যীকা'দাহ - ১৪৩১   ||   নভেম্বর - ২০১০

ঐক্য ও সংযমের ইবাদতে কেন এত অনৈক্য ও অসংযম

মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক

ইসলাম তাওহীদের দ্বীন, যা মুসলমানদের সব ধরনের শিরক থেকে বেঁচে থাকার এবং তাওহীদের সূত্রে একতাবদ্ধ থাকার আদেশ করে। দ্বীন ইসলামের দৃষ্টিতে তাওহীদ ও ইত্তিহাদ এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, এটাই গোটা মিল্লাতের সীমানা এবং  শরীয়তের সকল আহকাম ও আমর-নাহীর বুনিয়াদ।

ইসলাম মুসলমানদেরকে যে জীবনাদর্শ দান করেছে তাতে          বিভিন্নভাবে তাওহীদ ও ইত্তিহাদের চর্চা করানো হয়েছে। যদিও সকল ইবাদতে আছে তাওহীদের মশ্‌ক এবং সকল ইজতিমায়ী কাজে আছে ঐক্যের অনুশীলন, কিন্তু ইসলামের পঞ্চম রোকন হজ্ব এমন একটি ইবাদত, যা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তাওহীদ ও ইত্তিহাদের জীবন্ত নিদর্শন। এজন্য  এখান থেকে গুরুত্বের সাথে তাওহীদ ও ইত্তিহাদের সবক নেওয়া উচিত।

আজকের অবসরে এ বিষয়ে কিছু কথা নিবেদন করব।

হজ্ব বিশ্বজনীন ইসলামী ভ্রাতৃত্বের বলিষ্ঠ প্রকাশ

সর্বপ্রথম কথা, যা মাওলানা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভীর ভাষায় : একথা সত্য যে, ঔপনিবেশিক শাসন ও বৃহ শক্তিবর্গের কূটনৈতিক শঠতার ফলে ইসলামী উম্মাহ আজ বিভিন্ন বর্ণের জাতীয়তাবাদের অভিশাপের শিকার হয়ে পড়েছে। হজ্ব হচ্ছে সেই খণ্ডিত, কৃত্রিম ও অভিশপ্ত জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বজনীন মহান ইসলামী জাতীয়তাবাদের বিজয়-উৎসব। এখানে এসে একাকার হয়ে যায় বিশ্বের শত কোটি তাওহীদবাদী মুসলমান। মুছে যায় ভাষা ও বর্ণের সব ব্যবধান। ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায় মানুষের হাতে গড়া ভৌগোলিক সীমারেখার বিভেদ-প্রাচীর। স্ব স্ব জাতীয় পোশাক ও পরিচয়, এত দিন যা ছিল তাদের একান্ত গর্বের, একান্ত আপনার, ত্যাগ করে তারা অঙ্গে ধারণ করে ইহরাম নামের শ্বেতশুভ্র একক ইসলামী জাতীয় পোশাক। চোখের পানিতে, আবেগের উচ্ছ্বাসে ও হৃদয়ের ভাষায় যে কোনো তফাৎ নেই তার বাস্তব প্রমাণ মেলে তালবিয়ায়। একই ভাষায়, একই সুরে, একই তালে লক্ষ লক্ষ হাজীর কণ্ঠে ধ্বনিত হজ্ব-সংগীতের মিষ্টি মধুর সুরমূর্ছনায়-

হে প্রভু! আমি হাজির। আমি হাজির, তোমার কোনো শরীক নেই। আমি হাজির। তোমারই সকল প্রশংসা ও নিয়ামত। তোমারই বাদশাহী। তোমার কোনো শরীক নেই।

এখানে আমীর-গরীব ও বান্দা-মনিবের কোনো তফাৎ নেই। নেই ছোট-বড়র কোনো ভেদাভেদ, নেই শাসিতের হীনম্মন্যতা ও শাসকের প্রভুত্বসুলভ অহঙ্কার। ইহরামের শ্বেতশুভ্র পোশাকে ও লক্ষ কণ্ঠের ভাবগম্ভীর লাব্বাইকা ধ্বনিতে সবকিছু ছাপিয়ে ভেসে উঠে সর্বজনীন ইসলামী বিশ্ব-ভ্রাতৃত্বের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। হজ্বের প্রতিটি আহকামে, প্রতিটি গতিবিধিতে সেই একই দৃশ্য জুড়িয়ে দেবে আপনার হৃদয়প্রাণ। ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দেবে ভাষা, বর্ণ ও রক্ত-কৌলিন্যের মিথ্যা অভিমান। এখানে এসে কাঁধে কাঁধ মিলিয়েছে দূর-নিকটের সাদা-কালো মুসলমান। বুকে বুক মিলিয়েছে আরব-আজমের আদমসন্তান। একসাথে তারা দৌড়াচ্ছে সাফা-মারওয়ার মাঝে, চলেছে মিনা-আরাফার পথে। অশ্রুসিক্ত চোখে, কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে দুহাত তুলে মুনাজাত করছে জাবালে রহমতের পাদদেশে। মুযদালিফার খোলা আকাশের নিচে, নরম বালুর বিছানায় একসাথে কাটছে সবার রাত। বিশ্ব-মানবতার মিলন্তঐক্যের সে কী অপূর্ব প্রকাশ!

