জুমাদাল উখরা-১৪৩৩   ||   মে-২০১২

ছোহবতে বা-আহলে দিল

মাসউদুযযামান শহীদ

ছোহবত বা সংস্পর্শের রয়েছে অসাধারণ শক্তি। ব্যক্তি বা পরিবেশ মানুষকে দারুণভাবে বদলে দিতে পারে। এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন হয়ে থাকে তার অলক্ষে। পরশপাথর বলে যে একটা শব্দ আছে মানুষের মধ্যেও তেমনি আছেন কতক ব্যক্তি, যারা আপন গুণে, আপন ব্যক্তিত্ব বলে অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হন তার চেতনা ভাবনাকে, তার আদর্শ পছন্দকে। আর এই ব্যক্তিত্বটি অবশ্যই গড়ে ওঠে নিষ্ঠা, সততা, আন্তরিকতা সদাচার- সবের সমন্বয়ে। তার জ্ঞান যোগ্যতার চাইতেও এই সব গুণ বৈশিষ্ট্য বেশি প্রভাবক হয়ে থাকে। তার কারণ মানুষ মুগ্ধ হয় শুধুই মানুষের প্রতি। মনুষ্যত্বের বিকাশ যার মধ্যে যত বেশি তার প্রতিই ধাবিত হয় মানুষ। তাকে ভালবাসে, ভক্তি করে, তাকে অনুসরণ করে এবং তার পছন্দমত বলতে চলতে অনুপ্রাণিত বোধ করে। একজন মানুষের প্রতি আরেকজন মানুষের এই বিশ্বাস আস্থার সম্পর্কই খুলে দেয় পরিবর্তনের দুয়ার। পরস্পরের মধ্যে গড়ে দেয় আত্মার যোগাযোগ। আর আত্মার শুচিতা শক্তি যার যে পরিমাণ, মানুষ তার দ্বারা ততটাই লাভবান হয়  এবং তার পরশ ছোঁয়া ঠিক ততটাই প্রভাবক হয়ে থাকে।

মানুষের মধ্যে সততা সদগুণের বিকাশ, সত্যপ্রেম ন্যায়বোধ এসবই আসে একটা পর্যায়ে মেহনত সাধনার পর। তবে আল্লাহওয়ালা পুণ্যাত্মাদের সংস্পর্শ সাহচর্য মানুষের মধ্যে সদগুণের বিকাশ তাকে সৎপথে পরিচালনায় যেমন ফলদায়ক হয় অন্য কোনো পন্থায় এত অল্প সময়ে এবং এত বিপুলভাবে হতে দেখা যায় না।

এই আল্লাহ ওয়ালা সত্যবাদী কারা? যারা নিজেদেরকে পরম সত্যের চর্চায় সাধনায় নিয়োজিত করেছেন। নিজের মাঝে এর উৎকর্ষ সাধন এবং তার চেনা অচেনা অসংখ্য মানুষের মাঝে সেই সত্যের উপলব্ধি জাগিয়ে তুলতে যিনি নিবেদিত। সত্যের আলো তাই সত্যপন্থী হৃদয় থেকেই লাভ করতে হয়। সত্যের আলোকমালা তখনই মন চেতনাকে আচ্ছন্ন করে যখন তা প্রজ্জ্বলিত হৃদয় থেকে বিচ্ছুরিত হয়। তার কথায়, তার আচরণে কখনো বা নিছক দৃষ্টি নিক্ষেপে ... হ্যাঁ, মর্দে মুমিন কামেল ইনসানের চাহনিরও আছে বিশেষ গুণ, যা আল্লাহর ইচ্ছায় বদলে দিতে পারে বহু মানুষের জীবন।

