রবিউল আওয়াল-রবিউস সানী ১৪৩৪   ||   ফেব্রুয়ারি ২০১৩

আমাদের রাজ্যশাসন-৫

মাওলানা আবদুস সালাম কিদওয়ায়ী

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

খন্দক যুদ্ধ (পঞ্চম হিজরী)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মদীনা আগমনের আগে মদীনায় ইহুদীদের বেশ প্রভাব ছিল। ধর্ম ও ধন-সম্পদের প্রাচুর্যের কারণে তাদেরকে অনেক সম্মান করা হত। তবে মদীনায় ইসলামের আগমন ও বিস্তৃতির ফলে ইহুদীদের সেই প্রভাব ও সম্মান লোপ পেতে লাগল। এ কারণে তারা মুসলমানদেরকে শত্রু ভাবতে লাগল। এমনকি কুরাইশদের চেয়েও বেশি শত্রুতা শুরু করে দিল। মুসলমানদের শক্তি খর্ব করার জন্য তারা সব ধরনের চেষ্টা চালাতে লাগল। এদের মধ্যে বনী নযীর ছিল সবচেয়ে বড় শত্রু। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এদেরকে মদীনা থেকে উচ্ছেদ করে দেন। এরপর তারা খায়বর অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। এখানে আসার পর ইহুদীরা এক বড় ষড়যন্ত্র আঁটে। মুসলমানদের বিরুদ্ধে তারা মক্কার কুরাইশদের সাথে মিত্রতা স্থাপন করে। মুসলমান ছিল কুরাইশদের পূর্বশত্রু, ফলে সহজেই তারা বনী নযীরের সাথে যোগ দিল। এদের ছাড়াও আরবের প্রায় সব গোত্র মিলে মোট ২৪ হাজার সৈন্য নিয়ে মদীনা অভিমুখে রওনা হল।

এত বড় বাহিনীর সাথে আগে কখনো মুসলমানদের যুদ্ধ হয়নি। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংবাদ শুনে সাহাবায়ে কেরামের সাথে পরামর্শ করলেন। সালমান ফারেসী রা. মত দিলেন মদীনার চারপাশে খন্দক (পরিখা) খনন করার। যেন শত্রুরা ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার এ মতটি পছন্দ করলেন। ফলে চারপাশে পরিখা খনন করা হল। পরিখার কারণে কাফেরদের জন্য মদীনা আক্রমণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়াল। ফলে তারা নিরুপায় হয়ে চারদিক থেকে মুসলমানদের ঘেরাও করে রাখল। এ সময়টা ছিল মুসলমানদের জন্য খুবই কষ্টের। কোনো কোনো দিন তারা খাবারও পেতেন না। মুনাফিকরা বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে মুসলমানদের পক্ষ ত্যাগ করতে লাগল। অন্যদিকে পরিখার ওপার থেকেই শত্রুরা তীর, পাথর ইত্যাদি নিক্ষেপ করা শুরু করল। দীর্ঘ একমাস পর্যন্ত এই অবরোধ অব্যাহত থাকে।

মুসলমানগণ আল্লাহর উপর ভরসা করতে থাকলেন। এক মাস পর আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি দয়া করলেন। শত্রুদের মাঝে অনৈক্য দেখা দিল। তারা পরস্পরে বিভক্ত হয়ে পড়ল। এছাড়াও তাদের উপর এত প্রচন্ড ঘূর্ণিবায়ু বয়ে গেল যে, উনুনের হাড়ি-পাতিল পর্যন্ত এলোমেলো হয়ে গেল। এতে শত্রুরা সাহস হারিয়ে ফেলল এবং ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে ফিরে গেল। 

হুদায়বিয়া সন্ধি

মক্কা ছিল মুসলমানদের প্রিয় মাতৃভূমি। এখান থেকে তাদেরকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হয়েছিল। তবে তাদের অনেক আত্মীয়-স্বজন তখনও মক্কায় ছিল। অনেকের তো গোটা পরিবার-সন্তানসন্ততিও ছিল। মুসলমানদের মক্কা ছেড়ে আসার পর বেশ কয়েকটি বছরও পার হয়ে গেছে। তবুও তাদের মনে প্রিয় মাতৃভূমি যেন বার বার পীড়া দিচ্ছে। সেখানকার সবকিছুই তাদের খুব মনে পড়ত। তাছাড়া মক্কার বাইতুল্লাহ ছিল তাদের কিবলা। কয়েক বছর থেকে তারা বাইতুল্লাহর যিয়ারত ও হজ্ব থেকে বঞ্চিত। এজন্য খন্দক যুদ্ধের এক বছর পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চৌদ্দশ সাহাবীকে সঙ্গে নিয়ে কাবা যিয়ারতের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। যুদ্ধের জন্য তাঁরা রওনা হয়েছেন-কুরাইশদের যেন এ ধারণা না হয় সেজন্য তাঁরা উমরার ইহরাম বেঁধে নেন এবং কুরবানীর পশুও সাথে নিয়ে নেন। কিন্তু এতকিছুর পরও শত্রুরা আশ্বস্ত হল না। 

