জুমাদাল উখরা-১৪৩৩   ||   মে-২০১২

وحدة الأمة واتباع السنة উম্মাহর ঐক্য : পথ ও পন্থা মতভিন্নতার মাঝেও সম্প্রীতি রক্ষা, সুন্নাহসম্মত পন্থায় সুন্নাহর প্রতি আহবান

মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক

গত ২৩ রবিউস সানী ১৪৩৩ হিজরী, মোতাবেক ১৭ মার্চ ২০১২ . শনিবার কাকরাইল ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়ার উদ্যোগেউম্মাহর ঐক্য : পথ পন্থাশিরোনামে একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সেমিনারে আলকাউসারের তত্ত্বাবধায়কের পক্ষ থেকে যে প্রবন্ধটি উপস্থাপিত হয়েছিল তা হুবহু বা তার সারসংক্ষেপ আলকাউসারে প্রকাশের জন্য অনেক বন্ধু/পাঠক জোর আবেদন জানিয়েছেন। উক্ত সেমিনারে উপস্থিত বন্ধুরা প্রবন্ধটি পুস্তক আকারে পেলেও আলকাউসারের অধিকাংশ পাঠকের কাছে তা পৌঁছেনি। এজন্য সামান্য পরিবর্তন-পরিমার্জনের পর প্রবন্ধটির সারসংক্ষেপ আলকাউসারে প্রকাশ করা হচ্ছে। এটি প্রবন্ধের দ্বিতীয় কিস্তি। যাদের কাছে মূল প্রবন্ধটি রয়েছে তাদের জন্যও তা  উপকারী হবে বলে আশা রাখি।-সম্পাদক

 

(পূর্ব প্রকাশিতের পর) 

হাদীসের শরণাপন্ন হলে কি মতপার্থক্য দূর হয়, না বিবাদ? 

কারো কারো ধারণা, সবাই যদি কুরআন হাদীসের অনুসরণের ব্যাপারে সম্মত হয়ে যায় তাহলে ইখতিলাফ দূর হয়ে যাবে। ইখতিলাফ শুধু জন্যই হয় যে, এক পক্ষ কুরআন-হাদীস অনুসরণ করে, অপর পক্ষ কুরআন-হাদীস অনুসরণ করে না। প্রসঙ্গে তারা নিমেণাক্ত আয়াতটিও উল্লেখ করে থাকে-

فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآَخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا

 (তরজমা) যদি তোমরা কোনো বিষয়ে বিবাদে লিপ্ত হও তাহলে তা আল্লাহ রাসূলের নিকট পেশ কর। যদি তোমরা আল্লাহ শেষ দিবসের উপর ঈমান রাখ। এটা উত্তম এর পরিণাম সুন্দর।-সূরা নিসা () : ৫৯

অথচ উপরোক্ত আয়াতে কথা বলা হয়নি যে, ‘কুরআন-হাদীসের শরণাপন্ন হলে ইখতিলাফ দূর হয়ে যাবে।বরং বলা হয়েছে, ‘বিবাদের ক্ষেত্রসমূহে কুরআন-হাদীসের শরণাপন্ন হও।এর অর্থ হল তাহলে বিবাদ মিটে যাবে। এরা বিবাদ মিটে যাওয়াকে ইখতিলাফ মিটে যাওয়ার সমার্থক ধরে নিয়েছে এবং এখানেই ভ্রান্তিতে নিপতিত হয়েছে। কেননা বিবাদ মিটে যাওয়া ইখতিলাফ মিটে যাওয়া এককথা নয়। অনেক ক্ষেত্রে ইখতিলাফ বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও বিবাদ মিটে যায়। পক্ষান্তরে অনেক ক্ষেত্রে ইখতিলাফ বিবাদ দুটোই মিটে যায়।

  যেমন বিবাদরতদের মাঝে এক পক্ষ জালিম, অপর পক্ষ মাজলূম। এক পক্ষ হকের উপর, অন্য পক্ষ  বাতিলের উপর। তারা যদি কিতাব-সুন্নাহর শরণাপন্ন হয় এবং কুরআন-সুন্নাহর ফয়সালা মেনে নেয় তাহলে বিবাদও দূর হবে, মতভেদও থাকবে না। পক্ষান্তরে  যেখানে শরীয়তের দলীলের ভিত্তিতে একাধিক মত হয়েছে কিংবা সুন্নাহর বিভিন্নতার ক্ষেত্রে একজন এক সুন্নাহ অন্যজন  অন্য সুন্নাহ অনুসরণ করছে- ধরনের ক্ষেত্রে যদি পরস্পর বিবাদ সৃষ্টি হয় এবং উপরোক্ত আয়াতের নির্দেশনা অনুযায়ী তারা কিতাব-সুন্নাহর শরণাপন্ন হয় তাহলে কিতাব-সুন্নাহ তাদেরকে এই নির্দেশনাই দিবে যে, বিবাদ করো না। কারণ তোমরা উভয়ে সঠিক পথে আছ। কারো অধিকার নেই অন্যের উপর আক্রমণ করার। তো এখানে মতপার্থক্য বহাল থাকা সত্ত্বেও বিবাদ দূর হবে।

সহীহ বুখারীর হাদীস কারো অজানা নয়, যাতে হযরত উমর রা. হযরত হিশাম ইবনে হাকীম রা.-এর মধ্যকার বিরোধের কথা বর্ণিত হয়েছে। যা সাময়িক ঝগড়ার রূপ ধারণ করেছিল। মতবিরোধটি হয়েছিল কুরআনের কিরাত নিয়ে। হযরত উমর রা. হযরত হিশাম রা.কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট হাজির করে তার বিরুদ্ধে নালিশ করেছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেকের পড়া শুনলেন। এরপর প্রত্যেককেই বললেন-

هكذا أنزلت

অর্থাৎ এভাবে কুরআন নাযিল হয়েছে।-সহীহ বুখারী /৬৩৯-৬৪০ (ফাতহুল বারী)

ধরনের আরেকটি ঘটনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবে বলেছেন-

كلاكما محسن، فاقرآ

    তোমাদের দুজনই ঠিক পড়েছ। তাই পড়তে থাক।-সহীহ বুখারী /৭২০ (ফাতহুল বারী)

বনু কুরাইজার ঘটনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীর মর্ম বোঝার ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরামের মাঝে মতভেদ হয়েছিল। উভয় দল হাদীসের মর্ম যা বুঝেছেন সে অনুযায়ী আমল করেছেন। এরপর সরাসরি আল্লাহর রাসূলের শরণাপন্ন হয়েছেন। কিন্তু তিনি কোনো দলকে তিরস্কার করেননি। বিস্তারিত ঘটনা উদ্ধৃতিসহ সামনে আসছে।

 তো দেখুন, প্রথম ঘটনা ছিল কিরাআতের পার্থক্য সংক্রান্ত, যা সুন্নাহর বিভিন্নতার মধ্যে শামিল। এই মতভেদের ক্ষেত্রে যখন আল্লাহর রাসূলের শরণ নেওয়া হল তিনি বিবাদ মিটিয়ে দিলেন, কিন্তু ইখতিলাফ বহাল রাখলেন এবং বললেন, উভয় পদ্ধতি সঠিক।

দ্বিতীয় ঘটনাটি ছিল রায় ইজতিহাদের মতপার্থক্য। এখানে প্রত্যেক পক্ষ হাদীস থেকে যা বুঝেছেন সে অনুযায়ী আমল করেছেন। এখানে তাদের মাঝে কোনো বিবাদ হয়নি। এরপরও তাঁরা বোধ হয় এজন্যই আল্লাহর রাসূলকে জিজ্ঞাসা করেছেন যে, তাঁর আদেশের সঠিক অর্থ জানবে না। কিন্তু হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী, আল্লাহর রাসূল তা বলেননি। শুধু এটুকু করেছেন যে, কোনো পক্ষকেই তিরস্কার করেননি। তাহলে এখানে তিনি ইজতিহাদ এবং সঠিক প্রেরণা তথা হাদীস অনুসুরণের প্রেরণা থেকে প্রকাশিত সিদ্ধান্তকে বহাল রেখেছেন। এই শ্রেণীর মতভেদকে তিনি বাতিল করেননি। তাহলে ইখতিলাফে মাহমূদ বা ইখতিলাফে মাশরূ, যে নামই দেওয়া হোক, কুরআন-সুন্নাহর সামনে উপস্থাপন করা হলে বিলুপ্ত হবে না। কারণ তো কুরআন-সুন্নাহর দলিলের ভিত্তিতেই হয়েছে। হ্যাঁ, এসব বিষয়ে কেউ যদি বিবাদে লিপ্ত হয় সে কুরআন-সুন্নাহর শরণাপন্ন হলে বিবাদ থেকে ফিরে আসবে। কারণ কুরআন তাকে বলবে-

وكلا آتينا حكما وعلما

অর্থ : আর তাদের প্রত্যেককে দিয়েছি প্রজ্ঞা জ্ঞান।

এবং হাদীস তাকে বলবে-

كلاكما محسن فاقرءا  এবং فما عنف واحدا من الفريقين

হ্যাঁ, ইখতিলাফে মাযমুম বা নিন্দিত মতভেদের ভিত্তি যেহেতু দলিল-প্রমাণের বিরোধিতা অথবা মূর্খতা হঠকারিতা কিংবা প্রবৃত্তি দুর্বল ধারণার অনুসরণ তাই ধরনের ইখতিলাফ কুরআন-হাদীসের দিকে প্রত্যাবর্তন অনুসরণের দ্বারা মিটে যায়।

পক্ষান্তরে ইখতিলাফে মাহমুদ বা ইখতিলাফে মাশরূ হয়েই থাকে কুরআন হাদীসের উপর অটল থাকার কারণে। তাই কুরআন-হাদীসের দিকে প্রত্যাবর্তনের কারণে ইখতিলাফ মিটে যাওয়ার কোনো অবকাশ নেই। এজন্য ধরনের ইখতিলাফ সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন, তাবে তাবেয়ীন আইম্মায়ে দ্বীনের মাঝেও হয়েছে এবং পরবর্তীতে আহলে হাদীস সালাফী উলামায়ে কেরামের মাঝেও হয়েছে।

যারাআসবাবে ইখতিলাফে ফুকাহাএবংফিকহে মুকারান’-এর কিতাবসমূহের সঠিক ধারণা রাখেন তাদের নিকট বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট বাস্তব সত্য, তবে কিছু কিছু মানুষ নিজের অজ্ঞতার কারণে ধরনের ইখতিলাফকে হাদীস মানা বা না মানার ইখতিলাফ বলে মানুষকে বিশ্বাস করাতে চায়।

ইজতিহাদী বিষয় একাধিক সুন্নাহ সম্বলিত বিষয়ে সুন্নাহর প্রতি আহবানের সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি

আলহামদুলিল্লাহ শিরোনামের বেশ কিছু জরুরি কথা বিক্ষিপ্তভাবে বিভিন্ন শিরোনামের আলোচনায় এসে গেছে। কিছু কথা সামনের শিরোনামগুলোতেও আসবে। তবে গুরুত্ব প্রাসঙ্গিকতার কারণে কিছু কথা আলাদা শিরোনামেও নিবেদন করছি।

ইখতিলাফুত তানাওউ বা একাধিক সুন্নাহ সম্বলিত বিষয়ে আহবানের বিধান

প্রথমেইখতিলাফুত তানাওউসম্পর্কে আলোচনা করছি। যেহেতু এখানে মতপার্থক্যের ক্ষেত্র এমন বিষয়, যাতে একাধিক সুন্নাহ রয়েছে, তাই এক্ষেত্রে নিমেণাক্ত নীতিমালা অনুসরণ করা কর্তব্য।

