রবিউল আউয়াল ১৪৪৫   ||   অক্টোবর ২০২৩

রাব্বুল আলামীনের গুণ-পরিচয়
সিফাতের মর্ম অনুধাবনে বিভ্রান্তি এবং এর প্রতিকার

মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল মাজীদ

আল্লাহ তাআলার সিফাত ও গুণাবলি অতি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয়। এ ব্যাপারে অবহেলা ও অসর্তকতা মানুষকে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের করার জন্য এবং জাহান্নাম পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য যথেষ্ট। তাই এব্যাপারে সতর্কতা জরুরি।

ইলাহী সিফাতের ব্যাপারে মানুষের অবহেলা ও অসতর্কতার নানা প্রকার ও পর্যায় রয়েছে। এই অবহেলা ও অসতর্কতার বড় একটি প্রকার হল, সিফাতের মর্ম অনুধাবনে এবং এর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে অসতর্কতা।

এমনিভাবে অসতর্কতার আরেক দিক হল, আল্লাহ তাআলার পরিচয় ও গুণাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে এবং যিকির ও দুআয় তাঁর নাম নিতে গিয়ে শব্দ প্রয়োগে অসতর্কতা। এই দুই ধরনের অসতর্কতার ফলে সিফাত সংক্রান্ত আকীদার ক্ষেত্রে এবং সিফাতের তাবীল ও ব্যাখ্যায় বিভিন্ন প্রকারের এবং বিভিন্ন পর্যায়ের ভুল-ভ্রান্তি তৈরি হয়। যেমন-

১. না-বোঝার কারণে বা ভুল বোঝার কারণে- আল্লাহ তাআলার কিতাবে কিংবা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র যবানে যেসব ইলাহী নাম ও বিশেষণ সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে, তার কোনো একটিকে অপছন্দ করা, অস্বীকার করা কিংবা অর্থহীন মনে করা কুফুরী। যেমন, মক্কার মুশরিকরা আল্লাহ তাআলার রহমানবিশেষণকে অস্বীকার করত।

২. পবিত্র কুরআন ও হাদীসের মুহকাম ও সুস্পষ্ট বক্তব্য দ্বারা আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে যেসব আকীদা ও সিফাতের কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণিত এবং সেসবের উদ্দিষ্ট অর্থে ভাষাগত বিচারে কিংবা বোধগম্যতার বিচারে কোনো দ্ব্যর্থতা নেই, জটিলতা নেই; ফলে অতিরিক্ত কোনো ব্যাখ্যারও অপেক্ষা রাখে না; বরং সেসবের অর্থ প্রজন্ম পরম্পরায় সর্বজনবিদিত ও সর্বজনস্বীকৃত- এধরনের সুষ্পষ্ট ও সহজবোধ্য কোনো সিফাত ও আকীদার এমন কোনো ব্যাখ্যাকরাও কুফর, যার দ্বারা তার প্রতিষ্ঠিত ও সর্বজনবিদিত অর্থই  বদলে যায়।

কেননা কোনো কিছুর অপব্যাখ্যা ও অর্থের বিকৃতি হচ্ছে ঐ বিষয়টি অস্বীকারের ভয়াবহতম প্রকার। যেমন অতীতে বাতিনী ফেরকার কতক মুলহিদ-যিন্দীক লোক আল্লাহর সিফাত ও বিশেষণের এবং জরুরিয়াতে দ্বীনের এমন বাতিনী তাবীলও ব্যাখ্যা করেছে, যা এসবের সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত অর্থের খেলাফ।

৩. শাব্দিক সাদৃশ্যের কারণে ইলাহী সিফাতের হাকীকতকে মাখলূকের সিফাতের অনুরূপ মনে করা। যেমন কেউ যদি আল্লাহ তাআলাকে দেহধারী, অঙ্গবিশিষ্ট ও আকার-আকৃতিযুক্ত সত্তা মনে করে। কিংবা তাঁর সত্তাগত কোনো সিফাতকে হাদেছও ক্ষণস্থায়ী মনে করে।

৪. আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে কুরআন ও হাদীসের মুতাশাবিহবা ব্যাখ্যাসাপেক্ষ দ্ব্যর্থবোধক বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা। এই ভুল ব্যাখ্যা অবস্থাভেদে বিভিন্ন রকম হয়।

যদি সেই ভুল ব্যাখ্যা দ্বীনুল ইসলামের মুহকাম ও সুস্পষ্ট আকীদার সম্পূর্ণ পরিপন্থী হয় তবে তা কুফর। যেমন বর্ণিত আছে, নাজরানের নাসারারা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে তাওহীদের আকীদার বিপক্ষে ত্রিত্ববাদের আকীদা এবং হযরত ঈসা আসাইহিস সালাম সম্পর্কে তাদের ঈশ্বরত্বের কুফুরি আকীদার পক্ষে কুরআন মাজীদের কিছু  মুতাশাবিহবা ব্যাখ্যাসাপেক্ষ আয়াত উপস্থাপন করেছিল। যার প্রেক্ষাপটে সূরা আলে ইমরানের শুরুর কিছু আয়াত নাযিল হয়েছিল।

আর যদি সেই ভুল ব্যাখ্যা ইসলামের  কোনো সুস্পষ্ট ও অকাট্য আকীদার পরিপন্থি না হয়, কিন্তু সেই ব্যাখ্যার যদি কোনো সনদ ও দলীল না থাকে, বরং তাবীল ও ব্যাখ্যার ভাষাগত ও শরয়ী নীতিমালা লঙ্ঘন করে নিজস্ব খেয়ালখুশি ও চিন্তাধারা অনুসারে ব্যাখ্যা করা হয়, তবে তা হবে দ্বীনী বিষয়ে ইত্তেবায়ে হাওয়াবা প্রবৃত্তির অনুসরণ এবং বিদআত ও গোমরাহী। এধরনের ভুল ব্যাখ্যা ও ইত্তেবায়ে হাওয়াযাদের শিআর ও বৈশিষ্ট্য, তারা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর পথ থেকে বিচ্যুত এবং বিদআতী হিসেবে আখ্যায়িত। যেমন অতীতে কদারিয়্যা, মুতাযিলা, জাহমিয়্যা, কাররামিয়্যাহ ফেরকার লোকেরা এবং বর্তমানেরও বিভিন্ন বিদআতী ফেরকার লোকেরা আল্লাহ তাআলার বিভিন্ন সিফাতের, আখেরাত ও গায়েবের জগতের বিভিন্ন বিষয়ের এবং নবী ও রাসূলের বিভিন্ন মুজেযার ভুল ব্যাখ্যা করে থাকে।

কিন্তু ইত্তেবায়ে হাওয়াযার শিআর নয়, বরং যিনি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর অনুসারী এবং তাকওয়া ও ইখলাসের অধিকারী বিজ্ঞ আলিম, তিনি যদি মুতাশাবিহ বা দ্ব্যর্থবোধক কোনো বিষয়ের ব্যাখ্যায় অনাকাক্সিক্ষতভাবে ভুলের শিকার হন সেটাও ভুল। তবে সেই ভুলের কারণে ঐ মুখলিস ও বিজ্ঞ আলেমকে গোমরাহ বা বিদআতী বলা হবে না বটে, কিন্তু তাঁর সেই ভুল ব্যাখ্যা অনুসরণযোগ্য নয়, বরং বর্জনীয়।

তাবীলবা ব্যাখ্যার বিভিন্ন প্রকার, এর শরয়ী হুকুম এবং উসূল ও নীতিমালা সম্পর্কে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর বিজ্ঞ আলেমদের রচিত উসূলে ফিকহ গ্রন্থে, আকীদা বিষয়ক বিশদ গ্রন্থাবলিতে, তাফসীরগ্রন্থে এবং হাদীসের ভাষ্যগ্রন্থসমূহে আলোচনা রয়েছে।

তবে এ বিষয়ে হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাযালী রাহ. (৫০৫ হি.) রচিত স্বতন্ত্র তিনটি পুস্তিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

১. ফায়সালুত তাফরিকাহ বায়নাল ইসলাম ওয়ায যানদাকাহ।

২. কানূনুত তাবীল।

৩. ইলজামুল আওয়াম আন ইলমিল কালাম।

এই প্রবন্ধে পাঠকের সামনে মুতাশাবিহাত সম্পর্কে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর ভারসাম্যপূর্ণ নীতির ব্যাখ্যা এবং আহলে বিদআতের বিভ্রান্তির কারণ ও ধরন তুলে ধরার চেষ্টা করা হবেÑ ইনশাআল্লাহ। কেননা এদেশে বর্তমান সময়ে মুতাশাবিহাতকে কেন্দ্র করে  নতুন করে ফিতনা ছড়ানো হচ্ছে। একটি মহলকে দেখা যায়, তারা মুতাশাবিহাতকে তাদের আকীদা ও ইলম চর্চার মুখ্য বিষয় বানিয়েছে, বরং তারা মুতাশাবিহাতের চর্চাকে এবং আল্লাহ কোথায় থাকেন- সেই প্রশ্নের জবাবকেই সদম্ভে ঈমানের রোকন ও মানদণ্ড ঘোষণা করে। নাউযু বিল্লাহ।

رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوْبَنَا بَعْدَ اِذْ هَدَيْتَنَا وَ هَبْ لَنَا مِنْ لَّدُنْكَ رَحْمَةً   اِنَّكَ اَنْتَ الْوَهَّابُ.

তবে মুতাশাবিহাত সম্পর্কে বিশদ আলোচনায় অগ্রসর হওয়ার আগে আমরা ভূমিকাস্বরূপ ইলাহী সিফাত সম্পর্কে দুটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি আলোচনা করা প্রয়োজন মনে করছি। প্রথমটি হল, আল্লাহ তাআলার শানে গুণবাচক শব্দ ও অভিধা ব্যবহার প্রসঙ্গে। দ্বিতীয়টি হল, গুণের মর্ম বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে অনুধাবন প্রসঙ্গে।

আল্লাহ তাআলার শানে শব্দ ব্যবহারের নীতি

এ নীতির উদ্দেশ হল, এটা নির্ধারণ করা যে, আল্লাহ তাআলার পরিচয় বর্ণনার ক্ষেত্রে এবং তাঁর হামদ ও তাসবীহের ক্ষেত্রে কোন্ বিষয়গুলো বর্ণনা করা উচিত এবং তা কোন্ ভাষা ও শব্দে বর্ণনা করা উচিত। এমনিভাবে আল্লাহ তাআলার যিকির ও স্মরণের ক্ষেত্রে এবং তাঁর কাছে দুআ ও প্রার্থনার ক্ষেত্রে তাঁকে ডাকার জন্য কোন্ শব্দ ব্যবহার করা উচিত, আর কোন্ শব্দ বর্জন করা উচিত।

আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজীদে ইরশাদ করেন-

وَ لِلهِ الْاَسْمَآءُ الْحُسْنٰي فَادْعُوْهُ بِهَا  وَ ذَرُوا الَّذِيْنَ يُلْحِدُوْنَ فِيْۤ اَسْمَآىِٕهٖ سَيُجْزَوْنَ مَا كَانُوْا يَعْمَلُوْنَ.

