রবিউল আউয়াল ১৪৪২   ||   নভেম্বর ২০২০

হযরাতুল আল্লাম মাওলানা শাহ আহমদ শফী রাহ.
কিছু স্মৃতি কিছু কথা

মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ

[গত ২৯ মুহাররম ১৪৪২ হি. মোতাবেক ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ ঈ. তারিখে ইন্তেকাল করেন দেশের শ্রদ্ধাভাজন শীর্ষ আলেমেদ্বীন, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমীর, বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ ও আলহাইআতুল উলইয়ার চেয়ারম্যান এবং দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসার মুহতামিম আল্লামা শাহ আহমদ শফী রাহ.। সন্দেহ নেই, তাঁর ইন্তিকাল দেশ ও জাতির জন্য অনেক বড় শূন্যতা। হযরতের যৌবনকাল থেকে নিয়ে ইন্তেকাল পর্যন্ত বর্ণাঢ্য জীবনের নানান দিক নিয়ে স্মৃতিচারণমূলক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তাঁরই ছাত্র, মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা’র রঈস, মাসিক আলকাউসারের সম্পাদক মুফতী আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন মাওলানা সাইফুল ইসলাম।]

 

প্রশ্ন : আল্লামা আহমদ শফী ছাহেব হুযুর রাহ.-কে নিয়ে আপনার স্মৃতিচারণ আমরা শুনতে চাই।

উত্তর : স্মৃতিচারণ বলতে কী, এটা তো উস্তায-শাগরিদ সম্পর্কের স্মৃতি। হুযুরের কাছে পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। আমাদের সময় সুনানুন নাসাঈ, শামায়েলে তিরমিযী- এ দুই কিতাব হুযুর পড়াতেন। যারা নিয়মিত হুযুরের দরসে অংশগ্রহণ করত আমি তাদের মধ্যে ছিলাম। হাটহাজারী মাদরাসায় দাওরার জামাতে ছেলেরা তখন সব হুযুরের দরসে সমানভাবে অংশগ্রহণ করত না, এখন করে কি না- আমি জানি না। সব ছেলে সব দরসে আগে যেত না। শুধু হযরত মাওলানা আবদুল আযীয ছাহেবের দরসে নিয়মিত সব ছাত্র উপস্থিত হত। মাওলানা আবদুল আযীয ছাহেব রাহ. শাইখুল হাদীস ছিলেন। বুখারী-তিরমিযী দুটিই তিনি পড়াতেন। আমি সকল উস্তাযের দরসেই শরীক হতাম। আহমদ শফী ছাহেব হুযুরের সব দরসেই বসতাম। হুযুরের কাছে সরাসরি পড়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। হুযুর তখন শক্ত-সবল ছিলেন। ঐসময়ে মাদরাসার বাইরেও হুযুরের জনপ্রিয়তা ছিল। চট্টগ্রাম শহর ও উপজেলাগুলোতে হুযুর নিয়মিত দ্বীনী মাহফিল করতেন। চট্টগ্রামে তখন তো বাড়ি বাড়ি মাহফিল করার রেওয়াজ ছিল। বাড়ি-বাড়ি, মহল্লাভিত্তিক ওয়াজ মাহফিল হত।  সেসময়েই হুযুর একজন জনপ্রিয় ওয়ায়েজ ছিলেন।

হাটহাজারী মাদরাসায় তখন যারা মোটামুটি শুদ্ধ বাংলায় কথা বলতেন, হোক চিটাগাংয়ের সুরে- তার মধ্যে আহমদ শফী ছাহেব হুযুর অন্যতম ছিলেন। হুযুর শুদ্ধ বলতে পারতেন। অন্যান্য কোনো কোনো  হুযুর উর্দুতে তাকরীর করতেন আর কোনো হুযুর চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় তাকরীর করতেন। আহমদ শফী ছাহেব হুযুরও চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা বলতেন, কিন্তু হুযুর শুদ্ধ বলতে পারতেন। কোনো ওয়াজ-মাহফিলে গেলে চট্টগ্রামের ভাষায়ও ওয়াজ করতেন আবার যেখানে শুদ্ধ ভাষা বলা দরকার সেখানে শুদ্ধ ভাষায়ও কথা বলতেন।

তিনি আরেকটা বিষয়ের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। সেটা হচ্ছে মুনাযারা। যেহেতু চট্টগ্রামে বেদআতীদের খুব প্রভাব এবং শিরকী-বেদআতীদের খুব দাপট, হুযুর তাদের বিরুদ্ধে কড়া মুনাযির ছিলেন। তাঁর বইপত্রও ছিল। তখনই উর্দু ভাষায় ইলমে গায়ব ইত্যাদি বিষয়ে বই ছিল তাঁর। এসব বিষয়ে হুযুরের সুনাম তখনই ছিল। একারণেই বেদআতীরা এখনও তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর। গালমন্দ, খারাপ ভাষা তারা ব্যবহার করে। তো মাযারপন্থী লোকেরা তো হুযুরের প্রতি রেগে থাকবেই, তিনি মুহতামিম হওয়ার পরে ওদের বেদআতের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন- এমন নয়; অনেক আগে থেকেই ওদের বিরুদ্ধে মজবুত মুনাযির হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন।

 

প্রশ্ন  : হুযুরের পড়ানোর আন্দায কেমন ছিল?

উত্তর : হুযুরের পড়ানোর একটা ভিন্ন আন্দায ছিল। হুযুর যেটা করতেন সেটা হল, শরাহ-শুরুহাত নিয়ে দরসে আসতেন। একটা-দুটো শরাহ নিয়ে আসতেন, কিতাব নিয়ে আসতেন। অথবা খাতা নিয়ে আসতেন। হুযুরের কাছে খাতা থাকত। এনে হুযুর সেটা দেখে বলতেন- ‘এডে একখান্ জরুরি খতা আছে, লেখো, লেখো’। হুযুর ইমলা করাতেন। হয়ত শরাহ দেখে ইবারতটা বলতেন। নয়ত খাতা দেখে বলতেন তাকরীরটা। সেটা ছেলেরা লিখত। এই দরসে লেখানোর এ রেওয়াজ ছিল। এটা ছিল অন্য হুযুরদের চেয়ে হুযুরের পড়ানোর ভিন্ন আন্দায।

 

প্রশ্ন : হুযুরকে নিয়ে ঢাকায় আপনার কোনো স্মৃতি?

উত্তর : ঢাকায় যখন আমি তাদরীসের কাজে জড়িত হই তখনো হুযুরের সাথে ঢাকায় দুয়েকটা স্মৃতি আছে। একটা স্মৃতি আমাদের গ্রামের। আমরা যখন দেশের বাইরে পড়াশোনা করি তখনই হুযুর হাটহজারীর মুহতামিম হন। দেশে ফিরে আসার পর একবার আমাদের গ্রামের পাশে জনতা বাজার মাদরাসায় মাহফিল হল। হুযুর সেখানে আসলেন। আমি সেদিন বাড়িতে ছিলাম। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আমি হুযুরের নামে একটা তাহনিয়ানামা লিখি, উর্দুতে। ওটা আমার ভগ্নিপতি মুফতী সাঈদ আহমদ- তিনি তখন সাভার রাজফুলবাড়িয়া মাদরাসার মুদাররিস, তার কণ্ঠস্বর খুব সুন্দর ছিল- তিনি সেটা মাহফিলে পড়ে শুনিয়েছিলেন। আমিও সেই মঞ্চে ছিলাম।

তখন হুযুর একটি কথা বেশি বেশি বলতেন যে, আমি গত ১০০ বছরের ফারেগ ছাত্রদের পাগড়ি দিতে চাই। হাটহাজারী মাদরাসায় হুযুর ‘সদ সালা’ করেছেন, ফারেগদের পাগড়ি দিয়েছেন।

