপ্রথম যে মৌলিক জ্ঞান অর্জনে মনোনিবেশ করতে হবে, এ আয়াতসমূহ তাও নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। সর্বপ্রথম জানতে হবে নিজ অস্তিত্বের সূচনা সম্পর্কে- আমি কে, কোথা হতে কিভাবে আসলাম এবং কে আমাকে অস্তিত্ব দিয়েছেন। এ আয়াতসমূহে জানানো হয়েছে যে, তুমি এক সৃষ্টি। সেহেতু তোমার এক সৃষ্টিকর্তা আছেন, যিনি তোমাকে তোমার পিতার ঔরসে, মায়ের গর্ভে ধাপে ধাপে সৃষ্টি করেছেন এবং এক জ্ঞানবান সৃষ্টিরূপে তোমাকে মহিমান্বিত করেছেন।

বস্তুত একজন সৃষ্টি হিসেবে নিজ সৃষ্টিকর্তাকে জানাই সর্বপ্রথম কর্তব্য। তা জানা হলে নিজ সৃষ্টির উদ্দেশ্য, পরিণতি এবং উদ্দেশ্য পূরণের জন্য করণীয় জানার পথ তৈরি হয়। তারপর করণীয় কর্মে লিপ্ত থেকে ইহজীবন সার্থক করে তোলা সম্ভব হয়। তাই সবার আগে জানতে হবে নিজ সৃষ্টিকর্তাকে।

কুরআন তার পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় সৃষ্টিকর্তার পরিচয় তুলে ধরেছে। তিনি এক অনাদি অনন্ত সত্তা। সমস্ত লয়-ক্ষয়ের ঊর্ধ্বে। তিনি সর্বজ্ঞানী ও সর্বশক্তিমান। প্রকাশ্য-গুপ্ত ও ভূত-ভবিষ্যত সবই তাঁর সমান জানা। তিনি সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা ও রক্ষাকর্তা। তিনি তাঁর সমুদয় সৃষ্টির জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় যাবতীয় উপকরণের যোগানদাতা। তিনি বিধানদাতা এবং তিনি মহাবিচারক ও ইনসাফকর্তা। জগতের কোনও কিছুই তিনি অহেতুক সৃষ্টি করেননি। তিনি যাবতীয় অহেতুকতার ঊর্ধ্বে।

সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব ও তাঁর গুণাবলী সম্পর্কে কুরআনের আলোকপাত অতি সুস্পষ্ট। এর মাধ্যমে কুরআন-পাঠক সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পায়। তার মনে বিশ্বাস জন্মায় যে, তার একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন, যিনি সর্বগুণের আধার এবং এমন সর্বগুণসম্পন্ন সৃষ্টিকর্তা কোনও কিছুই অহেতুক সৃষ্টি করতে পারেন না। কাজেই আমিও নই কোনও অহেতুক সৃষ্টি। কুরআন মানুষের ভেতর সে আত্মসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে-

اَفَحَسِبْتُمْ اَنَّمَا خَلَقْنٰكُمْ عَبَثًا وَّ اَنَّكُمْ اِلَیْنَا لَا تُرْجَعُوْنَ.

তবে কি তোমরা মনে করেছিলে যে, আমি তোমাদেরকে অহেতুক সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে আমার কাছে ফিরিয়ে আনা হবে না? -সূরা মু’মিনূন (২৩) : ১১৫

মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই উত্তর দেবে যে, না, সে কোনও অহেতুক সৃষ্টি নয়। অর্থাৎ তার জীবনের অবশ্যই কোনও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য আছে। তা কী সে লক্ষ্য-উদ্দেশ্য? আয়াতের শেষাংশে সেদিকে ইঙ্গিত রয়েছে। বলা হয়েছে, মানুষকে অবশ্যই আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে। তার মানে ইহজীবনই শেষ নয়; পরে আরেকটা জীবন আছে। আর সে জীবনের মুক্তি ও সাফল্য লাভ করাই ইহজীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য। সে লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করেই তার ইহজীবন আবর্তিত হবে। এ আত্মসচেতনতা ও বিশ্বাস তাকে জানতে উৎসাহ যোগায় যে, তাহলে তার ইহজীবন কিভাবে নির্বাহ করতে হবে?

