জুমাদাল উখরা-১৪৩৩   ||   মে-২০১২

দা য়ি ত্ব : এক দুর্ঘটনায় চালকের ঘাড়ে তিন মামলা

ওয়ারিস রব্বানী

একদিকে তিনি মন্ত্রী। অপরদিকে আবার সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি। মন্ত্রীর মন্ত্রণালয়টি ভিন্ন হলেও আলোচনায় তিনি বেশি থাকেন সড়ক পরিবহনের সঙ্গে। এ খাতে তার ব্যবসাও রয়েছে। মিডিয়ায় প্রায়ই তার কর্মব্যস্ততার খবর আসে। তখন হঠাৎ হঠাৎ তাকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বলে ভ্রম হয়। কারণ রাস্তাঘাট, বিআরটিএ, সড়ক পরিবহন ও পরিবহন চালকদের বিষয়েই তার বেশি তৎপরতার খবর সামনে আসে।

একবার গাড়ি চালকদের লাইসেন্স দেওয়ার মাপকাঠি বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি খুবই মুখরোচক কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, চালকদের শিক্ষাদীক্ষার দরকার নেই। গরু-ছাগল চিনতে পারলেই হল। আরেকবার বলেছেন, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর গাড়িচালকও স্বল্পশিক্ষিত। নিরাপদ সড়কের জন্য কিছু সুশীল নাগরিক আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। তিনি এক মঞ্চ থেকে তাদেরকেও কিছু শ্রুতিকটূ উপদেশ দিয়েছেন। কোথাও কোনো সড়ক দুর্ঘটনা ঘটলে চালকদের যেন হয়রানি করা না হয়-এ বিষয়ে তিনি বরাবর সোচ্চার। মন্ত্রীত্বে আসার পর থেকে তার স্বর আরও উচ্চকিত। বিরুদ্ধবাদীরা অভিযোগ করেন, এই মন্ত্রী সব সড়ক দুর্ঘটনায় গাড়ি চালকদের নির্দোষ দেখতে চান। উপুর্যপরি সড়ক দুর্ঘটনা আর গাড়ি চালকদের নিয়ে লেখালেখির কারণে একপর্যায়ে তিনি সাংবাদিকদের বিষয়েও মনোযোগী হয়ে ওঠেন। বলেন, সাংবাদিকদের আরো শিক্ষিত করে তোলার জন্য স্কুল খোলার ইচ্ছা রয়েছে তার।

অবাক ব্যাপার হচ্ছে, এই মন্ত্রীই গত ২৭ এপ্রিল সড়ক দুর্ঘটনায় পড়ে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেছেন। ওই দিন দুপুর সোয়া ১২ টার দিকে মাদারীপুরের টেকেরহাট সংলগ্ন গোপালগঞ্জের মকসুদপুর উপজেলার রাঘদি এলাকায় ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে এই দুর্ঘটনা ঘটে। বরিশাল থেকে ঢাকাগামী একটি বাসের সংঘর্ষ হয় মন্ত্রীর প্রাডো গাড়ির সঙ্গে। ওই সময় বাসটি আরেকটি অ্যাম্বুলেন্সকেও ধাক্কা দেয়। এতে মন্ত্রী মহোদয় অক্ষত থাকলেও আহত হয়েছেন তার ব্যক্তিগত সহকারী। দ্রুত মন্ত্রীর গাড়ি সরিয়ে নেওয়ার সময় ওই গাড়ির ধাক্কায় হাত ভেঙ্গে যায় এক নারীর।

