মুহাররম ১৪৪২   ||   সেপ্টেম্বর ২০২০

কিতাবের প্রতি ভালবাসা

মাওলানা আবু সাফফানা

কিতাব মানুষকে আলোকিত করে। সুন্দর জীবনের পথ দেখায়। অতীতের সাথে বর্তমানের সেতুবন্ধন হচ্ছে কিতাব। প্রায় দেড় হাজার বছর ধরে উলামায়ে কেরাম ইলমের যে বাগান সাজিয়েছেন তার পুষ্পসৌরভে মোদিত হওয়ার একমাত্র মাধ্যম হল  কিতাব।

কোনো কোনো কিতাব মানুষের মনোজগতকে উজ্জীবিত করে। চেতনাকে শাণিত করে। মানবিকতা জাগিয়ে তোলে। কখনো একটি কিতাবই হতে পারে জীবন পরিবর্তনের কারণ। কিতাবকে বলা যায় মানুষের শ্রেষ্ঠ সঙ্গী। কিতাব অধ্যয়নের প্রশংসা করতে গিয়ে একজন মনীষী বলেন, “কিতাব আপনার সর্বোত্তম বন্ধু। কিতাব আপনাকে আলোর পথ দেখাবে। জীবন পথের পাথেয় যোগাবে। কিতাবের সান্নিধ্য আপনাকে অসীম দিগন্তে নিয়ে যাবে এবং অজানা রহস্য মেলে ধরবে। কিতাব মানুষের আত্মার খোরাক। তাই আরামপ্রিয় ও অলসদের সঙ্গ ছেড়ে কিতাবের সঙ্গ গ্রহণ করুন।”

কিতাবের ভালবাসা যখন কারো হৃদয়ে স্থান করে নেয় তখন অন্য সব ভালবাসা ¤øান হয়ে যায়। আমাদের আকাবিরদের হৃদয়ে ঠিক এমন ভালবাসা ছিল কিতাবের প্রতি।

 

অকল্পনীয় মুতালাআ

কিতাব মুতালাআ করে অনেকেই। ছোট ছোট কিতাব পেলে একটু আগ্রহ করে পড়ে, কিন্তু কিতাব কিছুটা দীর্ঘ হলেই আগ্রহের জোয়ারে ভাটা পড়ে। আর যদি তা  হয় কয়েক খণ্ডের তবে তো হিম্মত আরো কমে যায়। তবে পৃথিবীর ইতিহাসে অমর ব্যক্তিত্ব মুহাম্মাদ ইবনে আলী ইবনু দাকীকিল ঈদ রাহ. (মৃত্যু : ৭০২ হি.) হতে পারেন এক্ষেত্রে আমাদের প্রেরণার উৎস।

তিনি ছিলেন জ্ঞানের সমুদ্র। তবে তা এমনিই হয়ে যায়নি; বরং রাত-দিনের একনিষ্ঠ অধ্যয়ন তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে ইলমের সর্বোচ্চ শিখরে। যেখানে খুব কম মানুষই পৌঁছাতে পারে।

আদফুবী রাহ. বলেন, তার মুতালাআর ক্ষমতা ছিল অকল্পনীয়। আমি আলমাদরাসাতুন নাজীবিয়্যাহ-এর লাইব্রেরি ঘুরেছি। সেখানে অনেক গ্রন্থ ছিল। ইবনুল কাসসারের ‘উয়ূনুল আদিল্লাহ’ও ছিল সেখানে। ত্রিশ খণ্ডের এই বিশাল কিতাবের পাতায় পাতায় দেখেছি তার (ইবনু দাকীকিল ঈদ) কলমের দাগ। আলমাদরাসাতুস সাবেকীয়্যাহতেও যাওয়া হয়েছিল আমার। বাইহাকী রাহ.-এর  ‘আসসুনানুল কুবরা’ ছিল সেখানে। এই বিশাল গ্রন্থের প্রতিটি খণ্ডেই আমি তার কলমের দাগ দেখেছি। তাছাড়া তারীখে বাগদাদ, মুজামুত তবারানী আলকাবীর, আলবাসীত লিল ওয়াহিদীতেও দেখেছি তার কলমের দাগ। (আততালিউস সায়ীদ, পৃষ্ঠা ৫৮০)