কুরআন এ প্রশ্নেরও সুস্পষ্ট উত্তর দিয়েছে। বলে দিয়েছে, তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে কেবলই আল্লাহ তাআলার ইবাদত করার জন্য। আপন ইচ্ছায় সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর ‘আবিদ’ ও উপাসকে পরিণত হওয়াই মানবিক উৎকর্ষের সর্বোচ্চ স্তর। এর উপরে কোনও মর্যাদা নেই। এ মর্যাদা আল্লাহ তাআলা কেবল মানুষের জন্য নির্ধারণ করেছেন। কুরআন ঘোষণা করেছে-

وَ لَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِیْۤ اٰدَمَ وَ حَمَلْنٰهُمْ فِی الْبَرِّ وَ الْبَحْرِ وَ رَزَقْنٰهُمْ مِّنَ الطَّیِّبٰتِ وَ فَضَّلْنٰهُمْ عَلٰی كَثِیْرٍ مِّمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِیْلًا.

বাস্তবিকপক্ষে আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি এবং স্থলে ও জলে তাদের জন্য বাহনের ব্যবস্থা করেছি, তাদেরকে উত্তম রিযিক দান করেছি এবং আমার বহু মাখলুকের উপর তাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি। -সূরা বনী ইসরাঈল (১৭) : ৭০

অপর এক আয়াতে ইরশাদ করেন-

اَلَمْ تَرَوْا اَنَّ اللّٰهَ سَخَّرَ لَكُمْ مَّا فِی السَّمٰوٰتِ وَ مَا فِی الْاَرْضِ وَ اَسْبَغَ عَلَیْكُمْ نِعَمَهٗ ظَاهِرَةً وَّ بَاطِنَةً .

তোমরা কি লক্ষ করনি, আকাশম-লী ও পৃথিবীতে যা-কিছু আছে, আল্লাহ সেগুলোকে তোমাদের কাজে নিয়োজিত রেখেছেন এবং তিনি তার প্রকাশ্য ও গুপ্ত নিআমতসমূহ তোমাদের প্রতি পরিপূর্ণভাবে বর্ষণ করেছেন? -সূরা লুকমান (৩১) : ২০

কুরআন মাজীদে এ মর্মে আরও বহু আয়াত আছে, যার মধ্য দিয়ে মানুষের ভেতর আবদিয়াতের মূল্যবোধ সঞ্চার করা হয়েছে এবং তার আত্মসম্মানবোধ জাগ্রত করা হয়েছে। তাকে জানানো হয়েছে যে, তার মধ্যে আকল-বুদ্ধি আছে, আছে ইলম ও জ্ঞান আহরণের যোগ্যতা এবং তার রয়েছে ইচ্ছাশক্তির অমূল্য সম্পদ। একজন প্রকৃত আবেদ হওয়ার জন্য এর প্রত্যেকটিই জরুরি। এর সুষ্ঠু ও সঠিক ব্যবহার দ্বারা সে কোথা হতে কোথা পৌঁছে যেতে পারে। আর এগুলোর সুষ্ঠু ও সঠিক ব্যবহার কেবল তখনই সম্ভব, যখন তা ব্যবহার হবে আবদিয়াতের চেতনার সাথে।

আবদিয়াতের চেতনার সাথে মানুষ যখন তার শক্তিসমূহ ব্যবহার করে, তখন তার দ্বারা যে সমস্ত কাজ নিষ্পন্ন হয় তা কেবল ইবাদতই হয়। এরকম প্রতিটি কাজ হয় সুষ্ঠু, সুন্দর ও কল্যাণময়। এরকম কাজকে ইসলাম ‘আমলে সালিহ’ নামে অভিহিত করেছে। আমলে সালিহে লিপ্ত থাকার দ্বারা বান্দার দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জীবনই সাফল্যমণ্ডিত হয়। তার ইহজীবন হয় সুন্দর, সুচারু, স্বস্তিকর ও শান্তিপূর্ণ আর আখিরাতের জীবন জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে জান্নাতের অনন্ত সুখ-শান্তির অধিকারী হয়। কুরআন মাজীদ ইরশাদ করেছে-

مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِّنْ ذَكَرٍ اَوْ اُنْثٰی وَ هُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْیِیَنَّهٗ حَیٰوةً طَیِّبَةً،  وَ لَنَجْزِیَنَّهُمْ اَجْرَهُمْ بِاَحْسَنِ مَا كَانُوْا یَعْمَلُوْنَ.

