ফিরে দেখা ১৪৪৭ হিজরী
আমরা যাঁদের হারিয়েছি
মাওলানা মুহাম্মাদ যহীরুল ইসলাম
আহলে ইলমের তারিখ-তরজমা (জীবনী ও ইতিহাস) সংরক্ষণ করা ইসলামী ইতিহাসের একটি চলমান ধারা। প্রত্যেক ভূখণ্ডের আহলে ইলমের দায়িত্ব হল, তারা তাদের সালাফের জীবন বৃত্তান্ত, তাদের ইলমী তুরাছ সংরক্ষণ করবেন। বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে ১৪৪৭ হিজরীতে ওফাত হওয়া আহলে ইলমের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা পেশ করা হচ্ছে। এতে উপমহাদেশের আহলে ইলমের নামই বেশি স্থান পেয়েছে। এখানে সংক্ষিপ্তাকারে শুধু পরিচয় এবং ওফাতের তারিখ পেশ করাই উদ্দেশ্যে। যারা এ বিষয়ে বিস্তারিত কাজ করবেন তালিকাটি তাদের জন্য সহায়ক হবে আশা রাখি।
এ তালিকায় উল্লেখকৃত সকল হিজরী তারিখে বাংলাদেশের হেলাল নির্ভর তারিখের অনুসরণ করা হয়েছে। মৃত ব্যক্তির স্থানীয় হেলালের তারিখ ভিন্নও হতে পারে।
৬ মুহাররম (২-৭-২৫), বুধবার
মাওলানা সায়্যিদ মাহমুদ মিয়াঁ রাহ.
শাইখুল ইসলাম হুসাইন আহমাদ মাদানী রাহ.-এর বিশিষ্ট খলীফা মাওলানা হামিদ মিয়াঁ রাহ. (১৪০৮ হি.)-এর ছাহেবযাদা। বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ও রাজনীতিবিদ, ‘জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ’-এর সাবেক কেন্দ্রীয় সচিব মাওলানা সায়্যিদ মুহাম্মাদ মিয়াঁ ছাহেব রাহ.-এর নাতি। পিতা মাওলানা সায়্যিদ হামিদ মিয়াঁ রাহ. প্রতিষ্ঠিত (প্রতিষ্ঠা : ১৯৫২ ঈ.) লাহোরের প্রসিদ্ধ মাদরাসা জামিয়া মাদানিয়ার মুহতামিম ছিলেন। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম পাঞ্জাবের আমীর ছিলেন। ১৩৭৫ হিজরীতে (১৯৫৬ ঈ.) লাহোরে জন্মগ্রহণ করেন। জামিয়া মাদানিয়ার মুখপত্র মাসিক ‘আনওয়ারে মাদীনা’ আগস্ট ২০২৫ সংখ্যায় তাঁর জীবনী সম্পর্কিত কয়েকটি লেখা ছেপেছে।
২৯ সফর (২৪-৮-২৫), রবিবার
শায়েখ আবদুল মাজীদ হিন্নাভী রাহ.
সফর মাসের শেষ দিকে মদীনা মুনাওয়ারায় ইন্তেকাল করেন দামেশকের বিশিষ্ট মুহাদ্দিস-ফকীহ আলেম শায়েখ আবদুল মাজীদ মুহাম্মাদ মাজীদ হিন্নাভী। মদীনা মুনাওয়ারায় তার ইলমী দুরূস হত, সেখানে বিভিন্ন মুতূনে ইলমিয়্যার দরস দিতেন। সিরিয়ার উলামা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং সিরিয়ার খ্যাতনামা হানাফী ফকীহ শায়েখ মুহাম্মাদ আবুল খায়ের মায়দানী রাহ. (১৩৮০হি.)-এর বিশিষ্ট শাগরিদ ছিলেন তিনি। বর্তমান সময়ে علو إسناد -এর যে কয়েকটি গ্রহণযোগ্য সূত্র রয়েছে, শায়েখ হিন্নাভীর সূত্রে প্রাপ্ত শায়েখ আবুল খায়ের মায়দানী রাহ.-এর ‘ইসনাদ’ তার অন্যতম। ১৩৫২ হিজরীতে দামেশকে জন্মগ্রহণ করেন। ইন্তেকালের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৯৫ বছর।
৩০ সফর (২৫-৮-২৫), সোমবার
সায়্যদি আবদুল ওকীল হাশেমী মাক্কী রাহ.