. যেহেতু সুন্নাহ মোতাবিক আমল হওয়াই উদ্দেশ্য তাই যে এলাকায় যে সুন্নাহর উপর আমল হচ্ছে এবং যে মসজিদে যে সুন্নাহর অনুসরণ হচ্ছে সেখানে তা- বহাল থাকতে দেওয়া উচিত। এলাকায়, মসজিদে সাধারণ মানুষকে দ্বিতীয় সুন্নাহর দিকে দাওয়াত দেওয়া মোটেই উচিত নয়। দাওয়াত খাইরুল কুরূন তথা সাহাবা-তাবেয়ীনের যুগে ছিল না।  যেসব ক্ষেত্রে সুন্নাহ একটি সেখানে সেই সুন্নাহর বিষয়ে অবহেলা করা হলে সুন্নাহর দিকে দাওয়াত দিতে হবে। তদ্রূপ কেউ সুন্নাহ ছেড়ে বিদআতে লিপ্ত হলে তাকে বাধা দিতে হবে এবং সুন্নাহর দিকে আসার দাওয়াত দিতে হবে। দাওয়াত সালাফের যুগে ছিল।

সুন্নাহর বিভিন্নতার ক্ষেত্রগুলোতে বেশির চেয়ে বেশি এই তো হবে যে, আপনার বা আপনার উস্তাদের গবেষণা অনুযায়ী, কিংবা আপনার প্রিয় মুহাদ্দিস বা প্রিয় ইমামের গবেষণা অনুযায়ী যে সুন্নাহ মোতাবেক আপনি আমল করছেন তা অপর সুন্নাহ থেকে অগ্রগণ্য বা সুন্নত হওয়ার দিকটি তাতে বেশি স্পষ্ট। তো এটুকু অগ্রগণ্যতা সাধারণ মানুষকে সেদিকে আহবান করার জন্য যথেষ্ট নয়। নতুবা একই কথা অন্য পক্ষেরও বলার অবকাশ থাকবে। তো উভয় পক্ষ যখন নিজেদের দিকে আহবান করতে থাকবে তখন ফলাফল কী হবে? সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে সাধারণ মানুষের মাঝে অস্থিরতা ছড়ানো হবে না কি?

শ্রেণীর মতভেদকে তো ইসলাম কুফর কিংবা সুন্নাহ বিদআর মতো বিভেদ-বিচ্ছিন্নতার মতভেদ সাব্যস্ত করা যায় না। এখানে অন্য পক্ষের মতামতের দালিলিক ভিত্তি স্বীকার করতে হবে (যদি ইনসাফ ন্যায়নিষ্ঠা থাকে) তাহলে একের দৃষ্টিতে যে প্রাধান্য অগ্রগণ্যতা তা অন্যের উপর কেন আরোপ করা হবে?

. ধরনের বিষয়ে সর্বোচ্চ যা হতে পারে তা এই যে, আলিমগণ নিজেদের মাঝে আলোচনা করতে পারেন এবং পারস্পরিক মতবিনিময় চিন্তার আদান-প্রদান হতে পারে। জাতীয় বিষয়ে সালাফের ফকীহ ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তিদের থেকে এটুকুই পাওয়া যায়।

. এই বিষয়গুলোকেনাহি আনিল মুনকারে আওতায় নিয়ে আসা এবং কোনো একটি পন্থার উপর মুনকার কাজের মতো প্রতিবাদ করা, সেই পন্থার অনুসারীদের নিন্দা-সমালোচনা করা, তাদেরকে সুন্নাহবিরোধী হাদীসবিরোধী আখ্যা দেওয়া সম্পূর্ণ নাজায়েয সুন্নাহ পরিপন্থী কাজ।

এই কথাগুলোর দলিল এই-

. যেহেতু দুটো পন্থাই নির্ভরযোগ্য হাদীস বা আছার দ্বারা প্রমাণিত তাই কোনো একটি পন্থার উপর যদিআমর বিল মারুফ নাহি আনিল মুনকারে বিধান প্রয়োগ করা হয় তাহলে দ্বিতীয় পন্থাটিকে, যা শরীয়তের দলিল দ্বারা প্রমাণিত, প্রত্যাখ্যান করা হয়, যা ভুল।

. এর দ্বারাইবতালুস সুন্নাহ বিল হাদীসবাইবতালুস সুন্নাহ বিস সুন্নাহঅর্থাৎ হাদীসের দ্বারা সুন্নাহকে বাতিল করা, কিংবা এক সুন্নাহ দ্বারা অন্য সুন্নাহকে বাতিল করা হয়। তো ক্ষেত্রেও বৈধ নয়, যেখানে দলিলসমূহের মাঝে বিরোধ পরিলক্ষিত হয়। ক্ষেত্রেও তো একটি দলিলকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, অন্য দলিলকে বাতিল করা হয় না। তাহলে যে ক্ষেত্রে বিরোধ নয়, সুন্নাহর বিভিন্নতা, সেক্ষেত্রে কীভাবে তা বৈধ হতে পারে?

. আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যামানায় একটি ঘটনায় যখন তাঁর আদেশের মর্ম বোঝার ক্ষেত্রে সাহাবীদের মাঝে মতপার্থক্য হল, আর তা হল ফরয নামায কাযা করার  মতো কঠিন বিষয়ে, এরপর মতপার্থক্য আল্লাহর রাসূলের দরবারে পেশ করা হল তখন তিনি কোনো পক্ষকেই কিছু বলেননি। সুন্নাহর বিরোধিতার অভিযোগ তো দূরের কথা। অথচ আদেশটি (হাদীসটি) তাঁরই ছিল। সুতরাং আদেশের উদ্দেশ্যও তাঁর নিশ্চিতভাবেই জানা ছিল। এরপরও কোনো পক্ষকে আদেশ পালনে ব্যর্থ ঘোষণা করেননি। আল্লাহর রাসূল কি উম্মতের জন্য আদর্শ নন? তাহলে উম্মত কীভাবে সুন্নাহর বিভিন্নতার ক্ষেত্রে ঘোষণা দিয়ে দেয়?

. উম্মাহর সালাফ-খালাফ তথা আগের পরের মনীষীগণের ইজমা এই যে-‘লা ইনকারা ফী মাসাইলিল ইজতিহাদঅর্থাৎইজতিহাদী বিষয়ে প্রতিবাদ নয় তাহলে যেসব ক্ষেত্রে সুন্নাহর বিভিন্নতামূলক মতপার্থক্য সেখানে প্রতিবাদ করা কীভাবে বৈধ হয়?

. আর বিশেষভাবে একাধিক সুন্নাহ সম্বলিত ক্ষেত্রগুলোতে সাহাবা-যুগ থেকে সালাফের নীতি অবস্থানতাওয়াতুরতথা উম্মাহর অবিচ্ছিন্ন কর্মধারার মাধ্যমে প্রমাণিত। তাঁরা জাতীয় বিষয়ে একে অন্যের প্রতিবাদ করতেন না। আলিমগণ নিজেদের মাঝে আলোচনা করতেন।

উল্লেখিত দলিল-প্রমাণের আলোকে যে কথাগুলো নিবেদন করা হল বড় বড় আলিম মনীষীগণও তা বলেছেন। তাদের কিছু উদ্ধৃতি সামনে আসছে। আপাতত আমি দুটি কিতাবের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

. রিসালাতুল উলফা বাইনাল মুসলিমীন (শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রাহ.-এর কিছু পুস্তিকা ফতোয়ার সমষ্টি)

সংকলনটি হালাবের মাকতাবুল মাতবূআতিল ইসলামিয়া থেকে শায়খ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রাহ.-এর সম্পাদনায় তাঁর টীকা সহকারে প্রকাশিত হয়েছে। এর প্রচ্ছদে লেখা আছে-

وفيها أمر الإسلام بالتوحد والائتلاف وحظره التنازع والتفرق عند الاختلاف.

অর্থাৎ পুস্তিকায় আলোচনা করা হয়েছে যে, ইসলাম তার অনুসারীদেরকে ঐক্য সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ থাকার আদেশ করে এবং মতপার্থক্যের ক্ষেত্রে বিভেদ-বিচ্ছিন্নতার শিকার হতে নিষেধ করে।

সংকলনটিতে তানাওউয়ে সুন্নাহ বা সুন্নাহর বিভিন্নতা সম্পর্কেও শায়খ ইবনে তাইমিয়া রাহ.-এর একটি পুস্তিকা আছে। তাতে তিনি ইজমা সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণ করেছেন যে, একাধিক সুন্নাহর ক্ষেত্রে যে মতপার্থক্য তাতে উপরোক্ত  কর্মপন্থাই অনুসরণীয়।

তিনি লেখেন, ‘প্রথমত সালাফের ইজমা আছে যে, ধরনের একাধিক সুন্নাহ সম্বলিত ক্ষেত্রগুলোতে হাদীস-সুন্নাহয় বর্ণিত প্রতিটি পন্থাই জায়েয বৈধ। দ্বিতীয়ত এসব বিষয়ের হাদীস আছার থেকেও এই প্রশস্ততা প্রমাণিত হয়।

দ্বিতীয় পুস্তিকাটি শায়খ আবদুল্লাহ ইবনে জইফুল্লাহ আররুহাইলী লিখিত। হিজাযের ভালো আলিমদের মাঝে তাঁকে গণ্য করা হয়। তিনি ফকীহও এবং মুহাদ্দিসও। তাঁর এই সারগর্ভ দলিল সম্বলিত পুস্তিকাটির নাম- دعوة إلى السنة في تطبيق السنة منهجا وأسلوبا

অত্যন্ত দরদের সাথে পুস্তিকাটি লেখা হয়েছে। তাই সেরকম দরদের সাথেই তা পাঠ করা উচিত। আমার সামনে পুস্তিকার প্রথম সংস্করণ রয়েছে, যা দারুল কলম বৈরুত থেকে ১৪১০ হিজরীতে প্রকাশিত হয়েছে।

এতে তিনি উলামা-তালাবা দায়ীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছেন, ‘আমরা সুন্নাহর অনুসরণ করতে চাই, সুন্নাহর দিকে আহবান করতে চাই, কিন্তু আমাদের কাজও তো সুন্নাহ অনুসারেই হতে হবে। সুন্নাহর অনুসরণ করতে গিয়ে, সুন্নাহর দিকে দাওয়াত দিতে গিয়ে কোনো কাজ যদি সুন্নাহবিরোধী হয়ে যায় তাহলে কেমন হবে?’

পুস্তিকার শুরুতে তেরোটি আয়াত হাদীস উল্লেখ করেছেন এবং তার আলোকে সর্বমোট ২৪টি বিষয়ে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এরপর بعض مظاهر المخالفة للسنة সুন্নাহ-বিরোধিতার কিছু দৃষ্টান্তশিরোনামে এমন কিছু সুন্নাহ-বিরোধী কাজ চিহ্নিত করেছেন, যেগুলো সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করতে গিয়ে এবং সুন্নাহর দিকে দাওয়াত দিতে গিয়ে করা হয়। এরপর বিভিন্ন শিরোনামে বিস্তারিত দালিলিক আলোচনা করেছেন। দীর্ঘ আলোচনা করেছেন একাধিক সুন্নাহর ক্ষেত্রগুলোতে নিজের কাছে অগ্রগণ্য পন্থার দিকে দাওয়াত দেওয়ার বিধান সম্পর্কে। পুস্তিকাটিও আদ্যোপান্ত পড়ার মতো। আমি শুধু প্রাসঙ্গিক কিছু কথা তুলে দিচ্ছি।

الإشارة إلى خطأ في مفهومنا لمعنى الالتزام بالكتاب والسنة

وخطأ آخر من أخطائنا في هذا العصر، ارتكبناه في سبيل الدعوة إلى السنة وإلى الاحتكام إلى الكتاب والسنة، وهذا الخطأ هو الجمود باسم الاتباع. لا شك في أن الاتباع للكتاب والسنة واجب، وأن الخضوع والتسليم لهما لازم لكل مسلم، ولا خيرة للمسلم أمام حكم الله وحكم رسوله، كما أنه لا يصْلُحُ أن يتقدم بين يدي الله ورسوله بالقول أو التشريع والحكم، هذا أمر لا جدال فيه، ولكن الخطأ والجناية على الكتاب والسنة هما في الحرص على الجمود، وعدم الفقه وسعة البصيرة في فهم الكتاب والسنة في ضوء نصوصهما ومقاصدهما الشرعية.

