জুমাদাল উখরা-১৪৩৩   ||   মে-২০১২

ঝড়ের পরে

ইবনে নসীব

পয়লা বৈশাখ গেল। দেশের উপর দিয়ে যেন বয়ে গেল নাচ-গান, নাটক-সিনেমা, টকশো-বক্তৃতা, অহং-অভিমান এবং উল্লাস-উন্মাদনার এক কালবৈশাখী। সেই ঝড়ের তান্ডব থেমেছে। এখন বোধহয় শান্তির সাথে কিছু কথা বলা যায় এবং শান্তভাবে কিছু বিষয় ভাবা যায়।

উৎসবে মত্ত হওয়া আমাদের স্বভাব। এটা পুরাপুরি বদলানো যাবে না। তবে চেষ্টা করলে কিছুটা ভারসাম্য বোধ হয় অর্জন করা যাবে। তখন আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে প্রয়োজনগুলোর দিকে নজর বেশি দেওয়া যাবে।

এটি কোনো গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ নয়। সেসব লেখার জন্য আছেন দেশের বাঘা বাঘা লেখক-বুদ্ধিজীবী। আমি এখানে ক্ষুদ্র দু-একটি কথা নিবেদন করছি।

এখন ঘর থেকে বের হলে সড়কের ধারে, পথের মোড়ে অনেক বিলবোর্ড চোখে পড়ে। কে যেন বলেছিলেন, এসব বিলবোর্ডের বাণী ও বার্তার পিছনে ব্যয় করা হয় অনেক মেধা, সময় এবং অর্থ। কোনো কোনো বিলবোর্ডে এর ছাপ দেখা যায়। কোনো কোনোটা ব্যতিক্রমও থাকে। দুঃখের বিষয়, এরকম একটি ব্যতিক্রমী বিলবোর্ডে ছিল পয়লা বৈশাখের অনুভূতি। সুন্দর অলঙ্করণের মাঝে বড় বড় হরফে উৎকীর্ণ ছিল এই বাক্যটি- কোটি প্রানে বাঙালীয়ানা। এভাবেই বাক্যটি লেখা হয়েছে!

অবশ্য এখন চারপাশের অজস্র সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড এবং ওভারব্রিজগুলোতে ঝোলানো অভিনন্দন বাণীতে বানানভুলের যে ছড়াছড়ি তাতে মনে হতে পারে সংস্কৃতির সাথে ভাষার সম্পর্ক খুবই সামান্য। নতুবা বাঙালী সংস্কৃতির ধ্বজাধারীরা কেন এত উদাসীন হবেন বাংলাভাষার বিষয়ে?

পয়লা বৈশাখে দৈনিক পত্রিকাগুলোতে যথারীতি প্রকাশিত হয়েছে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেত্রী এবং অন্যদের বাণী। রাষ্ট্রপতির বাণীর একটি বাক্য এই-বাঙালীর সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, আশা-আকাঙ্খা, আবেগ-অনুভূতি বিমূর্ত হয়ে ওঠে এই দিনে। (দৈনিক প্রথম আলো, ১ বৈশাখ ১৪১৯)

শব্দটি বোধহয় মূর্ত হবে। এটা অবশ্য কম্পোজের ভুলও হতে পারে।

সবাই জানি, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, আশা-আকাঙ্খা, আবেগ-অনুভূতি- এগুলো হচ্ছে বিমূর্ত ও নিরাকার বিষয়। হয়তো বলতে চাওয়া হয়েছিল, পয়লা বৈশাখের উৎসবে-উচ্চারণে এই বিষয়গুলো মূর্ত হয়ে, আকার ধারণ করে চোখের সামনে এসে যায়। তাহলে বলতে হবে, মূর্ত হয়ে ওঠে।

অবশ্য বাস্তবতার মিল বিমূর্ত শব্দের সাথেই বেশি। কারণ এদিনের উৎসব-অনুষ্ঠানের সাথে সংখাগরিষ্ঠ দেশবাসীর আনন্দ-বেদনা, আশা-আকাঙ্খা, আবেগ-অনুভূতির তেমন কোনো সম্পর্ক নেই। অনেক কারণেই নেই। ধর্মীয় ও আদর্শিক কারণ তার অন্যতম। সুতরাং এইসব সরব অনুষ্ঠানে দেশবাসীর নীরব অনুভূতি আরো নীরব, আরো নির্বাক হয়ে পড়ে। এই হিসেবে এখানে বিমূর্ত  শব্দটির উপস্থিতি যথার্থই বলা চলে। 

 

 

advertisement