হারামাইনের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস শায়েখ আবদুল হক হাশেমী রাহ.-এর ছাহেবযাদা। প্রায় অর্ধ শতাব্দী আগেই মক্কা মুকাররমার মুকীম তথা স্থায়ী বাসিন্দা হন। মসজিদে হারামে দাওয়াত, ওয়াজ-নসীহা ও দরস-তাদরীসের খেদমত আঞ্জাম দেন। তৎকালীন ভারতের ভাওয়ালপুরে ১৩৫৭ হিজরী মোতাবেক ১৯৩৮ ঈসায়ী সনে জন্মগ্রহণ করেন।
২০ রবিউল আউয়াল (১৪-৯-২৫), রবিবার
হাফেজ আহমাদুল্লাহ ছাহেব
সদরে মুহতামিম, পটিয়া
পটিয়া মাদরাসায় সুদীর্ঘ ৪৭ বছর হাদীস ও ফিকহের দরস ও ফতোয়া প্রদানের খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন। ১৩৬১ হিজরী মোতাবেক ১৯৪১ সনে পটিয়া থানায় তার জন্ম। জিরি মাদরাসায় পড়াশোনা সমাপ্ত করে পাকিস্তানের জামিয়া আশরাফিয়া লাহোর, খাইরুল মাদারিস মুলতান এবং দারুল উলূম করাচিতে ফিকহ-তাফসীরে উচ্চতর পড়াশোনা করেন। ১৩৮৮ হিজরী থেকে ১৪১০ হিজরী পর্যন্ত জিরি মাদরাসায় অতঃপর ১৪১১ থেকে মৃত্যু পর্যন্ত পটিয়া মাদরাসায় শাইখুল হাদীস, প্রধান মুফতী এবং সদরে মুহতামিমের দায়িত্ব পালন করেন। হযরত মাওলানা ইদরীস কান্ধলবী রাহ. এবং মুফতী মুহাম্মাদ শফী রাহ.-এর শাগরিদ ছিলেন। হযরত হাফেজ্জী হুজুর রাহ.-এর সাথে বায়আত ও সুলূকের সম্পর্ক ছিল এবং হাফেজ্জী হুজুরের খলীফাও ছিলেন।
২৯ রবিউল আওয়াল (২৩-৯-২৫), মঙ্গলবার
শায়েখ আবদুল আযীয ইবনে আবদুল্লাহ আলুশ শায়েখ রাহ.
শায়েখ মুহাম্মাদ বিন আবদুল ওয়াহহাব রাহ.-এর বংশধর। তিনি ১৪২০ হি./১৯৯৯ ঈ. থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সৌদি আরবের প্রধান মুফতীর পদে ছিলেন। ১৪০২ হি. থেকে ১৪৩৬ হি. পর্যন্ত সুদীর্ঘ ৩৫ বছর একাধারে আরাফার ময়দানে খুতবা প্রদান করেছেন।
৮ রবিউল আখির (১-১০-২৫), বুধবার
কারী বশীর বিন আহমাদ সিদ্দীক রাহ.