* * *

মানুষের সংশোধন মানবাত্মার পরিশুদ্ধি যাদের মিশন, যাদের একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান দিনরাতের ফিকির, সেই দরদীদের মধ্যে হিন্দুস্তানের হারদুইর হযরত মাওলানা আবরারুল হক ছাহেব রহ.-এর নাম আমাদের অতিপরিচিত। কী তড়প আর ব্যথা নিয়ে তিনি ছুটে আসতেন এই বাংলাদেশের মানুষের মাঝে। বাংলাদেশের ওলামা এবং আওয়ামও তাকে গ্রহণ করেছিল অন্তর থেকে। ফলে কায়েম হয়েছিল হৃদয়ের জোরালো বন্ধন। সে বন্ধন ছিল একই সাথে ভক্তি ভালোবাসার এবং দরদ হিতাকাঙ্ক্ষার। সুন্নাহর প্রতি তার টান সুন্নাহ অনুসরণের আন্তরিক আহবান মানুষকে তাই নাড়া দিয়েছে, আলোড়িত করেছে। হযরত হাফেজ্জী হুজুর রহ. এবং হযরত হারদুই, যিনি সর্বপ্রথম তার দাওয়াতে দেশে এসেছিলেন; তারা এবং দেশের অন্যান্য মুসলিহ বুযুর্গ মাশায়েখের মেহনতে আদাব সুন্নতের আলোচনা ব্যাপকতা পেয়েছে, আযান ইকামত নামাযের মশক আম হয়েছে এবং মাকতব মুআল্লিমীনে মাকতাবের ইকরামের অনেক সূক্ষ্ম দিক সামনে এসেছে।

১৪২৬ হি., মোতাবেক ২০০৫ .- সর্বশেষ তিনি এখানে এসেছিলেন। বছরই তিনি মাওলার সান্নিধ্যে গমন করেন। যাত্রাবাড়ীতে তিনি আসতেন, কথা বলতেন, সেই স্মৃতি এখনো মনে পড়ে আজ এত বছর পর আবার বাংলাদেশ পেল হারদুইর জামাতের সংস্পর্শ, যখন এক সপ্তাহের সফরে বাংলাদেশে এলেন হারদুই হজরতের জা-নশীন খলীফা জামাতা মাওলানা হাকীম কালীমুল্লাহ ছাহেব তার ছয় রফীক বা সহচর। মাওলানা শাহরিয়ার মাহমুদের দাওয়াতে তারা সফর মঞ্জুর করেন এবং ঢাকার মহাখালী ডিওএইচএস- অবস্থান করেন। রাজধানী ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম কাপাসিয়াতে ছিল তাদের প্রোগ্রাম। গত শুক্রবার ২০ জুমাদাল উলা মোতাবেক ১৩ এপ্রিল ছিল সফরের শেষ দিন। ডিওএইচএস কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে মাগরিবের পরে তাই আখেরী বয়ান মুনাজাত। আমার উস্তায মুরবিব মুহতারাম আমীনুত তালীম ছাহেব চাইলেন, তাদের ছোহবতের ফায়েজ নিতে আমিও বয়ান শুনতে যাই। সুতরাং আছরের পরে আমরা তিনজন গেলাম। মাগরিবের নামায শেষ হল। মুসল্লিরা সবাই মেহরাবের দিকে এগিয়ে এসে বসল। প্রথমে মাইক্রোফোনের সামনে এলেন মুফতী সাবীল ছাহেব। তার বয়ান এত জোশদীপ্ত এবং প্রাঞ্জল ছিলো যে, উর্দু তরজমা ছাড়াই শ্রোতাবৃন্দ বুঝে নিতে সক্ষম ছিল তার মনের ভাব হৃদয়ের উত্তাপ। ভাষার মাধুর্য প্রকাশনৈপুণ্য ছাড়াও বিরাম-বিরতিহীন শব্দের মিছিল যেভাবে ঝরছিল তার যবান থেকে তা একপ্রকার সম্মোহিত করে রেখেছিল সবাইকে। তার কথার আওয়াজে গম গম করছিল গোটা মসজিদ। সেই সাথে শ্রোতাদের মাঝেও বিপুল তন্ময়তা আর ভাববিহবলতা ছিল দৃশ্যমান। অত্যন্ত দরদ নিয়ে তিনি শোনাচ্ছিলেন উম্মতের দুর্দশা তার পিছনের কারণ। উম্মতের সহস্র ব্যধি তা থেকে মুক্তির পথ। তিনি বলছিলেন, দেখুন সারা দুনিয়া আজকে আল্লাহর নাফরমানীতে লিপ্ত। গুনাহ আর পাপের ছড়াছড়ি সবখানে। সুদ-ঘুষ, চুরি, ব্যভিচার, ধোকা-জালিয়াতি সব রকমের গোনাহ আজকে আম। কিন্তু একই সাথে  গোনাহর এহসাস ফৌত। এত মারাত্মক মারাত্মক অন্যায় করছে মানুষ কিন্তু সে জন্য এতটুকু ভয় বা পাপবোধ নেই

