জুমাদাল উখরা ১৪২৯   ||   জুন ২০০৮

বাইতুল্লাহর মুসাফির-১০

মাওলানা আবু তাহের মেসবাহ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

অহুদের ময়দান থেকে বিদায়কালে হযরত আমাকে বললেন, খুব বেদনার্ত স্বরে। আজ পঁচিশ বছর পর এখনো  তা কানে বড় বিষণ্ণ হয়ে বাজে এবং হৃদয়ের গভীরে অন্যরকম একটি আর্দ্রতা সৃষ্টি করে। হযরত বললেন-

মওলবী আবু তাহের! আল্লাহর নবী দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণের আগে  শহীদানে অহুদের যিয়ারাতে এসেছিলেন। আমি তো বুড়া, তুমি জোয়ান!  তোমার যদি আবার এখানে আসা হয় তাহলে আমার পক্ষ হতে শহীদানে অহুদের উদ্দেশ্যে অবশ্যই সালাম পেশ করবে।

দুনিয়া থেকে হযরতের বিদায়ের পর যত বার এসেছি অহুদের ময়দানে শহীদানে অহুদের

যিয়ারাতে, আমার মনে হয়েছে, ঐ তো হযরত দাঁড়িয়ে আছেন আমার সামনে! ঐ তো তাঁর বিগলিত কণ্ঠে সালাম উচ্চারিত হলো শহীদানে অহুদের উদ্দেশ্যে!

হয়ত ভালো হতো, কলমকে  যদি আরো সংযত রাখা যেতো! সব কথা কি বলার কথা?! সব কথা কি লেখার কথা?! তবু কলমের উচ্ছ্বাসকে, মন বলে না সবসময় মুছে ফেলতে! কিছু কল্যাণ যদি তাতে থেকে থাকে!  আমাদের সবকথা, আমাদের সবলেখা আমরা যেন আল্লাহকে নিবেদন করি। যা কিছু কল্যাণ আল্লাহ যেন রেখে দেন; যা কিছু অকল্যাণ আল্লাহ যেন  মুছে দেন।

অন্তত কিছু সময়ের জন্য অন্য রকম এক মানুষ হয়ে অহুদের ময়দান থেকে আমরা রওয়ানা হলাম হযরতের সঙ্গে। সাত মসজিদের সামনে গাড়ী থামলো কিছু সময়ের জন্য। গাযওয়াতুল খান্দাকের স্মৃতি বিজড়িত এসকল মসজিদ! কঠিন এক দুর্যোগ নেমে এসেছিলো তখন মদীনায় আল্লাহর নবী ও তাঁর ছাহাবাদের উপর। আরবের গোত্রসকল একত্র হয়েছিলো এবং দশ হাজারের বিশাল বাহিনী মদীনা ঘেরাও করেছিলো। আল্লাহর নবী তাঁর প্রিয় ছাহাবী হযরত সালমান ফারসী (রা)-এর পরামর্শে মদীনার তিনদিকে পরিখা খনন করেছিলেন। আরবের রণকৌশলে এটা ছিলো অভিনব এক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা! যুদ্ধের আয়োজনে ও সাজসরঞ্জামে শত্রুরা সবসময় এগিয়ে ছিলো, কিন্তু যুদ্ধকৌশলে এগিয়ে থাকতেন আল্লাহর নবী। কিন্তু আজ! কেন?! হোনায়ন-

যুদ্ধকালে দুজন ছাহাবী  গোয়েন্দাবেশে প্রেরিত হলেন শামদেশে মিনজানিক ক্ষেপণাস্ত্রের কৌশল আয়ত্ত করার উদ্দেশ্যে! শত্রুর সমরপরিকল্পনা থেকে সেখানেও আল্লাহর নবী এগিয়ে ছিলেন অনেক দূর! কিন্তু আজ! কেন?! কে দেবে এ প্রশ্নের জবাব?! আমার মনে হয়, ডক্টর আব্দুল কাদীর এবং মাওলানা আব্দুল কাদীর উভয়কে আজ এ প্রশ্নের জবাব খুজতে হবে একত্র হয়ে!

 অবিশ্বাস্য রকম অল্প সময়ে অকল্পনীয় ত্যাগ ও কোরবানির মাধ্যমে পরিখা তৈরী হলো, যা দেখে হতবাক হয়ে গেলো সম্মিলিত মুশরিক বাহিনী! হানাদার শত্রুকে এরকম চমকে দিতে পারি না কেন আমরা আজ!

পরিখা খননকালে ছাহাবা কেরামের বিভিন্ন অবস্থানের স্মৃতিস্বরূপ পরবর্তীতে এ মসজিদগুলো তৈরী হয়েছিলো। একটু উঁচু স্থানে ছোট ছোট মসজিদ, যেন নুরের আলাদা আলাদা টুকরো! হৃদয় এক অপার্থিব অনুভূতিতে সিক্ত হলো। এখানে অল্প কিছুক্ষণ অবস্থান করে হযরতের সঙ্গে আমরা মদীনায় ফিরে এলাম।

দুপুরে হযরতের দাওয়াত ছিলো ভাই মাছীহুল্লাহর বাসায়। তার আববা মাওলানা ক্বারী বেলায়াত ছাহেব হযরতের বিশিষ্ট ছাত্র। হযরতেরই তত্ত্বাবধানে তিনি বাচ্চাদের কোরআন শিক্ষার নূরানী তালীম প্রবর্তন করেছেন, যা আজ বাংলাদেশে ব্যাপক মাকবূলিয়াত অর্জন করেছে।

ভাই মাছীহুল্লাহর সঙ্গে আমার পরিচয় ও অন্তরঙ্গতা লালবাগ মাদরাসার ছাত্রজীবন থেকে। তিনি এখানে জামিয়া ইসলামিয়ার অধ্যয়ন সমাপ্ত করেছেন এবং স্থায়ীভাবে থাকার ব্যবস্থা করেছেন। তিনি আমাকে বললেন, হযরতের সঙ্গে তাঁর সফরসঙ্গীদের দাওয়াত তো আছেই, তবে আপনাকে আমার পক্ষ হতে আলাদা দাওয়াত। এ আন্তরিকতায় আমি অভিভূত হলাম এবং কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলাম।

 যোহরের পর হযরতের সঙ্গে আমরা সবাই গেলাম। অত্যন্ত আনন্দদায়ক ও তৃপ্তিদায়ক দাওয়াত হলো। প্রতিটি খাবারের স্বাদে ও ঘ্রাণে যেন দেশের জন্য মন কেমন করে। কৈ ও পাবদা  থেকে শুরু করে মুগডাল ও কচুর লতি সবই ছিলো। বিছানো দস্তরখানে এবং খাবার পরিবেশনে যেমন

মুহাববাতের প্রকাশ ছিলো তেমনি রান্নায় পরিমিত লবণের সঙ্গে অপরিমিত আন্তরিকতার মিশ্রণ ছিলো!

মদীনায় আরো কিছু দাওয়াত হযরত কবুল করেছেন, কিন্তু আজকের দস্তরখানে যেমন তৃপ্তির সঙ্গে তিনি আহার করলেন তেমন আর দেখিনি।

 যেহেতু দস্তরখানের বিষয় সেহেতু আমার কথা একটু আলাদা করে বলা দরকার। অন্যরা শুধু দুপুরের খাবার খেলেন, আমি উত্তম উপলক্ষ বিবেচনা করে দুপুরের সঙ্গে রাতের খাবার যোগ করে নিলাম। পাবদা মাছের ঝোলটা হয়েছিলো বেশ মজাদার, আর মুগডালের মুড়িঘণ্টটা তো রীতিমত রসনীয়। কচুর লতির কথা যদি বলি তো সেটা হয়েছিলো ঠিক কচুর লতির মত। মোট কথা, আলিফ থেকে ইয়া সবকিছু এমন মযেদার ছিলো যে, কলমের ডগা দিয়ে না লিখে যদি জিহবার ডগা দিয়ে লেখা যেতো তাহলে প্রিয় পাঠক, তুমিও কিঞ্চিৎ স্বাদ পেতে পারতে!