মসজিদে নববীর শায়খুল কুররা। পাকিস্তানের মোযাফফরগড় জেলায় ১৩৫৭ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। লাহোরের বিখ্যাত কারী আবদুল আযীয শাওকী রাহ. (১৩৯১ হি.)-এর নিকট ইলমে তাজবীদ ও ইলমে কেরাতের ওপর তাখাসসুস করেন। এরপর দারুল উলূম করাচিতে শাইখুল কুররা কারী ফাতাহ মুহাম্মাদ ছাহেব রাহ. (১৪০৭ হি.)-এর নিকট মুতাওয়াতির কেরাতের সকল কেরাতে ভিন্ন ভিন্নভাবে পুরো কুরআন কারীমের খতম শোনান। ১৩৮৫ হি. মোতাবেক ১৯৬৫ সনে মদীনা মুনাওয়ারায় চলে যান। সে বছর থেকেই মসজিদে নববীতে কুরআন কারীমের দরস প্রদান শুরু করেন। মসজিদে নববীর সাবেক ইমাম শায়েখ আইয়ুব রাহ. (১৪৩৭ হি.) এবং মক্কা মুকাররমার সাবেক ইমাম শায়েখ আলী জাবের রাহ. (১৪২৬ হি.)-সহ অসংখ্য উলামা ও কুররা-এর উস্তায ছিলেন তিনি।
১৪ রবিউল আখির (৭-১০-২৫), মঙ্গলবার
জনাব মাওলানা নযীর আহমাদ নদভী রাহ.
দারুল উলূম নদওয়াতুল উলামার সিনিয়র উস্তায। ১৯৬৭ সনে ভারতের উত্তরপ্রদেশের ইটাওয়া শহরে জন্মগ্রহণ করেন। মাওলানা ওয়াজিহ রশীদ হাসানী নদভী রাহ.-এর নেগরানী ও বিশেষ তত্ত্বাবধানে তাঁর ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠেছে। কর্মজীবনের পুরো সময় তিনি তালেবে ইলমদের গড়ার মেহনতেই ওয়াকফ করেছিলেন। ফলে জ্ঞান-সাহিত্যে বিশেষ অবস্থান সত্ত্বেও স্বতন্ত্র কোনো তাসনীফ করার ফুরসত পাননি।
১৪ রবিউল আখির (৭-১০-২৫), মঙ্গলবার
ড. সায়্যদি আহমাদ উমর হাশেম
মিসরের সর্বজন শ্রদ্ধেয় দাঈ আলেম। ১৯৯৫-২০০৩ সময়কালে তিনি জামিয়া আযহারের রঈস ছিলেন। ‘ফয়যুল বারী শরহু সহীহিল বুখারী’ নামে তিনি সহীহ বুখারীর শরাহ লিখেছেন। যা দারুল ওয়াবিলিস সাইয়িব থেকে আট খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও তার গুরুত্বপূর্ণ রচনার মধ্যে রয়েছে-
تدوين السنة النبوية والرد على الشبهات، الشفاعة في ضوء القرآن والسنة والرد على منكريها، التضامن في مواجهات التحديات.
১৯ রবিউল আখির (১২-১০-২৫), রবিবার
শায়েখ আবদুল্লাহ ইবনে উমর ইবনে মুহাম্মাদ নাসীফ
হিজাযের দাঈ আলেম। ১৪০৩ হি. থেকে ১৪১৪ হি. পর্যন্ত রাবেতা আলমে ইসলামীর মহাসচিব ছিলেন এবং ১৩৯৩ হি. থেকে ১৩৯৬ হি. পর্যন্ত ৪ বছর জামিআতুল মালিক আবদুল আযীযের রঈস ছিলেন। ভূতত্ত্ববিজ্ঞানে তার বিশেষ পারদর্শিতা ছিল।
৬ জুমাদাল উলা (২৯-১০-২৫), বুধবার
মাওলানা কারী মুহাম্মাদ মিয়া ছাহেব রাহ.