যে ব্যক্তিই মুমিন থাকা অবস্থায় সৎকর্ম করবে, সে পুরুষ হোক বা নারী, আমি অবশ্যই তাকে উত্তম জীবনযাপন করাব এবং তাদেরকে তাদের উৎকৃষ্ট কর্ম অনুযায়ী তাদের প্রতিদান অবশ্যই প্রদান করব। -সূরা নাহ্ল (১৬) : ৯৭

বস্তুত উৎকৃষ্ট জীবনভোগ সৎকর্মের অনিবার্য ফল। কর্মে অসততাই সব অনর্থের মূল। জাহিলিয়াতের যুগে সর্বব্যাপী অনর্থের মূলে ছিল এই কর্মগত অসততা। কুরআন মানুষকে সৎকর্মের পথ দেখাল। তাকে শিক্ষা দিল এমন কিছু মূলনীতি, যার ভিত্তিতে সে অতি সহজে তার করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়াবলী নির্ণয় করতে পারে। যেমন তাকে শিক্ষা দিয়েছে-

ক. সমস্ত মানুষ একই আদম সন্তান। সে হিসেবে মানুষে মানুষে কোনও ভেদাভেদ নেই। কালোর উপর সাদার, এক ভাষাভাষীর উপর অন্য ভাষাভাষীর, এক অঞ্চলবাসীর উপর অন্য অঞ্চলবাসীর এবং এক বংশের উপর অন্য বংশের কোনও শ্রেষ্ঠত্ব নেই। এভাবে ইসলাম বর্ণবৈষম্য লোপ করে সাম্যের শিক্ষা দিয়েছে। বর্ণবৈষম্য এক ঘোর অন্ধকার। জাহিলী যুগে সারা জগত এতে আচ্ছন্ন ছিল। যারা কুরআনের সংস্পর্শে এসেছে, কুরআন তাদের অন্তরে সাম্যের আলো জ¦লিয়ে দিয়েছে। সে আলোয় সর্বপ্রকার বর্ণবাদের অন্ধকার তাদের থেকে অপসৃত হয়েছে। কিন্তু যারা এ আলোর সংস্পর্শে আসেনি, তাদের থেকে এ জাহিলিয়াত কখনও দূর হয়নি। তাদের উপর দিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী কেটে গেছে, মানবসভ্যতা দূর-দূরান্তের পথ অতিক্রম করেছে, কিন্তু তারা আজও পর্যন্ত পুরোনো সেই বর্ণবাদী অন্ধকারের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে। যতক্ষণ না তারা কুরআনের আলো প্রবেশের জন্য নিজেদের দরজা-জানালা উন্মুক্ত করবে, ততক্ষণ তাদের এ অন্ধকার দূর হওয়ার নয়।