فترى فينا :

_ من يتسرع إلى القول بالتحريم

_ ومن يميل إلى التشديد في فهم الأحكام

_ من يتجه إلى القول الواحد دائما في المسائل، وإبطال ما عداه.

_ ومن ينظر إلى المستحبات النظر إلى الواجبات.

_ ومن يتوهم أن السنة في كل الأمور ليست إلا شيئا واحدا. فيحجر المرء بهذا واسعا. في حين أن السنة في مسألة ما قد تكون على وجهين. وليست وجها واحدا، أو يكون الأصل في بعض الأمور أن السنة فيه الإطلاق، وليس التقييد والتحديد.

সংক্ষিপ্ত তরজমা

কিতাব-সুন্নাহর অনুসরণের অর্থ বোঝার ক্ষেত্রে আমাদের একটি ভুল

যুগের একটি ভুল, যা কিতাব সুন্নাহর দিকে দাওয়াত দিতে গিয়ে আমরা করে থাকি তা হচ্ছে ইত্তিবার নামে স্থবিরতা। কিতাব সুন্নাহ যে অবশ্যঅনুসরণীয় এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এর জন্য তো জ্ঞান প্রজ্ঞা লাগবে এবং কিতাব সুন্নাহ সঠিকভাবে বুঝতে হবে। আজ আমাদের ভুল এখানেই যে, আমরা ইত্তিবা অনুসরণের নামে জুমুদ স্থবিরতার আশ্রয় নিয়েছি। সঠিকভাবে বোঝা ছাড়াই নিজের বুঝের দিকে দাওয়াত দিচ্ছি।

- কারো কারো প্রবণতা এই যে, কোনো কিছুকে হারাম বলার আগে পর্যাপ্ত চিন্তা-ভাবনা করে না।

- কেউ শরীয়তের বিধান বোঝার ক্ষেত্রে কাঠিন্য কড়াকড়ির দিককে প্রাধান্য দিয়ে থাকে।

- কেউ ইখতিলাফী মাসায়েলের ক্ষেত্রে সর্বদা একটি মতই স্বীকার করে এবং অন্যসব মত প্রত্যাখ্যান করে।

- কেউ মুস্তাহাব বিষয়ের সাথে ওয়াজিবের মতো আচরণ করে

- কেউ মনে করে, সকল বিষয়ে সুন্নাহ পদ্ধতি কেবল একটিই হয়। এভাবে একটি প্রশস্ত ক্ষেত্রকে তারা সংকীর্ণ বানিয়ে ফেলে। অথচ কোনো কোনো বিষয়ে সুন্নাহর দুটি পন্থা থাকে (অর্থাৎ উভয় পন্থা সুন্নাহসম্মত হয়) কোনো কোনো ক্ষেত্রে শুধু মূল বিষয়টি সুন্নাহ হয়ে থাকে, বিশেষ কেনো পন্থা নয়। (পৃ. ৫০-৫১)

তিনি আরো বলেছেন-

الإشارة إلى مسلك خاطئ في فهمنا لمسائل الخلاف الفرعية وطريقة دعوتنا إلى الراجح فيها

لقد ابتليت الأمة الإسلامية في هذا العصر بظهور شيء من الروح الجدلية لدى كثير من المسلمين الصالحين مع نزعة إلى الشدة والغِلظة والفظاظة في طريقة الدعوة وفي الحوار الموقف حتى في المسائل الفقهية الخلافية.

وقد ترتب على هذه الطريقة كثير من المفاسد التي لا يقرها الإسلام، ومن ذلك :

_ تفرق الصف الإسلامي على مسائل فرعية، ففي سبيل الحماس لها والأخذ بالصواب فيها نسِيَتْ بعض الأصول في كثير من الأحيان في سبيل التمسك بالصواب في المسائل الخلافية في تلك الفروع!

_ وترتب على ذلك ظهور التعصبات والتحيّزات التي يرافقها الجهل والظلم، بدعوى الحرص على الحق والصواب في تلك الأمور الخلافية من المسائل الفرعية والأساليب والوسائل!!.

_وترتب على ذلك تجرؤ كثير من صغار الطلاب على الاجتهاد والفتيا وآداب العلم و"المشيخة" أو "الزعامة" العلمية أو الدعوية من قِبَل هؤلاء الصغار، الذين لم يأتوا بجديد سوى الخلاف والفُرْقة والابتعاد عن الجادة، وكان يسعهم الحرص على الخير في منهج وسط يبعدهم عن كل هذه الأنواع من الشر!.

_ لقد نَتَجَ عن هذه المسالك الخاطئة في الدعوة وفي طلب العلم والتفقه في الدين والتعامل مع المخالفين تضخيم بعض الأحكام الفرعية والغلوّ في السنن والمستحبات، وذلك أمر لا يقره الدين، لأن السنن والمستحبات هي من الدين وينبغي أن تؤخذ على أنها كذلك، ولا يجوز أن يتجاوز بها قدرها، كما أنه لا يجوز أن تنقص عن قدرها الذي وضعها الله فيه، والدين بين الغالي والجافي والمُفْرِط والمفرّط، ونتج عن هذا الخلل _ كما قلت _ الوقوع فيما نهى الله تعالى عنه من التفرق في الدين والتفرق في الصف، وآيات الله تعالى أعظم شاهد في نهي الله تعالى أشد النهي عن الأمرين كليهما، وكذا سيرة الرسول صلى الله عليه وسلم وسيرة فقهاء هذه الأمة : أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم ومن تبعهم بإحسان من أئمة السلف، فمن تأمل ذلك كله أدرك الحق في هذه المسألة.

وإن المصلِحَ الحق هو ذلك الذي يسعى في الإصلاح من غير أن يرافق إصلاحه إفساد، أو من غير أن يتلبس إصلاحه بإفساد يعْلَمُهُ أو لا يَعْلَمُهُ!.

তার আলোচনার মূল আরবী পাঠ উল্লেখ করা হয়েছে। শাখাগত বিষয়ে নিজের কাছে অগ্রগণ্য মতের দিকে আহবান করার উপর তিনি কঠিন ভাষায় প্রতিবাদ করেছেন।

তিনি বলেন, এর দ্বারা মুসলিম উম্মাহর মাঝে বিভেদ সৃষ্টি হয়েছে। সকল বিষয়ের পিছনে পড়ে উম্মাহর ঐক্য সংহতির বিষয়টি ভুলে যাওয়া হয়েছে; বরং শাখাগত মাসাইলের পিছনে পড়ে কিছু মৌলিক বিষয়ও চিন্তা থেকে অন্তর্হিত হয়েছে।

- এসব বিষয়ে বাহাস-বিতর্কের পন্থা অনুসরণ করে সময়ের অপচয় করা হয়েছে। ঈমানী মহববত খতম করা হয়েছে। শত্রুতা বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়েছে, যা  কোনো মুসলিম তার মুসলিম ভাইয়ের প্রতি পোষণ করতে পারে না।

- (যে মতপার্থক্য শরীয়তসম্মত ছিল তাতে মতপার্থক্যের নীতি বিধান ত্যাগ করে ভুল পন্থা অনুসরণ করার ফলে) মানুষের মাঝে অন্যায় পক্ষপাত দলীয় চেতনা সৃষ্টি হয়েছে, যার অনিবার্য ফল হচ্ছে, মূর্খতা অবিচার।

- এই কর্মপদ্ধতির কারণে ছোট ছোট তালিবুল ইলমও নিদ্বির্ধায় ইজতিহাদ ফতোয়ার ময়দানে প্রবেশ করেছে, যা বিভেদ বিচ্ছিন্নতা ছাড়া নতুন কোনো সুফল দিতে সক্ষম হয়নি।

- এই ভুল কর্মপন্থার কারণে শাখাগত বিষয়গুলোকে বড় বানিয়ে পেশ করা, সুন্নত-মুস্তাহাবের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করা এবং এমনসব বিষয় পয়দা হচ্ছে, যা ইসলামে বৈধ নয়। সুন্নত-মুস্তাহাবকে না তার অবস্থান থেকে উপরে তোলা যাবে, না নীচে নামানো যাবে। দ্বীনের মাঝে কোনো প্রকারের প্রান্তিকতাই বৈধ নয়।

কর্মপন্থার ভুলে দ্বীনের বিষয়ে বিভেদ উম্মাহর মাঝে বিবাদ সৃষ্টি হয়েছে, যা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলার আয়াতসমূহই সাক্ষ্য দেয়, কত কঠিনভাবে তিনি তা নিষেধ করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সীরাত, সাহাবায়ে কেরাম তাবেয়ীনের সীরাতও বিষয়ে সাক্ষী।

সত্যিকারের সংস্কারক তো তিনিই, যার সংস্কার-কর্মে ধ্বংসের উপাদান থাকে না।-পৃ. ৪৮-৪৯

আমার ধারণা, একাধিক সুন্নাহ বিষয়ে যে মতপার্থক্য সে সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনার জন্য এটুকু আলোচনাই যথেষ্ট ইনশাআল্লাহ।

ইজতিহাদী মাসাইল বা ফূরুয়ী মাসাইলে মতভিন্নতার ক্ষেত্রে সঠিক কর্মপন্থা

ইজতিহাদী মাসাইল কাকে বলে তা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি। এর অপর নাম আলফূরুবা ফুরূয়ী মাসাইল। এসকল মাসআলায় দলিলের ধরনই এমন যে, আলিম গবেষকদের মাঝে মতপার্থক্য হতে পারে এবং হয়েছে। তাই এই মতপার্থক্য বিলুপ্ত করার চেষ্টা কোনো সমাধান নয়; এতে মতভেদ আরো বাড়বে। এখানে করণীয় হচ্ছে, ইখতিলাফের নীতি বিধান কার্যকর করে ইখতিলাফকে তার সীমায় আবদ্ধ রাখা; একে কলহ-বিবাদের কারণ হতে না দেওয়া।

আজ মুসলিম উম্মাহর ট্রাজেডি এই যে, শাখাগত বা অপ্রধান বিষয়কে কেন্দ্র করে তারা কলহ-বিবাদে লিপ্ত হচ্ছে এবং নিজেদের শক্তি খর্ব করছে। যেন কুরআন মজীদের নিষেধ-

ولا تنازعوا فتفشلوا

এর বাস্তব দৃষ্টান্ত। বিষয়টা আরব-আজমের সংবেদনশীল উলামা-মাশাইখকে অস্থির করে রেখেছে। তাঁরা বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন এবং দিয়ে যাচ্ছেন।

গত শতাব্দীতে আরবের কিছু ব্যক্তি তাকলীদের বিরুদ্ধে এত বলেছেন এবং ফূরূয়ী মাসাইলের ক্ষেত্রে এত কড়াকড়ি করেছেন যে, যুবশ্রেণীর মাঝে দ্বীনের বিষয়ে স্বেচ্ছাচার লাগামহীনতার
বিস্তার ঘটেছে, যা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সেখানের বড়দেরকে রীতিমতো পরিশ্রম করতে হয়েছে। তো এখানেও তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়ার অপেক্ষায় না থেকে আগেভাগেই আমাদের সতর্ক হওয়া উচিত।

আমি প্রথমে সালাফে সালেহীনের কিছু ঘটনা নির্দেশনা উল্লেখ করছি। এরপর ইনশাআল্লাহ বর্তমান যুগের আরব-আজমের কয়েকজন মুরববী আলিমের নির্দেশনা তুলে ধরব।

. ইমাম দারিমী রাহ. (১৮১-২৫৫ হি.) তাঁর কিতাবুস সুনানে বর্ণনা করেছেন যে, (তাবেয়ী) হুমাইদ আততবীল (আমীরুল মুমিনীন) উমার ইবনে আবদুল আযীয রাহ.কে বললেন, ‘আপনি যদি সকল মানুষকে এক বিষয়ে (এক মাযহাবে) একত্র করতেন তাহলে ভালো হত।তিনি বললেন, ‘তাদের মাঝে মতপার্থক্য না হলে আমি খুশি হতাম না।এরপর তিনি ইসলামী শহরের গভর্ণরদের উদ্দেশে ফরমান পাঠালেন-

