জুমাদাল উখরা-১৪৩২   ||   মে-২০১১

তালিবুল ইলম ভাইদের খিদমতে দুটি কথা : নাশাত ও মুহাসাবার যিন্দেগী চাই

মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক

 

[গত ১৮ মার্চ ২০১১ জুমাবার মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়ার কেরাণীগঞ্জ, হযরতপুর প্রাঙ্গনে আবনাউল মারকায ফাউন্ডেশনের মজলিস অনুষ্ঠিত হয়। উপস্থিত ফারেগীনদের উদ্দেশে মজলিসে মারকাযের আমীনুত তালীম ছাহেবের প্রদত্ত বয়ান এবং তৎপরবর্তী জুমার খুতবার সার-সংক্ষেপ মুছাজজিল থেকে লিখে আলকাউসারের শিক্ষার্থী পাঠকদের খেদমতে পেশ করা হল। আশা করি, তারাও এর দ্বারা উপকৃত হবেন ইনশাআল্লাহ।]

আল্লাহ রাববুল আলামীনের শোকর, আল্লাহ তাআলা অনেক দিন পর আবার একসাথে বসার, একে অপরের সাথে সাক্ষাত করার এবং পরস্পর কিছু মুযাকারা করার তাওফীক নসীব করেছেন। এক সাথে অনেককে দেখে, যাদের মাঝে মাঝে দেখি আবার যাদেরকে কালেভদ্রে দেখি সবাইকে আজ এক সাথে দেখে ভালো লাগছে। এই ধরনের মুআসসাসা বা মজমার এটাও একটা ফায়েদার দিক। অর্থাৎ পুরনো ইয়াদ তাজা করা। একটা ফার্সী শের আছে- 

 

 

 

আর কিছু না হোক, অন্তত কিসসায়ে পারিনা তাজা করার ফায়েদাও যদি হয় তাও কম কি? 

আল্লাহ তাআলা তার মুমিন বান্দাদেরকে অনেক নেয়ামত দান করেছেন। তিনি নিজেই বলেছেন,  (তরজমা) তোমরা যদি আল্লাহর নেয়ামতসমূহ গণনা আরম্ভ কর তবে তা গুনে শেষ করতে পারবে না।-সূরা ইবরাহীম :  ৩৪; সূরা নাহল : ১৮ 

আমাদের উপর আল্লাহর নেয়ামত ও দান অনেক। জাহের-বাতেনসহ জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে আমাদেরকে আল্লাহ তাঁর জাহেরী-বাতেনী নেয়ামত দ্বারা মালামাল করেছেন।  

কিছু কিছু সৌভাগ্যবান মানুষ এমনও রয়েছেন, যাদেরকে আল্লাহ বিশেষ কিছু অনুগ্রহ ও নেয়ামত দান করেন। যার উপর আল্লাহর অনুগ্রহ যত বেশি, তার শুকরিয়ার পরিমাণও বেশি হওয়া দরকার।

আল্লাহ তাআলা বলেন (তরজমা) যদি তোমরা শোকর কর তবে তোমাদেরকে অধিক নেয়ামত প্রদান করব। আর যদি অকৃতজ্ঞ হও তবে আমার আযাব কত কঠিন।-সূরা ইবরাহীম : ৭

আল্লাহ বলেননি যে, যদি না-শোকরি কর তাহলে নেয়ামত আর বাড়াব না। অতএব নেয়ামতের না-শোকরি শুধু বেড়ে যাওয়া থেকেই বঞ্চিত করে না; বরং আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও কঠিন শাস্তি ডেকে আনে। এই আযাব দুনিয়া ও আখিরাতে উভয় জগতে হবে। দুনিয়ার আযাব হল নেয়ামত থেকে বঞ্চিত হওয়া। মূল নেয়ামতই ছিনিয়ে নেবেন অথবা নেয়ামতের বরকত থেকে বঞ্চিত করবেন। দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনাও আযাবের একটি প্রকার। আর আখিরাতের আযাব তো বড় ভয়াবহ ও যন্ত্রণাদায়ক। অতএব সাবধান। আল্লাহর নেয়ামত অনেক। তাই শোকরিয়া আদায়ে খুবই সচেতনতা দরকার। কারণ খোদ নেয়ামতদাতাই বলছেন : (তরজমা) আমার বান্দাদের মধ্যে শোকরগোযার লোক কমই হয়ে থাকে।-সূরা সাবা : ১৩