আরেকটা স্মৃতি ঢাকার। হুযুর তো আগে থেকেই পরিচিত। ঢাকায় আসতেনও। ১৯৯০-এর পরের কথা। তখন ঢাকার মাদরাসাগুলোতে উপরের দিকের মুদাররিস হাটহাজারীর ফারেগ কারা কারা আছেন খোঁজ করা হল। তখন কিন্তু হাটহাজারী পড়ুয়া আলেমের সংখ্যা ঢাকাতে কম ছিল। ঢাকায় তখন এত মাদরাসাও হয়নি। এখন সেটা বোঝা যাবে না। তখন তো মাত্র দুটো কেন্দ্র ছিল। একটা হল লালবাগ, কামরাঙ্গীরচর, ফরিদাবাদের সাইট। আরেকটা হল মালিবাগ কেন্দ্রিক। এ দুটো ধারা ছিল ঢাকায়।

তখন কেউ কেউ উদ্যোগ নিল, হাটহাজারী পড়ুয়া উপরের দিকের মুদাররিস যারা ঢাকায় আছেন তাদেরকে একত্রিত করবে। এরকম দু-তিনটি বৈঠকে আমার যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। সেখানে আহমদ শফী ছাহেব হুযুর আসতেন। পীরজঙ্গী মাযার মাদরাসাসহ আরো একটি মাদরাসায় এ বৈঠক হয়। উদ্দেশ্য ছিল, হাটহাজারীর ফারেগীনদেরকে সংগঠিত করা। সেখানে হুযুর নসীহত করতেন। সম্ভবত ২০/২৫ জন লোক সেখানে জমা হত। এক বছরের মধ্যে কয়েকবার হয়েছিল এমন মজলিস। সম্ভবত পরে আর এটা অগ্রসর হয়নি।

 

প্রশ্ন : হুযুরের জাতীয় পরিচিতি ও জাতির ওপর হুযুরের অবদান প্রসঙ্গে কিছু বলুন।

উত্তর : এক্ষেত্রে বড় দুটি সূত্র রয়েছে। দুটোকে আপনি আলাদা করে দেখতে পারেন। একটা হল, হাটহাজারী মাদরাসার বেফাকে যোগ দেওয়া। হাটহাজারী মাদরাসা বেফাকে যোগ দেওয়ার কারণেই হুযুরও বেফাকের প্রধান হন। সম্ভবত সময়টা ২০০৫-এর পরে। মাওলানা নূরুদ্দীন গহরপুরী ছাহেবের ইন্তেকালের পরে। হাটহাজারী মাদরাসা কিন্তু আগে থেকে বেফাকে ছিল না। লালবাগ মাদরাসা, যাত্রাবাড়ী মাদরাসাও ছিল না। তখন বেফাক হাটহাজারীর জন্য সুযোগ করে দিয়েছে অন্তত দাওরায় শামিল হওয়ার।

হাটহাজারী মাদরাসা যুক্ত হওয়ার আরো আগে মাওলানা হারুন ইসলামাবাদী ছাহেব একবার বেফাকের প্রধান হন। কারণ কওমী মাদরাসার দ্বিতীয় প্রধান বোর্ড হল, ইত্তেহাদুল মাদারিস। বেফাকের পরেই তাদের মাদরাসার সংখ্যা বেশি। ওটা পটিয়া মাদরাসা কেন্দ্রিক বোর্ড। মাওলানা হারুন ছাহেব দেশে এসে চাইলেন, দুই বোর্ড এক হোক। তাঁর উদ্যোগে দাওরায়ে হাদীস জামাতে ইত্তেহাদ আর বেফাক একত্র হয়।

(মাওলানা হারুন ইসলামাবাদী রাহ. বড় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। খেদমতের প্রথম যুগে দেশে বিভিন্ন দ্বীনী, তাহকীকী কাজ করার পর একসময় বহু বছর আবুধাবি ছিলেন। শেষের দিকে আবার দেশে চলে আসেন। হযরত হাজ্বী ইউনুস সাহেবের ইন্তেকালের আগে তিনি তাকে পটিয়ার যিম্মাদারি দিয়ে গেছেন। তার যিন্দেগীর শেষ কিছু বছর পটিয়ার যিম্মাদার ছিলেন। বেফাক-ইত্তেহাদ উভয় বোর্ডের সদর ছিলেন।)

তখনও হাটহাজারী মাদরাসা বেফাকে ছিল না। হাটহাজারী মাদরাসা যোগ দেওয়ার পর আহমদ শফী ছাহেব হুযুর বেফাকের প্রধান হন। এটাও ইতিহাসের অংশ। এভাবেই সারা বাংলাদেশের কওমী মাদরাসার নেতৃত্বের নীরব চেয়ারে হুযুর আসীন হন। এর আগে ঢাকায় বড় বড় ব্যক্তিত্বরা ছিলেন। শাইখুল হাদীস মাওলানা আযীযুল হক ছাহেব রাহ., বিবাড়িয়ার মুফাসসির ছাহেব রাহ., খতীব মাওলানা ওবায়দুল হক ছাহেব রাহ.-সহ আরো অনেক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। হুযুরও হাটহাজারী মাদরাসা কেন্দ্রিক দায়িত্বেই ছিলেন। তবে এসব জাতীয় পর্যায়ের বিষয়গুলো ঢাকার দিকের আলেমরা দেখতেন।

হুযুর বেফাকের প্রধান হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই জাতীয় নেতৃত্বের জায়গায় উঠে আসেন। হাটহাজারী মাদরাসা দেশের প্রাচীন এবং বেশিসংখ্যক ছাত্রের মাদরাসা হওয়ায় সে প্রতিষ্ঠানের প্রভাব তো পুরো দেশে সবসময়ে রয়েছে।

 

প্রশ্ন  : হেফাজতে ইসলাম সম্পর্কে কিছু বলবেন, হুযুর যখন হেফাজতের আমীর হলেন তখনকার পরিস্থিতি নিয়ে।

উত্তর : তখন একটা বড় ক্রান্তিকাল ছিল। রাজনৈতিকভাবে আমাদের মুরব্বীরা এবং আমাদের দেশে ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলো স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে আসলে কখনো স্থিতিশীলভাবে টিকে থাকতে পারেনি। মজবুত কিছু করার আগেই ইখতেলাফ হয়ে যাওয়া ইত্যাদি বহু কথাই ঠিক। কিন্তু এতদসত্ত্বেও মুরব্বিদের অবদান অস্বীকার করা যাবে না। খতীবে আযম সিদ্দীক আহমদ ছাহেব রাহ., হযরত মাওলানা আতহার আলী রাহ., হযরত সদর ছাহেব রাহ. ছিলেন, হাফেজ্জী হুযুর রাহ., শাইখুল হাদীস ছাহেব রাহ., আমীনী ছাহেবরা ছিলেন। একেকজন একেক সময়ে ছিলেন। ইসলামী হুকুমতের কথা অনেক পরের হিসাব। কিন্তু সময়ে সময়ে ময়দানী কাজে ইসলাম-বিদ্বেষীদের উস্কানিগুলোর জবাবে জাগরণ তৈরি করা, হুংকার দেওয়া, এগুলো করার জন্য যেসব মুরব্বি ছিলেন তারা সবাই বিদায় নিয়ে গেছেন। এমনই এক সময়ে দেখা গেছে যে, পুরান একটা গোষ্ঠী আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। তারা এটার জন্য উপযুক্ত সময় বাছাই করেছে ওই সময়টাকে। যারা পূর্বের ইতিহাস জানে না, তাদের এখনকার পরিস্থিতিতে বুঝতে অসুবিধা হতে পারে।

