রবিউল আখির ১৪৪৫   ||   নভেম্বর ২০২৩

‘এরা এমন এক কালসাপ, যার বিষদাঁত এখনই উপড়ে ফেলা না হলে অন্যান্য মুসলিম ভূখণ্ডেও ছোবল বসাবে’

হযরত মাওলানা মুফতি তকী উছমানী

শ্রদ্ধেয় ভাই ও বন্ধুগণ! বর্তমানে ফিলিস্তিনের মুসলমানগণ যে বিভীষিকাময় সময় পার করছেন তাতে বিশ্বের মুসলমানগণ অস্থির হয়ে আছেন। গাজা উপত্যকায় পৈশাচিকভাবে বোম্বিং করা হচ্ছে। (বর্তমান তথ্য অনুসারে) তিন হাজারের বেশি মুসলিমকে শহীদ করা হয়েছে এবং তাদের বাড়ি-ঘর ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালের ওপর বোমা বর্ষণ করা হচ্ছে। আহতদের ওপর হামলা করা হচ্ছে। বিপুল সংখ্যক নারী-শিশু এই পাশবিক নির্মমতার শিকার। গাজা সিটির বড় অংশ মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। মুসলিম জনপদের ধ্বংসলীলা আর নিষ্পাপ শিশুদের লাশের মিছিল দেখে মুসলমানরা এখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছে। বিশ্বশক্তি যারা নিজেদেরকে মানবাধিকার সুরক্ষার ঠিকাদার ঘোষণা করে, তারা কেবল মুখে কুলুপ এঁটে তামাশা দেখছে, তাই নয়; বরং জালিমদের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রকাশ্যে নির্লজ্জভাবে অবতীর্ণ হয়েছে।

এ মুহূর্তে আমি দুয়েকটি কথা আরজ করতে চাচ্ছি-

হামাস কেন হামলা করতে গেল?

প্রথম কথা হচ্ছে, ইসরাইলের একটি অপপ্রচার, যা গোটা দুনিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে অনেক সরকার যারা নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখতে চায় তারাও ভুল বোঝাবুঝির মধ্যে রয়েছে। কখনো কখনো এমন প্রশ্ন মুসলমানদের মাথায়ও ঘুরপাক খেতে থাকে, হামাসের কী প্রয়োজন ছিল এ মুহূর্তে ইসরাইলের প্রতি রকেট ছুঁড়ে এমন একটি যুদ্ধ ডেকে আনার? অথচ তাদের খুব ভালোভাবেই জানা আছে, ইসরাইল তাদের তুলনায় বহু গুণ শক্তিশালী। এটাও জানা ছিল, ওদের পেছনে আমেরিকা আছে, ব্রিটেন আছে। তো এমন পরিস্থিতিতে কয়েকটি রকেট ছুঁড়ে কীভাবে তারা তা সামাল দেবে! এজন্য কেউ কেউ বলছেন, এর মাধ্যমে হামাস আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। এটা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এ মুহূর্তে যখন হামাসের কাছে অত্যাধুনিক শক্তি নেই, আকাশ পথে যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ নেই, তাদের সাথে ব্রিটিশ-আমেরিকা নেই, এমন পরিস্থিতিতে ওদেরকে উসকে দেওয়া তো আত্মহত্যার নামান্তর। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ইসরাইল নিজে কোনো শক্তি রাখে না। ওকে শক্তি সরবরাহ করে করে টিকিয়ে রাখা হয়েছে আরববিশ্বের মাঝখানে। উদ্দেশ্য কেবল ফিলিস্তিন বধ করা নয়; বরং এর মাধ্যমে আরব ভূখণ্ডে, বরং পুরো মুসলিমবিশ্বের মাঝে একটি অদম্য বিরোধী শক্তি জিইয়ে রাখা। 