আমাদের ওপর আল্লাহ তাআলার জাহেরী নেয়ামতগুলোর মধ্যে রয়েছে মারকাযের প্রশস্ত ও বা-বরকত জমি, একটি মুবারক মসজিদ ও একটি প্রশস্ত ঘর। এর সকল কিছুই আল্লাহর নেয়ামত।

প্রত্যেক নেয়ামতের শোকরগোযারি করতে হয়। নেয়ামতের শোকরিয়া কিভাবে আদায় করা হবে? শোকরের কমপক্ষে তিনটি স্তর বলা যায়।

এক. শোকরে কলবী। অর্থাৎ দিলে এই মজবুত বিশ্বাস ও আকীদা রাখা যে, এই সকল নেয়ামত শুধু এবং শুধু আল্লাহর দান। এখনো এই নেয়ামতগুলো তারই কবজায়। আমাদেরকে তিনি এর পূর্ণ মালিক বানিয়ে দেননি আর না এতে আমদের পূর্ণ ক্ষমতা কার্যকর রয়েছে। সবকিছু তাঁরই হাতে। তিনি যখন ইচ্ছা এসব কিছুই ছিনিয়ে নিতে পারেন। তাই এই নেয়ামত ব্যবহারের ব্যাপারে খুবই সতর্কতা দরকার।

দুই. শোকরে লিসানী। অর্থাৎ যখনই নেয়ামতের স্মরণ হবে তখনি মুখে আল্লাহর শোকর করা, বেশি বেশি আলহামদুলিল্লাহ বলা। বিশেষভাবে সকালে এই দুআকে আমরা অযীফা বানিয়ে নিই-

اللّهُم مَا أَصْبَحَ بِيْ مِنْ نِعْمَةٍ أَوْ بِأَحَدٍ مِنْ خَلْقِكَ، فَمِنْكَ وَحْدَكَ، لاَ شَرِيْكَ لَكَ، فَلَكَ الْحَمْدُ وَلَكَ الشُّكْرُ مَا أَصْبَحَ بِيْ مِنْ نِعْمَةٍ أَوْ بِأَحَدٍ مِنْ خَلْقِكَ، فَمِنْكَ وَحْدَكَ، لاَ شَرِيْكَ لَكَ، فَلَكَ الْحَمْدُ وَلَكَ الشُّكْرُ

আর সন্ধ্যায় এই দুআ করি-

اللّهُم مَا أَصْبَحَ بِيْ مِنْ نِعْمَةٍ أَوْ بِأَحَدٍ مِنْ خَلْقِكَ، فَمِنْكَ وَحْدَكَ، لاَ شَرِيْكَ لَكَ، فَلَكَ الْحَمْدُ وَلَكَ الشُّكْرُ مَا أَمْسَى بِيْ مِنْ نِعْمَةٍ أَوْ بِأَحَدٍ مِنْ خَلْقِكَ، فَمِنْكَ وَحْدَكَ، لاَ شَرِيْكَ لَكَ، فَلَكَ الْحَمْدُ وَلَكَ الشُّكْرُ

তিন. শোকরে আমলী। নেয়ামতের আমলী শোকরের বড় একটি দিক হল, যে নেয়ামত যে জন্য সে নেয়ামতকে সেই নির্দিষ্ট কাজে যথাযথভাবে ব্যবহার করা।

উপরে মারকাযের যেসব জাহেরী নেয়ামতের কথা বললাম, এ ছাড়াও রয়েছে মূল্যবান কিতাবের সংগ্রহশালা, আহলে ইলম ও ফিকহ এবং আহলে যিকর আসাতিযার উপস্থিতি। এই সকল নেয়ামতের আমলী শোকরিয়া হল, এই নেয়ামতকে যথাযথভাবে নিজেদের জীবনে কাজে লাগানো।

আল্লাহ এই সব নেয়ামতের কলবী, যবানী এবং বিশেষভাবে আমলী শোকর আদায় করার তাওফীক আমাদের দান করুন। আমীন।

আমাকে বলা হয়েছে যে, আলোচনার জন্য নির্দিষ্ট কোনো বিষয় নির্ধারিত নেই। তাই আমি ভাবলাম, আমার নিজের জন্য এবং আমার সব সাথীর জন্য দুটি কথা আরয করছি। মানুষ নিজের অবস্থা অনুযায়ী অন্যের প্রতি ধারণা করে-বলে একটি কথা আছে। সে হিসেবে বলছি। যিন্দেগীতে তারাক্কীর ক্ষেত্রে এবং ঈমান-আমল-আখলাক ও চিন্তা-চেতনার তারাক্কীর ক্ষেত্রে বাধা তো অনেক। তন্মধ্যে দুটি বাধার কথা আমার যেহেনে বেশি আসে এবং আমার দেমাগকে তা আচ্ছন্ন করে রাখে। হয়ত তার কারণ এই যে, আমার মধ্যে এই দুটি দুর্বলতা বেশি রয়েছে।