এটা বলতে দ্বিধা নেই যে, বরাবরই ইসলাম-বিরোধী অপতৎপরতার জন্য ওরা সময় বাছাই করে। একটা সময় ইসলাম-বিদ্বেষীরা স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়কে বাছাই করেছে। তারা মনে করেছে, তাদের পক্ষের সরকার ক্ষমতায় এসেছে। একই কাজ তারা ছিয়ানব্বই-পরবর্তী সরকারের সময় করেছে। ১৯৯৬ পরবর্তী সরকার যখন এসেছে ওই গোষ্ঠী আবার তৎপর হয়েছে। কিছু কাজ তারা সরকারকে দিয়ে করিয়েছে, কিছু তারা নিজেরা করেছে। আলেম-উলামা, দেশের মাদারিস, দ্বীনদার শ্রেণির বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করা, এদের নানাভাবে লাঞ্ছিত করা- এসব কাজ তারা করেছে। সে কাজেই আবার তারা যখন সুযোগ পেয়েছে ২০১১/১২ সনের পরে, তারা মনে করেছে, এখনই আমাদের উপযুক্ত সময়। তারা তখন নতুন করে মনে করেছিল, তাদের এখন স্বর্গরাজ্য হয়েছে। কিছু ব্লগার, ইসলামবিদ্বেষী, নাস্তিক এই অপতৎপরতায় নেমে পড়ে। তারা ইসলামের বিরুদ্ধে, ইসলামের নবীর বিরুদ্ধে, মহান মনীষীদের বিরুদ্ধে যাচ্ছে তাই কথা বলা শুরু করে।

ওদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়েছে। কিন্তু দেখা গেল, প্রতিবাদে সাড়া দেওয়া তো দূরের কথা, ... প্রভাবশালী কর্তৃক ওদের পক্ষে প্রচার-প্রচারণা ও রাজপথ দখল করা হয়েছে। পুরো বাংলাদেশের সবচে বড় জেনারেল বিদ্যাপীঠের সামনে নিয়মিত ইসলাম-বিদ্বেষী আয়োজন চলেছে। মনে হয়েছে, ইসলামপন্থী লোকেরা একটা কোণঠাসা অবস্থায় পৌঁছে গেছে। এমনই এক সময়ে হেফাজতে ইসলামের আবির্ভাব হয়।

এই সময়ে হেফাজতে ইসলামের আমীরের পদ হুযুরের কাছে যায়। আমি বলেছি, এটা ছিল একটা জাতির ক্রান্তিলগ্ন। এখনকার বাংলাদেশ দেখে ঐসময়কার অবস্থা অনুভব করাটা- যারা ঐসময় বুঝের হয়ে উঠেনি তাদের জন্য কঠিন।

এমনও দেখা গেছে, ইসলাম-বিদ্বেষী কাউকে কেউ একজন আবেগের বশবর্তী হয়ে মেরে ফেলেছে। সংসদের অধিবেশনে দাঁড়িয়ে ওকে (ইসলাম বিদ্বেষীকে) কেউ দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের শহীদ খেতাব দিয়ে দিয়েছেন। পরিস্থিতিটা এত জটিল ছিল। এমন এক সময়ে হেফাজতের আবির্ভাব হয়, আন্দোলন হয়। বলতে দ্বিধা নেই, সে আন্দোলনে সাধারণ জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল। যেটা ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণভাবে করতে পারেনি। ইসলামী দলগুলোর সভায় সাধারণত দেখা যায়, মাদারিসের লোকজনই বেশি থাকে। সাধারণ জনগণ কম থাকে। অনেকসময় একেবারেই কম থাকে। কিন্তু সেই আন্দোলনে মানুষ ব্যাপক অংশগ্রহণ করেছে। কারণ, সাধারণ মানুষই বিরক্ত ছিল ওদের ধর্মবিদ্বেষী কর্মকাণ্ডের কারণে। আল্লাহ তাআলা সেটার নেতৃত্ব হুযুরকে দান করেছিলেন। দেশের মানুষও শান্তির নিশ্বাস নিয়েছে যে, একজন বর্ষীয়ান আলেমে দ্বীন, বড় একজন ব্যক্তিত্ব, হাটহাজারী মাদরাসার মুহতামিম এ পদে আছেন।

 

প্রশ্ন : হেফাজতে ইসলামের ক্রমাগ্রসরতা ও এর সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে আপনি কিছু বলবেন কি?

উত্তর : এটার মূল্যায়ন বড় ব্যক্তিত্বরা করবেন। আমি একজন নগণ্য মানুষ। আমি এ আন্দোলনের একজন দর্শক-সমর্থক মাত্র। আমি মনে করি, হেফাজতের দুটি দিক নিয়ে ভাবা যায়। এক হল, ২০১৩ এর ৫ মে’র আগে। আরেকটি ৫ মে’র পরে।

৫ মে’র আগের ঘটনাবলি যদি আমরা ধরি তাহলে দেখব এর সাফল্যই সাফল্য। এ সাফল্য এমন যে, এটা নিয়ে লম্বা গবেষণা হতে পারে। পিএইচডি থিসিস হতে পারে। বাংলাদেশে তখনকার এই আন্দোলন পরিষ্কার করে দিয়েছে, একটা গোষ্ঠী বুঝে ফেলেছে, দেশের বড় বড় পত্র-পত্রিকা যারা এখন হিসাব করে কথা বলে, তারা এবং নাস্তিকমার্কা লোকেরা তারা বুঝে ফেলেছে যে, এদেশে ইসলাম নিয়ে হেলাফেলা করা এত সহজ নয়। এদেশে উল্টো কিছু করলে সমস্যা আছে। শুধু তারাই বুঝেনি, বরং আমি মনে করব, যারা বড় ক্ষমতাধর তারাও এটা বুঝেছে। একই কারণে পরবর্তী সময়ে তাদেরও পলিসিতে পরিবর্তন এসেছে।

দ্বিতীয় প্রসঙ্গে আসি। প্রথমে বলব, ইসলাম-বিদ্বেষী প্রত্যেক গোষ্ঠীর এটা অনুধাবন হয়েছে। এটাকে আমরা সাফল্য ধরতে পারি। ইসলামী শক্তির রু‘ব-প্রভাব বলতে পাারি। মানুষের ঈমানী জাগরণের কত প্রভাব- এটা অন্তত দেখা গেছে। এটা অন্যদের ওপর প্রভাব সৃষ্টি করেছে। দেশী-বিদেশী ইসলামবিরোধী শক্তি তাদের সামর্থ্যরে সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে অনুভব করতে পেরেছে। শাহবাগ কেন্দ্রিক কথিত আন্দোলনও মাঠে মারা গেছে। ওরা তো পাত্তাই পায়নি।

এদিক থেকে তো এটা বড় অর্জন ছিল। মানুষের মনে বড় আশা জেগেছিল। বিশেষ করে দ্বীনদার শ্রেণির লোক, আলেম-উলামারা অনেক দিন পরে একটু চাঙা হয়ে উঠেছিলেন।

আর হেফাজতের দ্বিতীয় যুগ হচ্ছে, ৫ মে-পরবর্তী হেফাজত। এটা একটা বড় ট্রাজেডি। একটা বিপদ ঘটে গেছে। বলতে গেলে একটি জিনিসের আসমান থেকে জমিনে পড়ে যাওয়ার মতো। এরকম ঘটনা ঘটেছে ৫ মে-পরবর্তী সময়ে। যতটুকু উপরে উঠেছিল ততটুকু নিচে পড়ে গেছে ৫ মে’র পর। অনেকের কাছে বিষয়টি এমনই। কেউ ভিন্নভাবেও মূল্যায়ন করতে পারেন। তবে যারা ৫ মে-সময়ের সাক্ষী, যারা তখন থেকে আগে-পরের পরিস্থিতি দেখেছে, তাদের মূল্যায়ন হয়ত এমনই হবে।

 

প্রশ্ন  : ৫ মে-পরবর্তী সময়ের হেফাজতকে কেন আপনি এভাবে মূল্যায়ন করছেন?