অন্তরে। মানুষের দিল আজকে মরে গিয়েছে, মুর্দা দিলে অনুভূতি আসবে কোত্থেকে। মানুষের কলব ব্যধিগ্রস্ত। গোনাহ করতে করতে রোগের সর্বশেষ পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছি, যার পরে আর নিরাময়ের সুযোগ বাকী থাকে না ... যেমন ক্যান্সার আক্রান্ত কোনো ব্যক্তি একটু একটু করে আক্রান্ত হতে হতে একসময় সবটুকু অঙ্গে পচন ধরে গেল। অথচ তার খবর নেই। চিকিৎসার জন্য তড়প নেই। শেষে যখন ডাক্তরের কাছে নিয়ে যাওয়া হল ডাক্তার বলে দিল রোগের আর কোনো চিকিৎসা নেই। অনেক দেরি হয়ে গেছে। আরেকটু আগে হলেও বাঁচানোর সম্ভাবনা ছিল ... সুতরাং ভেবে দেখুন এই রোগীর কী অবস্থা! আমরাও আজকে রূহের নানা রকম বেমারিতে আক্রান্ত এবং অবস্থা খুবই ভয়াবহ। সময় থাকতে যদি ডাক্তারের শরণাপন্ন না হই, রূহানী চিকিৎসকদের কাছে না যাই তাহলে বুঝুন কী ভয়ানক, কী আশঙ্কাজনক অবস্থা আমাদের! অবস্থায় মৃত্যু এসে গেলে আর কোনো উপায় নেই। তিনি আরও বলছিলেন, আজকে আমরা নেকী করছি সত্য, কিন্তু তার সঙ্গে অন্য অনেক বদী যু্ক্ত হয়ে যাচ্ছে। নামায পড়ি, কিন্তু অন্যের গীবত শেকায়েত করি। হজ্জ করি, যাকাত দেই, কিন্তু অন্যের প্রতি হিংসা বিদ্বেষে আমাদের মন ভরপুর। ফলে এই হিংসার আগুন আমাদের নেকী খেয়ে ফেলছে। গীবত শেকায়েতের দরুণ আমাদের নেকীর গুণ আর শক্তি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে নেক আমলের আছর আমাদের মাঝে আর বাকী থাকছে না। সত্যিকার ফল লাভ থেকে আমরা বঞ্চিত।

মুফতি সাবীল ছাহেবের এই জোরালো আলোচনা হৃদয়গ্রাহী বয়ান সবার মনেই দাগ কেটেছে। তওবার অশ্রুতে ভিজেছে পাথরের মতো অনেক শক্ত মন তা নিশ্চয়ই বলা যায়।