একটি বাধা যা আমি প্রায় বলেও থাকি। পূর্বে পল্লবীতে অনুষ্ঠিত আবনাউল মারকাযের মজলিসেও বলেছিলাম। তা হল السطحية I التشمية যা  الجديةএর বিপরীত।

মানুষের যিন্দেগী জিদ্দ হওয়া উচিত অর্থাৎ সুচিন্তিত ও উদ্যমপূর্ণ হওয়া উচিত। অবহেলার যিন্দেগী, গাফলতের যিন্দেগী, মুর্দা যিন্দেগী আর লাগামহীন যিন্দেগী-এটা তালিবে ইলমের যিন্দেগী হতে পারে না; বরং তালিবে ইলমের যিন্দেগী হবে সুচিন্তিত ও নশীত। নাশাতের যিন্দেগীর বিপরীত হল হাযলের যিন্দেগী।

ثلاثة جدهن جد وهزلهن جد

ছালাছাতুন এর মধ্যে এটা নেই। আমার হায়াতকে আমি হাযলের বানাব আর তা খোদ-বখোদ জিদ্দ হয়ে যাবে? আমার হায়াত যদি জিদ্দ হয় তাহলে তা জিদ্দ হবে। আর যদি একেবারে হাযলের হায়াত বানাই তাহলে তা জিদ্দ হবে না, হাযল হবে।

হাযলের যিন্দেগী মানে যে যিন্দেগীতে কোনো ফিকির নেই, মুহাসাবা নেই, মুরাকাবা নেই। মুহাসাবা, মুরাকাবা ও ফিকিরহীন যিন্দেগীর নাম হাযলের যিন্দেগী। আর জিদ্দিয়্যাত হল সব জিনিসকে গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করা, নিজের মুহাসাবা করতে থাকা। সবকিছুকে গুরুত্বের সাথে নেওয়া ও মুহাসাবা জারি রাখা-এরই নাম জিদ্দিয়্যাতের যিন্দেগী। আর এর বিপরীত হল হাযলের যিন্দেগী।

আর এই হাযলের আছর হল, গতানুগতিকতা। তাই যার যিন্দেগীতে জিদ্দিয়্যাত আছে সে কখনো গতানুগতিকতা বরদাশত করতে পারে না। কারণ সেটাতো হাযলের ফলাফল।

জিদ্দিয়্যতের আছর হবে, মুহাসাবা-মুরাকাবা-নাশাত-আযীমত-হিম্মত ও মুনাফাসাত ফিল খায়র। এগুলো জিদ্দিয়্যতের ফলাফল।

এই প্রসঙ্গে শায়খুল হাদীস সাহেব দামাত বারাকাতুহুম-এর একটি কিসসার কথা মনে পড়ে।

দুটি গরুর বাছুর। একটি গেরস্থের গরুর বাছুর আরেকটি গোয়ালের গরুর বাছুর। গেরস্থের গরুর বাছুর খুব খেতে পায়, গেরস্থও বাছুরকে কদর করে এবং বেশি বেশি গাভীর দুধ খেতে দেয়। এমনিতেই গরুর তরীকা হল, সে স্তনে বাছুরের জন্য কিছু দুধ সংরক্ষিত রাখে। আর গেরস্থ এসে বাছুরের কথা খেয়াল করে আরো দুধ রেখে দেয়। ফলে ঐ বাছুর খেয়ে তাজা ও নাদুস-নুদুস হয়ে থাকে। অন্যদিকে গোয়ালের গরুর উদ্দেশ্য হল ব্যবসা। তার চেষ্টা থাকে, দুধ যত বেশি বের করা যায়। এমনকি গরু তার তরীকা অনুযায়ী  বাছুরের জন্য যা সংরক্ষণ করে তাও বের করে আনার চেষ্টা করে। মাঝখানে সে আবার বাছুর লাগায়। ফুয়াকা নাকাতিন বলে একটি আরবী শব্দ আছে। এর অর্থ হল, যখন দুধ দেয় না তখন মাঝখানে আবার বাছুর এনে লাগিয়ে দেওয়া। বাছুর খাচ্ছে ভেবে মা দুধ নামিয়ে আনে, দুধ ছাড়লেই গোয়াল এসে আবার বাছুরকে ছাড়িয়ে নেয়। গারার। এই ধরনের গারার জায়েয আছে কি না সে ভিন্ন মাসআলা। কিন্তু এভাবে ছাড়িয়ে নেয় যে, এটাও এক ধরনের গারার বা প্রতারণা।