খ. কুরআন দিয়েছে সমাজবদ্ধতার শিক্ষা। সমাজবদ্ধ জীব হিসেবে প্রত্যেক ব্যক্তির উপর অন্যের কিছু না কিছু অধিকার আছে। সে অধিকার তার পরিবারের লোকজন থেকে শুরু করে নিকট ও দূর প্রতিবেশী তথা সারা পৃথিবীর সমস্ত মানুষের মধ্যে ব্যপ্ত। প্রত্যেকের কর্তব্য অন্যের অধিকারসমূহ সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং কোনওভাবেই তার দ্বারা অন্যের কোনও হক ও অধিকার ক্ষুণœ না হয় সে ব্যাপারে সতর্ক থাকা। এটা তার এক গুরুত্বপূর্ণ যিম্মাদারী ও অবশ্যপালনীয় দায়িত্ব। এ যিম্মাদারী সম্পর্কে আখিরাতে তাকে জিজ্ঞেস করা হবে। কুরআন তার পাঠকের অন্তরে এ যিম্মাদারীর চেতনা প্রজ্বলিত করে। শুরু থেকে এ পর্যন্ত যারাই আন্তরিকভাবে কুরআনের পাঠ গ্রহণ করেছে, তারা সর্বদা দায়িত্বসচেতন থেকেছে। ফলে তাদের দ্বারা কখনও কারও অধিকার ক্ষুণœ হয়নি। বস্তুত দায়িত্বসচেতনতাই সে আলো, যার উত্তাপে মানুষ অন্যের অধিকার পূরণে উদ্দীপিত থাকে। আপন দায়িত্ব সম্পর্কে অচেতন থেকে অন্যের নিকট থেকে আপন অধিকার আদায় করে নেওয়ার সংগ্রাম এক প্রাচীন জাহিলিয়াত। আজ সেই জাহিলিয়াতের অন্ধকার আবারও মানবসভ্যতাকে গ্রাস করে নিচ্ছে। তা থেকে মুক্তির একই উপায়- কুরআন যে দায়িত্ববোধের আলো জ¦ালাতে চায়, নিজ অন্তকরণকে তা দ্বারা উদ্ভাসিত করে তোলা।

গ. ইনসাফভিত্তিক সহাবস্থান। এটাও জীবনাচারের একটি কুরআনী মূলনীতি। কুরআন নিজের প্রতি, নিজ পরিবারবর্গের প্রতি এবং দুনিয়ার সমস্ত মানুষের প্রতি এমনকি শত্রুর প্রতিও ন্যায়াচরণের শিক্ষা দেয়। কুরআনী শিক্ষায় কোনও অবস্থায়ই জুলুম ও অবিচার অনুমোদিত নয়। ‘জোর যার মুল্লুক তার’ একটি জাহিলী মানসিকতা। ইসলামপূর্ব যুগে সারা জগৎ এ মানসিকতার শিকার ছিল। কুরআন তার অনুসারীদের অন্তরে ন্যায়বোধের আলো জ¦ালিয়ে দেয়। ফলে সেই সূচনাকাল থেকেই মুসলিমসমাজ ন্যায়-ইনসাফের আলোয় চালিত হতে থাকে। যারা এ আলো গ্রহণ করেনি, জুলুমের জুলমাত থেকে তারা কখনও মুক্তি পায়নি। আজ পেশিশক্তির পাশাপাশি আরও নানারকম শক্তি মানুষের করায়ত্ত। কুরআনী ইনসাফ যারা আয়ত্ত করেনি, তাদের বহুমুখী শক্তিমত্ততায় গোটা মানবসভ্যতা আজ বিপন্ন। এর থেকে মুক্তি পেতে হলে মানুষকে অবশ্যই কুরআনের ন্যায় ও ইনসাফের শিক্ষা আত্মস্থ করতে হবে।

ঘ. সম্পদের মালিকানা। জাহিলী যুগে সম্পদের মালিকানালাভে কোনও নীতি-নিয়মের বালাই ছিল না। পেশি শক্তির ব্যবহারই ছিল মূল। ফলে পৃথিবীর সর্বত্রই এক অরাজক অবস্থা বিরাজ করত। মালের কারণে মানুষ জান-মালের নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত ছিল। কুরআনই এ বিষয়ে সর্বপ্রথম আলোকপাত করে। কায়িক শ্রম বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, উত্তরাধিকার প্রভৃতি মালিকানার সূত্রসমূহ তার যাবতীয় শর্তসহ ইসলামী শরীআত যেভাবে সুস্পষ্ট করেছে, অন্য কোথাও তার নজির নেই। ইসলামের সে অর্থনৈতিক রূপরেখা অনুসরণের মাধ্যমে মুসলিম-সমাজ যে আলোর জগতে প্রবেশ করেছিল, যুগ-যুগান্তের বহু চিন্তা-ভাবনা ও নিত্যনতুন গবেষণার পরও অন্য কোনও সমাজ সেখানে পৌঁছাতে পারেনি। অর্থনৈতিক অরাজকতা আজ মানবসভ্যতার পক্ষে বলা যায় এক অপ্রতিরোধ্য হুমকি। হাঁ, সে হুমকি রোধের একটা মাত্র উপায়ই আছে- কুরআনী অর্থব্যবস্থার অনুসরণ।