ভাই মসীহুল্লাহ অন্য একদিন আমার প্রতি আরেকটি দয়া করলেন। মৌসুমের জানান্তকর ব্যস্ততার মাঝেও তিনি আমাকে জামিয়া ইসলামিয়া দেখাতে নিয়ে গেলেন। যদিও জামিয়া তখন ছুটির নির্জনতায় বিলকুল সুনসান ছিলো তবু পুরো এলাকা ঘুরে দেখতে খুব ভালো লাগলো। পটিয়ার জামিয়া ইসলামিয়ায় যখন দাওরা পড়ি তখন মদীনার জামিয়া ইসলামিয়ার নামে একটি আবেদনপত্র পাঠিয়েছিলাম। মূল লক্ষ্য ছিলো মদীনার স্বপ্ন।  যে কোন উপায়ে আল্লাহর নবীর শহরে হাযির হওয়ার কিসমত যেন হয়। তখন আমার আবেদনপত্রের উত্তর আসেনি, কেননা তা পাঠানো হয়েছিলো মানুষের ঠিকানায়। এ সহজ সত্য কথাটি আমরা প্রায় ভুলে যাই যে, মানুষের ঠিকানা হলো ভুল ঠিকানা। আজ আমি মদীনায়  হাযির হতে পেরেছি, কারণ মদীনার আরযি আমি দাখিল করেছিলাম আসমানের ঠিকানায়। জামিয়া ইসলামিয়ার বিশাল চত্বরে দাঁড়িয়ে এসব কথা মনে পড়লো এবং অন্তরে অন্যরকম এক অনুভূতি হলো। আমার আল্লাহ যা করেন আমার ভালোর জন্য করেন; একথা আমার জন্য যেমন সত্য তেমনি সত্য তোমারও জন্য। কিন্তু সবসময় আমরা তা বুঝতে পারি না। বুঝলেও মনে রাখতে পারি না।

মদীনার স্বপ্নের দিনগুলো যখন স্বপ্নের মতই ফুরিয়ে আসছিলো তখন হঠাৎ করেই দেখা হয়ে গেলো আমার সল্প পরিচিত একজন মানুষের সঙ্গে। তার নাম আমার মনে থাকা উচিত ছিলো; মনে নেই। তবে নাম-ঠিকানা ছাড়াও আল্লাহর কাছে কারো জন্য দুআ করা যায়। আমি দুআ করি, আল্লাহ যেন তার মঙ্গল করেন। আমার হৃদয়ের সুন্দর একটি আকাঙ্ক্ষা তিনি পূর্ণ করেছিলেন, যা পরে আর কোনদিন পূর্ণ করার সুযোগ আসেনি। তিনি বহুদিন মদীনায় থাকেন। তাকে বলেছিলাম,   মদীনার কোন গ্রাম এবং গ্রামের জীবন দেখার আকাঙ্ক্ষার কথা। কিতাবে পড়েছি, গ্রাম থেকে সহজ সরল লোকেরা মদীনার বাজারে আসতেন তাদের গ্রামীণ পণ্যদ্রব্য নিয়ে। আল্লাহর রাসূলের জন্য তারা গ্রাম থেকে বিভিন্ন হাদিয়া আনতেন, আর তিনি তা খুশির সাথে কবুল করতেন এবং তাদেরকে শহরের দ্রব্য হাদিয়া দিতেন।

আল্লাহর রাসূল একবার মদীনার বাজারে এক গ্রাম্য বেদুঈনের সঙ্গে সুন্দর কৌতুক করেছিলেন। তিনি তাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে  বলেছিলেন, কে এই গোলামকে আমার কাছ থেকে খরিদ করবে?! গ্রামের সহজ সরল ছাহাবী যখন বুঝতে পারলেন, আল্লাহর নবীর পবিত্র দেহ তার শরীরকে স্পর্শ করেছে তখন তিনি আপ্লুত হয়ে আল্লাহর নবীর সঙ্গে আরো নিবিড়ভাবে লেগে থাকলেন, আর বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাহলে তো আপনি আমাকে সস্তা পাবেন!

গ্রামের মানুষ, যাকে বলে দেখতে সুন্দর, হয়ত তিনি তেমন ছিলেন না, তাই বিষণ্ণ স্বরে  কথাটা বলেছিলেন, কিন্তু আল্লাহর পেয়ারা নবী স্নেহ-মমতার পরশ বুলিয়ে তাকে এমন একটি কথা বললেন, যাতে তার কিসমতের সিতারা রওশন হয়ে গেলো চিরকালের জন্য। তিনি বললেন-

لكن عند الله لست بكاسدٍ

 কিন্তু আল্লাহর কাছে তো তুমি সস্তা নও!

তখন থেকে মদীনার সহজ-সরল ছাহাবাদের প্রতি আমার অন্তরে সঞ্চারিত রয়েছে অন্যরকম একটি ভালোবাসা এবং তখন থেকে আমার আকাঙ্ক্ষা এই যে, আল্লাহ যদি মদীনার যিয়ারাত নসিব করেন, আমি মদীনার গ্রাম দেখতে যাবো। নিজের চোখে দেখবো, মদীনার গ্রামের মানুষ কেমন! কেমন তাদের সহজ-সরল জীবনযাপন!

আমার এই স্বল্প পরিচিত মানুষটি সানন্দে রাজি হলেন। তিনি বললেন, আমি অনেক বার গিয়েছি কাছের এবং দূরের গ্রামে। আমার পরিচিত কিছু পরিবারও আছে সেখানে। আমি নিজের গাড়ীতে করে আপনাকে নিয়ে যাবো।

মদীনার গ্রামের কথা শুনে মাওলানা হাবীবুল্লাহ মেছবাহ   মিনতির সুরে বললেন, আমাকে নেবেন আপনার সঙ্গে? আমার খুব ভালো লাগলো তার অভিব্যক্তি এবং মদীনার গ্রামের প্রতি এই অনুরাগ-অনুভূতি। হযরতের অনুমতি নিয়ে আমরা  বের হলাম। শহর পার হয়ে সুপ্রশস্ত সড়কে গাড়ী যেন হাওয়ায় ভেসে চললো। এটা ছিলো মদীনার নিম্ন এলাকা। কিছু দূর পরপর বড় বড় খেজুর বাগান। অল্প কিছু তাঁবু, খেজুর পাতার ছাউনী, দুচারটে কাঁচা ঘর; এই হলো মদীনার গ্রাম। পরিবেশের এই শান্ত নির্জনতা এবং জীবনের এই অনাড়ম্বর ছবিই বলে দেয়, এখানে যারা বাস করে তারা কত সহজ সরল হতে পারে!

ত্রিশ চল্লিশ কিলোমিটার দূরে একটি বড় গ্রামে আমাদের গাড়ী থামলো। সফরসঙ্গী বললেন, এ গ্রামে আমার পরিচিত একটি পরিবার আছে। এদের

আন্তরিকতা মনে রাখার মত।

মরুভূমির মুক্ত নির্মল আবহাওয়া। মূল সড়ক থেকে বেশ কিছু দূর বালুর উপর দিয়ে এসেছে আমাদের গাড়ী। নরম বালুর উপর গাড়ীর চলা বড় অদ্ভুত! চাকা দেবে দেবে যায়, আগে যেন বাড়তেই চায় না। সেখান থেকে মূল সড়কের ধাবমান গাড়ীগুলো শুধু দেখা যায়; আসছে, যাচ্ছে। এখান থেকে আওয়ায শোনা যায় না। আধুনিক জীবনের সঙ্গে সংযোগ বলতে ঐ অতটুকুই। দূর থেকে গাড়ীর নিঃশব্দ ছুটে চলা দেখতে পাওয়া! দূর অতীতের একটুকরো জীবন যেন তুলে এনে রাখা হয়েছে আমার চোখের সামনে! খেজুরবাগানের শান্ত-শীতল ছায়া আমাকে যেন সেই দূর অতীতেরই ছায়া দান করলো! একটা কূপ দেখলাম; সামান্য সামান্য পানি তোলা যায় তা থেকে। একটি বালিকা পানি তুললো, আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলাম! আমি যেন দেখলাম সেই ভাগ্যবতী মেয়েটিকে, যে বিবি হালিমার ঘরে কুয়া থেকে মশক ভরে পানি আনতো, আমার প্রিয় নবীও সে পানি পান করতেন। আমার প্রিয় নবী তার কোলে দোল খেতেন। হয়ত এমনই ছিলেন দেখতে সেই ভাগ্যবতী মেয়ে শায়মা!

 বেশ কিছু পরিবারের বাস এই গ্রামে। ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে দল বেঁধে ছোটাছুটি করছে, লুকোচুরি খেলছে। এদেরই বোধ হয় বলে প্রকৃতির কোলে প্রতিপালিত মানবসন্তান।

গাড়ী দেখে ছেলে-মেয়েরা খেলা ছেড়ে গাড়ীর পাশে এসে জড়ো হলো। অবাক তাদের চাহনি, নিষ্পাপ কৌতুহল! কখনো তাকায় গাড়ীর দিকে, কখনো আমাদের দিকে। এদেশেও গাড়ী তাহলে দেখার জিনিস! যেমন আমাদের দেশে শহর থেকে দূরে প্রত্যন্ত কোন গ্রামে! নিষ্পাপ শিশুদের নিষ্পাপ কৌতুহল আমার বড় ভালো লাগলো; আরো ভালো লাগলো তাদের মুখের বিশুদ্ধ ভাষা! যা কিছু জিজ্ঞাসা করি, হাসি মুখে উত্তর দেয়, একেবারে কিতাবের ভাষায়! তাদের ডাগর ডাগর চোখের অবাক চাহনি আমাকে মনে করিয়ে দেয় একটি হরিণশাবকের কথা, যা আমি দেখেছিলাম অনেক বছর আগে, আমার কৈশোরে। সেই আশ্চর্য-সুন্দর চাহনিটাই যেন ফিরে এসেছে মদীনার এই শিশুদের চোখে!

