জুমাদাল উখরা ১৪৩৫   ||   এপ্রিল ২০১৪

আমরা কোন্ পথে?

আমীর হামযা

সতেরো শতকের পৃথিবীতে নতুন একটি হাওয়া বইতে লাগল। পশ্চিম থেকেই এই হাওয়া বইতে শুরু করেছিল। তাই পশ্চিমাদেরকে এ বাতাস প্রথম স্পর্শ করল। এ ছিলো বস্ত্তবাদের বাতাস। নতুনের প্রতি মানুষের যে স্বাভাবিক আকর্ষণ থাকে, সে আকর্ষণ থেকে তারা একে স্বাগত জানালো। এর বাহ্যিক চাকচিক্য ও পোশাকের ঝলমলানি তাদেরকে ধোঁকায় ফেলে দিল। তারা আসল চেহারা চিনতে পারল না। বাস্তবে এ বাতাস ছিলো খুবই বিষাক্ত ও মানবতা বিধ্বংসী। যা নীতি-নৈতিকতার মৃত্যু ঘটায়। পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক সম্প্রীতি ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়।

সেসময় তারা এর চোখধাঁধানো চাকচিক্যে মুগ্ধ হলেও আজ তাদের সামনে এর মুখোশ খুলে গেছে। আসল চেহারা প্রকাশ পেয়ে গেছে। তাই তারা এর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে।

তাদের কাছে আজ কোন বংশপরিচয় নেই। মায়ের নামে তারা নিজেদের পরিচয় দেয়।  (যদিও মায়ের নামে পরিচয় দেওয়াকে নারীর অধিকার বলে চালিয়ে দেয়, কিন্তু আসল উদ্দেশ্যটা ভিন্ন। তেমনি দেহ-প্রদর্শন থেকে নিয়ে আর দশটা বিষয়েও তারা নারীদের এমন ধোকায় ফেলে রেখেছে।) পরিবার ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। জন্মহার কমে গেছে। কিছুটা বুঝমান হলে মাতৃস্নেহ থেকেও তারা বঞ্চিত হয়। কারণ, সন্তানের মা তখন নতুন কোন বয়ফ্রেন্ডের খোঁজে বেরিয়ে পড়ে।

অনেক ক্ষেত্রে এমন হয়, গর্ভে বাচ্চা এসে যাওয়ার পর বয়ফ্রেন্ড গার্লফ্রেন্ডকে ফেলে চলে যায়। তখন গর্ভধারণকালীন জটিলতা, সন্তান প্রসব ও লালন-পালনের মত কষ্টকর ও কঠিন কাজগুলো একজন অসহায় নারীকে একাই আঞ্জাম দিতে হয়। অথচ একটি পরিবারের পাঁচ-সাতজন লোক মিলেও এ কাজগুলো সামাল দিতে হিমশিম খায়। চিন্তা করুন, একজন অসহায় নারীর জন্য এ মুহূর্তগুলোতে একা থাকা কত কঠিন হতে পারে! এখানেই কষ্টের শেষ নয়। আলাহর নাফারমানীতে রাতদিন ডুবে থাকার কারণে তাদের নবজাতকদের উলেখযোগ্য একটা সংখ্যা পূর্ণাঙ্গ হওয়ার আগেই দুনিয়াতে এসে পড়ে অথবা বিকলাঙ্গ হয়ে জন্মগ্রহণ করে। এ-ও এক খোদয়ী গযব।

একটা মেয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হতে না হতেই তাকে স্বামী খোঁজার মতো কঠিন সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে হয়। এজন্য কতজনের কাছে যে নিজ দেহকে সঁপে দিতে হয়! তবুও পছন্দ না হলে কিছু করার নেই। অন্যজনের পিছু নিতে হয়। এভাবে স্বামী খুঁজতে গিয়ে হয়তো তিন সন্তানের মা হয়ে যায়। কিন্তু কপালে স্বামী জুটে না। ওদিকে যৌবন পেরিয়ে গেলে স্বামী কেন, বয়ফ্রেন্ডও জুটে না। তখন ওল্ডহোমই হয় তার ঠিকানা। আশ্চর্য হলো, ওখানে একই পেশায় একই যোগ্যতায় একজন নারীকর্মীর বেতন পুরুষের চেয়ে অনেক কম। এই হলো তাদের নারীঅধিকার