প্রিয় পাঠক! একটু চিন্তা করুন। এ গ্রন্থগুলো সম্পর্কে যাদের সামান্য জানাশোনা আছে তারা জানেন একেকটি গ্রন্থের কলেবর কত বৃহৎ। আদ্যোপান্ত অধ্যয়ন তো দূরের কথা শুধু পৃষ্ঠা উল্টিয়ে পুরো কিতাবের ঘ্রাণ নিয়েছেন এমন মানুষ এ যুগে খুব কম পাওয়া যাবে, কিন্তু এ মহান মনীষী এ পুরো কিতাব অধ্যয়নের সাথে সাথে পাতায় পাতায় এঁকে গেছেন মুতালাআর চিহ্ন।

সিরাজুদ্দীন রাহ. বলেন, আল্লামা রাফেয়ী রাহ.-এর ‘আশশারহুল কাবীর’ যখন প্রকাশিত হয় তিনি তা এক হাজার দিরহাম দিয়ে ক্রয় করেন। এরপর তিনি শুধু নামায পড়া ছাড়া বাকি সময় কিতাব মুতালাআয় নিমগ্ন থাকতেন। এভাবেই শেষ করেন পুরো কিতাব। (প্রাগুক্ত)

ইবনু দাকীকিল ঈদ রাহ.-এর বেশির ভাগ সময় অর্থকষ্ট লেগেই থাকত। সম্পদের প্রাচুর্য তার ছিল না। তাই ঋণ করেই অনেকসময় কিতাব ক্রয় করতেন।

 

কিতাব সংগ্রহের নেশা

মানুষের সখের শেষ নেই। একেকজনের সখ একেক রকম। কারো সখ ঘুরে বেড়ানো। আবার কারো বই পড়া। আবু মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ইবনে আহমাদ ইবনুল খাশশাব আননাহবী রাহ. (মৃত্যু : ৫৬৭)-এর শখটি ছিল বই সংগ্রহ করা। সাথে অবিরাম মুতালাআ তো আছেই।

ইবনুন নাজ্জার বলেন, কোনো আহলে ইলম মারা গেলেই ইবনুল খাশশাব রাহ. তার সকল কিতাব কিনে ফেলতেন। এভাবে মাশায়েখদের অনেক কিতাব জমা হয়েছিল তার কাছে। তার হাতে সবসময় কিতাব থাকত। আর তিনি নিবিষ্ট চিত্তে অক্লান্তভাবে সারাদিন মুতালাআয় ডুবে থাকতেন। (সাফাহাত মিন সাবরিল উলামা, পৃষ্ঠা ৩২১)

ইবনুল আখদার রাহ. বলেন, আমি একদিন উসতাদজীর কাছে যাই। তিনি তখন অসুস্থ ছিলেন। তবুও বুকে কিতাব রেখে মুতালাআ করছিলেন। আমি বললাম, এ কী? তিনি বললেন, ইবনে জিন্নী নাহুর একটা মাসআলা বলে শে‘রের একটি পংক্তি দিয়ে তা প্রমাণ করতে চেয়েছেন। তবে ব্যপারটা খুব ভালোভাবে স্পষ্ট করতে পারেননি। অথচ এ মাসআলার সমর্থনে আমার সত্তরটি পংক্তি জানা আছে। (শাযারাতুয যাহাব ৬/৩৬৬)

 

বাড়ি বিক্রি করে কিতাব সংগ্রহ...

