রবিউস সানী-১৪৩৩   ||   মার্চ-২০১২

একটি অনুপম মৃত্যু

মুহাম্মাদ জাহিরুল আলম

এই কদিন আগে জানুয়ারি মাসে যে মেয়েটি আমাদের সকলকে কাঁদিয়ে, পুরো বংশকে শোকের এক মহাসাগরে ভাসিয়ে দিয়ে মুচকি হেসে কালিমা শরীফ জপতে জপতে এই নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে সে আমার জ্যৈষ্ঠ পুত্রবধূ ডা. ফারজানা সৈয়দা আখতার লিপি।

তার কথা বলতে গেলে আমার বুক ফেটে কেবল কান্না আসে। কথা এগোয় না। ভাবনাও থেমে যায়। শুধু ইচ্ছা করে বসে বসে যেন কাঁদি আর তার জন্য দোয়া করি। মনে হয় সব শান্তি এরই মধ্যে নিহিত। এত ভালো একটি মেয়ে, মুখে সর্বদা মিষ্টি সুন্দর হাসি লেগে থাকা মেয়ে আমি জীবনে কখনো কোথাও দেখেছি বলে মনে পড়ে না। তাকে কখনও শব্দ করে অট্টহাসি হাসতে যেমন দেখিনি তেমনি গোমড়া মুখেও তেমন দেখা যায়নি। আজ সে নেই। স্নেহময়ী মায়ের আদরটুকু জীবন্ত করে রেখে গেছে তার রেখে যাওয়া তিনটি শিশু সন্তানের জন্য। আর তার বৃদ্ধা মা ও বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়ির জন্য। যাদের অবশিষ্ট পৃথিবীর জীবনে কান্না আর চোখের পানি ফেলা ছাড়া আর কিছুই রইল না।

লিপি মণির অসুস্থতার খবর প্রথম পেলাম বিগত রমযানে। দূরারোগ্য ক্যান্সার ঘর বেঁধেছিল তার দেহে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। রোগী নিজেও একজন বড় চিকিৎসক এবং তার স্বামী ডা. নাজমুল আলমও। তারা দুজনেই সরাসরি চিকিৎসা সেবা ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের অধ্যাপনার সাথে জড়িত। তাছাড়া বর্তমানে ক্যান্সারকে অত বড় মাপের ব্যাধি হিসেবে গণ্যও করে না মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। লক্ষ কোটি মানুষ এ রোগের নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছে সেখানে এবং প্রতিদিনের প্রাত্যহিক কাজকর্মও হাসিমুখে চালিয়ে যাচ্ছে সাথে সাথে। ।

চিকিৎসা বিজ্ঞানে উচ্চতর ডিগ্রিধারী হয়েও প্রথম থেকেই সবকিছু ছেড়ে বাইরে কর্মক্ষেত্রে ব্যাকুলভাবে জড়িয়ে পড়েনি ডা. ফারজানা। সেটা ছিল তার দ্বিতীয় কর্মক্ষেত্র। তার কাছে পরিবারই ছিল প্রথম, এরপর সবকিছু। শ্রান্ত-ক্লান্ত অর্ধ বিধ্বস্ত জড়াজীর্ণ এই সমাজের অবস্থা দেখে  বোধ হয় খুশি হতে না পেরে গড়ে তুলতে চেয়েছিল একটি শান্তির নীড়। যেখানে কেবল দুঃখ-বিড়ম্বনাবর্জিত সুখ আর প্রশান্তি। সব কিছুকেই সে দেখত একেবারে নিজের মতো করে। তার কাছে অতি অর্থই ছিল সকল অনর্থের মূল। আকাশচুম্বী সুখস্বপ্নে বিভোর ছিল না কখনো। আবেগের চেয়ে যুক্তিকেই প্রাধান্য দিত বেশি। তাই সে লৌহবর্মের মতো আকড়ে ধরেছিল তিনটি শিশু সন্তানকে ও তার নিজের সংসারটিকে।

পৃথিবীর সংসারগুলোকে সাধারণত তুলনা করা হয় বেহেশত অথবা দোযখের সাথে। সংসারবাসীরা নিজেদের সংসারগুলোকে ন্যায়নীতি ও নিয়মানুবর্তিতার সুরক্ষা দ্বারা একটি সোনার সংসার রচনা করতে পারে। আবার মিথ্যা, লোভ-লালসা ও হিংসা-বিদ্বেষের প্রতিযোগিতা দ্বারা একটি ক্ষুদ্র দোযখরাজ্যও রচনা করতে পারে। বৌমা তার ছোট্ট সংসারটিকে একটি স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছিল। কিন্তু নিয়তির অমোঘ নিয়মে অতি অল্প সময়েই এসে গেল বিদায়ের ডাক।