কিছুক্ষণ পর এক বৃদ্ধ এবং তার যুবক পুত্র আমাদেরকে আহলান ওয়া সাহলান বললেন। আরবের হাজার বছরের ঐতিহ্যপূর্ণ স্বাগত সম্ভাষণ! গবেষণা করে দেখা যেতে পারে, মেহমানকে স্বাগত জানানোর এর চেয়ে আন্তরিক ও অর্থপূর্ণ সম্ভাষণ পৃথিবীর আর কোন জাতির ভাষায় আছে কি না?

আহলান ওয়া সাহলান - আপনি আপনার পরিবারে এসেছেন এবং কোমল ভূমিতে পা রেখেছেন। এখানে আপনার হাঁটতেও কষ্ট হবে না, থাকতেও কষ্ট হবে না। ভাব ও আবেগের এমন অপূর্ব নিবেদন দুটিমাত্র শব্দে! আহলান ওয়া সাহলান!

পিতা-পুত্র আমাদের সাদরে নিয়ে গেলেন তাদের খেজুর-ডালের ছাউনী দেয়া কাঁচা ঘরে। বাইরে যেমন গরম ভিতরে তেমনি ঠান্ডা! প্রাথমিক আপ্যায়ন হলো দুধ দিয়ে এবং তা আমাদেরই সামনে  বকরী দোহন করে! তারপর দেয়া হলো গাছ থেকে পেড়ে আনা কাঁচা-পাকা খেজুর। পুরো  থোকাটাই রেখে দেয়া হলো  দস্তরখানে। পছন্দ মত খেতে থাকো পাকা খেজুর, বা কাঁচা খেজুর, যেন তুমি নিজেই গাছ থেকে পেড়ে খাচ্ছো!

সবকিছুতে এমন সাবলীল

আন্তরিকতা যে, হৃদয়ের গভীরে গিয়ে স্পর্শ করে। বিভিন্নভাবে বিভিন্ন কথায় তারা আমাদের আগমনে তাদের খুশির অনুভূতি প্রকাশ করলেন।

মুগ্ধ বিস্ময়ে আমরা শুধু অনুভব করলাম এবং উপভোগ করলাম। আরবের তাঁবুবাসী বেদুঈনদের মেহমান-সেবার অনেক কাহিনী কিতাবে পড়েছি। সেই সব দৃশ্য যেন আমার সামনে একে একে জীবন্ত হয়ে উঠতে লাগলো।

অল্পক্ষণের মধ্যেই আস্ত দুম্বা ভুনা হয়ে আমাদের সামনে হাজির! ক্ষুধা ছিলো না, তবু সামান্য খেলাম। সামান্য খেলাম বলে কোন পীড়াপীড়ি নেই, আবার সবটা খেলেও আপত্তি নেই। এটাই আরব-মেহমানদারির প্রধান বৈশিষ্ট্য।

দুতিন ঘণ্টার মত আমরা ছিলাম মদীনার খেজুরবাগানের ছায়া-ঘেরা সেই গ্রামে এবং সারা জীবনের জন্য সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলাম একটি সুখময় স্মৃতি!

আমাদের পথপ্রদর্শক, যিনি আগেও এগ্রামে কয়েকবার এসেছেন এবং পরিবারটির সঙ্গে যথেষ্ট পরিচিত, তিনি গ্রামের শিশুদের জন্য চকোলেট ও টফি নিয়ে এসেছিলেন। সেগুলো পেয়ে শিশুরা যে আনন্দ প্রকাশ করেছিলো, তাদের চোখে-মুখে খুশির যে ঝিলিক দেখা দিয়েছিলো তা সত্যি অপূর্ব! তাদের জন্য আমাদের উপহার  ছিলো সামান্য টফি, আর আমাদের জন্য তাদের উপহার ছিলো অসামান্য খুশির হাসি ও আনন্দের ঝিলিক! এখনো যা মনে পড়লে আত্মার গভীরে প্রশান্তি অনুভব করি।

 ফেরার পথে মাওলানা হাবীবুল্লাহ মেছবাহ বললেন, যদি সম্ভব হয় তাহলে হযরত সালমান ফার্সী (রা)-এর বাগানে যাবো।

আমি জানতাম না, হযরত সালমান ফার্সী (রা)-এর বাগান এখনো আছে! সত্যের সন্ধানে পৃথিবীতে এ পর্যন্ত যত মানুষ যত কষ্ট ভোগ করেছে, যত ত্যাগ ও কোরবানি স্বীকার করেছে তাদের মাঝে হযরত সালমান ফার্সী (রা)-এর মর্যাদা অনন্য। এজন্য আল্লাহর পেয়ারা হাবীব তাঁকে এতো ভালোবাসতেন যে, একবার পারস্য থেকে আগত  এই ছাহাবীকে নিয়ে আনছার-মুহাজিরদের মাঝে মধুর প্রতিযোগিতা হলো। মুহাজিরগণ বললেন, সালমান আমাদের। কেননা তিনি পারস্যের স্বদেশ ভূমি থেকে হিজরত করে এসেছেন।

আনছার বললেন, সালমান আমাদের। কেননা নবীর হিজরতের আগে থেকেই তিনি মদীনার বাসিন্দা ছিলেন। আল্লাহর পেয়ারা নবী তখন বলে উঠলেন-

سلمان منا أهل البيت

সালমান তো আমাদের আহলে বাইতের একজন!

এমন অনন্য সৌভাগ্য ছাহাবা কেরামের মাঝে একমাত্র তিনিই লাভ করেছিলেন।

হযরত সালমান ফার্সী (রা)-এর সর্বশেষ ঘটনা এই যে, তিনি এক ইহুদীর বাগানে দাসরূপে কাজ করতেন। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে পরামর্শ দিলেন মুক্তি লাভের জন্য ইহুদী বাগানওয়ালার সাথে চুক্তি করার। ইহুদী শর্ত দিলো, বাগানে নির্দিষ্ট পরিমাণ খেজুর-চারা রোপণ করতে হবে। তাতে যখন ফল আসবে তখন তিনি মুক্তি পাবেন। শর্তের বিবরণ শুনে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং সেই বাগানে তাশরীফ নিলেন এবং আপন পবিত্র হাতে চারা রোপণ করলেন, আর আল্লাহ তাআলা এমন বরকত দান করলেন যে, নবীর মুজিযারূপে অতি অল্প সময়ে খেজুর গাছে খেজুর ধরলো এবং হযরত সালমান ফার্সী (রা) দাসত্বের চরম কষ্টদায়ক জীবন থেকে মুক্তি লাভ করলেন।

মাওলানা হাবীবুল্লাহ মেছবাহ জানালেন, তার আববা (কিংবা দাদা) তার যুগে যখন হজ্ব করেছেন তখন এই বাগানে এসেছিলেন। কিছু গাছ দেখিয়ে বাগানের মালিক নাকি তাকে বলেছিলেন, এগুলো আল্লাহর নবীর মোবারক হাতে লাগানো গাছের বংশ। আর একটি শুকনো কান্ড দেখিয়ে বলেছিলেন, এটি সেই গাছের কান্ড!

 লোকপরম্পরায় খেজুরবাগানটির যখন এ পরিচয় চলে আসছে তখন তা সত্যই হবে আশা করা যায়!

বাগানটি প্রায় বে-আবাদ অবস্থায় এসে পৌঁছেছে, সম্ভবত অনাদর এবং অযত্নের কারণে! এর চেয়ে বড় বড় চিহ্নই তো মুছে ফেলা হচ্ছে, এটা আর বাদ যাবে কেন!

ছড়িয়ে ছিটিয়ে কিছু গাছ এখনো আছে এবং তাতে খেজুরও ধরেছে। বাগানের মালিককে  পাওয়া গেলে একটা দুটো খেজুর চেয়ে নিতে পারতাম। গাছ এবং গাছের খেজুরগুলোর দিকে আমরা মুহাববাতের নযরে তাকিয়ে থাকলাম, যদি জনশ্রুতি সত্য হয়!