فاذا افضتم من عرفت فاذكروا الله عند المشعر الحرام واذكروه كما هداكم وان كنتم من قبله لمن الضالين

‘‘অতপর যখন তোমরা দলে দলে আরাফা থেকে ফিরবে তখন মাশআরে হারামের নিকট আল্লাহর যিকর করবে এবং তাঁর প্রদর্শিত পথে তাঁর যিকির করবে। এর পূর্বে নিশ্চয়ই তোমরা অজ্ঞ ছিলে।’’ (সূরা বাকারা : ১৯৮)

অভিন্ন সবার গতি ও অবস্থান : একসাথে চলা, একসাথে থামা এবং একসাথে মক্কায় ফিরে আসা।

ثم افيضوا من حيث افاض الناس واستغفروا الله ان الله غفور رحيم

‘‘হ্যাঁ, তোমরা ঠিক ততদূর গিয়ে ফিরে আসবে যতদূর অন্যরা যায় এবং আল্লাহর কাছে তোমরা মাগফিরাত কামনা কর। নিঃসন্দেহে আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়াময়।’’

পৃথিবীতে হজ্ব ইনশাআল্লাহ কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে। কোনো জাতীয়তাবাদী আহ্বান ও অনৈসলামী শ্লোগানই হাজারো ত্রুটি ও দুর্বলতা সত্ত্বেও ইসলামী উম্মাহকে সম্পূর্ণরূপে গ্রাস করতে পারবে না কিছুতেই। স্বদেশপ্রেম তাদের যত গভীর হোক, জন্মভূমির আলো-বাতাস যত প্রিয়ই হোক, পৃথিবীর কোনো শক্তিরই সাধ্য নেই তাদের কাবাকেন্দ্রিক জীবনের এই পরিক্রমাকে ভিন্ন কোনো কেন্দ্রবিন্দুতে আবর্তিত করার। কিয়ামত পর্যন্ত বাইতুল্লাই থাকবে ইসলামী উম্মাহর প্রাণপ্রিয় কিবলা। কিবলামুখী হয়েই প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করবে পৃথিবীর শত কোটি তাওহীদবাদী মুসলমান। হজ্ব-মৌসুমে এখানেই তারা ছুটে আসবে প্রেমদগ্ধ হৃদয়ের জ্বালা মেটাতে। 

اذ جعلنا البيت مثابة للناس وامنا واتخذوا من مقام ابراهيم مصلى

আর (সে সময়ের কথা স্মরণ করুন)- যখন পবিত্র কাবা ঘরকে আমি মানুষের জন্য আশ্রয় ও নিরাপত্তার কেন্দ্র নির্ধারণ করেছি। আর মাকামে ইবরাহীমকে সালাতের স্থানরূপে নির্বাচন করে নাও। (সূরা বাকারা : ১২৫)

[আরকানে আরবাআ (মূল) পৃ. ৩২৫-৩২৭, অনুবাদ : মাওলানা আবু তাহের মিসবাহ পৃ. ২৯২-২৯৪]

বিদায় হজ্বের খোৎবায় ইত্তিহাদের দাওয়াত

দ্বিতীয় কথা এই যে, হজ্বের সকল আরকান ও আহকাম ইত্তিহাদের শিক্ষায় পরিপূর্ণ থাকা সত্ত্বেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোটা উম্মতের সামনে আরাফার ময়দানে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন।

يا ايها الناس! ألا إن ربكم واحد، وإن أباكم واحد، ألا لا فضل لعربي على عجمي ولا لعجمي على عربي ولا لأحمر على أسود، ولا أسود على أحمر إلا بالتقوى أبلغت؟ قالوا : بلغ رسول الله صلى الله عليه وسلم، قال الهيثمي : رجاله رجال الصحيح.

হে লোকসকল! জেনে রেখো, তোমাদের রবএকজন এবং তোমাদের আব’ (পিতা) ও একজন। জেনে রেখো, অনারবের উপর আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই এবং আরবের উপরও অনারবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কালোর উপর সাদার এবং সাদার উপরও কালোর কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র ভিত্তি তাকওয়া। আমি কি তোমাদেরকে পৌঁছে দিয়েছি? তারা বললেন, আল্লাহর রাসূল পৌঁছে দিয়েছেন। (মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ২৩৪৮৯)

আরো বলেছেন,

هذا يوم عرفة ...

আজকের এই দিবস মহিমান্বিত। এই ভূখণ্ড মহিমান্বিত। তোমাদের প্রত্যেকের জান্তমাল, ইজ্জত-আব্রূ অন্যের জন্য এই দিবস ও ভূখণ্ডের মতোই সম্মানিত। তাঁর সাথে সাক্ষাতের দিন পর্যন্ত। ...

আমি কি তোমাদেরকে বলব, মুসলিম কে? মুসলিম ঐ ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে সকল মুসলিম নিরাপদ থাকে। তদ্রূপ মুমিন ঐ ব্যক্তি, যার কাছে সকল মানুষের জান্তমালের নিরাপত্তা থাকে। মুহাজির ঐ ব্যক্তি, যে গোনাহ ও পাপাচার ত্যাগ করে আর মুজাহিদ ঐ ব্যক্তি, যে আল্লাহর আদেশ পালনার্থে নিজের প্রবৃত্তির সাথে লড়াই করে। (মুসনাদে বাযযার, হাদীস : ৩৭৫২)

এর আগে ফত্‌হে মক্কার সময় মসজিদে হারামের খোলা মজমায় এলান করেছিলেন

يا أيها الناس! إن الله تعالى قد أذهب عنكم عُبَيَّةَ الجاهلية وتعظمها بآبائها فالناس رجلان : رجل بر تقي كريم على الله تعالى، ورجل فاجر شقي هين على الله تعالى إن الله عز وجل يقول : يا ايها الناس انا خلقناكم من ذكر وانثى وجعلناكم شعوبا وقبائل لتعارفوا ان اكرمكم عند الله اتقاكم ان الله عليم خبير

হে লোকসকল! আল্লাহ তাআলা বাতিল করে দিয়েছেন জাহেলিয়াতের অভিমান। এখন মানুষ দু ভাগে বিভক্ত।

নেককার-পরহেযগার, যে আল্লাহর কাছে প্রিয় ও সম্মানিত। আর বদকার-বদবখত, যে আল্লাহর কাছে তুচ্ছ ও ধিকৃত। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, হে লোকসকল! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে এবং তোমাদেকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে যেন একে অপরকে চিনতে পর। নিঃসন্দেহে তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই সবচেয়ে বেশি সম্মানিত, যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খোদাভীরু। নিশ্চয়ই আল্লাহ সকল কিছু জানেন, সমস্ত খবর রাখেন। .... (তাফসীরে ইবনে হাতীম, হাদীস : ১৮৬২২; তাফসীরে ইবনে কাছীর ৪/২২৯)

সেই সময় বা অন্য সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন

الناس بنو آدم وآدم من تراب لينتهين أقوام فخرهم برال أو ليكونن أهون عند الله من الجعلان التي تدفع بأنفعها النتن.