দারুল উলূম হাটহাজারী মাদরাসার সিনিয়র উস্তায। ১৯৩৭ সনে হাটহাজারী থানাধীন পূর্ব ফটিকায় জন্মগ্রহণ করেন। হাটহাজারী মাদরাসা থেকে দাওরায়ে হাদীস সমাপ্ত করে জামিআতুল উলূমিল ইসলামিয়া বিন্নুরী টাউনে পাঁচ বছর উচ্চতর পড়াশোনা করেন। এ সময়ে তিনি ইলমুল কিরাআতের বিষয়ে বিশেষ মাহারাত হাসিল করেন। দেশে ফেরার পর হাটহাজারী মাদরাসার তৎকালীন মুহতামিম হযরত মাওলানা আবদুল ওয়াহহাব ছাহেব রাহ.-এর নির্দেশে হাটহাজারী মাদরাসায় উস্তায হিসেবে যোগদান করেন।
১২ জুমাদাল উলা (৪-১১-২৫), মঙ্গলবার
শহীদ মাওলানা আবদুস সালাম আরিফ রাহ.
পাকিস্তানের খাইবর পাখতুনখোয়া প্রদেশের প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন। তিনি জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রাদেশিক শুরার সিনিয়র সদস্য ছিলেন। আসরের নামায পড়ে বাসায় ফেরার পথে অজ্ঞাত সন্ত্রাসীদের হামলায় শহীদ হন।
১৭ জুমাদাল উলা (৯-১১-২৫), রবিবার
ড. যাগলূল নাজ্জার রাহ.
মিসরের প্রসিদ্ধ দাঈয়ে ইসলাম। ভূতত্ত্ববিজ্ঞান তার পাণ্ডিত্য ও পারদর্শিতার বিষয় ছিল। ভূতত্ত্ববিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানকে তিনি দাওয়াতের কাজে ব্যবহার করেছেন এবং এ বিষয়ে কুরআন কারীমের ভাষাশৈলীর ‘ই‘জায’ (অলৌকিকতা) নিয়েও কাজ করেছেন। তার প্রসিদ্ধ কয়েকটি রচনা হল—
قضية الإعجاز العلمي للقرآن وضوابط التعامل معها، من آيات الإعجاز العلمي، السماء في القرآن الكريم، الأرض في القرآن الكريم، سرُّ الليل والنهار.
২০ জুমাদাল উলা (১২-১১-২৫), বুধবার
মুফতী মুহাম্মাদ হানীফ আবদুল মাজীদ
পাকিস্তানের দাঈ আলেম। দেশের সর্বস্তরে কুরআনের সহীহ তিলাওয়াত ব্যাপক করার বিষয়ে তাঁর বিশেষ ফিকির ও প্রশংসনীয় মেহনত ছিল। তাঁর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ‘আলবদর’ স্কুলে এসএসসি পর্যন্ত সকল শ্রেণিতে তাসহীহে তিলাওয়াতের দরস বাধ্যতামূলক ছিল। ‘বাইতুল ইলম’ নামে করাচিতে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন। দ্বীনী বোধ জাগ্রতকরণ, চরিত্র গঠন ও নৈতিকতা বিষয়ে তার অনেক রচনা রয়েছে,
مثالی استاذ، مثالی ماں،مثالی باپ، پانچ منٹ کا مدرسہ، تحفۂ دلہا، تحفۂ دلہن۔
৬ জুমাদাল আখিরাহ (২৮-১১-২৫), জুমাবার
মাওলানা শফীউদ্দীন (র্ফাসী কবি) রাহ.
কিশোরগঞ্জের বর্ষীয়াণ বুযুর্গ ওয়ায়েয। আকাবিরের যামানায় খেড়িহর মাদরাসার মাহফিলে যে কয়জন বুযুর্গ আমন্ত্রিত হতেন, তিনি তাদের একজন। রদ্দে বেদআত নিয়ে—
الشفيع المثنوي في إبطال الفكر الرضوي
—নামে ফারসী কাব্যে তার একটি স্বতন্ত্র সংকলন আছে। তাঁর আসাতেযা মাশায়েখের মধ্যে ছিলেন কিশোরগঞ্জ জামিয়া মাদানিয়া দারুল উলূম হুসাইনিয়া আবদুল্লাহপুর জগৎচর মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আবদুস সুবহান রাহ. (১৪১৪ হি.) এবং কুমিল্লা বরুড়া মাদরাসার সাবেক মুহতামিম মুফতী আবদুল ওয়াহহাব ছাহেব রাহ. (১৪২৯ হি.)।
৬ জুমাদাল আখিরাহ (২৮-১১-২৫), জুমাবার
শায়েখ আবু হাসসান মূসা আলআরাবী
ফিলিস্তিন থেকে বাস্তুচ্যুত সিরিয়ার বিশিষ্ট দাঈ আলেম। দামেশকের মসজিদে মসজিদে ও শিক্ষাকেন্দ্রগুলোতে গিয়ে তালীম ও দাওয়াতের কাজ করতেন। এ কাজেই তিনি যিন্দেগী ওয়াকফ করেছিলেন। আত্মপ্রচারবিমুখ ছিলেন। তাঁর বিখ্যাত বাণী—
حب الظهور يقصم الظهور.