ঙ. নারী-পুরুষের পারস্পরিক মর্যাদার প্রতি সম্মান প্রদর্শন। নারীর মর্যাদা উপেক্ষা ও পুরুষের কর্তৃত্বপরায়ণতা এক প্রাচীন জাহিলিয়াত। কুরআনের আলোবঞ্চিত সমাজে সে জাহিলিয়াতের অন্ধকার আজও যথারীতি বিরাজ করছে। নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার নামে মানুষ নানা আইন-কানুন তৈরি করছে। সেসব মনগড়া আইন-কানুনের প্রয়োগে নারীর মর্যাদা আরও বেশি ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। কারণ সেসব আইন প্রকৃতিসম্মত নয়। নারী-প্রকৃতির সাথে সাংঘর্ষিক আইন নারীজীবনকে কেবল বিপর্যস্তই করতে পারে। এর থেকে উত্তরণ সম্ভব কেবল কুরআনী আইনের প্রয়োগ দ্বারা। কুরআন নারী-পুরুষকে একে অন্যের সম্পূরক বানিয়েছে। উভয়ের সাধারণ মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার পর প্রত্যেকের জন্য তার প্রকৃতিসম্মত বিশেষ মর্যাদাও স্থির করে দিয়েছে। জীবনাচার ও কাজকর্মে তাদের সে সাধারণ ও বিশেষ মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ দ্বারাই নারী-পুরুষ প্রত্যেকের জীবন সুন্দর ও স্বাচ্ছন্দ্যময় হতে পারে। অন্যথায় পারস্পরিক জুলুম-নিপীড়ন বাড়তেই থাকবে এবং সামাজিক শান্তি ও নিরাপত্তাও কোনওদিন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না।

চ. আখলাক-চরিত্রের হেফাজত। কুরআনের শিক্ষায় মানুষের আখলাক-চরিত্রের গুরুত্ব অপরিসীম এবং এটা মানুষের এক মৌলিক সম্পদ। মানুষ সত্যিকারের মানুষ হয় আখলাক-চরিত্রের বিকাশ দ্বারা। জাহিলী যুগে পৃথিবীর সর্বত্র মানুষের এ সম্পদ উপেক্ষিত ছিল। ফলে এক পাশব জীবনই তারা যাপন করত। বর্তমান জড়বাদী সভ্যতা মানুষকে তা থেকে উদ্ধার তো করেইনি; বরং তার ভেতর আরও বেশি নিমজ্জিত করেছে। সর্বপ্রথম কুরআনই আখলাক-চরিত্রের উপর আলোকপাত করে মানুষের মানবিক মূল্য উন্মোচিত করেছে। ইতিহাস সাক্ষী, সে আলোর পথ ধরে মানুষ তার আখলাক-চরিত্রের এমন বিকাশই ঘটিয়েছিল, যা যেমন সেই জাহিলী যুগে ছিল অকল্পনীয়, তেমনি তথাকথিত এ আধুনিক সভ্যতার যুগেও অভাবনীয়। তা যতই অভাবনীয় হোক, কুরআনী নীতিশিক্ষার অনুসরণ দ্বারা আজও মানুষের পক্ষে তার মানবিক গুণাবলীর ঈর্ষণীয় উৎকর্ষ সাধন সম্ভব।

