রবিউস সানি ১৪৩৯   ||   জানুয়ারি ২০১৮

প্রতিবেশী : বন্ধুর বন্দুকে...

আশিক বিল্লাহ

খরার মৌসুমে উজানের পানি বন্ধ করে হাজার হাজার হেক্টর কৃষি জমি বানজার করা; বর্ষার সিজনে বাঁধ খুলে দিয়ে শত সহ¯্র ঘরবাড়ি ভাসিয়ে দেওয়া; আর বিনোদনের নামে নোংরা সংস্কৃতির বিষ ছড়িয়ে দেয়ার পাশাপাশি বন্দুকের গুলিতে ‘বন্ধু-রাষ্ট্রে’র নাগরিকদের হত্যা করলেও প্রতিবেশী রাষ্ট্রটি আমাদের বন্ধু-রাষ্ট্রই বটে! এই সেদিনও (১১ ডিসেম্বর ২০১৭) রাজশাহীর গোদাগাড়ী সীমান্তে একই বাড়ির দুই যুবক বিএসএফ-এর গুলির নির্মম শিকার হলেন। নিহত আবু আশরাফ (২৯) ও মিছু শেখ (২৭) সম্পর্কে চাচাত ভাই। তেমনিভাবে গত ১৯ ডিসেম্বর নওগাঁ জেলার পত্নীতলা সীমান্তে এরশাদ আলী নামে এক বাংলাদেশী যুবক বিএসএফের গুলিতে মারাত্মক আহত হন। ২১ ডিসেম্বর বিএসএফের হেফাজতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। (দৈনিক নয়া দিগন্ত, ২২ ডিসেম্বর ২০১৭) মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকারে’র হিসাব মতে- গত বছরের নভেম্বর পর্যন্ত বিএসএফের হাতে নিহত হয়েছে ২০ বাংলাদেশী। অপহৃত হয়েছেন ২৭জন। যাদের অনেকেই হত্যার শিকার হয়েছেন। (দৈনিক নয়া দিগন্ত, ১২ ডিসেম্বর ২০১৭) সীমান্তহত্যা নিয়ে বাংলাদেশ ভারত সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মাঝে বহু বৈঠক ও আলোচনা অনুষ্ঠিত হলেও তা বন্ধ হয়নি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের একাধিক বৈঠকে সীমান্তহত্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার ব্যাপারে ভারতের পক্ষ থেকে বার বার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এইসকল প্রতিশ্রুতির কোনো প্রতিফলন নেই। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এই বাহিনীকে উল্লেখ করেছে ‘ট্রিগার হ্যাপী’ বাহিনী হিসেবে। বিএসএফ-এর পক্ষ থেকে ‘সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করা হবে না’ বলে জানানো হয়েছিল। (দৈনিক নয়া দিগন্ত, ১২ ডিসেম্বর ২০১৭) ‘প্রাণঘাতী অস্ত্র’ ব্যবহার না করেও কীভাবে বাংলাদেশী হত্যা করা যায় তারও নজির রয়েছে বিএসএফের। গত ১৯ ডিসেম্বর লালমনিরহাট জেলার পাঁচগ্রাম সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর নির্যাতনে মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারান রশিদুল ইসলাম (৩২) নামে বাংলাদেশী এক যুবক। নিহত যুবক রশিদ কুচবিহার ৬১ বিএসএফ ব্যাটালিয়ান পানিশালা ক্যাম্পের একটি টহল দলের সদস্যের হাতে আটক হলে তাকে নির্যাতন করে ঘটনাস্থলে ফেলে রেখে যায় বিএসএফ। গুরুতর অবস্থায় স্থানীয়রা উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য রংপুর নিতে নিতে পথেই তার মৃত্যু হয়। (দৈনিক নয়া দিগন্ত, ২১ ডিসেম্বর ২০১৭) প্রতিবেশির দাবি, বাংলাদেশ তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও পরীক্ষিত বন্ধু। বাংলাদেশও এই বন্ধুত্বে কৃতার্থ। কারণ বর্তমান যাই হোক অতীতেরও তো একটা দায় আছে! বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ে প্রতিবেশীর অবদান তো কম নয়। নিন্দুকেরা যতই বলুক বাংলাদেশের স্বাধীনতায় ভারতের মদদদানের পেছনে তার নিজেরও স্বার্থ জড়িত ছিল এবং তা সে কড়ায় গণ্ডায় উসুল করে নিয়েছে, কিন্তু সব ঋণ কি উসুল করলেই শেষ হয়ে যায়? একচেটিয়া বাজার দখল, ট্রানজিটসহ বহু ফায়দা নিছক বন্ধুত্বের দোহাই দিয়ে লুফে