ليقض كل قوم بما اجتمع عليه فقهاءهم

প্রত্যেক কওম যেন সিদ্ধান্ত মোতাবেক ফায়সালা করে, যে বিষয়ে তাদের ফকীহগণ (আলিমগণ) একমত।-সুনানুদ দারিমী, পৃষ্ঠা : ১৩৪

. ইমাম ইবনে আবী হাতেম ইমাম মালেক থেকে বর্ণনা করেন যে, খলীফা আবু জাফর মানসুর আগ্রহ প্রকাশ করলেন যে, আমি চাই গোটা মুসলিম সাম্রাজ্যে এক ইলমের (অর্থাৎ মুয়াত্তা মালিকের) অনুসরণ হোক। আমি সকল এলাকার কাযী সেনাপ্রধানের নিকট ব্যাপারে ফরমান জারি করতে চাই।

ইমাম মালেক রাহ. বললেন, ‘জনাব! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতের মাঝে ছিলেন। তিনি বিভিন্ন জনপদে সেনাদল প্রেরণ করেছেন, কিন্তু ইসলামের দিগ্বিজয়ের আগেই তাঁর ওফাত হয়ে গেছে। এরপর আবু বকর খলীফা হয়েছেন। তাঁর আমলেও বেশি কিছু রাজ্য বিস্তার হয়নি। এরপর উমর খলীফা হয়েছেন। তাঁর সময়ে প্রচুর শহর জনপদ বিজিত হয়েছে। তিনি সেসব বিজিত এলাকায় শিক্ষা-দীক্ষার জন্য সাহাবীগণকে প্রেরণ করেছেন। সেই সময় থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত (প্রত্যেক জনপদে সাহাবীগণের শিক্ষাই) এক প্রজন্ম থেকে অপর প্রজন্ম পর্যন্ত পৌঁছেছে।

অতএব আপনি যদি তাদেরকে তাদের পরিচিত অবস্থান থেকে অপরিচিত কোনো অবস্থানে ফেরাতে চান তবে তারা একে কুফরী মনে করবে। সুতরাং প্রত্যেক জনপদকে তাদের অবস্থার উপর ছেড়ে দিন এবং নিজের জন্য এই ইলমকে (মুয়াত্তা মালেক) গ্রহণ করুন।

আবু জাফর তাঁর কথা মেনে নিলেন।’-তাকদিমাতুল জারহি ওয়াত তাদীল ২৯

ইবনে সাদের বর্ণনায় ইমাম মালেকের বক্তব্যে উল্লেখ আছে যে-

يا أمير المؤمنين! لا تفعل هذا، فإن الناس قد سبقت إليهم أقاويل، وسمعوا أحاديث، ورووا روايات، وأخذ كل قوم بما سبق إليهم وعملوا.

ইয়া আমীরাল মুমিনীন! এমনটি করবেন না। কেননা, লোকেরা (সাহাবীগণের) বক্তব্য শুনেছে, হাদীস শুনেছে, রেওয়ায়েত বর্ণনা করেছে এবং প্রত্যেক জনগোষ্ঠী তাই গ্রহণ করেছে, যা তাদের নিকট পৌঁছেছে এবং তদনুযায়ী আমল করেছে।’-আততবাকাত ৪৪০

(القسم المتمم)

খতীব বাগদাদীর বর্ণনায় আছে, ইমাম মালেক  বলেন-

يا أمير المؤمنين! إن اختلاف العلماء رحمة من الله تعالى على هذه الأمة، كل يتبع ما صح عنده، وكل على هدى، وكل يريد الله تعالى.

ইয়া আমীরাল মুমিনীন! নিঃসন্দেহে আলেমগণের মতপার্থক্য আল্লাহর পক্ষ থেকে উম্মতের জন্য রহমত। প্রত্যেকে তাই অনুসরণ করে, যা তার নিকট সহীহ সাব্যস্ত হয়েছে, প্রত্যেকেই হেদায়েতের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং প্রত্যেকেই আল্লাহর (সন্তুষ্টি) কামী।’-কাশফুল খাফা, আলআজলূনী /৫৭-৫৮; উকূদুল জুমান, আসসালেহী ১১

বিচক্ষণ ব্যক্তিদের জন্য এই দুটি ঘটনায় জ্ঞান প্রজ্ঞার অনেক উপাদান আছে।

বর্তমান যুগের আকাবির মাশাইখ

. মুফতী মুহাম্মাদ শফী রাহ. (১৩১৪ হি.-১৩৯৬ হি.)

জাওয়াহিরুল ফিকহের প্রথম খন্ডে হযরতের দুটি রিসালা আছে। দুটোই মূলত আলিমদের সমাবেশে দেওয়া বক্তব্য : . ওয়াহদাতে উম্মত, . ইখতিলাফে উম্মত পর এক নজর আওর মুসলমানোঁ কে লিয়ে রাহে আমল।

দুটো রিসালাই আমাদের পাঠ করা উচিত।

প্রথম পুস্তিকার শেষে হযরত বলেন, দায়িত্বশীল আলিমদের প্রতি ব্যথিত নিবেদন-‘রাজনীতি অর্থনীতির অঙ্গনে এবং পদ পদবীর প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে যে বাড়াবাড়ি সীমালঙ্ঘন তার প্রতিকার তো আমাদের সাধ্যে নেই। কিন্তু দ্বীনী ধর্মীয় কাজে নিয়োজিত দলগুলোর নীতি কর্মপন্থার যে বিরোধ তা বোধ হয় দূর করা সম্ভব। কারণ সবার লক্ষ্য অভিন্ন। আর লক্ষ্য অর্জনে সফলতার জন্য তা অপরিহার্য। যদি আমরা ইসলামের বুনিয়াদী উসূল মৌলনীতি সংরক্ষণের এবং নাস্তিকতা ধর্মহীনতার স্রোত মোকাবেলাকে সত্যিকার অর্থে মূল লক্ষ্য মনে করি তাহলে এটিই সেই ঐক্যের বিন্দু, যেখানে এসে মুসলমানদের সকল ফের্কা সব দল একত্রিত হয়ে কাজ করতে পারে আর তখনই এই স্রোতের বিপরীতে কোনো বলিষ্ঠ পদক্ষেপ কার্যকর হতে পারে।

কিন্তু বাস্তব অবস্থার দিকে তাকালে বলতে হয়, এই মূল লক্ষ্যটিই আমাদের দৃষ্টি থেকে গায়েব হয়ে গেছে।   কারণে আমাদের সমস্ত সামর্থ্য এবং জ্ঞান গবেষণার সমুদয় শক্তি নিজেদের ইখতিলাফি মাসআলায় ব্যয় হচ্ছে। ওগুলোই আমাদের ওয়াজ, জলসা, পত্রিকা বই-পুস্তকের আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের এমন কর্মকান্ডে সাধারণ মানুষ কথা মনে করতে বাধ্য হচ্ছে যে, ইসলাম ধর্ম কেবল এই দুই-চার জিনিসেরই নাম। আরো আক্ষেপের বিষয় এই যে, ইখতিলাফী মাসআলাসমূহে যেই দিকটি কেউ অবলম্বন করেছে তার বিপরীতটিকে গোমরাহী এবং ইসলামের শত্রুতা আখ্যা দিচ্ছে। ফলে আমাদের যে শক্তি কুফুরি, নাস্তিকতা, ধর্মহীনতা এবং সমাজে বাড়তে থাকা বেহায়াপনার মোকাবেলায় ব্যয় হতে পারত তা এখন পরস্পর কলহ-বিবাদে ব্যয় হচ্ছে। ইসলাম ঈমান আমাদেরকে যে ময়দানে লড়াই আত্মত্যাগের আহবান জানায় সেই ময়দান শত্রুর আক্রমণের জন্য খালি পড়ে আছে। আমাদের সমাজ অপরাধ অন্যায়ে ভরপুর, আমল-আখলাক বরবাদ, চুক্তি লেনদেনে ধোঁকাবাজি, সুদ, জুয়া, মদ, শূকর, অশ্লীলতা, নির্লজ্জতা অপরাধপ্রবণতা আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মিশে গেছে।

প্রশ্ন হল, আম্বিয়া কেরামের উত্তরসূরী এবং দেশ ধর্মের প্রহরীদের নিজেদের মধ্যেকার মতপার্থক্যের বেলায় যতটা সংক্ষুব্ধ হতে দেখা যায় তার অর্ধেকও কেন সেসব খোদাদ্রোহীদের বেলায় দেখা যায় না? এবং  পরস্পর চিন্তাগত মতপার্থক্যের বেলায় যেমন ঈমানী জোশ প্রকাশ পায় তা ঈমানের এই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কেন প্রকাশ পায় না? আমাদের বাকশক্তি এবং লেখনীশক্তি যেমন শৌর্যবীর্যের সাথে নিজেদের ইখতিলাফি মাসআলায় লড়াই করে তার সামান্যতম অংশও কেন ঈমানের মৌলিক বিষয়ের উপর আসা হুমকির মোকাবেলায় ব্যয় হয় না? মুসলমানদেরকে মুরতাদ বানানোর প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে আমরা সকলে কেন সিসাঢালা প্রাচীরের মতো রুখে দাঁড়াই নাসর্বোপরি আমরা বিষয়ে কেন চিন্তা করি না যে, নবী প্রেরণ কুরআন নাযিলের মহান উদ্দেশ্য, যা পৃথিবীতে বিপ্লব সৃষ্টি করেছে এবং যা পরকে আপন বানিয়ে নিয়েছে, যা আদম
সন্তানদেরকে পশুত্ব থেকে মুক্ত করে মানবতার মর্যাদা দিয়েছে এবং যা সমগ্র দুনিয়াকে ইসলামের আশ্রয়কেন্দ্র বানিয়েছে তা কি শুধু এই সব বিষয়ই ছিল, যার ভিতর আমরা লিপ্ত হয়ে আছি। এবং অন্যদেরকে হেদায়েতের পথে আনার তরীকা পয়গম্বরসুলভ দাওয়াত দেওয়ার কি এটাই ছিল ভাষা, যা আজ আমরা অবলম্বন করেছি?

এখনো কি সময় হয়নি যে, ঈমানদারদের অন্তরগুলো আল্লাহর স্মরণ তার  নাযিলকৃত সত্যের সামনে অবনত হবে ...

শেষ পর্যন্ত তাহলে সময় কবে আসবে যখন আমরা শাখাগত বিষয়আশয় থেকে কিছুটা অগ্রসর হয়ে ইসলামের মৌলিক নীতিমালার সংরক্ষণ এবং অবক্ষয়প্রাপ্ত সমাজের সংশোধনকে নিজেদের আসল কর্তব্য মনে করব। দেশের মধ্যে খৃস্টবাদ কমিউনিজমের সর্বগ্রাসী সয়লাবের খবর নিব। কাদিয়ানীদের হাদীস অস্বীকার ধর্ম বিকৃতির জন্য কায়েম করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পয়গম্বরসুলভ দাওয়াত এসলাহের মাধ্যমে মোকাবেলা করব।

আর যদি আমরা এগুলো না করি এবং হাশরের ময়দানে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে প্রশ্ন করেন যে, আমার দ্বীন শরীয়তের উপর এই হামলা হচ্ছিল, ইসলামের নামে কুফরি বিস্তার লাভ করছিল, আমার উম্মতকে আমার দুশমনের উম্মত বানানোর ধারাবাহিক প্রচেষ্টা চলছিল, কুরআন সুন্নাহর প্রকাশ্য বিকৃতি ঘটছিল, আল্লাহ রাসূলের প্রকাশ্য নাফরমানি করা হচ্ছিল তখন তোমরা ইলমের দাবীদারেরা কোথায় ছিলে? তোমরা এর মোকাবেলায় কতটা মেহনত এবং ত্যাগ স্বীকার করেছ? কতজন বিপথগামী ব্যক্তিকে পথে এনেছ? তো আমাদের ভেবে দেখা উচিত সেদিন আমাদের উত্তর কী হবে?

