রবিউল আখির-জুমাদাল উলা ১৪৪৮   ||   অক্টোবর ২০২৬

ফাওয়ায়েদ সংরক্ষণ
গুরুত্ব, উপকারিতা ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

মাওলানা মুহাম্মাদ মুসআব

[দারুল উলূম দেওবন্দের দারুল ইফতার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য মাওলানা মুহাম্মাদ মুসআব দা. বা. তালিবুল ইলমদের জন্য একটি বায়ায বা নোটবুক প্রকাশ করেন। যাতে তালিবুল ইলমগণ মুতালাআর সময় সামনে আসা ফাওয়ায়েদ, দরসের গুরুত্বপূর্ণ নোট, উস্তাযগণের মূল্যবান উপদেশ ইত্যাদি তাতে লিপিবদ্ধ করতে পারে।

এটি প্রকাশের সময় তিনি তালিবুল ইলমদের ‘বায়ায নবীসী’র প্রতি উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে সেক্ষেত্রে সালাফের কর্মপন্থা, একেন্দ্রিক তাঁদের মূল্যবান উপদেশ ও উৎসাহব্যঞ্জক ঘটনা নিয়ে একটি মূল্যবান রিসালা প্রস্তুত করেন।

তালিবুল ইলমদের ফায়েদার কথা বিবেচনা করে উক্ত রিসালাটির অনুবাদ পেশ করা হল। অনুবাদ করেছেন— মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহমান।]

 

‘বায়ায নবীসী’ বা কাগজে ফাওয়ায়েদ নোট করা উম্মতের আসলাফ এবং আমাদের আকাবিরের নিত্যদিনের অভ্যাস ছিল। এটি মুতালাআকে সফল ও ফলপ্রসূ করার একটি কার্যকর মাধ্যম। যখন কোনো তালিবে ইলম এতে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন তার মধ্যে জীবনভর একজন সত্যিকার তালিবে ইলম হয়ে থাকার এবং শিখতে থাকার জযবা অব্যাহত থাকে। আর তালিবে ইলম হওয়ার অনুভূতিই আহলে ইলমদের জন্য সবচেয়ে বড় সম্মান।

এই রিসালায় ‘বায়ায নবীসী’-এর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা, সালাফের নির্বাচিত কিছু বায়াযের উল্লেখ, তাদের মূল্যবান নির্দেশনাবলি, বায়ায নবীসীর ব্যবহারিক পদ্ধতি ও কিছু জটিলতার সমাধান এবং মুতালাআ সংশ্লিষ্ট কিছু উপকারী বিষয় সংক্ষেপে পেশ করা হল। —মাওলানা মুহাম্মাদ মুসআব

 

بسم الله الرحمن الرحيم

الحمد لله الذي بنعمته تتمُّ الصالحات، والصلاة والسلامُ على سيِّدِ المرسلين وإمامِ المتقينَ وخاتَم النبيينَ، محمد عبده ورسولِه، إمامِ الخير وقائد الخير ورسول الرحمة، اللهمَّ ابعثْه مقاماً محموداً يغبِطه به الأولونَ والآخرون.

আল্লাহ তাআলার ফযল ও করম এবং তাঁর বিশেষ তাওফীকে মুশফিক উস্তায হযরত আকদাস মাওলানা নূর আলম খলীল আমীনী রাহ.-এর সোহবত ও খেদমতের সৌভাগ্য বান্দার হাসিল হয়েছে। যদিও নিজের অলসতা ও উদাসীনতার কারণে যথাযথ ফায়েদা হাসিল করতে পারিনি এবং খেদমতের হকও আদায় করতে পারিনি। তবুও হযরতের স্নেহ-মমতা, নেক নযর, দুআ এবং ইসলাহী বাণীসমূহ সর্বদা আমার মূল্যবান সম্পদ, যেগুলোকে আমি আমার জীবনের অমূল্য পাথেয় মনে করি।

হযরাতুল উস্তায ছিলেন একজন মুখলিস মুরব্বী এবং অনন্য রাহনুমা। হযরতের উপদেশ ও নির্দেশনাবলি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বায়ায (নোটবুক)-এ সংরক্ষণ করা আমার অভ্যাস ছিল। হযরত যেসব বিষয়ের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করতেন, সেগুলোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই ছিল যে, উস্তাযের কথা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে এবং যত দ্রুত সম্ভব তা লিখে নিতে হবে। ‘আততাখাসসুস ফিল আদাব’-এর শুরুতে হযরত প্রথম যে লিখিত অনুশীলনটি করিয়েছিলেন, তা ছিল—

التقيُّد بأوامر الأستاذ أول سُلَّم لإحراز النَّجاح.

