রবিউস সানী-১৪৩২   ||   মার্চ-২০১১

তিনি নেই, তবে তিনি থাকবেন

মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক

 

হিদায়াতের কত বাতি ছিল যারা কুরআন-সুন্নাহর আলো জ্বেলে রেখেছিল। আরদুল ওয়াহি থেকে বহু দূরের এই দেশ সেই আলোতেই তো আলোকিত ছিল। চারদিকে নূর ও নূরানিয়্যাত ছিল। তাদের সোহবতেই তো মানুষের দিলের জাহান আবাদ ছিল। নূর ও নূরানিয়াতে পূর্ণ ছিল। কিন্তু তকদীরের ফায়সালা! আজালের ঝাপটা আসে, একটি করে বাতি নিভে যায়, আর অন্ধকার আরো ঘনীভূত হয়। তেমনি একটি নিভে যাওয়া বাতির কথা লিখতে বসেছি আজ। এই তো দুদিন আগেও ঘোর অন্ধকারে এ বাতি আমাদের আলো দিয়ে যাচ্ছিল। আমরা পথ দেখতে পাচ্ছিলাম। হঠাৎ নিভে গেল ঘোর অন্ধকারে আমাদের দিশেহারা করে। তিনি আলো লাভ করেছিলেন আগের বাতি থেকে, আগামী দিনের বাতিগুলো এই নিভে যাওয়া বাতি থেকে কতটা আলো লাভ করেছে তা তো সময় থেকেই জানা যাবে। আমি এখানে শুধু বাতি থেকে বাতির আলোর গ্রহণের ধারাটুকু উল্লেখ করতে চাই।

পাকভারতে উপমহাদেশে ইলম ও হিদায়াতের অঙ্গনে এই নিকট অতীতেও অসংখ্য বাতি উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বল আলো দান করছিল। অনেক আলোর মাঝেও যে বাতির আলোটি বিশেষভাবে প্রোজ্জ্বল ছিল তিনি হলেন ফকীহুন-নাফস হযরত মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী রাহ. (১২৪৪-১৩২৩ হি.)। এই প্রদীপ্ত প্রোজ্জ্বল বাতির আলো থেকে আলো গ্রহণ করেছেন এবং বিভিন্ন জনপদে অন্ধকার মানুষের মাঝে আলো বিতরণ করেছেন কত বাতি, কত প্রদীপ, তার হিসাব আছে শুধু মহাকালের কাছে। আমাদের সৌভাগ্য এই যে, এ অঞ্চলেও ছিল কয়েকটি প্রদীপ্ত বাতি। তাদেরই একজন চট্টগ্রামের গৌরব হযরত মাওলানা যমীরুদ্দীন ছাহেব রাহ. (১২৯৬-১৩৫৯ হি.)। তিনি ছিলেন বহুমুখী আত্মিক ও বাহ্যিক গুণের এক বিরল ব্যক্তি। তাঁর আলোক-সান্নিধ্য থেকে আলো লাভকারী অনেক বাতির বিশিষ্ট একটি হলেন হযরত মাওলানা মুফতী আযীযুল হক ছাহেব রাহ. (১৩৮০ হি.)। বস্ত্তত জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বিনয়, ধর্ম-ভীরুতা, রুচি ও বুদ্ধির বিশুদ্ধতা ইত্যাদি যাবতীয় গুণের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন যুগের অনন্য পুরুষ। আবার বাতি থেকে অনেক বাতি আলো লাভ করল। তবে সবার মাঝে সবচে প্রোজ্জ্বল হলেন হযরত মাওলানা সুলতান আহমদ নানুপুরী রাহ. (মৃত্যু : ১৪১৮ হি.)। এ মহান আধ্যাত্মিক পুরুষের ফানাইয়্যাত ও আত্মবিলীনতা, তাঁর জাযব ও আকর্ষকতা এবং তাঁর কালবানিয়্যাতের জামাল ও সৌন্দর্য কোন সুউচ্চ স্তরের ছিল তা যারা অনুধাবন করেছেন তাদের অনেকে এখনো বেঁচে আছেন। এই মহান সাধকপুরুষ তাঁর প্রাণপ্রিয় প্রতিষ্ঠান জামিয়া ওবায়দিয়া নানুপুর-এর দায়িত্বভার অর্পণ এবং সুলূক ও আধ্যাত্মিকতার ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য যে ভাগ্যবান ব্যক্তিটিকে নির্বাচিত করেছিলেন তিনি হলেন আমাদের প্রিয় মুরববী হযরত মাওলানা যমীরুদ্দীন (পীর ছাহেব নানুপুর রাহ.)। তিনি ছিলেন এক নীরব সাধক। মহান পূর্ববর্তীর কাছ থেকে প্রাপ্ত মহান দায়িত্বের প্রতি পূর্ণ আত্মনিবেদিত অবস্থায় এ ক্ষণস্থায়ী জীবন তিনি অতিবাহিত করেছেন। ইলমের পিপাসুদের মধ্যে নবুওয়তের মীরাছ বণ্টন করেছেন, যাদের মধ্যে পিপাসা সৃষ্টি করেছেন এবং পিপাসার জল সরবরাহ করেছেন, উত্তপ্ত হৃদয় দ্বারা বহু হৃদয় উত্তপ্ত করেছেন, আর যারা জানত না কীভাবে কাঁদতে হয়, নিজের কান্না দিয়ে তাদের তিনি কান্নার সৌন্দর্য শিখিয়েছেন, অসংখ্য মানুষের হৃদয় ও আত্মাকে ঈমান ও মারিফাত এবং বিশ্বাস ও অন্তর্জ্ঞানের আলোতে আলোকিত করেছেন। এভাবেই পার হয়েছে তাঁর জীবনের সকাল-সন্ধ্যা এবং যিন্দেগীর ছুবহ-শাম।

