রবিউল আখির-জুমাদাল উলা ১৪৪৮   ||   অক্টোবর ২০২৬

গাজার ধ্বংসস্তূপও প্রতিশোধ নিচ্ছে

ওয়াসআতুল্লাহ খান

যেমন কর্ম, তেমন ফল। ভালো কাজের ভালো ফল, মন্দ কাজের মন্দ ফল। প্রতিবেশীর ঘরে লাগা আগুন আশপাশেও ছড়ায়। এগুলো শুধু বই-পুস্তকের অন্তঃসারশূন্য কিছু প্রবাদ-প্রবচন নয়। শত সহস্র বছর থেকে চলে আসা মানব অভিজ্ঞতার সারকথা। চারপাশে ভালো করে তাকালে এক একটি প্রবাদ-প্রবচন পেঁয়াজের খোসার মতো খুলে যাবে।

ইসরাইল বস্তুত গাজাকে একেবারেই ধ্বংস করে ফেলেছে। ধ্বংসস্তূপের পাহাড়, এর নিচে চাপা পড়া হাজার হাজার মানুষের মরদেহ ও লক্ষ লক্ষ জীবন্ত লাশ। কিন্তু এরপরও ইসরাইল এতটাই ভীত যে, সীমান্তের ওপারে কোনো শিশু ঘুড়ি ওড়ালেও বোমা হামলার নির্দেশ দেওয়া হয়। কে জানে, এসব ঘুড়ির আড়ালেও কোনো ষড়যন্ত্র আছে কি না!

কিন্তু গাজা থেকে ইসরাইলের দিকে বর্তমানে যে জিনিসটি ধীরে ধীরে অগ্রসর হতে চলেছে এবং কোনো হাতিয়ার দিয়েও যা প্রতিহত করা সম্ভব নয়, তা হল আবর্জনা ও ধ্বংসস্তূপ।

গাজা ও ইসরাইল একে অপরের সাথে সংযুক্ত ভূ-মধ্যসাগরের তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এক অঞ্চল। অর্থাৎ এখানকার তীরবর্তী অঞ্চল, আবহাওয়া ও ভূগর্ভস্থ প্রাকৃতিক পানির উৎসগুলো পরস্পর যুক্ত। গাজার বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্যসেবা ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা একেবারে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ফলে দৈনিক প্রায় এক লক্ষ বর্গমিটার আবর্জনা ও ময়লা-বর্জ্য সরাসরি সমুদ্রে গিয়ে পড়ছে।

আর ভূ-মধ্যসাগরের তীরবর্তী এসব অঞ্চলের বাতাস সাধারণত উত্তর-দক্ষিণে প্রবাহিত হয়। ফলে এসব ময়লা-বর্জ্য গাজা থেকে ইসরাইলের দিকেই বয়ে চলেছে।

পরিস্থিতি এত ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে যে, গাজা থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে ইসরাইলের উপকূলীয় শহর আসকালানের পানি শোধনাগারটি প্লান্টের ফিল্টার পাইপ পরিষ্কার করার জন্য বারবার বন্ধ করতে হচ্ছে। কারণ ব্যাকটেরিয়াযুক্ত বিষাক্ত পানি ও কাদা পানি প্লান্টটির জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। এসব কাদা ও ময়লা-বর্জ্য উপকূলের বিভিন্ন অংশে পৃথক অঞ্চল তৈরি করে নিয়েছে। যেখানে মাছও বাঁচতে পারছে না। আর এসব অঞ্চলের বাইরের মাছগুলোর প্রাকৃতিক খাদ্যও দূষণ থেকে নিরাপদ নয়। ফলে মানুষের খাদ্য হিসেবে এসব মাছের ব্যবহারও ঝুঁকি থেকে মুক্ত নয়।

ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়া দূষণ তেল আবিব ও হাইফার উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতেও ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে। এমনকি ভূ-গর্ভস্থ পানিতেও তা ছড়িয়ে পড়ছে। সময়ের সাথে সাথে এসব দূষণ ও বিষাক্ত পদার্থ লবণাক্ত হয়ে ভূ-গর্ভস্থ প্রাকৃতিক পানির উৎসে এত ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে যে, চাষাবাদ ও মানুষের বিভিন্ন প্রয়োজনে এসব পানির ব্যবহার স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গাজায় বর্তমানে প্রায় ৬ কোটি টনের বেশি দালানকোঠার ধ্বংসস্তূপ পড়ে আছে। দৈনিক প্রায় ১০০টি ইসরাইলী ট্রাক এসব আবর্জনা ইসরাইল ও অধিকৃত পশ্চিম তীরের নির্জন স্থানে ফেলছে।