অর্থাৎ উস্তাযের নির্দেশ মেনে চলাই সফলতার প্রথম সিঁড়ি।

এই বাক্যটি ছিল তাঁর তরবিয়তী চিন্তাধারার নির্যাস। এজন্য তিনি সর্বদা কলম আর একটি ছোট ডায়েরি সঙ্গে রাখার তাগিদ দিতেন এবং রোযনামচা লেখার ওপরও জোর দিতেন।

তিনি মাঝে মাঝেই রোযনামচা দেখতেন এবং সম্পাদনা করে দিতেন। এই সময় তিনি সুন্দর লেখার প্রতিও বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করতেন। তিনি খত্তে নসখ, খত্তে রুকআ এবং উর্দূর সুন্দর হস্তলিপির চর্চা খুব গুরুত্বের সাথে করাতেন। আল্লাহ তাআলা হযরাতুল উস্তাযের মর্যাদা উঁচু করুন এবং তার ফয়েয ও বরকত জারি রাখুন— আমীন।

মুতালাআ এবং কিতাবাদি দেখার সময় সামনে আসা বিভিন্ন ইলমী ফায়েদা, উস্তাযগণের মূল্যবান উপদেশ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিকথা সংরক্ষণ করার উদ্দেশ্যে প্রিয় তালিবে ইলম ভাইদের জন্য একটি বিশেষ ‘বায়ায’ প্রকাশ করা হয়, সেটার প্রতি উৎসাহ ও আগ্রহ সৃষ্টির জন্য এই রিসালাটি লেখা হয়। এসব নিঃসন্দেহে হযরাতুল উস্তাযের তারবিয়াতেরই ফল।

সাধারণত দেখা যায়, তালিবে ইলম ভাইয়েরা এলোমেলো কাগজে মূল্যবান কথাগুলো নোট করে রাখেন বটে, কিন্তু সময় গড়িয়ে যাওয়ার সাথে সাথে সেই কাগজপত্র হারিয়ে যায়, আর এভাবে তালিবে ইলম নিজের অর্জিত ইলমী সম্পদ থেকে বঞ্চিত হয়।

এই বায়ায ইনশাআল্লাহ তালিবে ইলমের জন্য একটি শক্তিশালী প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে, যা তাকে বারবার মনে করিয়ে দেবে যে, উস্তাযের বরকতময় মুখ থেকে বের হওয়া প্রতিটি ইলমী ফায়েদা এবং মুতালাআর সময় সামনে আসা প্রতিটি মূল্যবান কথা যত্ন করে সাথে সাথে লিখে রাখা দরকার।

এই বায়ায প্রকাশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হল, যেন প্রিয় তলাবায়ে কেরামের মধ্যে সালাফের মতো ইলমের প্রতি সত্যিকারের কদর ও গুরুত্ববোধ তৈরি হয়, তাদের মধ্যে পড়াশোনার আগ্রহ বৃদ্ধি পায় এবং ইলম অর্জনের জন্য এমন ব্যাকুলতা ও অতৃপ্ত পিপাসা তাদের মনে জেগে ওঠে, যা তাদেরকে সময়ের অপচয় থেকে রক্ষা করে প্রতি মুহূর্তে শেখা ও ইলমের অনুসন্ধানে নিয়োজিত থাকতে উদ্বুদ্ধ করবে। যার ফলে একজন খাঁটি তালিবে ইলম হওয়ার অনুভূতি জীবনভর আমাদের অন্তর ও মস্তিষ্কে জাগ্রত থাকবে।