ছ. বাকশক্তির পরিমিত ব্যবহার। বাকশক্তি মানুষের এক অমূল্য সম্পদ। এ সম্পদ তার চিন্তাশক্তির সাথে অবিচ্ছেদ্য। এ দুইয়ের সম্মিলনেই অপরাপর সৃষ্টি থেকে সে আলাদা। এ শক্তিটি দোধারী তরবারির মত। এর সুষ্ঠু ব্যবহার অপরিমিত কল্যাণ সাধন করতে পারে। আর এর যথেচ্ছ ব্যবহার হয় মানুষের জন্য আত্মবিনাশী। কিন্তু কোন্ কথা বলা উচিত কোন্টা বলা উচিত না, চিন্তা-চেতনা, রুচি-অভিরুচি ও বুদ্ধি-বিবেচনার বহু বৈচিত্র্যসম্পন্ন মানুষের পক্ষে তার ভেদরেখা টানা কখনও সম্ভব নয়। এটা নির্ণয় করা সম্ভব কেবল বাকশক্তিদাতার নির্দেশনা দ্বারা। তাঁর পাঠানো কুরআনে সুস্পষ্টভাবেই সে নির্দেশনা আছে। সে আলোকে ব্যবহার দ্বারাই মানুষের পক্ষে তার বাকশক্তি কল্যাণকর হয়ে থাকে। সুতরাং এ শক্তির বিকাশ ও এর কল্যাণপ্রসূ ব্যবহারের জন্য মানুষকে অবশ্যই কুরআনের আলো গ্রহণ করতে হবে।

মানুষের যাবতীয় কাজকর্মকে সৎকর্মে পরিণত করার লক্ষ্যে কুরআন মাজীদ আরও বহু মূলনীতি পেশ করেছে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ বাণী দ্বারা সেসব মূলনীতির সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে দিয়েছেন। সুতরাং এসব বিষয় সম্পর্কে যেমন কুরআন মাজীদে আছে বহু আয়াত, তেমনি হাদীসগ্রন্থসমূহে আছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বহু অমূল্য বাণী। প্রবন্ধের কলেবর অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে বলে এস্থলে তা উদ্ধৃত করা গেল না।

মোটকথা কুরআনই সেই প্রথম আলো, যা মানুষকে সর্বতোভাবে আলোকিত করে তোলার জন্য আখিরী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি নাযিল করা হয়েছে। যারা কুরআন পড়েছে তারা তার আলোয় জানতে পেরেছে সৎকর্মের বৈচিত্র্য ও তার মূলনীতি। তারপর যখন তার ভিত্তিতে সৎকর্মে লিপ্ত হয়েছে, তখন তাদের জীবন থেকে যাবতীয় অনর্থ লোপ পেয়ে যায় এবং এক সুন্দর ও উৎকৃষ্ট জীবন তারা উপভোগ করতে থাকে। সেইসঙ্গে সৎকর্মের বৈচিত্র্য-চেতনা উজ্জীবিত করে তোলে তাদের মধ্যে নিহিত বিপুল সম্ভাবনার বিকাশ সাধনে। তারা এগিয়ে যেতে থাকে জ্ঞানে, কর্মে ও আখলাক-চরিত্রে। তারা বিপুল উদ্যমে জ্ঞানের সাধনায় আত্মনিয়োগ করে। সে এক দুর্বার অভিযাত্রা। কুরআনের আলোয় উদ্দীপিত আরব-আজমের মুসলিমগণ এ অভিযাত্রার নাবিক হয়ে কেবল নিজেরাই দূরগন্তব্যে এগিয়ে যায়নি; মানবসভ্যতাকেও এগিয়ে নিয়েছে বহুদূর। আজ আরব-আজম ও পূব-পশ্চিমসহ পৃথিবীর সর্বত্র জ্ঞানচর্চার যে সচলতা ও মুখরতা, তা তাদের সেই সাহসী অগ্রযাত্রারই ফলশ্রুতি। তবে নব্য অভিযাত্রীরা কুরআন-হাদীসের আলো থেকে বিমুখ হওয়ায় সরল ও মধ্যপথ হারিয়ে ফেলেছে। ফলে তাদের জ্ঞান-সাধনা বহুলাংশে মানুষের যতটা না হিতকর, তারচে’ অনেক বেশি অনিষ্টকর সাব্যস্ত হচ্ছে।