এশার নামাযের আযান হতে আর বেশি বাকি নেই। এমন সময় মেহরাবের কাছে তাশরীফ আনলেন হারদুই হজরতের বর্তমান জা-নশীন মজলিসে দাওয়াতুল হকের নাযেম মাওলানা হাকীম কালীমুল্লাহ ছাহেব। সাদা সুন্নতী লেবাস আর শ্মশ্রুশোভিত উজ্জ্বল মুখন্ডল। চোখে মুখে গভীর চিন্তার ছাপ। মুতারজিমের আলোচনার সময়টুকুতে তিনি যখন শান্ত দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন শ্রোতাবৃন্দের মজমা ছাড়িয়ে দূরে মসজিদের দেয়াল আর পিলারগুলোর দিকে বোঝা যায় উম্মাহর কত দূর ভবিষ্যতের ছায়া এসে পড়ছে তার চোখের মণিতে। একটা সমাহিত ভাব সবসময়ই ছড়িয়ে থাকে তার চেহারায়। একরাশ ব্যথা আর দরদভরা মন নিয়ে যখন কথা বলে ওঠেন তখন কণ্ঠস্বরেও ধরা পড়ে সেই বেদনার চাপা আওয়াজ। ধীরে ধীরে থেমে থেমে বলা কথাগুলো তাই খুব সহজেই গেঁথে যায় অন্তরে। কোনো আড়ম্বর নেই, শোরগোল নেই ... তবু তার কথায় তার উচ্চারণে আছে কুল কুল ছন্দের গতিময়তা, আর বরফ শীতল এক কোমলতা, যা তৃষিত প্রাণকে, পাপে তাপে দগ্ধ হৃদয়কে নিমেষে করে শান্ত,

তৃপ্ত পরিপ্লুত।

তিনি মুখতাছার কিছু কথা বললেন এবং যথাসম্ভব কম সময়ে কম শব্দে যেন তিনি আলোচনা শেষ করতে চাইছিলেন। এতেই বোঝা যায় তিনি কতটা মিতভাষী। তিনি বাংলাদেশের মানুষের প্রশংসা করলেন। কারণ বাংলাদেশে দাওয়াতুল হক তথা সুন্নাহ জীবন্ত করার মেহনত অনেক বেশি বেগবান। কথাটি তিনি বললেন হারদুইর হজরত মরহুমের বরাতে। তিনি এই কাজকে আরো এগিয়ে নিতে সাবাইকে একযোগে কাজ করার আহবান জানিয়ে বলেন, দলাদলি থেকে বিরত থাকুন। হকপন্থী যত দল আছে সবাই ইসলাম মুসলমানের বন্ধু। সব দল সব জামাআতই উম্মাহর জন্য দরকারি। উম্মাহর এই দুর্যোগের মুহূর্তে সবাইকে মিলে মিশে কাজ করে যেতে হবে। এরপর তিনি উপস্থিত ওলামা আওয়ামের উদ্দেশ্যে নসীহতে চারটি জিনিসের পাবন্দী করতে বলেন-

এক. বেশি বেশি যিকির করা। আর যিকিরের ক্ষেত্রে এস্তেগফারের উপর বেশি জোর দেয়া এবং সম্ভব হলে এই দোয়াটি পড়া-আল্লাহুম্মাগফিরলি ওয়ারহামনী।

দুই. সব রকম গোনাহ থেকে বাঁচা, বিশেষত চোখের গোনাহ, কানের গোনাহ এবং যবানের গোনাহ।

তিন. নিয়মিত কালামে পাকের তেলাওয়াত। কিছু পরিমাণে হলেও যেন প্রতিদিন তেলাওয়াত জারি থাকে। কখনো বাদ না যায়।

চার. আল্লাহওয়ালাদের ছোহবত তাঁদের সঙ্গে সবসময় যোগাযোগ। এর মাধ্যমে গোনাহের প্রতি ঘৃণা এবং আমলের প্রতি উৎসাহ বাকী থাকবে। এবং উত্তরোত্তর নিজের মধ্যে পরিবর্তন অবস্থার উন্নতি হতে থাকবে।