আর আমাদের জন্য এর চেয়ে বড় সম্মান ও গর্বের বিষয় আর কিছুই হতে পারে না।

***

নিকট অতীতের মহান ইলমী মুরব্বী ও বিশ্ববরেণ্য মুহাদ্দিস শায়েখ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রাহ. দুই দশকব্যাপী তাফসীর, হাদীস, ফিকহ, তারীখ, তারাজিম, লুগাত, নাহু, আদব, আখলাক ও তাসাওউফের মতো বিভিন্ন বিষয়ের ওপর শত শত কিতাব   গভীরভাবে মুতালাআ করেছেন। এই দীর্ঘ ইলমী সফরের সময় সামনে আসা দুর্লভ ফাওয়ায়েদ এবং আনকোরা উদ্ধৃতি তিনি অভ্যাস অনুযায়ী বায়াযে সংরক্ষণ করে রাখতেন। এর ফলে পরবর্তীতে বহু মূল্যবান গ্রন্থ অস্তিত্ব লাভ করেছে, যার মধ্যে একটি হল তার অনন্য ও বিশ্বখ্যাত বই ‘কীমাতুয যামান’।

তিনি এই কিতাবে তালিবে ইলমদের নসীহত করতে গিয়ে লেখেন—

وليكُن معك على الدوام دفتر وقلمٌ تقيِّد به سوانحَ الخاطر، وتقْتنِص به شواردَ الأفكار، وتكتبُ فيه ما تسمعه من فوائدَ ونُكَتٍ، ففي ذلك توفيرٌ للوقت الثمين، فلا يضيعُ في تذكُّر وتخمينٍ، وظنٍّ لا يُغني عن اليقين، وقديماً قيلَ: العلمُ صيدٌ والكتابةُ قيْده.

قال العلامة المربِّي برهان الدين الزَّرْنُوجِيُّ رحمه الله تعالى: وينبغي أن يكونَ طالبُ العلم مستفيدًا في كلِّ وقت، حتى يحصلَ له الفضلُ، وطريق الاستفادة أن يكونَ معه في كلِّ وقتٍ مِحْبَرة حتى يكتبَ ما يسمع من الفوائد.

قيلَ: ما حُفظ فرَّ، وما كُتب قرَّ. وقيلَ: العلمُ ما يُؤخَذ من أفواه الرجال (العلماء)، لأنهم يحفظون أحسنَ ما يسمعون، ويقولون أحسنَ ما يحفظون...، وينبغي أن يستصْحبَ دفترًا على كلِّ حال ليطالعَه، وقيلَ: من لم يكنْ له دفتر في كُمِّه لم تثبتِ الحكمة في قلبِه. وينبغي أن يكونَ في الدفترِ بياضٌ، ويستصحب المِحْبَرة ليكتبَ ما يسمع. (قيمة الزمن عند العلماء ص: ٢٠٦، الطبعة الخامسة عشر)

‘হাশিয়াতু তালীমিল মুতাআল্লিম’ গ্রন্থে শায়েখ নূর আলম খলীল আমীনী রাহ. লিখেছেন—

في هذا الفصل يوصي المؤلف الطالبَ بأنْ يظلَّ مستعداً للاستفادةِ كلَّ وقت، وأنْ يُقيِّد ويُسجِّل ما يسمعه من العلماء، لأنَّ المحفوظ في الذاكرة قد يَضيع؛ ولكنه لا يضيع ما يُكتب ويُسجَّل في الدفاتِر والأوراق، وأنْ يحفظ كل يوم شيئًا يسيرا من العلم؛ لأنه عما قريب يصبح كثيرًا، وأنْ لا يضيعَ الأوقات ويغتنم الليالي والخَلَوات، وأنْ يَغْتنم وجودَ المشايخ والعلماء، ويستفيدَ منهم قبلَ أنْ يَفقِدهم. (تعليم المتعلم ص: ١٤٣)

শায়েখ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রাহ. আরও বলেছেন—

وكان شيخنا العلامة الشيخ محمد نور سيف المكِّي رحمه الله تعالى يردد الكلمة المتوارَثة في شأن ما ينبغي أن يكونَ عليه طالب العلم في تسجيل الفوائد وصَيْد الفرائد:

لا بدَّ للطالب من كُنَّاشِ ... يكتب فيه قائماً أو ماشي

وجاء في >السير< في آخر ترجمة الحافظ حمزةَ بن محمد الكِنانيِّ، صاحب مجلس البطاقة، عن ابن مَعين قوله: إذا رأيت الرجل يخرج من منزله بلا مِحْبَرَة ولا قلم يطلب الحديث، فقد عزَمَ على الكِذْبَة. اهـ.