আমাদের হাতে আর মাত্র একটি দিন! সুখের দিন দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ার কথা সাহিত্যের পাতায় পড়েছি, জীবনের পাতায় কখনো  তার অভিজ্ঞতা হয়নি। আজ বুঝলাম, সাহিত্যের পাতায় যা লেখা হয় তার সব অবাস্তব নয়। কীভাবে কোন্ দিক দিয়ে দিনগুলো পার হয়ে গেলো এবং রাতগুলো হারিয়ে গেলো! কী জন্য এসেছিলাম? ভুল হলো, আমি আসিনি, দয়া করে আল্লাহ এনেছিলেন। কী জন্য আল্লাহ এনেছিলেন, আর আমি কী করলাম?! জীবনের এমন সৌভাগ্যের দিনগুলো এমন গাফলতে, এমন অবহেলায় হারালাম! হায়, কবি কি আমাদের মত দুর্ভাগাদের কথাই বলেছেন তার কবিতায়? -

বাগানে ফুল ফুটেছিলো, কোথায় ছিলে প্রজাপতি!/ তুমি এলে না, ফুল ঝরে গেলো, বসন্তের হলো ইতি/ এখনো আছে বাগানে ঝরা ফুল, শুকনো পাতা/ যাও না উড়ে, শুনতে পাবে বিগত

বসন্তের কথা।

স্বপ্ন দেখেছিলাম যিয়ারাতে মদীনার! স্বপ্ন দেখেছিলাম সবুজ গম্বুজের! স্বপ্নের মধুর বেদনায় কেটেছে দিনের পর দিন। জীবনের অনেকগুলো বসন্ত পার হয়েছে ফুল ও ফুলের সুবাস ছাড়া! তারপর ঝিরঝির করে রহমতের বৃষ্টি বর্ষিত হলো, আমার স্বপ্নের বাগানে  সবুজ বৃক্ষের শাখায় একটি কলি দেখা দিলো। কিন্তু স্বপ্নের কলি ফুল হয়ে ফোটার আগেই আমার দুর্ভাগ্যের ঝাপটায় তা বৃন্তচ্যুত হলো। একদিনের বাদশাহ যেমন ছিলো তেমনি ভিখারী হয়ে গেলো নিজের অবহেলায় এবং নিজের নির্বুদ্ধিতায়! কিন্তু রহমতের দুয়ার বন্ধ হলো না; রহমতের দুয়ার কখনো বন্ধ হয় না। আকাশ থেকে আবার করুণা বর্ষিত হলো। স্বপ্নের বাগানে আবার কলি দেখা দিলো এবং এবার তা পূর্ণ প্রস্ফুটিত হলো। ভিখারী আবার রহমতের নবীর দরবারে হাজির হলো। যামানার শ্রেষ্ঠ আশিকে নবীর ছোহবত লাভেরও সৌভাগ্য হলো, কিন্তু গাফলতের ঘোর থেকে বের হয়ে আসা সম্ভব হলো না। আর মাত্র একটি দিন আছে আমার সামনে।

প্রতিজ্ঞা করলাম, আজকের দিনটিতে অন্তত চেষ্টা করবো কিছু অর্জনের, কিছু ক্ষতিপূরণের। তুমি তাওফীক দান করো হে আল্লাহ!

 এশার পর হযরতের সঙ্গে মুসাফিরখানায় ফিরে এলাম। আল্লাহর শোকর, আজ রাতে ডাকতে হলো না। নিজে নিজেই ঘুম ভাঙ্গলো। হযরত মুনাজাতে ছিলেন। মুনাজাত শেষে আমাদের জাগাবেন, যেমন প্রতিদিন করেন। আজ আগেই জেগেছি দেখে খুশী হলেন এবং শাবাশি দিলেন। বুড়োর ডাক শোনার আগেই জোয়ান জেগে যাবে, শাবাশির মত কান্ডই তো বটে!

হযরতের পিছনে পিছনে রওয়ানা হলাম। বাবুস-সালাম তখন খোলা হয়েছে। পশ্চিম থেকে পুবের সোজা পথ, যেন ছিরাতুল মুসতাকীমের বাস্তব নমুনা! দুরু দুরু বুকে ধীরে ধীরে অগ্রসর হলাম রাহমাতুল-লিল আলামীনের মহান দরবারের উদ্দেশ্যে। হযরত আমাদের সামনে, আমরা তাঁর পিছনে। এ পথের তিনি পুরোনো পথিক! এ দরবারের তিনি বৃদ্ধ প্রেমিক! তাঁর পিছনে থাকা নিরাপদ। আমরা হাঁটতে জানি না, তিনি যেভাবে হাঁটেন সেভাবে হাঁটার চেষ্টা করবো। আমরা দাঁড়াতে জানি না, তিনি যেভাবে দাঁড়ান সেভাবে দাঁড়াতে চেষ্টা করবো। দুরূদ ও সালামের নাযরানা কিভাবে পেশ করতে হয় জানি না, তিনি যেভাবে পেশ করেন সেভাবে করার চেষ্টা করবো। তাতে হয়ত আমাদেরও নাযরানা কবুল হবে!  হে আল্লাহর নবী, আপনাকে সালাম! হে রাহমাতের নবী, হে পাপী-তাপীর সুফারিশকারী, আপনাকে সালাম! রোয হাশরে উম্মাতি উম্মতি বলে হে বে-কারার নবী, আপনাকে সালাম! আপনাকে সালাম!

 হে শ্রেষ্ঠ উম্মত, হে ছিদ্দীকে আকবার, আপনাকে সালাম! হিজরতের পথে নবীর সঙ্গদানকারী এবং নবীর জন্য সর্বস্ব কোরবানকারী হে আবু বকর, আপনাকে সালাম! আপনাকে সালাম!

উম্মতের দ্বিতীয় সর্বোত্তম হে ফারূককে আযাম, আপনাকে সালাম! খেজুরতলায় ধূলিশয্যায় শয়নকারী এবং তাগুত ও শয়তানের মাঝে ত্রাশ সৃষ্টিকারী হে উমার ইবনুল খাত্তাব, আপনাকে সালাম! আপনাকে সালাম!

হযরতের ছোহবতে, হযরতের পিছনে পিছনে আমাদেরও যিয়ারাত সম্পন্ন হলো। হৃদয় ও আত্মা আজ অনেক বেশী তৃপ্ত হলো, অনেক বেশী প্রশান্তি লাভ করলো; আসমান থেকে যেন অন্যরকম সান্ত্বনা বর্ষিত হলো!  মনে হলো গরীব বান্দার শূন্য পাত্র দেখে হয়ত দাতার দানের ভান্ডারে জোশ এসেছে! হয়ত ভিখারীর করুণ দশায় রহমতের দরিয়ায় জোয়ার এসেছে!

হযরত ইচ্ছা করলেন, আজো তিনি ছুফফার চত্বরে বসবেন। আমরাও তাঁর অনুগামী হলাম এবং সেখানেই তাহাজ্জুদের নামায আদায় করলাম। আরো দুতিনবার ছুফফায় হযরতের ছোহবতে বসেছি; হযরতের যবানে আহলে ছুফফার বিভিন্ন হালাত ও ঘটনা শুনেছি। বারবার পড়া কাহিনী, বারবার শোনা ঘটনা, কিন্তু ছুফফার মাকামে হযরতের যবানে প্রতিটি ঘটনা যেন অন্য রকম এক নূরানিয়াত নিয়ে উদ্ভাসিত হয়! কবির ভাষায়-

একই পানশালায় একই পাত্রে সেই পুরোনো শরাব/ তুমি কে হে নতুন সাকী, নতুন নেশায় মজলো  শাবাব!

এটাই সত্য! শরাবের নেশা জমে সাকীর পরিবেশনগুনে। অতীতের ঘটনাবলীতে নূরানিয়াতের উদ্ভাস ঘটে, যিনি ঘটনা বলেন তার দিলের নূর থেকে। হযরত হাফেজ্জী হুযূরের ছোহবতে এসত্য বারবার আমি উপলব্ধি করেছি। তাই একই ঘটনা হযরতের যবানে আমার বারবার শুনতে ইচ্ছা করতো। আজো প্রতীক্ষায় ছিলাম, হয়ত হযরত কিছু বলবেন এবং তিনি বললেন। তবে অন্য কথা, এমন কথা যা কিছুক্ষণের জন্য আমাকে নির্বাক করে রেখেছিলো। আমার ভিতরে তখন অপূর্ব এক পুলক কম্পন সৃষ্টি হয়েছিলো। হযরত বললেন, মওলবী আবু তাহের! তোমার জন্য একটি দুআ করতে চাই, বলো কী দুআ করবো?

 হে আল্লাহ, এটা কি তোমার পক্ষ হতে নেমে আসা পরীক্ষা, না সৌভাগ্য?! আমি তো বুঝতে পারছি না, আমার কী বলা উচিত! একবার মনে হলো, বলি, হযরত! আপনার যা ইচ্ছা সেই দুআ করুন। হঠাৎ দিলে জেগে উঠলো একটি কথা, আমি ভয়ে ভয়ে কম্পিত কণ্ঠে নিবেদন করলাম, হযরত দুআ করুন, আমার যবানে এবং কলমে যেন ইলমের চশমা এবং নূরের ফোয়ারা জারি হয়।

হযরত মৃদু হেসে বললেন, আচ্ছা এই দুআ করবো, তারপর আমার নিজের পক্ষ হতে একটি দুআ করবো।

আমার সাহস হয়নি, আমি কখনো  জিজ্ঞাসা করিনি, হযরত আমার জন্য কী দুআ করেছেন।  শুধু প্রার্থনা করি, হে আল্লাহ! তোমার পেয়ারা বান্দা তোমার এই গোনাহগার বান্দার জন্য  যখন যে দুআ করেছেন, সব তুমি কবুল করো; তোমার শান মোতাবেক কবুল করো। আমীন।

হযরতের খিদমতে আরয করলাম, হযরত! কিভাবে চাইতে হয়, কিভাবে পেতে হয়, আমি তো কিছু জানি না, আমাকে শিখিয়ে দেবেন!