বস্ত্তবাদী চিন্তাধারার কারণে ওদের কাছে নারীর নারীত্বের কোন মর্যাদা নেই। আছে শুধু নারীর যৌবন ও সৌন্দর্যকে ভোগ করার লালসা। এ লালসাকে চরিতার্থ করতে নারীদেরকে আকর্ষণীয় ও চটকদার শোগান শুনিয়ে তারা প্রথমে ঘর থেকে বের করে এনেছিল। আজ নারীদের এ দশা করে ছেড়েছে। পুরুষেরা তাদের খাহেশ পুরো করে নারীকে বিপদে ফেলে চম্পট দেয়। বেরিয়ে পড়ে নতুন শিকারের সন্ধানে। কারণ তাদের মাঝে তো আর সতিত্ব বলতে কোনো বিষয় নেই। অনেক ক্ষেত্রে সন্তান গর্ভে আসার মতো কোন রিস্কও নেই। আছে শুধু পশুর মতো চাহিদা মিটিয়ে জীবনকে উপভোগ করার আকাঙ্ক্ষা। এসব কিছু করেও তারা শান্তি পায় না। অশান্তির আগুনে প্রতিনিয়তই দগ্ধ হয়। তাই অনেকেই সেখানে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়!

প্রশ্ন হলো, পাশ্চাত্যে নারীর যে করুণ চিত্র-এ পর্যন্ত তারা কীভাবে পৌছেছে? তাদের বংশপরিচয় কীভাবে মুছে গেল? কীভাবে ভেঙ্গে পড়লো পরিবার ব্যবস্থা? এগুলো কি একদিনে হয়েছে? না, এগুলো একদিনে ঘটেনি। প্রথমেই তো আর পরিবার ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েনি কিংবা বংশ পরিচয় হারিয়ে যায়নি। আস্তে আস্তে হয়েছে। প্রথমে নারীরা কর্মবণ্টন নীতি ভেঙ্গে ঝাঁকে ঝাঁকে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। এভাবে তারা সুরক্ষিত কর্মক্ষেত্র ছেড়ে পর-পুরুষের হাতের নাগালের ভিতর চলে এসেছে। ফলে একদিকে হস্ত ও কুটির শিল্প অচল হয়ে পড়ল। অন্যদিকে পারিবারিক জীবন হয়ে উঠল অশান্তিময়। স্বামী-স্ত্রীর মাঝে অনাস্থাভাব সৃষ্টি হল এবং একে অপরকে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করলো। তখন বিবাহ-বিচ্ছেদের হার বেড়ে গেল।

এ সময় উচিত ছিলো, কর্মবণ্টন নীতির প্রতি সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধাবোধ তৈরী হওয়া এবং নারী-পুরুষের সহাবস্থানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা। কিন্তু তা না করে মানুষ উল্টো বৈবাহিক জীবনকে গুডবাই জানাতে শুরু করলো। কারণ বিবাহ ছাড়াই যেহেতু বিবাহ-পরবর্তী কাজ সেরে নেওয়া যাচ্ছে তাহলে আর বিবাহের প্রয়োজনটা কী? এরপর এ পথেই তারা এতদূর পৌঁছেছে। এটা ঠিক সেই পথ, যে পথে আমরা এখন হাঁটছি। আমাদের পারিবারিক জীবনে অশান্তির বিষয়টি এখন খুবই স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিবাহ-বিচ্ছেদের হার আশংকাজনকভাবে বাড়ছে। তাই আমাদেরকে ভাবতে হবে, আমরা কোন পথে অগ্রসর হচ্ছি?! আমরা কি তাদের জীবন থেকে শিক্ষা নেব না? নিজেদেরকে তাদের মতো পরিণতির দিকেই ঠেলে দেব?! আলাহ আমাদের হেফাজত করুন। আমীন। 

 

 

advertisement