কুরআনের আলোকস্পৃষ্ট মানুষ কি কেবল জ্ঞানের সাধনাই করেছে? তারা কর্মসাধনারও অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। মানবমুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় কোনও কাজেই তারা কখনও পিছিয়ে থাকেনি। তারা ইবাদত-বিশ্বাসে সৃষ্টিসেবারও সকল শাখায় কর্মব্যস্ত থেকেছে। এর জন্য নিজ স্বার্থ জলাঞ্জলী দিয়েছে। নিয়েছে প্রাণের ঝুঁকি। এমনকি তাদের রাজ্যজয় এবং সে লক্ষ্যে সাগর, নদী ও দূরবিস্তৃত পর্বতশ্রেণী অতিক্রমের যে লোমহর্ষক অভিযান তারা চালিয়েছে, তারও উদ্দেশ্য ছিল কেবল নিঃস্বার্থ মানবকল্যাণ- মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে আল্লাহর দাসত্বে, দুনিয়ার সংকট-সংকীর্ণতা থেকে মুক্তি দিয়ে এর স্বাচ্ছন্দ্য ও প্রশস্ততায় এবং মনগড়া সব ধর্ম ও তন্ত্রমন্ত্রের জুলুম-নিপীড়ন থেকে উদ্ধার করে ইসলামের ন্যায়-ইনসাফের ছায়ায় নিয়ে আসা।

আর তাদের আখলাক-চরিত্রের যে বিকাশ সাধিত হয়েছিল তা বিশ্বমানবতার এক মহাবিস্ময়। এ ভূপৃষ্ঠ কখনও আল্লাহনির্ভরতা ও আত্মবিশ্বাস, সত্যবাদিতা ও সৎসাহস, বিনয় ও সম্ভ্রমবোধ, পরহিতৈষণা ও ন্যায়-নিষ্ঠা প্রভৃতি সাধুগুণে তাদেরতুল্য লোক বিচরণ করতে দেখেনি। একসময় যারা ছিল মৃত, সহসাই ঐশী আলোর সংস্পর্শে মানবিকতা ও মননশীলতার এমন এক উচ্চতায় পৌঁছে গেল, যেখানে পৌঁছা কেবল ওই আলোর শক্তিতেই সম্ভব। যে ব্যক্তি সে আলো গ্রহণ করবে না, সে কখনও মানবিক মুক্তির পথ খুঁজে পাবে না। সবদিক থেকে সে গভীর অন্ধকারের মধ্যেই পড়ে থাকবে। কুরআন মাজীদে ইরশাদ-

اَوَ مَنْ كَانَ مَیْتًا فَاَحْیَیْنٰهُ وَ جَعَلْنَا لَهٗ نُوْرًا یَّمْشِیْ بِهٖ فِی النَّاسِ كَمَنْ مَّثَلُهٗ فِی الظُّلُمٰتِ لَیْسَ بِخَارِجٍ مِّنْهَا.

একটু বল তো, যে ব্যক্তি ছিল মৃত, অতপর আমি তাকে জীবন দিয়েছি এবং তার জন্য এক আলোর ব্যবস্থা করেছি, যার সাহায্যে সে মানুষের মধ্যে চলাফেরা করে, সে কি ওই ব্যক্তির মত হতে পারে, যার অবস্থা এই যে, সে অন্ধকার দ্বারা পরিবেষ্টিত, যা থেকে সে কখনও বের হতে পারবে না? -সূরা আনআম (৬) : ১২২

যারা কুরআন পড়ে না এবং তার থেকে আলো গ্রহণ করে না, তাদের জীবন জাহিলিয়াতের অন্ধকারেই থেকে যায়। তারা না চেনে নিজ সৃষ্টিকর্তাকে, না জানতে পারে জীবনের উদ্দেশ্য। ফলে তাদের যাবতীয় দৌড়ঝাঁপ হয় কেবলই ইহজীবনকেন্দ্রিক এবং কেবল বস্তু ও শরীরকেন্দ্রিক। আত্মার উৎকর্ষ ও আত্মিক চাহিদা অগ্রাহ্যকারী সে ইন্দ্রিয়বিলাসী মহল মনগড়া দর্শন ও মনগড়া জীবনব্যবস্থার ধ্বজাধারী হয়ে মানবসভ্যতার অবশিষ্ট আলোটুকুও মুছে দিতে চায়।

