সফর ১৪৪২   ||   অক্টোবর ২০২০

নতুন শিক্ষাবর্ষের আহ্বান

বিভিন্ন পরিস্থিতির কারণে চলতি শিক্ষাবর্ষে আমাদের কওমী মাদরাসাগুলোর বর্ষ-শুরু কিছুটা এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ আমাদের সামাজিক জীবনের সব ক্ষেত্রেই ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। শিক্ষা-দীক্ষা, চাকরি-বাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, যাতায়াত-যোগাযোগ সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘ সময় ধরে একপ্রকারের স্থবিরতা বিরাজ করছিল। আমাদের দ্বীনী শিক্ষাঙ্গনও এর বাইরে ছিল না। সময়ের পরিক্রমায় সবকিছুই আবার স্বাভাবিকতার দিকে ফিরছে। কওমী মাদরাসাগুলোতেও তালিবানে ইলমের উপস্থিতি ও পড়াশোনার পরিবেশ ধীরে ধীরে ফিরে আসছে। এই ভিন্নরকমের পরিস্থিতির মধ্যে কওমী অঙ্গনের জন্য একটি বড় ঘটনা আল্লামা আহমদ শফী ছাহেব রাহ.-এর ইন্তিকাল। কিছুদিন আগে চলে গেছেন দারুল উলূম দেওবন্দের শাইখুল হাদীস হযরত মাওলানা মুফতী সাইদ আহমদ পালনপুরী রাহ. এবং আরো কয়েকজন, যাঁরা স্ব স্ব ক্ষেত্রে ছিলেন অভিভাবকতুল্য ব্যক্তিত্ব । নিজ পরিমÐলে যাদের উপস্থিতি ছিল তাসবীহের ঐ সুতোর মতো, যা এর বিক্ষিপ্ত দানাগুলোকে একত্র করে রাখে।

আমাদের ধর্মীয় ও সামাজিক উভয় অঙ্গনে বিচ্ছিন্নতা-বিক্ষিপ্ততা ও তার কুফল থেকে আত্মরক্ষার জন্য এমন ব্যক্তিত্বের বিকল্প নেই, যাঁরা হবেন মানুষের আস্থা ও শ্রদ্ধার পাত্র, নানা শ্রেণি-পেশা ও নানা রুচি-অভিরুচির মানুষের ঐক্যের সূত্র। স্বভাবগত সারল্য ও দুর্বলতা কিংবা চারপাশের লোকদের অযোগ্যতা-অনাচারের কারণে এই মহামূল্যবান ঐক্যের সূত্রগুলো যখন দুর্বল হয়ে পড়ে কিংবা আল্লাহর হুকুমে যখন তাদের ইন্তিকাল হয়ে যায় তখন স্বভাবতই শূন্যতার অনুভতি জাগে। আল্লাহ তাআলা এই শূন্যতা পূরণ করে দিন।

বর্তমান শিক্ষাবর্ষের শুরু থেকেই যেসকল অবাঞ্ছিত পরিস্থিতি আমাদের স্বাভাবিক পড়াশোনা ও নিমগ্নতা ব্যাহত করেছে তা  অনেকগুলো সত্য আমাদের সামনে এনে দিয়েছে। চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গের কাছে তা স্পষ্টও বটে। তন্মধ্যে আমরা যারা তালিবানে ইলম তাদের জন্য যে বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে, বিদ্যমান সময়-সুযোগের অপব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। সময় নিজ গতিতে চলছে। কারো জন্য, কোনো পরিস্থিতির কারণেই তা থেমে থাকে না। আগামীর সুন্দর ভবিষ্যত নির্মাণে বিদ্যমান সময়ের পূর্ণ সদ্ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। আমাদের জানা নেই, কখন কী পরিস্থিতি তৈরি হবে আর আমাদের জীবন-গঠনের সোনালী নিমগ্নতায় ছেদ পড়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের হেফাযত করুন। কাজেই বিভিন্ন ঘটনা ও পরিস্থিতির পর এখন যেহেতু সব ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও স্বাভাবিকতা ফিরে এসেছে, আমাদের শিক্ষাঙ্গনেও নিয়মতান্ত্রিক পড়াশোনার ধারা শুরু হয়েছে তাই এখন পূর্ণ মনোযোগের সাথে পড়াশোনায় মগ্ন হয়ে যাওয়া কর্তব্য। চিন্তা-চেতনা, জ্ঞান-প্রজ্ঞা, আমল-আখলাক গঠনে মনোনিবেশ করা এখন সময়ের দাবি।