উত্তর : ৫ মে‘র ট্রাজেডির কথা তো কমবেশি সবারই জানা থাকার কথা, কী হয়েছিল সেদিন, কাদের গাফলতি বা মতলব ছিল- এসব নিয়ে আমি আজ কিছু বলতে চাই না। তবে ৫ মে-পরবর্তী সময়কে এভাবে মূল্যায়ন করছি এজন্য যে, ৫ মে’র আগের হেফাজতে ইসলাম ইসলাম-বিদ্বেষী সবার জন্য আতঙ্ক। যারা প্রকাশ্যে ধর্ম অবমাননা করত তাদের জন্য আতঙ্ক। সে যত ক্ষমতাসীনই হোক, সে দেশী শক্তি বা বিদেশী শক্তিই হোক, সবার জন্যই ছিল আতঙ্ক। কিন্তু ৫ মে-পরবর্তী হেফাজতের ক্ষেত্রে দেখা গেল, সেটা বিপরীত দিকের সকলের কাছে সহনীয়। ৫ মে-পরবর্তী হেফাজতের ব্যাপারে তখন মন্ত্রীরা বলা শুরু করলেন যে, হেফাজত আমাদের নিয়ন্ত্রণেই আছে। এর পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি বাস্তবেও তাই দেখা গেল।

এদিকে প্রভাবশালীরা একটা পলিসি গ্রহণ করল। সে পলিসি অনুযায়ী হেফাজতকে তারা ভাঙল না। সাধারণত এরকম দলকে ষড়যন্ত্র করে ভেঙে দেওয়া হয়। কিন্তু এখানে ভাঙা না হলেও কার্যত ভেঙে দেওয়া হল। হেফাজতের আমীরকে দেখানো হল যে, তিনি সরকারের ঘনিষ্ঠ। আর হেফাজতের মহাসচিবকে দেখানো হল, তিনি সরকারের বিপক্ষে। একজনকে বন্দি করা হল না। আরেকজনকে বন্দি করা হল। একজনকে সম্মানের সাথে বিদায় করে চট্টগ্রামে পৌঁছে দেওয়া হল। এমন একটা পলিসি তৈরি করল প্রভাবশালীরা যে, দলটি কার্যক্ষেত্রে দ্বিধাবিভক্ত হল। ফলে কার্যকারিতাটা থেমে গেল। আপনি বলুন, ২০১৩ সনের পরবর্তীতে হেফাজত আর বড় কোনো কার্যক্রম করতে পেরেছে?

 

প্রশ্ন : এমনিতে তো ২০১৩ সনের ৫ মে’র পরেও সরকারের মধ্যে হেফাজতের একটা প্রভাব ছিল। যেমন আমরা দেখেছি যে, হেফাজতের দাবির কারণে সরকার পাঠ্য সিলেবাসে ইসলাম-পরিপন্থী বিষয়গুলো সংশোধন করেছে। একইভাবে হাইকোর্ট চত্বরে যে থেমিস দেবীর নারীমূর্তিটা বসানো হয়েছিল, সেটাও আন্দোলনের মুখে সরকার সরিয়ে দিয়েছে।

উত্তর : এগুলোও ৫ মে’র পূর্বের হেফাজতের সাফল্য। একবার তো তারা হেফাজতকে ভয় পেয়েছে। এরপর এখন যেই যেই জায়গায় সরকার মনে করেছে যে, এদেরকে আর ক্ষেপানোর দরকার নেই, সেখানে তারা এধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। এটা হেফাজতের পুরাতন সাফল্য। পুরাতন সাফল্যটাই সামনে আরো কাজে দিয়েছে এবং এখনো যে হেফাজতকে গণনা করা হচ্ছে, এটাও ৫ মে’র পূর্ববর্তী হেফাজতের প্রভাবের কারণে। ৫ মে’র পরবর্তী হেফাজতকে ভয় পাবার দৃশ্যত কোনো কারণ নেই।

আগের হেফাযতকে ভয় পাওয়ার কারণেই আহমদ শফী ছাহেব হুযুরের ইন্তেকালের পর বামপন্থী মিডিয়াসহ একশ্রেণির রাজনীতিবিদদের হেফাজতের প্রতি আগ্রহ-কৌতুহল দেখা গেছে। তাদের আগ্রহ এজন্য যে, তারা ওই আগের হেফাজত নিয়ে চিন্তিত। তারা মনে করেছে, ৫ মে’র পরবর্তী সময়ে তো হেফাজতকে নিয়ন্ত্রণ করা গেছে। হেফাজত পরে আর বড় কোনো কিছু করেনি। এখন হেফাজতের কোন্ নেতা এসে আবার কী ঘটিয়ে দেয়। এজন্য তাদের যত ভয়।

আমার এই বিশ্লেষণের সাথে কারো ভিন্নমত থাকতে পারে, কিন্তু আমি যেটা মনে করি যে, ৫ মে’র পরে হেফাজত তার আবেদন হারিয়ে ফেলেছে। তার ইমেজ হারিয়ে ফেলেছে। যে কোনো আন্দোলনের একটা ইমেজ বা ভাবমূর্তি থাকে। সেটা হারিয়ে গেছে। কারণ, কোনো একটা সংস্থা বা সংগঠন যে সরকারই দেশে থাকুক- বিএনপি-আওয়ামীলীগ যারাই ক্ষমতায় থাকুক- যদি তার ঘনিষ্ঠ বলে প্রচার পেয়ে যায়, তখন তার আর সে ভাবমূর্তি থাকে না। একজন বুদ্ধিজীবীও যদি প্রচার পেয়ে যান যে, তিনি বিএনপি ঘনিষ্ঠ বা আওয়ামীপন্থী, তখন যে বুদ্ধিজীবীর ব্যাপারে এজাতীয় প্রচার নেই, আর যার ব্যাপারে দলীয় প্রচার আছে- দু’জনের ভাবমূর্তিতে অনেক পার্থক্য হয়ে যায়। যদিও সরকার-ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির জ্ঞান-গরিমা অনেক থাকুক, তারপরও তার ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তো হেফাজতের ওপর সরকার-ঘনিষ্ঠতার একটা দাগ লেগে গেছে।

 

প্রশ্ন : তাহলে আপনি কি মনে করেন যে, সরকার-ঘনিষ্ঠ হওয়া একটা সমস্যা? আপনি কি মনে করেন যে, সরকারের সাথে দূরত্ব রক্ষা করেই চলতে হবে, ঝগড়া করতে হবে বা অন্তত বিরোধ থাকতে হবে আলেমদের?