‘যশ-আসক্তি ব্যক্তিত্বের বিনাশ ডেকে আনে।’
১০ জুমাদাল আখিরাহ (২-১২-২৫), মঙ্গলবার
ড. মুহাম্মাদ বিন আলী আলআকলা
সৌদি আরবের বিশিষ্ট ইসলামী অর্থনীতিবিদ। ২০০৭ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত তিনি জামিআ ইসলামিয়া মদীনা মুনাওয়ারার রঈস—পরিচালক ছিলেন।
তিনি ১৩৭৮ হিজরী মোতাবেক ১৯৫৯ ঈসায়ী সনে মক্কা মুকাররমায় জন্মগ্রহণ করেন।
২২ জুমাদাল আখিরাহ (১৪-১২-২৫), রবিবার
পীর যুলফিকার আহমাদ নকশবন্দী রাহ.
নকশবন্দিয়া সিলসিলার প্রসিদ্ধ সূফী বুযুর্গ। ১৯৫৩ সনে পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের ঝং শহরে জন্মগ্রহণ করেন। হযরত মাওলানা পীর গোলাম হাবীব রাহ. (১৪১০ হি.)-এর মুজাযে বাইয়াত ছিলেন। এর আগে লাহোর ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজি ইউনিভার্সিটিতে অধ্যয়নকালে হযরত মাওলানা সায়্যদি যাওয়ার হুসাইন শাহ রাহ. (১৪০০ হি.)-এর কাছে যাওয়া-আসা করতেন।
২৩ জুমাদাল আখিরা (১৫-১২-২০২৫), সোমবার
মাওলানা মাহবুবুল হক কাসেমী রাহ.
জামিয়া ইসলামিয়া লালমাটিয়া মাদরাসার স্বনামধন্য উস্তাযুল হাদীস। ২০০০ সনে লালমাটিয়া মাদরাসায় তাকমীল জামাত খোলা হলে প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আবদুর রউফ ছাহেব রাহ.-এর আহ্বানে খতীব ওবায়দুল হক ছাহেব রাহ.-এর পরামর্শে লালমাটিয়া মাদরাসায় তাদরীসের খেদমতে যুক্ত হন। এর আগে ১৯৮৫ সনে দারুল উলূম দেওবন্দ থেকে তাকমীলে আদব সমাপ্ত করার পর হযরত মাওলানা নাসির খান রাহ.-এর হুকুমে রাজস্থানের ইসলামিয়া লতিফিয়া তালীমুল কুরআন মাদরাসায় উস্তায হিসেবে নিযুক্ত হন। পাঁচ বছর পর দেশে ফিরে নারায়ণগঞ্জ আমলাপাড়া মাদরাসায় ৮ বছর এবং বড় কাটারা মাদরাসায় দুই বছর খেদমত করেন।
কঠিন ইলমী বিষয় অত্যন্ত সহজবোধ্য করে উপস্থাপনে তার বিশেষ পারদর্শিতা ছিল। তাঁর দরসের এ খুসূসিয়তের কথা তাঁর শাগরিদদের মুখে প্রসিদ্ধ।
১৯৬৪ সনে তিনি পিরোজপুর জেলার জিয়ানগর থানাধীন নলবুনিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। হযরত সদর ছাহেব রাহ.-এর বিশিষ্ট খলীফা পিরোজপুরের ঐতিহাসিক সাতকাসেমিয়া মাদরাসা (প্রতিষ্ঠা ১৯৪২ ঈ.)-এর বা-নী (প্রতিষ্ঠাতা) মাওলানা মুমতাযুদ্দীন ছাহেব রাহ. (১৯১৭-১৯৮২) ছিলেন তাঁর নানা। তাঁর দাদার ভাই মাওলানা ইয়াকুব আলী ছাহেব রাহ. (মৃ. ১৯৯৮ ঈ.) ছিলেন সাহারানপুরের ফাযেল। থানাভবনে যাতায়াত করতেন। পরবর্তীতে হযরত সদর ছাহেব রাহ.-এর হাতে বাইআত হন এবং হযরতের ঘনিষ্ঠজনদের একজন ছিলেন।
