মুহাররম ১৪৪২   ||   সেপ্টেম্বর ২০২০

যে সকল আমল দ্বারা গোনাহ মাফ হয়

মুহাম্মাদ ফজলুল বারী

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

যাদের জন্য ফিরিশতারা মাগফিরাতের দুআ করে

বারো. রোযাদারের সামনে খাওয়া হলে ফিরিশতা রোযাদারের জন্য দুআ করে

 

রোযাদারকে আল্লাহ অনেক ভালবাসেন। কত ভালবাসেন- একটি বর্ণনা থেকে তা আমরা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারি। আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

...وَلَخُلُوفُ فَمِ الصّائِمِ أَطْيَبُ عِنْدَ اللهِ مِنْ رِيحِ المِسْكِ.

...আর রোযাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহ্র কাছে মেশকের চেয়েও প্রিয়। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৯২৭

এ বর্ণনা থেকেই উপলব্ধি করা যায়- রোযাদারকে আল্লাহ কত ভালবাসেন। এর কারণ কী? এর কারণ হল, রোযা একমাত্র আল্লাহ্র জন্য রাখা হয়। রোযার মাঝে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে আল্লাহকে ভয় করার বিষয়টি সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রকাশ পায়। এজন্যই তো শত সুযোগ থাকা সত্তে¡ও বান্দা এক ঢোক পানিও পান করে না; পানিতে ডুব দিয়েও না, বন্ধ ঘরেও না। এমনকি সে ওযু, গোসল ইত্যাদির সময়ও সতর্ক থাকে- ভুলক্রমেও যেন এক ফোঁটা পানি তার গলার ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে। একারণেই রোযা আল্লাহ্র এত প্রিয়, রোযাদার আল্লাহ্র এত প্রিয়পাত্র।

যাইহোক, এত কষ্ট করে একমাত্র আল্লাহ্র ভয়ে রোযারাখা এ মানুষটির সামনে যখন কোনো মানুষ খায় তখন ফিরিশতারা রোযাদার ব্যক্তির জন্য দুআ করতে থাকে। যতক্ষণ রোযাদারের সামনে খাওয়া হয় ততক্ষণ দুআ করতে থাকে। রহমত ও মাগফিরাতের দুআ করে। কারণ, স্বাভাবিকভাবে রোযাদার ব্যক্তির ক্ষুধার কষ্ট থাকে। এ অবস্থায় রোযাদারের সামনে খেলে তার মানসিক কষ্ট হবে এটাই স্বাভাবিক। এজন্যই ফিরিশতারা তার জন্য মাগফিরাতের দুআ করতে থাকে।

একবার নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মে উমারা রা. বাড়িতে গেলেন। তিনি নবীজীর সামনে খাবার পেশ করলেন। নবীজী তাকেও খেতে অনুরোধ করলেন। তিনি বললেন, আমি তো রোযা আছি। একথা শুনে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-

إِنّ الصّائِمَ تُصَلِّي عَلَيْهِ الْمَلاَئِكَةُ إِذَا أُكِلَ عِنْدَهُ حَتّى يَفْرُغُوا.

রোযাদারের সামনে খাওয়া হলে খাওয়া শেষ পর্যন্ত ফিরিশতারা রোযাদারের জন্য (মাগফিরাতের) দুআ করতে থাকে। -জামে তিরমিযী, হাদীস ৭৮৫; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ৩৪৩০

(ইমাম তিরমিযী রাহ. বলেন-

هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ)

এ থেকে এ বিষয়টিও বুঝে আসে, ওযর না থাকলে রোযাদারের সামনে খাওয়াটা উচিত নয়। কারণ, এতে রোযাদারের কষ্ট হয়। ফলে হতে পারে রোযাদারের জন্য ফিরিশতা মাগফিরাতের দুআ করবে ঠিকই; কিন্তু আমার জন্য বদদুআ করতে পারে। আর ফিরিশতার দুআ যেমন কবুলের সম্ভাবনা বেশি তেমনি বদদুআও...। সুতরাং একান্ত অপারগতা ছাড়া আমরা রোযাদারের সামনে খাব না।

 

তেরো. দ্বীনের আলেম-তালিবুল ইলম : যার জন্য মাগফিরাতের দুআ করে...