এগুলো কোনো সাধারণ বর্জ্য নয়। এতে আছে সীসা, পারদ, কেডমিয়াম, পরিত্যক্ত গোলাবারুদ, লক্ষ লক্ষ গুলির খালি খোসা, অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ, সাদা ফসফরাস, শিল্প কারখানার বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ, ধ্বংস হওয়া ভবন থেকে উড়ে আসা অ্যাসবেসটস-এর টুকরা ও বিভিন্ন ধাতু এবং মৃত মানুষ ও পশুপাখির মরদেহের সাথে মিশে থাকা ধুলা ও মাটি। মোটকথা, পরিবেশ ও মানুষের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে, এমন সব উপাদানই এসব ময়লা-আবর্জনায় আছে।

এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ ময়লা-বর্জ্য অপসারণের সময়ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিধি কঠোরভাবে পালন করা আবশ্যক। তাছাড়া এটিও সকলের জানা উচিত যে, এসব ময়লা বর্জ্য এক স্থান থেকে অন্য স্থানে কীভাবে সরানো হচ্ছে এবং কোথায় ও কীভাবে ফেলা হচ্ছে! আর সেসব অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের পরিমাণ ও ময়লা-বর্জ্য থেকে ছড়ানো স্বাস্থ্যগত বিভিন্ন সমস্যা থেকে তাদের কীভাবে সুরক্ষা দেওয়া হবে ইত্যাদি।

বর্র্জ্য অপসারণের অজুহাতে ইসরাইলের বুলডোজারগুলো ফিলিস্তিনীদের গণকবরের চিহ্নগুলোও ধ্বংস করে ফেলছে। যেন ভবিষ্যতে কোনো আইনি সহায়তা লাভের মৌলিক কোনো প্রমাণই আর অবশিষ্ট না থাকে।

উদ্বেগের বিষয় হল, এ ধরনের ময়লা-বর্জ্য সরানোর সময় নিরাপত্তাবিধি যথাযথ পালন করা না হলে বর্জ্য উত্তোলন, বহন ও ফেলার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিরাই সবার আগে আক্রান্ত হবে। আমাদের জানা নেই, গাজার ফিলিস্তিনী নাগরিক কিংবা বন্দিদেরকে এসবের কোন্ কোন্ কাজে জোরপূর্বক ব্যবহার করা হচ্ছে।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গাজার কিছু ময়লা-বর্জ্য দক্ষিণ ইসরাইলের মরু অঞ্চল আর বেশিরভাগ বর্জ্য অধিকৃত পশ্চিম তীরের বিভিন্ন স্থানে ফেলা হচ্ছে। এর পেছনেও এমন দুষ্ট চক্রান্ত থাকতে পারে যে, বর্জ্যরে সরাসরি প্রভাবে যদি ফিলিস্তিনীদের বসতিগুলো স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ে তবে তাও ভালো! কারণ ইসরাইলীরা তো ফিলিস্তিনীদেরকে পুরোপুরি মানুষই মনে করে না।

পশ্চিম তীরে বর্তমানে ৭ লক্ষ ইহুদীর বাস। আর লক্ষাধিক ইহুদীর বসতি স্থাপনের কাজও চলমান রয়েছে। জোরপূর্বক অধিকৃত এসব বসতির অধিবাসীদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তার জন্য হাজার লক্ষ সতর্কতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও পানি, বাতাস ও মাটির দূষণ তো ইহুদী, মুসলমান কিংবা খ্রিস্টানের মাঝে পার্থক্য করতে জানে না।

আন্তর্জাতিক কনভেনশন (চুক্তি) অনুযায়ী, অধিকৃত অঞ্চলগুলোতে জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও অধিগ্রহণকারীর আইনি দায়িত্ব। আজ থেকে ৩৬ বছর আগে টিডি কোলিক অধিকৃত জেরুজালেমের মেয়র ছিল। কয়েক বছর পর সে স্বীকার করেছে, আমরা ফিলিস্তিনী সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব জেরুজালেমে বিশুদ্ধ পানি বিতরণ ও পয়ঃনিষ্কাশনের জন্য কিছু সংযোগ স্থাপন করা ছাড়া আর বড় কোনো উন্নয়নকাজ করিনি। আর এই উন্নয়নও ফিলিস্তিনী জনগণের স্বার্থে করা হয়নি; বরং তা এজন্য করা হয়েছিল, যেন দূষিত পানির কারণে ভবিষ্যতে পূর্ব জেরুজালেমে কোনো মহামারি ছড়িয়ে পড়লে পশ্চিম জেরুজালেমের ইহুদীরা এতে আক্রান্ত হয়ে না পড়ে।

এহেন মানসিকতা পোষণকারী জাতি ও নেতৃবৃন্দরা এটাও জানে না যে, পৃথিবীতে তাদের প্রতি মানুষের ঘৃণা  ক্রমেই বাড়ছে কেন?

ভাষান্তর : মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ফাহাদ

 

 

advertisement