তার পিতা মাওলানা শামসুল হক (পাড়ের হাটের হুজুর) রাহ. (মৃ. ১৪৪৫ হি.) বালিহারী খাদেমুল ইসলাম কওমী মাদরাসায় (নেছারাবাদ, পিরোজপুর) ৫০ বছরেরও অধিককাল তাদরীসের খেদমত আঞ্জাম দেন। হযরত সদর ছাহেব রাহ. ছিলেন এ মাদরাসার প্রতিষ্ঠাকালীন মুরব্বী।
৮ রজব (৭ রজব দিবাগত রাত) (২৮-১২-২০২৫), রবিবার
হযরত মাওলানা আবদুর রহীম ছাহেব রাহ.
দেশের প্রবীণতম আলেম, হাজারও আলেম তালেবে ইলমের উস্তায হযরত মাওলানা আবদুর রহীম ছাহেব রাহ. কুমিল্লা জেলার বরুড়া থানাধীন মইশাইর গ্রামে আনুমানিক ১৯৪১ সনে জন্মগ্রহণ করেন। বাল্যকাল থেকে হযরত সদর ছাহেব রাহ.-এর বন্ধুবর মাওলানা আবুল কাসেম শেখজী রাহ.-এর তালীম-তরবিয়তে বেড়ে ওঠেন। হযরত শেখজী রাহ. হযরত সদর ছাহেব রাহ. বরাবর লালবাগ জামেয়ায় তাঁর দাখেলার (ভর্তি) বিষয়ে চিঠি লিখেছিলেন।
১৯৫৭ সনে লালবাগ মাদরাসায় শরহেজামী জামাতে ভর্তি হন। ১৯৬৩ সনে দাওরায়ে হাদীস সমাপ্ত হয়। দুই বছর তাকমীলে তাফসীর পড়ার পর মুহাদ্দিস (হেদায়াতুল্লাহ) ছাহেব রাহ.-এর নির্দেশে ফরিদাবাদ মাদরাসায় খেদমতে নিযুক্ত হন। ১৯৭১ পর্যন্ত পাঁচ বছর ফরিদাবাদ মাদরাসায় তাদরীস করেন। ১৯৭৩ সনে মাদরাসাগুলো পুনরায় চালু হলে মুহাদ্দিস ছাহেব রাহ.-এর পরামর্শেই জামেয়া লালবাগে উস্তায হিসেবে চলে আসেন। ইন্তেকাল পর্যন্ত লালবাগ জামিআতেই খেদমত করে যান। মাঝে পাঁচ বছর হেদায়েতুল্লাহ ছাহেব রাহ.-এর গ্রাম চাঁদপুর শাহতলীর মুমিনপুর মাদরাসায় ছিলেন।
মারকাযুদ দাওয়াহর মুহতারাম মুদীর হযরত মাওলানা মুফতী আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ দামাত বারাকাতুহুমসহ দেশের বহু মুরব্বী আলেম তাঁর শাগরিদ।
মাওলানা আবদুল মালেক ছাহেব দামাত বারাকাতুহুম বলেন, ‘আসাতেযা এবং মাশায়েখের যে দাওরটা আমরা পাইনি, বেশ কিছু ভালো সিফাতের মধ্যে হযরত সে দাওরের উত্তম নমুনা ছিলেন’।
৮ রজব (২৯-১২-২৫), সোমবার
মুফতী সায়্যদি মুখতারুদ্দীন