সকল মানুষ আদমের সন্তান আর আদম সৃজিত মাটি থেকে। সকল কওম যেন পূর্বপুরুষদের নিয়ে অহংকার করা থেকে বিরত হয় নতুবা আল্লাহর কাছে তারা হবে ঐ কীটের চেয়েও হীন, যা নাক দ্বারা গান্দেগী দূর করে। (মুসনাদে আহমদ ২/৩৬১, হাদীস : ৮৭৩৬; আবু দাউদ, হাদীস : ৫০১৭; তিরমিযী, হাদীস : ৩৯৫৫, ৩৯৫৬)

এই অমর ঘোষণায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উৎখাত করেছেন সকল প্রকার সামপ্রদায়িকতা এবং ইত্তিহাদ-বিরোধী সকল চিন্তা-ভাবনা। আর কোরআন মজীদের উদ্ধৃতিতে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলে দিয়েছেন যে, মর্যাদার একমাত্র মানদণ্ড হল তাকওয়া।

তাকওয়া এমন এক বৈশিষ্ট্য, যা তাওয়াযূ ও বিনয় সৃষ্টি করে এবং কিব্‌র ও অহংকার দূর করে। আর একথা বলাই বাহুল্য যে, বিবাদ-বিভক্তির মূলে হল কিবর ও অহংকার। পক্ষান্তরে ইত্তিহাদ-ঐক্যের সবচেয়ে বড় সহায়ক হল তাওয়াযূ ও বিনয়।

প্রীতি ও অনুরাগ মুমিনের স্বভাবধর্ম

মুমিন তার হৃদয়ে ধারণ করে প্রীতি ও বন্ধুত্ব। কারণ ঝগড়া-বিবাদের মূল কারণ হাসাদ, কিব্‌র ও নিফাক। মুমিনের অন্তর তো এসব থেকে পাকসাফ থাকবে। এটাই তার মুমিন নামের ও ঈমানী ছিফাতের দাবি। কারণ ঈমান ও নিফাক তো কখনো একত্র হতে পারে না। আর ভিতর যখন পাকসাফ তখন বাইরে কেন থাকবে ঝগড়া-বিবাদ?

সাহল ইবনে সাদ সায়েদী রা. বলেন,

المؤمن مألف ولا خير فيمن لا يألف ولا يؤمن

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মুমিন সকলের আপন। পক্ষান্তরে ঐ ব্যক্তি কল্যাণ-বঞ্চিত যে আপন হয় না এবং যাকে আপন বানানোও যায় না। (মুসনাদে আহমদ ২/৪০০, হাদীস : ৯১৯৮)

হাদীসের কিতাব থেকে বোঝা যায়, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই কথা বিভিন্নভাবে বলেছেন এবং বারবার বলেছেন। এজন্য আরো কয়েকজন সাহাবী থেকেও কাছাকাছি শব্দে এই বিষয়বস' বর্ণিত হয়েছে। (দেখুন : মুসনাদে আহমদ ১৫/১০৬-১০৭; ৩৭/৪৯২-৪৯৩ হাশিয়া)

কাযী ইয়ায রাহ. বিভিন্ন আয়াত ও হাদীসের আলোকে যথার্থই বলেছেন যে,

الألفة إحدى فرائض الدين وأركان الشريعة ونظام شملا لأسلام.

মহব্বত ও অনুরাগ হল দ্বীন-শরীয়তের অন্যতম ফরয রোকন। এর দ্বারাই ইসলামের সকল অংশকে সমন্বিত করা যায়।-ইকমালুল মুলিম শরহু সহীহ মুসলিম ১/২৭৬; শরহে মুসলিম নববী ২/১১

সহীহ বুখারী (৪৮১) ও সহীহ মুসলিম (২৫৮৫) হযরত আবু মূসা আশআরী রা.-এর সূত্রে বর্ণিত হাদীসটি খুবই প্রসিদ্ধ।

المؤمن للمؤمن كالبنيان يسد بعضه بعضا ثم شبك بين أصابعه

মুমিনগণ যেন একটি দেয়াল, যার একাংশ অন্য অংশকে শক্তি যোগায়। এরপর তিনি দু হাতের আঙ্গুল একে অপরের মাঝে প্রবেশ করালেন। নুমান ইবনে বশীর রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে যে,

مثل المؤمنين في توأدهم وتراحمهم وتعاطفهم مثل الجسد إذا اشتكى منه عضو تداعي له سائر الجسد بالسهر والحمى

প্রীতি ও সহানুভূতিতে সকল মুমিন যেন এক দেহ, যার এক অঙ্গে ব্যথা হলে গোটা দেহ জ্বর ও অনিদ্রায় ভুগতে থাকে। (সহীহ মুসলিম (২৫৮৬)

مبتلائي درد كونى جسم هو روتى هى آنكه / كس قدر همدرد سارى جسم كى هوتى هى آنكه.

দেহের বেদনায় চোখের অশ্রু ঝরে। দেখ বন্ধ, চোখ দেহের কত আপন!