কিতাব সংগ্রহের জন্য কি কেউ তার বাড়ি বিক্রি করতে পারে? আপাতদৃষ্টিতে তা অসম্ভব। তবে এক কিতবাপ্রেমী কিতাবের ভালবাসায়  এ অসম্ভবকে বাস্তব রূপ দিয়েছিলেন। ইবনুল খাশশাব রাহ. একবার কিতাবের বাজারে গেলেন। তখন একটা কিতাব খুব পছন্দ হল তার। তবে দামটা একটু বেশি। পাঁচশত দিনার। অত টাকা তার সংগ্রহে ছিল না তখন। তবুও তিনি কিতাবটি কিনে ফেললেন। বিক্রেতার কাছে দাম পরিশোধের জন্য তিন দিন  সময় নিয়ে বাড়িতে চলে গেলেন। গিয়েই ঘটালেন এক অবাক কাণ্ডবাড়ি বিক্রির জন্য ডাক উঠালেন। একজন পাঁচশত দিনার বলতেই নগদ টাকা নিয়ে বাড়ি বিক্রি করে দিলেন। এরপর সে টাকা দিয়ে পরিশোধ করলেন কিতাবের মূল্য! (সাফাহাত মিন সাবরিল উলামা, পৃষ্ঠা ৩২১-৩২২)

প্রিয় পাঠক! আপনি কি ভেবেছেন ইসলামী ইতিহাসে এমন ঘটনা একটাই ঘটেছে? না, বরং এর নযীর আরো আছে। কিতাবের প্রতি এই প্রেম ও হৃদয়ের টানের কারণেই তো সে যুগে আমরা ছিলাম পৃথিবীর সর্বোন্নত সভ্যতার ধারক-বাহক।

আবুল আলা হাসান ইবনে আহমাদ বিন সাহল আলআত্তার রাহ. (মৃত্যু : ৫৬৯ হি.)। তিনি ছিলেন ধনী পরিবারের সন্তান। বাবা ব্যবসা করতেন। তাই বাবার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারসূত্রে অঢেল সম্পদ লাভ করেছিলেন। তবে এগুলো দ্বারা তিনি বিলাসিতা করেননি। পুরোটাই ইলম অর্জনের জন্য ব্যয় করেছিলেন।

একদিনের ঘটনা। বাগদাদে ইবনুল জাওয়ালিকী রাহ.-এর কিতাবসমূহ বিক্রি হচ্ছিল। আবুল আলা রাহ.-ও সেখানে গেলেন। কিছু কিতাবের তখন দাম হাঁকা হল ষাট দিনার। তিনি তা কিনে ফেললেন। তবে দাম পরিশোধের জন্য সময় চাইলেন এক সপ্তাহ। সাথে সাথে রওয়ানা দিলেন মাতৃভমি হামাযানের দিকে। বাড়ি পৌঁছে বাড়ি বিক্রির ঘোষণা দিলেন। একজন ষাট দিনারের কথা বলল। তিনি রাজি হয়ে গেলেন। আশপাশের লোকজন বললএ বাড়ির দাম তো আরো বেশি হবে। তিনি বললেন, না, এ দামেই বিক্রি করব। তখন ষাট দিনারেই বাড়ি বিক্রি করে দেয়া হল। অর্থ নিয়ে তিনি আবার ছুটলেন বাগদাদের দিকে। বাগদাদ থেকে হামাযান। আবার হামাযান থেকে বাগদাদ আসা-যাওয়ার মাঝেই কেটে গেল এক সপ্তাহ। এসে তিনি কিতাবের দাম শোধ করে দিলেন। (সাফাহাত মিন সাবরিল উলামা, পৃ. ৩২৩)

৫৬৯ হিজরীতে এই মহান মনীষী ইন্তেকাল করেন। একজন স্বপ্নে দেখলেন, তিনি একটি শহরে, যার সবগুলো দেয়াল তৈরি করা হয়েছে কিতাব দিয়ে। আবুল আলা রাহ.-এর চারপাশেও অসংখ্য কিতাব। তিনি গভীর নিমগ্নতায় সেগুলো মুতালাআ করছেন। স্বপ্নেই তাকে জিজ্ঞেস করা হল, এর রহস্য কী? তিনি বললেন, আমি আল্লাহ্র কাছে আরজি জানিয়েছি, দুনিয়াতে আমি যা নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম এখানে তা নিয়েই ব্যস্ত থাকার সুযোগ তিনি যেন আমায় করে দেন। আল্লাহ তাআলা আমার এ চাওয়া কবুল করেছেন। (প্রাগুক্ত)