আমাদের মতো নির্বোধ সংসারীরা ঘুণাক্ষরেও চিন্তা করি না যে, আমরাও একদিন একই নিয়মে চলে যাব এক পৃথিবী থেকে অন্য এক পৃথিবীতে। পেছনে ফেলে রেখে যাব জীবনের সবকিছু। অলৌকিক না হলেও এটাই জীবনের সবচেয়ে বড় অলৌকিক সত্য। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে এ বিশ্বের সকল দেশের সকল মানুষের বেলায় এই একই কথা প্রযোজ্য। পরম করুণাময় আল্লাহ তো বলেছেন তাঁর পবিত্র কালামে-

هُوَ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ تُرَابٍ ثُمَّ مِنْ نُطْفَةٍ ثُمَّ مِنْ عَلَقَةٍ ثُمَّ يُخْرِجُكُمْ طِفْلًا ثُمَّ لِتَبْلُغُوا أَشُدَّكُمْ ثُمَّ لِتَكُونُوا شُيُوخًا وَمِنْكُمْ مَنْ يُتَوَفَّى مِنْ قَبْلُ وَلِتَبْلُغُوا أَجَلًا مُسَمًّى وَلَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ * هُوَ الَّذِي يُحْيِي وَيُمِيتُ فَإِذَا قَضَى أَمْرًا فَإِنَّمَا يَقُولُ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ

 (তরজমা) তিনিই তো তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন মাটি দ্বারা, পরে শুক্রবিন্দু দ্বারা জমাট রক্ত দ্বারা, তারপর তোমাদের বের করেন শিশুরূপে অতপর তোমরা যৌবনে পদার্পণে কর, অতপর বার্ধক্যে উপনীত হও। তোমাদের কারো কারো এর পূর্বেই মৃত্যু ঘটে যাতে তোমরা নির্ধারিত সময়ে পৌঁছ এবং তোমরা যাতে অনুধাবন কর। তিনিই জীবিত করেন এবং মৃত্যু দেন।-সূরা মুমিন : ৬৭-৬৮

ফারজানার জীবন ছিল ছোট্ট মেয়াদের। পরম করুণাময় এই ছোট্ট মেয়াদ দিয়েই লিপি মণিকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন আমাদের সান্নিধ্যে। সময় ফুরালে যথা সময়ে ডেকে নিয়ে গেছেন তাঁর কাছে। তাঁরই আদেশে আমাদের আগমন। আবার তাঁরই নির্দেশে তাঁরই নিকট আমাদের প্রত্যাগমন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

ফারজানার রোগ অজান্তেই বিস্তার লাভ করতে থাকে স্টমাকে। কখনও কোনো কারণে পেটে ব্যাথা হলে ব্যাথার ঔষধ বা গ্যাসের ঔষধ সেবন করত। নিজেরাই বড় ডাক্তার। সুতরাং বড় করে চিন্তা করার অবকাশ কোথায়। এমনি করে এল ২০১১ সালের পবিত্র রমযানুল মুবারক। চিরাচরিত নিয়মানুযায়ী বাড়ির ছোট বড় সকলে মিলে শুরু হল সিয়াম পালন। মাঝামাঝি রমযানে এসে রোগ গেল বেড়ে। ফারজানার স্বামী ডাক্তার নাজমুল আলম বার বার তাগাদা দিল রোযা ছাড়তে আর ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে। ডা. ফারজানা রোযা ছাড়তে বা ডাক্তারের কাছে যেতে রাজি হয় না। বার বার তাগাদা দিয়ে অবশেষে রাজি করানো হল। রোযায় বিরতি দিয়ে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হল। কিন্তু মেঘনায় তখন অনেক পানি গড়িয়ে গেছে। রোগ ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে স্টমাকে। ঘাতক ব্যাধি আশপাশের অন্যান্য অঙ্গও স্পর্শ করেছে তখন। প্রায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

রোগ এবং আরোগ্য দুটোই আসে আল্লাহরই তরফ থেকে। এর ভিতরের নিগূঢ় রহস্য আমাদের জানা নেই। পরম করুণাময়ের ভেদ আমরা বুঝব কেমন করে। পৃথিবীতে আমাদের আগমন ও নির্গমনের চিরাচরিত ব্যাখ্যার বাইরে আমাদের তো একটি অক্ষরও জানা নেই।

সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে পরম করুণাময় আল্লাহ মানুষকে কিছু জ্ঞান ও হিকমত দিয়েছেন, যার বদৌলতে মানুষ এগিয়ে যাচ্ছে সম্মুখে, বৈজ্ঞানিক সাফল্যের দিকে প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে। তবুও পরম করুণাময়ের সীমাহীন জ্ঞানের তুলনায় তা অতি সামান্য। সমুদ্রে শিশির বিন্দুতুল্য।