হজ্বের সফরে প্রীতি ও মহব্বত অতি প্রয়োজন

হজ্বের সফরে কথায় ও কাজে  মহব্বতের প্রকাশ খুব জরুরি। কারণ হজ্ব একটি ইবাদত, আর ইবাদতের হালতে আল্লাহর বান্দাদের ভাই ভাই হয়ে থাকা অপরিহার্য। তাছাড়া এই সফরটিই এমন যে, বিভিন্ন কারণে ঝগড়া-বিবাদের পরিসি'তি তৈরি হতে পারে। এজন্য আল্লাহ তাআলা  সাবধান করে বলেছেন

 

الحج أشهر معلومات، فمن فرض فيهن الحج فلا رفث ولا فسوق ولا جدال في الحج

‘‘হজ্বের নির্দিষ্ট কয়েকটি মাস আছে। যে ব্যক্তি সেসব মাসে (ইহরাম বেঁধে) নিজের উপর হজ্ব অবধারিত করে নেয় সে হজ্বের সময় কোনো অশ্লীল কথা বলবে না, কোনো গুনাহ করবে না এবং ঝগড়াও করবে না।’’ (সূরা বাকারা : ১৯৭)

এই আয়াতে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, হজ্বের সফরে ঝগড়া-বিবাদ যেন নামাযে নিয়ত বেঁধে ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত হওয়া।

অপ্রীতিকর আচরণের মৌলিক কারণ

এ ধরনের আচরণ কেন প্রকাশিত হয় সে সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে মৌলিক কারণগুলো চিহ্নিত করা উচিত। এরপর তা সংশোধন করা এবং হজ্বের হাকীকত সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে সৌহার্দ্য ও সমপ্রীতির পরিচয় দেওয়া কর্তব্য। নিম্নে কিছু বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হল।

১. স্বভাবের বিপরীত কোনো কিছু সহ্য হয় না

অনেক সময় গীবত-শেকায়েত ও ঝগড়া-বিবাদ শুধু এজন্য হয়ে থাকে যে, নিজ স্বভাবের বিপরীত কোনো কিছু সহ্য হয় না। অথচ আল্লাহ তাআলা মানুষের ভাষা ও বর্ণের মতো রুচি ও স্বভাবও বিভিন্ন রকম বানিয়েছেন। এক ঘরের দুই ব্যক্তির স্বভাব একরকম হয় না। তাহলে যেখানে লক্ষ লোকের সমাবেশ সেখানে তা কীভাবে আশা করা যায়?

শরীয়তের দৃষ্টিতে নাজায়েয নয় এমন কোনো বিষয়ের উপর শুধু আমার কাছে ভালো লাগে না বলে আপত্তি করার অধিকার আমার নেই। তাহলে এ কারণে গীবত-শেকায়েত ও ঝগড়া-বিবাদের তো প্রশ্নই আসে না। চিন্তা করা দরকার, যেসব কাজ সাধারণভাবে ও সবসময় নাজায়েয তা বিনা কারণে ও হজ্বের সফরে কেমন নাজায়েয হবে?

নফসকে বোঝানো উচিত যে, স্বভাবের প্রতিকূল অবস্থার মুখোমুখি করে আল্লাহ আমাদের পরীক্ষা করছেন। আল্লাহ তাআলা হালীম, তিনি হিলম ও সহনশীলতা পসন্দ করেন। বান্দা যখন সবর করে এবং সহনশীলতার পরিচয় দেয় তখন আল্লাহ তার প্রতি সন'ষ্ট হন। আর আমাদের সফরের উদ্দেশ্যই তো নফসের তরবিয়াত ও আল্লাহর রেযামন্দি।

যে নবীয়ে পাকের উম্মত আমরা তাঁর আখলাক দেখুন! আনাস ইবনে মালিক রা. বলেন, আমি দশ বছর রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খেদমতে ছিলাম, (বলাবাহুল্য, সকল কাজ তাঁর মানশা মোতাবেক হত না), কিন্তু কখনো তিনি উফশব্দটি পর্যন্ত উচ্চারণ করেননি। তদ্রূপ একথাও বলেননি যে, এটা কেন করেছ? বা এটা কেন করনি? ঘরের কেউ কিছু বলতে চাইলে তিনি বাধা দিয়ে বলতেন, বাদ দাও, যা হওয়ার ছিল, হয়েছে। (বুখারী, হাদীস : ২৭৬৮; মুসলিম, হাদীস : ২৩০৯; মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ১১৯৮৮, ১৩০২১, ১৩০৩৪, ১৩৪১৮, ৩/২৩১)

২. সফরসঙ্গীদের বে-উসূলী বা না- মোনাসিব আচরণে অধৈর্য্য হওয়া

আল্লাহ তাআলা সবাইকে আকল-বুদ্ধি সমান দেননি। তদ্রূপ ভালো পরিবেশে লালিত-পালিত হওয়ার সুযোগও সবার হয়নি। আদাবুল মুআশারা সম্পর্কে সহীহ সমঝ আমাদের কয়জনের আছে? আদব-আখলাকের তরবিয়াতইবা কয়জন হাসিল করেছি? আর সমঝদার ও আকলমন্দ মানুষেরও তো ভুল-ত্রুটি হয় তাহলে যেখানে অসংখ্য লোকের সমাবেশ, যাদের অধিকাংশই এই সফরে নতুন, সেখানে তো বুঝে না বুঝে ভুল-ত্রুটি হতেই পারে এবং তাকলীফের কারণও ঘটতে পারে। এই জন্য মানসিক প্রস্তুতি থাকা চাই।