তার বয়ানের তরজমা করছিলেন ছিদ্দিক বাজার জামে মসজিদের খতীব মুফতি ওবায়দুল্লাহ ছাহেব। আমার উস্তায মুহতারাম আমীনুত তালীম ছাহেব বলেছেন, এই সফরে অন্য একটি মজলিসে মাওলানা হাকীম কালীমুল্লাহ ছাহেব বয়ান করছিলেন। বয়ানের উপস্থাপনা-ভঙ্গি ছিল খুবই চমৎকার আর অভিনব। হযরত সেদিন বলেছিলেন, আজকের বয়ানের খোলাছা : দুই ‘‘আলিফ’’ দুই ‘‘বা’’ এবং দুই ‘‘তা’’ এবং পরে ব্যাখ্যা দিয়ে বললেন, দুই ‘‘আলিফ’’ হচ্ছে ইখলাছ আখলাক, দুই ‘‘বা’’হচ্ছে বান্দা বাগী আর দুই ‘‘তা’’ হচ্ছে তাকওয়া তাওয়াক্কুল ... অর্থাৎ নিজের মধ্যে ইখলাছ পয়দা করতে হবে। সবকিছু করতে হবে পার্থিব স্বার্থ ব্যক্তিগত প্রাপ্তির মোহ ত্যাগ করে এবং যা করব সবই আল্লাহর জন্যে, তার খুশী রেযামন্দি হাসিলের নিমিত্তে। আর আখলাক সচ্চরিত্র হচ্ছে মুমিনের সবচেয়ে বড় সম্পদ। ঈমানের পরে সবচেয়ে বড় মূলধন। এই আখলাক যে যত বেশি অর্জন করতে সক্ষম হবে দুনিয়া আখেরাতে সে তত বেশি সুখী নিশ্চিন্ত জীবন লাভ করবে। দুনিয়াতে আমাদের সবচে বড় পরিচয় কী? আমরা আল্লাহর বান্দা। আল্লাহর কাছেও এই পরিচয়ই আসল। অতএব আমাদেরকে আল্লাহর বান্দা হতে হবে। আব্দিয়াতের যত ছিফাত সব আনতে হবে নিজেদের মধ্যে। আল্লাহর বন্দেগী আর ফরমাবরদারীই হতে হবে আমাদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। আল্লাহর বিপরীতে অন্যসবকিছুই আমরা প্রত্যাখান করব। আল্লাহর একেকটি হুকুম পালনের জন্য, প্রতিষ্ঠার জন্য এবং সংরক্ষণের জন্য জানমাল নিয়ে তৈরি থাকব। আজকে মানুষ একরকম আল্লাহর বিপক্ষে দাঁড়িয়ে গেছে, যেন বিদ্রোহ ঘোষণা করতে চায়। আল্লাহর হুকুম শুধু অমান্যই করছে না, অবজ্ঞাও করছে। নামায পড়ে না আবার পড়া যে জরুরি-ফরজ সেটাও মানতে চায় না ... পাপের পক্ষে যুক্তি দিচ্ছে, মন্দ আর অন্যায়ের চমকপ্রদ সব ব্যাখ্যা দাঁড় করাচ্ছে। মানুষ আজকে খোদাদ্রোহিতায় লিপ্ত। এই অবস্থার সংশোধনের জন্য আমাদের যা সাধ্য অবশ্যই করতে হবে।

তৃতীয়টি হচ্ছে তাকওয়া তাওয়াক্কুল। আমাদেরকে মুত্তাকী হতে হবে। আল্লাহর ভয় দিলের মধ্যে পয়দা করতে হবে। সব রকম হারাম থেকে বাঁচতে হবে। তাহলে হালাল উপায়ে আল্লাহ স্বয়ং আমাদের জরুরত পূরণ করবেন। ওয়াদা তিনি করেছেন। গোনাহ পরিত্যাগের জন্য মুজাহাদা করতে হবে। সতর্ক সাবধান হয়ে চলতে হবে। আর অতীত গোনাহের জন্য তাওবা করতে হবে ...

আমাদেরকে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল ভরসা করতে হবে। সর্বক্ষেত্রে আল্লাহমুখী তাঁর উপর নির্ভরশীল থাকতে হবে। তাহলে সমস্ত পেরেশানি আসান হয়ে যাবে। সঙ্কটের অবসান হবে। শান্তি আসবে। মনে প্রশান্তি অনুভব হবে। কোনো কিছুর অভাব বা না পাওয়ার অভিযোগ থাকবে না। কারণ আল্লাহর হুকুম ব্যাতিরেকে কিছুই হচ্ছে না-এই বিশ্বাস আমার অন্তরে বসে গেছে। আর বান্দার জন্য যা মঙ্গল তাই তো তিনি করবেন। যখন যেখানে যেভাবে যতটুকু আমার জন্য উচিত তাই তিনি দেবেন, তাই তিনি করবেন। তাওয়াক্কুল তাই ঈমানের দাবী। কুরআনে মাজীদে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, আর আল্লাহরই উপর ভরসা করে মুমিনগণ।-সূরা তাওবা () : ৫১