আল্লাহ তাআলার জন্য রয়েছে সুন্দরতম নামসমূহ। সুতরাং তাঁকে সেইসব নামেই ডাকবে। যারা তাঁর নামের ব্যাপারে বক্র পথ অবলম্বন করে, তাদেরকে বর্জন কর। তারা যা-কিছু করছে, তাদেরকে তার বদলা দেওয়া হবে। -সূরা আরাফ (৭) : ১৮০

লক্ষ করুন, উক্ত আয়াতে প্রথমে আল্লাহ তাআলাকে তাঁর গুণবাচক সুন্দরতম নামসমূহ দ্বারা ডাকার আদেশ করা হয়েছে। তারপর সেসব গুণবাচক নামের ক্ষেত্রে যারা ইলহাদবা বক্রপথ অবলম্বন করে, তাদেরকে কঠোরভাবে হুঁশিয়ার করা হয়েছে।

তাই আমাদেরকে বুঝতে হবে, আল্লাহ তাআলার সুন্দরতম নামসমূহ কোন্গুলো এবং তাঁর নামসমূহকে হুসনাবা সুন্দরতম বলার তাৎপর্য কী? তারপর জানতে হবে, তাঁর নামের ব্যাপারে ইলহাদ বলতে কী বোঝায় এবং তা থেকে বাঁচার উপায় কী?

আল্লাহ তাআলার আলআসমাউল হুসনাবা সুন্দরতম নামসমূহ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, তাঁর ইলাহী বৈশিষ্ট্যের পরিচায়ক সেসব গুণবাচক শব্দ ও বিশেষণ, যেগুলো তিনি নিজেই তাঁর নাম হিসেবে বর্ণনা করেছেন কিংবা তাঁর পক্ষ থেকে তাঁর নবী-রাসূলগণ বর্ণনা করেছেন।

কুরআন মাজীদ এবং নবীজীর হাদীস অধ্যয়ন করলে আমরা জানতে পারি, ‘আলআসমাউল হুসনা’-এর কতক আল্লাহ তাআলা নিজেই কুরআন মাজীদে জানিয়ে দিয়েছেন এবং কতক তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদীসের মাধ্যমে জানিয়েছেন।

কুরআন মাজীদের কয়েক স্থানে আলআসমাউল হুসনা’-এর প্রতি ইশারা করা হয়েছে। [দেখুন : সূরা বনী ইসরাঈল (১৭) : ১১০; সূরা ত্ব-হা (২০) : ৮সূরা হাশর (৫৯) : ২৪]

এছাড়া সহীহ বুখারী ও অন্যান্য হাদীসগ্রন্থে আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তাআলার নিরানব্বইটি নাম আছে। ইমাম তিরমিযী সুনানগ্রন্থে ও ইমাম হাকিম মুসতাদরাকগ্রন্থে সে নামসমূহও বর্ণনা করেছেন।

এখন দেখুন, আল্লাহ তাআলার নামসমূহকে হুসনা’-সুন্দরতম বিশেষণে বিশিষ্ট করা হয়েছে; কারণ আল্লাহ তাআলার নামসমূহ সুন্দর ও উৎকৃষ্ট অর্থের ধারক। তাঁর নামসমূহ তাঁর ইলাহী শান ও শওকত, জালাল ও প্রতাপ, মান ও মর্যাদা, আহাদিয়্যাত ও এককত্ব এবং তাঁর সকল বৈশিষ্ট্যকে সুন্দরভাবে প্রকাশ করে। তিনি তো সকল সুন্দর ও উত্তম নামের অধিকারী এবং পূর্ণতাবাচক সকল গুণে গুণান্বিত। এতে এই ইশারা রয়েছে, মন্দ ও অসুন্দর অর্থবিশিষ্ট কোনো নাম কিংবা কামালাত ও পরিপূর্ণতার পরিপন্থী অর্থ প্রকাশ করে এমন কোনো নাম বা বিশেষণ আল্লাহর প্রতি আরোপ করা গোমরাহী। যেমন নাসারাগণ আল্লাহকে পিতানামে অভিহিত করে থাকে।

তারপর দেখুন, উপরোক্ত আয়াতে আল্লাহর নামের ক্ষেত্রে ইলহাদকারীদেরকে বর্জন করতে বলা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারী জানানো হয়েছে। এছাড়াও কুরআন কারীমের অন্য জায়গায় আল্লাহর আয়াতের ক্ষেত্রে ইলহাদকারীদের হুঁশিয়ার করা হয়েছে-

اِنَّ الَّذِيْنَ يُلْحِدُوْنَ فِيْۤ اٰيٰتِنَا لَا يَخْفَوْنَ عَلَيْنَا.

(আমার আয়াতসমূহের ব্যাপারে যারা বাঁকা পথ অবলম্বন করে, তারা আমার অগোচর নয়।)

ইলহাদ মানে সোজা পথ ছেড়ে বক্র পথ অবলম্বন করা। সে হিসেবে আল্লাহ তাআলার নাম ও সিফাতের ব্যাপারে বক্রপথ অবলম্বনের বিভিন্ন ধরন রয়েছে। যেমন-

১. আল্লাহর নামকে পরিবর্তন করা। যেমন বর্ণিত আছে, মক্কার মুশরিকরা তাদের লাত’, ‘মানাতউযযাদেবীসমূহের নাম রেখেছিল যথাক্রমে আল্লাহ’, ‘মান্নানআযীয’- নাম থেকে রূপান্তর করে।

২. আল্লাহর নাম ও সিফাতের মধ্যে নিজের থেকে কিছু বৃদ্ধি করা। যেমন, মুশাব্বিহা ফেরকা আল্লাহর নাম ও সিফাতের অর্থের মধ্যে তাশবীহ তথা মাখলূকের সঙ্গে সাদৃশ্য বৃদ্ধি করে। তারা কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত আল্লাহ তাআলার বিভিন্ন সিফাতের ক্ষেত্রে দেহত্ব, অঙ্গত্ব এবং নশ্বরত্বের ভাব বৃদ্ধি করে। নাউযু বিল্লাহ।

৩. তাঁর নাম ও সিফাতের মধ্য থেকে কোনো কিছু হ্রাস করা। যেমন বাতিল ধর্মাবলম্বীগণ এবং কতক বেদ্বীন দার্শনিক কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত আল্লাহ তাআলার সিফাত ও গুণাবলিকে অস্বীকার করে কিংবা অপছন্দ করে, যা তাতীলনামে পরিচিত। (দ্রষ্টব্য : আহকামুল কুরআন, ইবনুল আরাবী ১/৪৯; তাফসীরুল কুরতুবী ২/৫৭)

মোটকথা, আল্লাহ তাআলার কোনো নাম ও গুণ অস্বীকার করা, তাঁর কোনো নাম বা গুণের অপব্যাখ্যা করা, তাঁর কোনো নাম ও বৈশিষ্ট্যকে দেব-দেবীর ওপর আরোপ করা, কিংবা অনুপযোগী ও ভ্রান্ত অর্থপূর্ণ কোনো নাম ও বিশেষণ আবিষ্কার করে আল্লাহর ওপর আরোপ করা- এ সবই ইলহাদও গোমরাহীর শামিল।

এই ইলহাদ থেকে বাঁচার সহজ উপায় হল, আল্লাহ তাআলা কুরআন কারীমে এবং নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদীস শরীফে আল্লাহ তাআলার যেসব নাম, সিফাত ও বিশেষণসমূহ যে শব্দে যেভাবে বর্ণনা করেছেন সেভাবে হুবহু ব্যবহার করা।

কেননা যদিও সুস্থ বিবেক-বুদ্ধি দ্বারা সৃষ্টিকর্তার মৌলিক অনেক গুণাবলির আভাস পাওয়া যায়, কিন্তু অনেক সময়ই মানুষ নানা কারণে এক্ষেত্রে বিভিন্ন রকম বিভ্রান্তির শিকার হয়ে থাকে। সুতরাং সিফাতে আকলিয়্যাহ তথা যুক্তি-বুদ্ধি দ্বারা উপলব্ধিযোগ্য গুণাবলি সম্পর্কেও বিস্তারিত এবং সঠিক ও স্বচ্ছ ধারণা লাভের জন্য ওহীর শিক্ষার বিকল্প নেই। আর যেসব সত্তাগত গুণাবলি শুধু যুক্তি-বুদ্ধি দ্বারা জানা যায় না, সেসব গুণাবলি সম্পর্কে অবগতি লাভের একমাত্র উৎস ওহী ও নববী শিক্ষা।

তাছাড়া সৃষ্টিকর্তার গুণাবলি থাকার আবশ্যকতা এবং তাঁর অনিবার্য গুণাবলিগুলোর মূল ভাব ও মর্ম যদিওবা যুক্তি-বুদ্ধির সাহায্যে অনুধাবন করা যায়, কিন্তু সেসব গুণাবলি ব্যক্ত করার জন্য তাঁর শায়ানেশান শব্দ ও অভিধা কী হবে- তা নির্ধারণ করা সহজ ব্যাপার নয়। সর্বোপরি নাম ও বিশেষণ হিসেবে কোন্ শব্দ ও অভিধাকে তিনি নিজের জন্য নির্ধারণ করেছেন ও পছন্দ করেছেন কিংবা কোন্ নাম ও বিশেষণ দ্বারা তাঁর যিকির ও ইবাদত করা এবং তাঁর কাছে দুআ ও প্রর্থনা করা তাঁর পছন্দ তা কেবল যুক্তি-বুদ্ধি দিয়ে কীভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব!

কেননা মানুষের ভাষায় একই অর্থবোধক মোটামুটি সমার্থক অনেক শব্দই তো রয়েছে; সেসবের মধ্যে কোন্টি মহান আল্লাহর ক্ষেত্রে যথাশব্দ, কোন্টি তাঁর শান ও মানের অধিক উপযোগী এবং তাঁর পছন্দনীয়- তা শুধু যুক্তি-বুদ্ধি দ্বারা ফয়সালা করা কি সম্ভব?!