হায়! এটা হচ্ছে দুর্ঘটনার মধ্যে দুর্ঘটনা। একটি বাস এসে প্রাডোকে ধাক্কা দিল। এটাতো একটা দুর্ঘটনাই। কিন্তু এ দুর্ঘটনা এ দেশে প্রতিদিন কয়েক ডজন ঘটছে। তাতে বাসচালকদের কিছুই যাচ্ছে-আসছে না। মাননীয় মন্ত্রীর জোরেই বাসচালকরা সব ক্ষেত্রে ডেমকেয়ার ভাব বজায় রেখেছে। কিন্তু এবার ওই মন্ত্রীর গাড়ির সঙ্গেই দুর্ঘটনা। এখানেই ফেঁসে গেছে বাসচালক। বীর বাসচালক বেচারার মতো গ্রেফতার হয়েছেন। ধরাখাওয়া বাসচালক তাদের অভিভাবক মন্ত্রীকে চিনতে পারলে নিশ্চয়ই এ কর্ম করত না। এ বিষয়টি নিয়ে ২৮ এপ্রিল ঢাকার একটি প্রভাবশালী পত্রিকা লিখেছে এভাবে-চালক হয়তো চিনতে পারেননি। তাই দ্রুতগতিতে যেমন চালাচ্ছিলেন তেমনি চালিয়ে এনে সংঘর্ষ বাধালেন গাড়িটির সঙ্গে। অল্পের জন্য রক্ষা পেলেন গাড়ির গুরুত্বপূর্ণ যাত্রী। পুলিশ অবশ্য চালককে আটক করেছে। বাসচালককে আটক করেই কাজ শেষ করেনি পুলিশ। তার বিরুদ্ধে তিন ধারায় তিনটি মামলা ঠুকে দিয়েছে। ভাঙ্গা হাইওয়ে থানার ওসি জানান, দ্রুতগতিতে বেপরোয়া গাড়ি চালানোয় চালকের বিরুদ্ধে দন্ডবিধির ২৭৯ ধারা, দুর্ঘটনায় মারাত্মক জখম করার জন্য ৩৩৮ (ক) ধারা এবং ক্ষয়ক্ষতি করার জন্য ৪২৭ ধারায় মামলা করা হয়েছে।

এ দুর্ঘটনার পরও মন্ত্রী গণমাধ্যমকে বরাবরের মতো কিছু কথা বলেন। এক পর্যায়ে তিনি বলেন, সড়কের সব জায়গায় স্পীডে গাড়ি চালানো ঠিক নয়, কন্ট্রোল করে চালানো ভালো। তাই আমি চালকদের প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিচ্ছি। তিনি আগে বলেছিলেন, চালকরা গরু-ছাগল চিনতে পারলেই হল। এবার তিনি বলতে পারতেন, না, চালকদের পতাকাও চিনতে হবে। পতাকা না চিনলে তো পথেঘাটে মন্ত্রীদের মেরে ফেলবে। কিন্তু তিনি সে কথা বলেননি। হয়তো অভিমান করেই বলেননি। যে চালকদের জন্য তিনি এত করেন তারা কি না তার পতাকাবাহী গাড়িটিই চিনল না! তিনি গাড়ি বদল করে জেলা প্রশাসকের গাড়িতে মন্ত্রীত্বের পতাকাটি লাগান। এরপর ওই গাড়িতে ওঠে বসেন।

এমপি-মন্ত্রী মানে জনপ্রতিনিধি। তাদেরকে নাগরিকদের অভিভাবকও বলা যায়। এ রকম একজন অভিভাবক দুর্ঘটনায়  পড়ে অল্পের জন্য বেঁচে যাওয়ায় আমরা তাই সুখী। এ নিয়ে আর কথা বাড়াতে চাই না। কিন্তু নিন্দুকের মুখ আটকে রাখা মুশকিল। তারা এ দুর্ঘটনার পর বাসচালককে আটক করা আর এক দুর্ঘটনায় তিন মামলা ঠুকে দেওয়ায় বিস্ময় ও ক্ষোভ লুকাতে পারেননি।

তারা বলেন, এতদিন তো এই মন্ত্রী কেবল চালকদের পক্ষ নিতেন। এখন নিজে দুর্ঘটনায় পড়ে চালকের ওপর খাপপা হলেন। এক ঘটনায় পুলিশ তিন মামলা ঠুকে দিল। জনগণের মৃত্যু আর অসুবিধার সময় তো এত অস্থির হতে দেখা যায় না তাদের। তারা কেমন অভিভাবক? এই যদি হয় অভিভাবকদের অবস্থা, তাহলে তো মনে হয় নিজের পরিবারের লোকেরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন বিদ্যুৎহীন (আইপিএস-জেনারেটরমুক্ত) না থাকলে বিদ্যুৎমন্ত্রীর হুশ হবে না, নিজের সন্তান সরকারি হাসপাতালে বিনা চিকিৎসায় না কাতরালে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চোখ খুলবে না, আর নিজের ভাতিজা-ভাগ্নে গুম বা খুন না হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মনে উদ্বেগ জাগবে না। নিজেরা বিপদে না পড়লে যদি তারা জনগণের কষ্ট না বুঝেন তাহলে তারা কিসের অভিভাবক? এরা তো নিজেদের আঁতে ঘা না লাগলে সক্রিয় হন না। আমাদের দুঃখ হচ্ছে, নিন্দুকদের এসব কথার কোনো উত্তর আমরা দিতে পারি না। দিতে পারলে ভালো লাগত। 

 

 

advertisement