 

মুসলিমের জন্য প্রথম যে ওহী নাযিল হয়েছে তা হল- اِقْرَأْ (পড়)। ফলে পড়া তথা দ্বীনী ইলম অর্জন করা মুসলিমের জীবনের সাধারণ বিষয়। মুসলিম হতে হলে পড়তে হবে। দ্বীনের উপর চলতে হলে পড়তে হবে। পড়া ছাড়া মুসলিমের কোনো গত্যন্তর নেই। এজন্যই প্রতিটি মুসলিমকেই দ্বীনী ইলম অর্জন করতে হয় এবং প্রতিটি মুসলিমই তালিবুল ইলম। আর যে মুসলিম দ্বীনী ইলমের ক্ষেত্রে পাণ্ডিত্য অর্জন করেন তিনি হলেন আলেম। সকলের পক্ষে আলেম হওয়া সম্ভব না হলেও তালিবুল ইলম হওয়া তো সম্ভব; বরং আরেক ভাষায় বলি, আলেম হতে না পারলেও প্রতিটি মুসলিমকে  ‘তালিবুল ইলম’ তো হতেই হবে। তাহলে আসমান-যমীনের সকল অধিবাসি আমাদের জন্য মাগফিরাতের দুআ করবে; এমনকি সমুদ্রের মাছ, গর্তের পিপিলিকা পর্যন্ত এদের জন্য মাগফিরাতের দুআ করে। আবুদ দারদা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলত শুনেছি-

مَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَبْتَغِي فِيهِ عِلْمًا سَلَكَ اللهُ بِهِ طَرِيقًا إِلَى الجَنّةِ، وَإِنّ المَلَائِكَةَ لَتَضَعُ أَجْنِحَتَهَا رِضًا لِطَالِبِ العِلْمِ، وَإِنّ العَالِمَ لَيَسْتَغْفِرُ لَهُ مَنْ فِي السّمَوَاتِ وَمَنْ فِي الأَرْضِ حَتّى الحِيتَانُ فِي المَاءِ.

যে ব্যক্তি ইলমের জন্য পথ চলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন। আর ফিরিশতারা তালিবুল ইলমের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে ডানা রেখে দেন। আর আলেমের জন্য আসমান ও যমিনের অধিবাসিরা ইসতিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করে। এমনকি সমুদ্রের মাছ পর্যন্ত তাঁদের জন্য ইসতিগফার করে...। -জামে তিরমিযী, হাদীস ২৬৮২; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৩৬৪১; শুআবুল ঈমান, বায়হাকী, হাদীস ১৫৭৩; আলমাদখাল ইলাস সুনানিল কুবরা, বায়হাকী, হাদীস ৩৪৭

দ্রষ্টব্য : কেউ কেউ এই হাদীসের لَتَضَعُ أَجْنِحَتَهَا এই বাক্যের ব্যাখ্যা করেছেন-ডানা বিছিয়ে দেয়া’। আবার কেউ বলেছেন, এর অর্থ হল, ‘তালিবুল ইলমের সম্মানে বিনয়াবনত হওয়া’। কেউ বলেছেন, ‘উড্ডয়ন বন্ধ করে থেমে যাওয়া ও যিকিরের জন্য অবতরণ করা।’ মূলত এ বাক্যের মাঝে এ সবক’টি অর্থেরই অবকাশ রয়েছে।

কিছু বর্ণনায় ‘আলেম’-এর স্থলে ‘তালিবুল ইলম’ শব্দ এসেছে। সে হিসাবে আলেম তালিবুল ইলম উভয়েই এই ফযীলতে শামিল। আর বাস্তবে আলেমও তো তালিবুল ইলম-ই।

আর অলোচ্য বর্ণনায় তলবে ইলমের একটি সুন্দর গল্পও রয়েছে। সে গল্পটিসহ ‘তালিবুল ইলম’ শব্দে বর্ণিত রেওয়াতটি পেশ করছি-

