রবিউস সানী ১৪৩১   ||   এপ্রিল ২০১০

উম্মাহঃ ইসরাইলের সঙ্গে আমেরিকার খুনসুটি

ওয়ারিস রব্বানী

পূর্ব জেরুজালেমে ইহুদী বসতি নির্মাণের ইসরাইলি সিদ্ধান্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরাইলের বাদানুবাদ শুরু হয়েছে। মার্চের মাঝামাঝি সময়ে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইসরাইল সফরের সময় ইসরাইলের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়, পূর্ব জেরুজালেমে ইহুদী বসতি সমপ্রসারিত হবে। তখন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় পরিকল্পিত বসতির ছবিও মুদ্রিত হয়। প্রথমে জো বাইডেন, এরপর হিলারি ক্লিনটন ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বসতি নির্মাণের প্রতিবাদ জানিয়ে এ সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকতে ইসরাইলকে আহ্বান জানান। ইসরাইল অবশ্য মার্কিনী এই আহ্বানকে একদম পাত্তা দেয়নি। ইসরাইলের কর্তা ব্যক্তিদের সাফ কথা, পূর্ব জেরুজালেমে বসতি সমপ্রসারণ বন্ধ করা হবে না। আমেরিকার পক্ষ থেকে মুখে বলা হচ্ছে, পূর্ব জেরুজালেমে ইহুদী বসতি সমপ্রসারণ শান্তি আলোচনায় বাধার সৃষ্টি করবে। অথচ বসতি নির্মাণে ইসরাইলের অনমনীয় সিদ্ধান্ত বার বার ব্যক্ত হচ্ছে। উভয় পক্ষের বক্তব্যই মিডিয়ায় আসছে। মজার বিষয় হচ্ছে, এসব বাদানুবাদ যে একদমই অন্তঃসারশূন্য, তা আমেরিকার প্রেসিডেন্টের বক্তব্যেই উঠে আসছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট একবার বলেছেন-ইসরাইলের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক অটুট রয়েছে। সে সম্পর্কের কোনো ক্ষতি হবে না।’ আরেকবার বলছেন-কখনো কখনো বন্ধুদের মাঝে মতানৈক্য দেখা দিতে পারে। ইসরাইল আমাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র।’ একদিকে মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচনার নামে চারপক্ষের বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ইইউ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও জাতিসংঘের সে বৈঠক থেকে বলা হচ্ছে-পূর্ব জেরুজালেমে নতুন বসতি স্থাপন শান্তির পক্ষে সহায়ক নয়। অপরদিকে সে সময়ই গাজাসহ ফিলিস্তিনী ভূ-খণ্ডের বিভিন্ন অংশে বারবার ইসরাইলের বিমান হামলা হচ্ছে। প্রতিটি হামলাতেই কয়েকজন ফিলিস্তিনী শাহাদত বরণ করছেন। ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সদম্ভ ঘোষণা প্রকাশিত হচ্ছে। তার বক্তব্য-ফিলিস্তিনকে কোনো ভু-খণ্ড ছাড় দেওয়া হবে না। সংস্কৃতির সঙঘাতের নিরসন ভূ-খণ্ড ছাড় দেওয়ার মাধ্যমে আসতে পারে না। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে পূর্ব জেরুজালেম ইসরাইলের দখলে আসার পর তা ইসরাইলের রাজধানীর অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে পড়েছে।’ অন্যদিকে জাতিসংঘ মহাসচিব বলেছেন-ইসরাইল এবং ভবিষ্যত ফিলিস্তিন রাষ্ট্র উভয়ের রাজধানী হওয়া উচিত জেরুজালেম। আমাদেরকে আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। জেরুজালেমকে যাতে ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের রাজধানী হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা যায়, সে উপায় আমাদেরকে আলোচনার মাধ্যমে বের করতে হবে।’ পূর্ব জেরুজালেমে নতুন ইহুদী বসতি নির্মান যে অনুচিত এবং সেটি যে আন্তর্জাতিক আইন পরিপন্থী সে কথাও আমেরিকার নেতৃত্বও জাতিসংঘের বক্তব্যে উঠে আসছে। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে ‘মিত্রতা’ অটুট থাকার ‘প্রতিশ্রুতি’সহ মৌখিক কিছু বাদানুবাদ ছাড়া ইসরাইলের সঙ্গে আমেরিকার যা হচ্ছে সেটাকে খুনসুটি বা তামাশাই বলা যেতে পারে। পার্থক্য এতটুকুই যে, এ খুনসুটি বিশ্ববাসীকে জানিয়ে গণমাধ্যমের সামনে করা হচ্ছে। আগে মনে করা হতো, ইসরাইলের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক চরিত্রহীন স্ত্রী আর ভেরুয়া স্বামীর, যে স্বামী উছৃঙ্খল স্ত্রীকে সংসারে ধরে রাখার জন্য তার সব অন্যায় আবদার ও আচরণ মেনে নেয়। এখন দেখা যাচ্ছে ইসরাইল স্বামীর আসনে, শক্ত হাতে স্ত্রীর মতিগতি সে নিয়ন্ত্রণ করছে। মুখে মতভিন্নতা যাই থাকুক বাস্তব ক্ষেত্রে স্ত্রীকেই বলতে হচ্ছে-সম্পর্ক অটুট আছে।’ কচুগাছের এখন কলাগাছ স্ত্রী, বিশ্ববাসী এটাই দেখছে। অথচ এই কলাগাছকেই দেখা যাচ্ছে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামার পুরোপুরি সমরায়োজন সম্পন্ন করতে। স্কটল্যাণ্ডের ‘সানডে হেরাল্ড’ পত্রিকার ১৪ মার্চ সংখ্যা জানিয়েছে, ইরানে সম্ভাব্য হামলার প্রস'তি হিসেবে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ভারত মহাসাগরে ব্রিটিশ দ্বীপে দিয়েগো গার্সিয়ায় শক্তিশালী বাঙ্কার-বাস্টার বোমা নিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ইসরাইলের সঙ্গে মুখের খুনসুটি করলেও বিশ্বের মোড়ল শক্তিগুলো মুসলিম কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে যা করে, তা হচ্ছে নৃশংসতা। পদ বদল হয়, মুখ বদল হয়, কিন্তু রাষ্ট্রীয় নৃশংসতার ছক বদল হয় না। মিষ্টিকথার প্রেসিডেন্ট হয়তো নৃশংসতার ঝাঁঝালো সেই ছক ধরেই হাঁটছেন।

 

advertisement