কর্মপন্থা

এজন্য জাতির প্রতি সংবেদনশীল এবং ঈমান ইসলামের উসূল মাকসাদসমূহের প্রতি সচেতন উলামায়ে কেরামের কাছে আমার ব্যথাভরা নিবেদন-মাকসাদের গুরুত্ব নাযুকতাকে সামনে রেখে সবার আগে মন থেকে এই অঙ্গীকার করুন যে, নিজেদের ইলমী আমলী যোগ্যতা এবং কথা কলমের শক্তিকে বেশির থেকে বেশি ময়দানে নিয়োজিত করবেন, যার সংরক্ষণের জন্য কুরআন হাদীস আপনাদের ডাকছে।

. সম্মানিত ওলামা! বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিন এবং প্রতিজ্ঞা করুন যে, কাজের জন্য নিজের বর্তমান ব্যস্ততার মধ্য থেকে বেশির থেকে বেশি সময় বের করবেন।

. পরস্পর মতপার্থক্য ইজতিহাদী বিরোধকে কেবল নিজেদের দরস এবং লেখালেখি ফতওয়া পর্যন্ত সীমিত রাখবেন। আম জলসা, পত্রপত্রিকা, বিজ্ঞপ্তি, পরস্পর বিতর্ক ঝগড়া-বিবাদের মাধ্যমে তাকে বড় করবেন না। নবীদের মতো দাওয়াত ইসলাহের নীতির অধীনে কষ্টদায়ক ভাষা, নিন্দা, উপহাস, আক্রমণ বাক্যচালনা থেকে বিরত থাকবেন।

. সমাজে ছড়িয়ে পড়া ব্যধিসমূহের প্রতিকারের জন্য হৃদয়গ্রাহী শিরোনামে সেণহ আন্তরিকতাপূর্ণ ভাষা আঙ্গিকে কাজ শুরু করুন।

. নাস্তিকতা ধর্মহীনতা এবং কুরআন-সুন্নাহর বিকৃতির মোকাবেলার জন্য পয়গম্বরদের দাওয়াতের নীতি অনুসারে প্রজ্ঞাপূর্ণ কৌশল,
আন্তরিকতাপূর্ণ আলোচনা এবং হৃদয়গ্রাহী দলিল প্রমাণের মাধ্যমে وجادلهم بالتي هي أحسن এর সাথে নিজের মুখের ভাষা কলমের শক্তিকে ওয়াকফ করে দিন।

ধরনের আরেক বক্তৃতায় তিনি বলেন, ‘যে দেশকে একদিকে খৃস্টান মিশনারীরা নিজেদের পূর্ণ শক্তি এবং পার্থিব জাকজমকের সাথে খৃস্টান-রাজ্য বানানোর স্বপ্ন দেখছে আরেকদিকে প্রকাশ্যে আল্লাহর বান্দা এবং তাদের শিক্ষা-দীক্ষা নিয়ে উপহাস করা হচ্ছে, অন্যদিকে কুরআন ইসলামের নামে ঐসব কিছু করা হচ্ছে, যাকে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করার জন্যই কুরআন ইসলাম এসেছিল, সে দেশে কেবল শাখাগত মাসাইল এবং তার বিচার-পর্যালোচনা প্রচারণার চেষ্টায় লিপ্ত হয়ে মৌলিক বিষয়াদি থেকে যারা উদাসীন রয়েছি তাদের প্রতি যদি আল্লাহ তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর তরফ থেকে প্রশ্ন করা হয়-তোমাদের দ্বীনের বিষয়ে যখন এই সকল বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল তোমরা তার জন্য কী করেছিলে, তখন আমাদের কী জবাব হবে? আমার বিশ্বাস, কোনো ফের্কা, কোনো জামাত যখন বিভেদ-বিতর্ক থেকে উপরে উঠে বিষয়ে চিন্তা করবে তখন তার বর্তমান কাজকর্মের জন্য অনুশোচনা হবে এবং তার তৎপরতার রোখ বদলে যাবে। যার
ফলে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-কলহ নিশ্চয়ই হ্রাসপ্রাপ্ত হবে।

. শায়খ মুহাম্মাদ ইবনে ছালিহ আলউছাইমীন (১৪২১ হি.)

তিনি বিষয়ে অনেক বলেছেন এবং অনেক লিখেছেন। আমরা এখানে তার কয়েকটি কথা নকল করছি :

) ‘‘ যুগের কিছু কিছু সালাফী, বিরোধীদেরকে গোমরাহ  বলে থাকে, তারা হকপন্থী হলেও। আর কিছু কিছু লোক তো একে বিভিন্নইসলামীদলের মত একটি দলীয় মতবাদে পরিণত করেছে। এটা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়, অবশ্যই এর প্রতিবাদ করতে হবে। তাদেরকে বলতে হবে, সালাফে সালেহীনের কর্মপদ্ধতি লক্ষ করুন, ইজতিহাদগত মতপার্থক্যের ক্ষেত্রে তাদের নীতি কী ছিল এবং তাঁরা কেমন উদারতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তাঁদের মাঝে তো অপেক্ষাকৃত বড় বড় বিষয়েও মতভেদ হয়েছে, কোনো কোনো (শাখাগত) আকীদা বিষয়েও মতভেদ হয়েছে : দেখুন, আল্লাহর রাসূল তাঁর রবকে দেখেছেন কিনা- বিষয়ে কেউ বললেন, দেখেননি; কেউ বললেন, দেখেছেন। কেয়ামতের দিন আমল কীভাবে ওজন করা হবে- বিষয়ে কেউ বলেছেন, আমল ওজন করা হবে। কেউ বলেছেন, আমলনামা ওজন করা হবে; তেমনি ফিকহের মাসাইল- নিকাহ, ফারাইয, ইদ্দত, বুয়ূ  (বেচাকেনা) ইত্যাদি বিষয়েও তাঁদের মাঝে মতভেদ হয়েছেকিন্তু তাঁরা তো একে অপরকে গোমরাহ বলেননি।

সুতরাং যাদের বিশ্বাস, ‘সালাফীএকটি সম্প্রদায়, যার নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট রয়েছে, অন্যরা সবাই গোমরাহ, প্রকৃত সালাফী আদর্শের সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। সালাফী মতাদর্শের অর্থ হচ্ছে, আকিদা-বিশ্বাস, আচরণ- উচ্চারণ, মতৈক্য-মতানৈক্য এবং পরস্পর সৌহার্দ্য সম্প্রীতির ক্ষেত্রে সালাফে সালেহীনের পথে চলা। যেমনটি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন; প্রীতি, করুণা পরস্পরের প্রতি অনুরাগে মুমিনগণ যেন একটি দেহ, যার এক অঙ্গ অসুস্থ হলে গোটা দেহ জ্বর নিদ্রাহীনতায় আর্তনাদ করতে থাকে। এটিই হচ্ছে প্রকৃত সালাফী মতাদর্শ।’ [লিকাআতুল বাবিল মাফতূহ, প্রশ্ন : ১৩২২]

) শায়খ মুহাম্মাদ ইবনে ছালিহ উছাইমিন রাহ. জামেয়া ইসলামিয়া মদীনা মুনাওয়ারায় ২১/১২/১৪১১ হিজরী তারিখে একটি মুহাযারা (বক্তৃতা) পেশ করেছিলেন। তাতে তিনি বিশেষভাবে বলেছেন-

سب العالم سبب لانتهاك السنة النبوية وسبب لانتهاك العلم الشرعي.

 ‘আলিমকে কটুক্তি করা সুন্নাহর অমর্যাদা শরয়ী ইলমের অমর্যাদার কারণ হয়ে থাকে।

. ‘যখন আলিমদের দিক (তাদের মান-মর্যাদা) দুর্বল হয় তখন সাধারণ মানুষের কিতাব সুন্নাহর অনুসরণও দুর্বল হয়ে যায়।

. ‘যারা আলিমদের অমর্যাদায় লিপ্ত বাস্তবে তারা সুন্নাহর আবরণ ছিন্ন করার কাজে লিপ্ত।’ 

. ‘আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মন মুখকে সুস্থ সংযত রাখা।

. ‘আলিম দায়ীগণের নিন্দা-সমালোচনাকারী উম্মতকে আলিম দায়ীদের প্রতি বিরূপ করে থাকে। উম্মত আলিম দায়ীদের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে। তখন দ্বীন-শরীয়তের প্রতিও তাদের আস্থা থাকে না।

সমালোচিতদের প্রতি আস্থা নষ্ট হওয়ার পর সমালোচনাকারীদের প্রতিও লোকের আস্থা থাকে না। আর এতে আনন্দিত হয় ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী (ইসলামের দুশমনেরা)’-আদদাওয়াতু ইলাল জামাআতি ওয়াল ইতিলাফ পৃষ্ঠা : ১০১

. . নাসির ইবনে আবদুল কারীম আলআকল

তিনি জামিআতুল ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে সাউদ আলইসলামিয়া রিয়াদের প্রফেসর। তিনিআলইফতিরাক : মাফহূমুহু, আসবাবুহূ, সুবুলুল বিকায়াতি মিনহুনামে একটি সংক্ষিপ্ত সারগর্ভ পুস্তিকা লিখেছেন। তাতে তিনি কথাও বলেছেন যে, জেনে বুঝে সচেতনতার সাথে ইমামগণের অনুসরণ করা হলে একেও তাকলীদ নামে আখ্যায়িত করা হয়! বলা হয়, মাশাইখের অনুসরণ হচ্ছে তাকলীদ আর তা নাজায়েয! আমাদের কাছে কিতাব আছে, জ্ঞানের বিভিন্ন মাধ্যম আছে, এখন কেন আলিমদের কাছে যেতে হবে? এই ভুল চিন্তা খন্ডন করে তিনি বলেন, ইমাম, মাশাইখ আলিমগণের অনুসরণ করা ওয়াজিব ...

শরীয়তের দৃষ্টিতে (আহলে ইলমের) ইত্তিবা অনুসরণ অপরিহার্য। কারণ আম মুসলিম জনসাধারণ; বরং ইলম চর্চায় নিয়োজিত অনেকেই ইজতিহাদ তথা সঠিক পন্থায় দলীল-প্রমাণ গ্রহণে বিশ্লেষণে পারদর্শী নয়। তো এরা কাদের নিকট থেকে ইলম হাসিল করবে? এবং কীভাবে ইলম অর্জনের পদ্ধতি, সুন্নাহর নিয়ম এবং সালাফে সালেহীন ইমামগণের নীতি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করবে? তো আহলে ইলমের অনুসরণ ছাড়া সম্ভব নয়। একে (নিন্দিত বর্জনীয়) তাকলীদ বলে না। নতুবা প্রত্যেকেই নিজের ইমাম হবে এবং যত ব্যক্তি তত দলের উদ্ভব ঘটবে। এটা নিঃসন্দেহে ভুল। সুতরাং সঠিক পন্থায় ইমামদের অনুসরণ (নিন্দিত) তাকলীদ নয়। নিন্দিত তাকলীদ হচ্ছে অন্ধ অনুসরণ। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, (তরজমা) ‘যদি না জান তাহলে জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞাসা কর।

উলামা মাশায়েখ দ্বীনদার মুবাল্লিগদের থেকে বিমুখ হয়ে শুধু বইপত্রের মাধ্যমে ইলম অর্জনের চেষ্টা করা এবং মনে করা যে, এখন বইপত্র আছে, ক্যাসেট আছে, প্রচারমাধ্যম আছে, ইলম অর্জনের জন্য এগুলোই যথেষ্ট, এটা ইলম অন্বেষণের একটা মারাত্মক ভুল পদ্ধতি।