এই বাছুর আর কি খেতে পারে? এই ধরনের বাছুর হবে মরা ও ম্যারা।

এখন গেরস্থের বাছুর আর গোয়ালের বাছুরের মধ্যকার যদি প্রতিযোগিতার প্রশ্ন আসে তাহলে গেরস্থের বাছুর বলবে কি, চলো দেখি কে কত দৌড়াতে পারি-এর প্রতিযোগিতা করি। আর গোয়ালের বাছুর বলবে, না; বরং দেখি কে কতক্ষণ শুয়ে শুয়ে লেজ দিয়ে কান চুলকাতে পারি-এই প্রতিযোগিতা করি।

এই হল পার্থক্য। একটা হাযল, আরেকটা জিদ্দ। আমাদের হালত এর চাইতে খুব একটা ভালো না। কারণ আমাদের যিন্দেগীতে জিদ্দিয়্যত একেবারে কম। বিলকুল নাই বলি না। তবে যা আছে হাযলের পরিমাণে খুবই স্বল্প। সেই কারণেই নাশাত এবং আযীমত ও হিম্মতের মুরাকাবা নেই, মুহাসাবা নেই।

তাই আমার দরখাস্ত হল, আমরা এই মারায বা ব্যাধিটি দূর করার চেষ্টা করি। হাযলের মারায দূর করি এবং হায়াতকে নাশাত ও জিদ্দিয়্যতের হায়াত বানাই। গাফলত ও উদাসীনতা পরিহার করি। খোদ রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও গাফলত ও অলসতা থেকে পানাহ চেয়েছেন। তিনি উম্মতকে এই শিক্ষা দিয়েছেন, তারা যেন সকাল-সন্ধ্যায় এই দুআ করে-

اللّهُمَّ إِنّيْ أَعُوْذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحُزْنِ، وَ أَعُوْذُ بِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَأَعُوْذُ بِكَ مِنَ الْجُبْنِ وَالْبُخْلِ، وَأَعُوْذُ بِكَ مِنْ غَلَبَةِ الدَّيْنِ وَقَهْرِ الرِّجَالِ.

 

গাফলত ও অলসতা খুব বড় মারায, যা বান্দাকে তার মাওলার দিকে এবং তাঁর রেযামন্দির দিকে অগ্রসর হওয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। তার রহমত ও মাগফিরাত থেকে বঞ্চিত করে।

চলুন, জীবনের সকল অঙ্গনে গাফলত ও অলসতা থেকে বেঁচে থাকি, হায়াতকে আযীমত-হিম্মত ও নাশাতের হায়াতে পরিণত করি। কবির এই কবিতা-পংক্তির প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠি-

كن رجلا رجله في الثرى + وهامة همته في الثريا

যদি আমরা তা করতে পারি এবং পরীশীলিত ভাষা, পরিশুদ্ধ চিন্তায় অভ্যস্ত হই, উন্নত চিন্তা করি, গতানুগতিক চিন্তাধারা পরিহার করতে পারি তাহলেই আমরা ঐ সব নেয়ামতের কিছু শোকরিয়া আদায় করলাম, যা আল্লাহ আমাদের দান করেছেন।

আর এর জন্য মুহাসাবা খুবই জরুরি। আমাদের সালাফ তো বলতেন-

من استوى يوماه فهو مغبون

আমরা কমপক্ষে এতটুকু তো চেষ্টা করতে পারি, আমাদের দু সপ্তাহ যেন এক বরাবর না হয়। বিগত সপ্তাহ থেকে আমার কোনো না কোনো তারাক্কী যেন হয়। মুহাসাবা-মুরাকাবার মাধ্যমে আমরা তা করতে পারি।

এই মুহাসাবাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রত্যেকের জন্য বিশেষত যাদেরকে আল্লাহ ইলমের সম্পদ দান করেছেন তাদের জন্য মুহাসাবা করা অবশ্যই জরুরি। সালাফ আমাদের বলেছেন-

حاسبوا أنفسكم قبل أن تحاسبوا، وزنوا أعمالكم قبل أن توزنوا

তোমাদের হিসাব নেওয়ার পূর্বে তোমরা নিজেরাই নিজেদের মুহাসাবা কর, তোমাদের আমল ওযন করার পূর্বে নিজেরাই ওযন করে নাও।

