রবিউস সানী-১৪৩২   ||   মার্চ-২০১১

দেনমহর ও একটি খবর

আবু তাশরীফ

কয়েক বছর ধরে এদেশে নারী নির্যাতন ও হয়রানির ঘটনা ঘটছে বেশি মাত্রায়। প্রায় প্রতিদিনের সংবাদপত্রে নারীর প্রতি সহিংসতার খবর পাওয়া যাচ্ছে। দিন দিন এর মাত্রা ও পরিমাণ যেন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। ইভটিজিং নামের একটি শব্দ নারীকে উত্তক্তকরণ এর অর্থে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে। সম্প্রতি অবশ্য হাইকোর্ট থেকে দেওয়া এক নির্দেশনায় ইভটিজিং এর পরিবর্তে যৌনহয়রানি শব্দটি ব্যবহার করতে বলা হয়েছে। সবকিছু দেখেশুনে মনে হচ্ছিল, এদেশে নারীদের জন্য একটি অংশের জন্য চরম দুঃসময় যাচ্ছে। নারীর অধিকার ও নিরাপত্তার অনুকূল পরিবেশটাই শেষ হয়ে যাচ্ছে। এরকম একটি সময়ে গত ২৭ জানুয়ারি ঢাকার একটি দৈনিক পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠার প্রথম কলামে ছাপা হওয়া একটি খবর বেশ আশার সৃষ্টি করেছে। শোভন ও উচিত নয়-এ রকম কিছু কিছু ওই খবরে থাকলেও খবরের মূল বিষয়টি ছিল আকর্ষণীয় ও প্রশংনীয়।

খবরের শিরোনামটি ছিল দেনমোহর মেলা। ওই খবরের প্রথম লাইনটি হচ্ছে-দেনমোহর পরিশোধ করি, যৌতুক পরিহার করি শ্লোগান নিয়ে কুড়িগ্রামের উলিপুরে গতকাল (২৬ জানুয়ারি, বুধবার) দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়েছে দেনমোহর পরিশোধ মেলা। এতে বলা হয়েছে- ৫৪৮ জন ব্যক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে স্ত্রীর দেনমোহর মোট তিন কোটি ১৮ লাখ টাকা পরিশোধ করেন। স্থানীয় একটি সমিতির উদ্যোগে এ মেলাটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে উলিপুরের ইউএন ও ওসি এবং অধিকার নামক সংস্থার স্থানীয় এক কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। মেলা উপলক্ষে সেখানে বিভিন্ন পণ্যের ১৬টি স্টলও ছিল।

মেলা করে দেনমোহর পরিশোধ করার হয়তো কোনোই প্রয়োজন ছিল না। স্বামী ও স্ত্রীর নিজস্ব লেনদেনের বিষয়। ব্যক্তিগত উদ্যোগে ব্যক্তিগত পর্যায়েই এটা পরিশোধের কথা।

তারপরও এ ধরনের অনুষ্ঠানের উপলক্ষ সম্ভবত ঘটেছে এজন্যই যে, এদেশে দেনমোহর স্ত্রীকে পরিশোধ না করাই নিয়মে পরিণত হয়ে গেছে। দেনমোহর হচ্ছে বিবাহিত নারীর শরীয়ত নির্ধারিত আর্থিক অধিকার, যা তার স্বামীর ওপর তাকে পরিশোধ করা কর্তব্য। কিন্তু রেওয়াজ এখন এমনই যে, বিয়ের সময় মোটা অংকের মহর ধার্য্য হয়, বিয়ের পর স্বামী স্ত্রীর কাছে ক্ষমা চায়, অপারগতার কারণে স্ত্রী মৌখিক মার্জনা করে দেয়। মহরের এ টাকা স্বামী আর স্ত্রীকে দেয় না। স্ত্রীর একটি আর্থিক প্রাপ্তি ও অধিকার এভাবেই বিস্মরণে হারিয়ে যায়। মহর যে স্ত্রীর পাওনা, এ সত্যটাই স্বামীরা এক সময় ভুলে যায়। এ জন্য একটি এলাকার বহু মানুষের মহর আদায়ের ঘটনা একটা অনুষ্ঠান ও মেলায় পরিণত করার সুযোগ করে দিয়েছে আয়োজকদের। এতো  রাখঢাক ও সঙ্গীত-নাটিকাও অনুষ্ঠান না করে এজন্য সুন্দর দ্বীনী মজলিস হলে এতে আরো বহু ফায়েদা হত। কারণ মহর আদায়ের ঘটনা হচ্ছে শরীয়তের একটি দাবি পরিশোধের ঘটনা। মহর আদায়ে রাষ্ট্রীয় আইনের চেয়ে শরয়ী নির্দেশনার জোর ও শরীয়ত নির্দেশিত মানবিক প্রেরণার প্রাবল্যই বড়।

মহরের অর্থ হতে পাওয়া যেমন অধিকার তেমনি বিয়েতে কোনো যৌতুক না থাকা এবং শরীয়াসম্মত উত্তরাধিকারের সম্পত্তি পাওয়াও নারীর অধিকার। নারীর এসব শরয়ী অধিকার তার হাতে পৌঁছানোর জন্য এ বিষয়ে দায়িত্বশীল প্রত্যেকের মনোযোগী হওয়া দরকার। এ ব্যাপারে ব্যক্তিগত উপলব্ধি ও সামাজিক জাগরণ খুবই জরুরি। এ কাজটি দ্বীনদার ও শরীয়তের প্রতি অনুরক্ত ও প্রতিপালনকারীদের হাতে হওয়ার মধ্যেই কল্যাণ নিহীত বেশি। 

 

advertisement