আমি গত জুমায় আলোচনা করেছিলাম, ১৯৪৭ সনে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হয় আর ১৯৪৮ সনে ইসরাইলী শাসনের ঘোষণা আসে। হাজারো মানুষের রক্ত প্রবাহিত করে, মুসলমানদের জবাই করে, তাদেরকে ভিটেবাড়ি থেকে উৎখাত করে ১৯৪৮ সনে তা প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন কায়েদে আজম মোহাম্মাদ আলী জিন্নাহ বলেছিলেন, এটা হল পশ্চিমা শক্তির জারজ সন্তান। একদিকে পাকিস্তান ইসলামী শক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করছিল, ওই সময়েই মুসলিমবিশ্বের মাঝে একটি বিষফোঁড়া রেখে দিল, যার নাম ইসরাইল। এরপর বিভিন্নভাবে ফুসলে ফাসলে মুসলিম দেশগুলোকে এ কথায় রাজি করে ফেলল যে, ইসরাইলকে একটি ইহুদী রাষ্ট্র হিসেবে মেনে নিন। কোনো কোনো দেশ চাপে পড়ে ওদেরকে মেনেও নিল। এভাবে মিশর, জর্ডান প্রভৃতি দেশগুলো ওদের স্বীকৃতি দিয়ে দেয়।

পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ে এসেছে, এর স্বীকৃতি আদায় করতে মুসলমানদের কেন্দ্রভূমি সৌদি আরবের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পাঁয়তারা চলছে। সৌদি আরব যদি একবার ইসরাইলকে মেনে নেয় তখন অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোর জন্য ইসরাইলকে মেনে না নেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। এজন্য এই ষড়যন্ত্র করা হচ্ছিল, যেন সকল মুসলিম দেশ একচেটিয়াভাবে ওদের মেনে নেয়।

হামাস ওদের ওপর অতর্কিত হামলে পড়েছে, এমন নয়। ইতিহাস সাক্ষী, ইসরাইল এখানে ঘাঁটি গেড়ে বসার পর ফিলিস্তিনীদের ওপর যে নির্মম অন্যায় অত্যাচার অবিচার করেছে সচেতন ব্যক্তি মাত্রই তা জানেন। কিছুদিন যেতে না যেতেই ফিলিস্তিনের কোথাও না কোথাও মুসলমানদের জবাই করত। হামাস হয়ত চিন্তা করেছে, -আল্লাহ্ই ভালো জানেন- একবার যদি মুসলিম দুনিয়া এদের স্বীকৃতি দিয়ে দেয়, তাহলে পৃথিবীতে এমন একটি অপশক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে, যা কেবল ফিলিস্তিন নয়, তাদের যে গ্রেটার ইসরাইলের পরিকল্পনা রয়েছে, সেটা তারা বাস্তবায়ন করে ফেলবে। এজন্য তারা চিন্তা করলেন, এ সময়ে যদি কার্যকরী কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, তাহলে বিভিন্ন মুসলিম দেশের সাথে তাদের যে সখ্য দেখা যাচ্ছে অন্তত তা বাধাপ্রাপ্ত হবে। বাস্তবেও তাই হয়েছে। আলহামদু লিল্লাহ, তাদের এই পদক্ষেপের কারণে মুসলমানদের মাঝে কিছুটা চৈতন্য এসেছে। আর সেই যে অবৈধ সম্পর্কতৈরি হতে যাচ্ছিল, তা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

তারা চিন্তা করলেন মরতে তো হবেই। তাহলে সম্মানের মৃত্যু কেন নয়! একজন মুসলিম মুজাহিদ কেন শাহাদাতের পথ গ্রহণ করবে না! এজন্য তারা ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছেন। তাদের এই অভিযান কিছু মানুষের বুঝে না ধরলেও, আল্লাহর রাস্তায় শাহাদাতের পেয়ালায় চুমুক দেওয়া যাদের জীবনের অভিপ্রায়, তাদের জন্য এটা উত্তম পদক্ষেপই বটে। আল্লাহ তাআলার অপার অনুগ্রহ, এর মাধ্যমে দুনিয়াব্যাপী ইসরাইলের যেই হম্বিতম্বি ছিল, সেই বেলুন ফুটো হয়ে গেছে। এমন দৃঢ়তার সাথে যদি মুজাহিদগণ যুদ্ধ চালিয়ে যান আর মুসলিম দেশগুলো তাদের দায়িত্ব পালন করে, তাহলে আল্লাহ তাআলার মেহেরবানীর ওপর ভরসা করে বলা যায়, এ যুদ্ধেই হয়তো একটা ফয়সালা হয়ে যাবে।

ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডে কি ইসরাইলের কোনো অধিকার আছে?

দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, অনেকের মনে এ প্রশ্ন, ইহুদীরা যদি একটি নিজস্ব রাজত্ব চায় আর তা যদি হয় এমন ভূখণ্ডে যেখানে তাদের ইতিহাস ও স্মৃতি রয়েছে। অর্থাৎ শামের এই ভূখণ্ড নবীদের বাসভূমি। অধিকাংশ নবী তো বনী ইসরাইল থেকেই এসেছেন। আর এরা তো বনী ইসরাইল ও তাদের বংশধর। এখন এরা যদি এ অঞ্চলে নিজস্ব রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে তাতে বাধা দেওয়ার কী আছে? এমন প্রশ্নও কারো কারো মনে উঁকি দিয়ে থাকে।

মূলত এটাও ইসরাইলের একটি  প্রোপাগান্ডা, যা তারা দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ আমরাই এ ভূখণ্ডের উত্তরাধিকারী। কাজেই আমরা এখানে শাসন করব। আমি স্পষ্ট করে দিতে চাই, বহু পূর্বে ফিলিস্তিন ভূখণ্ড বনী ইসরাইল শাসন করেছিল।  যেখানে হাজার হাজার বছরের ইতিহাসে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে বনী ইসরাইলের শাসন ছিল মাত্র কিছুকাল। এর পূর্বে ফিলিস্তিনের মূল অধিবাসীরা কেনআনী ছিল। আর কেনআনীরা এখানে এসেছিল জাযিরাতুল আরব তথা আরব উপদ্বীপ থেকে। অতএব আরবদের হাত ধরে এর সূচনা হয়। শত শত বছর তারা এখানে ছিল। এরপর হযরত মূসা আ.-এর পর হযরত সামুয়েল আ.-এর তত্ত্বাবধানে ফিলিস্তিন বিজিত হয়। এরপর বনী ইসরাইল সেখানে রাজত্ব করে। যদিও ওদের রাজত্ব অত্যন্ত ভঙ্গুর কিসিমের ছিল। ওরা ওদের নবীদের হত্যা করত। কুরআন মাজীদে সে কথা বলা আছে। আজও বাইবেলের পুরাতন নিয়মে তাদের যে ইতিহাস পাওয়া যায়, তাতেও এ কথা আছে যে, অসংখ্য নবী তারা হত্যা করেছে। সর্বশেষ যখন ওদের রাজত্ব চলে যায় তখন থেকে বহু শতাব্দী গত হয়েছে। এর মধ্যে ফিলিস্তিনে একবারের জন্যও ইহুদী রাজত্ব ছিল না। এখন এই দীর্ঘকাল পরে এসে যদি কেউ বলে, যেহেতু অতীতে আমাদের বাপ দাদারা এখানে রাজত্ব করেছিলেন, তাই এখন আমরা এখানে দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করে শাসনকার্য পরিচালিত করব। বলুন তো, এ থিউরি যদি মেনে নেওয়া হয়, তাহলে বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে! রেড ইন্ডিয়ানরা বলবে, আমেরিকায় তো আমাদের শত শত বছরের রাজত্ব ছিল। আর এ ইতিহাস বেশি পুরাতনও নয়।  তাই আমাদের কর্তব্য হচ্ছে, আমেরিকার জনগণকে সেখান থেকে বের করে দিয়ে রেড ইন্ডিয়ানদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করা। শুধু এক জায়গার কথা নয়, পুরো বিশ্বে যদি আপনি এ নীতি প্রয়োগ করেন তাহলে তো বর্তমান পৃথিবীটাই শেষ হয়ে যাবে। শত-সহস্র বছর পূর্বের লোকদের উত্তরসূরিরা এসে বসতি স্থাপন করবে আর বর্তমান অধিবাসীদের বিতাড়িত করবে- এটা কি কোনো সুস্থ বিবেক মেনে নিতে পারে?! কিন্তু এ থিউরি কেবল ইসরাইলের ক্ষেত্রেই মেনে নেওয়া হয়েছে। ইহুদীরা গোটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, রাশিয়া ইত্যাদি বিভিন্ন দেশে তারা বিক্ষিপ্তভাবে বসবাস করত। তারা সবাইকে একত্র করে এক জায়গায় আস্তানা করে দেওয়ার উদ্যোগ নিল। এর জন্যে স্থানীয় অধিবাসীদের গণহত্যা করতে হলে করবে। এ হিসাবে ১৯৪৮ সনে তারা তা সংঘটিত করে। এতে সবচে বেশি ভূমিকা রাখে ইংল্যান্ড। তাদের সাথে আমেরিকাও ছিল। এরা সবাই মিলে এই অবৈধ সন্তানের সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতা শুরু করল। এভাবে ১৯৪৮ সনে এসে ইসরাইলকে রাষ্ট্রের ঘোষণা দিল। এদিকে ইসরাইলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়ন ইসরাইল রাষ্ট্রের ঘোষণা দেয়। মাত্র দুই ঘণ্টার মাথায় আমেরিকা তাকে স্বীকৃতি দিয়ে দেয়। অথচ কুদসের পশ্চিমে অবস্থিত দেইর ইয়াসীন-এর বীভৎস গণহত্যার পর এই ঘোষণা আসে। যেখানে অসংখ্য নিরীহ ফিলিস্তিনীকে ঢালাওভাবে হত্যা করা হয় এবং তাদের বাস্তুচ্যুত করা হয়। এরপর এটা প্রতিষ্ঠিত হয়।