কাছীর ইবনে কায়স রাহ. বলেন, একদিন আমি দামেস্কের মসজিদে আবুদ দারদা রা.-এর কাছে বসা ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি আগমন করলেন। তিনি বললেন, আবুদ দারদা! আমি মদীনা থেকে এসেছি-মাদীনাতুর রাসূল থেকে। আমার আসার উদ্দেশ্য হল, আমি জানতে পেরেছি যে, আপনি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেন (অমুক হাদীস)। আমি আপনার মুখ থেকে তা সরাসরি শোনার জন্য এসেছি।

তখন আবুদ দারদা রা. বললেন, তুমি ব্যবসার উদ্দেশ্যে আসনি তো? তিনি বললেন, না। তিনি আবার বললেন, ব্যবসা ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে এসেছ? এবারও লোকটি বলল, না; (আমি কেবল আপনার মুখ থেকে হাদীস শোনার জন্যই সুদূর মদীনা থেকে দামেস্কে এসেছি। একথা শুনে) আবুদ দারদা রা. বললেন, আমি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি-

مَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَلْتَمِسُ فِيهِ عِلْمًا، سَهّلَ اللهُ لَهُ طَرِيقًا إِلَى الْجَنّةِ، وَإِنّ الْمَلَائِكَةَ لَتَضَعُ أَجْنِحَتَهَا رِضًا لِطَالِبِ الْعِلْمِ، وَإِنّ طَالِبَ الْعِلْمِ يَسْتَغْفِرُ لَهُ مَنْ فِي السّمَاءِ وَالْأَرْضِ، حَتّى الْحِيتَانِ فِي الْمَاءِ.

যে ব্যক্তি ইলমের জন্য পথ চলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন। আর ফিরিশতারা তালিবুল ইলমের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে ডানা রেখে দেন। আর তালিবুল ইলমের জন্য আসমান ও যমিনের অধিবাসিরা ইসতিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করে। এমনকি সমুদ্রের মাছ পর্যন্ত তাঁদের জন্য ইসতিগফার করে...। (দ্র. সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ২২৩; সুনানুদ দারেমী, হাদীস ৩৫৪)

আলোচ্য বর্ণনায় ‘আসমানের অধিবাসি’ দ্বারা উদ্দেশ্য, ফিরিশতা। সুতরাং আমরা বলতে পারি, আলেম-তালিবুল ইলমের জন্যও ফিরিশতারা মাগফিরাতের দুআ করেন। আল্লাহ আমাদের সকলকে ইলম অন্বেষণের তাওফীক দান করুন; আলেম বা তালিবুল ইলম হিসাবে কবুল করুন- আমীন।

এ পর্যন্ত আমরা ১৩টি বিষয় জানলাম, যার কারণে ফিরিশতারা মাগফিরাতের দুআ করেন। সামনে আমরা গোনাহ মাফ হওয়ার আরো কিছু সাধারণ আমল বা বিষয় জানব।

সোম ও বৃহস্পতিবার রোযা রাখি : এদিন গোনাহ মাফ করা হয়...

 

আমাদের গোনাহ যত ব্যাপক, আল্লাহ্র ক্ষমার দুয়ার বা বলি ক্ষমার বাহানা-উপলক্ষ্য তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি ও বিস্তৃত। প্রয়োজন শুধু বান্দার আল্লাহমুখী হওয়া, ফিরে আসা; আল্লাহ্র ক্ষমা ও রহমতের দরিয়ায় অবগাহন করা।

তেমনি একটি উপলক্ষ্য হল, সোম ও বৃহস্পতিবারের রোযা। সপ্তাহের দিনগুলোর মধ্যে সোম ও বৃহস্পতিবার গুরুত্বপূর্ণ। আমলের মাধ্যমে কল্যাণ লাভের বিচারে সপ্তাহের সব দিনই গুরুত্বপূর্ণ, তবে কিছু দিবস একটু বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে।