হে আল্লাহ! কিতাবের প্রতি এমন ভালবাসা, এমন পাঠনিমগ্নতা আমাদেরকেও নসীব করুন- আমীন।

 

ঈদের দিনেও পাঠনিমগ্নতা

ঈদের দিন কী করি আমরা? খাওয়া-দাওয়া, ঘুরা-ফেরা এই তো! কিন্তু বই পড়া, কিতাব মুতালাআর চিন্তা কি করি কখনো? না।

মূসা বিন মুহাম্মাদ রাহ. একসময়ের জ্ঞানরাজ্য আন্দালুসের বিখ্যাত মনীষী। তার ছেলে আবুল হাসান রাহ. বাবার সম্পর্কে বলেন, বাবা ৬৭ বছর জীবিত ছিলেন। তবে কিতাব মুতালাআ ও লেখালেখি ছাড়া একটা দিনও তিনি অতিবাহিত করেননি। এমনকি ঈদের দিনও এ ধারা অব্যাহত থাকত। একবার ঈদের দিন আমি তার কামরায় যাই। তিনি তখন লিখছিলেন। আমি বললাম, বাবা! আজ ঈদের দিনও আপনি বিশ্রাম করবেন না? তিনি তখন চোখ তুলে আমার দিকে তাকালেন। মনে হল যেন আমার উপর রাগ করেছেন। বললেন, আমার মনে হয় তুমি জীবনে সফল হতে পারবে না। তুমি কি এ ভিন্ন অন্য কিছুর মাঝে আনন্দ খুঁজে পাও? খোদার কসম এর চেয়ে অধিক আনন্দের কাজ আমার জানা নেই। (নাফহুত তীব মিন গুছনিল আন্দালুস আররাতীব ২/৩৩৪)

আহ! আমরাও যদি মুতালাআয় এমন আনন্দ খুঁজে পেতাম। লেখালেখি ও অধ্যয়নের মাঝে এমন প্রশান্তি যদি আমাদেরও অনুভব হত। তাদের মত কিংবা তার কিছু অংশ।

 

বদ্ধ ঘরে তিন বছর!

সানাদ ইবনে আলী বলেন, আমার বাবা খলীফার রাজদরবারে কাজ করতেন। খলীফাও তাকে অনেক ভালবাসতেন। উকলিদাসের পাঠ শেষ করে আমি মিজাসতী কিতাব পড়া শুরু করতে চাইছিলাম। তবে কিতাবটি ছিল না আমার কাছে। বাগদাদে তখন এক লিপিকার এ কিতাব বিশ দিনারে বিক্রি করত। আমি বাবাকে বললাম তা কিনে দেয়ার জন্য। বাবাও কিনে দেয়ার আশ্বাস দিলেন। কিন্তু দিব দিচ্ছি করে করে অনেক দিন হয়ে গেলেও আর কিনে দিলেন না।