কাজেই এ দাবি করা যে, এখানে ইহুদীদের অধিকার রয়েছে- সম্পূর্ণ ভুল। রাজনৈতিক বিচারেই ভুল। কেননা হাজার হাজার বছর পর্যন্ত সেখানে তাদের কোনো রাজত্ব ছিল না। এ সময়ে কিছুকাল মুসলমানগণ রাজত্ব করেছেন, কিছুকাল খ্রিস্টানগণ রাজত্ব করেছেন। মুসলমানদের শাসনামলে ওদেরকে পূর্ণ নিরাপত্তা দিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। অবশ্য উসমানী খেলাফতের সুলতান আবদুল হামীদ রাহ. বলেছিলেন, আমি ওদেরকে শামে গিয়ে বসতি গড়তে দিব না। তবে খেলাফতের অধীনে তারা যেখানেই বসবাস করুক না কেন, তাদের সম্পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা ছিল। নিজেদের ধর্ম চর্চা করতে কোনো বাধা ছিল না। তাদের ওপর কোনো অত্যাচার-অবিচার হত না। শত-সহস্র বছর পরে এসে বিক্ষিপ্তভাবে বসবাস করা ইহুদীরাই এখন বলছে- এ ভূখণ্ডে আমাদের অধিকার রয়েছে। রাজনৈতিক বিচারেই এ এক অন্যায় দাবি।

রইল ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ। ধর্মীয় বিবেচনায়ও ওরা এর হকদার নয়। ওরা বলে, এখানে হযরত দাউদ আ. ও হযরত সুলাইমান আ. হায়কাল তৈরি করেছিলেন। আমরাও তা মানি। হযরত সুলাইমান আ. মসজিদে আকসা নির্মাণ করেছিলেন। হযরত দাউদ আ. ও হযরত সুলাইমান আ. তো আমাদেরও নবী। এখানে ইহুদীদের দাবি তোলার কোনো অধিকার নেই। কেননা তারা যেটাকে তাওরাত বলে কিংবা যেটাকে তারা পুরাতন নিয়ম বলে, সেখানে একথা আছে যে, হযরত সুলাইমান আ. জীবনের শেষে মুরতাদ হয়ে গিয়েছিলেন। কাফের হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি মূর্তিপূজা করতেন। (নাউযু বিল্লাহ) (দ্রষ্টব্য. বাইবেল, ১ রাজাবলি, ১১ : ৪-১০)

 কুরআন তা খণ্ডন করেছে-

وَ مَا كَفَرَ سُلَيْمٰنُ وَ لٰكِنَّ الشَّيٰطِيْنَ كَفَرُوْا ...