واعلم أنَّ لتلقي العلم والترقي فيه أصولا لا بدَّ من التزامها، ومراحل لا بدَّ من المرور بها، فبها يتأسَّس التعلم لَبِنة لبنَةً، فلا تكنْ مُنْبتًّا متعجِّلا قبلَ الأوان، فيكون نصيبُك الحرمان.

روى ابنُ عبد البرِّ في >جامع بيان العلم< عن يونسَ بن يزيد قال: قال لي ابن شهاب الزُّهْري: يا يونس، لا تُكابِد العلمَ، فإنَّ العلمَ أوديةٌ، فأيَّتُها أخذْتَ فيه قَطع بك قبلَ أنْ تبلُغَه، ولكنْ خُذْه مع الأيام والليالي، ولا تأخذ العلمَ جُملةً، فإنَّ من رامَ أخْذَه جُملةً ذهبَ عنه جُملةً، ولكن الشيءَ بعدَ الشيءِ مع الليالي والأيام.

وتقدَّم قول بهاء الدين ابنِ النَّحَّاس الحَلَبيِّ:

اليومَ شيء وغدًا مثله ... من نُخَبِ العلم التي تُلْتقَطْ

يُحَصِّل المرءُ بها حِكمةً ... وإنما السَّيلُ اجتماع النُّقَطْ

وروى ابن عبد البرِّ في >جامع بيانِ العلم< أيضاً، عن غير واحدٍ من السَّلَف، منهم الفُضَيْل بن عِياض وابن المبارك ومحمد بن النَّضْرِ الحَارثيُّ، وسفيان الثَّوْري، واللفظ له، قالَ: >كانَ يُقَال: أولُ العلمِ الاستماعُ، ثم الإنصاتُ، ثم الحفظُ، ثم العملُ، ثم النَّشْرُ<.

وقال الشيخ سلمان بن عبد الفتاح (تعليقا على قوله >يكتب فيه قائمًا أو ماشي<): هكذا كانَ شأنُ سيدي العلامة الوالد رحمه الله، يَقْتَنِصُ الفوائدَ ويقيِّد الشَّوارد مقيماً مسافرًا ماشيًا أو جالسًا، واسأَلْ إنْ شئتَ مئاتِ القُصَاصات من أوراقه وجُذاذاته. (قيمة الزمن عند العلماء ص: ٢٠٦-٢٠٨، الطبعة الخامسة عشر)

এই দীর্ঘ মূল্যবান উদ্ধৃতি থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায়—

১. একজন তালিবে ইলমের সব সময় ইলমী ফাওয়ায়েদের তালাশে থাকা উচিত। আর এর প্রায়োগিক ও ফলপ্রসূ পন্থা হল, তার কাছে সব সময় কলম ও নোটবুক থাকবে, যাতে যখনই তার মনে কোনো নুকতা আসে অথবা কোথাও কোনো ইলমী ফায়েদা শোনে অথবা মুতালাআর সময় কোনো ফায়েদা সামনে আসে, তা সাথে সাথে নোট করে নেবে।

ইলমী ফাওয়ায়েদ সময়মতো লিখে রাখার সবচেয়ে বড় ফায়েদা হল, পরবর্তীতে তা মনে করার কষ্ট এবং অনুমানভিত্তিক ধারণা থেকে বাঁচা যায়, আর মূল্যবান সময়েরও হেফাযত হয়।

২. আসাতিযা ও মুহাক্কিক উলামায়ে কেরামের বাণীসমূহ তাদের সারা জীবনের অধ্যয়নের নির্যাস হয়ে থাকে। তারা সর্বোত্তম কথাগুলো মনে রাখেন এবং তাদের শাগরিদদের সামনে সবচেয়ে মূল্যবান মুক্তাগুলো পেশ করেন। তাই তাদের গুরুত্বপূর্ণ মালফূযাত লিপিবদ্ধ করতে অলসতা করা উচিত নয়। 

৩. শায়েখ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রাহ.-এর উস্তায আল্লামা মুহাম্মাদ নূর সাইফ আলমাক্কী রাহ. বারবার এই শের আবৃত্তি করতেন—

لا بُدَّ للطَّالب منْ كُنَّاشِ

... يَكْتُب فِيه قائِمًا أَوْ ماشي

অর্থাৎ তালিবে ইলমের কাছে বায়ায থাকা আবশ্যক, যাতে সে দাঁড়িয়ে বা চলতে চলতেও লিখতে পারে।