উত্তর : না, আমি এরকম মনে করি না। আমি বিরোধ থাকা দরকার মনে করি না সরকারের সাথে। যদি আপনি বলেন, দেশে ইসলামী শাসন না থাকার কারণে বিরোধ, ইনসাফ না থাকার বিরোধ, তো সেটা তো স্বীকৃত কথা। যে দলই সরকারে আসুক সে তো ইসলামী শাসন কায়েম করবেই না। সেটা তো ভিন্ন হিসাব।

আর যদি বলেন, সরকারের সাথে সবসময় আমরা ঝগড়া করব কি না, বিনা কারণে লেগে থাকব কি না, তো আমি এটার পক্ষে না যে, সরকারের সাথে ঝগড়া করতে হবে, লেগে থাকতে হবে, এটার দরকার নেই। বিরুদ্ধে লেগেও থাকার দরকার নেই। আবার আমাদের সালাফের রীতি চলে আসছে যে, সরকার-ঘনিষ্ঠ তারা হতে চাননি। যুগ যুগ থেকেই তারা সরকারের ঘনিষ্ঠতার দাগ তাদের গায়ে লাগাতে চাননি। এমনকি যখন ইসলামী শাসন ছিল, ক্ষমতায় ছিলেন স্বয়ং আমিরুল মুমিনীনরা, তখনও আমাদের পূর্বসূরী উলামায়ে কেরাম সরকার থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখেছেন।

যখন কোনো সংস্থা বা ফোরাম ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ হয়ে যায়, তখন তার অসুবিধার দিক হল, তার চোখের লাজ তৈরি হয়, মুখের লাজ তৈরি হয়। তখন সে অনেক কিছুই করতে পারে না। চাইলেও সে সরকারের মন্দ কাজকর্মের ঠিক ওই প্রতিবাদটা করতে পারে না, যেটা সে ঘনিষ্ঠ হওয়ার আগ পর্যন্ত করতে পেরেছে। এজন্য বৈরিতারও দরকার নেই, ঘনিষ্ঠতারও দরকার নেই।

 

প্রশ্ন : হযরত মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভী রাহ.-এর একটি অভিমত ছিল এরকম যে, আমাদের এ উপমহাদেশে সরকারকে শুরুতেই শত্রু বানিয়ে ফেলা হয়। তিনি এক্ষেত্রে হযরত মুজাদ্দিদে আলফে সানী রাহ.-এর কর্মপন্থা অনুসরণের অভিমত দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, হযরত মুজাদ্দিদে আলফে সানী রাহ. ভারতবর্ষের ক্ষমতাসীন বাদশাহ আকবরের ওপর মেহনত করেছিলেন। এরপর আকবরের ছেলে জাহাঙ্গীরের ওপরও মেহনত করেছিলেন। যার চূড়ান্ত সুফল দেখা গিয়েছিল জাহাঙ্গীরের বংশধর বাদশাহ আলমগীরের মাধ্যমে। মুজাদ্দিদ রাহ.-এর মেহনতের বদৌলতে বাদশাহ আলমগীরের মতো আল্লাহওয়ালা শাসক ভারতবর্ষের ক্ষমতায় এসেছিলেন। তো এই কর্মপন্থার ব্যাপারে আপনার অভিমত কী?

উত্তর : দেখতে হবে, সেই মেহনতটা কেমন ছিল? তার রূপরেখা কী ছিল? সেটা কি সরকার-ঘনিষ্ঠ মেহনত ছিল? ঘনিষ্ঠতা যেটাকে বলে, মুজাদ্দিদে আলফে সানী রাহ. কি সেটা করেছিলেন? তিনি কি বাদশাহ আকবরের ঘনিষ্ঠ হয়েছিলেন? নাকি তার কাছে গিয়ে তাকে নসীহত করেছিলেন। দ্বীনের দাওয়াত দিয়েছিলেন। তার মেহনতটা ছিল হাফেজ্জী হুযুরের মতো, আজিমপুরের মাওলানা আবদুল্লাহ ছাহেবের মতো। হাফেজ্জী হুযুর রাজনীতিবিদদের চিঠি লিখেছিলেন। মাওলানা আবদুল্লাহ ছাহেব, আজীমপুরে যার মাদরাসায় আমি পড়িয়েছি তিনি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে চিঠি লিখেছেন। নিজে একবার গিয়ে দিয়ে এসেছেন বঙ্গভবনে। তাদের ছিল দাওয়াতী উসলূব। আরেকটা হচ্ছে ঘনিষ্ঠতার পন্থা। সরকারের ঘনিষ্ঠতা ছিল না তাদের মধ্যে। তারা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে তাদের দাওয়াতী কাজ করেছেন। কেন, মাওলানা আলী মিয়া সাহেবরা কংগ্রেসের সাথে মিলে কাজ করলেন না কেন? মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডের কাজে তারা সরকারি লোকদের সাথে বসেছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁদের গায়ে কখনো সরকার-ঘনিষ্ঠতার তকমা লাগতে দেননি।

উপমহাদেশে তিনি বাংলাদেশ-পাকিস্তানের কথা বলতেন যে, তোমরা ওভাবে আন্দোলন করে লাভ কী? তিনি প্রচলিত রাজনৈতিক ধারার মোকাবেলায় দাওয়াতের উসলূবের ওপর জোর দিতেন বেশি। এজন্য তিনি এমন বলেছেন। কিন্তু এটার অর্থ এটা না যে, সরকার-ঘনিষ্ঠ হতে হবে।

এই ঘনিষ্ঠতা তো হয়ত কিছু লোকের। এটা আমি আহমদ শফী ছাহেব হুযুরের ব্যাপারে বলছি না। কিন্তু আশপাশের সুবিধাবাদী লোকেরা নিজের সুবিধা আদায় করে নেওয়ার রাস্তা তৈরি করে নেয়। এটার দ্বারা জাতির বদনাম হয়। মানুষ আলেমদের ওপর আস্থা হারায়। আমাদের উপমহাদেশের রাজনীতির ধারাটাই এরকম যে, সরকার-ঘনিষ্ঠ আলেমদের ‘দরবারি’ ভাবা হয়।

তো যখন সরকারি মহল মনে করে এবং বলতে থাকে যে, হেফাজত আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে, সেখান থেকেই ধরে নেওয়া যায় যে, পরিস্থিতিটা কোন্ দিকে। নিয়ন্ত্রণে থাকার অর্থ কী? অর্থাৎ হেফাজত অতটুকুই আন্দোলন করবে, যতটুকুতে আমাদের সায় থাকবে। বাহ্যিকভাবে এটাই তো নিয়ন্ত্রণে থাকার অর্থ।

 

প্রশ্ন : হযরত আহমদ শফী ছাহেব হুযুর রাহ.-এর জীবনের শেষের দিকে সরকার-ঘনিষ্ঠতা বা হুযুর যেহেতু কওমী মাদরাসা বোর্ডের প্রধান ছিলেন, অনেকেই এই প্রশ্নগুলি তুলছেন- স্বকীয়তা হারানো ইত্যাদি যা হুযুরের দিকে নিসবত হয়। শেষের দিকের কিছু ঘটনাও ঘটেছে, আবার বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগগুলোও উঠেছে। এরপর হুযুরের ইন্তেকাল হয়ে গেল। তো শেষ সময়ে উঠে আসা অভিযোগ ও হুযুরের বিদায়- এ সময়টাকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

উত্তর : এটা আসলে আমি দেখব আমাদের জাতিগত একটা সমস্যা হিসেবে। বিষয়টা হুযুরের সাথেই খাস না। আমরা দেখে এসেছি অতীতে। আমাদের বয়স অনেক বেশি হয়নি, কিন্তু বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতি বলেন, বড় বড় ব্যক্তিত্বের জীবন বলেন, আমাদের সৌভাগ্য হয়েছে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ের লোকদেরকে দেখার। এদেশের ইসলামী রাজনীতির ‘নাশআতে সানিয়া’-পুনর্জাগরণ বা দ্বিতীয় ধাপ তো জিয়াউর রহমানের আমল থেকে শুরু হয়েছে। স্বাধীনতা-পরর্বর্তী সময়ে ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল। এদেশে বহু বড় ব্যক্তিত্ব অতীত হয়েছেন। এখনো হায়াতে আছেন অনেকে। এদেশের একটা নিয়ম আমরা বানিয়ে ফেলেছি যে, একটা মানুষ একেবারে জীবনসায়াহ্নে চলে যাবার আগে তাকে ব্যাপক মূল্যায়ন করা হয় না। হিসাবে নেওয়া হয় না। আর কেউ যখন একবার কোনো একটি বিষয়ে প্রসিদ্ধ হন তখন সব তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। অথচ ঐ ব্যক্তিত্ব তো যোগ্যতাসম্পন্ন থাকেন আগে থেকেই। অতীতেও একাধিক ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রে এমনটি দেখেছি আমরা।