প্রত্যেক সাথীর চেষ্টা করা উচিত, আমার দ্বারা যেন কারো তাকলীফ না হয়, অনিচ্ছায় কখনো কিছু হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে মাফ চেয়ে নিব এবং যথাসম্ভব তা পূরণ করার চেষ্টা করব। পক্ষান্তরে অন্য কারো কথা বা কাজে কষ্ট পেলে উত্তেজিত হব না;বরং সবর করব এবং মনে মনে বলব, আল্লাহ যা চান তা-ই হয়, আল্লাহ যা চান না তা হয় না। কোনো সাথী যদি বেশি অনভিজ্ঞ বা বেশি বে-পরোয়া হয় তাহলে কাফেলার আমীর তাকে হেকমতের সাথে বোঝাবেন এবং যা কিছু বলার নরমির সাথে বলবেন। কারো না-মোনাসিব আচরণের সংশোধন না-মোনাসিব তরীকায় হওয়া উচিত নয়। নরমি ও হেকমতের সাথে হওয়া চাই।

আমরা তো ঐ নবীর উম্মত, যিনি আরাবী ও বুদ্দুদের সকল না-মোনাসিব আচরণ হাসিমুখে সহ্য করতেন। তরবিয়াতের প্রয়োজন হলে এমনভাবে করতেন যে, কওমের কাছে ফিরে গিয়ে বলত, এমন উস্তাদ জীবনে কখনো দেখিনি।

আমাদের সাথীদের মধ্যে কি এমন কেউ আছে, যে নামাযে দাঁড়িয়ে কথা বলে, কিংবা মসজিদে পেশাব করে? দয়ার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো এমন কাজেও ছখতী ও কঠোরতার এজাযত দেননি।

যে আরাবী নামাযে কথা বলেছিলেন তার সাক্ষ্য এই যে,

فبأبي هو أمي، ما رأيت معلما قبله ولا بعده أحسن تعليما منه، فوالله ما كهرني ولا ضربني ولا شتمني، قال : إن هذه الصلاة لا يصلح فيها شيء من كلام الناس، إنما هو التسبيح والتكبير وقراءة القرآن.

আমার পিতা-মাতা তাঁর উপর কোরবান হোক! তাঁর চেয়ে উত্তমরূপে শিক্ষাদানকারী কোনো শিক্ষক আমি কখনো দেখিনি। খোদার কসম! তিনি আমাকে ধমক দেননি, প্রহার করেননি, এমনকি কোনো কটুকথাও বলেননি। তিনি শুধু বলেছেন, এই যে নামায, এতে সাধারণ কথাবার্তা বলা যায় না। এ তো শুধু তাসবীহ, তাকবীর ও কিরাআতুল কোরআন।’-মুসলিম, হাদীস : ৫৩৭, বাবু তাহরীমিল কালামি ফিস সালাহ ..., মুসনাদে আহমদ ৫/৪৪৮

তদ্রূপ যে লোক মসজিদে পেশাব করে দিয়েছিল যখন তার দ্বীনের বুঝ হল তখন তিনি নিজের ঘটনা এভাবে বর্ণনা করেছেন

فقام إلى رسول ا لله صلى الله عليه وسلم فلم يونبني ولم يسبني، وقال : إنما هذا المسجد لذكر الله، الصلاة ولا يسال فيه.

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাছে এলেন। কোনো ধমক দিলেন না এবং কটুকথা বললেন না। শুধু বললেন, ‘এই মসজিদ তো বানানো হয়েছে আল্লাহর যিকর ও নামাযের জন্য, এখানে পেশাব করা যায় না।’ (সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস : ১৪০২; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস : ৫২৯)

অবশ্যই সকল সাথীকে সতর্ক হয়ে চলা উচিত, যেন আমার কোনো আচরণে  অন্য কারো কষ্ট না হয় এবং আমার কোনো কথার দ্বারা-খোদা               নাখাস্তা-ঝগড়া-বিবাদ শুরু না হয়। কিন্তু এরপরও সকল সতর্কতা সত্ত্বেও আমার নিজেরও তো ভুলত্রুটি হতে পারে। তাই অন্যের না-মোনাসিব আচরণের ক্ষেত্রে সীরাতে নবীর অনুসরণ ছাড়া ইজতিমায়ী যিন্দেগী, বিশেষত এ ধরনের সফর   শান্তিপূর্ণ হতে পারে না। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাওফীক দান করুন। আমীন।

৩. সৌদী সরকারের অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার কারণে বিরক্তি

সৌদী-সরকার ইসলামী সরকার নয়। আর যে উপাধী-খাদিমুল হারামাইনিশ শারীফাইনতারা নিজেদের জন্য গ্রহণ করেছে তার দাবিও তাদের দ্বারা পূরণ হয় না। কিন্তু অতি না-শোকরী হবে যদি আমরা তাদের বিভিন্ন রকমের খেদমত ও অন্যান্য গুণাবলি স্বীকার না করি। নিঃসন্দেহে বহু জায়গায় তাদের অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা চোখে পড়ে, কিন্তু প্রথম কথা হল, দোষ না দেখে গুণ দেখার দ্বারা শোকরের তাওফীক হয়, আর এটাই ইজতিমায়ী যিন্দেগীর নিয়ম ও উসূল। এখানেও এই উসূল মোতাবেক আমল করা চাই। তা না হলে গীবত-শেকায়েত ও ঝগড়া-বিবাদ ছাড়া কোনো লাভ হবে না। যদি গঠনমূলক কোনো পরামর্শের ইচ্ছা থাকে তাহলে সঙ্গী-সাথীদের সাথে সমালোচনা না করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ ও পরামর্শ পৌঁছে দেই। মসজিদে হারামের বারান্দায় লেখা আছে যে, কারো কোনো অভিযোগ থাকলে অমুক নম্বরে ফ্যাক্স করে জানিয়ে দিন।

এটা তো হল নিয়মের কথা, কিন্তু আহলে দিল মানুষের নজর তো অনেক সূক্ষ্ম ও গভীর হয়ে থাকে। তাদের দৃষ্টিভঙ্গিই ভিন্ন। একজন হাজী সাহেবকে তার বিভিন্ন অভিযোগের জবাবে মাওলানা আবু তাহের মিসবাহ দামাত বারাকাতুহুম শুধু একটি বাক্যই  বলেছিলেন, মাশাআল্লাহ ঐ হাজী সাহেব ও উপসি'ত ব্যক্তিদের উপর এর ভালো আছর হয়েছে। তিনি বলেছিলেন, ‘ভাই আপনি কি সৌদি-সরকারের মেহমান, না আল্লাহর মেহমান?’