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় পৌঁছার আগেই তারা পথ আটকে দিল। তাদেরকে যতই বোঝানো হল যে, আমরা শুধু উমরার উদ্দেশ্যেই এসেছি, যুদ্ধ-বিগ্রহের কোনো ইচ্ছাই আমাদের নেই। তবুও তারা বাধা তুলে নিল না।

বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য হযরত উসমান রা. কুরাইশদের কাছে গিয়েছিলেন। কেউ রটিয়ে দিল যে, হযরত উসমান রা.কে শহীদ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সংবাদ শুনে খুব মর্মাহত হলেন। তৎক্ষণাত তিনি একটি গাছের নিচে বসে সকল সাহাবীর পক্ষ থেকে এ মর্মে বাইআত (অঙ্গিকার) নিলেন যে, এ খুনের বদলা না নিয়ে স্থানত্যাগ করবেন না। এই বাইআতকে ‘বাইআতে রিদওয়ান’ বলা হয়। পরে জানা গেল যে, সংবাদটি ভুল ছিল। ফলে নতুন করে আগের আলোচনা শুরু হয়।

সবশেষে অনেক জটিলতার পর সন্ধির এ বিষয়গুলো চূড়ান্ত হল-

১। মুসলমানগণ এবারের মতো মদীনায় ফিরে যাবে। আগামী বছর উমরার জন্য আসবে। তবে তলোয়ার (এমনকি কোষবদ্ধ তলোয়ার) ও অন্য কোনো হাতিয়ার সঙ্গে আনতে পারবে না। তিনদিন তারা মক্কায় থাকতে পারবে। এ দিনগুলোতে কুরাইশরা শহরের বাইরে চলে যাবে।

২। মুসলমান ও কুরাইশ উভয়েরই এ সুযোগ থাকবে যে, তারা যে কারো সাথে মিত্রতার চুক্তিতে আবদ্ধ হতে পারবে।

৩। কুরাইশের কেউ মুসলমানদের সাথে চলে এলে তাকে ফিরিয়ে দিতে হবে। পক্ষান্তরে কোনো মুসলমান কুরাইশদের কাছে চলে গেলে তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে না।

৪। এই সন্ধি দশ বছর বলবৎ থাকবে। এ সময়ের মধ্যে পরস্পর কোনো যুদ্ধ-বিগ্রহ করা যাবে না।

এই সন্ধিপত্রের তৃতীয় দফায় বাহ্যত কোনো উপকার দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু বাস্তবে এই দফাটিই মুসলমানদের পক্ষে গেল। মুসলমানরা যখন কাফেরদের সাথে মিশল তখন কাফেররা দেখল, এতে তাদের কোনো উপকার নেই; বরং মুসলমানদের থেকে দূরে থাকাই নিরাপদ। কেননা মুসলমানদের কাছে থাকলে সব সময় তাদের ভীত থাকা ছাড়া কোনো উপকার নেই। আর মুসলমান যেখানেই থাকুক, কাফেরদের ক্ষতি ছাড়া কোনো উপকার হওয়ার নয়। বাস্তবেও হল তাই।

কুরাইশের যারা মুসলমান হল তারা সেই দফার কারণে মদীনায় থাকতে পারল না। আবার মক্কায় কাফেরদের কাছেও ফিরে যেতে চায় না। ফলে বাধ্য হয়ে তারা পৃথক বসতি স্থাপন করল এবং কুরাইশদের বিভিন্ন কাফেলাকে সেখানে নিয়ে যেতে শুরু করল। অল্প কয়েক দিনেই কাফেরদের টনক নড়ল। তারা নিজেরাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে সন্ধিপত্রের এই দফা রহিত করার আবেদন জানাল। ষ   

 (চলবে ইনশাআল্লাহ)

 

 অনুবাদ : আবদুল্লাহ ফাহাদ

 

 

advertisement