বাতির আলো উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বল হয়ে দূর থেকে আরো বিস্তার লাভ করে চলেছিল, ঠিক তখন আবার তকদীর নাযিল হল, আজলের ঝাঁপটায় এ বাতিটিও নিভে গেল। এই নিভে যাওয়া তো আমাদের দিক থেকে। তাঁর দিক থেকে হলে বলব, মাওলার ডাকে লাববাইক বলে, দুই ঠোঁটে সারা জীবনের আল্লাহ, আল্লাহ যিকিরের সজীবতা নিয়ে মাওলার কাছে চলে গেলেন। আমাদের জন্য হল-

انا لله وان انا لله وانا اليه رجعون

আর তাঁর জন্য হল-

ارجعى الى ربك راضية مرضية

(মৃত্যুর তারিখ, পয়লা রবিউল আওয়াল ১৪৩২ হি., ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১১ ঈ., রোয শনিবার দিবাগত রাত প্রায় এগারটার) ইনতিকালের রাতে এশার পরে তিনি তালিবানে ইলমের উদ্দেশ্যে বয়ান করেছেন, এমন আদনা কামও করবে না, যার কারণে মন্দ মওত হতে পারে, আবার এমন আদনা কামও তরক করবে না যার দ্বারা উত্তম মওত নছীব হতে পারে।

বয়ান ও দুআর পর কামরায় এসে রাতের উপস্থিত খাবার গ্রহণ করলেন এবং কিছুক্ষণ পর রাতের শয্যাগ্রহণ করলেন। হঠাৎ অস্থিরতা অনুভূত হল। নিজেই অযু-তাহারাত হাছিল করলেন। যিকরুল্লাহ জারি ছিল, জারি থাকল। এ্যম্বুলেন্স আনতে নিষেধ করে বললেন, দরকার নেই। এর পর দশ মিনিটেরও কম সময়ে রওয়ানা হয়ে গেলেন এবং পৌঁছে গেলেন। রাহিমাহুল্লাহু রাহমাতান ওয়াসিআতান।

প্রায় প্রত্যেক দুআতে তিনি মন্দ মওত থেকে পানাহ চাইতেন। আর তা এমনই কবুল হল যে, বড় ঈর্ষণীয় মৃত্যু সবাই দেখতে পেল, যা দেখতে পাওয়াও বড় সৌভাগ্যের। (চাঁদ হিসেবে) তাঁর জীবনের পরিধি ছিয়াত্তর বছরের বেশি নয়, কিন্তু মাশাআল্লাহ কর্মে ও কীর্তিতে এবং দানে ও অবদানে তা ছিল সুসমৃদ্ধ ও প্রাচুর্যপূর্ণ, যেমন তালিম-তারবিয়াতে তেমনি ওয়াজ ও ইরশাদে, আর তেমনি মুনাজাতে-ইবাদতে। যদিও আল্লাহর বান্দাদের ইসলাহ ও সংশোধন এবং তাদের কল্যাণসাধন ছিল তাঁর জীবনের প্রধান চিন্তা, তবে আউলিয়ায়ে সালাফের মত তাঁরও আত্মার প্রশান্তি ছিল দুআ-মুনাজাত এবং শেষ রাতের আহাজারি ও রোনাযারি। বস্ত্তত এটা ছিল স্বভাব ও আত্মার চাহিদা, তার রূহের গিযা ও দিলের খোরাক। তবে ইসলাহে খালক-এর দায়িত্ব সম্পর্কে ছিলেন পূর্ণ সজাগ ও সদাপ্রস্ত্তত। দিলে উম্মতের দরদ ছিল বে-পানাহ। কেউ যখন দেখে না তখন কাঁদতেন, আর যখন কাউকে কাছে পেতেন মায়া দিয়ে, দরদ দিয়ে বলতেন, এই পথে চল, ঐ পথে চলো না। এতটা অস্থিরতা ছিল দিন-রাত, বান্দা কীভাবে মাওলার সঙ্গে জুড়ে যায়, কীভাবে নবীওয়ালা যিন্দেগী হাছিল হয়ে যায়, আর আখেরাতে খোশনছীব হয়ে যায়।

