যিলহজ্জ্ব ১৪৩০   ||   ডিসেম্বর ২০০৯

দৃষ্টিভঙ্গি : মুনাফা ও বাজারস্বার্থ সংস্কৃতির মাপকাঠি নয়

আবু তাশরীফ

ঢাকার একটি কেবল দৈনিক পত্রিকার গত ৭ নভেম্বর সংখ্যার প্রধান শিরোনাম করা হয়েছে-‘ভারতীয় শিল্পীদের রমরমা বাজার : সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে বাংলাদেশ।’ রিপোর্টের সূচনাটি ছিল এরকম-‘রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক দখলদারিত্বের পর বাংলাদেশে ভারতীয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ষোলকলা পূর্ণ হতে চলেছে। বাংলাদেশ এখন ভারতীয় শিল্পীদের রমরমা বাজার। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত ১০ মাসে অর্ধশতাধিক শিল্পী এদেশে কনসার্ট করেছেন। এ প্রক্রিয়ায় হুণ্ডির মাধ্যমে ভারতে চলে যাচ্ছে কোটি কোটি টাকা।’ ওই রিপোর্টেরই একটি পার্শ-প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল- ‘ দেশের শিল্পী-সংস্কৃতিসেবীরা ক্ষুব্ধ।’ তাতে লেখা হয়েছে-... এরই মধ্যে অর্ধশত ভারতীয় শিল্পী এসেছেন বাংলাদেশে। বিনিময়ে তারা নিয়ে গেছেন কোটি কোটি টাকা। অথচ আমাদের দেশের গুণী শিল্পীদের নিয়ে পাশের দেশটিতে এ ধরনের কোনো আয়োজন করা হয় না। অনুষ্ঠান করা তো দূরের কথা, অনেক সময় আমাদের দেশের শিল্পীদের ভিসা পেতেও বেগ পেতে হয়। বিদেশ থেকে শিল্পী এলে আমাদের দেশের শিল্পীদেরও ওই দেশে কনসার্ট করার সুযোগ দিতে হবে-এমনটিই স্বাভাবিক বলে মনে করেন শিল্পী সমাজ।’

রিপোর্টের বিষয় হচ্ছে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। অথবা বলা যেতে পারে দেশীয় শিল্প-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বিদেশীদের প্রভাব বিস্তার। বিষয় হিসেবে এটিকে অত্যন্ত ইতিবাচক একটি বিষয় মনে করা যেতেই পারে। অপর দেশের তুলনায় আপন দেশের প্রতি মমতা ও ভালবাসা বজায় থাকা কিংবা একটু বেশিমাত্রায় বজায় থাকা যে কোনো দেশপ্রেমিক নাগরিকের কর্তব্যও। বাস্তবতা এ কথার স্বাক্ষ্য দেয় যে, ভিন দেশী নষ্ট সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে আমাদের দেশের সংস্কৃতির আবহে অবক্ষয়ের নানা মাত্রা দিন দিন যোগ হয়ে চলেছে। কিন্তু অত্যন্ত আক্ষেপ ও হাতাশা নিয়ে বলতে হচ্ছে, এ বিষয়ের রিপোর্ট ও প্রতিবেদনে কেবল আর্থিক লাভালাভ ও মুনাফাস্বার্থটাই মুখ্য হয়ে এসেছে। সাংস্কৃতিক আগ্রাসন কি কেবল ভিনদেশী শিল্পীদের আমাদের দেশ থেকে টাকা উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ? আমাদের দেশের শিল্পীরা প্রতিবেশী দেশে ভালো সুযোগ-সুবিধা পেলেই কি সংস্কৃতির পূর্ণতা ঘটে যেত? এটা কি গার্মেন্ট, গরু, ওষুধ কিংবা এ রকম ব্যবসাজাত পণ্যের বিষয়? আমাদের ঠকিয়ে আমাদের বাজার ওরা দখল করে নিচ্ছেন, ক্ষোভ কি শুধু এজন্যই প্রকাশ পাওয়া উচিত?

একটি দেশ ও জাতির সংস্কৃতির স্বকীয়তা রক্ষা কিংবা আগ্রাসনের শিকার হওয়ার মাপকাঠি টাকাকড়ির হ্রাসবৃদ্ধি দিয়ে মাপার কারণে বিপুল খেসারতের সমুদ্রে আমাদের ডুবে যেতে হচ্ছে। মুসলিম প্রধান একটি জাতির সংস্কৃতি কী, তাদের শিল্পের অবলম্বন কী-এ বিষয়গুলোই ঠিক করতে না পারলে সংস্কৃতি ও শিল্পকে বাজারের আর দশটা আমদানি-রপ্তানিযোগ্য পণ্যের চেয়ে আলাদা কিছু মনে হওয়ার কথা নয়।

এজন্য সংস্কৃতি নিয়ে অস্বস্তি কিংবা দ্বন্দের পর্যায়টিকে আর্থিক লাভালাভের হিসাব অতিক্রম করিয়ে শালীনতা, নৈতিকতা, সৌন্দর্যের শাশ্বত স্তরে গিয়ে উঠতে দেওয়ার চিন্তাই জাগে না। সখ্য-দ্বন্দ, শত্রুতা-মিত্রতার নিক্তি হয়ে যায় কেবল মুনাফা ও বাজারস্বার্থ, এরচেয়ে বেশি কিছু নয়। অথচ এটি কোনো সুস্থ মুসলিম দেশের সংস্কৃতি বিষয়ক চিন্তার বৃত্ত হতেই পারে না।