সোমবার তো বিভিন্ন দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ; যাঁর মাধ্যমে আমরা আমাদের রবকে চিনেছি, যাঁর মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের হেদায়েত দিয়েছেন, যাঁর মাধ্যমে আমরা ওহীর আলোর সন্ধান পেয়েছি, যাঁর মাধ্যমে..., যাঁর মাধ্যমে..., সরকারে দো আলম, সায়্যিদুল মুরসালীন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দিনেই জন্মগ্রহণ করেছেন। যে কিতাবের মাধ্যমে আমরা রবের কালাম লাভ করেছি, আসমানী নূরে ¯œাত হয়েছি, হেদায়েতের বাণী লাভ করেছি- সে কিতাবও নাযিল হয়েছে সোমবারে। আবু কাতাদা আনসারী রা. থেকে বর্ণিত-

أَنّ رَسُولَ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ سُئِلَ عَنْ صَوْمِ الِاثْنَيْنِ؟

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সোমবারের রোযা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হল। (এ দিনের রোযার ফযীলত কী? বা কেন আপনি গুরুত্বের সাথে এদিন রোযা রাখেন?) তিনি তখন উত্তরে বললেন-

فِيهِ وُلِدْتُ وَفِيهِ أُنْزِلَ عَلَيّ.

এ দিনেই অমি জন্মলাভ করেছি এবং এ দিনেই আমার উপর ওহী নাযিল হয়েছে। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ১১৬২

এছাড়াও আরো কারণ রয়েছে- নবীজীর প্রিয় সাহাবী উসামা বিন যায়েদ রা. একবার নবীজীকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনাকে অনেক গুরুত্বের সাথে দুই দিন রোযা রাখতে দেখি! নবীজী তখন জিজ্ঞেস করলেন-

أَيّ يَوْمَيْنِ؟

কোন্ দুই দিনের কথা বলছ, উসামা!

তিনি বললেন, সোম ও বৃহস্পতিবার।

তখন নবীজী বললেন-

ذَانِكَ يَوْمَانِ تُعْرَضُ فِيهِمَا الْأَعْمَالُ عَلَى رَبِّ الْعَالَمِينَ، فَأُحِبّ أَنْ يُعْرَضَ عَمَلِي وَأَنَا صَائِمٌ.

এ দু’দিন রাব্বুল আলামীনের সামনে বান্দার আমলসমূহ পেশ করা হয়; ফলে আমি চাই- আমার আমল পেশ করার সময় আমি রোযা অবস্থায় থাকি। -সুনানে নাসায়ী, হাদীস ২৩৫৮

আর কেমন গুরুত্বের সাথে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সোম ও বৃহস্পতিবার রোযা রাখতেন! আয়েশা রা. বলেন-

كَانَ النّبِيّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ يَتَحَرّى صَوْمَ الِاثْنَيْنِ وَالخَمِيسِ.

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গুরুত্বের সাথে খোঁজ রেখে রেখে সোম ও বৃহস্পতিবারের রোযা রাখতেন! -জামে তিরমিযী, হাদীস ৭৪৫

আর এ দুই দিনের রোযার সবচেয়ে বড় ফযীলত হল, এর মাধ্যমে আল্লাহ গোনাহ মাফ করেন। আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (গুরুত্বের সাথে) সোম ও বৃহস্পতিবার রোযা রাখতেন। ফলে নবীজীকে জিজ্ঞাসা করা হল-

يَا رَسُولَ اللهِ إِنّكَ تَصُومُ الِاثْنَيْنِ وَالْخَمِيسَ؟

আল্লাহ্র রাসূল! আপনি (গুরুত্বের সাথে) সোম ও বৃহস্পতিবার রোযা রাখেন! (এর কারণ কী?)। তখন নবীজী বললেন-

إِنّ يَوْمَ الِاثْنَيْنِ وَالْخَمِيسَ يَغْفِرُ اللهُ فِيهِمَا لِكُلِّ مُسْلِمٍ، إِلّا مُتَهَاجِرَيْنِ، يَقُولُ: دَعْهُمَا حَتَّى يَصْطَلِحَا.