অর্থাৎ আপনি যদি সরকারের মেহমান হয়ে থাকেন তাহলে সমালোচনা করতে থাকুন! আর যদি আল্লাহর মেহমান হয়ে থাকেন তাহলে বোঝা উচিত যে, হাজীগণ শুধু আল্লাহর মেহমানই নন, আর আল্লাহ তাআলাও শুধু মেযবান নন। তিনি আমাদের রব আমরা তাঁর বান্দা। তাই আমাদের ঈমানী তরবিয়াত ও দীক্ষার জন্য তাঁর মেহমানদারীর বিভিন্ন ধরন হতে পারে এই সফরের সকল অবস্থাকে মেহমান নাওয়াযী ও বান্দা-নাওয়াযীর অংশ বলেই মনে করা উচিত। আর বাস্তবেও বিষয়টি এমনই।

এই রায-রহস্য যদি আমাদের বুঝে এসে যায় তাহলে সর্বহালতে আল্লাহর দিকেই রুজু করব এবং বান্দা-নাওয়াযীর শান ও আনদায দেখে পুলকিত হব। কারো উপর আমাদের কোনো শেকায়েত ও অভিযোগ থাকবে না।

خلاصه سن لى كوئى مجه سى آداب محبت كا /  دعائين دل سى دينا ظلم سهنا بى زبان رهنا

৪. কাফেলার আমীর ও এজেন্সী ওয়ালাদের আচরণে অসন্তুষ্টি

এই অভিযোগ খুব ব্যাপক। তবে একে কেন্দ্র করে মনোমালিন্য ও ঝগড়া-বিবাদের পিছনে অন্য কারণও থাকে। যেমন্তক) চুক্তি সম্পাদনের সময় পূর্ণ চুক্তি বা তার অংশবিশেষ অস্পষ্ট রেখে দেওয়া।

এটা দুপক্ষের যে কারো থেকেই হতে পারে। আমার মতে অধিকাংশ ঝগড়াঝাটি এই কারণেই হয়। এর সমাধান হল, উভয় পক্ষ চুক্তির সময়ই প্রত্যেকটি বিষয় স্পষ্ট করে চুক্তি সম্পাদন করবে। যদি কোনো বিষয় ইচ্ছাকৃতভাবে অস্পষ্ট রাখা হয় কিংবা বে-খেয়ালির কারণে অস্পষ্ট থেকে যায় আর পরবর্তীতে কারো চাহিদার বিপরীত হয় তখন তো সবর ছাড়া উপায় নেই।

খ) কাফেলার আমীর ও এজেন্সীওয়ালাদের এখতিয়ার বহির্ভূত বিষয়াদি

কিছু বিষয় এমনও থাকে যেখানে কাফেলা তো দূরের কথা, এজেন্সীওয়ালাদেরও কিছু করার থাকে না। যেমন্তমিনা থেকে মক্কায় পৌঁছানো, মিনায় অবস্থান, মিনা থেকে আরাফায় যাওয়া, আরাফা থেকে মুযদালিফায় আসা এবং মুযদালিফায় অবস্থানের পর দশ তারিখের অন্যান্য আমল। লক্ষ লক্ষ লোকের সমাবেশ হওয়ার কারণে এসব ক্ষেত্রে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।  সমাধানের কোনো সূরত নেই তা নয়, কিন্তু বর্তমান অবস্থায় এসব সমস্যার সমাধান আসলেই আমীর ও এজেন্সীওয়ালাদের এখতিয়ারের বাইরে। কিন্তু দেখা যায়, তাদের সাথে এসব বিষয় নিয়ে ঝগড়া চলতেই থাকে, যা মোটেই উচিত নয়। কারণ এখানে তারাও আমাদের মতোই অসহায়। অতএব এর একমাত্র সমাধান হল-সবর ও দুআ।

গ) সুস্পষ্টভাবে চুক্তি হওয়ার পরও তার অন্যথা করা।

কোনো সন্দেহ নেই, আল্লাহর বান্দাদের অনেকের মাঝেই এই রোগ আছে, অথচ তাদের পরনেও থাকে ইহরামের লেবাস। আল্লাহ তাদের হেদায়াত দিন। এই সমস্যা সমাধানের সঠিক পন্থা হল, বিনয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরকে চুক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দিন। এরপর নীরব থাকুন। যদি সুন্দর কোনো সমাধান পাওয়া যায় তাহলে আল্লাহর শোকর, অন্যথায় সবরের পথ তো খোলাই আছে। হজ্ব সবরের এত বড় ক্ষেত্র যে, হাদীস শরীফে হজ্বকে জিহাদপর্যন্ত বলা হয়েছে।

আমি এ কথা বলি না যে, আপনার পাওনা হক্ব ছেড়ে দিন। যদিও এটা বড় সওয়াবের কাজ। কিন্তু সে জন্য তো বড় হিম্মতের প্রয়োজন। আমি শুধু এটুকু বলব, আপনার হক্বের দাবি সংযমের সাথে করুন এবং মুখ ও মেজাজ নিয়ন্ত্রণে রাখুন; অন্যের অজ্ঞতা বা জুলুমের কারণে কি আপনি নীচে নেমে আসবেন? আপনি তো এখন মামুলি মানুষ নন, আপনি আল্লাহর দাওয়াতী মেহমান। সাধারণ কোনো অবস্থাতেও আপনি নেই, আপনি রয়েছেন ইহরামের হালতে। যেন আপনি নামাযে দাঁড়িয়েছেন। আপনি যেনতেন কোনো জায়গায় নয়; বরং মাশআরে হারাম ও পবিত্রতম স্থানে রয়েছেন।