শাইখুল হাদীস যাকারিয়া রাহ.-এর বিশিষ্ট খলীফা। তাঁর ইন্তেকালে শাইখুল ইসলাম মুফতী মুহাম্মাদ তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম লিখেছেন—
انا للہ وانا الیہ راجعون! حضرت مولانا مفتی مختار الدین صاحب رحمۃ اللہ علیہ کی وفات ملک وملت کے لئے انتہائی افسوسناک خبر ہے ہم ملت کے ایک عظیم خیر خواہ اور روحانی پیشوا سے محروم ہوگئے، لیکن انہوں نے جن دلوں میں تقویٰ طہارت اور تزکیہ کی آبیاری کی وہ انکا صدقہ جاریہ ہے جو ان شاء اللہ تعالیٰ باقی رہیگا۔ اللہ تعالیٰ ان کو درجات عالیہ عطا فرمائیں اور پسماندگان کو صبر جمیل اور اجر جزیل سے نوازیں آمین۔
শহীদ ‘আবু উবায়দা’
তাঁর নাম হুযায়ফা সামীর আবদুল্লাহ আলকাহলূত। ‘আবু উবায়দা’ নামে পরিচিত। হামাসের আলকাসসাম ব্রিগেডের দীর্ঘদিনের সামরিক মুখপাত্র। ৭ অক্টোবরের (২০২৩) পর তাঁর দৃঢ়চেতা ও প্রভাবক বক্তব্য, সামরিক বিবৃতি এবং যুদ্ধের নানা পর্যায়ে ব্রিগেডের অবস্থান তুলে ধরা তাঁকে প্রতিরোধের অন্যতম প্রতীক করে তোলে। অবশেষে তিনিও গাযার শহীদানের কাফেলায় শামিল হন। ৩০ আগস্ট ২০২৫ তারিখে ইসরাইলের বিমান হামলার শিকার হন বলে দাবি করা হয়। ২৯ ডিসেম্বর ’২৫ হামাস আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর শাহাদাতের ঘোষণা করে।
১৫ রজব (৫-১-২৬), সোমবার
বিশিষ্ট মুহাদ্দিস মাওলানা ফযলুর রহীম আশরাফী রাহ.
জামিয়া আশরাফিয়া লাহোরের মুহতামিম। তাঁর পিতা মুফতী মুহাম্মাদ হাসান অমৃতসরী রাহ. ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কিছুদিন পর জামিয়া আশরাফিয়া প্রতিষ্ঠা করেন। মুফতী মুহাম্মাদ হাসান রাহ. হযরত থানভী রাহ.-এর বিশিষ্ট খলীফা ছিলেন।
মাওলানা ফযলুর রহীম ১৯৪৪ সনে জন্মগ্রহণ করেন। কারী খোদাবখশ রাহ. এবং কারী আবদুল মালিক রাহ. এর নিকট কুরআন কারীম শিখেছেন। মাওলানা রসূল খান রাহ., হযরত মাওলানা ইদরীস কান্ধলবী রাহ., শামসুল হক আফগানী রাহ. প্রমুখের শাগরিদ ছিলেন।
কুরআন বোর্ড পাঞ্জাবের চেয়ারম্যান, পাকিস্তান বেফাকুল মাদারিসের ‘সরপুরস্তি’সহ বিভিন্ন ইলমী ও আদবী সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়েছেন। সর্বসাধারণের উপযোগী তার গুরুত্বপূর্ণ রচনাবলি রয়েছে।
২২ রজব (১২-১-২৬), সোমবার
হযরত মাওলানা সগীর আহমাদ খান রশাদী রাহ.
ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের মহীশূর জেলার গুরুত্বপূর্ণ দ্বীনী ব্যক্তিত্ব। দক্ষিণ ভারতের বেঙ্গালুরুর সুপ্রসিদ্ধ মাদরাসা দারুল উলূম সাবীলুর রাশাদ-এর মুহতামিম ও শাইখুল হাদীস ছিলেন। ১৯৫০ ঈসায়ী সনে মহীশুর জেলায় তার জন্ম। ১৩৯১ হিজরীতে সাবীলুর রাশাদ মাদরাসায় দাওরায়ে হাদীস সমাপ্তির পর থেকে অর্ধ শতাব্দীরও অধিককাল এ মাদরাসায় দরস-তাদরীস, শাইখুল হাদীস ও মুহতামিমের দায়িত্ব আঞ্জাম দেন।
২৭ রজব (১৭-১-২৬), শনিবার
মাওলানা জুবাইর আহমদ আশরাফ
প্রতিভাবান আলেম মাওলানা জুবাইর আহমদ আশরাফ দেশের খ্যাতিমান ইসলামী সাহিত্যিকদের একজন। ১৯৭০ সালে কুমিল্লায় জন্মগ্রহণ করেন। কুমিল্লা বরুড়া মাদরাসা, লালবাগ জামেয়া এরপর ১৯৮৭ সাল থেকে মালিবাগ জামিয়ায় পড়েন। ১৯৯১-৯২ সালে দারুল উলূম দেওবন্দ থেকে দাওরায়ে হাদীস সম্পন্ন করেন।
দীর্ঘদিন ড. কাজী দীন মুহম্মদের অধীনে বাংলাভাষা ও সাহিত্য অধ্যয়ন করেছেন। বাংলা-পাক-ভারত উপমহাদেশের উলামা-মাশায়েখের তারিখ (জীবনী) নিয়ে কাজ করা তার স্বপ্ন ছিল। ‘স্মরণীয় মনীষী’ নামে একটি গ্রন্থও রচনা করেন, যা চেতনা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষ সাময়িকী “লেখকপত্র” তার ২৮তম সংখ্যা (এপ্রিল-জুন ২০২৬ঈ) মাওলানা জুবাইর আহমদ আশরাফ স্মরণসংখ্যা হিসেবে বের করেছে।
২৭ রজব (১৭-১-২৬), শনিবার
মাওলানা আবু হুযাইফা হুসাইন কাসেম রাহ.
জামিয়া দারুল উলূম করাচির প্রবীণ উস্তায। আরবী ভাষার মাহের ছিলেন, বড় আশেকও ছিলেন। হাবীবুল্লাহ মুখতার শহীদ রাহ.-এর ঘনিষ্ঠ শাগরিদ ছিলেন।
كشف النقاب عما يقوله الترمذي وفي الباب
—কিতাবের কাজে তারও অংশগ্রহণ ছিল। ১৯৬৯ সালে আরাকানে তার জন্ম। ১৫ বছর বয়সে আরাকান থেকে করাচি চলে যান। ১৯৯৩ সনে জামিয়াতুল উলূমিল ইসলামিয়া বিন্নুরী টাউনে পড়াশোনা সমাপ্ত করার পর সেখানে উস্তায হিসেবে নিযুক্ত হন। হাবীবুল্লাহ মুখতার রাহ.-এর শাহাদাতের কিছুদিন পরে তিনি জামিয়া দারুল উলূম করাচিতে চলে আসেন। হযরত হাকীম মুহাম্মাদ আখতার ছাহেব রাহ.-এর খলীফায়ে মুজায ছিলেন। দারুল উলূম করাচির মুখপত্র মাসিক ‘আলবালাগ’ রমযান ১৪৪৭ হিজরী সংখ্যায় তার পরিচিতি ও ইলমী খেদমত নিয়ে বিশেষ প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
(চলবে ইনশাআল্লাহ)