সোম ও বৃহস্পতিবারে আল্লাহ সকল মুসলিমকে ক্ষমা করে দেন। তবে ঐ দুই ব্যক্তি ছাড়া, যারা একে অপরকে বর্জন করেছে। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘তারা পরস্পর মিলে যাওয়া পর্যন্ত এদেরকে আপন অবস্থায় ছেড়ে দাও।’ -সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ১৭৪০

আল্লাহ আমাদের সোম ও বৃহস্পতিবার রোযা রাখার তাওফীক দান করুন, হিংসা-বিবাদ-বিদ্বেষ থেকে রক্ষা করুন এবং আমাদের গোনাহগুলো ক্ষমা করুন- আমীন।

জনমানবহীন মাঠে-ময়দানে, পাহাড়-পর্বতে আযান দিয়ে নামায পড়া...

 

মানুষ যখন কেবল আল্লাহ্র ভয়ে তাঁর ইবাদত করে আল্লাহ খুশি হন। আর তা যদি হয় জনমানবহীন মরুভূমিতে, বা পাহাড়েরর চূড়ায়, কিংবা জনমানবহীন মাঠে-ময়দানে তখন আল্লাহ আরো বেশি খুশি হন।

আমরা জানি, জামাতে নামায আদায় করলে একাকী নামাযের তুলনায় পঁচিশ থেকে সাতাশ গুণ বেশি সওয়াব হয়। কিন্তু এক হাদীসে এসেছে, জনমানবহীন প্রান্তরে নামায আদায় করলে পঞ্চাশ নামাযের সওয়াব লাভ হয়। আবু সাঈদ খুদরি রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

الصّلَاةُ فِي الْجَمَاعَةِ تَعْدِلُ خَمْسًا وَعِشْرِينَ صَلَاةً فَإِذَا صَلّاهَا في الْفَلَاةِ فَأَتَمّ رُكُوعَهَا وَسُجُودَهَا بَلَغَتْ خَمْسِينَ صَلَاةً.

জামাতে নামায আদায়ের দ্বারা পঁচিশ নামাযের সওয়াব লাভ হয়। কিন্তু যদি জনমানবহীন প্রান্তরে তা আদায় করা হয় এবং পূর্ণরূপে রুকু-সিজদা আদায় করা হয়- এর দ্বারা পঞ্চাশ নামাযের সওয়াব লাভ হয়। -শুআবুল ঈমান, বায়হাকী, হাদীস ২৫৭২; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৫৬০; মুসতাদরাকে হাকেম, হাদীস ৭৫৩

স্বাভাবিকভাবে এ হাদীস থেকে যদিও বোঝা যায় যে, একাকী পড়ক বা জামাতে পড়- এ সওয়াব লাভ হবে। কিন্তু এর দ্বারা ‘জামাতে পড়া’ উদ্দেশ্য নেওয়াটাই বেশি যুক্তিযুক্ত। ইবনে হাজার রাহ. ফাতহুল বারীতে বলেন-

حَمْلُهُ عَلَى الْجَمَاعَةِ أَوْلَى وَهُوَ الّذِي يَظْهَرُ مِنَ السِّيَاقِ.

এখানে ‘জামাতে নামায’ উদ্দেশ্য নেওয়াটাই বেশি ভালো (ও যুক্তিযুক্ত)। কারণ, হাদীসের আগ-পর বিচারে এ অর্থই বুঝা যায়। -ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার ২/১৩৫

আর যে ব্যক্তি এমন জনমানবহীন প্রান্তরে একাকী আযান-ইকামাত দিয়ে নামায আদায় করে, তার পেছনে ফিরিশতারা নামায আদায় করে। দৃষ্টিসীমার শেষ পর্যন্ত অসংখ্য ফিরিশতা তার নামাযে শরীক হয়। সালমান ফারসী রা. থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

إِذَا كَانَ الرّجُلُ بِأَرْضِ قِيٍّ فَحَانَتِ الصّلَاةُ فَلْيَتَوَضّأْ، فَإِنْ لَمْ يَجِدْ مَاءً فَلْيَتَيَمّمْ، فَإِنْ أَقَامَ صَلّى مَعَهُ مَلَكَاهُ، وَإِنْ أَذّنَ وَأَقَامَ صَلّى خَلْفَهُ مِنْ جُنُودِ اللهِ مَا لَا يُرَى طَرَفَاهُ.