বাস্তবতা এই যে, আজ যারা  ছাত্র তারাই আগামী দিনের শিক্ষক, আজকের ছোটরাই আগামী দিনের বড়। তাদের মধ্যমেই পূর্ণ হবে চলে যাওয়া বড়দের শূন্যস্থান। সেই শূন্যস্থান যোগ্য ও সৎ মানুষের দ্বারাই পূরণ হোক- এ এক স্বাভাবিক প্রত্যাশা। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই শুভ প্রত্যাশা পূরণের উপায় হচ্ছে সবাই মিলে আত্মগঠন ও আত্মবিনির্মাণের কাজে নিমগ্ন হওয়া। এই নির্মাণ ও বিনির্মাণের পক্ষে যেখানে যতটুকু অনুকল পরিবেশ আছে তা সংরক্ষণ করে তা থেকে বেশি বেশি উপকৃত হওয়ার চেষ্টা করা আমাদের কর্তব্য।

কথাগুলো আমাদের কওমী অঙ্গনের জন্য কোনো নতুন বা না-বলা কথা নয়। যে কোনো তালিবে ইলমেরই তা মনের কথা। আমাদের যোগ্য ও ¯œহশীল উস্তাযগণের হৃদয়ের আকুতি, যা বিভিন্ন ভাষায় ও আঙ্গিকে তাঁদের আলোচনায়, নির্দেশনায়, দুআ ও শুভ কামনায় স্পষ্ট প্রকাশিত। কিন্তু পরস্পর শুভকামনা বিনিময় যেহেতু ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তাই জানাশোনা কল্যাণের কথাগুলোও পরস্পর আলোচনা করতে দোষ নেই; বরং বারবার তা আলোচনায় নিয়ে আসা প্রয়োজন, যেন তা আমাদের হৃদয় ও মস্তিষ্ককে স্পর্শ করে এবং আল্লাহর হুকুমে আমাদের চেতনাকে সংকল্পে আর সংকল্পকে কর্মে পরিণত করতে পারে।

ইসলামী দাওয়াতের ভবিষ্যত ধারক-বাহক হিসেবে আমাদের গড়ে ওঠার ক্ষেত্র কতই না বিস্তৃত! প্রত্যেক প্রজন্মের মধ্যেই তো থাকতে হবে ইসলামী উলূম-ফুনূনের প্রত্যেক শাখার এক দল বিদগ্ধ মনীষী, থাকতে হবে ইসলামী দাওয়াত নিয়ে গণমানুষের মাঝে বিচরণকারী একদল নিষ্ঠাবান ও প্রজ্ঞাবান দায়ী, থাকতে হবে আমর-বিল মারূফ, নাহী আনিল মুনকারের বিস্তৃত অঙ্গনের দাবি পূরণকারী জ্ঞানী, বিচক্ষণ ও সাহসী কর্মী।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই সকল অঙ্গনের প্রয়োজন পূরণের জন্য ইসলামী শিক্ষা ও বিধানের গভীর পাণ্ডিত্যের পাশাপাশি প্রয়োজন দক্ষ কলম-সৈনিক, হৃদয় ও মস্তিষ্ককে সম্মোহিতকারী আলোচক, সুযোগ্য শিক্ষক, ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্ব গঠনকারী মমতাবান শায়খ ও উস্তায, সর্বোপরি নিজ জীবন ও কর্মের পবিত্র আভায় চারপাশ আলোকিতকারী আদর্শ মাটির মানুষ।

গোটা তালিবানে ইলম-সমাজ যদি এই নববী মীরাছের বাহক হওয়ার উঁচু সংকল্প নিয়ে আত্ম-নির্মাণে মগ্ন হয়ে যান তাহলেও এই মীরাছের বিস্তৃতি ও গভীরতার যে দাবি তাতে তাদের আত্মতৃপ্তিতে ভোগার কোনো উপায় নেই। আমরা সবাই মিলেও যদি এই পবিত্র মীরাছের কিছু অংশও ধারণ করতে পারি, কিছু দাবিও পূরণ করে যেতে পারি সেটিও হবে মহান রাব্বুল আলামীনের অপরিসীম দয়া ও করুণা।

তাই আসুন, আমরা আবারো আমাদের মঞ্জিল ও গন্তব্যকে স্মরণ করি এবং বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহবলে আমাদের মোবারক যাত্রা আরম্ভ করি। নতুন শিক্ষাবর্ষে সবার জন্য শুভকামনা।

 

 

advertisement