নিলেও বাংলাদেশকে ক্ষুধা-পিপাসা, প্লাবন-আগ্রাসন সবকিছুই চোখবুজে সহ্য করেই যেতে হবে। এমনকি কূটনৈতিক সম্পর্কের উপরে মুরুব্বিয়ানা শাসনও মাথা পেতে মেনে নিতে হবে। বন্ধুত্বের ঋণ বলে কথা! কিন্তু প্রশ্ন কি দাঁড়ায় না যে, ভারত বন্ধু রাষ্ট্রের নাগরিকদের যেভাবে গুলি করে হত্যা করে যাচ্ছে বছরের পর বছর, কথিত শত্রু-রাষ্ট্র পাকিস্তানের নাগরিকদের কি এভাবে গুলি করতে পারবে? ইট বা গুলি ছুড়তে গিয়ে আবার না পাটকেল বা গোলা নিক্ষিপ্ত হয়! বন্ধু-শত্রুর আচরণ ও উচ্চারণের সমীকরণ তবে কি এরকমই হয়!? সীমান্তে ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে বেসামরিক লাশের মিছিল। ১১ থেকে ২১ মাত্র দশদিনের মাথায় ঘটে গেল চার চারটি হত্যাকা-। আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে সীমান্তে এভাবে বেসামরিক লোক হত্যা করা বিচারবহির্র্ভূত হত্যাকা-ের শামিল হলেও এর জন্য কোনো বিএসএফ সদস্যকে আইনের আওতায় আনা হয় না। বড়জোর যা হয়, তা হল-দুই দেশের পতাকা বৈঠকে কিংবা পত্র মারফত লাশ হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। এই লাশ পেতেও কখনো বিস্তর কাঠখড় পোড়াতে হয়। সম্প্রতি নিহত হতভাগা দুই ভাইয়ের মধ্যে মিছু শেখের লাশ পরিবার পেলেও আবু আশরাফের লাশ নিয়ে যায় বিএসএফ। গোদাগাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিপজুর আলম জানান, আশরাফের লাশ ফেরত পেতে ডিএমসি সীমান্তে বিএসএফ-এর সাথে বিজিবির পতাকা বৈঠকের প্রস্তুতি চলছে। (দৈনিক নয়া দিগন্ত, ১১ ডিসেম্বর ২০১৭) এদিকে নিহত এরশাদ আলীর লাশ ফেরত চেয়ে ১৪ বিজিবির পক্ষ থেকে ১২২ বিএসএফ ব্যাটালিয়ানের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে জানান নওগাঁর পত্নীতলার ১৪ বিজিবির অধিনায়ক লে: কর্নেল খিজির খান। (দৈনিক নয়া দিগন্ত, ২২ ডিসেম্বর ২০১৭) প্রশ্ন হচ্ছে, এহেন পরিস্থিতিতে মানবাধিকার সংস্থা আর মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক সংগঠনগুলো নীরব কেন? মিডিয়া ও স্বাধীনতার চেতনা ধারণকারীদের কণ্ঠস্বরও স্তব্ধ কেন? সরকারের কর্তব্য- শুধু বিজিবি-বিএসএফ পর্যায়ে নয়, উচ্চ পর্যায় থেকে তীব্র নিন্দা জানানো এবং জরুরি ভিত্তিতে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা যেমন করতে হবে তেমনি দেশের স্বাধীনতা রক্ষা ও দেশের নাগরিকদের জান-মালের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। একতরফা বন্ধুত্ব- বন্ধুত্ব নয়; এক প্রকারের দাসত্ব। আর মুমিন হিসেবে আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে কুরআনের বাণী- یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا لَا تَتَّخِذُوا الَّذِیْنَ اتَّخَذُوْا دِیْنَكُمْ هُزُوًا وَّ لَعِبًا مِّنَ الَّذِیْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَ الْكُفَّارَ اَوْلِیَآءَ وَ اتَّقُوا اللهَ اِنْ كُنْتُمْ مُّؤْمِنِیْنَ. হে মুমিনগণ! তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে তাদের মধ্যে যারা তোমাদের দ্বীনকে হাসি-তামাশা ও ক্রীড়ার বস্তুরূপে গ্রহণ করে তাদেরকে ও কাফেরদেরকে তোমরা বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না এবং যদি তোমরা মুমিন হও তবে আল্লাহকে ভয় কর। -সূরা মায়েদাহ (৫) : ৫৭ বন্ধু যখন থাকে বন্দুক তাক করে তখন বন্ধুত্বের পুনঃনিরীক্ষণ অপরিহার্য হয়ে পড়ে বলেই মনে হয়। ষ

 

 

advertisement