যখন কোনো ব্যক্তি জনমানবহীন নির্জন ভূমিতে অবস্থান করে এবং নামাযের সময় হয় তখন যেন সে ওযু করে। পানি না পেলে তায়াম্মুম করে নেয়। এ অবস্থায় যদি সে ইকামাত দিয়ে নামায আদায় করে তখন সাথের ফিরিশতাদ্বয় তার সাথে নামাযে শরীক হয়। আর যদি আযান-ইকামাত উভয়টি দিয়ে নামাযে দাঁড়ায় তখন তার পেছনে দৃষ্টিসীমার শেষ পর্যন্ত আল্লাহ্র সৈনিকেরা (ফিরিশতারা) দাঁড়িয়ে যায়। -মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক, হাদীস ১৯৫৫; আলমুজামুল কাবীর, তবারানী, হাদীস ৬১২০; সুনানে কুবরা, বায়হাকী, হাদীস ১৯০৮

আর সবচেয়ে বড় কথা হল, জনমানবহীন প্রান্তরে যখন কেউ আযান দিয়ে নামায আদায় করে তখন আল্লাহ এত খুশি হন যে, তাকে নিয়ে ফিরিশতাদের কাছে গর্ব করেন এবং ঐ বান্দাকে মাফ করে দেন। উকবা ইবনে আমের রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

يَعْجَبُ رَبّكُمْ مِنْ رَاعِي غَنَمٍ فِي رَأْسِ شَظِيّةٍ بِجَبَلٍ، يُؤَذِّنُ بِالصّلَاةِ، وَيُصَلِّي، فَيَقُولُ اللهُ عَزّ وَجَلّ: انْظُرُوا إِلَى عَبْدِي هَذَا يُؤَذِّنُ، وَيُقِيمُ الصّلَاةَ، يَخَافُ مِنِّي، قَدْ غَفَرْتُ لِعَبْدِي وَأَدْخَلْتُهُ الْجَنّةَ.

তোমাদের রব ঐ মেষপালকের প্রতি খুশি হন, যে পাহাড়ের চূড়ায় আযান দিয়ে নামায আদায় করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, দেখো, আমার এই বান্দা আমার ভয়ে আযান দিয়ে নামায পড়ছে।

এরপর আল্লাহ বলেন, আমি তাকে ক্ষমা করে দিলাম এবং তাকে জান্নাত দান করলাম। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১২০৩; সুনানে নাসায়ী, হাদীস ৬৬৬; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ১৬৬০

সুতরাং জনমানবহীন প্রান্তরে একাকী থাকলেও আমরা আযান-ইকামত দিয়ে নামায আদায় করব। যাতে এই ফযীলত লাভ করতে পারি।

 

নামাযের শেষ বৈঠকে যে ব্যক্তি এই দুআ পড়বে...

 

বান্দার ক্ষমা চাওয়া বা ইসতিগফারের যত মুহূর্ত ও ক্ষেত্র রয়েছে এর মধ্যে নামায সবচেয়ে উত্তম ক্ষেত্র। বিশেষ করে নামাযের শেষ বৈঠক। আবু বকর রা. নবীজীর কাছে নামাযে পড়ার জন্য দুআ শেখানোর অনুরোধ করলে নবীজী ইসতিগফার বা ক্ষমাপ্রার্থনার দুআ শিখিয়ে দেন-

اللّهُمّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي ظُلْمًا كَثِيرًا، وَلاَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلّا أَنْتَ، فَاغْفِرْ لِي مَغْفِرَةً مِنْ عِنْدِكَ، وَارْحَمْنِي إِنّكَ أَنْتَ الغَفُورُ الرّحِيمُ.