হুযুরের ক্ষেত্রে যেটা ঘটল যে, হেফাজত-পরবর্তী সময়ে হেফাজতের যখন হুযুর আমীর হলেন, এরপর যত দায়-দায়িত্ব, যত নেতৃত্ব, যত একক কর্তৃত্ব সব হুযুরের দিকে দিয়ে দেওয়া হল। আলহাইআতুল উলয়া, বেফাক, হাটহাজারী মাদরাসার দায়িত্ব, হেফাজতের আমীর সবকিছু। অথচ হুযুরের বয়স তখন নব্বইয়ের ঊর্ধ্বে; যে হায়াত এদেশের অধিকাংশ লোক পায় না। এরকম একটা বয়সে উপনীত হওয়ার পরে যদি এতগুলো দায়িত্ব একটা ব্যক্তির কাঁধে চলে যায়, তো খুব স্বাভাবিক, এ কাজগুলোর জন্য তাকে নির্ভর করতে হয়েছে তার আশপাশের লোকদের ওপর। এক্ষেত্রে আশপাশের লোকেরা, তার সহায়তাকারী, উপদেষ্টাদের ওপর নির্ভর করে অনেক কাজ করতে হয়েছে।

এর পরে দেখা গেছে, যত সিদ্ধান্তের কথা বিভিন্ন দিক থেকে শোনা গেছে, হাটহাজারীর শূরা বলেন, পরবর্তী হাটহাজারীর দায়িত্বশীল বলেন, হেফাজত নিয়ে যে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গুঞ্জন, মহাসচিব বদল হয়ে যাচ্ছে, এটা সেটা কত কথা উঠেছে। এর পরে বেফাক-কেন্দ্রিক দায়-দায়িত্বের কথা বলেন এবং জাতীয় দ্বীনী বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কথা বলেন- যা কিছু হচ্ছে, সবই হুযুরের দিকে নিসবত করা হচ্ছিল। ‘হাটহাজারীর হযরত একথা বলেছেন’। এত কিছুর দায়িত্ব দেওয়ার কারণেই স্বাভাবিকভাবে আমাদের দেশের ওই রেওয়াজটি আমরা সর্বশেষ হুযুরের ক্ষেত্রেও পেলাম। এগুলো করে আমরা কিছু লোককে সুযোগ করে দিলাম, যারা সুযোগ সন্ধানে থাকে, যারা এ মুরব্বিদেরকে সামনে নিয়ে নিজেদের আখের গোছায়, নিজেদের সুবিধা নিয়ে নেয়। হুযুরের ক্ষেত্রেও সেরকমই ঘটেছে। এবং সেটা ঘটার কারণে হুযুরের ব্যাপারে সাধারণ লোকের উচ্চাশা মানুষের ভক্তি-শ্রদ্ধা- আশা, যা অনেক বেশি ছিল, কিছু কিছু সিদ্ধান্ত যখন প্রকাশ হয়েছে যে, এটা হুযুরের নামে, ওটা হুযুরের নামে, তখন মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। ফলে দেখা গেল, যাকে আমরা শ্রদ্ধার উপরের আসনে উঠিয়েছি, তাঁর ব্যাপারেই বিভিন্ন ধরনের লোকের মধ্যে আবার বিরূপ কথা তৈরি হয়েছে।

 

প্রশ্ন : তাহলে শেষ বয়সে মুরব্বিদের ব্যাপারে আমাদের কর্মপন্থা কী হওয়া উচিত বলে মনে করেন?

উত্তর : দেখুন, প্রত্যেকেরই তো একটা বয়সের তাকাযা (চাহিদা) আছে। আমাদের এই মানসিকতা কেন হয় যে, আমরা সকল জাতীয় বড় বড় দায়িত্ব একসঙ্গে মুরব্বিদেরকে চাপিয়ে দিই। হুযুর এতকিছুর দায়িত্বে ছিলেন। হুযুরকে নিয়ে বিতর্কগুলো তৈরি হল কেন? হুযুরকে মুরব্বি ও পৃষ্ঠপোষক রেখে এ বোর্ডগুলোর দায়িত্ব অন্য কাউকে দেওয়া যেত না জীবদ্দশায়? কেন আমরা এটা চিন্তা করি যে, নব্বই-ঊর্ধ্ব লোক না হলে, আশি-ঊর্ধ্ব লোক না হলে বোর্ডের দায়িত্ব দেওয়া যাবে না! আপনি বাংলাদেশের জেনারেল লাইনের বোর্ডগুলো দেখেন। সেগুলোতে কোনো চেয়ারম্যানের বয়স ষাটের ঊর্ধ্বে নয়।

আমাদের আগের সালাফের যুগেও তো এমন ছিল না। অনেক বয়স হয়ে গেলে তারা নিজেরাই হাদীসের রেওয়ায়েত করা বন্ধ করে দিতেন যখন নিজেদের ওপর আস্থা থাকত না। অন্যরাও সতর্কতামূলক তাদের থেকে হাদীস গ্রহণ করতেন না। কিন্তু আমরা ধরেই নিয়েছি যে, অনেক বয়স হওয়ার পর অথবা একজন ব্যক্তিত্ব যখন বিখ্যাত হয়ে যাবেন তখন তাঁর কাঁধে সব চাপিয়ে দিতে হবে। আমরা এটা করি কেন? আমরা তো এটা জুলুম করি, আমরা ইহসান করি না। আমরা মনে করি, তাঁকে সম্মান করছি। আসলে সব দায়িত্ব একজনকে চাপিয়ে দিয়ে তাকে কষ্ট দিচ্ছি এবং তাকে বিতর্কিত করছি। আমরা তাকে বিতর্কিত হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছি। হুযুরের শেষ জীবনের বিয়োগান্তক ঘটনা হল এটা।

 

প্রশ্ন : হযরত আহমদ শফী ছাহেব হুযুর রাহ.-এর জীবনের শেষ দু-তিন দিনের বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

উত্তর : প্রত্যেকেরই তো মৃত্যু পূর্ব-নির্ধারিত। মুমিন মাত্রই আমরা এটা বিশ্বাস করি। আল্লাহ তাআলা হুযুরকে দীর্ঘ হায়াত দিয়েছেন। হুযুর দ্বীনী অনেক খেদমত করে গেছেন। আল্লাহ তাআলা সুযোগ করে দিয়েছেন। হুযুরেরও সময় এসে গিয়েছিল। কিন্তু সময় যখন এসে গেছে, তার দুয়েকদিন আগে তার প্রতিষ্ঠানে বিয়োগান্তক ঘটনা ঘটেছে। সবাই বিষয়টি জানেন। সেখানে হুযুর তার ছেলেকে মাদরাসা থেকে বাদ দিয়েছেন। নিজে দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন। এটাকে বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে মূল্যায়ন করবে। আমি এটাকে ইতিবাচক মূল্যায়ন করি। আমি হুযুরের একজন নগণ্য ছাত্র হিসেবে মনে করি, এটা হুযুরের ইতিবাচক দিক। আল্লাহ তাআলা হুযুরকে সুযোগ করে দিয়েছেন। হুযুর এই ইস্তফা না দিলেও হুযুরের ‘আজাল’ নির্ধারিত ছিল। হুযুরের ইন্তেকাল তো হয়ে যেত। আমরা তো মুমিন হিসেবে এটাই বিশ্বাস করি যে, হুযুর ঐদিনেই চলে যেতেন দুনিয়া থেকে। দেখুন, কে কী কারণে করেছে, বিক্ষোভ কেন হয়েছে, সব বিস্তারিত আমরা ঢাকা বসে জানিও না। সে প্রসঙ্গে যেতেও চাই না।