তিনি আরো বলেন, ‘বিভেদের আরেকটি কারণফিকহুল খিলাফতথা মতপার্থক্যের প্রকার, বিধান নীতি সম্পর্কে এবংফিকহুল জামাআতি ওয়াল ইজতিমাতথা ঐক্য মতৈক্যের নীতি বিধান সম্পর্কে সঠিক উপলব্ধির অভাব। কোন মতপার্থক্য বৈধ, কোন মতপার্থক্য বৈধ নয় অপর পক্ষকে কোন ক্ষেত্রে মাযূর মনে করা হবে, কোন ক্ষেত্রে মনে করা হবে না, তেমনি জামাআ ইজতিমার অর্থ কী, বিভেদ-অনৈক্যের ক্ষতি অনিষ্ট কী-এসব বিষয় সঠিকভাবে বোঝা উচিত।

আমার সামনে কিতাবের ইন্টারনেট সংস্করণ রয়েছে।

. শায়খ আবদুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ বিন ছালিহ আলমুতায

তিনিআদদাওয়াতু ইলাল জামাআতি ওয়াল ইতিলাফ ওয়ান নাহয়ু আনিত তাফাররুকি ওয়াল ইখতিলাফনামে একটি ছোট পুস্তিকা লিখেছেন। তাতে ঐক্য সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা এবং বিদ্বেষ-অনৈক্য পরিহারের আহবান জানিয়েছেন।

  কিতাবে শায়খ . সালিহ ইবনে ফাওযান আলফাওযানের অভিমতও রয়েছে। পুস্তিকাটিতে অনেক উদ্ধৃতি দলিলের সাথে বারবার বলা হয়েছে যে, ফুরূয়ী মাসআলায় মতভেদের পরও আমাদেরকে ঐক্য সম্প্রীতি অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে। সকল মতভেদ কিন্তু বিভেদ বিচ্ছিন্নতাকে অপরিহার্য করে না।  কোনো মতপার্থক্যের বিষয়ে যদি সংশয় হয় যে, তা সহনীয় কি না তাহলে এর সমাধান বড় বড় আলিমরা করবেন।

. মাওলানা মুহাম্মাদ তকী উছমানী দামাত বারাকাতুহুম

হযরত তার সফরনামাসফর দর সফর কিরগিজিস্তানের বিবরণে লেখেন, ‘এখন সেখানকার পরিস্থিতি কতকটা এমন যে, একদিকে সাধারণ মুসলমান সোভিয়েত ইউনিয়নের চলমান মতবাদ কৃষ্টি-কালচারে প্রভাবিত হয়ে দ্বীনের প্রাথমিক বিষয়গুলো সম্পর্কেও অজ্ঞ এবং পশ্চিমা সংস্কৃতিতে মেতে ইসলামের বিধিনিষেধ থেকে সম্পূর্ণ উদাসীন; রাস্তাঘাটে চলাচলকারী  নারীদের পোশাক থেকে বোঝার উপায় নেই যে, ইসলামী জীবনধারার সাথে তাদের ন্যূনতম যোগাযোগ আছে। অপর দিকে ধর্মীয় অভিভাবকদের মাঝে দ্বিতীয় জামাত করা, জুমার সাথে সতর্কতামূলক যোহর আদায় করা আর সালাফী বন্ধুদের উপস্থিতির সুবাদেআরশে সমাসীন হওয়া মত জটিল জটিল মাসআলা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আলোচনার মূল বিষয় ছিল কিরগিজিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্বীনী মেহনতকে কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায় এবং ক্ষেত্রে উলামায়ে কেরাম দ্বীনী ব্যক্তিবর্গের করণীয় কী হওয়া উচিৎ। প্রসঙ্গে শ্রোতাদের কাছে সবিনয় নিবেদন করি যে, শাখাগত মাসআলায় ইখতিলাফ থেকে আপনাদের মনোযোগ ফিরিয়ে নিন। আপনারা নজর দিন উম্মাহর মৌলিক স্বতঃসিদ্ধ বিষয়গুলোর শিক্ষা প্রচার প্রসারে, অধিকাংশ জনসাধারণ যে সম্পর্কে বেখবর অজ্ঞ।

আলহামদু লিল্লাহ সম্মেলন শ্রোতাদের একথার উপর শেষ হয়েছে যে, আল্লাহর রহমতে কিছু ইখতিলাফ তো মিটে গেছে। বাকিগুলোর ব্যাপারে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, এগুলোকে আলোচনার বিষয় বানাব না। বরং এখন আমাদের সর্বাত্নক চেষ্টা হবে দ্বীনের মৌলিক বিষয়গুলোর দাওয়াত তালীমে  মনোযোগ দেওয়া। (পৃ : ১৩৬- ১৩৮)

রাশিয়ার সফরের বিবরণে লেখেন-

রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের কিছু তরুণ আরব ভার্সিটি থেকে কম বেশি পড়াশোনা করে এসেছে। তারা কট্টর সালাফী হয়ে দেশে ফিরেছে। যেহেতু দাগিস্তানের অধিকাংশ আলিম শাফেয়ী মাযহাবের অনুসারী, তাঁদের মাঝে দীর্ঘকাল থেকে তাসাওউফের সিলসিলা অব্যাহতভাবে চলে আসছে আর শাফেয়ী মাযহাবের (পরবর্তী কিছু আলিমের মধ্যে কোনো কোনো) বিদআতের ব্যাপারে কিছু ছাড় আছে- কারণে ঐসব তরুণ এখানে এসে শক্ত অবস্থান নিয়েছে। ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর তাকলীদ এবং তাসাওউফের বিরুদ্ধে তারা কঠোরভাবে বিরোধিতা শুরু করেছে। কেউ কেউ তো এখানকার প্রবীণ আলেমদের মুশরিক পর্যন্ত বলেছে। এর ভিত্তিতে এখানকার মুসলমানদের মাঝে অস্থিরতা দেখা দিচ্ছে।

প্রেক্ষাপটে আমার আলোচনার মূল বিষয়বস্ত্ত ছিল, কমিউনিজমের আধিপত্য নির্যাতন থেকে স্বাধীনতা অর্জনের পর রাশিয়ার মুসলমানদের কর্মপদ্ধতি কী হওয়া উচিৎ। প্রসঙ্গে আমি বললাম যে, আজ রাশিয়ার মুসলমানদের মাঝে যদি ইসলাম ইসলামী জীবনপদ্ধতির কোন চিহ্ন বাকি থেকে থাকে তা কেবল প্রবীণ উলামায়ে কেরামের মেহনতের ফসল। যারা কমিউনিস্ট শাসনের অন্ধকার রাতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইলমে দ্বীনের আলো জ্বালিয়ে রেখেছিলেন এবং যারা জীবন জীবিকার সকল সুযোগ-সুবিধা আরাম-আহার ত্যাগ করে ভবিষ্যত প্রজন্মের দ্বীন ঈমানের হেফাযত করেছেন। তাই আজকের তরুণসমাজের কর্তব্য, ঐসকল মহীরূহ উলামায়ে দ্বীনের যথার্থ মূল্যায়ন সম্মান করা। পাশাপাশি এটা কখনো ভোলা উচিৎ নয় যে, শাখাগত মাসআলায় ইখতেলাফ সব যুগেই ছিল। ইখতিলাফকে কেন্দ্র করে একপক্ষ অপর পক্ষের বিরুদ্ধে কাফের মুশরিক বলে ফতোয়া দেওয়া হলে এতে কেবল ইসলামের শত্রুরাই লাভবান হবে। আজ তো রাশিয়ার অবস্থা এই যে, ইসলাম ইসলামের বিধি-বিধান সম্পর্কে দমনপীড়নের কারণে সাধারণ মুসলমানদের কাছে দ্বীনের মৌলিক শিক্ষাই অস্পষ্ট হয়ে গেছে। মুহূর্তে তাদের কাছে দ্বীনের মৌলিক জ্ঞান পৌঁছানো অবশ্যকর্তব্য। মুসলমানদের এমন অসহায় পরিস্থিতিতেআরশে সমাসীন হওয়া’, ‘তাকলীদ চলবে, না গাইরে তাকলীদ’- জাতীয় মাসআলায় ইখতিলাফ করা হলে দ্বীনের ক্ষতিসাধনে এর চেয়ে বড় কোনো ফেতনা আর হতে পারে না। তাই সাধারণ মুসলমানের কর্তব্য এটাই যে, তারা প্রবীণ আলেমদের সাথে জুড়ে থাকবেন। কোনো বিষয়ে সন্দেহ হলে আপোসে সমাধা করে নেবেন। কলহ কোন্দলের দিকে যাবেন না।  (পৃ :১৭৯-১৮০)       

আমি নিবেদন করছিলাম যে, বর্তমান সময়ে এটি গোটা মুসলিম জাহানের সমস্যা। এজন্য বিষয়টির সংশোধন অতি প্রয়োজন। আল্লাহ তাআলা তাওফীক দান করুন। তবে এর জন্য শর্ত হচ্ছে ইখলাস হিম্মত।

নামাযের পদ্ধতিতে সুন্নাহর বিভিন্নতা বা সুন্নাহ অনুধাবন কেন্দ্রিক মতপার্থক্য

নামায ঐক্যের চিহ্ন, একে বিবাদের কারণ বানাবেন না

 ( শিরোনামের আলোচনা মাসিক আলকাউসারে এবং নবীজীর নামাযের ভূমিকায় প্রকাশিত হয়েছে। তাই এখানে নির্বাচিত কিছু অংশ তুলে দেওয়া হল।)

উম্মতের উপর ফকীহগণের বড় অনুগ্রহ এই যে, তারা শরীয়তের বিধি-বিধানের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ যেমন করেছেন তেমনি তা সংকলনও করেছেন। বিশেষত ইবাদতের পদ্ধতি তার পূর্ণাঙ্গ কাঠামো স্পষ্টভাবে পেশ করেছেন, যা হাদীস, সুন্নাহ আমলে মুতাওয়ারাছ’ (যা সুন্নাহর এক গুরুত্বপূর্ণ প্রকার) থেকে গৃহীত। এর বড় সুবিধা এই যে, কেউ মুসলমান হওয়ার পর সংক্ষেপে তাকে নামাযের পদ্ধতি বুঝিয়ে দেওয়া হয় আর সে সঙ্গে সঙ্গে নামায পড়া আরম্ভ করে। শিশুদেরকে শেখানো হয়, সাত বছর বয়স থেকেই তারা নামায পড়তে থাকে। সাধারণ মানুষ, যাদের দলীলসহ বিধান জানার সুযোগ নেই এবং শরীয়তও তাদের উপর এটা ফরয করেনি, তাদেরকে শেখানো হয় আর তারা নিশ্চিন্ত মনে আল্লাহ তাআলার ইবাদত করতে থাকে।

যদি অমুসলিমকে ইসলাম গ্রহণের পর এবং শিশুকে বালেগ হওয়ার পর বাধ্য করা হত যে, তোমরা নামায আদায়ের পদ্ধতি হাদীসের কিতাব থেকে শেখ, কারো তাকলীদ করবে না, দলীল-প্রমাণের আলোকে সকল বিষয় নিজে পরীক্ষা করে নামায পড়বে তাহলে বছরের পর বছর অতিবাহিত হবে, কিন্তু তার নামায পড়ার সুযোগ হবে না। একই অবস্থা হবে যদি সাধারণ মানুষকে এই আদেশ করা হয়।

খুব ভালো করে বুঝে নেওয়া প্রয়োজন যে, কুতুবে ছিত্তা (বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, নাসায়ী, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ) অন্যান্য প্রসিদ্ধ হাদীস-গ্রন্থের সংকলক ইমামগণও প্রথমে নামায শিখেছেন ফিকহে ইসলামী থেকেই, এরপর পরিণত হয়ে হাদীসের কিতাব সংকলন করেছেন। অথচ হাদীসের কিতাব সংকলন করার পর তারা না ফিকহে ইসলামীর উপর কোনো আপত্তি করেছেন, আর না মানুষকে ফিকহ সম্পর্কে আস্থাহীন করেছেন। বরং তারা নিজেরাও ফকীহগণের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। তবে যেখানে ফুকাহায়ে কেরামের মধ্যে মতভেদ হয়েছে সেখানে তারা নিজেদের বিচার-বিবেচনা মোতাবেক কোনো এক মতকে অবলম্বন করেছেন এবং অন্য মত সম্পর্কে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন।