কী পরিহাস! তারা বিস্তার করছে অন্ধকার, কিন্তু তার নাম দিচ্ছে আলো। তা তারা যতই আলো নামের ঢাক পেটাক না কেন, বাস্তবিকপক্ষে তারা অন্ধকার জগতেরই জীব। তাদের কোনও সংবাদ-প্রচারপত্র যা বিস্তার করতে পারবে তা প্রথম আলো তো নয়ই, এমনকি নয় প্রথম অন্ধকারও; বরং প্রাচীন জাহিলিয়াতী অন্ধকারেরই নব্যরূপ মাত্র। প্রকৃতপক্ষে তারা সেই অন্ধকারেই দেশ ও জাতিকে আচ্ছন্ন করার বহুমুখী প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। আজ আলোর নামে উদ্ভাবন করা হচ্ছে নিত্যনতুন দর্শন। প্রকৃতপক্ষে আলোর শব্দাবরণে তা অন্ধকার ছাড়া কিছু নয়। এজাতীয় আলোর মানুষ গড়ার শ্লোগান দিয়ে ব্যক্তিমানসে নিহিত আলোর শেষ বিন্দুটুকুও শুধু নিভিয়েই ফেলা যায়, মনুষ্যত্বের কোনও উপকার সাধন করা যায় না। কুরআন ও কুরআনের বাহক, আখিরী পয়গম্বর কর্তৃক প্রজ্বালিত আলোর পরশ ছাড়া কোনও মানুষের আলোকিত হয়ে ওঠা আদৌ সম্ভব নয়। সে আলোর পরশবিহীন কোনও প্রতিভাবান মানুষকে যতই আলোকিত বলা হোক না কেন এবং তাকে প্রথম আলো বানিয়ে যতই বই-পুস্তক লেখা হোক না কেন, তার জীবন থেকে সত্যিকারের আলো কেউ কোনওদিন পেতে পারে না। যে ব্যক্তি নিজেই আলোকবঞ্চিত, সে অন্যদের মধ্যে কী আলো বিলাবে? এরকম অন্ধকারের জীব জীবনভর অন্ধকারে নিমজ্জিত থেকে শেষপর্যন্ত অন্ধকার কবরে উপনীত হয়। জ্যোতির্ময় কুরআন অগ্রাহ্য করার পরিণামে সেখানে তার অন্ধকার মোচনের কোনও ব্যবস্থা থাকে না। হাশরের ময়দানেও অন্ধকারে পড়ে থাকবে। কুরআনধারী মানুষ আলোর পথ ধরে জান্নাতের দিকে এগিয়ে যাবে আর তা দেখে দেখে তারা শুধু আক্ষেপ করতে থাকবে আর আলো ভিক্ষা চাবে। তাদেরকে লক্ষ্য করে তারা বলবে-

انْظُرُوْنَا نَقْتَبِسْ مِنْ نُّوْرِكُمْ.

আমাদের জন্য একটু অপেক্ষা কর, যাতে তোমাদের নূর থেকে আমরাও কিছুটা আলো গ্রহণ করতে পারি। -সূরা হাদীদ (৫৭) : ১২

এর উত্তরে তাদের বলা হবে-

ارْجِعُوْا وَرَآءَكُمْ فَالْتَمِسُوْا نُوْرًا.

তোমরা তোমাদের পেছনে ফিরে যাও, তারপর আলো তালাশ কর। -সূরা হাদীদ (৫৭) : ১২

মোটকথা, কুরআন মানুষকে যে পথ দেখায় কেবল সেটাই আলোর পথ। মানবজীবনকে আলোকিত করার জন্য সে পথের কোনও বিকল্প নেই। এছাড়া আর সবই অন্ধকার। যারা কুরআনের পথে চলবে, কেবল তারাই অন্ধকার থেকে মুক্তি পাবে। তাদের দুনিয়ার জীবন হবে সাফল্যম-িত এবং আখিরাতেও তারা জাহান্নাম থেকে নাজাত পেয়ে জান্নাতের অধিকারী হবে। আসুন আমরা কুরআনের আলোয় জীবন আলোকিত করি। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাওফীক দান করুন- আমীন।

 

 

advertisement