৪. তালিবে ইলমের এই বিষয়টি ভালোভাবে অনুধাবন করা উচিত যে, ইলম অর্জনের জন্য এবং এতে উন্নতি লাভের জন্য কিছু নীতিমালা রয়েছে, যা মেনে চলা আবশ্যক। কিছু ধাপ রয়েছে, যা অতিক্রম করা অপরিহার্য। কারণ এর মাধ্যমেই এক-একটি ইট করে ইলমের ইমারত তৈরি হয়। সব ইলম একসঙ্গে শিখে ফেলার চেষ্টা করা উচিত নয়; এমনটি হলে ইলমের যে উপত্যকায়ই সে চলতে শুরু করবে, গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই তা তাকে ক্লান্ত ও নিঃশেষ করে দেবে।

ইবনে শিহাব যুহরী রাহ. তার শাগরিদকে এই বলে নসীহত করেছিলেন, ইলমকে একসাথে হজম করার চেষ্টা করো না; বরং দিন-রাতের ধারাবাহিকতায় কিছু কিছু করে অর্জন করো। কারণ যে ব্যক্তি একসাথে সব ইলম অর্জন করতে চায়, ইলম তার কাছ থেকে একসাথেই বিদায় নেয়।

উল্লিখিত বাহাউদ্দীন ইবনুন নাহহাস হালাবী রাহ.-এর বিখ্যাত শেরের ভাষ্য হল—

আজ ইলমের একটি মূল্যবান ফায়েদা আর আগামীকাল অনুরূপ আরেকটি, এভাবেই তিলে তিলে (মুতালাআ ও উস্তাযগণের সান্নিধ্যে) ইলম বৃদ্ধি পেতে থাকে। মানুষ এভাবেই একদিন হেকমত অর্জন করে। আর ঢলও তো আসলে বিন্দু বিন্দু জলেরই সমষ্টি।

৫. ইলমের পাঁচটি ধাপ রয়েছে, যা প্রতিটি তালিবে ইলমের জন্য অতিক্রম করা জরুরি—

ক. মনোযোগ দিয়ে শোনা।

খ. নীরবতা ও একাগ্রতার সাথে মনোযোগী থাকা।

গ. মনে রাখা এবং (লেখার মাধ্যমে) সংরক্ষণ করা।

ঘ. ইলম অনুযায়ী আমল করা।

ঙ. অন্যদের কাছে ইলম পৌঁছে দেওয়া।

শায়েখ সালমান বিন আবদুল ফাত্তাহ তাঁর সম্মানিত পিতার বিষয়ে যা লিখেছেন, তা অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—

আমার সম্মানিত পিতা রাহ.-এর অবস্থা এমনই ছিল। তিনি বিক্ষিপ্ত ফাওয়ায়েদ ও নুকতাসমূহ শিকার করতেন ও সংরক্ষণ করতেন; মুকীম বা মুসাফির অবস্থায়, চলন্ত বা স্থির সর্বাবস্থায়। আপনি চাইলে তাঁর শত শত কাগজের টুকরা ও নোট (এই কথার প্রমাণ হিসেবে) দেখতে পারেন।

সালাফের বায়ায নবীসীর নমুনা

আমাদের আকাবির ও আসলাফের নিয়ম এটিই ছিল যে, তারা নিজেদের মুতালাআর সময় ও আসাতিযায়ে কেরামের মজলিসে সামনে আসা ইলমী সূক্ষ্ম বিষয়, মূল্যবান নুকাত এবং দুর্লভ ফায়েদাসমূহ তৎক্ষণাৎ লিপিবদ্ধ করে নিতেন। তারাজিমের কিতাবে এর বহু উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বিদ্যমান। যেমন :

ক. আল্লামা আবুল ওয়াফা হাম্বলী রাহ.-এর ‘আলফুনূন’।

খ. আল্লামা ইবনুল জাওযী রাহ.-এর ‘সাইদুল খাতির’।

গ. হাফেয ইবনুল কায়্যমি রাহ.-এর ‘বাদাইউল ফাওয়াইদ’।

ঘ. ইমাম যারকাশী রাহ.-এর ‘খাবাইয়ায যাওয়াইয়া’।

ঙ. বাহাউদ্দীন হারিসীর ‘আলকাশকূল’।

আমাদের আকাবিরের মধ্যেও ইলমের প্রতি এই আগ্রহ ও ব্যাকুলতা পূর্ণ মাত্রায় বিদ্যমান ছিল—