আমার এক ভাই ছিল। আমার মত পড়াশোনার  এত আগ্রহ তার ছিল না। বাবার সাথে বিভিন্ন কাজ করত। একদিনের ঘটনা। বাবা কোনো একটা কাজে গিয়েছিলেন এক জায়গায়। আমিও সাথে গেলাম সেদিন। বাবা ভেতরে কাজ সারার সময়টাতে বাহনজন্তুকে ধরে রাখাই ছিল আমার কাজ। বয়স আমার তখন মাত্র সতের বছর। বাবা ভিতরে যাওয়ার পর এক ছেলে এসে আমাকে বলল, তোমার বাবা অনেক সময় এখানে অবস্থান করবেন। তাই তুমি চলে যাও। আমি তখন বাহনজন্তুটা নিয়ে সোজা বাজারে চলে গেলাম। বাবাকে না জানিয়েই তা তিরিশ দিনারের কিছু কমে বিক্রি করে দিলাম। এরপর বিশ দিনার দিয়ে মিজাসতী কিতাবটা কিনে বাড়ি ফিরে এলাম। মাকে এসে বললাম, আজ খুব বড় একটা অপরাধ করেছি। এরপর পুরো ঘটনা শুনিয়ে মাকে কসম দিয়ে বললাম। বাবা যদি এ কারণে আমার উপর রাগ করেন তবে তোমাদের ছেড়ে অনেক দূরে চলে যাব আমি। একথা বলে অতিরিক্ত মূল্যটা মাকে ফেরত দিয়ে দিলাম। বাড়িতে আমার একটা ঘর ছিল। সেখানে একাকী থাকতাম আমি। মাকে বললাম, ঘরে ঢুকে আমি দরজাটা লাগিয়ে দেব। কিতাব শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি আর বের হব না। তোমার কাছে অনুরোধ, প্রতিদিন একটা মাত্র রুটি বাহির থেকে আমার ঘরে নিক্ষেপ করবে। কয়েদিকে যেমন খাবার দেয়া হয় সেভাবে।

মা আমাকে বাবার দিকটি দেখার ব্যাপারে আশ্বস্ত করলেন। আমি এরপরই ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলাম। এদিকে আমার ভাই বাবার কাছে গিয়ে সব বলে দিল। শুনতেই বাবার মুখের রং বদলে গেল। উপস্থিত অন্যদের চোখ থেকে ব্যাপারটা এড়াল না। জিজ্ঞেস করল, ব্যাপার কী? একটা খবর শুনেই আপনি এমন বদলে গেলেন কেন? বলুন তো কী হয়েছে? বাবা আমার ঘটনা বললেন, অন্যরা বলল, বাহ্! আপনি তো অনেক ভালো একটি সন্তান লাভ করেছেন। এমন ছেলে ক’জনের ভাগ্যে জোটে। আপনি আপনার ছেলেকে কিছুই বলবেন না। আর এই নিন আগেরটার চেয়ে অনেক সুন্দর একটা বাহন আপনাকে দিচ্ছি।

সানাদ ইবনে আলী বলেন, আমি সেই ঘরে তিনটা বছর  এক দিনের মত কাটিয়ে দিলাম! (আলমুকাফাআহ্ পৃ. ১১৯; সাফাহাত মিন সাবরিল উলামা, পৃ. ২৭৫-২৭৭)

 

আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ আসসিলাফী রাহ. (মৃত্যু : ৫৭৬ হি.)-এর পাঠনিমগ্নতা

আবদুল কাদের রুহাবী বলেন, সিলাফী রাহ. ইসকান্দারিয়া থাকা অবস্থায় একদিন শুধু ঘুরতে বেরিয়েছিলেন। তিনি সবসময় মাদরাসাতেই থাকতেন। আমরা যখনই তার কাছে যেতাম দেখতাম তিনি মুতালাআয় নিমগ্ন।

আওকী রাহ. বলেন, সিলাফী রাহ. আমাকে বলেছেন, আমার এখন ষাট বছর, অথচ এ দীর্ঘ সময়ে আমি একবারের জন্যও ইসকান্দারিয়ার প্রসিদ্ধ মিনার দেখতে যাইনি। (অথচ এটা ছিল পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্যের একটি) হাঁ, মাদরাসার জানালা দিয়ে যতটুকু দেখা যায় এতটুকুই।

হাফেয আবদুল আযীম মুনযিরী রাহ. বলেন, সিলাফী রাহ.-এর কিতাব সংগ্রহের প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল। যা অর্থ আসত কিতাব কিনেই খরচ করে ফেলতেন। (সাফাহাত মিন সাবরিল উলামা, পৃ. ৯৩)

 

কিতাবপ্রেমী তিন মনীষী

আবু হাফফান রাহ. বলেন, তিন ব্যক্তির মত কিতাবপ্রেমী আমি আর কাউকে দেখিনি। জাহেয, আলফাত্হ ইবনে খাকান, ইসমাঈল বিন ইসহাক আলকাযী।

 

এক. জাহেয (মৃত্যু : ২৫৫ হি.)