মোটকথা, হাদীসের কিতাবসমূহের সংকলক এবং হাদীসশাস্ত্রের ইমামগণের যেমন বড় অবদান উম্মতের প্রতি রয়েছে তেমনি ফিকহে ইসলামীর সংকলক ফিকহের ইমামগণেরও বড় অবদান রয়েছে। উম্মাহর অপরিহার্য কর্তব্য, কিয়ামত পর্যন্ত উভয় শ্রেণীর মনীষীদের অবদান স্বীকার করা এবং উভয় নেয়ামত : হাদীস ফিকহকে সঙ্গে রেখে চলা।

নামাযের পদ্ধতিগত কিছু বিষয়ে খুলাফায়ে রাশেদীন সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকেই বিভিন্নতা ছিল। এটা খাইরুল কুরূনেও ছিল এবং পরের যুগগুলোতেও ছিল। এর কারণ সম্পর্কেও ইতিপূর্বে কিছু আলোচনা হয়েছে। এই ধরনের  ক্ষেত্রে উম্মতের করণীয় কী তা শরীয়তের দলীলের আলোকে ফিকহে ইসলামীতে বলা হয়েছে। হাদীস মোতাবেক নামায পড়ার জন্য
ওই নির্দেশনা অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই।

ধরনের বিষয়ে উম্মাহর যে নীতিখাইরুল কুরূনতথা সাহাবা, তাবেয়ীন তাবে তাবেয়ীন-এর যুগ থেকে অনুসৃত তা সংক্ষেপে এই :

যে অঞ্চলে যে সুন্নাহ প্রচলিত সেখানে তা- চলতে দেওয়া উচিত। এর উপর আপত্তি করা ভুল। কেননা আপত্তি বিষয়ে করা হয়, যা বিদআত বা সুন্নাহর পরিপন্থী। এক সুন্নাহর উপর এজন্য আপত্তি করা যায় না যে, এটা আরেক সুন্নাহর মোতাবেক নয়।

প্রসঙ্গে ইসমাঈল শহীদ রাহ.-এর ঘটনাটি উল্লেখযোগ্য। তিনি একবার রুকু ইত্যাদিতেরাফয়ে ইয়াদাইনকরতে আরম্ভ করেছিলেন। অথচ সে সময় গোটা ভারতবর্ষের সর্বত্র (ক্ষুদ্র কিছু অঞ্চল ব্যতিক্রম ছিল, যেখানে ফিকহে শাফেয়ী অনুযায়ী আমল হত) নামাযের সূচনা ছাড়া অন্য কোনো স্থানে রাফয়ে ইয়াদাইন না-করার সুন্নতটি প্রচলিত ছিল। শাহ শহীদ রাহ.-এর বক্তব্য ছিল, মৃত সুন্নত জীবিত করার ছওয়াব অনেক বেশি। হাদীস শরীফে বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে-

من تمسك بسنتي عند فساد أمتي فله أجر مأة شهيد

উম্মতের ফাসাদের মুহূর্তে যে আমার সুন্নাহকে ধারণ করে সে একশত শহীদের মর্যাদা পাবে।

তখন তাঁর চাচা হযরত মাওলানা আবদুল কাদের দেহলবী রাহ. (শাহ ওয়ালিউল্লাহ রাহ.-এর পুত্র, তাফসীরে মূযিহুল কুরআন-এর রচয়িতা) তার এই ধারণা সংশোধন করেন। তিনি বলেন, ‘‘মৃত সুন্নাহকে জীবিত করার ফযীলত যে হাদীসে এসেছে সেখানে বলা হয়েছে যে, উম্মাহর ফাসাদের যুগে যে ব্যক্তি সুন্নাহকে ধারণ করে তার জন্য এই ফযীলত। তো কোনো বিষয়ে যদি দুটো পদ্ধতি থাকে এবং দুটোই মাসনূন (সুন্নাহভিত্তিক) হয় তাহলে এদের কোনো একটিকেওফাসাদবলা যায় না। সুন্নাহর বিপরীতে শিরক বিদআত হল ফাসাদ, দ্বিতীয় সুন্নাহ কখনও ফাসাদ নয়। কেননা, দুটোই সুন্নাহ। অতএব রাফয়ে ইয়াদাইন না-করাও যখন সুন্নাহ, তো কোথাও সুন্নাহ অনুযায়ী আমল হতে থাকলে সেখানে রাফয়ে ইয়াদাইনের সুন্নাহজীবিতকরে উপরোক্ত ছওয়াবের আশা করা ভুল। এটা ওই হাদীসের ভুল প্রয়োগ। কেননা এতে পরোক্ষভাবে দ্বিতীয় সুন্নাহকে ফাসাদ বলা হয়, যা কোনো মতেই সঠিক নয়।

এই ঘটনাটি আমি বিশদ করে বললাম। মূল ঘটনা মালফূযাতে হাকীমুল উম্মত . , পৃ৫৪০-৫৪১, মালফুয : ১১১২৬ . , পৃ. ৫৩৫, মালফুয : ১০৫৬ এবং মাজালিসে হাকীমুল উম্মত পৃ. ৬৭-৬৯ তে উল্লেখিত হয়েছে।

সারকথা, সালাফে সালেহীন বিদআত থেকে দূরে থাকতেন এবং বিদআতের বিরোধিতা করতেন। আর সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করতেন এবং সুন্নাহকে জীবিত করতেন। কিন্তু কখনও তাদের নীতিইবতালুস সুন্নাহ বিসসুন্নাহবাইবতালুস সুন্নাহ বিলহাদীসছিল না। অর্থাৎ তারা এক সুন্নাহকে অন্য সুন্নাহর মোকাবেলায় দাঁড় করাতেন না। তদ্রূপসুন্নতে মুতাওয়ারাছাদ্বারা প্রমাণিত আমলের বিপরীতে রেওয়ায়েত পেশ করে তাকে বিলুপ্ত করার চেষ্টা করতেন না। এক সুন্নাহর সমর্থনে অন্য সুন্নাহকে খন্ডন করা  আর একেমুর্দা সুন্নত জিন্দা করাবলে অভিহিত করা তাদের নীতি ছিল না। এটা  ভুল নীতি, যা খাইরুল কুরূনের শত শত বছর পরে জন্মলাভ করেছে।

. কয়েক বছর আগের ঘটনা। তখনও শায়খ আলবানী মরহুমের কিতাবছিফাতুস সালাহতার পুরো নাম-

صفة صلاة النبي صلى الله عليه وسلم من التكبير إلى التسليم كأنك تراها

-এর বাংলা তরজমা প্রকাশিত হয়নি, আমার কাছে একজন জেনারেল শিক্ষিত ভাই এসেছিলেন, যাকে বোঝানো হয়েছিল কিংবা তাদের বোঝানোর দ্বারা তিনি বুঝে নিয়েছিলেন যে, এই দেশের অধিকাংশ মুসলমান যে পদ্ধতিতে নামায পড়ে তা হাদীস মোতাবেক হয় না। তিনি আমার কাছে অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গেসুসংবাদদিলেন যে, আলবানী মরহুমের কিতাব বাংলায় অনুদিত হয়েছে! শীঘ্রই তা প্রকাশিত হতে যাচ্ছে! জিজ্ঞাসা করলেন, কিতাব সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা আছে কি না! জানা নেই, তিনি মাসআলা জানার জন্য এসেছিলেন, নাহেদায়েতকরার জন্য। আমি শুধু এটুকু আরজ করেছিলাম যে, আপনি আপনার শিক্ষকদের কাছ থেকে তিন-চার জন  সাহাবীর নাম নিয়ে আসুন যাদের নামায শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আলবানী মরহুমের কিতাবে উল্লেখিত নিয়ম অনুযায়ী ছিল! তিনি ওয়াদা করে গিয়েছিলেন, কিন্তু সাত-আট বছর অতিবাহিত হল আজও তাঁর দেখা পাইনি!

একটু চিন্তা করুন। তাকবীরে তাহরীমা ছাড়া নামাযের অন্য কিছু তাকবীরের মধ্যে রাফয়ে ইয়াদাইন করা যদি আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. অন্য কিছু সাহাবীর আমল হয়ে থাকে তাহলে রাফয়ে ইয়াদাইন না-করা তাঁর পিতা খলীফায়ে রাশেদ হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা-এর আমল। তদ্রূপ চতুর্থ খলীফায়ে রাশেদ হযরত আলী ইবনে আবু তালিব রা. প্রবীণ সাহাবীদের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.সহ সাহাবীদের এক জামাত এই নিয়মেই নামায পড়েছেন। তো এদের মধ্যে কার নামাযকে আপনি খেলাফে সুন্নত বলবেন?

আমাদের যে বন্ধুরা শুধু রাফয়ে ইয়াদাইনকেই সুন্নত মনে করেন এবং রাফয়ে ইয়াদাইন না করাকে ভিত্তিহীন বা খেলাফে সুন্নত মনে করেন তারা ফাতিহা পাঠ সম্পর্কে বলে থাকেন যে, ইমামের পিছনে জোরে আস্তে সব কিরাতের নামাযে মুকতাদীর জন্য ফাতিহা পড়া ফরয, না পড়লে নামায হবে না। কোনো কোনো কট্টর লোক তো এমনও বলে যে, ফাতিহা ছাড়া যেহেতু নামায হয় না তো যারা ইমামের পিছনে ফাতিহা পড়ে না তারা সব যেন বে-নামাযী। আর বে নামাযী হল কাফির!! (নাউযুবিল্লাহ)

আমাদের এই বন্ধুরা যদি চিন্তা করতেন যে, যে আবদুল্লাহ ইবনে উমরের রা. বর্ণনাকৃত হাদীস মোতাবেক তারা রফয়ে ইয়াদাইন করে থাকেন তিনিও তো ইমামের পিছনে কুরআন (ফাতিহা এবং ফাতিহার সঙ্গে আরো কিছু অংশ) পড়তেন না। মুয়াত্তায় সহীহ সনদে এসেছে, তিনি বলেন-

إذا صلى أحدكم خلف الإمام فحسبه قراءة الإمام، وإذا صلى وحده فليقرأ

যখন তোমাদের কেউ ইমামের পিছনে নামায পড়ে তখন ইমামের কিরাতই তার জন্য যথেষ্ট। আর যখন একা পড়ে তখন সে যেন (কুরআন) পড়ে।

আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.-এর বিশিষ্ট শাগরিদ নাফে রাহ. তাঁর এই ইরশাদ বর্ণনা করে বলেন, ‘আবদুল্লাহ ইবনে উমর ইমামের পিছনে পড়তেন না।’ (মুয়াত্তা পৃ. ৮৬)

ওই বন্ধুদেরনীতিঅনুযায়ী তো আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.-এরও নামায হত না! আর যখন তাঁর নামায হত না তাহলে রাফয়ে ইয়াদাইন বিষয়ে কিংবা অন্য কোনো বিষয়ে তাঁর বর্ণনাকৃত হাদীস দ্বারা প্রমাণ দেওয়া যাবে কি? কেননা (তাদের কথা অনুযায়ী আল্লাহ মাফ করুন) ‘বেনামাযীরহাদীস কীভাবে গ্রহণ করা যাবে!

অথচ শরীয়তের দলীল দ্বারা ইজমায়ে উম্মত দ্বারা প্রমাণিত যে, তাঁর হাদীস অবশ্যই গ্রহণযোগ্য। তাহলে এটা কি প্রমাণ করে না যে, ধরনের বিষয়ে কারো নিন্দা-সমালোচনা করা কিংবা গোমরাহ ফাসেক আখ্যা দেওয়া নাজায়েয অবৈধ?