তাছাড়া মানুষের সব ভাষারই রয়েছে সীমাবদ্ধতা; মানুষের ভাষা তো মূলত পার্থিব বিষয়াদি বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। সুতরাং পার্থিব শব্দ দ্বারা অপার্থিব অসীম অর্থ নির্দেশ করা কতটুকু আর সম্ভব! আর তাই মানুষের ভাষায় ব্যবহৃত পার্থিব শব্দ মহান আল্লাহর শানে ব্যবহার করা হলে অনেক ক্ষেত্রে ভুল বোঝার আশঙ্কা থাকে। তাই মানুষের ভাষার কোনো শব্দকে এবং বিশেষত মানুষের জন্য ব্যবহৃত কোনো শব্দকে আল্লাহ তাআলার নাম ও বিশেষণ হিসেবে ব্যবহারের জন্য আল্লাহ তাআলার অনুমোদন থাকা জরুরি।

সর্বোপরি আল্লাহ তাআলা তো তাঁর নাম ও সিফাতের জ্ঞানকে মানুষের যুক্তি-বুদ্ধির ওপর ছেড়ে দেননি। বরং তিনি এবিষয়ের সঠিক ও স্বচ্ছ জ্ঞান কিতাব ও সুন্নাহর মাধ্যমে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর নাযিল করেছেন এবং তাঁর প্রতি যা-কিছু নাযিল করেছেন তার প্রতি ঈমান আনা এবং তাঁর অনুসরণ ও আনুগত্য করাকেও ফরয করেছেন। তিনি আলআসমাউল হুসনাবা সুন্দরতম নামসমূহ দ্বারা তাঁকে ডাকার আদেশ করেছেন এবং তাঁর নামের ব্যাপারে ইলহাদকারীদেরকে কঠোরভাবে হুঁশিয়ার করেছেন। তারপর তিনি আলআসমাউল হুসনার জ্ঞানও কিতাব ও সুন্নাহর মাধ্যমে দান করেছেন। সুতরাং এখন কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত আলআসমাউল হুসনাদ্বারাই আল্লাহ তাআলার যিকির এবং তাঁর কাছে দুআ করা চাই। নিজের পক্ষ থেকে তাঁর জন্য কোনো নাম তৈরি করে নেওয়া ঠিক নয়।

এমনিভাবে আমরা দেখতে পাই, কিছু শব্দ আছে, যা মূলত সঠিক অর্থে আল্লাহর জন্য ব্যবহার করা যায়, কিন্তু শব্দগুলো যুগে যুগে বিভিন্ন সম্প্রদায় ভুল অর্থে ব্যবহার করেছে এবং সেই ভুল অর্থই মানুষের মধ্যে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে, ফলে ইসলামী শরীয়তে আল্লাহর শানে সেসব শব্দের ব্যবহার নিষিদ্ধ হয়েছে। যেমন- খ্রিস্টান সম্প্রদায় ভুল আকীদার ভিত্তিতে আল্লাহর জন্য পিতাশব্দটি ব্যবহার করে থাকে, ফলে ইসলামে আল্লাহর শানে এই শব্দটি ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

এছাড়াও আল্লাহ তাআলা এবং তাঁর পক্ষ থেকে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন ক্ষেত্রে শব্দ চয়নের ব্যাপারেও বিধি-নিষেধ দান করেছেন। যেমন কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে-

يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا لَا تَقُوْلُوْا رَاعِنَا وَ قُوْلُوا انْظُرْنَا وَ اسْمَعُوْا وَلِلْكٰفِرِيْنَ عَذَابٌ اَلِيْمٌ.

হে ঈমানদারগণ! (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে লক্ষ করে) রাইনাবলো না; বরং উন্জুরনাবলো এবং শ্রবণ করো। আর কাফিরদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাময় শাস্তি। -সূরা বাকারা (২) : ১০৪

মদীনায় বসবাসকারী ইহুদীদের একটি দল ছিল অতিশয় দুষ্ট। তারা যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করত, তখন তাঁকে লক্ষ করে বলত রাইনা(رَاعِنَا)আরবীতে এর অর্থ আমাদের প্রতি লক্ষ রাখুনএ হিসেবে শব্দটিতে কোনো দোষ নেই এবং এর মধ্যে বেআদবীরও কিছু নেই। কিন্তু ইহুদীদের ধর্মীয় ভাষা হিব্রুতে এরই কাছাকাছি একটি শব্দ অভিশাপ ও গালি অর্থে ব্যবহৃত হত। তাছাড়া এ শব্দটিকেই যদি عএর দীর্ঘ উচ্চারণে পড়া হয়, তবে رَاعِيْنَا হয়ে যায়, যার অর্থ আমাদের রাখালমোটকথা ইহুদীদের আসল উদ্দেশ্য ছিল, শব্দটিকে মন্দ অর্থে ব্যবহার করা। কিন্তু আরবীতে যেহেতু বাহ্যিকভাবে শব্দটিতে কোনো দোষ ছিল না, তাই কতিপয় সরলপ্রাণ মুসলিমও শব্দটি ব্যবহার করতে শুরু করে দেয়। এতে ইহুদীরা বড় খুশি হত এবং ভেতরে ভেতরে মুসলিমদের নিয়ে মজা করত। তাই এ আয়াতে মুসলিমদেরকে তাদের এ দুষ্কর্ম সম্পর্কে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে তাদেরকে এ শব্দ ব্যবহার করতে নিষেধ করা হয়েছে। সেইসঙ্গে এ শিক্ষাও দেওয়া হয়েছে যে, যে শব্দের ভেতর কোনো মন্দ অর্থের অবকাশ থাকে বা যা দ্বারা ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনা থাকে, সে রকম শব্দ ব্যবহার করা সমীচীন নয়। (দ্রষ্টব্য: আহকামুল কুরআন, জাসসাস রাযী ১/৭২; আহকামুল কুরআন, ইবনুল আরাবী ১/৪০; তাফসীরুল কুরতুবী ২/৫৭)

এমনিভাবে বিভিন্ন হাদীসেও শব্দের ভালো-মন্দ ব্যবহারের ব্যাপারে নির্দেশনা বর্ণিত হয়েছে। যেমন এক হাদীসে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

لا تسموا العنب الكرم، فإن الكرم الرجل المسلم.

তোমরা আঙ্গুরকে কারামবলো না, কারণ কারামহল মুসলিম ব্যক্তির বিশেষণ। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৪৭

আরেক হাদীসে তিনি বলেছেন-

لا يقولن أحدكم عبدي وأمتي، كلكم عبيد الله، وكل نسائكم إماء الله، ولكن ليقل غلامي وجاريتي وفتاي وفتاتي.

তোমরা কেউ (নিজেদের গোলাম ও বাদীকে) আবদী ও আমাতী বলো না। তোমরা পুরুষরা সকলেই আল্লাহর আবদ (বান্দা) এবং নারীরা সকলই আল্লাহ আমাত (বান্দী)। কিন্তু তোমরা বলতে পার, গোলামী ও জারিয়াতী, ফাতাইয়া ও ফাতাতী। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৪৯

উক্ত হাদীসের অন্য এক বর্ণনায় আছে-

ولا يقل العبد: ربي، ولكن ليقل: سيدي.

কোনো গোলাম যেন (মালিককে) রাব্বী না বলে, বরং সে যেন বলে, সায়্যিদী।

অন্য এক হাদীসে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

لا يقولن أحدكم خبثت نفسي، ولكن ليقل لقست نفسي.

তোমাদের কেউ যেন না বলে, খবুছাত নাফছী; বরং বলবে, লাকিসাত নাফছী। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৫০

এখন চিন্তা করুন, সাধারণ ক্ষেত্রে যেখানে শব্দ চয়ন ও শব্দ ব্যবহারের ব্যাপারে আদব ও শিষ্টাচার রক্ষার আদেশ করা হয়েছে, তখন মহামহিম আল্লাহ তাআলার শানে শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা ও শিষ্টাচার কতটা জরুরি!

আসলে যারা মহান আল্লাহ তাআলার শানে শব্দ চয়নে সতর্কতা ও শিষ্টাচার রক্ষা করে না, বরং তাঁর শান ও মানের পরিপন্থি কোনো শব্দ কিংবা বিভ্রান্তিকর কোনো শব্দ প্রয়োগ করে, তাদের ব্যাপারে কুরআন কারীমের এই ভর্ৎসনাবাণী প্রযোজ্য-

وَ مَا قَدَرُوا اللهَ حَقَّ قَدْرِهٖۤ.

তারা আল্লাহকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়নি। -সূরা আনআম (৬) : ৯১; সূরা হজ¦ (২২) : ৭৪; সূরা যুমার (৩৯) : ৬৭

যাইহোক, শব্দ ব্যবহারের ব্যাপারে শরীয়তের যে সাধারণ আদব ও শিষ্টাচার এবং বিশেষভাবে আল্লাহ তাআলার শানে শব্দ ব্যবহারে যে শরয়ী হুকুম ও নির্দেশনা সে অনুসারে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর উলামায়ে কেরাম আল্লাহর নাম ও সিফাতের বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি বর্ণনা করেছেন এবং অনুসরণ করেছেন। যথা :

১. তাদের একটি মুলনীতি হল, আল্লাহ তাআলার আলআসমাউল হুসনা তাওকীফীবিষয়; অর্থাৎ কোনো শব্দ আলঅসমাউল হুসনার অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য সেটি হুবহু আল্লাহ তাআলার মহান সত্তার নামরূপে কুরআন মাজীদে কিংবা হাদীস শরীফে স্পষ্টভাবে উল্লিখিত হওয়া জরুরি। শুধু অনুমানের ভিত্তিতে কিংবা কিয়াস ও যুক্তির ভিত্তিতে কিংবা ইজতিহাদ ও ইস্তেম্বাতের ভিত্তিতে অর্থগত বিচারে কোনো শব্দকে আসমায়ে হুসনার অন্তর্ভুক্ত করা যায় না। এমনকি যে শব্দরূপটি কুরআন বা হাদীসে সরাসরি নামরূপে বব্যহৃত হয়নি; বরং ফেয়েল ও ক্রিয়ারূপে কিংবা নিছক কোনো সিফাত ও গুণ বর্ণনার জন্য অন্য কোনোরূপ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে সেটাকে সরাসরি আলআসমাউল হুসনার অন্তর্ভুক্ত করা ঠিক নয়। (শানুদ-দুআ, ইমাম খাত্তাবী, পৃ. ১১১-১১৩; মাকালাতু আবীল হাসান আশআরী, ইবনুল ফূরাক, পৃ. ৪২; আলইনসাফ, বাকিল্লানী, পৃ. ৩৯; আলমাকসিদুল আসনা ফী শরহি মাআনী আসমাইল্লাহিল হুসনা, ইমাম গাযালী, পৃ. ১৭৩-১৭৬; আলআসনা ফী শরহি আসমাইল্লাহিল হুসনা, ইমাম কুরতুবী, পৃ. ৭-৯, ২০, ২৬-৩১; তবাকাতুশ-শাফিইয়্যতিল কুবরা, সুবকী ৩/৩৫৭; হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ, শাহ ওয়ালীউল্লাহ, ১/১২২-১২৪; আলআকীদাতুল ইসলামিয়্যাহ, মুহাম্মাদ মাক্কী ইবনু আয্যুয, (মাজদ মাক্কীর টীকাসহ), পৃ. ২৬৬-২৭৩)