হযরত বললেন, ইয়াহি বে-কাসী ওয়া বে-বাসী আল্লাহকে হুযূর মেঁ পেশ কর দো।

 (এই নিঃশ্বতা ও রিক্ততাই আল্লাহর কাছে পেশ করে দাও) বান্দার এই মিসকীন-অনুভূতি আল্লাহর খুব পছন্দ!

এশরাক পর্যন্ত হযরত ছুফফায় অবস্থান করলেন। তারপর মাওলানা আতাউল্লাহ ছাহেব হযরতকে নিয়ে ফিরে গেলেন।

সময় যত কমে আসুক, ঘড়ির কাঁটা যত দ্রুত চলুক আমার মত গাফেল ইনসান সেখান থেকেও আরাম ও বিশ্রামের জন্য সময় কেটে নিয়ে আসে। জানি না, মৃত্যুর আগের রাত্রটিও কি ঘুমের শিকার হবে? হে আল্লাহ, তোমার রহমতে আমার আনজাম যেন নেক হয়, যারা আমীন বলবে তাদেরও।

বিশ্রামের আয়োজন করছি, এমন সময় আমার থেকে একটু দূরে দেখলাম একটি দৃশ্য! খুব সাদামাটা একটি দৃশ্য, তবে হৃদয় ও আত্মাকে আপ্লুত করার মত  দৃশ্য! আমি দেখতেই থাকলাম! সারা জীবনে দৃশ্য অনেক দেখেছি, তবে এমন নয়! দুহাত তুলে বসে আছেন আল্লাহর এক বান্দা। ঠোঁটে কোন শব্দ নেই, আছে শুধু সামান্য কম্পন। চোখ থেকে শুধু ঝরছে টপ টপ করে অশ্রুর ফোঁটা, একটার পর একটা!

 হে আল্লাহর বান্দা! জানি না তুমি কোন দেশের, কোন গোত্রের! কী তোমার ভাষা, কী তোমার পরিচয়! তবে আজীবন আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ থাকলাম! তোমার অজ্ঞাতেই তোমার অশ্রুবিন্দুগুলো দ্বারা নিজেকে আমি সিক্ত করে নিলাম!

খুব গভীর ঘুম ছিলো, তবু বলবো না, গাফলতের ঘুম ছিলো। কেন নিজের বিরুদ্ধে নিজে সাক্ষী দিতে যাবো! আমি তো দুআ পড়ে বিশ্রামের নিয়তে ঘুমিয়েছিলাম! আল্লাহ যদি কবুল করেন তাহলে তো এই ঘুমই হয়ে যাবে ইবাদত! আল্লাহর রহমতের কাছে কেন আমি আশা করবো না! অবশ্যই আশা করবো।

যোহর আদায় করার পর হিসাব করে দেখলাম,আছর, মাগরিব, এশা, ফজর ও যোহর - এ পাঁচ ওয়াক্ত নামায মসজিদে নববীতে আদায় করা সম্ভবত আমার কিসমতে আছে। অন্তরে অদ্ভুত এক ভাবের উদয় হলো। বাকি সময়টুকু একা একা থাকবো আল্লাহর নবীর মসজিদে। কারো সঙ্গে দেখা করবো না, এমনকি হযরতের সঙ্গেও না। শুধু আমি থাকবো এবং আমার হৃদয় থাকবে। আজ আমি শুধু আমার নিঃসঙ্গতার সঙ্গী হবো। কে যেন বলেছেন, আব তো আ-জা, আব তো খালওয়াত হো গায়ী!

(এসো এসো প্রিয়তম! এখন তো আছে একান্তের প্রশান্তি!)

 সকালে আল্লাহর বান্দাকে কাঁদতে দেখেছিলাম। আমি কি পারবো না দুহাত তুলে তেমন করে কাঁদতে? তেমন করে ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু ঝরাতে! মসজিদে নববীতে আমি রেখে যেতে চাই আমার শেষ কান্না, শেষ অশ্রুবিন্দু!

যদি কান্না না আসে?! শুকনো চোখ যদি অশ্রুতে না ভেজে?! এই মসজিদের শাহানশাহ বলেছেন-

فإن لم تبكوا فتباكوا

(কাঁদতে যদি না পারো, কান্নার ভান করো।)

সুবহানাল্লাহ! এর পরো কি আমরা বোঝবো না?! রাহমান রাহীম আল্লাহ আমাদের দিতে চান যে কোন সুযোগে, যে কোন উপায়ে এবং যে কোন বাহানায়! তাই তো রহমতের নবীর মাধ্যমে চাওয়ার এবং পাওয়ার কত রকম কৌশল শিখিয়েছেন তিনি তাঁর বান্দাকে!

আল্লাহ যেন বলছেন, আমার নেক বান্দারা কেঁদে কেঁদে বুক ভাসায়; আমার আযাবের ভয়ে, আমার রহমতের আশায় অশ্রুর ঝরণা বহায়। তোমার তো হে বান্দা, সে তাওফীক হয় না! তোমার বুকে তো কান্না জমে না! তোমার চোখ থেকে তো অশ্রু ঝরে না! শক্ত তোমার দিল, মুরদা তোমার কলব, অনুভূতিহীন তোমার হৃদয়! তবু হে বান্দা, তোমাকে আমি দিতে চাই, রহমতের জোয়ারে তেমাকেও আমি ভাসিয়ে নিতে চাই! এক কাজ করো; কাঁদতে পারো না, তো কান্নার ভান করো!

কাঁদতে পারে না সবাই, কিন্তু কান্নার ভান করতে কে না পারে?! তাতেই আমি খুশী হবো। তোমার ভান দেখেই আমার দান নেমে আসবে। কান্নার ভান কেউ পছন্দ করে না, আমি করি!

আল্লাহর নবীর এ হাদীছ আমার অন্তরে ভাবের অপূর্ব এক তরঙ্গ সৃষ্টি করলো এবং আমি উদ্বেলিত হলাম, ভাবের তরঙ্গদোলায় আমি আন্দোলিত হলাম। আশায় আমার বুক ভরে উঠলো। আমার ভিতর থেকে কে যেন আমাকে পথ দেখালো, দরবারে নবীর আশিক তুমি হতে পারোনি, কিন্তু আশিকের ভান ধরে অন্তত একটা দিন তো তুমি অতিবাহিত করতে পারো! আশ্চর্য কী, হয়ত তাতেই আশিকানে রাসূলের দফতরে তোমারও নাম লেখা হয়ে যাবে! তিনি নিজেই তো উম্মতকে সুসংবাদ দিয়ে গেছেন, আল্লাহর কাছে আসলের যেমন কদর আছে তেমনি নকলেরও সমাদর আছে। আসল-নকল সবই তার পছন্দ, পছন্দ নয় শুধু ভেজাল

আছরের নামায হলো। সময় আরো গড়িয়ে গেলো। সবুজ গম্বুজের উপর অস্তগামী সূর্যের আলো পড়লো। এ অস্তগামী সূর্য যেন আজকের নয়, চৌদ্দশ বছরের! রাতের আকাশে তারার উদয় হলো। তারাভরা এ আকাশ যেন আজকের নয়, চৌদ্দশ বছরের। আমি! আমি আজকের! আমি বর্তমানের! কিন্তু আমার পরিচয় দূর অতীতের, চৌদ্দশ বছরের! আমি নামায পড়ি ইমারতসজ্জিত এই মসজিদে, কিন্তু সিজদা করি খেজুরপাতার সেই মসজিদে! আমি এই, কিন্তু আমি সেই!

এশার নামাযের পর হযরতের সঙ্গে দেখা করলাম মসজিদের ঐ স্থানে যেখানে বসে হযরত সবসময় যিয়ারাত করেন সবুজ গম্বুজের! হযরত আমার দিকে তাকালেন। কিছু যেন জিজ্ঞাসা করবেন, কিন্তু করলেন না। আমি আরয করলাম, হযরত শেষ রাতটা মসজিদে থাকতে চাই, বাইরে টিনের ছাউনীর নীচে। হযরত অনুমতি দিলেন। মুসাফিরখানায় ফিরে এলাম। কিছু শুকনো খাবার ছিলো; হযরত আমাকে দিলেন। তা নিয়ে আমি মসজিদে নববীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম।