যদি ঝগড়া-বিবাদ করেই হক্ব উসূল করতে হয় তাহলে তো দেশে ফিরেও অনেক সুযোগ পাওয়া যাবে। সময় ও স্থানের মর্যাদা রক্ষা করে, ইহরামের হালতের শরাফত ও লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক সম্মানের দিকে তাকিয়ে এসব ঝগড়া-বিবাদকে মূলতবী করুন। ইনশাআল্লাহ ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না। আল্লাহ তাআলা এর কী বিনিময় দেন তা স্বচক্ষে দেখতে পাবেন। দুনিয়াতেও দেখতে পাবেন, আখিরাতেও দেখতে পাবেন।

انما يوفى الصبرون اجرهم يغير حساب

সূরা যুমার : ১০

৫. মাসাইলের ইখতিলাফ নিয়ে বিবাদে লিপ্ত হওয়া

আল্লাহ মাফ করুন্তহজ্বের সফরে এটাও কলহ-বিবাদের বড় কারণ। এ কারণে তর্ক বিতর্ক থেকে ঝগড়া-বিবাদ পর্যন্ত হয়ে যায়। আমাদের হালত থেকে মনে হয় কিবর ও অহংকার যেন আমাদেরকে পেয়ে বসেছে। কেউই একথা মানতে প্রস'ত নই যে, আমার জানাটাও ভুল বা অসম্পূর্ণ হতে পারে? সম্ভবত আমাদের অনেকেরই জানা নেই যে, মাসআলার বহু বিষয় এমন আছে যেখানে দলীল-প্রমাণের ভিত্তিতেই ইমামগণের মাঝে ইখতিলাফ ও মতভেদ হয়েছে। এ কারণে আলাদা দুই মাযহাবের মাঝেই শুধু নয়, এক মাযহাবের আলেমদের মাঝেও ইখতিলাফ হতে পারে। কিছু কিছু বিষয়ে হয়েছেও। দলীল-প্রমাণের ভিত্তিতে হওয়া এই ইখতিলাফ আক্বীদা-বিশ্বাসের ইখতিলাফ নয়, যাকে নিন্দিত মতভেদ ও মাযমূম ইখতিলাফ বলা যায়। বরং এ ইখতিলাফ শরীয়তের দৃষ্টিতে শুধু মার্জনীয়ই নয়, স্বীকৃত ও গ্রহণযোগ্যও বটে। এসব ক্ষেত্রেও আল্লাহর পক্ষ থেকে ছওয়াব পাওয়া যাবে।

আর এমন  মাসআলার সংখ্যাও কম নয়, যেগুলোকে মনে করা হয় ইখতিলাফী মাসআলা অথচ বাস্তবে তা নয়; বরং প্রত্যেকটি আলাদা সুন্নত এবং সুন্নাহর ভিত্তিতে প্রমাণিত। এ বিষয়ে আলকাউসারের পিছনের কয়েক সংখ্যায় সুন্নাহসম্মত নামায : কিছু মৌলিক কথাশীর্ষক প্রবন্ধে বিস্তারিতভাবে আলোকপাত করা হয়েছে। এখানে আমি শুধু এটুকু আরজ করব যে, আমরা যদি নিম্নোক্ত নীতি ও উসূলের উপর আমল করি তাহলে ইনশআল্লাহ মাসআলার কারণে দুশ্চিন্তা ও পেরেশানীতে পড়তে হবে না এবং ঝগড়া-বিবাদ ও তর্ক-বিতর্কেরও সম্মুখীন হতে হবে না।

ক) আমরা যারা সাধারণ মানুষ, যারা কারো নিকট থেকে শুনে বা বাংলা  গাইড-নির্দেশিকা জাতীয় পুস্তিকা পড়ে মাসাইল শিখি তাদের মনে রাখা উচিত যে, এই শেখাটা প্রাথমিক পর্যায়ের। এর আলোকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে আমল করা যায়, কিন্তু অন্য কারোর, বিশেষত কোনো আলেমের মোকাবেলা করা যায় না। কারণ আমার জানা অসম্পূর্ণ বা ভুলও হতে পারে। তদ্রূপ মাসআলাটি ইখতিলাফী বা মতভেদপূর্ণও হতে পারে, যার শুধু একটি মত আমি জানি, অন্য ভাই যা বলছেন তা অন্য কোনো আলেমের মত। এজন্য আমার নীরব থাকা উচিত। এতে দোষের বা অসম্মানের কিছু নেই। আমি সেভাবেই আমল করব যেভাবে আমার বিশ্বস্ত আলেম বলেছেন। কিন্তু এই জানার উপর ভিত্তি করে অন্যের আমলকে ভুল সাব্যস্ত      করব না।

আমাদের অবস্থা এমন হওয়া উচিত নয় যে, নিজের শায়খ ছাড়া অন্য কোনো শায়খের কথা, নিজের পসন্দের আলেম ছাড়া অন্য আলেমের ফতওয়া, নিজের ইমাম ছাড়া অন্য ইমামের      মাযহাব পসন্দই হয় না। আমি উসূল মোতাবেক কোনো একটি সহীহ তরীকা বেছে নিতে পারি, কিন্তু নিজের বিচার ও নির্বাচনকে অন্যের উপর চাপিয়ে দিতে পারি না। অন্যের শরীয়তসম্মত হক কেড়ে নেওয়ার অধিকার তো আমার নেই।