২. আলআসমাউল হুসনাছাড়াও সাধারণভাবে সিফাত ও গুণ বর্ণনার ক্ষেত্রেও সে বিষয়ে কুরআন ও সুন্নাহ্য় গুণবাচক যে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে তা ব্যবহার করাই উত্তম ও বাঞ্ছনীয়, নিজ থেকে অন্য কোনো শব্দ প্রয়োগ করা ভালো নয়। বরং আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর অনেক আলেম এক্ষেত্রেও হুবহু কুরআন ও সুন্নাহর শব্দ ব্যবহার করাকে জরুরি মনে করেন। তবে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর অনেক মুহাক্কিক আলেম এধরনের ক্ষেত্রে কুরআন ও সুন্নাহর বাইরের শব্দ দ্বারাও আল্লাহ তাআলার গুণ ও মহিমা ব্যক্ত করা বৈধ মনে করেন এই শর্তে যে, সেই শব্দটি যদি কুরআন ও সুন্নাহ্য় বর্ণিত গুণবাচক শব্দের সমার্থক হয় এবং ভুল কোনো অর্থের বা ভ্রান্ত কোনো আকীদার ভ্রম ও সন্দেহ তৈরি না করে। যেমন, আরবীতে আলেমগণ মাওজুদ, ওয়াজিবুল উজুদ, কায়িম বিযাতিহি, কদীম ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করে থাকেন। (প্রাগুক্ত গ্রন্থাবলি; বাদায়িউল ফাওয়াইদ, ইবনুল কায়্যিম, পৃ. ২৮৪-৩০০)

৩. কুরআন ও হাদীসে আল্লাহ তাআলার শানে যেসব শব্দ ও বাক্য ব্যবহৃত হয়েছে, সেগুলোকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা যাবে না। যেমন, বিশেষ প্রসঙ্গের কথাকে মুতলাক ও ব্যাপক অর্থে বলার কারণে, কিংবা যুগল শব্দকে বিচ্ছিন্নভাবে বলার কারণে কিংবা পূর্বাপর প্রসঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন করে উপস্থাপনের কারণে যদি  ভুল অর্থের বা ভুল বার্তার সন্দেহ তৈরি হয়, তবে তা ব্যাপক অর্থে এবং বিচ্ছিন্নভাবে বলা বৈধ নয়। বরং যেভাবে বর্ণিত আছে হুবহু সেভাবে বলতে হবে। (প্রাগুক্ত গ্রন্থাবলি; ইলজামুল আওয়াম আন ইলমিল কালাম, ইমাম গাযালী, পৃ. ৮৩-৮৬, দারুল মিনহাজ প্রকাশিত; বাদায়িউল ফাওয়াইদ, ইবনুল কায়্যিম, পৃ. ২৮৪-৩০০)

৪. কুরআন মাজীদে এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যবানে আল্লাহর যে নাম ও বিশেষণ বর্ণিত হয়েছে এবং তাঁর শানে যে শব্দ ও অভিধা ব্যবহৃত হয়েছে তা সাদরে গ্রহণ করা এবং বিশ্বাস করা জরুরি। এখন সেই শব্দের অর্থ বুঝে আসুক বা না-আসুক সর্ব অবস্থায় তা গ্রহণ করা ও বিশ্বাস করা জরুরি। অস্বীকার করা বা অপছন্দ করা গোমরাহী।

সুতরাং কুরআন মাজীদে এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যবানে আল্লাহ তাআলার শানে যেসব বিশেষণ এবং  যেসব শব্দ ও অভিধা বর্ণিত হয়েছে, সেগুলোকে এমন অর্থেই বিশ্বাস করতে হবে, যা আরবী ভাষা অনুসারে এবং কুরআন ও হাদীসের নির্দেশনা অনুসারে বুঝে অসে এবং যে অর্থ  মর্ম সহাবায়ে কেরাম থেকে আজ পর্যন্ত আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর আলেমদের কাছে স্বীকৃত।

আর যদি এধরনের মানসূসমাছূরকোনো বিশেষণ কিংবা শব্দ ও অভিধার অর্থ ও মর্ম বুঝে না এলে তা অস্বীকার করা যাবে না, কিংবা তার বিরুদ্ধে কোনো আপত্তি তোলা যাবে না এবং অপছন্দ করা চলবে না। অর্থ বুঝে না এলেও মন থেকে তা বিশ্বাস করতে হবে এবং গ্রহণ করতে হবে। মুমিনের শান হল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কোনো কথার মর্ম বুঝে না এলেও সেই কথার সত্যতা ও যথার্থতার প্রতি এজমালীভাবে বিশ্বাস রাখে এবং নিজের অক্ষমতা অকপটে স্বীকার করে। একজন পাক্কা ঈমানদার এধরনের ক্ষেত্রে দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে ঘোষণা করে (কুরআনের ভাষায়)-

اٰمَنَّا بِهٖ  كُلٌّ مِّنْ عِنْدِ رَبِّنَا.

অর্থাৎ আমরা এর প্রতি ঈমান আনলাম, এই কুরআনের যে কথা আমাদের বুঝে আসে এবং যা বুঝে আসে না- সবই সত্য, সবই আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।

অন্যভাবে বললে, কুরআন ও হাদীসের প্রতিটি শব্দ ও বাক্যের তরজমা ও তাফসীর জানা সবার পক্ষে সম্ভব নয় এবং জরুরিও নয়। তবে কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত সব কথার সত্যতা ও যথার্থতার প্রতি এজমালীভাবে ঈমান থাকা জরুরি। তাই কুরআন ও হাদীসের কোনো কথার উদ্দিষ্ট অর্থ বুঝে না এলেও তা অস্বীকার করা যাবে না, বরং ঈমানের দাবি হল, প্রথমে সেই কথাটির সত্যতা এজমালীভাবে মেনে নেওয়ার পর, তার প্রকৃত ও তফসীলী অর্থ কী- তা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন- একথা বলে আত্মসমর্পণ করা জরুরি। (দ্রষ্টব্য : ইলজামুল আওয়াম আন ইলমিল কালাম, গাযালী, পৃ. ৫৭-৫৮; আররিসালাতুত তাদমুরিয়্যাহ, ইবনে তাইমিয়া, পৃ. ৬৫, মাকতাবাতুল উবাইকান প্রকাশিত; মাজমূউল ফাতাওয়া, ইবনে তাইমিয়া ৩/৪১, ১৬/৪১০)

উল্লেখ্য, এভাবে কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত কোনো কথা বুঝে না এলেও তার সত্যতার প্রতি এজমালীভাবে ঈমান রাখা এবং সে বিষয়ের প্রকৃত ও বিস্তারিত জ্ঞান আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি সোপর্দ করাকে পরিভাষায় তাফবীযবলা হয়। এসম্পর্কে আরো বিস্তারিত কথা সামনে (মুতাশাবিহাতের ক্ষেত্রে তাফবীযদ্বারা উদ্দেশ্য কী- সে প্রসঙ্গে) আলোচনা করা হবে, ইনশাআল্লাহ।

সিফাত বিষয়ক আরবী শব্দের তরজমা করার বিধান

বাকি থাকল, কুরআন ও হাদীসে আরবী ভাষায় যেসব সিফাত ও বিশেষণ বর্ণিত হয়েছে, অন্য ভাষায় সেসবের অনুবাদ প্রসঙ্গ। তো এব্যাপারে খোলাসা কথা হল, আরবী ভাষায় বর্ণিত সিফাত ও বিশেষণের অর্থ ও মর্ম অনারবদেরকে বোঝানোর জন্য ভিন্ন ভাষায় সমার্থক শব্দে এসবের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা করা বৈধ। এর ওপরই সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকে এ পর্যন্ত উলামায়ে কেরাম এবং ইসলামের দাঈগণ আমল করেছেন। তাই এর বৈধতা উম্মতের মুতাওয়ারাছ আমল দ্বারা প্রমাণিত। তবে বলার অপেক্ষা রাখে না, এই অনুবাদের ক্ষেত্রে সতর্কতা কাম্য। তো যেসব শব্দ ও বিশেষণের অর্থ সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট সেসবের সমার্থক শব্দে অনুবাদ করা তো সহজ। যেমন- কুদরত অর্থ শক্তি ও ক্ষমতা, ইলম অর্থ জ্ঞান, ইরাদাহ ও মাশিয়্যাত অর্থ ইচ্ছা, সামীউন অর্থ যিনি শোনেন, বাসীরুন অর্থ যিনি দেখেন এবং কালাম ও কওল অর্থ কথা বলা। এসবের অর্থ সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট।

কিন্তু ভাষাগত বিচারে যেসব শব্দের একাধিক ব্যবহারিক অর্থ রয়েছে এবং শরীয়তের কোনো দলীল দ্বারা সেসব একাধিক অর্থের মধ্য থেকে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো একটি অর্থ সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়, তার উদ্দিষ্ট অর্থ নির্ধারণ করা জটিল হয়ে থাকে। এধরনের ক্ষেত্র মূলত ইজতেহাদের ক্ষেত্র। তাই এ ক্ষেত্রে ইনসাফের দাবি হল, যেহেতু একাধিক সহীহ অর্থের সম্ভাবনা রয়েছে, তাই কোনো বিজ্ঞ আলেম তাঁর ইজতেহাদ অনুসারে বোঝানোর জন্য কোনো একটি অর্থ বর্ণনা করলেও অন্য সহীহ অর্থের সম্ভাবনাকে নাকচ করা যায় না।

তাই তো পূর্ববর্তী ও পরবর্তী যুগে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর অনুসারী  কোনো কোনো আলেম সতর্কতাবশত এধরনের মুতাশাবিহ শব্দের কোনোরূপ অনুবাদ করা থেকেই বিরত থেকেছেন এবং হুবহু শব্দ উচ্চারণ করাকেই যথেষ্ট মনে করেছেন। কিন্তু আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর অধিকাংশ উলামায়ে কেরাম এজমালীভাবে বোঝানোর জন্য এধরনের মুতাশাবিহ শব্দকে মোটামুটি উপযোগী শব্দে অনুবাদ করাকে নিষেধ করেননি। তাঁরা মূলত এসব সিফাতের হাকীকত ও স্বরূপ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে নিষেধ করেছেন, নিছক যুক্তি-বুদ্ধি দিয়ে এসবের তাত্ত্বিক ও চুলচেরা বিশ্লেষণ করাকে নিষেধ করেছেন। কিন্তু তাঁরা এসবের মূল ভাব এবং বার্তা ও শিক্ষাকে এজমালীভাবে অনুধাবন করা এবং বর্ণনা করাকে নিষেধ করেননি। তবে শব্দের অনুবাদের ক্ষেত্রে তাদের কেউ কেউ এসবের শাব্দিক ও মূলানুগ অনুবাদ করেছেন এবং কেউ ভাবানুবাদ করেছন। (দ্রষ্টব্য : ইলজামুল আওয়াম আন ইলমিল কালাম, গাযালী, পৃ. ৫৭, ৬৬-৬৯, ৭৯-৮০; উসূলুদ দ্বীন, বাযদাবী, পৃ. ৩৯; আলআসনা, কুরতুবী, পৃ. ২০; বয়ানুল কুরআন, থানবী (সূরা আলে ইমরানে বর্ণিত মুতাশাবিহাত সংক্রান্ত আয়াতের তাফসীর, টীকা ও সংযুক্ত মাকালাসহ), বাওয়াদিরুন নাওয়াদির ২/৬১৭, ৭৫২-৭৫৪; মাআরিফুস সুনান, বানূরী, ৪/১৫৬)

এধরনের একটি মুতাশাবিহ বা দ্ব্যর্থবোধক বাক্য হল-

اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ.