আমীন জোরে বলা হবে না আস্তে- নিয়ে আমাদের এই বন্ধুরা ঝগড়া-বিবাদ করে থাকেন। হাদীস আছারের গ্রন্থসমূহ তারা যদি সঠিক পন্থায় অধ্যয়ন করতেন তবে জানতে পারতেন যে, সুফিয়ান ছাওরী রাহ., যাঁর রেওয়ায়েতকৃত হাদীসের ভিত্তিতে এরা জোরে আমীন বলে থাকেন স্বয়ং তিনিই আমীন আস্তে বলতেন। (আলমুহাল্লা, ইবনে হায্ম /৯৫)

যদি বিষয়টাসুন্নাহর বিভিন্নতানা হত কিংবা অন্ততমুজতাহাদ ফীহনা হত তাহলে এই প্রশ্ন কি আসত না যে, যে ব্যক্তি নিজের রেওয়ায়েতকৃত হাদীসের উপর নিজেই আমল করে না তার রেওয়ায়েত দ্বারা প্রমাণগ্রহণ জায়েয কি না?

এভাবে অন্যান্য বিষয়েও যদি চিন্তা করতে থাকেন তাহলে এইসব ক্ষেত্রে সাহাবা-যুগ থেকে চলে আসা মতভেদ আপনাকে বিচলিত করবে না। আর একে বিবাদ-বিসংবাদের মাধ্যম বানানোর প্রবণতাও দূর হয়ে যাবে। ইনশাআল্লাহ।

হাদীস অনুযায়ী আমল করারও নির্ধারিত পন্থা রয়েছে। এই পন্থার বাইরে গেলে তা আর হাদীস অনুসরণ থাকে না, যা শরীয়তে কাম্য। ইত্তেবায়ে সুন্নতেরও মাসনূন পদ্ধতি রয়েছে। পদ্ধতি পরিহার করে সুন্নতের অনুসরণ করতে গেলে তা একটা অসম্পূর্ণ সংশোধনযোগ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

কেউ যদি রাফয়ে ইয়াদাইনের সুন্নত অনুযায়ী আমল করে তবে এতে অসুবিধার কী আছে? শাফেয়ী হাম্বলী মাযহাবের লোকেরাও তো এই সুন্নত মোতাবেক আমল করে থাকেন। হারামাইনের অধিকাংশ ইমাম হাম্বলী মাযহাবের সাথে যুক্ত। তারাও এই সুন্নতের উপর আমল করে থাকেন। কিন্তু তারা তো রাফয়ে ইয়াদাইন না-করার সুন্নতকে প্রত্যাখ্যান করেন না। যারা এই সুন্নত অনুযায়ী আমল করেন তাদের সঙ্গে বিবাদ-বিসংবাদে লিপ্ত হন না, তাদের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জবাজি, লিফলেটবাজি করেন না। তারা অন্যের নামাযকে বাতিল বলা তো দূরের কথা খেলাফে সুন্নতও বলেন না। তারা হাদীস অনুসরণের ক্ষেত্রে নিজেদের বিদ্যা-বুদ্ধির উপর নির্ভর না করেআহলুয যিকরফিকহের ইমামগণের উপর নির্ভর করেন।

এখানে ঘটনাটি উল্লেখ করা যায়, যা হাকীমুল উম্মত থানভী রাহ.-এর মালফূযাতে রয়েছে। ঘটনার সারসংক্ষেপ এই যে, এক জায়গায় আমীন জোরে বলা নিয়ে হাঙ্গামা হয়ে গেল এবং বিষয়টা মামলা-মোকদ্দমা পর্যন্ত গড়াল। ঘটনার তদন্তের জন্য যাকে দায়িত্ব দেওয়া হল তিনি তদন্ত শেষে রিপোর্টে লিখলেন যে, ‘আমীন বিলজাহরঅর্থাৎআমীন জোরে বলাহাদীস শরীফে আছে এবং মুসলমানদের এক মাযহাবে তা অনুসরণ করা হয়। তদ্রূপআমীন বিছছিরঅর্থাৎআস্তে আমীন বলা হাদীস শরীফে আছে আর মুসলমানদের এক মাযহাবে তা অনুসৃত। আরেকটি হলআমীন বিশশারঅর্থাৎ হাঙ্গামা সৃষ্টির জন্য উচ্চ আওয়াজে আমীন পাঠ। এটা উপরোক্ত দুই বিষয় থেকে ভিন্ন। প্রথম দুই প্রকার অনুমোদিত আর তৃতীয়টা নিষিদ্ধ হওয়া চাই।-মালফূযাতে হাকীমুল উম্মত, - : , কিসত : , পৃষ্ঠা : ২৪০-২৪১; - : , কিসত : , পৃষ্ঠা : ৫০৬, প্রকাশনা দেওবন্দ

বলাবাহুল্য, আস্তে আমীন বলাকে ভুল বা হাদীস পরিপন্থী আখ্যা দিয়ে একমাত্র নিজেদেরকে সুন্নতের অনুসারী দাবি করে উচ্চ স্বরে আমীন পাঠ করা আমীন বিলজাহর নয়, যা হাদীস শরীফে এসেছে এবং সালাফে সালেহীনের এক জামাত যার অনুসরণ করতেন।

. যদি সাধারণ মানুষের কাছে উলামা-মাশায়েখের আমলের বিপরীত কোনো দাওয়াত পৌঁছে তাহলে তাদের জন্য যা করণীয় তা এই যে, তারা পরিষ্কার বলে দিবেন, ভাই, আমরা সাধারণ মানুষ। আমাদের নিজেদের পক্ষে গবেষণা পরীক্ষা নিরীক্ষা করা সম্ভব নয়, আপনাদের কথা যদি মানতে হয় তাহলে আপনাদের উপরই নির্ভর করে মানতে হবে, সেক্ষেত্রে ওলামা-মাশায়েখের কথার উপর নির্ভর করতে অসুবিধা কী?

আর যদি বিষয়ে আপনাকে মাথা ঘামাতেই হয় তাহলে তারপদ্ধতি এই :

. কেউ যদি আপনাকে বলে, (উদাহরণস্বরূপ) ভাই, তুমি যে রাফয়ে ইয়াদাইন করছ না- তো হাদীস বিরোধী! আপনি আদবের সঙ্গে বলুন, সব হাদীসের বিরোধী, না রফয়ে ইয়াদাইন না-করারও কোনো হাদীস আছে? তারা বলবে, হ্যাঁ, হাদীস তো কিছু আছে, কিন্তু সব জয়ীফ বা ভিত্তিহীন। আপনি প্রশ্ন করুন, এটা কি আপনার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, না হাদীস বিশারদদের ফয়সালা? এরপর সব হাদীস-বিশারদের ফয়সালা, না তাঁদের কারো কারো? একজন ইমামও কি রফয়ে ইয়াদাইন না-করার হাদীসকেসহীহবলেননি? যদি তার মধ্যে সততা থাকে তাহলে বলতে বাধ্য হবে যে, জ্বী, একাধিক ইমাম হাদীসকেও সহীহ বলেছেন।

আপনি বলুন, আমার জন্য এই যথেষ্ট। যখন সাহাবা, তাবেয়ীন তাবে তাবেয়ীনের একটি জামাত রাফয়ে ইয়াদাইন না-করার হাদীস মোতাবেক আমল করেছেন তো আপনি তার বিশেষ কোনো সনদকে জয়ীফ বললে কী আসে যায়? সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকে প্রজন্ম পরম্পরায় চলে আসা এবং উম্মাহর উলামা-মাশায়েখের মাঝে স্বীকৃত বিষয়কে শুধু সংশ্লিষ্ট একটি হাদীসের সনদের দুর্বলতা দ্বারা প্রশ্নবিদ্ধ করা কি মারাত্মক ভুল নয়!

আর সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হল, আপনি তাকে হিকমতের সাথে কোনো বিশেষজ্ঞ আলিমের কাছে নিয়ে যাবেন, যার হাদীস সীরাতের কিতাবসমূহের উপর এবং ফিকহে মুদাল্লাল ফিকহে মুকারানের কিতাবসমূহের উপর দৃষ্টি রয়েছে। ইনশাআল্লাহ সকল ভুল ধারণার অবসান ঘটবে এবং কটুকথা, নিন্দা-সমালোচনার ধারাও বন্ধ হবে।

. যারা খতীব বা মুদাররিস-এর দায়িত্বে রয়েছেন কিংবা দ্বীনী বিষয়ে সাধারণ মানুষ যাদের শরণাপন্ন হয় তাদের খিদমতে নিবেদন, যদিও আম মানুষ জেনারেল শিক্ষিত মানুষের পক্ষে দলীল দলীল দ্বারা দাবী প্রমাণের পদ্ধতি বোঝা কঠিন তবুও তাদেরকে  এই প্রশ্ন না করাই ভালো যে, দলীল জানতে চাওয়ার অধিকার তাদের আছে কি না। বরং রাহমাতান বিইবাদিল্লাহ তাদের সঙ্গে কোমল আচরণ করুন এবং অনুগ্রহপূর্বক তাদের কথাবার্তা-যদিও তা উল্টাসিধা হোক না কেন-শুনুন। তারা যদি দলীল জানতে চায় তাহলে অন্তত দুএকটি স্পষ্ট দলীল তাদেরকে জানিয়ে দিন। তবে এর জন্য প্রস্ত্ততির প্রয়োজন আছে। আপনাকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কিতাবাদি অধ্যয়ন করতে হবে এবং সকল বিষয়ের সর্বাধিক সহজ সবচেয়ে বিশুদ্ধ দলীল  সহজভাবে উপস্থাপনের যোগ্যতা অর্জন করতে হবে।

সাথে সাথে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খেয়াল রাখুন যে, সকল ইখতিলাফী বিষয়ে অন্যরা যেমন প্রান্তিকতার শিকার আপনি যেন তা না হন। যেমন আপনি বলবেন না রাফয়ে ইয়াদাইন মানসূখ হয়ে গেছে; বরং এমন বলুন, রাফয়ে ইয়াদাইন আছে, কিন্তু রাফয়ে ইয়াদাইন না করার সুন্নাহ আমাদের ইমামের দৃষ্টিতে অগ্রগণ্য। আপনি অন্যের রফয়ে ইয়াদাইন করা জোরে আমীন বলার উপর আপত্তি করবেন না, তেমনি আপনার মুসল্লিদেরকেও তাদের সাথে ঝগড়া করার অনুমতি দিবেন না। নতুবা আপনার তাদের অবস্থা এক হয়ে যাবে। আপনি তাদেরকে হিকমতের সাথে বোঝান যে, ‘আপনাদের তো এক সুন্নাহ থেকে অন্য সুন্নাহর দিকে বা অন্য মোবাহ তরীকার দিকে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আর যদি যেতেই হয় তাহলে অন্যকে হাদীসবিরোধী মনে করার কোনো সুযোগ নেই। তেমনি এই
চিন্তারও সুযোগ নেই যে, আহা! এতদিন পর হেদায়েত পেলাম! আর অন্যের সাথে কলহ-বিবাদের তো প্রশ্নই আসে না। সেটা যদি করেন তাহলে নিঃসন্দেহে আপনি সুন্নাহ পরিপন্থী রাস্তায় চলে গেলেন! অথচ যে বিষয়ে তাদের  সাথে বিবাদে অবতীর্ণ হবেন তাতে তারা সুন্নাহর উপর আছেন। তাহলে কী লাভ হল? আপনি এমন একটি সুনণতের সমর্থন করতে গিয়ে, যার বিপরীতটিও সুন্নাহ, এমন পথ অবলম্বন করলেন, যা সর্ববাদীসম্মত সিদ্ধান্ত অনুসারে সুন্নাহ পরিপন্থী!!’ এভাবে খুলে খুলে এবং দলিলের সাথে বোঝান। ভৎর্সনা উচিতও নয়, ফায়েদাও নেই।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাওফীক দান করুন। আমীন।

(চলবে ইনশাআল্লাহ)


 

 

 

 

advertisement