মহাররম ১৪৩১   ||   জানুয়ারী ২০১০

একটি নতুন বর্ষের সূচনা - এই সূচনা কি সমাপ্তিরও স্মারক নয়?

১৪৩০ হিজরী শেষ হয়ে ১৪৩১ হিজরীর সূচনা হয়েছে। তদ্রূপ ইংরেজি ক্যালেণ্ডারে ২০০৯ সাল শেষ হয়েছে এবং ২০১০ সাল আরম্ভ হয়েছে। এই সমাপ্তি ও সূচনায় ‘বর্তমান’ যেমন আছে তেমনি আছে ‘অতীত।’ অতীতের পথ ধরেই আমরা বর্তমানে উপনীত হয়েছি এবং আমরা যেহেতু ভবিষ্যতের দিকেই ধাবমান তাই উপসি'ত ‘বর্তমান’ও অতীতের গর্ভে বিলীন হয়ে চলেছে। তবুও আমরা বর্তমান নিয়েই ব্যস-। জীবনের সকল অঙ্গনে আমরা যেমন অতীতকে বিস্মৃত হয়েছি তেমনি ভবিষ্যত সম্পর্কেও উদাসীন রয়েছি। ফলে আমাদের ‘বর্তমান’ও ফলপ্রসূ হয়ে উঠছে না।

একটি নতুন বর্ষের সূচনা শুধু আগমন নয়, বিদায়ও। জীবনের সময়-সম্পদ থেকে একটি পূর্ণ বছর ব্যয় হয়ে গেল। তাই নতুন বছরের আগমন বিদায়েরই বার্তাবাহক। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বহু সম্পদে সম্পদশালী করেছেন। অর্থ-সম্পদ, জ্ঞান-সম্পদ ও সময়-সম্পদ এই সব আল্লাহর দান। তবে একটি প্রকাশ্য পার্থক্য এই যে, অর্থ-সম্পদ, জ্ঞান-সম্পদ ও অন্য সকল সম্পদে বিয়োগ যেমন হয় তেমনি যোগও হয়। মানুষ যেমন অর্থ ব্যয় করে তেমনি উপার্জনও করে। তদ্রূপ প্রতিনিয়ত আমরা যেমন বিস্মৃত হই তেমনি নতুন নতুন জ্ঞান ও অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধও হই। পক্ষান-রে সময়-সম্পদে শুধু বিয়োগ, কোনো যোগ নেই। আমাদের জীবন থেকে দিন-রাত, সপ্তাহ, মাস ও বছর শুধু বিয়োগই হচ্ছে, যোগ হচ্ছে না। এভাবে প্রত্যেকের জীবনে সেই অমোঘ মুহূর্ত উপসি'ত হবে, যা আল্লাহ নির্ধারণ করে রেখেছেন।

একটি নতুন বছরের আগমনের তাৎপর্য হল জীবনের নির্ধারিত সময় থেকে একটি পূর্ণ বছর বিয়োগ হয়ে যাওয়া। প্রশ্ন এই যে, বিয়োগ কি ফূর্তি ও উৎসবের বার্তা বহন করে? তাই একজন মুমিনের জন্য এ মুহূর্তটি উৎসবের নয়, ভাবনা ও হিসাব মেলানোর। সময়-সম্পদের যে অংশ ব্যয় হয়ে গেল তা কি প্রয়োজনীয় ও লাভজনক ক্ষেত্রে ব্যয় হয়েছে না অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর খাতে? জীবনের মূলধন খরচ করে জীবনকে আমরা কতটুকু সমৃদ্ধ করেছি? বস'ত জীবনের প্রতিটি দিন, প্রতিটি রাত, প্রতিটি সপ্তাহ, মাস, বছর এই মুহাসাবার বার্তা নিয়ে আসে।

আরেকটি বিষয় এই যে, পার্থিব সকল সম্পদের মতো সময়-সম্পদও আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দান। এর প্রকৃত মালিক আল্লাহ তাআলা। তিনিই সময়ের সৃষ্টিকর্তা। মানুষকে এই সম্পদ তিনি দান করেছেন তার আদেশ মোতাবেক ব্যয় করার জন্য। তাই প্রদত্ত সময়-সম্পদ ব্যয় করে মানুষ যখন তাঁর কাছে ফিরে যাবে তখন প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব দিতে হবে। তাই একটি নতুন দিন, নতুন রাত, একটি নতুন সপ্তাহ, মাস ও বছরের আগমন আমাদেরকে সেই হিসাব-দিবস সম্পর্কে সচেতন করে। কুরআন মজীদে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তিনিই রাত ও দিনকে একে অপরের অনুগামী করেছেন, তাদের জন্য যারা উপদেশ গ্রহণ করতে চায় অথবা শোকর গোযারী করতে চায়।’

তাই দিবস ও রজনীর আগমন ও নির্গমন একটি বিশেষ বার্তা বহন করে। যা অনুধাবন করাই হল প্রকৃত বুদ্ধিমানের পরিচয়। হাদীস শরীফে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

বিচক্ষণ ওই ব্যক্তি যে নিজের হিসাব গ্রহণ করে এবং মৃত্যুর পরের জন্য কর্মব্যস্ত থাকে। আর অক্ষম ওই ব্যক্তি, যে নিজেকে প্রবৃত্তির অনুগামী করে আর আল্লাহর নিকট অমূলক বাসনা পোষণ করে।

তাই নতুন বছরের আগমনে ফূর্তি ও উৎসবের অবকাশ নেই; বরং এটা বিগত সময়ের কর্ম পর্যালোচনা করে আগামীর জন্য নতুন সংকল্প ও প্রেরণায় উজ্জীবিত হওয়ার সময়। আল্লাহ তাআলা আমাদের তাওফীক দান করুন। আমীন।

 

advertisement