* * *

আজ সন্ধ্যায় বয়ানের পর হযরত যখন মুনাজাতে হাত তোলেন তখন সবগুলো চোখ যেন ছলছল করে উঠল। তিনি দোয়া করলেন, আর আমীন আমীন গুঞ্জনে কেঁপে উঠল মসজিদ। নরম নরম ভাষায় বিনম্র প্রার্থনা। কার না মন গলে! নুরানী চেহারার সেই মুনাজাত এখনো আমার চোখে ভাসছে। দোয়া শেষে সবাই যখন বিন্যস্তভাবে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে তার হাতের স্পর্শ নেয়ার জন্য তখনো আমার কানে বেজে চলেছে তার মধুর কন্ঠের আলতো আলতো উচ্চারণগুলো। আল্লাহওয়ালাদের এই এক ক্ষমতা।  সাধাসিধে নরম কথা দিয়েও কঠিন হৃদয়কে বিগলিত করেন। শুষ্ক অনুর্বর মাটিকেও সিক্ত প্রাণময় করে তোলেন। কেমন যেন তাদের নসীহত আর কথাগুলো একরাশ জল ছিটিয়ে দেয় মনের মাটিতে। ফলে শুষ্ক জমিন আর্দ্র হয়। আবার ফুল ফসলে সজীব হয়ে ওঠে। বদলে যায় মন, বদলে যায় চেতনা, চিন্ত-ভাবনা, আচরণ কথা সবকিছু।

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে ছাহাবা জামাতকে গড়েছেন একটি নতুন পৃথিবী গড়ার কারিগর হিসেবে তেমনি যুগে যুগে আল্লাহর এইসব আওলিয়া পীর-বুযুর্গ তাঁর ওয়ারিস হিসেবে খরাগ্রস্ত বসুন্ধরাকে সজীব করে তুলতে রেখেছেন ভূমিকা। তাদের অসামান্য নিষ্ঠা দরদী আহবান আন্তরিক প্রচেষ্টায় কত পথভোলা পেয়েছে পথের দিশা। কত পাপী ছেড়েছে পাপের পথ। কত গোনাহগার তওবা করে হয়েছে মুত্তাকী, আল্লাহর পথের পথী ... সেই ধারা ক্ষীণ আকারে হলেও আজও বহমান।  আজকের পিপাসার মুহূর্তেও তাই তৃষ্ণার্তরা ছুটে আসে এই অমৃত সুমিষ্টের কাছে এবং আকণ্ঠ পান করে শীতল করে শুষ্ক আত্মা। যেন আত্মা শুধু আল্লাহকে ভালোবাসে, শুধু তাঁকে ভয় করে, শুধু তাঁকেই পেতে চায়, তাঁর তরে বিলীন হয়ে খোঁজে জীবনের সার্থকতা। কারণ কুরআনের ভাষায়-এই পৃথিবীর বুকে যা কিছু আছে সবই ধ্বংসশীল। বাকি থাকবেন কেবল তোমার রব আপন সত্তার মহিমায় ...

এই যে জীবনের পরমতম লক্ষ্যের সন্ধান এটা শুধু দিতে পারেন তারাই যারা পরমের ধ্যানে নিজেদের উৎসর্গ করেছেন। আল্লাহ আমাদেরকে তাদের কাতারে শামিল করুন এবং তাদের সঙ্গে থেকে, তাদের সাহচর্য অবলম্বন করে জীবনটাকে শিশিরভেজা কচি কিশলয়ের মতো চিরসজীব চিরনির্মল করে দিন... হ্যাঁ, তাদের সঙ্গ এবং সংস্পর্শটা আমাদের জন্য  তেমনি, গাছের জন্য যেমন পানি, ফসলের জন্য যেমন বৃষ্টি এবং পাতার জন্য যেমন শিশির।

 

 

advertisement