কিন্তু আমি মনে করি, কয়েক বছর থেকে হাটহাজারী, বেফাক কেন্দ্রিক বিভিন্ন প্রসঙ্গে হুযুরকে নিয়ে বিভিন্ন গুঞ্জন হয়েছে। হাটহাজারীতে হুযুরের পরবর্তীতে হুযুরের নিকটজনেরা হাটহাজারী দখল করে ফেলবে- এইসব কথাবার্তা হয়েছে। কিন্তু হুযুর হাসপাতালে যাওয়ার আগে আমরা তো খবর পেয়েছি, হুযুর স্বেচ্ছায় দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন। কেউ হয়ত বলবে, হুযুর চাপে পড়ে ছেড়েছেন। ধরে নিলাম, হুযুর চাপে পড়ে ছেড়েছেন, কিন্তু হুযুর যে দায়িত্ব ছেড়ে গেলেন, এটাকে আমি দু’দিক থেকেই ইতিবাচক দেখছি। প্রথমত, যখন ওখানে বিক্ষোভ হয় আমরা শুনেছি যে, মাদরাসার বাইরে সরকারি আইন-শৃংখলা বাহিনীর লোকজন ছিল, সরকার আবার মাদরাসা বন্ধেরও ঘোষণা দিয়েছিল, সেখানে একটা রক্তক্ষয়ী অবস্থার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারত। কিন্তু হুযুর দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার কারণে ঐ পরিস্থিতিতে একেবারেই পানি পড়ে গেছে, কিচ্ছু হয়নি। আমরা তো মনে করি, হুযুর দায়িত্ব সচেতন হিসেবেই এ কাজটা করেছেন। হুযুর যদি চাইতেন, ঐ বিক্ষোভের চাপে পড়েও তো দায়িত্ব না ছাড়তে পারতেন। চুপ করেও তো থাকতে পারতেন তখন পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আশংকা তো ছিল। দৃশ্যত, হুযুর দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার কারণে ওসব আর হয়নি।

এরচে বড় যে দ্বিতীয় বিষয়টি আমি মনে করি, হুযুর দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে গেছেন। আগে অনেকে হুযুরকে নিয়ে বিরূপ কথা বলেছে, নানা কথা প্রচারও হয়েছে, হাটহাজারী মাদরাসা কেন্দ্রিক, হুযুরের এক ছেলেকে নিয়ে কথা হয়েছে। এরপর হুযুরের স্বাক্ষরেই হুযুরের ছেলেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এটার কারণে হুযুরের ব্যাপারে যেই বিরূপ অবস্থাগুলো তৈরি হয়েছিল ওগুলোর মধ্যে পানি পড়ে গেছে। একারণে আমরা দেখেছি যে, হুযুরের জানাযায় আবার স্বতঃস্ফূর্তভাবে সকল শ্রেণির লোকেরাই সমানভাবে গিয়েছে। তো এটা হুযুরের ইন্তেকালের এক দিন আগে হুযুরের গ্রহণযোগ্যতা আবার আগের মতো ব্যাপকভাবে ফিরে আসার সুযোগ হয়েছে- হুযুরের দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়াতে। এজন্য আমি এটাকে ইতিবাচকভাবে দেখছি। যে যেভাবেই দেখুক।

জীবনের শেষ দু-তিন দিন একটা উত্তাল অবস্থা গিয়েছে। কিন্তু হুযুরের ইন্তেকালের পর থেকে হুযুরের সমালোচক আর কোনো মানুষ পাওয়া যায়নি। এটার কারণও এটা যে, সাফ হয়ে যাওয়া। হুযুর দায়িত্ব ছেড়ে না দিলে ধাক্কাধাক্কি, ইখতেলাফ থেকে যেত। হাটহাজারী মাদরাসা কেন্দ্রিক একটা ঝামেলা তৈরি হতে পারত। সবকিছুই সুন্দরভাবে সমাপ্ত হয়েছে।

 

প্রশ্ন : একটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন, ছাত্ররা যখন নিজেদের প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিভিন্ন সংকট দেখে এবং এ ধরনের ঝামেলাগুলো ছাত্ররা অনুভব করে তখন কেউ কেউ আন্দোলন, প্রতিবাদের পথ অবলম্বন করে, সোশ্যাল মিডিয়ায় নেতিবাচক চর্চা শুরু হয়, এক্ষেত্রে করণীয় কী? বড়দের সংকটগুলোর ক্ষেত্রে ছোটরা কী করবে?

উত্তর : আগে আমাদের সময় তালিবে ইলমদের প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে খবর রাখা, নাক গলানো- এগুলোর চিন্তা তেমন একটা ছিল না। কখনো কখনো বড় আপত্তিকর কোনো ঘটনা ঘটে গেলে তখন আন্দোলন হয়েছে তখনও যে বড় কোনো বিক্ষোভ-আন্দোলন একদমই হয়নি এমন না। তখনও দুয়েকটা হয়েছে।

কিন্তু এখন সময় পাল্টে গেছে। এখন আমরা চাই বা না চাই, খবর পৌঁছে যেতে দেরি হয় না। দেখা গেল, কোনো জায়গায় একটা সিদ্ধান্ত হল, এটা দ্রুত তালিবে ইলমদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। যেহেতু এটা একটা কঠিন বাস্তবতা যে, একটি ফোরামের কাজ ফোরামের বাইরে দ্বিতীয় স্তরেও চাউর হয়ে যাচ্ছে, ছড়িয়ে পড়ছে। তাই এখন প্রথম দায়িত্ব হল, দায়িত্বশীলদের আরো সচেতন ও সতর্ক হতে হবে। আখেরাতে জবাবদিহিতা ও হালাতের নাযুকতার কারণেও। আমাদের কাজকর্ম ও আমাদের সিদ্ধান্তের মধ্যে নেতিবাচক কিছু যেন না হয়। তালিবে ইলমরা তো শুনবে, তাদের কাছে গেলে এর খারাপ প্রভাব যেন না পড়ে।

আর তালিবে ইলমদের কাছে তো আমাদের আহ্বান থাকবেই যে, তালিবে ইলমরা তাদের নিজ কাজ করবে। তার কাজ পড়াশোনা করা। সে সেটা করবে। এছাড়া যারা ফোরামের বাইরের লোক, তারা নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত থাকবে। হাঁ, কেউ কোনো বিষয়ে মতামত দিতে চাইলে দিতে পারে। সেটাতে কোনো সমস্যা নেই। মতামত দেবে। তিনি যদি উস্তায হন তাহলে তিনি দেবেন। তালিবে ইলমের মতামত দেওয়ার তেমন কিছু নেই। তালিবে ইলম তো তালিবে ইলম। সে তো পড়ছে। সে তার পড়াশোনায় থাকবে। মতামত দিলে সে তার মুহতামিমকে পৌঁছে দিতে পারে। তার দায়িত্বশীল কাউকে লিখিত দিয়ে আসতে পারে। একটা চিরকুট দিয়ে আসতে পারে। বা বোর্ড সম্পর্কে বললেও বোর্ডে চিঠি পাঠিয়ে দিতে পারে। কিন্তু যে একটা ধারা, আমরা শুনতে পাই যে, সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রতিবাদের চর্চা করা, বিরূপ চর্চা করা, গালমন্দের কথা আমরা শুনি, বকাঝকার কথা শুনি, দোষত্রুটি চর্চার কথা আমরা শুনি- এটা দুঃখজনক। এটা সংশোধিত হওয়া অবশ্যই উচিত। এর কারণ দুটি :

এক. এটা করে লাভের কী করছি আমরা? এটা তো ইসলামের কোনো পদ্ধতি নয়। কেউ কি দেখাতে পারবে যে, ইসলামে সংশোধনের পদ্ধতি এটা। ইসলামে সংশোধনের জন্য এমন কথা বলেছে যে, চর্চা করতে থাকো। দোষ বলতে থাকো?

