রবিউল আখির-জুমাদাল উলা ১৪৪৮   ||   অক্টোবর ২০২৬

কাশ্মীর প্রতারিত

হামেদ মীর

পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মারইয়াম নাওয়াজ মূলত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এই প্রস্তুতি প্রায়শই তাঁর বয়ান-বক্তৃতায় প্রতিফলিত হয়। তাঁর সাম্প্রতিক একটি বক্তব্য পুরো ভারতকে সুখকর বিস্মিত এবং কাশ্মীরের জনগণকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

মারইয়াম নাওয়াজ বলেছেন, তিনি প্রতিবেশী দেশ থেকে নয়; বরং প্রতিবেশী প্রদেশ থেকে সন্ত্রাসবাদের হুমকির মুখোমুখি।

পাকিস্তানের বৃহত্তম প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্য আমাদের সমস্ত কর্তৃপক্ষের দাবি খণ্ডন করে; যারা বলছেন, বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়ায় সন্ত্রাসীদের পেছনে ভারতের হাত রয়েছে।

এখন মারইয়াম নাওয়াজ ও তাঁর লোকজন এই বিবৃতির কোনো না কোনো ব্যাখ্যা দিয়ে দেবেন। তবে এই বিবৃতিটি পড়ে কাশ্মীরের এক সম্মানিত সাংবাদিক, শেখ মুহাম্মাদ আমীনের ‘কাশ্মীর ফারীব যাদাহ’ (কাশ্মীর প্রতারিত) বইয়ের কথা মনে পড়ে গেল, যা কয়েক মাস আগে প্রকাশিত হয়েছে।

কিছুদিন আগে বইটি পড়ে মনে হয়েছে, নাওয়াজ শরীফ ও তাঁর পরিবার সম্পর্কে শেখ মুহাম্মাদ আমীনের ভাষা খুবই কঠোর। শেখ সাহেব জেনারেল পারভেজ মোশাররফ, নাওয়াজ শরীফ এবং জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়াকে একই লাইনে দাঁড় করিয়ে তাদেরকে কাশ্মীরীদের প্রতি অন্যায়কারী সাব্যস্ত করেন।

শেখ মুহাম্মাদ আমীন অধিকৃত কাশ্মীরের হান্দওয়ারা এলাকার বাসিন্দা। শ্রীনগরের কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসসি শেষ করার পর তিনি শিক্ষক হন। এরপর সাপ্তাহিক চাটান শ্রীনগর থেকে সাংবাদিকতা শুরু করেন। স্বাধীনতার তীব্র আকাঙ্ক্ষা তাঁকে কারাগারেও নিয়ে যায়। দুই বছর কারাগারে কাটানোর পর ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর চোখ থেকে উধাও হয়ে যান।

২০১০ সালে মুজাফফরাবাদ থেকে প্রকাশিত ম্যাগাজিন কাশ্মীর আলইয়াউম-এর প্রধান সম্পাদক হন। তিনি বেশ কয়েকটি বইও লিখেছেন। তার নতুন বই ‘কাশ্মীর প্রতারিত’-এ তিনি কাশ্মীর স্বাধীনতা আন্দোলনের অতীত-বর্তমান বর্ণনা করার পর ভবিষ্যৎ বিশ্লেষণ করেছেন।

নাওয়াজ শরীফ সম্পর্কে তিনি তাঁর বইয়ে লিখেছেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি কাশ্মীর ইস্যুতে মনোনিবেশ করার চেয়ে ভারতের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ককে প্রাধান্য দিয়েছেন।

শেখ মুহাম্মাদ আমীন ভারতীয় শিল্পপতি সজ্জন জিন্দালের সাথে নাওয়াজ শরীফের বন্ধুত্ব এবং কথিত ব্যবসায়িক সম্পর্ক নিয়ে অনেক কিছু লিখেছেন। বইটিতে ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী আই কে গুজরালের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন, ১৯৯৭ সালে নিউ ইয়র্ক থেকে ফেরার সময় তিনি বিমানে সাংবাদিকদের নাওয়াজ শরীফের সাথে তাঁর সাক্ষাতের আকর্ষণীয় বিবরণ দেন। 

গুজরালের মতে, নাওয়াজ শরীফ তাঁর সঙ্গে কাশ্মীর নিয়ে খুব বেশি কথা বলেননি।

শেখ মুহাম্মাদ আমীন লিখেছেন, ২০১৪ সালে নাওয়াজ শরীফ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। ২০১৫ সালে রাশিয়ার উফা শহরে পাকিস্তান ও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পরে জারি করা ঘোষণাপত্রে কাশ্মীর শব্দটি অনুপস্থিত ছিল এবং এর কিছুদিন পরেই মোদি হঠাৎ করেই মারইয়াম নাওয়াজের মেয়ের বিয়েতে যোগ দিতে লাহোরে যান।

এরপর শেখ মুহাম্মাদ আমীন ‘বাজওয়া ডকট্রিন’ বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি লিখেছেন, বাজওয়া ডকট্রিন আসলে নাওয়াজ শরীফের ব্যবসায়িক ডকট্রিনের ধারাবাহিকতা, যার লক্ষ্য ছিল কাশ্মীর ইস্যু হিমশীতল করে ভারতের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক বাড়ানো।

অন্যদিকে ভারত কুলভূষণ যাদবের মতো চরিত্রের মাধ্যমে পাকিস্তানের ক্ষতি করার নীতি অব্যাহত রেখেছিল।

২০১৭ সালে পানামা পেপারস মামলায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের এক বিশেষ ভিসার কারণে সুপ্রিম কোর্ট নাওয়াজ শরীফকে প্রধানমন্ত্রীর পদে অযোগ্য ঘোষণা করেছিল। ফলে ইমরান খান প্রধানমন্ত্রী হন।