সুলায়মান (আলাইহিস সালাম) কোনো কুফরি করেনি। অবশ্য শয়তানগণ মানুষকে যাদু শিক্ষা দিয়ে কুফরীতে লিপ্ত হয়েছিল। -সূরা বাকারা (০২) : ১০২

তো একদিকে সুলাইমান আ.-কে কাফের মুরতাদ ও মূর্তিপূজক আখ্যা দিচ্ছে। অপরদিকে তাঁর স্থাপনার হকদার বলে দাবি করছে!

অতএব রাজনৈতিক বিচারেও তাদের কোনো অধিকার সাব্যস্ত হয় না। ধর্মীয় বিচারেও কোনো অধিকার সাব্যস্ত হয় না। কিন্তু ব্রিটিশ আমেরিকা মুসলিম বিশ্বকে বিক্ষিপ্ত করার জন্য আরবদের হৃদপিণ্ডে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে ইসরাইলকে ঘাঁটি করে দিয়েছে। সেই সময় থেকে অবিরাম ফিলিস্তিনী মুসলিমদের ওপর অত্যাচারের স্টিমরোলার চালিয়ে যাচ্ছে। যার জন্যে এ ভাইয়েরা ৩৫ বছরের দীর্ঘ প্রস্তুতির পর ইসরাইলে হামলা করছেন।

এই হামলার জবাবে ইসরাইল যে প্রচণ্ড আক্রমণ করবে, এতে অনেক নিরীহ প্রাণ ঝরবে (এবং ঝরছেও) এটা সত্যিই দুঃখজনক। তবে এরচে বড় বেদনাদায়ক হচ্ছে, যে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য হামাসের মুজাহিদীন দাঁড়িয়েছেন পুরো মুসলিম বিশ্ব এ বিষয়ে নির্লিপ্ত নির্বিকার। মৌখিক বিবৃতি তো দিয়ে দিয়েছে অনেকে। আমরাও বক্তৃতা করে যাচ্ছি। কিন্তু তাদের সহযোগিতায় কার্যকরী কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে না।

শরীয়তের বিধান হচ্ছে, কোনো মুসলিম ভূখণ্ডে অমুসলিমরা হামলা করলে ওই অঞ্চলের সকল মুসলমানের ওপর জিহাদ ফরয হয়ে যায়। নিকটবর্তিতার ভিত্তিতে। অর্থাৎ সর্বপ্রথম ওই অঞ্চলের মুসলিমদের উপর। নিকটতম    প্রতিবেশী মুসলিমদের ওপর জিহাদ ফরয হবে। যদি তারা পেরে না ওঠে, তাহলে তাদের পাশের লোকদের ওপর এ বিধান আরোপিত হবে। তারাও যদি যথেষ্ট না হয় তাহলে তার পরের অঞ্চলের লোকদের ওপর। এভাবে নিকটবর্তী রাষ্ট্রগুলোর ওপর জিহাদ ফরয হয়ে যায়।

কিন্তু সাথে সাথে এ কথাও আছে, সাধ্য ও সামর্থ্য অনুযায়ী জিহাদ ফরয হয়। যার যতটুকু সামর্থ্য ও সক্ষমতা আছে সে ততটুকু শক্তি নিয়ে জিহাদে অংশ গ্রহণ করবে। কাজেই ফিলিস্তিনবাসীর জান, মাল ও প্রতিরক্ষাসহ সার্বিক সহযোগিতায় এগিয়ে আসা গোটা মুসলিম বিশ্বের ওপর ফরয। কিন্তু এর জন্য এমন সুচিন্তিত কৌশলী পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন, যাতে তাদের উপকার হয়, ক্ষতি না হয়। এজন্য জরুরি হল, মুসলিম বিশ্ব একত্র হয়ে কোনো কর্মসূচি গ্রহণ করবে। আলহামদু লিল্লাহ, পাকিস্তানের কাছে এমন শক্তিশালী সমর বাহিনী রয়েছে, যা খুব কম দেশেরই রয়েছে। তাদের কর্তব্য হচ্ছে সেই ভাইদের সহযোগিতা করা। তবে এভাবে সহযোগিতা করবে, যাতে তাদের উপকার হয়, ক্ষতি না হয়। আর এর পদ্ধতি এই নয় যে, প্রকাশ্যে গিয়ে তাদের ওখানে পাড়ি জমাবে। বরং এর জন্য প্রয়োজন প্রজ্ঞা ও কৌশল। আমি এ মুহূর্তে এতটুকুই ইশারা করতে পারি যে, হেকমতে আমলী প্রয়োজন। আর হেকমতে আমলী প্রয়োগ করে তাদের সার্বিক সহযোগিতায় এগিয়ে আসা পাকিস্তানসহ সকল মুসলিম রাষ্ট্রের ওপর ফরয। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন।