মদীনা শরীফের প্রথম দিনেই হযরত বলে দিয়েছিলেন নযর নীচের দিকে রেখে চলার কথা। হযরত বলেছিলেন, নযরের খেয়ানত সবসময় এবং সবখানেই কবীরা গোনাহ, কিন্তু হজ্বের সময় পবিত্র ভূমিতে আরো বড় গোনাহ, আরো বড় বরবাদির কারণ। কিন্তু আজ নিজের অজান্তেই আমার ব্যাকুল ব্যথিত দৃষ্টি চারদিকের সবকিছু অনুসরণ করতে লাগলো। আগামী রাতে আমার এই পথে আর হাঁটা হবে না। মুসাফিরখানার সামনে এই যে মাঠ, সকালে-বিকালে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা খেলাধূলা করে; সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বড়দের এবং বুড়োদের কফি ও গল্পের আসর বসে, এই মাঠ আমি আর দেখতে পাবো না! এই যে একটু দূরে আধুনিক বুকশপ মাকতাবাতুছ-ছাকাফাহ, ঐ যে ওখানে দ্বীনী কিতাবের বিশাল কুতুবখানা মাকতাবাতুল  ঈমান, প্রতিদিন এখানে ওখানে কত রকম কিতাব দেখেছি, আর কিতাব সংগ্রহের অপারগতায় আফসোস করেছি, এখানে আর আসা হবে না! মদীনার পথে পথে আর হাঁটা হবে না! মদীনার খেজুর বাগান আর দেখা হবে না! এই সব ভাবছি, আর ভিতর থেকে কেমন একটা কষ্ট, ব্যথা ও কান্না উঠে উঠে আসছে এবং সমগ্র হৃদয়কে আচ্ছন্ন করে ফেলছে।

উত্তর,পূর্ব ও পশ্চিম দিকের বিশাল এলাকায় টিনের ছাউনী স্থাপন করা হয়েছে। এটা অস্থায়ী ব্যবস্থা। মসজিদুন-নবী এখন বিশাল আকারে সম্প্রসারিত হবে, সেই আয়োজন চলছে। মসজিদ তখন আরো বড় হবে, আরো সুন্দর হবে। আরো বিপুল সংখ্যায় আশিকানে মদীনার আগমন হবে। অনেক কিছু হবে; আমি শুধু থাকবো না, আমি শুধু দেখবো না। যেদিকে তাকাই সেদিকে বিষাদের ছায়া এবং বেদনার সুর! বিদায় তো অনিবার্য। একদিন এসেছি, একদিন যেতে হবে, এ তো অমোঘ সত্য! কিন্তু বিদায় যে এত কষ্টের, এত বেদনার, এত স্পষ্ট করে তা বুঝতে পারিনি কখনো।

আবার ভাবি, আচ্ছা! এত কষ্ট হচ্ছে কেন?! মদীনার আসন্ন বিচ্ছেদ আমাকে এত কাঁদাচ্ছে কেন?! মদীনার প্রতি ভালোবাসার জন্যই তো! তাহলে তো এটা আনন্দের এবং সৌভাগ্যের! তাহলে তো আমার কিসমতের সিতারা উদিত হয়েছে! তাহলে তো আমার হৃদয়-উদ্যানে প্রেমের কলি এসেছে, ভালোবাসার ফুল ফুটেছে!

এভাবে অনেকরকম ভাবের দোলায় আমি যখন দুলছি তখন সময় কিন্তু থেমে ছিলো না, সময় কখনো থেমে থাকে না। তাহাজ্জুদের আযান হলো। আহা, আযানের সুর কী সুমধুর! যুগ যুগ ধরে মদীনার সব মুআয্যিনের কণ্ঠেই কি এভাবে ফিরে ফিরে আসে বিলালী আযানের সুর! আল্লাহর রাসূলের প্রিয় মুআয্যিন, হে সাইয়েদেনা বিলাল! আপনি শুয়ে আছেন সুদূর শামদেশের মাটিতে। আপনার কবর যদি হতো মদীনায়! জান্নাতুল বাকীতে! আল্লাহর নবী কত ভালোবাসতেন আপনাকে, জীবদ্দশায়, এমন কি মৃত্যুর পর! সুদূর শামদেশে স্বপ্নযোগে আপনার দেখা হলো আল্লাহর নবীর সঙ্গে। আল্লাহর নবী অনুযোগ করে বললেন, বেলাল! তুমি কি ভুলে গেছো আমাকে? তবে কেন মদীনায় আসো না? স্বপ্ন থেকে আপনি জেগে উঠলেন ব্যাকুল বে-কারার হয়ে। তারপর রওয়ানা হলেন সুদূর শাম থেকে মদীনার উদ্দেশ্যে।

কত কঠিন ছিলো সে যুগের সফর! কঠিন ছিলো, কিন্তু বাঁধা ছিলো না। এখন কত আরামের সফর! আরামের, কিন্তু সহজ নয়। এখন অনেক রকম বাঁধা, নিয়মের অনেক বেড়াজাল।

সুদূর শামদেশ থেকে আপনি ছুটে এলেন আপনার প্রিয় মদীনায়। যিয়ারাত করলেন আপনার পিয় হাবীবের কবর! তারপর ঘটলো সেই ঘটনা, যা ইতিহাসের পাতায় বারবার পড়েছি, অনেকের মুখে অনেকবার শুনেছি। প্রিয় নবীর আদরের নাতি, মা ফাতেমার কলিজার টুকরা ইমাম হাসান-হোসায়ন আব্দার জানালেন আযান দেয়ার। সে আব্দার রক্ষা না করে কি পারা যায়!

অনেক দিন, হাঁ, অনেক দিন পর মদীনার বাতাসে আপনার কণ্ঠের আযান ধ্বনিত হলো, আর মদীনার ঘরে ঘরে কান্নার রোল পড়ে গেলো। পেয়ারা নবীর নূরানি যামানা শুধু আপনার আযানের সুর ধরে যেন ফিরে এলো, তাই মদীনায় কান্নার রোল পড়ে গেলো। মদীনার যুবক-বৃদ্ধ সবাই ছুটে এলো। আপনাকে বুকে জড়িয়ে ধরে জারজার হয়ে কাঁদলো।

আপনাকে আবার ফিরে যেতে হলো জিহাদের ডাকে, কিন্তু আপনার আযানের সুর রয়ে গেলো মদীনায়! এত যুগ পরে আজো আমরা শুনতে পাই মদীনার আযানে আপনার আযানের সুর! আর দুটি মাত্র আযান আমি শুনতে পাবো মদীনার!

বাবে সালাম দিয়ে  প্রবেশ করলাম। এখন আমি যিয়ারাত করবো, তবে বিদায়ের যিয়ারাত নয়। আরো সুযোগ আছে আমার যিয়ারাত করার। আরো একবার, হয়ত আরো কয়েকবার।

সোজা পথ ধরে ধীরে ধীরে আমি এগিয়ে গেলাম। আমার সামনে আজ হযরত হাফেজ্জী হুযূর নেই। তাহলে কে আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন? আসল কথা শোনো বন্ধু! সবকিছু হলো পর্দা। তুমি নেককার, আমি বদকার, এটা সত্য। তবে এটাও সত্য যে, তুমি যার বান্দা, আমিও তাঁরই বান্দা। তোমাকে যিনি পথ দেখান, আমাকেও তিনিই পথ দেখান। আজ এই একা একা যিয়ারাতে আমি যেন পর্দার আড়ালের সেই সত্যকে অন্তর দিয়ে অনুভব করলাম। হাত ধরে, পথ দেখিয়ে কেউ যেন আমাকে নিয়ে গেলো এগিয়ে! আমার না হলো ভয়, না হলো দ্বিধা-সংকোচ। আমি যেন একটি আশ্বাসবাণী পেলাম, চলো বান্দা, এগিয়ে চলো। আমার হাবীবের দরবারে সালামের নাযরানা পেশ করো। আদবের যদি ভুল হয়, ভয়  করো না, আমি মাফ করে দেবো।

আমার আল্লাহ আমার সব, এছাড়া যা কিছু তা হলো পর্দা। আমার পেয়ারা রাসূল আমার সব, এছাড়া যা কিছু সব হলো পর্দা। পর্দার অবলম্বন অবশ্যই আমার প্রয়োজন, কিন্তু মাকছূদ আমার পর্দার আড়ালের সত্য, অন্য কিছু নয়। সেই পরম সত্যের একটুখানি স্পর্শ যেন আমি আজ লাভ করলাম এই একা একা যিয়ারাতে।

 হে আমার প্রিয় ভাই! যতবার তুমি তোমার পেয়ারা হাবীবের দরবারে হাযির হবে, যতবার তুমি সালামের নযরানা পেশ করবে, অন্তরের অন্তস্তল থেকে যদি বলতে পারো, হে আল্লাহ! আমি কিছু জানি না, তুমি আমাকে তোমার পেয়ারা হাবীবের যিয়ারাত করিয়ে দাও, তাহলে তোমার কোন ভয় নেই। তিনিই তোমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবেন পেয়ারা হাবীবের দরবারে। তোমার মনে হবে, তুমি একা নও, তিনি আছেন তোমার সঙ্গে। তখন তুমি অর্জন করবে নতুন কিছু । নতুন স্বাদ, নতুন আনন্দ, নতুন অনুভব-অনুভূতি এবং আলোর নতুন উদ্ভাস! আজকের যিয়ারাত আমার জন্য নিয়ে এলো তেমনি এক নতুন প্রাপ্তির প্রশান্তি! সবই আমার আল্লাহর দান! সবই আমার আল্লাহর করুণা ও মেহেরবানি! শোকর আলহামদু লিল্লাহ!