জাহেয এতটাই কিতাবপ্রেমী ছিলেন যে, কোনো কিতাব পেলেই তিনি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়ে ফেলতেন। কিতাবটা যে বিষয়েরই হোক না কেন। অনেকসময় বই বিক্রেতাদের দোকান ভাড়া নিয়ে রাত জেগে কিতাব মুতালাআ করতেন।

 

দুই. আলফাত্হ ইবনে খাকান (মৃত্যু : ২৪৭ হি.)

সবসময় ইবনে খাকানের হাতে কোনো না কোনো কিতাব থাকত। প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণ কিংবা নামাযের জন্য মুতাওয়াক্কিলের মজলিস থেকে উঠে যাওয়ার প্রয়োজন হলে হাঁটতে হাঁটতেই কিতাব মুতালাআ করতেন। মসজিদ কিংবা হাম্মামে যাওয়ার আগ পর্যন্ত চলত অধ্যয়নের এ ধারাবাহিকতা। প্রয়োজন শেষে মজলিসে ফিরে আসা পর্যন্ত আবার শুরু হত অধ্যয়ন। মুতাওয়াক্কিল কোনো প্রয়োজনে উঠে গেলে ফেরার আগ পর্যন্ত আবার কিতাব মুতালাআ শুরু করতেন।

 

তিন. ইসমাঈল ইবনে ইসহাক আলকাযী (মৃত্যু : ২৮২ হি.)

আমি যখনই তার কাছে গিয়েছি দেখেছি তিনি মুতালাআ করছেন। কিংবা মুতালাআর জন্য কিতাব খুঁজছেন কিংবা কিতাবের ধুলো-ময়লা ঝাড়ছেন।

(তারীখুল ইসলাম, যাহাবী খ. ৫, পৃ. ১১৯৩, জীবনী নং ৩৪৫-এর অধীনে)

 

কাপড় বিক্রি করে কাগজ ক্রয়

কিতাব পড়ি আর না পড়ি কিন্তু কিতাব কেনার শখ আছে আমাদের অনেকেরই। কারণ কিতাব কিনে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখাটা এখন ঘরের সৌন্দর্য বর্ধনের একটা মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যপারটা অনুচিত। কিতাব কেনা উচিত পড়ার জন্য। সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য নয়।

যাই হোক কিতাব কেনার এ আগ্রহটা কিন্তু পকেটে টাকা থাকলেই প্রবল থাকে। টাকা থাকার অর্থও আবার প্রয়োজনের অতিরিক্ত টাকা। আমাদের অনেকের অবস্থাই এমন। তাই আসুন সামনের ঘটনাটা পড়ে আমাদের এই অবস্থার সংশোধন করা যায় কি না।

আবু জাফর ইবনে আবদুর রহমান (মৃত্যু : ৩২১ হি.) ছিলেন অনেক বড় ফকীহ। সেইসাথে খোদাভীরু মুত্তাকী। সবসময় ইলম চর্চায় নিমগ্ন থাকতেন।

আবু বকর মালেকী বলেন, তিনি (আবু জাফর) একবার ‘সূসা’ শহরে একটি কিতাব দেখেন। কিতাবটি পছন্দ হয় তার। কিন্তু অনুলিপি করার মত কাগজ তার কাছে ছিল না। কাগজ কিনবেন- পকেটে সেই টাকাও নেই। অবশেষে পরিধেয় কাপড়টাই তিনি বিক্রি করে ফেলেন। সে কাপড়বেচা টাকা দিয়ে কাগজ কিনে পুরো কিতাব অনুলিপি করে নেন। এরপর কায়রাওয়ানে ফিরে আসেন গর্বের ধন কিতাবটিকে বুকে নিয়ে। (সাফাহাত মিন সাবরিল উলামা, পৃ. ১৯৪)