দ্বিতীয় কথা হল, আমরা নিজেদের দোষ-ত্রুটিগুলো অন্যদের হাতে দিয়ে দিচ্ছি। এটা খুবই মারাত্মক। আলেম-উলামাদের যাদেরকে আমরা যেখানে বসিয়েছি বা যারা যে দায়িত্বে আছেন- খুব জানা কথা যে, তারা মাসূম ব্যক্তি নন। তাদের থেকে ভুলভ্রান্তি হতে পারে। ভুল-ভ্রান্তি হওয়াটা উচিত নয়; কিন্তু হয়ে যেতে পারে। আল্লাহ না করুন, ভুল হয়ে গেলে আমরা কখনোই এটার পক্ষে না যে, ভুলভ্রান্তি বহাল থাকুক, সংশোধন না হোক। অবশ্যই ভুলভ্রান্তি করা থেকে বাঁচতে হবে। যদি হয়ে যায় সংশোধন করতে হবে। এটার প্রতিকার করতে হবে, এটা আপন জায়গায় আবশ্যক। কিন্তু এটার জন্য আমি রাস্তার মধ্যে চিৎকার করতে থাকব। সব লোককে শোনাতে থাকব, পুরো দুনিয়াকে শোনাতে থাকব, আমি সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা পোস্ট দিলাম, মন্তব্য বলে দিলাম- তো এটা মুহূর্তে পুরো দুনিয়ায় চলে যাবে। আমার ঘরে ঝামেলা হয়েছে এটা পুরো দুনিয়াকে শুনিয়ে দিলাম- এটা কী ধরনের কথা! এটা খুবই খারাপ একটা নজির তৈরি হচ্ছে। একথা শুধু এক্ষেত্রেই না, সব দ্বীনী ক্ষেত্র ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই আমরা একথা বলব।

এখন একটা রেওয়াজ হয়ে গেছে। বড় আশ্চর্যের বিষয়, একেকজন লাইভে এসে পুরো জাতিকে খেতাব করে ভাষণ দিয়েছেন। ভাবটা এরকম যে, আমি ফেসবুক লাইভে এসে কথা বললেই পুরো বিশ্ব আমার কথা একসাথে শুনছে। পুরো দেশবাসীকে একসাথে দিকনির্দেশনা দিয়ে দিচ্ছে ফেসবুক লাইভে এসে। আভ্যন্তরীণ কোনো ঝামেলা হলেই লাইভে বলে দেওয়া- আমার কোনো ঘরোয়া বিষয় আমি লাইভে বলে দিচ্ছি। আমার প্রতিষ্ঠানের বিষয় আমি লাইভে বলে দিচ্ছি। কারো সাথে মতভেদ হলে তার জবাবও নেটের মাধ্যমে দিতে হবে, ইলমী ইখতেলাফগুলোর চর্চাও করতে হবে সামাজিক মাধ্যমে- এই মেযাজটা কেন তৈরি হল!

ইসলামী শরীয়তে এই মেযাজটা, এই তরীকাটা কেউ দেখাতে পারবে? আমরা কেন অন্যদের বানানো হাতিয়ারগুলোতে নিজেদেরকে ভাসিয়ে দিচ্ছি। এটা আমাদের আবার ভাবা উচিত।

আলেমদের মধ্যে যারা সমাজচিন্তক আছেন, তাদের কাছেও আহ্বান থাকবে- তারা এসব নিয়ে ভাববেন। চিন্তা করবেন। আামাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে বোঝাবেন।

আমরা তালিবে ইলমদের প্রতি, নবীণ আলেমদের প্রতি আহ্বান করব- আমরা নিজেদের কাজে ব্যস্ত হই। আমরা নিজেদেরকে আগে প্রতিষ্ঠিত করি। সমাজ বদল হবে আমাদের মাধ্যমে। আমরা সমালোচনা করে, অন্যদের পেছনে লেগে থেকে তাদেরকে সোজা করার চিন্তার আগে নিজেরা সোজা হওয়ার চিন্তা করি। আমরা ভালো কিছু করি। নিজেরা কাজ করতে থাকি। আমরা যখন চারদিক থেকে ভালো কিছু করতে থাকব, নবীনরা যখন ভালো কিছু দেখাবে, তালিবে ইলমরা যখন নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করবে তখন দেখা যাবে এর প্রভাবে সমাজ এবং আমাদের নিজস্ব ফোরামগুলোর অসুবিধাগুলো ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যাবে। আর কোনো দোষত্রুটি আমি দেখে ফেললে সংশ্লিষ্ট ফোরামের সাথে যদি আমার যোগাযোগ থাকে তাহলে তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করব। আমি আমার মন্তব্যটা লিখিতভাবে তাদেরকে জানিয়ে দেব। ফোনে জানিয়ে দেব যে, এখানে এরকম অনিয়ম হচ্ছে। আমরা বাহিরের লোকদেরকে না জানাই। এটা তরীকা না।

 

প্রশ্ন : বাইরে জানানো বা আমলোকদেরকে জানানো- এটা তো অবশ্যই ইসলাহের তরীকা না। কিন্তু কেউ কেউ বলে, যেহেতু এমনিতে ইসলাহ হচ্ছে না, তাই আমরা সোশ্যাল মিডিয়ার আশ্রয় নিয়ে থাকি।

উত্তর : অর্থাৎ আপনি বলছেন, আমরা অধৈর্য হচ্ছি। তো অধৈর্য হওয়া তো উচিত না।

আমার প্রথম পরামর্শই হল, আন্দোলন করতে হবে- এমন পরিস্থিতিই তৈরি না করা। যারা দায়িত্বশীল আছেন তাদের সতর্ক থাকা। বাকি এর পরও যদি কিছু হয়ে যায়, তো ইসলাম কী শিখিয়েছে? ইসলাম শিখিয়েছে যে, যার কাজ সে করবে। আন্দোলন করা তোমার দায়িত্বে পড়ে কি না? অথচ তুমি সেটাই করছ। তার কাজ হল ঠিক হওয়া, সংশোধিত হওয়া। ফোরামের দায়িত্ব ছিল তাদেরকে সোজা করা। ফোরাম করছে না। তারা দায়িত্ব পালন করেনি। তোমার অতটুকু কাজ ছিল, তুমি যদি পার তাহলে তাদেরকে জানিয়ে দাও। তুমি জানিয়ে দিলে, তোমার দায়িত্ব এখানে শেষ হয়েছে। এখন তারা না করলে এটা তাদের দায়িত্ব আদায় করছে না। তোমার হতাশ হওয়ার দরকার নেই। তারা দায়িত্ব আদায় না করে থাকতে পারবে না। একসময় তারা সেটা করবে। করতে বাধ্য হবে। সময় তো আর একরকম থাকে না। কেউ কি দুনিয়ার ক্ষমতায় স্থায়ী হয়েছে? তুমি বলেছ, তোমার মতো আরো দশ-বিশজন বলবে। একসময় তারা বাধ্য হয়ে সংশোধন করবে। কিন্তু দ্রুত করার জন্য অনিয়মের মধ্যে যেও না। এতটুকুই আমরা বলতে চাই।

সবশেষে আমি বলব, আল্লাহ তাআলা উস্তাযে মুহতারাম হযরত মাওলানা আহমদ শফী ছাহেব হুযুরকে জান্নাতের আ‘লা মাকাম দান করুন। তাঁর সদকায়ে জারিয়াকে কিয়ামত পর্যন্ত জারি রাখুন এবং হুযুরের রেখে যাওয়া ভালো ভালো কাজগুলো আমাদের অনুসরণ করার তাওফীক দান করুন- আমীন।

 

 

advertisement