শেষ সময়ে এ অস্থিরতায় বে-চায়ন ছিলেন যে, তরুণ আলিমগণ কীভাবে নিজেরা আহলে দিল হবেন, তারপর তালিবানের জন্য সাচ্চা রাহনুমা ও পথপ্রদর্শক হবেন। তিনি বলতেন, এখন আসল দুর্ভিক্ষ হচ্ছে কলব-রূহের উপর মেহনতকারী মানুষের। তাই তোমরা খালওয়াত ও নির্জনতা গ্রহণ করো এবং নিজেদের তৈয়ার করো। ছদর ছাহেব, হাফেজ্জি হুজুর, পীরজী হুজুর, তাঁদের নমুনা যিন্দা করো। তাঁদের মেহনতের সিলসিলা জারি রেখো।

যিকির ও দুআর প্রাচুর্য এবং ইনাবাত ও আত্মনিবেদন, এগুলোই ছিল তাঁর পরিচয়-বৈশিষ্ট্য। মুনাজাতের নিবিষ্টতা ও নিমগ্নতা ছিল তাঁর সমকালে তুলনাহীন। রোনাযারি ও আহাযারি ছিল এমন যে, নির্জীব হৃদয়ও যেন সজীব এবং মুরদা দিলও যেন যিন্দা হয়ে ওঠে। সালিকীনের তাযকিয়া ও তারবিয়াত দুআ-যিকির দ্বারা শুরু করাকেই তিনি উপকারী মনে করতেন। এটা শুধু এবং শুধু আল্লাহর তাআলার ফযল ও করম যে, কয়েকবার কিছু সময় এ অধম লেখকের সৌভাগ্য হয়েছিল তাঁর মজলিসে মারিফাত-এর কাছাকাছি উঁকিঝুঁকি করার। সেই মজলিসের খায়র ও কল্যাণ যদি এখানে তুলে ধরতে যাই, বড় এক লেখা হয়ে যাবে, যা নিকটতম কোনো সুযোগে করার নিয়ত আছে ইনশাআল্লাহ। এখন তো শুধু উদ্দেশ্য হযরত মরহুম, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সম্পর্কীদের জন্য দুআর আবেদন জানানো। হাদীস শরীফে এসেছে- আদমের বেটা যখন মারা যায়, তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে যদি ছাদাকা-জারিয়া রেখে যায় বা এমন ইলম রেখে যায়, যা দ্বারা উপকার হয়, কিংবা নেক সন্তান রেখে যায়, যে তার জন্য দুআ করে (সেগুলো বন্ধ হয় না)।

আলহামদুলিল্লাহ উপরোক্ত তিন পথেই আমলের সিলসিলা জারি থাকার ব্যবস্থা হযরত মরহুম করে গিয়েছেন, যা ইনশাআল্লাহ তা-কিয়ামত অব্যাহত থাকবে। দুনিয়াতে কেউ থাকার জন্য আসে না, যাওয়ার জন্যই আসে। এখানে আগমন আসলে নির্গমনেরই প্রারম্ভ। তবে কারো নির্গমন হয় কোনো প্রস্ত্ততি ছাড়া, কারো হয় অর্ধপ্রস্ত্ততির উপর, কারো প্রস্ত্ততি সীমাবদ্ধ শুধু নিজের পর্যন্ত, আর আল্লাহর ভাগ্যবান বান্দারা তো মাশাআল্লাহ এমনই প্রস্ত্ততি গ্রহণ করেন যে, আল্লাহর ইচ্ছায়, শত শত নয়, হাজারো, লাখো বান্দার নাজাত ও বুলন্দ দারাজাত-এর জন্যও যথেষ্ট হয়। শুধু তাই নয়, তাঁরা তাঁদের পিছনে এত বিপুল কর্ম ও কীর্তি রেখে যান যে, মৃত্যুর পরও তাদের ফায়য ও ফায়যান জারি থাকে। তাঁরাই হলেন মরণেও অমর।

আমাদের হযরত মরহুম হলেন সেই রকম একজন অমর (ইনশাআল্লাহ)। তাঁর জড়-অস্তিত্ব তো এখন আর নেই, কিন্তু কর্মে ও কীর্তিতে এবং জাগতিক ও আধ্যাত্মিক সাদাকাতে জারিয়ার মাধ্যমে তিনি জীবন্ত থাকবেন, কিয়ামত পর্যন্ত মানুষ তাঁর দ্বারা উপকৃত হতে থাকবেন এবং তাঁর আমলনামা ওযনদার হতে থাকবে, আল্লাহর রহমতের ভরসায় একথা বলা যায়।

উম্মতের দরদে, মৃত্যুর চিন্তায় আরামের ঘুম জীবনে তার নছীব হয়নি। হে আল্লাহ, কবরে তা-কেয়ামত সেই আরামের ঘুম যেন তাঁর নছীব হয়। আমীন।

اللهم لا تحرمنا أجره ولا تفتنا بعده وأكرم

اللهم لا تحرمنا أجره ولا تفتنا بعده وأكرم نزلا ووسع مدخله آمين يا رب العالمين، وصلى الله تعالى على سيدنا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين, والحمد لله رب العالمين.

 

 

 

advertisement