খ) আমরা যারা মাদরাসার একটি নেসাবসমাপ্ত করে বের হয়েছি, যাদেরকে পরিভাষায় আলিমবলা হয়, তাদেরও মনে রাখা উচিত যে, ইলম এক অথৈ সমুদ্র। প্রত্যেক আলেমের উপর রয়েছে আরো বড় আহলে ইলম-এ তো একটি মুসাল্লাম কায়েদা ও স্বীকৃত নীতি। এজন্য ইখতিলাফী মাসাইলের ক্ষেত্রে আমাদেরকে হিলম ও তাহাম্মুল এবং ধৈর্য্য ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে হবে।  আমার মুতালাআর বাইরেও তো কিতাব থাকতে পারে। এবং আমার জানাশোনার বাইরেও তো দলীল-প্রমাণ থাকতে পারে।

আর যেসব আহলে ইলম, আল্লাহর রহমতে, দলীল-প্রমাণের পর্যালোচনার যোগ্যতার অধিকারী তাদেরকে তো একথা বলারও প্রয়োজন নেই যে, ইখতিলাফী মাসআলা শুধু একান্ত ও খাস মজলিসে আলোচনা করা যায়, এগুলো সাধারণ ও আম মানুষের মজলিসে আলোচনার বিষয় নয়। তদ্রূপ এগুলো ঝগড়া-বিবাদেরও বিষয় হতে পারে না।

গ) সাধারণ মানুষের জন্য মাসআলা নিয়ে আলেমদের সাথে তর্ক করা কোনোভাবেই উচিত নয়। তেমনি কোনো আলেমেরও উচিত নয়, ইখতিলাফী মাসআলায় অন্য কোনো আলেম বা সাধারণ মানুষের সাথে বাদানুবাদ করা। কারণ এই লোকটিও তো কোনো আলেমের কাছ থেকে মাসআলা জেনেই আমল করছে। হ্যাঁ, যদি জানা যায় যে, ঐ ব্যক্তি কোনো আলেমের কাছ থেকে মাসআলা না জেনেই আমল করছে তখন তাকে মাসআলা বলে দিতে অসুবিধা নেই।

ঘ) যদি একই কাফেলায় কয়েকজন আলেম থাকেন তখন ভালো হয়, পরস্পর মশওয়ারা করে মাসআলা বললে যেন একই কাফেলায় দুধরনের ফতওয়া না আসে। এমনও হতে পারে যে, কাফেলার আমীর একজনকে নির্দিষ্ট করে দিবেন, তিনিই প্রয়োজনের ক্ষেত্রে মাসআলা বলবেন।

ঙ) এক তাঁবুতে কয়েক কাফেলার লোক একত্র হয়ে গেলে প্রথম কর্তব্য হল, কাফেলার সাধারণ লোকজন মাসআলা-মাসাইল নিয়ে নিজেদের মতামত পেশ করবে না। এটা ছেড়ে দিবে আলিমদের উপর। আর একই তাঁবুতে ইখতিলাফী মাসআলায় ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণকারী কয়েকজন আলেম একত্র হয়ে গেলে তাঁদের কর্তব্য, বড় আলেমের কথায় একমত হয়ে যাওয়া।

হযরত ওসমান রা.-এর সাথে মিনাতে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর ইখতিলাফ হয়ে গেল যে, এখানে নামায চার রাকাত পড়া হবে, না দুরাকাত? ইবনে মাসউদ রা.-এর সিদ্ধান্ত ছিল-দুরাকাত, কিন্তু যখন নামাযের সময় হল তখন তিনি হযরত ওসমান রা.-এর পেছনে চার রাকাত নামায আদায় করলেন। কেউ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, আলখিলাফু শাররুনঅর্থাৎ ইখতিলাফী মাসআলার কারণে বিবাদ করা নিন্দনীয়। (আবু দাউদ, হাদীস : ১৯৫৫)

যদি তাও সম্ভব না হয়, তাহলে কোনোরূপ বাদানুবাদ ছাড়া নীরবে প্রত্যেক আলেম তাঁর কাফেলাকে নিজের মাসলাক অনুযায়ী আমল করতে বলবেন। এখানে ঝগড়া-বিবাদ তো দূরের কথা, নাহি আনিল মুনকারের উসূলও চলবে না। কারণ উম্মতের ইজমা রয়েছে যে, ইখতিলাফী মাসআলা নাহি আনিল মুনকারের ক্ষেত্র নয়।

আজকের অবসের আমি কয়েকটি মৌলিক ও উসূলী কথা আরজ করেই শেষ করছি। আল্লাহ তাআলা যদি তাওফীক দেন তাহলে আগামী শাওয়াল ১৪৩২ হি. সংখ্যায় এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার ইচ্ছা রইল। তখন আমরা স্বচক্ষে দেখতে পাব যে, আজকাল যে সকল মাসআলাকে কেন্দ্র করে হজ্বের সফরে, বিশেষত মিনা ও আরাফায় ঝগড়া-বিবাদের ময়দান গরম করা হয় সেগুলো তো বাহাস-বিতর্কের বিষয়ই নয়।

সর্বশেষ আরয এই যে, ইলমী আলোচনার জন্য তো গোটা বছরই পড়ে আছে। হজ্বের এই পাঁচদিনেই তা করতে হবে কেন? এই সময়টুকু তো শুধু যিকির-আযকার ও আল্লাহর দিকে রুজুর মাঝেই কাটানো উচিত। লাব্বাইকের হালত তো আল্লাহর স্মরণ ও আল্লাহর ডাকে সাড়া দেওয়ার হালত।  এ অবস্থায় তো সাধারণ আলোচনা থেকেও বিরত থাকা চাই। তাহলে বহস-বিতর্কের অবকাশ কীভাবে থাকে? আর ঝগড়া-বিবাদের তো প্রশ্নই অবান্তর।

 

advertisement