রবিউল আখির ১৪৪৫   ||   নভেম্বর ২০২৩

কুরআনী নির্দেশনা
‘তোমরা ইহুদী-খ্রিস্টানকে বন্ধু বানিয়ো না’

মাওলানা মুহাম্মাদ তাওহীদুল ইসলাম তায়্যিব

কুরআন মাজীদে আল্লাহ তাআলা বলেন-

يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُوْدَ وَالنَّصٰرٰۤي اَوْلِيَآءَ ؔۘ بَعْضُهُمْ اَوْلِيَآءُ بَعْضٍ وَمَنْ يَّتَوَلَّهُمْ مِّنْكُمْ فَاِنَّهٗ مِنْهُمْ اِنَّ اللهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظّٰلِمِيْنَ.

হে মুমিনগণ! তোমরা ইহুদী ও খ্রিস্টানদেরকে বন্ধু বানিয়ো না। তারা পরস্পরে একে অন্যের বন্ধু! তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তাদেরকে বন্ধু বানাবে, সে তাদেরই মধ্যে গণ্য হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ জালিমদেরকে হেদায়েত দান করেন না। -সূরা মায়িদা (৫) : ৫১

অপরদিকে মুমিনদের উদ্দেশে বলেন-

وَالْمُؤْمِنُوْنَ وَالْمُؤْمِنٰتُ بَعْضُهُمْ اَوْلِيَآءُ بَعْضٍ يَاْمُرُوْنَ بِالْمَعْرُوْفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُقِيْمُوْنَ الصَّلٰوةَ وَيُؤْتُوْنَ الزَّكٰوةَ وَيُطِيْعُوْنَ اللهَ وَرَسُوْلَهٗ اُولٰٓىِٕكَ سَيَرْحَمُهُمُ اللهُ اِنَّ اللهَ عَزِيْزٌ حَكِيْمٌ .

মুমিন নর ও মুমিন নারী পরস্পরে একে অন্যের সহযোগী। তারা সৎকাজের আদেশ করে, অসৎ কাজে বাধা দেয়, নামায কায়েম করে, যাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে। তারা এমন লোক, যাদের প্রতি আল্লাহ নিজ রহমত বর্ষণ করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাবান। -সূরা তাওবা (৯) : ৭১

অন্যত্র ইরশাদ করেছেন-

يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا لَا تَتَّخِذُوا الْكٰفِرِيْنَ اَوْلِيَآءَ مِنْ دُوْنِ الْمُؤْمِنِيْنَ اَتُرِيْدُوْنَ اَنْ تَجْعَلُوْا لِلهِ عَلَيْكُمْ سُلْطٰنًا مُّبِيْنًا.

হে মুমিনগণ! তোমরা মুসলিমদের ছেড়ে কাফিরদেরকে বন্ধু বানিয়ো না। তোমরা কি আল্লাহর কাছে নিজেদের বিরুদ্ধে (অর্থাৎ নিজেদের শাস্তিযোগ্য হওয়া সম্পর্কে) সুস্পষ্ট প্রমাণ দাঁড় করাতে চাও? -সূরা নিসা (৪) : ১৪৪

শুধু কাফের নয়। কাফেরদের সঙ্গে যারা মিলেমিশে থাকে এবং ঈমানের উপর কুফরকে প্রাধান্য দেয়- এমন লোকদের সাথেও বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করা হয়েছে। সেই ব্যক্তি যদি নিজের বাবা কিংবা ভাই হন তবুও। ইরশাদ হয়েছে-

يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا لَا تَتَّخِذُوْۤا اٰبَآءَكُمْ وَاِخْوَانَكُمْ اَوْلِيَآءَ اِنِ اسْتَحَبُّوا الْكُفْرَ عَلَي الْاِيْمَانِ وَمَنْ يَّتَوَلَّهُمْ مِّنْكُمْ فَاُولٰٓىِٕكَ هُمُ الظّٰلِمُوْنَ.

হে মুমিনগণ! তোমাদের পিতা ও ভাইয়েরা যদি ঈমানের বিপরীতে কুফরকে পছন্দ করে, তবে তাদেরকে নিজেদের বন্ধু বানিয়ো না। তোমাদের মধ্যে যারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, তারাই জালেম। -সূরা তাওবা (৯) : ২৩

এমনিভাবে যারা মুসলমানদের ক্ষতি করার চেষ্টায় থাকে এবং মুসলমানদের ক্ষতি দেখলে খুশি হয়, তাদের সাথে বন্ধুত্ব ও ঘনিষ্ঠতা এড়িয়ে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে-

يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا لَا تَتَّخِذُوْا بِطَانَةً مِّنْ دُوْنِكُمْ لَا يَاْلُوْنَكُمْ خَبَالًا وَدُّوْا مَا عَنِتُّمْ  قَدْ بَدَتِ الْبَغْضَآءُ مِنْ اَفْوَاهِهِمْ  وَمَا تُخْفِيْ صُدُوْرُهُمْ اَكْبَرُ قَدْ بَيَّنَّا لَكُمُ الْاٰيٰتِ اِنْ كُنْتُمْ تَعْقِلُوْنَ.

হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের বাইরের কোনো ব্যক্তিকে অন্তরঙ্গ বন্ধু বানিয়ো না। তারা তোমাদের অনিষ্ট কামনায় কোনো রকম ত্রুটি করে না। তারা মনে-প্রাণে কামনা করে- তোমরা কষ্ট ভোগ কর। তাদের মুখ থেকে আক্রোশ বের হয়ে পড়ে। আর তাদের অন্তর যা-কিছু (বিদ্বেষ) গোপন রাখে, তা আরও গুরুতর। আমি আসল বৃত্তান্ত তোমাদের কাছে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দিলাম- যদি তোমরা বুদ্ধিকে কাজে লাগাও! -সূরা আলে ইমরান (৩) : ১১৮

এক আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, ইহুদী ও মুশরিকরাই মুসলমানদের সবচে কঠিন শত্রু। আল্লাহ তাআলা বলেন-

لَتَجِدَنَّ اَشَدَّ النَّاسِ عَدَاوَةً لِّلَّذِيْنَ اٰمَنُوا الْيَهُوْدَ وَالَّذِيْنَ اَشْرَكُوْا.

আপনি অবশ্যই মানুষের মধ্যে মুসলমানদের শত্রুতায় সর্বাপেক্ষা কঠোর পাবেন ইহুদীদেরকে এবং সেই সমস্ত লোককে, যারা শিরক করে। -সূরা মায়িদা (৫) : ৮২

মুসলমানদের জন্য কত বড় সৌভাগ্যের বিষয় এই যে, তাদেরকে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা নিজের বন্ধু হিসেবে ঘোষণা করেছেন। ঘোষণা করেছেন তাঁর রাসূল এবং অপরাপর মুমিনদেরও বন্ধু হিসেবে। ইরশাদ হয়েছে-

اِنَّمَا وَلِيُّكُمُ اللهُ وَرَسُوْلُهٗ وَالَّذِيْنَ اٰمَنُوا الَّذِيْنَ يُقِيْمُوْنَ الصَّلٰوةَ وَيُؤْتُوْنَ الزَّكٰوةَ وَهُمْ رٰكِعُوْنَ.

(হে মুসলিমগণ!) তোমাদের বন্ধু তো কেবল আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মুমিনগণ, যারা (আল্লাহর সামনে) বিনীত হয়ে সালাত আদায় করে ও যাকাত দেয়। -সূরা মায়িদা (৫) : ৫৫

শুধু তাই নয়। ঘোষণা করেছেন- যারা আল্লাহকে এবং তাঁর রাসূল ও মুমিনদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবে তাদের বিজয় ও সফলতা সুনিশ্চিত। ইরশাদ হয়েছে-

وَمَنْ يَّتَوَلَّ اللهَ وَرَسُوْلَهٗ وَالَّذِيْنَ اٰمَنُوْا فَاِنَّ حِزْبَ اللهِ هُمُ الْغٰلِبُوْنَ.

আর যে কেউ আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মুমিনদেরকে বন্ধু বানাবে (সে আল্লাহর দলভুক্ত হয়ে যাবে)। আর নিশ্চয় আল্লাহর দলই বিজয়ী হবে। -সূরা মায়িদা (৫) : ৫৬

এই আশ্বাস ও ভরসা পাওয়ার পর কোনো মুমিনের কী প্রয়োজন হতে পারে ইহুদী-খ্রিস্টানের সাথে বন্ধুত্ব করার! কী দরকার হতে পারে তাদের আপনত্ব কিংবা মিত্রতা লাভে আকাক্সক্ষী হওয়ার!

উপরোক্ত আয়াতদুটির ধারাবাহিকতা ছিল এই যে, কিছুসংখ্যক মুনাফিক সবসময় ইহুদী-খ্রিস্টানদের সাথে উঠাবসা করত এবং বিভিন্ন ষড়যন্ত্রেও তাদের সাথে শরীক হত। এ ব্যাপারে তাদেরকে প্রশ্ন করা হলে বলত, তাদের সাথে সম্পর্ক না রাখলে তারা আমাদেরকে সংকটে ফেলে দেবে; তখন তো আমরা মসিবতে পড়ে যাব। তারা মনে মনে ভাবত- কখনো মুসলিমগণ ইহুদী-খ্রিস্টানদের কাছে পরাস্ত হয়ে গেলে তো তাদের সাথেই আমাদেরকে চলতে হবে। [দ্র. সূরা মায়িদা (৫) : ৫২, তাফসীরে তাওযীহুল কুরআন ১/৩৭৮; তাফসীরে ইবনে কাসীর ৩/১৩২]

বর্তমান দুনিয়ার অবস্থার সাথে এই বিবরণের কী আশ্চর্য মিল!

 

 

advertisement