বাংলায় এই বাক্যের সম্ভাব্য একাধিক অনুবাদ হতে পারে। যেমন- আরশে/বা হুকুমতের তখতে কায়েম হলেন, স্থিত হলেন, অধিষ্ঠিত হলেন বা অধিষ্ঠান করলেন কিংবা আধিপত্য বা রাজত্ব কায়েম করলেন। সবগুলোই চলতে পারে।

তবে কতক আহলে ইলম অবশ্য সতর্কতাবশত ভিন্ন শব্দে এর অনুবাদ করা থেকে বিরত থেকেছেন এবং হুবহু আরবী শব্দ ব্যবহার করে অনুবাদ করেছেন- তিনি আরশে ইসতিওয়া করলেন।

কিন্তু আরশে বসলেন, আসীন হলেন, আরোহন করলেন, উঠলেন ইত্যাদি অনুবাদ করা সঠিক নয়, বরং বিভ্রান্তিকর। এধরনের লঘু অনুবাদ  মাখলূকের ক্ষেত্রে চলতে পারে, কিন্তু যিনি মাখলূকের বৈশিষ্ট্য থেকে চিরপবিত্র এবং মালিকুল মুলকতাঁর শানে এধরনের লঘু অনুবাদ চলে না। এ সম্পর্কে পরবর্তীতে স্বতন্ত্র প্রবন্ধে আরো বিশদ আলোচনার প্রয়াস পাব, ইনশাআল্লাহ।

সিফাতের মর্ম অনুধাবনের নীতি

এই নীতির উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তাআলার সিফাতসমূহ মানুষের পক্ষে যেভাবে বোঝা সম্ভব বা যেভাবে বোঝা উচিত তা বর্ণনা করা। এই নীতিটিকে দুই ভাগে ভাগ করে আলোচনা করা যায়। প্রথম ভাগের সারসংক্ষেপ হল, ইলাহী সিফাত কল্পনা করা যায় না, বরং বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সিফাতের শুধু অস্তিত্ব এজমালীভাবে উপলব্ধি করা যায়। আর দ্বিতীয় ভাগের সারসংক্ষেপ হল, সিফাতকে তার সত্তাগত স্বরূপ দিয়ে নয়, বরং দৃশ্যমান প্রভাব ও ফলাফল দিয়ে পরোক্ষভাবে বুঝতে হয়।

সুতরাং মহান আল্লাহর যত সিফাত ও গুণাবলি কুরআন ও হাদীসের মাধ্যমে জানা যায়, আমরা তার অস্তিত্ব এজমালীভাবে জেনে ও বুঝে বিশ্বাস করি, বিস্তারিত ধরন-ধারণ কল্পনা করা ছাড়া। কারণ তাঁর কোনো গুণের স্বরূপ ও প্রকৃত ধরন-ধারণ আমাদের কাছে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত এবং আমাদের জ্ঞান-বুদ্ধির ঊর্ধ্বের বিষয়।

সিফাতকে কল্পনা করা যায় না, বরং বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সিফাতের শুধু অস্তিত্ব এজমালীভাবে উপলব্ধি করা যায়

এই প্রবন্ধের গত কিস্তিতে আল্লাহ তাআলার অনন্যতা সম্পর্কে আমরা সালাফের এই সুস্পষ্ট বক্তব্য জেনেছি-

لا تَبْلُغُه الأوهامُ ولا تُدركُه الأفهامُ ولا يشبهُ الأنامُ.

কারো কল্পনা তাঁর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না, মানুষের সমঝ-বুঝ তাঁকে বেষ্টন করতে পারে না এবং তিনি জগতের অন্য কোনো কিছুর মতো নন। -আলআকীদাতুত তহাবিয়্যাহ, পৃ. ৩৫-৩৬ (হিন্দুস্তানী নুসখা)

সালাফের অনেক মনীষী সিফাত সাব্যস্তকরণের মূলনীতি সম্পর্কে বলেছেন-

ويؤمن بها ولا يتوهم ولا يقال: كيف.

সিফাতের প্রতি (এজমালীভাবে) ঈমান রাখতে হবে। কিন্তু কল্পনা করা যাবে না এবং বলা যাবে না, তাঁর সিফাতটি কেমন? (জামে তিরমিযী, ৬৬২ নং হাদীসের অধীনে)

প্রশ্ন হল, আমরা কেন আল্লাহ তাআলার সত্তা ও সিফাতকে কল্পনা করতে পারি না? কেন তিনি আমাদের কল্পনার ঊর্ধ্বে?

তো বলার অপেক্ষা রাখে না, এর কারণ হল, তিনি মাখলূকের সাদৃশ্য ও সমশ্রেণিতা হতে চিরপবিত্র। কল্পনাশক্তি দিয়ে মানুষ কোনো কিছুর সদৃশ অনুমান করে। তো আল্লাহ তাআলার যখন কোনো সদৃশ নেই তখন তাকে কল্পনা করাও অসম্ভব। কল্পনার প্রধান উপাদান হল, ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত। মানুষ কল্পনার মাধ্যমে মূলত ইন্দ্রিয়-লব্ধ পূর্ব অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা করেই কোনো কিছু অনুমান করার চেষ্টা করে। পূর্ব অভিজ্ঞতা ও স্মৃতিকে সংশ্লেষণ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমেই কল্পনার জগৎকে গড়ে তোলে। তাই কল্পনা হল, স্মৃতিনির্ভর বিষয়। ফলে যার সম্পর্কে আমাদের কোনো স্মৃতি নেই, কিংবা যার সম্পর্কে আমাদের কোনো ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা নেই, তাকে আমরা কল্পনা করতেও অক্ষম। একারণেই আমরা আল্লাহ তাআলার সত্তা বা সিফাতকে কল্পনা করতে অক্ষম। কেননা তাঁর সত্তা ও সিফাত সম্পর্কে কিংবা এর সদৃশ সম্পর্কে আমাদের কোনো স্মৃতি বা অভিজ্ঞতা নেই।

এখন কথা হল, কল্পনা দিয়েও যদি আমরা তাঁকে অনুমান করতে না পারি তবে আমরা তাঁর অস্তিত্ব কীভাবে জানি ও উপলব্ধি করি? আসলে আমরা তাঁকে জানি ও বুঝি বুদ্ধিবৃত্তি ও যুক্তিবোধ দিয়ে, কল্পনা দিয়ে নয়। তাই মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআলার অস্তিত্বের আবশ্যকতা এবং তাঁর গুণাবলির আবশ্যকতা আমাদের বুদ্ধিগম্য জ্ঞানের বিষয়, কল্পনার বিষয় নয়।

লক্ষ করুন, এখানে বুদ্ধিগম্যতা ও যুক্তিবোধের কথা বলা হচ্ছে, কল্পনার কথা বলা হচ্ছে না। ইন্দ্রিয়ের পর্যবেক্ষণ, কল্পনাবৃত্তি এবং যুক্তিবোধের মধ্যে যে পার্থক্য তা বোঝা জরুরি; সবগুলোকে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। প্রতিটির নিজস্ব ক্ষেত্র ও সীমারেখা রয়েছে। ইন্দ্রিয় ও কল্পনা দিয়ে যাকে জানা যায় না, এমন অনেক কিছুই বুদ্ধিবৃত্তি ও যুক্তিবোধের মাধ্যমে জানা যায়। ভালো-মন্দ এবং ন্যায়-অন্যায়ের ফয়সালা তো মূলত বুদ্ধি দিয়েই করা হয়, ইন্দ্রিয় বা কল্পনা দিয়ে নয়। জগতের কত অবস্তুগত বিষয় রয়েছে, যা মানুষ যুক্তিবোধ দিয়ে অনুভব করে। সুতরাং ইন্দ্রিয়শক্তি, কল্পনাশক্তি এবং বুদ্ধিবৃত্তির ক্ষেত্র ও বিস্তৃতি সম্পর্কে সচেতন হওয়া জরুরি।

বোঝার জন্য একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। মনে করুন, কেউ আপনার ঘরের দরজায় কড়া নাড়ল। তখন আপনি কী বুঝবেন? আপনি ঘরের দরজা খুলে দেখার আগেই বুঝবেন যে, কোনো একজন জীবন্ত ও সক্ষম মানুষ আপনার ঘরের দরজার কড়া নাড়ছে। এখন সেই মানুষটি পুরুষ নাকি নারী, বেঁটে নাকি লম্বা, কালো নাকি ফর্সা- তা কি শুধু কড়া নাড়া শুনে বোঝা যাবে?