ইলম, আমল ও আখলাকসহ দুনিয়া-আখিরাতের যে কোনো বিষয়ে অগ্রগতির জন্য মুহাসাবা জরুরি। যে নিজেকে লাগামহীন ছেড়ে দিল তার কোনো উন্নতি নেই। উন্নতি ও অগ্রগতির চাবিকাঠি হল মুহাসাবা ও মুরাকাবা। নফসের মুহাসাবা ও আল্লাহ তাআলার মুরাকাবা।

অতএব নিজেরাই নিজেদের মুহাসাবা করি, নিজেদের দোষ-ত্রুটি ও বিচ্যুতিগুলোর দিকে তাকাই। কারো গীবত না করি। অন্যের দোষ-ত্রুটির দিকে না তাকাই। এই খাসলত আল্লাহ পছন্দ করেন না।

এই অভ্যাস আল্লাহকে খুবই নারায করে যে, নিজের ব্যাপারে গাফেল আর পরের ব্যাপারে সচেতন। নিজের ইসলাহ নিয়ে বেখবর আর অন্যকে নিয়ে ফিকিরমন্দ, অন্যকে নিয়ে মাতামাতি।

আল্লাহ আমাদেরকে তার নেয়ামত নিয়ে ফিকির করার এবং নিজেকে নিয়ে ফিকির করার জন্যই সৃষ্টি করেছেন। এক্ষেত্রে দাওয়াত, তালীম, তরবিয়ত ও ইসলাহে নফসের যে বিষয়, তাতো একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই এবং মুসলিহ মাশায়েখদের নির্দেশনার আলোকেই করা যাবে। এসব কিছু এই জন্য নয় যে, এর দ্বারা মানুষের মুহাসাবা করা হবে, তাদেরকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হবে; বরং এর পূর্বে নিজেদের নফসের এই এতটুকু ইসলাহ করতে হবে যেন আমরা ইসলাহ ও তাচ্ছিল্যের মধ্যে পার্থক্য অনুভব করতে পারি। সংশোধন ও সম্মান হরণের মাঝে পার্থক্য বুঝতে পারি।

অতএব আমাদের উচিত নিজেদের মুহাসাবা করা, নিজের নফসের তাযকিয়া ও কলবের ইসলাহের ফিকির করা। ইসলামী আদাব নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করা। সালাফের আখলাকে নিজেদের সজ্জিত করা এবং সর্বোপরি নিজেদের জাহের-বাতেনকে আল্লাহর রঙে রঙ্গীন করা, যা ছিল সালাফে সালেহীনের রঙ।

صِبْغَةَ اللهِ، وَمَنْ اَحْسَنُ مِنَ اللهِ صِبْغَةً

আমরা আল্লাহর রঙে রঙ্গিন হব। আর এমন কে আছে, যার রঙ আল্লাহ অপেক্ষা অধিক রঙ্গিন হবে।-সূরা বাকারা : ১৩৮

যদি আমরা নিজেদের নিয়ে ফিকির করি, তাহলে এটিই আমাদেরকে অনেক অহেতুক কাজকর্ম থেকে বিরত রাখবে। আমাদের ইসলাম হবে মুহাসাবাপূর্ণ ইসলাম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

مِنْ حُسْنِ إِسْلاَمِ الْمَرْءِ تَرْكُهُ مَا لاَ يَعْنِيْهِ

আলাহ তাআলাও বলেন,

قَدْ اَفْلَحَ الْمُؤْمِنُوْنَ الَّذِيْنَ هُمْ فِىْ صَلَاتِهِمْ خشِعُوْنَ، وَالَّذِيْنَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُوْنَ

নিশ্চয় ঐ মুসলমানগণ সফলতা লাভ করবে, যারা নিজেদের নামাযের মধ্যে বিনয়ী, যারা অনর্থক কথা ও কাজ হতে দূরে থাকে।-সূরা মুমিনুন : ১-৩

মুহাসাবা ও নিজেদের নিয়ে ফিকিরে থাকা ব্যাতীরেকে সব ধরনের অনর্থক ও অহেতুক কাজকর্ম থেকে বিরত থাকা সম্ভব নয়। তা না করে যদি আমরা অন্যকে নিয়ে ব্যস্ত থাকি, তাহলে আমরা নিজেদের নিয়ে বে খবর হয়ে যাব। আর এটাতো সুস্পষ্ট ক্ষতি। এতো গেল একটি কথা। অর্থাৎ যিন্দেগীকে হাযল মুক্ত যিন্দেগী বানানো।

(চলবে ইনশাআল্লাহ)

 

 

advertisement