রাওযাতুল জান্নায় বসার নছীব আবার হয় কি না হয়,

যিয়ারাতের পর তাই রাওযাতুল জান্নায় প্রবেশ করলাম। তাহাজ্জুদ আদায় করে কিছুক্ষণ তিলাওয়াত করলাম। তারপর প্রাণভরে সবকিছু দেখলাম। উসতুওয়ানা আয়েশা, উসতুওয়ানা আবু লোবাবা, উসতুওয়ানা হান্নানা এবং উসতুওয়ানাতুল অফদ, একে একে প্রতিটির উপর কোমল করুণ দৃষ্টি বুলালাম। আল্লাহর নবীর মেহরাব দেখলাম আদব ও মুহাববাতের নযরে। প্রাণভরে দেখলাম সবকিছু সম্ভবত বিদায়ের দেখা।

আমার সামনে জ্বলজ্বল করছে যেন নূরের হরফে লেখা সেই হাদীছ, সেই পরম আশ্বাসবাণী-

ما بين بيتي ومنبري روضة من رياض الجنة.

আমার ঘর এবং আমার মিম্বরের মাঝখানে যা আছে তা জান্নাতের একখন্ড বাগান!

রাহমানের রাহীমানা শান ভেবে আমি কূলকিনারা পাই না। দুনিয়াতেই জান্নাতের বাগিচা কেন সাজালেন তিনি! বান্দার প্রতি এত দয়া! এত মায়া! বিশাল কোন আয়তন নয় জান্নাতের এ বাগিচা! মাত্র কয়েক গজের ছোট্ট একটি খন্ড! কিন্তু আল্লাহর এমন একজন বান্দা তুমি খুঁজে পাবে না, যিনি দরবারে মদীনায় এসেছেন, অথচ জান্নাতের বাগিচায় প্রবেশের এবং অন্তত দুরাকাত নামায আদায়ের সৌভাগ্য তার জুটেনি! লক্ষ লক্ষ আশিক বান্দা আসেন এবং ঐ একটুকরো জান্নাতের বাগিচায় প্রবেশ করেন। নেককার বান্দা, তিনিও প্রবেশ করেন; গোনাহগার বান্দা, সেও প্রবেশ করে। পাপের পঙ্কিলতায় ডুবে যাওয়া বান্দা, সেও বাদ পড়ে না। আল্লাহর কুদরত ছাড়া এ কিভাবে সম্ভব! আল্লাহর দয়া ও রহমত ছাড়া এ কিভাবে সম্ভব!

আমি বিশ্বাস করি, রাহীম ও রাহমানের দয়া ও করুণার কাছে আমি আশা করি, জান্নাতের বাগিচায় একবার যে প্রবেশ করেছে, সে কিছু না কিছু পেয়েছে। এমনকি সে যার যার জন্য দুআ করবে তারাও কিছু না কিছু পাবে!

আমার ভাবতে খুব ভালো লাগলো, এখানে এই জান্নাতের বাগিচায় আমার বাবা এসেছিলেন! নিশ্চয় আমার জন্য তিনি দুআ করেছিলেন! হে আল্লাহ, আমার মাকেও তুমি এখানে হাযির করো। তোমার দুয়ারে মায়ের জন্য এটা এক

সন্তানের মিনতি!

 হে আল্লাহ, যে ছোট্ট এক মা তুমি আমাকে দান করেছো সেও যেন আসতে পারে এখানে তোমার দয়ায়।

হে আল্লাহ, আমার সন্তানকে ধারণ করে যে এত কষ্ট করেছে সেও যেন বাদ না পড়ে তোমার হাবীবের সাজানো এই জান্নাতি দস্তরখান থেকে। হে আল্লাহ,

 প্রসবকালে তার যে চিৎকার  শুনেছিলাম অন্তত সেজন্য তাকে তুমি এ সৌভাগ্য দান করো।

একে একে সবার জন্য দুআ করলাম। ভাইবোনদের জন্য, আসাতেযা কেরামের জন্য, আমার ছাত্রদের জন্য, বন্ধুদের জন্য এবং দুনিয়ার সকল মুসলিমের জন্য। বিশেষ করে ইরাক-ইরানের ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ বন্ধের জন্য।

ফজরের আগে ছুফ্ফার মজলিসে হাযির হলাম। ছুফ্ফার মজলিস সবার প্রিয় স্থান, সবারই ভালোবাসার স্থান। তবে একজন তালিবে ইলম যখন ছুফ্ফার মজলিসে হাযির হয় তখন সে যে আপনত্ব অনুভব করে, তার

অন্তরে যে ভাবের উদয় হয় এবং তার হৃদয়ে আনন্দ ও পুলকের যে তরঙ্গ জাগে তার সত্যি কোন তুলনা নেই। একজন তালিবে ইলম যখন ওয়াবিহী হাদ্দাছানা বলে এবং আন আবী হোরায়রাতা পড়ে তখন তো সে যুগের ব্যবধান এবং দেশের সীমানা অতিক্রম করে ছুফ্ফার মাকামে হাযির হয়ে যায় এবং আহলে ছুফ্ফার সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়! এরপর দুনিয়ার মানুষের কাছে তার কী চাওয়ার এবং কী পাওয়ার থাকতে পারে?!

ফজরের পর সেই স্থানে হযরত হাফেজ্জী হুযূরের খিদমতে হাযির হলাম। হযরত কলজে ঠান্ডা করা একটি কথা বললেন। এই শুভ্র-পবিত্র মানুষটি আমার অনেক স্খলনের কথা জানতেন, বুঝতেন, তবু আমাকে স্নেহ করতেন। বলতে পারো, সাদা রুমাল দিয়ে তিনি আমাকে ঢেকে রাখতেন। যত দিন তিনি দুনিয়াতে ছিলেন আমাকে মুহাববাত করেছেন এবং আমার তরক্কীর ফিকির করেছেন। কিন্তু .. আলো কিভাবে তোমার পথ আলোকিত করবে, তুমি যদি চোখ বন্ধ করে রাখো। হয়ত আমার চোখ বন্ধ ছিলো, নইলে এমন আলোর স্পর্শ লাভ করেও কেন আমি আজ ..!

হযরত বললেন, আজ রাত্রে আমি তোমার রূহানি তরক্কীর জন্য অনেক দুআ করেছি।

হযরত যখন একথাগুলো বলছিলেন, তাঁর দৃষ্টি ছিলো সবুজ গম্বুজের দিকে। আমার চোখে তখন আনন্দের অশ্রু; আমিও তাকালাম অশ্রুসিক্ত চোখে সবুজ গম্বুজের দিকে।

আমি বললাম, হযরত আমিও রাওযাতুল জান্নায় আপনার জন্য দুআ করেছি।

হযরত হাসিমুখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, কি দুআ করেছো?

বললাম, দুআ করেছি, আল্লাহ যেন দুই মুসলিম দেশের মাঝে রক্তপাত বন্ধে আপনার মেহনতকে কবুল করেন। হযরত খুশী হয়ে বললেন, আমীন।

একসময় আমি আরয করলাম, হযরত! বিদায়ের সময় যত করিব হচ্ছে কলবের ব্যথা-বেদনা ততই যেন বেড়ে চলেছে। আর যেন সহ্য হতে চায় না।

হযরত খুব স্বাভাবিকভাবে বললেন। যেন খুব সাদামাটা একটা কথা, যা সবাই জানে এবং বোঝে এমনভাবে বললেন এবং আমার সারা জীবনের জন্য তা আলোকবর্তিকা হয়ে গেলো। তিনি বললেন, তুমি বিদায় হবে কেন?! সারা যিন্দেগির জন্য তুমি মদীনায় থেকে যাও। জিসিমের দুনিয়ায় যেখানেই থাকো, কলবের জাহানে মক্কায় এবং মদীনায় বাস করো; তখন দেখবে, বিছাল ও ফিরাক (মিলন ও বিরহ) তোমার কাছে একরকম হয়ে গেছে।

হযরতের এ কথা আমার সামনে যেন রহস্যের নতুন এক জগত উন্মুক্ত করে দিলো, যা এত দিন আমার কাছে ছিলো একেবারে অজানা। মুহূর্তের ব্যবধানে আমি যেন নবজন্ম লাভ করলাম, আমি যেন আজ এক নতুন বর্ণমালার পাঠ গ্রহণ করলাম।

মদীনার শেষ আযান শুনলাম। যোহরের জামাত হলো। হযরত আমাদেরকে বিদায়লগ্নের প্রয়োজনীয় উপদেশ দিলেন। বললেন, দেখো; আমাদের তো মদীনায় আসার এবং থাকার কোন যোগ্যতা ছিলো না। মদীনায় আসার যোগ্যতা ছিলো যাদের তাঁরা তো এখানে শুধু নূর দেখতেন। এটা তো শুধু আল্লাহর ফযল ও করম যে, তিনি আমাদেরকে তাঁর হাবীবের দরবারে হাযির হওয়ার তাওফীক দান করেছেন। কিন্তু আমরা মদীনার কোন আদব রক্ষা করতে পারি নাই। রাওযা আতহারের শান বজায় রাখতে পারি নাই। আমাদের দ্বারা শুধু বেহুরমতি হয়েছে। তাই এখন আমাদের শরমিন্দা ও লজ্জিত হওয়া দরকার, আফসোস ও অনুতাপ করা দরকার, তাওবা ও ইসতিগফার করা দরকার, যেন আল্লাহ আমাদের সব কুছূর মাফ করে দেন। তিনি যেন আপন হাবীবের ফুয়ূয ও বারাকাত দ্বারা আমাদেরকে মালামাল করে দেন। আমরা যেন খোশনছীব হয়ে মদীনা থেকে বিদায় নিতে পারি।