না, বোঝা যাবে না। তবে কেউ চাইলে কল্পনা করতে পারে, কিন্তু না দেখা পর্যন্ত সে নিশ্চিতভাবে কিছু বুঝতে পারবে না। অথচ কোনো একজন জীবন্ত মানুষই যে ঘরের দরজার কড়া নাড়ছে- এতটুকু বিষয় আপনি নিশ্চিতভাবেই বুঝতে পারবেন, দরজা খুলে তাকে দেখা ছাড়াই।

ঠিক তদ্রূপ, সৃষ্টিজগতে সৃষ্টিকর্ম দেখে আমরা নিশ্চিত বুঝতে পারি যে, সমগ্র বিশ্বজগতের একজন মহান সৃষ্টিকর্তা রয়েছেন, যিনি সকল উৎকৃষ্ট গুণের অধিকারী। কিন্তু তাঁর সেসব গুণাবলি তাঁর সত্তায় কীভাবে বিদ্যমান এবং কীভাবে তা থেকে সৃষ্টিকর্ম প্রকাশিত হয়- তা আমরা জানি না, জানা সম্ভবও নয়। وَلِلهِ الْمَثَلُ الْأَعْلَىআল্লাহ তাআলার জন্যই সর্বোচ্চ উদাহরণ।

সর্বোপরি যুগে যুগে আল্লাহ তাআলা মানুষের হেদায়েতে জন্য যেসব নবী ও রাসূলকে প্রেরণ করেছেন তারাও কিন্তু আল্লাহ তাআলার গুণাবলির হাকীকত ও স্বরূপ বর্ণনা করেননি কিংবা তাঁরা আল্লাহ তাআলার গুণাবলিকে মানুষের গুণাবলির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বলেননি। বরং মাখলূকের সাথে সাদৃশ্যকে সম্পূর্ণ নাকচ করেছেন। তাঁরাও সাধারণত আল্লাহ তাআলার কার্যাবলীকেই তাঁর গুণ ও মহিমার প্রমাণ হিসেবে পেশ করতেন।

দেখুন, হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম সে যুগের কাফের বাদশার সামনে আল্লাহ তাআলার রুবুবিয়্যাতের প্রমাণ হিসেবে তাঁর সৃষ্টিকর্মকেই উপস্থাপন করেছিলেন। এই ঘটনার ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে ইমাম আবু বকর জাসসাস রাহ. সুন্দর বলেছেন-

وَتَدُلُّ عَلَى أَنَّ اللهَ تَعَالَى لَا يُشْبِهُهُ شَيْءٌ وَأَنَّ طَرِيقَ مَعْرِفَتِهِ مَا نَصَبَ مِنْ الدَّلَائِلِ عَلَى تَوْحِيدِهِ; لِأَنَّ أَنْبِيَاءَ اللهِ عَلَيْهِمْ السَّلَامُ إنَّمَا حَاجُّوا الْكُفَّارَ بِمِثْلِ ذَلِكَ وَلَمْ يَصِفُوا اللهَ تَعَالَى بِصِفَةٍ تُوجِبُ التَّشْبِيهَ وَإِنَّمَا وَصَفُوهُ بِأَفْعَالِهِ وَاسْتَدَلُّوا بِهَا عَلَيْهِ.

এ আয়াতটি একথাও নির্দেশ করে যে, আল্লাহ তাআলার অনুরূপ কোনো কিছু নেই এবং আল্লাহ তাআলার পরিচয় জানার উপায় হল, তিনি নিজে তাওহীদের পক্ষে (সৃষ্টিজগতে) যেসব প্রমাণ স্থাপন করেছেন। কেননা নবীগণ এসব সৃষ্টিজাগতিক প্রমাণাদি দ্বারাই কাফেরদের বিরুদ্ধে প্রমাণ উপস্থাপন করতেন। তাঁরা আল্লাহকে এমন বিশেষণ দ্বারা বিশেষিত করতেন না, যা মাখলূকের সাথে সাদৃশ্যায়ন আবশ্যক করে তোলে। তাঁরা আল্লাহ তাআলাকে কার্যাবলি দ্বারাই বিশেষিত করতেন এবং এর দ্বারাই তাঁর ব্যাপারে প্রমাণ উপস্থাপন করতেন। -আহকামুল কুরআন, জাসসাস রাযী ১/৫৫২

তো মোদ্দাকথা হল, আল্লাহ তাআলার বিভিন্ন রকম সৃষ্টিকর্ম সম্পর্কে জেনে তা থেকে পরোক্ষভাবে আল্লাহ তাআলার গুণাবলির অস্তিত্ব উপলব্ধি করতে হয়। এ সম্পর্কে আরো বিস্তারিত কথা সামনের শিরোনামের অধীনে আসবে, ইনশাআল্লাহ।

কেন সিফাতের সত্তাগত স্বরূপ জানা সম্ভব নয়, বরং বাহ্যিক প্রভাব ও ফলাফল দিয়ে পরোক্ষভাবে বুঝতে হয়?

কেননা মহামহিম আল্লাহ তাআলার সত্তা ও সিফাতকে আমরা সরাসরি প্রত্যক্ষ করতে পারি না। সর্বোপরি, আল্লাহ তাআলা যেহেতু মাখলূকের সমশ্রেণিতা ও সাদৃশ্য হতে চিরপবিত্র, তাই অন্য কিছুর সাথে তুলনা করেও তাঁকে অনুমান করা যায় না। তাই তাঁর সিফাতের হাকীকত বা প্রকৃত ধরন-ধারণ বা সিফাতটি বাস্তবে তাঁর সত্তায় যেভাবে অস্তিত্বমান তা বিস্তারিতভাবে জানা ও বোঝা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। বরং দৃশ্যমান সৃষ্টিজগতে যখন তাঁর কার্যাবলি দেখি এবং অদৃশ্য জগতে তাঁর যেসব কার্যাবলি আছে- তা কুরআন ও হাদীসের  মাধ্যমে জানতে পারি, তখন কার্যকারণরূপে তাঁর সত্তাগত সিফাতসমূহ থাকার কথা পরোক্ষভাবে জানতে পারি এবং এজমালীভাবে বা মোটামুটিভাবে বুঝতে পারি।

আসলে কাজ, প্রভাব ও ফলাফল দেখে গুণের পরিচয় লাভ করা সহজ। কারণ কাজ ও ফলাফল সাধারণত বাহ্যিক ও দৃশ্যমান বিষয়ই হয়ে থাকে কিংবা এমন বুদ্ধিগম্য কোনো বিষয় হয়ে থাকে, যা বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে অনুধাবন করা আমাদের পক্ষে সহজ। যেমন দেখুন, আমরা কোনো ব্যক্তিকে জীবিত বলি, কারণ আমরা তার মাঝে জীবনের লক্ষণ দেখতে পাই (সরাসরি রূহ বা জীবনীশক্তিকে নয়)। কোনো ব্যক্তিকে ন্যায়বান বলি, কারণ তার থেকে ন্যায় ও ইনসাফের আচরণ প্রকাশ পায়। কাউকে জালিম বলে থাকি, কারণ তার থেকে জুলুমের আচরণ প্রকাশ পায়।

অনেক ক্ষেত্রে আমরা দেখি, কোনো কারিগরের কর্ম দেখে তার কর্মগত গুণসমূহের অস্তিত্ব সহজেই অনুমান করা যায়, যদিও সেই গুণসমূহ বাস্তবে সরাসরি প্রত্যক্ষ করা যায় না। যেমন, মানুষের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা, আকল ও বুদ্ধি, আবেগ ও ভালবাসা ইত্যাদি। কেবল বাহ্যিক ফলাফল ও প্রতিক্রিয়া দেখে এসবের অস্তিত্ব অনুমান করতে হয়। কেননা এসব গুণ বেশিরভাগই মূলত আমাদের পঞ্চেন্দ্রিয়ের গোচরিভূত নয়। তাই কোনো গুণের স্বরূপ কী, তার মূল উৎস ও কারণ কী এবং তা ব্যক্তির মাঝে কীভাবে বিদ্যমানÑ এসব প্রশ্নের জবাব মানুষের গুণাবলির ক্ষেত্রেও সহজবোধ্য নয়। এসব ব্যাখ্যার জন্য প্রয়োজন হয় গভীর পর্যবেক্ষণ এবং সূক্ষ্ম চিন্তা ও গবেষণার, যা মূলত দর্শন ও বিজ্ঞানের কাজ। বরং দর্শন ও বিজ্ঞানের সাহায্যেও অনেক সময় মানবীয় অনেক গুণের এবং প্রাকৃতিক অনেক বিষয়ের স্বরূপ জানা যায় না। শুধু প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া দেখে অনুভব করতে হয়। যেমন, আমরা আকর্ষণ-বিকর্ষণ দেখে চুম্বকশক্তিকে জানি, কিন্তু চুম্বকশক্তির স্বরূপ জানি না। আমরা বিদ্যুতশক্তিকে জানি তার কাজ দিয়ে, কিন্তু সরাসরি বিদ্যুৎশক্তির স্বরূপ জানি না।

তদ্রূপ আমরা যদিও মহামহিম আল্লাহর পবিত্র সত্তা ও তাঁর গুণাবলি সরাসরি দেখতে পাই না এবং তাঁর গুণাবলির স্বরূপ যদিও মানবীয় জ্ঞান-বুদ্ধির ধরা-ছোঁয়ার ঊর্ধ্বে; কিন্তু আমরা তাঁর কুদরত ও হিকমত এবং রহমত ও করুণা ইত্যাদি বহু গুণের প্রভাব ও প্রকাশ সৃষ্টিজগতে প্রত্যক্ষ করে অভিভূত হই। আর এভাবে জগতের বস্তুনিচয় ও ঘটনাবলির মাঝে সৃষ্টিকর্তার গুণের প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করার মধ্য দিয়ে আমরা তাঁর গুণাবলির অস্তিত্বকে অনুভব করি।

যেমন আমরা তাঁর রহমত ও দয়া গুণের প্রকাশ দেখতে পাই মানুষের জীবন ধারণজীবন রক্ষার এবং জীবন যাপনের হরেক রকম উপায়-উপকরণের মাঝে। বৃষ্টির পানি, সজীব উর্বর ফসলি জমি, সজীব গাছপালা ও তরুলতা, শস্য-ফসল এবং ফুল ও ফলসহ অগণিত নিআমতরাজির মাঝে। আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজীদে ইরশাদ করেন-

فَانْظُرْ اِلٰۤي اٰثٰرِ رَحْمَتِ اللهِ كَيْفَ يُحْيِ الْاَرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا   اِنَّ ذٰلِكَ لَمُحْيِ الْمَوْتٰى  وَ هُوَ عَلٰى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ.