ঠিক এমন একটি ঘটনা ঘটেছে শায়েখ আহমাদ ইবনে কাসেম আলহাজ্জারের (মৃত্যু : ১২৭৮ হি.) সাথেও। একবার একটা কিতাব বিক্রি হচ্ছিল। কেনার মত অর্থ তখন তার কাছে ছিল না। তাই পরিধানের কাপড় থেকে একটা বিক্রি করে তার মূল্য দিয়েই কিতাবটি ক্রয় করেন। (সাফাহাত মিন সাবরিল উলামা, পৃ. ২৭৮)

 ইমাম আবু যুরআ রাযী রাহ. (মৃত্যু : ২৬৪ হি.) হাদীস শাস্ত্রের বিখ্যাত ইমাম। হাদীসের আলোয় আলোকিত এ মহা মনীষী হাদীস শাস্ত্রে লাভ করেছেন আকাশ ছোঁয়া মর্যাদা। আকাশের এই উচ্চতায় তিনি এমনিই পৌঁছে যাননি। কষ্টের সিঁড়ি বেয়ে তবেই পৌঁছেছেন সেখানে। ত্যাগের এমন একটি ঘটনা তার মুখেই শুনুন-

আমি রায় শহর থেকে ইলম অর্জনের জন্য দ্বিতীয়বার বের হয়েছিলাম ২২৭ হিজরীতে। আর ফিরে আসি ২৩২ হিজরীতে। (অর্থাৎ এ সফরে ৫ বছর তিনি ইলম অর্জনের জন্য বিভিন্ন দেশে সফর করেন)

এ সফরের সূচনা করি পবিত্র হজ¦ আদায়ের মাধ্যমে। এরপর হিজায ভমি থেকে প্রথমে যাই মিশরে। সেখানে পনের মাস অবস্থান করি আমি। প্রথমে ইচ্ছা ছিল খুব বেশি দিন মিশরে থাকব না। তবে সেখানে ইলমের যেই আসর দেখেছি, জ্ঞান-প্রদীপদের যেভাবে আলো ছড়াতে দেখেছি তখন এই আলো বুকে ধারণ না করে আর যেতে মন চাইল না। প্রথমে ইমাম শাফেয়ী রাহ.-এর কিতাবসমূহ শোনার ইচ্ছা আমার ছিল না। কিন্তু পরে ইলমের এ ঝর্ণা থেকেও ইলম শুধা পান করার আগ্রহ জেগে উঠল। ইমাম শাফেয়ী রাহ.-এর কিতাব সম্পর্কে ভালো জানা-শোনা আছে- প্রথমে এমন একজনকে খুঁজে বের করলাম। তার সাথে কথা হল, দিরহামের বিনিময়ে সবগুলো কিতাব সে আমাকে অনুলিপি করে দেবে। তখন কাগজের প্রয়োজন দেখা দিল। কিন্তু কাগজ ছিল না আমার কাছে। মিশর থেকে দুই জোড়া কাপড় আমি কিনেছিলাম। ইচ্ছে ছিল বাড়ি গিয়ে তা সেলাই করে পড়ব। কিন্তু কাগজের কোনো ব্যবস্থা না হওয়ায় উপায়ান্তর না দেখে কাপড় জোড়া বিক্রি করে দেয়া হল। এরপর বিক্রিত মূল্যের কিছু অংশ দিয়ে কাগজ কেনা হল। (সাফাহাত মিন সাবরিল উলামা, পৃ. ২৬১-২৬২)

কিতাবের প্রতি এ ভালবাসার জন্য তারাও এক একজন হয়ে উঠেছিলেন জীবন্ত কিতাব। তাদেরকে দেখেও অনুভব করা যেত কিতাবের সৌরভ। সে সৌরভ সুরভিত করত আলেম-তালিবুল ইলম সকলকে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবার মনেই কিতাবের প্রতি এমন ভালবাসা দান করুন- আমীন।

[সাফাহাত মিন সাবরিল উলামা, আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ ও তারীখের বিভিন্ন কিতাব থেকে চয়নকৃত]

 

 

advertisement