খুব স্বাভাবিক কিছু কথা, যে কেউ বলতে পারে, যে কেউ শুনতে পারে এবং যে কোন কিতাব থেকে তা হাছিল করা যেতে পারে। কিন্তু কথা যখন বের হয়ে আসে কলব থেকে তখন প্রতিটি শব্দ হয়ে যায় নূর এবং শ্রোতার কলবকে দান করে আশ্চর্য এক নূরানিয়াত। আমাদের মত মুরদা দিলেও যেন সেই নূরানিয়াতের কিছুটা ছায়াপাত হলো। আমরা যেন নতুন এক অনুভব-অনুভূতি লাভ করলাম।

এবার বিদায় যিয়ারাত। ফুরিয়ে গেলো স্বপ্নের দিনগুলো এবং সৌভাগ্যের মুহূর্তগুলো। এবার বিদায় সালাম। যারা অনেক পেয়েছে তারা শেষ মুহূর্তের প্রাপ্তি ছাড়তে রাজি নয়। যারা কম পেয়েছে তারা শেষ মুহূর্তে আরো কিছুটা পেতে চায়। যারা কিছুই পায়নি তারা ভাবছে,  অন্তত শেষ মুহূর্তে যেন কিছু পাওয়া যায়। মোটকথা, আশায় বুক বেঁধে আমরা সবাই হযরতের পিছনে পিছনে এগিয়ে চললাম, আমাদের কাফেলা আজ বিদায় কাফেলা! প্রতিদিন যেমন ছিলো, আজো আশিকানে রাসূলের তেমনি মওজ, তেমনি তরঙ্গ! দুরূদ ও সালামের আজো তেমনি সুমধুর গুঞ্জন! গতকাল যেমন ছিলো আজো তেমনি আছে, আগামীকালও তেমনি থাকবে; শুধু আমরা থাকবো না।

ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছি। এই মহান দরবারের দিকে প্রতিটি পদক্ষেপ যেন জীবনের শেষ পদক্ষেপ! একটু একটু করে যেন ফুরিয়ে আসছে! আমি যেন ফুরিয়ে যাচ্ছি!

এসে গেছি! হযরতের পিছনে পিছনে আমরা এসে গেছি রাওযা শরীফের মাকামে বিদায় সালাম জানাতে! কিন্তু আশ্চর্য! বিদায়ের এবং বিচ্ছেদের বিষাদ-বেদনার কোন চিহ্ন নেই আমাদের হযরতের মুখমন্ডলে! তাঁর আজকের মত এমন শান্ত-সমাহিত রূপ আমি আর দেখিনি। আমি নিজে তো জানি না কিছু, বুঝি না কিছু; প্রেম কাকে বলে? প্রেমিকের বিদায় কেমন? কাকে বলে ইশকের খুশি-গম? কেমন হয় আশিকানের বিদায় সালাম? তাই হযরতকে দেখে হযরতের অনুকরণকেই নিরাপদ মনে করলাম। হৃদয়ের বেদনা হৃদয়ে সুপ্ত রেখে, ভিতর থেকে উথলে ওঠা কান্নাকে সংযত করে আমিও শান্ত-সমাহিত রূপ ধারণের চেষ্টা করলাম।

জিসমের বিদায় হলেও এ তো কলবের বিদায় নয়! দেহের দূরত্ব হলেও এ তো হৃদয়ের দূরত্ব নয়!

 যেখানেই থাকি, আমি এখানেই আছি এবং ইনশাআল্লাহ এখানেই থাকবো নবীর পবিত্র জীবন অনুসরণের মাধ্যমে, নবীর সুন্নাহর উপর আমল করার মাধ্যমে এবং নবীর রেখে যাওয়া দ্বীনের জন্য জিহাদ ও মুজাহাদার মাধ্যমে! সুতরাং আমার এ বিদায় তো বিদায় নয়, মিলনেরই অন্য রূপ!

হযরত বিদায় সালাম আরয করলেন, আমরাও করলাম-

الصلاة والسلام عليك يا رسول الله!

হযরতের গলার আওয়ায কি একটু কম্পিত হলো! ভিতরের কম্পন কি কণ্ঠস্বরেও প্রকাশ পেলো! হয়ত তাই! অর্থাৎ বাইরে তাঁর শান্তরূপ, কিন্তু ভিতরে চলছে ভাবের ঢেউ, আবেগের তরঙ্গ এবং বিচ্ছেদ-বেদনার অনলপ্রবাহ! এসবেরই ক্ষীণতম আভাস যেন পেলাম হযরতের সালাম আরযের কম্পিত কণ্ঠস্বরে! আর তাতেই আমার সংযম শিথিল হয়ে গেলো; আমার নীরব কান্না শব্দ হয়ে বের হলো এবং দু'চোখ বেয়ে অশ্রুর ঢল নেমে এলো। আমি আত্মহারা হলাম, তবে খুব সামান্য সময়ের জন্য। আবার আমার সবকিছু সংযত হলো, আবার আমি দুরূদ ও সালাম আরয করলাম-

الصلاة والسلام عليك يا رسول الله!

হঠাৎ মনে হলো, আল্লাহর যিনি হাবীব তিনি তো রাহমাতুল লিল আলামীন! তিনি তো রাহমাতের নবী! তিনি তো শাফাআতের নবী! তাঁর শাফাআত ছাড়া তো উম্মাতের কোন গতি নেই! সুতরাং পেয়ারা নবীর রাহমাত ও শাফাআতের কথা স্মরণ করে আবার দুরূদ ও সালাম আরয করলাম-

الصلاة والسلام عليك يا رسول الله!

তারপর সালাম আরয করলাম প্রথম খলিফা হযরত ছিদ্দীকে আকবার এবং দ্বিতীয় খলিফা হযরত ফারূকে আযামের খিদমতে।

এর পর আমাদের হযরত হুজরা শরীফের ডান দিক দিয়ে কদম মোবারাকের দিকে এসে বসলেন। এখানে অনেক্ষণ তিনি ধ্যানমগ্ন হলেন। কিসের ধ্যান, কিসের মগ্নতা, তা জানার সাধ্য কোথায় আমাদের! আমার শুধু মনে হলো,

হযরতের সঙ্গে যদি না হতাম তাহলে নবীজীর কদম মোবারাকের সামনে বসার সৌভাগ্য আমাদের হতো না। আমরা জানতেই পারতাম না, এখানে বসা যায়! এখানে পাওয়া যায়! উম্মাতের সৌভাগ্যবান যারা যুগে যুগে এই পাক কদমের ছায়ায় বসেছেন তারা। বহু যুগ আগে বলে গেছেন নবীর প্রেমিক কোন এক কবি-

নাই বা হলো তোমার কদমের দীদার/ নাই বা পেলাম তোমার কদমের গোবার/ ঠাঁই তো পেলাম কদমের নীচে তোমার!/ এ-ই তো কপাল আমার, কপাল আমার!

হযরতের ধ্যাননিমগ্নতা সামাপ্ত হলো। তাঁর মুখমন্ডলে আমাদের স্থূল চোখেও আমরা যেন নতুন এক জ্যোতির্ময়তা দেখতে পেলাম, হয়ত কদম মোবারাকের সান্নিধ্যের জ্যোতির্ময়তা! আমরা সঙ্গে ছিলাম এ অনুভূতি এখনো হৃদয়ে আনন্দের পুলকশিহরণ জাগায়!

বাবে জিবরীল দিয়ে বের হয়ে হযরত একটু দাঁড়ালেন। নির্নিমেষ দৃষ্টিতে পূর্বদিকে তাকিয়ে থাকলেন। ধীরে ধীরে তাঁর চোখ আবার অশ্রুসিক্ত হলো। আমরা বুঝলাম, তিনি জান্নাতুল বাকীর সৌভাগ্যবান বাসিন্দাদের স্মরণ করছেন এবং তাদের উদ্দেশ্যে সালাম নিবেদন করছেন। তারপর তিনি সবুজ গম্বুজের দিকে প্রেমপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন, আর তখনই তাঁর চোখ থেকে ঝরঝর করে অশ্রু ঝরে পড়লো। তাতে আমাদেরও হৃদয় বিগলিত হলো এবং আমাদেরও চোখ থেকে অশ্রুর ধারা নেমে এলো।

এবার আমরা রওয়ানা হবো মক্কার পথে পবিত্র হজ্বের উদ্দেশ্যে।

(চলবে, ইনশাআল্লাহ)

 

 

advertisement