আল্লাহর রহমতের ফল লক্ষ কর, তিনি কীভাবে ভূমিকে তার মৃত্যুর পর জীবন দান করেন।

বস্তুত তিনি মৃতদের জীবনদাতা এবং তিনি সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান। -সূরা রূম (৩০) : ৫০

উক্ত আয়াতে মৃত বিরাণ ভূমিকে বৃষ্টিপাতের মাধ্যমে জীবন দান এবং তা থেকে মানুষ ও প্রাণিকুলের জন্য শস্য-ফসল উদ্গমনের ঘটনাকে আল্লাহর রহমতের ফল ও নিদর্শনরূপে উল্লেখ করা হয়েছে এবং তা পর্যবেক্ষণের আদেশ করা হয়েছে। তো এসব নিদর্শন দেখে খুব সহজেই আল্লাহর দয়া গুণের পরিচয় পাওয়া যায়।

এভাবে কুরআনের অনেক আয়াতে আল্লাহ তাআলা মাখলূক ও সৃষ্টিকে তাঁর অস্তিত্বের, তাঁর গুণাবলির এবং তাঁর একত্বের প্রমাণ ও নিদর্শনরূপে উল্লেখ করেছেন। কুরআন কারীমে এধরনের নিদর্শনাবলিকে আয়াতনামে অভিহিত করা হয়েছে। আয়াত মানে আলামত, যা কোনো কিছুকে নির্দেশ করে। দেখুন সূরা বাকারার ১৬৪ নং আয়াতে ইরশাদ হয়েছে-

 اِنَّ فِيْ خَلْقِ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضِ وَ اخْتِلَافِ الَّيْلِ وَ النَّهَارِ وَ الْفُلْكِ الَّتِيْ تَجْرِيْ فِي الْبَحْرِ بِمَا يَنْفَعُ النَّاسَ وَ مَاۤ اَنْزَلَ اللهُ مِنَ السَّمَآءِ مِنْ مَّآءٍ فَاَحْيَا بِهِ الْاَرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا وَ بَثَّ فِيْهَا مِنْ كُلِّ دَآبَّةٍ  وَّ تَصْرِيْفِ الرِّيٰحِ وَ السَّحَابِ الْمُسَخَّرِ بَيْنَ السَّمَآءِ وَ الْاَرْضِ لَاٰيٰتٍ لِّقَوْمٍ يَّعْقِلُوْنَ.

নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলি ও পৃথিবীর সৃজনে, রাত দিনের একটানা আবর্তনে, সেই সব নৌযানে, যা মানুষের উপকারী সামগ্রী নিয়ে সাগরে বয়ে চলে, সেই পানিতে, যা আল্লাহ আকাশ থেকে বর্ষণ করেছেন এবং তার মাধ্যমে ভূমিকে তার মৃত্যুর পর সঞ্জীবিত করেছেন ও তাতে সর্বপ্রকার জীব-জন্তু ছড়িয়ে দিয়েছেন এবং বায়ুর দিক পরিবর্তনে এবং সেই মেঘমালাতে, যা আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যে আজ্ঞাবহ হয়ে সেবায় নিয়োজিত আছে- এসবের মাঝে বহু নিদর্শন আছে সেইসব লোকের জন্য, যারা নিজেদের জ্ঞান-বুদ্ধিকে কাজে লাগায়। -সূরা বাকারাহ (২) : ১৬৪

এসব আয়াতে আমাদেরকে গুণের নিদর্শন দেখতে বলা হয়েছে, গুণের সত্তাগত স্বরূপ নিয়ে ভাবতে বলা হয়নি। এভাবে আপনি যদি কুরআন কারীমে ইলাহী সিফাত সংক্রান্ত আয়াতগুলো তাদাব্বুর ও গভীর অনুধ্যানের সঙ্গে অধ্যয়ন করেন তবে দেখতে পাবেন, যেখানেই আল্লাহ তাআলার সিফাতের আলোচনা এসেছে সেখানে সেই সিফাতের কাজ বা প্রভাব ও ফলাফলও উল্লিখিত হয়েছে। কোথাও যদি নিছক সিফাতী শব্দ উল্লিখিত হয়ে থাকে তবে সেই সিফাতের কাজ ও প্রভাবের কথা অন্য আয়াতে অবশ্যই উল্লিখিত হয়েছে। তাই আপনি যদি কুরআন মাজীদে আল্লাহ তাআলার সিফাত সংক্রান্ত আয়াতসমূহ পূর্বাপর প্রসঙ্গসহ তাদাব্বুর ও চিন্তা-ভাবনা করেন তবে সেসব সিফাতের মর্ম, দাবি ও বার্তা আপনার কাছে অস্পষ্ট থাকবে না, ইনশাআল্লাহ।

তাই আল্লাহ তাআলার সিফাতের পরিচয় লাভের জন্য সিফাতের হাকীকত ও স্বরূপ জানার প্রয়োজন নেই, বরং সিফাতের ফলশ্রুতিগত মর্ম বা ফলাফলগত বৈশিষ্ট্য জানাই যথেষ্ট। এটাই কোনো গুণ ও সিফাতের পরিচয় লাভের সহজ-সরল ও স্বাভাবিক পদ্ধতি।

যেমন দেখুন, দয়া গুণের বৈশিষ্ট্য হল, এটি এমন এক গুণ ও যোগ্যতা, যা ব্যক্তিকে অন্যের কল্যাণকামনায় এবং কল্যাণসাধনে উদ্বুদ্ধ করে। এই অর্থে আমরা বিশ্বাস রাখি, মহান আল্লাহ দয়া নামক মহৎ গুণের অধিকারী, যার কারণে তিনি মাখলূককে কল্যাণ দান করেন এবং অকল্যাণ থেকে রক্ষা করেন। এখন তাঁর সেই দয়া গুণের স্বরূপ কী এবং তা কীভাবে তাঁর সত্তায় বিদ্যমান- এসব তাত্ত্বিক ও দার্শনিক বিষয়। এই তত্ত্ব তালাশের আদেশ আমাদেরকে করা হয়নি। তাই এর পেছনে পড়ার দরকার নেই।

তবে আমরা দৃঢ় বিশ্বাস রাখি, তাঁর দয়া গুণের হাকীকত ও স্বরূপ মাখলূকের দয়া গুণের হাকীকত ও স্বরূপ হতে সম্পূর্ণ ভিন্ন। মাখলূকের দয়া গুণের হাকীকত হল, তা তার হৃদয়ের একধরনের আবেগ ও  প্রতিক্রিয়া বা মনের দরদ ও ব্যাথা, যা তাকে অন্যের কল্যাণকামনায় তাড়িত করে। কিন্তু বলার অপেক্ষা রাখে না, আল্লাহর দয়া গুণের হাকীকত এমন মানবীয় আবেগ হওয়া অসম্ভব। তাঁর গুণ তাঁর শান উপযোগী, কোনো মাখলূকের মতো নয়। মহামহিম আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পবিত্র সত্তা ও গুণাবলি এবং তাঁর কার্যসম্পাদন প্রক্রিয়া অন্য কারো মতো বা অন্য কোনো কিছুর মতো নয়। তিনি তো মাখলূকের সমশ্রেণিতা ও সাদৃশ্য হতে চিরপবিত্র। সুতরাং মাখলুকের সঙ্গে তুলনা করে খালিকের কোনো কিছুর স্বরূপ ও প্রকৃত ধরন-ধারণ জানা আমাদের পক্ষে অসম্ভব। দর্শন বা বিজ্ঞানের কোনো সূত্র দ্বারাই তা সম্ভব নয়। তাঁর সত্তা যেমন অসদৃশ, অতুলনীয়, তেমনি তাঁর গুণ ও ক্রিয়াও অতুলনীয়, অসদৃশ ও অকল্পনীয়। সুতরাং আমরা তাঁর সকল গুণাবলির প্রতি ঈমান রাখি কোনোরূপ সাদৃশ্য কল্পনা ছাড়া।

فَانْظُرْ  إِلَى آثَارِ رَحْمَتِ اللهِ.

এই আয়াতে আল্লাহ তাআলার রহমত ও দয়ার ফলাফল ও নিদর্শনাবলি চিন্তা করতে বলা হয়েছে; তাঁর দয়াগুণের সত্তাগত স্বরূপ নিয়ে ভাবতে বলা হয়নি। তো কেন রহমতের ফল ও প্রভাব দেখতে বলা হল, সরাসরি রহমত গুণকে দেখতে বলা হল না?

এই প্রশ্নের জবাবে প্রখ্যাত ফকীহ ও মুহাদ্দিস ইমাম ইবনুস সালাহ রাহ. (ওফাত : ৬৪৩ হি.) বলেছেন-

إنما كان ذلك كذلك، لأن الآية واردة للأمر بالنظر إلى المطر الذي يحيي الأرض بعد موتها، والمطر الذي هذا شأنه، وسائر صنوف الأنعام آثار للرحمة، لا نفس الرحمة، فإن الرحمة عند المحققين من صفات الذات نحو الإرادة، ولا سبيل إلى النظر إليها، ومهما سمي المطر وغيره من وجوه الإنعام رحمة فعلى سبيل التجوز، والأصل هو الأول.

রহমতের ফল দেখার আদেশ করা হয়েছে, কারণ আয়াতটিতে মূলত মানুষকে দেখার আদেশ করা হয়েছে সেই বৃষ্টিকে, যা মৃত যমীনকে সজীব করে। আর বৃষ্টি ও অন্যন্যা নিআমত তো আসলে আল্লাহ তাআলার সিফাতে রহমত নয়, বরং সিফাতে রহমতের ফল ও প্রভাব। কেননা মুহাক্কিক আলেমদের মতে রহমতহল, আল্লাহ তাআলার একটি সত্তাগত গুণ, যেমন ইরাদাহ বা ইচ্ছা হল, আল্লাহ তাআলার একটি সত্তাগত গুণ। আর এই সত্তাগত গুণকে সরাসরি দেখার কোনো উপায় নেই। সুতরাং যেসব আয়াতে বৃষ্টি ও অন্যান্য নিআমতকে সরাসরি রহমত নামে ব্যক্ত করা হয়েছে তা মূলত রূপক অর্থে। অন্যথায় প্রকৃত ব্যাপার তা-ই, যা প্রথমে বলা হল। -ফাতাওয়া ইবনিস সালাহ ১/১৫২