আমি আমাদের সেনাদের ব্যাপারে যতটুকু জানি, মৌলিকভাবে তারা মুসলমান এবং তাদের মাঝে ইসলমী জযবাও রয়েছে। ফলে এমন পরিস্থিতিতে তারা বিলকুল খামোশ থাকবে, এর জন্য কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করবে না, আমার কাছে এটা অবাস্তব মনে হয়। আমি আশা করি, তারা অবশ্যই হেকমতে আমলী গ্রহণ করে থাকবেন। আল্লাহ চাহে তো এমন কিছুই হোক।

নতুবা এই মুহূর্তে যদি ইসরাইল জিতে যায়, তাহলে এ যুদ্ধ শুধু ফিলিস্তিন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে না। আশপাশের গোটা অঞ্চল ওরা কব্জা করে বসবে। এরা এমন এক কালসাপ, যার বিষদাঁত এখনই উপড়ে ফেলা না হলে অন্যান্য মুসলিম ভূখণ্ডেও ছোবল বসাবে। এজন্য পুরো মুসলিম বিশ্বকে এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, যাতে এই ফেতনা খতম হয়ে যায়। সাধারণ মুসলমানদের তো সেখানে গিয়ে সশরীরে যুদ্ধ করার সামর্থ্য নেই, যদি সেখানে যায়ও তাতেও তো কোনো ফায়দা নেই। কিন্তু যে সহযোগিতা পৌঁছান সম্ভব সেটা অন্তত করুন।

আমরাও অতি ক্ষুদ্র এক প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছি, গাজার বিপদগ্রস্ত মুসলমানদের কিছু অর্থনৈতিক সহযোগিতা করার তৎপরতা। আলহামদু লিল্লাহ, সেগুলো তাদের কাছে পৌঁছছে। তাতেও কোনো মুসলিম ভাই চাইলে অংশগ্রহণ করতে পারেন। সাথে সাথে দুআর প্রতিও খুব মনোযোগী হোন।

এভাবে যদি চিন্তা করেন- আমাদের ওপর বোমা ফেলা হচ্ছে, আমাদের সন্তানরা তাতে শহীদ হচ্ছে, আমাদের নারীদের লাশ পড়ছে, তখন আমরা কী করতাম? নিশ্চিন্তে থাকতে পারতাম?! সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতায় এগিয়ে আসুন। পাশাপাশি খুব বেশি আল্লাহমুখী হোন। বান্দার কাজ তো এটাই, সাধ্য অনুযায়ী প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে এবং আল্লাহর দিকে রুজু করবে। যাতে আল্লাহ তাআলা এই মুহূর্তে-

كَمْ مِّنْ فِئَةٍ قَلِيْلَةٍ غَلَبَتْ فِئَةً كَثِيْرَةًۢ بِاِذْنِ اللهِ.

(এমন কত ছোট দলই না রয়েছে, যারা আল্লাহর হুকুমে বড় দলের ওপর জয়যুক্ত হয়েছে!)

-এর দৃশ্য আমাদের সামনে উন্মোচন করে দেন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সেই তাওফীক দান করুন- আমীন।

 

[জুমাপূর্ব বয়ান

০৪ রবিউল আখির ১৪৪৫ হি.

মোতাবেক ২০-১০-২০২৩ ঈ.

অনুবাদ : মুহাম্মাদ আশিক বিল্লাহ তানভীর]

 

 

advertisement