কয়েকজন ক্যান্সার বিশেষজ্ঞের গঠিত বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বৌমাকে দেওয়া হল কেমোথেরাপি। যথারীতি এক মাসের কম সময়ের চিকিৎসার ফলাফল আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা দিলেন আশানুরূপ সাফল্য। রোগযন্ত্রণা কমে গেল। সার্বিকভাবে রোগের উপশমও হল।

যখন তার বাড়ি ফেরার পালা তখন দেখা গেল ভিন্ন রোগ। চরম বিপর্যয়কর ইনফেকশন, যার জন্য কেউ প্রস্ত্তত ছিল না। রোগী ব্যাথায় অস্থির। ডাক্তারদের আনাগোনা গেল বেড়ে। বড় বড় ডাক্তারদের বোর্ড, সভা, মিটিং, সিদ্ধান্ত, ঔষধ। মামণি তখন মহাযাত্রার প্রস্ত্ততি নিচ্ছে। তার স্বামী পাশে বসে কাঁদছে আর সকল মমতা ও ভালবাসা দিয়ে আঁকড়ে ধরে রেখে কালিমা পাঠ করছে। স্বামীর সাথে সাথে স্ত্রীও পাঠ করে চলেছে সুস্পষ্ট কণ্ঠে পবিত্র কালিমা ও পবিত্র দরূদ শরীফ। ইতিমধ্যে আমার ভাই বোন, আত্মীয়-স্বজন সবাই খবর পেয়ে সব কাজকর্ম ফেলে হাজির হয়ে গেছে হাসপাতালে। এক রোগীর জন্য এত আত্মীয়-স্বজনের হাসপাতালে উপস্থিতি সে দেশে একেবারেই অবিশ্বাস্য ঘটনা।

আমেরিকা মূলত ধর্মকর্ম বিবর্জিত ইহুদি-নাসারাদের একটি দেশ। যে যার ধর্ম নিজেদের মতন করে চাইলে পালন করতে পারে। এটাই ঐ দেশের বৈশিষ্ট্য ও বিধান। এখানে তারা অবলোকন করল এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। একটা ভিন্ন ধর্মের কয়েক ডজন নারী-পুরুষ এত অল্প সময়ে কেমন করে উপস্থিত হল এক মুমূর্ষু রোগীর পাশে তা সেদেশে এক অভাবনীয় দৃশ্য। সকলেরই চোখ অশ্রুসিক্ত। সবাই দোয়া করছে যার যার মতো করে পরম করুণাময়ের দরবারে। কালিমা, সূরা ইয়াসীন ও দুরূদ পাঠ করছে অপূর্ব ধ্যানমগ্নতায়। এ এক অপরূপ দৃশ্য, যা কখনো এদেশ, এ জাতি, এ সমাজ তাদের জীবনে দেখেনি। কল্পনাও করেনি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তখন এক বড় খালি কক্ষে রুগীকে ও তার জন্য আগত লোকজনকে স্থানান্তর করে দিল। এতে খুব উপকার হয়। মুমূর্ষ ফারজানা অনেক অনেক কথা বলে যায় তার স্বামী ডা. নাজমুল আলমকে। সে জানায়, দীর্ঘ দিন আগে প্রয়াত তার দাদী এসেছে তাকে নিয়ে যেতে। তার পিতা দশ বছর পূর্বে মৃত্যুবরণ করেছেন ঢাকায়। তিনিও এসেছেন একই উদ্দেশ্যে। মৃত্যুপথ যাত্রী তার মায়ের কথা উল্লেখ করেন, যিনি ঢাকার বনানীতে নিজ বাসগৃহে অসুস্থ অবস্থায় জীবন যাপন করছেন। মুমূর্ষু রুগী পূর্ণ সচেতনতায় কথা বলে চলে।

মায়ের কথা উল্লেখ করায় তাকে জিজ্ঞাসা করা হয় তুমি কি তোমার মায়ের সাথে কথা বলতে চাও? সম্মতিসূচক মাথা নাড়লে তাৎক্ষণিকভাবে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হয় বিশ হাজার মাইল দূরে অবস্থানরত মায়ের সাথে। টেলিফোনে তার আম্মা লিপি বলে সম্বোধন করলে সে কেবল চিৎকার করে বলে, আম্মা! তারপর তার কণ্ঠ থেমে যায়। কেবল ঠোঁট দুটো নড়তে থাকে। তারপর তাও ধীরে ধীরে থেমে যায়। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

 

পুনশ্চ : সেদিন ছিল শুক্রবার। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, কোনো মুসলিম শুক্রবার দিনের বেলা কিংবা রাতে মৃত্যুবরণ করলে আল্লাহ তাআলা তাকে কবরের ফেতনা থেকে মুক্তি দান করেন।

তাই আশা করছি, আল্লাহ তাকে কবরের আযাব থেকে মুক্তি দান করবেন। আমীন। 

 

 

advertisement