সিফাতে ইলাহীকে যে তার প্রভাব ও ফলাফল দিয়ে বুঝতে হবে, হাকীকত ও স্বরূপ দিয়ে নয়- এই বাস্তব ও মৌলিক কথাটি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর পূর্ববর্তী ও পরবর্তী উলামায়ে কেরাম বিভিন্ন ভাষায় বিভিন্ন আন্দাযে বলেছেন। যারাই সিফাতের শব্দ ও অর্থ সাব্যস্ত করা সত্ত্বেও সিফাতের হাকীকত নিয়ে তত্ত্ব-তালাশকে নিষেধ করেছেন এবং কল্পনাশক্তি দিয়ে সিফাতকে কল্পনা করাকে নিষেধ করেছেন- এমন সকলের বক্তব্যের সারমর্ম এটাই, যা আমরা উপরে সবিস্তারে উল্লেখ করেছি। এখন এখানে সবার বক্তব্য উল্লেখ করতে গেলে লেখার কলেবর অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে। তাই আমরা এখানে কয়েকজন আলেমের শুধু কয়েকটি কিতাবের উদ্ধৃতির উল্লেখ করছি। যাতে আগ্রহী পাঠকগণ সেসব কিতাবে এই নীতির কথা সহজে অধ্যয়ন করতে পারেন। যেমন : তাবীলাতু আহলিস সুন্নাহ, ইমাম মাতুরিদী (সূরা যুমারের ৬৭ নং আয়াতের তাফসীর) ৮/৭০৪; আহকামুল কুরআন, জাসসাস (সূরা বাকারার ২৫৮ নং আয়াতের তাফসীর) ১/৫২৫; হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ, শাহ ওয়ালীউল্লাহ ১/১২২; আততাফহীমাতুল ইলাহিয়্যাহ, শাহ ওয়ালীউল্লাহ, ১/১০৯; রহমাতুল্লাহিল ওয়াসিআহ, সাঈদ পালনপুরী ১/৬৩৪-৬৩৮; আবাক্বাত, শাহ ইসমাঈল শহীদ রাহ., পৃ. ৭২-৭৬; আলআলামুশ শামিখ ফী ঈছারিল হক আলাল আ-বা ওয়াল মাশায়িখ, সালেহ মাকবালীপৃ. ১১৬, ১২৪

সবশেষে ইলাহী সিফাতের এছবাতের নীতি সম্পর্কে পূর্ববর্তী ফকীহ ও মুহাদ্দিসদের একটি সুসংক্ষিপ্ত ও গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য উল্লেখ করছি-

فإذا كان معلوما أن إثبات الباري سبحانه إنما هو إثبات وجود، لا إثبات كيفية، فكذلك إثبات صفاته إنما هو إثبات وجود، لا إثبات تحديد وتكييف.

একথা সবার জানা যে, আল্লাহ তাআলাকে এছবাত করার অর্থ হল, তাঁর অস্তিত্ব সাব্যস্ত করা, কাইফিয়্যাত বা ধরন সাব্যস্তকরণ নয়। তাই তাঁর সিফাত সাব্যস্ত করার উদ্দেশ্য হল, সিফাতের শুধু অস্তিত্ব সাব্যস্ত করা, সীমারেখা কিংবা ধরন-ধারণ সাব্যস্ত করা নয়। (আলকালাম আলাস সিফাত, খতীব বাগদাদী, পৃ. ২২; মাজমূউল ফাতাওয়া, ইবনে তাইমিয়া ৫/৫৯)

সুতরাং আমরা আল্লাহ তাআলার গুণের অস্তিত্বকে এজমালীভাবে বিশ্বাস করি, বিস্তারিত ধরন-ধারণ কল্পনা ছাড়া। আমাদের সালাফ তথা সহাবা-তাবেয়ীন ও তাবে-তাবেয়ীন এমনটাই করতেন। তবে যখন ইহুদী-নাসারারা, মুলহিদ-যিনদীক দার্শনিকরা এবং বিদআতীরা ইসলামের মুতাওয়ারাছ বিভিন্ন আকীদার ব্যাপারে এবং ইলাহী সিফাতের ব্যাপারে নানা রকম অমূলক সন্দেহ-সংশয় ও আপত্তি উত্থাপন শুরু করে এবং সেগুলোকে তারা দর্শন ও যুক্তি-বুদ্ধির মোড়কে পেশ করতে থাকে তখন তাদের খণ্ডন ও প্রতিরোধের জন্য আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের অনুসারী কালামশাস্ত্রবিদগণ নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তাঁরা ইসলামী আকীদাসমূহের পক্ষে যৌক্তিক প্রমাণাদি সরবরাহের প্রতি মনোনিবেশ করেন, যুক্তি-বুদ্ধির আলোকে আকীদাসমূহের আরো অধিকতর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেন এবং আকীদাগুলোকে যুক্তির ভাষায় এবং যুক্তির আঙ্গিকে নতুনভাবে উপস্থাপন শুরু করেন। এটা করতে গিয়ে তাঁরা ইলাহী সিফাতের ব্যাখ্যায় এজমালের পরিবর্তে তফসীলী ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ শুরু করেন এবং এমনসব তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার উদ্ভব ঘটান, যা পূর্ববর্তী সালাফের যুগে ছিল না এবং যার সাথে কোনো আমলী মাসআলা জড়িত নয়। তারা এসব তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা করেছেন সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসেবে, সুনিশ্চিত ও অবশ্যম্ভাবী ব্যাখ্যা হিসেবে নয়। বুদ্ধিবৃত্তিক হামলার মোকাবেলায় বুদ্ধিবৃত্তিক জবাব হিসেবে এবং সন্দেহ-সংশয়ের দাওয়া ও চিকিৎসা হিসেবে, মৌলিক আকীদা হিসেবে নয়। অন্যথায় আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর কালামশাস্ত্রবিদদের মতেও আসলে ইলাহী সিফাতের প্রকৃত ধরন-ধারণ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট ও সুনিশ্চিত কিছু বলা যায় না। তাই প্রয়োজন ছাড়া এসব তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ থেকে বিরত থাকাই শ্রেয় ও নিরাপদ। (দ্রষ্টব্য : তাবয়ীনু কাযিবিল মুফতারি, ইবনু আসাকির, পৃ. ৮৩-৮৪, ২৮৬-২৮৭; উলূম ও ফুনুন ও নেসাবে তালীম, হযরত থানবী, সংকলনে : যায়েদ মাযাহিরী, পৃ. ৮৮-৯৫)

আর তাই মুহাক্কিক মুতাকাল্লিমগণ ইলাহী সিফাত সম্পর্কে কালামশাস্ত্রীয় তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণকে সর্বসাধারণের জন্য উপযোগী মনে করতেন না, বরং এগুলোকে তারা দর্শন ও যুক্তি-প্রেমিকদের দাওয়া হিসেবে সরবরাহ করতেন। যেমন আমরা দেখি, ইমাম গাযালী রাহ. প্রখ্যাত মুতাকাল্লিম হওয়া সত্ত্বেও তাঁর বিভিন্ন কিতাবে কালামশাস্ত্রের তাত্ত্বিক ও চুলচেরা বিশ্লেষণ থেকে আওয়ামকে বিরত রাখার ও বিরত থাকার ওসীয়ত করেছেন। আর এটাই হল, শরীয়তের সেই উসূলের দাবি, যা খলীফায়ে রাশেদ হযরত আলী ইবনু আবী তালিব রা. নিম্নোক্ত ভাষায় ব্যক্ত করেছেন-

حَدِّثُوا النَّاسَ بِمَا يَعْرِفُونَ، أَتُحِبُّونَ أَنْ يُكَذَّبَ اللهُ وَرَسُولُهُ.

তোমরা মানুষকে এমন কথা বর্ণনা করো, যা তারা বুঝতে সক্ষম; তোমরা কি চাও আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হোক?! -সহীহ বুখারী, হাদীস ১২৭

এ তো গেল হকপন্থী ঐসব মুতাকাল্লিমদের কালামী ব্যাখ্যার মাকসাদ ও হুকুমের কথা, যারা মূলত আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর আকায়েদকেই যৌক্তিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণাদি দ্বারা সাব্যস্ত করেছেন এবং যুক্তিবিদ্যার ভাষায় ও আঙ্গিকে উপস্থাপন করেছেন। বাকি থাকল আহলে বিদআতের কালামশাস্ত্রের কথা। তো তারা যেহেতু দ্বীনের বিভিন্ন আকীদার ব্যাপারে এবং ইলাহী সিফাত সম্পর্কে ভুল ও বিচ্ছিন্ন ব্যাখ্যাকে কিংবা দূরবর্তী ব্যাখ্যাকে আকীদার অংশ বানিয়েছে, তাই তাদের কালামশাস্ত্রীয় ব্যাখ্য-বিশ্লেষণ নিন্দিত ও বর্জনীয়।

কিন্তু আফসোসের বিষয় হল, আজকাল দেখা যায়, সালাফের অনুসরণের দাবিদার সালাফী ভাইয়েরা না বুঝে পাইকারীভাবে কালামশাস্ত্রের নিন্দা করে থাকে। আরো আশ্চর্যের বিষয় হল, তারা হকপন্থী আশআরী ও মাতুরিদী আলেমদের বিরোধিতা করতে গিয়ে নিজেরা অজান্তে আহলে বাতিল ও আহলে বিদআতের নিন্দিত কালামী ব্যাখ্যার শিকার হয়েছেন। দেখা যায়, ইলাহী সিফাত সম্পর্কে তাদের অনেক ব্যাখ্যাই কাররামী বিদআতী ফিরকার ভুল ও শায ব্যাখ্যার সঙ্গে মিলে যায়। তাই এটা এক অপ্রিয় সত্য যে, ইলাহী সিফাত সম্পর্কে বর্তমানের প্রচলিত সালাফী নীতি ও ব্যাখ্যা সালাফের অনুসৃত নীতি ও ব্যাখ্যা থেকে আলাদা। বরং তাদের নীতি ও ব্যাখ্যা আসলে কাররামী ও বিদআতী কালামশাস্ত্রের নতুন সংস্করণ। এই হাকীকত ও সত্যের উন্মোচনে আরবী ভাষায় একাধিক গবেষণা প্রবন্ধ ও গ্রন্থ রচিত হয়েছে। আগ্রহী পাঠক তা পড়ে দেখতে পারেন। এ ধরনের কিছু গ্রন্থের নাম এখানে উল্লেখ করছি :

১- السيف الصقيل في الرد على ابن زفيل، للإمام تقي الدين السبكي، مع حاشية الشيخ زاهد الكوثري.

২-المدرسة السلفية وموقف رجالها من المنطق وعلم الكلام، للدكتور محمد عبد الستار نصار.

৩- السلفية مرحلة زمنية مباركة لا مذهب إسلامي، للشيخ محمد سعيد رمضان البوطي.

৪- المحكم والمتشابه في القرآن الكريم، للدكتور إبراهيم عبد الرحمن خليفة.

৫- ابن تيمية ليس سلفيا، للشيخ منصور محمد محمد عويس.

৬- موقف السلف من المتشابهات: دراسة نقدية لمنهج ابن تيمية للشيخ محمد عبد الفضيل القوصي.

৭- بعض أفكار ابن تيمية في العقيدة: عرض وتحليل، للشيخ محمد سالم أبو عاصي.

৮- القول التمام بإثبات التفويض مذهبا للسلف الكرام، للشيخ سيف العصري.

৯- الكاشف الصغير عن عقائد ابن تيمية: للشيخ سعيد عبد اللطيف فودة

১০- السادة الحنابلة واختلافهم مع السلفية المعاصرة، للشيخ مصطفى حمدون عليان الحنبلي.

 

 

advertisement