এ প্রসঙ্গে বছর দশেক আগের ছোট্ট একটি ইস্যুর কথা মনে করা যেতে পারে। সেবার কলকাতার আনন্দ বাজার গ্রুপের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘আনন্দ প্রকাশ’ ঢাকায় বসে সরাসরি পুস্তক প্রকাশ ও ব্যবসার অনুমোদন নিয়ে ফেলেছিল। তখন দেখা গেছে, এদেশের প্রকাশনা ব্যবসায় আনন্দ প্রকাশের সরাসরি আগমনের বিরুদ্ধে বহু দেশপ্রেমিক কবি-সাহিত্যিকের পাশাপাশি এমন লেখক, কবি-সাহিত্যিক ও প্রকাশকরাও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন, যারা ‘আনন্দ গ্রুপে’র হর্তাকর্তাদের হাতে নিজেদের পিঠে একটু চাপড়ানি পেলে আপন দেশ ও জাতির গোষ্ঠী উদ্ধার করা বহু কাজ হাসিমুখে করে দেন। কেন তারা এটা করেছিলেন? আনন্দ গ্রুপের মুসলিম বিদ্বেষ, সূক্ষ্ম আগ্রাসী তৎপরতা কিংবা তাদের বাংলাদেশবিরোধী নানা মিশনের কারণে? না, তেমন মনে করার কোনো কারণই নেই। কারণ, আনন্দ গ্রুপের আস্কারায় এসব কাজ তো তারা হরদম করেন। তারা করেছিলেন কেবল নিজেদের প্রভাব, বাজার ও অস্তিত্বের গোড়ায় মড়ক লাগার আশংকায়। শেষ পর্যন্ত আনন্দ গ্রুপ সরাসরি আর এদেশে প্রকাশনা ব্যবসা নিয়ে আসেনি। কিন্তু তাদের বাজার এখনও গোটা বইপাড়ায় আগের মতোই আছে। দেখা যাচ্ছে এখন আর সেটা নিয়ে উচ্চবাচ্য হচ্ছে না।

এজন্যই আমাদের প্রভাবশালী মূলধারার সাহিত্যে ও সংস্কৃতিতে এ দেশটি যে একটি ধর্মপ্রাণ মুসলিম দেশ, তার কোনো ছাপ থাকে না। জনপ্রিয় লেখকদের দশ-বারটি উপন্যাস পড়ার পরও পাত্র-পাত্রীর নাম ছাড়া আর কোনোভাবে বোঝার উপায় থাকে না যে, এটি কোনো মুসলিম পরিবার বা সমাজের গল্প। নামগুলো পাল্টে দিলেই গল্পগুলোকে কলকাতার গল্প হিসেবে চালিয়ে দেওয়া যাবে। সাহিত্য-সংস্কৃতি ও শিল্পের অন্দরে অন্দরে এমন বিশাল ব্যাপক আত্ম-অবক্ষয় ও স্ব-আরোপিত আগ্রাসনের পর এবং সেসবকে নির্বিকার চিত্তে হজম করার পর আগ্রাসনের আর কিছু বাকী থাকে বলে মনে হয় না। বাকী যা থাকে সেটা হচ্ছে পচে যাওয়া সংস্কৃতির বাজার-ব্যবসা দখলের চেষ্টা কিংবা হতাশার দহন। এই দহন থাকা-না থাকায় ধর্মপ্রাণ জাতির কিছুই যায়-আসে না। বরং অবক্ষয়টাকে মেনে নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মানসিকতা তীব্র করে তুললে ক্ষয়-ক্ষতি আরো ব্যাপক হওয়ার আশংকাই জেগে ওঠে।

এদেশের শিল্প-সংস্কৃতি ও সাহিত্যে একটি ইতিবাচক আবহের প্রত্যাশা করা আমাদের দায়িত্ব। ধর্ম, ধর্মীয় অনুশাসন ও মূল্যবোধকে বিবেচনায় নিয়ে সুস্থ ও নৈতিক সংস্কৃতি ও সাহিত্য গড়ে তুলতে পারলে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সব আগ্রাসন থেকেই আমরা মুক্ত হতে পারব। ভেতর এবং বাজার উভয়টার নিয়ন্ত্রণই তখন থাকবে দেশীয়দের হাতে। তাই ওই রিপোর্টের মূল প্রেরণার সঙ্গে সহমত পোষণ করেও আমরা বলতে পারি, সংস্কৃতির সুরক্ষা ও আগ্রাসনের বিষয়টিকে কেবল মানচিত্রের ভিন্নতা দিয়ে বিবেচনা না করে আদর্শ ও নৈতিকতার বড় ফ্রেমের মধ্য দিয়ে দেখা দরকার। চোখের মূল ফোকাস আসল ক্ষেত্রটিতে দিয়ে এরপর এর বিভিন্ন অনুষঙ্গ নিয়ে কাজ করলে সুফলটা আসতে পারে।

 

advertisement