ক. হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ ইয়াকুব নানুতবী রাহ.-এর ‘বায়াযে ইয়াকুবী’।

খ. হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রাহ.-এর ‘বায়াযে আশরাফী’।

গ. হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ শফী রাহ.-এর ‘ছামারাতুল আওরাক’।

ঘ. হযরত মাওলানা মানাযির আহসান গীলানী রাহ.-এর ‘বায়াযে মানাযির’।

ঙ. হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম-এর ‘তারাশে’

—এগুলো উলামায়ে কেরামের নিকট পরিচিত ও প্রসিদ্ধ।

সমকালীনদের মধ্যে শায়েখ মুস্তফা সিবায়ী রাহ.-এর ‘আলকলাইদ মিন ফারাইদিল ফাওয়াইদ’, শায়েখ আবদুস সালাম হারুন রাহ.-এর ‘কুন্নাশাতুন নাওয়াদির’, আলমাজমাউল ইলমী দামেশক-এর সদস্য শায়েখ জামীল বেক-এর ‘আলমুসারাআ ইলা কায়দি আওয়াবিদিল মুতালাআ’— এ সবই ফাওয়ায়েদ নোট করার ফসল।

এছাড়াও জীবনীগ্রন্থগুলোতে আল্লামা ইবনে আবেদীন শামী রাহ., মাখদুম হাশেম ঠাট্টাভী রাহ., আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী রাহ. এবং আল্লামা শাব্বীর আহমাদ উসমানী রাহ.-এর বায়াযসমূহের উল্লেখও বান্দার নজরে এসেছে। যথাযথ খোঁজ-খবর করলে আরও তথ্য সামনে আসবে।  

হযরত থানভী রাহ.-এর বায়ায

এখানে বিশেষভাবে হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী রাহ.-এর ‘বায়াযে আশরাফী’-এর আলোচনা ফায়েদা থেকে খালি হবে না। যার শুরুতে তিনি আরবী ভাষায় একটি শানদার ভূমিকা লিখেছেন। যা কীভাবে ফাওয়ায়েদ নোট করা উচিত এবং কীভাবে তা বিন্যস্ত করা উচিত— সে বিষয়ে পথ দেখায়।

হযরত লেখেন—

وبعد، فهذا كشكول جامع لعجائب الطرائف وغرائب الظرائف، نافع لطالبي اللطائف، بما يحويه من الشرائف، التقطته من بطون الأوراق وصدور الرجال، ومنه ما أفاض الله تعالى على النفس والخيال. ولقد أشرت إلى المأخذ في الأكثر، وعسى أن يهمل ذكره في الأقل الأندر، فها هو أنيس في الخلوة، جليس في الجلوة. ولقد ألحقت فهرسا إجماليا في الآخر ليسهل الأخذ للناظر. هذا وإني أريد الدعاء لنفسي من الناظرين بأن يتوفاني مسلما ويلحقني بالصالحين.

وقد شرعت فيه لمنتصف ذي الحجة الحرام سنة ۱۳۱٦ من هجرة خير الأنام، عليه وعلى جميع إخوانه من النبيين وعلى آله وأصحابه أفضل التحية والسلام، ما دارت الليالي والأيام.

হযরত থানভী রাহ.-এর এই লেখা থেকে জানা যায় :

তিনি তাঁর বায়াযে তিন ধরনের বিষয় একত্র করেছেন—

১. কিতাব মুতালাআর সময় চয়ন করা দুর্লভ বিষয়াবলি।

২. আকাবির ও মাশায়েখে কেরাম থেকে প্রাপ্ত উপদেশ ও নির্দেশাবলি।

৩. সেসব সূক্ষ্ম নুকতা, যা স্বয়ং হযরতের অন্তরে উদিত হত।

* তিনি ইলমী আমানতের প্রতি লক্ষ রেখে বায়াযে অধিকাংশ ফাওয়ায়েদের সাথে সেগুলোর উৎসও উল্লেখ করে দিয়েছেন।

* বায়াযের শেষে তিনি একটি সূচিপত্রও যুক্ত করে দিয়েছেন।

 

(চলবে ইনশাআল্লাহ)

 

 

advertisement