শেখ সাহেব বলেন, জেনারেল বাজওয়া যখন বুঝতে পারলেন, ইমরান খান তার ডকট্রিনের বোঝা বহনের যোগ্য নন, তখন ‘ঘোড়া’ পরিবর্তনের পরিকল্পনা করা হয়।

শেখ মুহাম্মাদ আমীনের মতামতের সাথে দ্বিমত পোষণ করার মতো অনেক মানুষ থাকবেন। তবে তাঁর বইটি আসলে পাকিস্তানের শাসক অভিজাতদের সম্পর্কে অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীরের সেই জনগণের হতাশার বর্ণনা দেয়, যা ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯-এ নাওয়াজ শরীফ ও অটল বিহারী বাজপেয়ীর মধ্যে লাহোর ঘোষণার মাধ্যমে শুরু হয়েছিল এবং ৫ আগস্ট ২০১৯-এ ভারতের সংবিধানে জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের বিশেষ মর্যাদা রহিত করার মাধ্যমে শেষ হয়েছিল।

শেখ মুহাম্মাদ আমীনের বইয়ের একটি অধ্যায়ের শিরোনাম ‘তাজেরানা ডকট্রিন— ব্যবসায়ী মতবাদ’। পরের অধ্যায়ের শিরোনাম ‘বাজওয়া ডকট্রিন’।

এই বইটি ২০২৫ সালের মে মাসে পাকিস্তানের কাছে ভারতের পরাজয়ের পর প্রকাশিত হয়েছে। বইটিতে কাশ্মীরের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত সেসব ব্যক্তিদের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, যাদেরকে পাকিস্তান ও আযাদ কাশ্মীরে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা টার্গেট কিলিংয়ের শিকার করেছিল।

শেখ সাহেব সতর্ক করে দিয়েছেন, ২০০৮ সালের পরে ইসরাইলী সেনাবাহিনী কাশ্মীরী স্বাধীনতা আন্দোলনের অবসান ঘটাতে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে সহায়তা করে আসছে। কাশ্মীরকে নতুন গাজা বানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে ভারত।

শেখ মুহাম্মাদ আমীন লিখেছেন, কাশ্মীরীদের আত্মত্যাগ কখনোই বৃথা যাবে না।

এই বইয়ের অনন্য দিক হল, শেখ মুহাম্মাদ আমীন অনেক জায়গায় তিক্ত ভাষা প্রয়োগ করা সত্ত্বেও ইতিহাসবিদ হিসেবে বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা দেখাননি। একদিকে তিনি সৈয়দ আলী গিলানীকে তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক ও আদর্শিক নেতা হিসেবে বিবেচনা করেন, অন্যদিকে শহীদ মকবুল বাটের আত্মত্যাগকে তাঁর সাহস ও শক্তি বলে মনে করেন।

তিনি লিখেছেন, ১৯৮৭ সালের রাজ্য নির্বাচনে কারচুপি সশস্ত্র প্রতিরোধের জন্ম দেয়। ১৯৮৭ সালে হিজবুল মুজাহিদীন প্রধান সৈয়দ সালাহুদ্দীন শ্রীনগরের একটি নির্বাচনী এলাকা থেকে মুহাম্মাদ ইউসুফ শাহ নামে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।

বন্দি জেকেএলএফ নেতা ইয়াসিন মালিক ছিলেন তাঁর প্রধান পোলিং এজেন্ট। ভারত সরকার যখন ব্যালটের পবিত্রতা পদদলিত করেছিল, তখন তারা দুজনই বুলেটের পথ বেছে নিয়েছিলেন।

১৯৮৭ সালের কারচুপির পরে কিছু দিন নীরবতা বিরাজ করছিল। তবে ১৯৮৮ সালে সশস্ত্র প্রতিরোধ শুরু হয়ে গিয়েছিল।

শেখ মুহাম্মাদ আমীন লিখেছেন, যারা প্রতিরোধ শুরু করেছিলেন তারা জম্মু ও কাশ্মীর লিবারেশন ফ্রন্ট-এর সদস্য ছিলেন, তবে তাদের মধ্যে অনেকেই পিপলস লিগ, জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য দলের সাথে মতাদর্শগতভাবে যুক্ত ছিলেন। আজও অধিকৃত কাশ্মীরে ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির মতো নীরবতা বিরাজ করছে। কারণ কাশ্মীর এক বেদনায় নীল হয়ে আছে।

শেখ সাহেব লিখেছেন, ভারতীয় সংবিধান থেকে অনুচ্ছেদ ৩৭০ বিলুপ্ত হয়ে গেছে, কিন্তু প্রকৃতির আইন তো বিলুপ্ত হয়নি। কাশ্মীরীদের অসহায়ত্ব দেখে হেসো না, তুমি তোমার আনন্দ উদ্যাপন কর।

কাশ্মীর প্রতারিত-এর শেষে সতর্ক করতে গিয়ে তিনি লেখেন, কাশ্মীরের জনগণের ইচ্ছা অনুযায়ী কাশ্মীর সমস্যার সমাধান না হলে একটি ছোট্ট স্ফুলিঙ্গ যে-কোনো সময় বিশাল অগ্নিকাণ্ডে পরিণত হতে পারে, যা কেবল এই অঞ্চলের ইতিহাসই বদলে দেবে না; এর ভৌগোলিক অবস্থানও বদলে যাবে এবং অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে।

[দৈনিক জঙ্গ (৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬) থেকে অনুবাদ করেছেন, ওয়ালিউল্লাহ আব্দুল জলীল]

 

 

advertisement