এ দুআ আমাদের সবার জানা। এসময় পড়ার মত আরেকটি দুআর কথাও হাদীসে এসেছে। মিহজান ইবনুল আরদা‘ রা. বলেন-

أَنّ رَسُولَ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ دَخَلَ الْمَسْجِدَ، إِذَا رَجُلٌ قَدْ قَضَى صَلَاتَهُ وَهُوَ يَتَشَهّدُ، فَقَالَ: اللّهُمّ إِنِّي أَسْأَلُكَ يَا اَللهُ بِأَنّكَ الْوَاحِدُ الْأَحَدُ الصّمَدُ، الّذِي لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ، أَنْ تَغْفِرَ لِي ذُنُوبِي، إِنّكَ أَنْتَ الْغَفُورُ الرّحِيمُ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ: قَدْ غُفِرَ لَهُ، ثَلَاثًا.

একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে প্রবেশ করলেন। দেখলেন এক ব্যক্তি নামাযের শেষ বৈঠকে তাশাহহুদ পড়ছে। এরপর সে এ বাক্যে দুআ করল, ইসতিগফার করল-

اللّهُمّ إِنِّي أَسْأَلُكَ يَا اَللهُ بِأَنّكَ الْوَاحِدُ الْأَحَدُ الصّمَدُ، الّذِي لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ، أَنْ تَغْفِرَ لِي ذُنُوبِي، إِنّكَ أَنْتَ الْغَفُورُ الرّحِيمُ.

তা শুনে নবীজী বললেন-

قَدْ غُفِرَ لَهُ (ثَلَاثًا)

তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে, তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে, তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। -সুনানে নাসায়ী, হাদীস ১৩০১; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৯৮৫; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৮৯৭৪

 

হজ্ব শেষে হলক করি, নবীজীর মাগফিরাতের দুআয় হিসসা নিই

 

হজ্ব শেষে হালাল হওয়ার জন্য আমরা হলক (মাথা মুণ্ডানো) বা কসর (চুল ছাঁটা) করে থাকি। হলক বা কসর যেটাই করা হোক হালাল হয়ে যাবে; কিন্তু হলক করা উত্তম। হাদীস শরীফে হলকের আলাদা ফযীলতও বর্ণিত হয়েছে। হলককারীদের জন্য নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন বার মাগফিরাতের দুআ করেছেন। আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-

اللهُمّ اغْفِرْ لِلْمُحَلِّقِينَ.

আল্লাহ! তুমি হলককারীদের মাফ করে দাও।

একথা শুনে কিছু সাহাবী বললেন-

يَا رَسُولَ اللهِ، وَلِلْمُقَصِّرِينَ؟

আল্লাহ্র রাসূল! কসরকারীদের জন্যও দুআ করুন!

নবীজী আবার বললেন-

اللهُمّ اغْفِرْ لِلْمُحَلِّقِينَ.

আল্লাহ! তুমি হলককারীদের মাফ করে দাও।

তারা আবার বললেন-

يَا رَسُولَ اللهِ، وَلِلْمُقَصِّرِينَ؟

আল্লাহ্র রাসূল! কসরকারীদের জন্যও দুআ করুন!

একথা শুনে নবীজী আবার বললেন-

اللهُمّ اغْفِرْ لِلْمُحَلِّقِينَ.

আল্লাহ! তুমি হলককারীদের মাফ করে দাও।

তারা আবারও বললেন-

يَا رَسُولَ اللهِ، وَلِلْمُقَصِّرِينَ؟

আল্লাহ্র রাসূল! কসরকারীদের জন্যও দুআ করুন!

এবার নবীজী বললেন-

وَلِلْمُقَصِّرِينَ

আল্লাহ! তুমি কসরকারীদেরও মাফ করে দাও। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৩০২; সহীহ বুখারী, হাদীস ১৭২৮

 

সালাম দিই, ভালো কথা বলি...

 

কারো সাথে সাক্ষাৎ হলে আমরা সালাম দিই। তারপর হাসিমুখে কুশল বিনিময় করি। মুসলিম হিসেবে এটি আমাদের সাধারণ অভ্যাস। এটি ইসালামেরই শিক্ষা। ইসলামের বদৌলতেই এটি আমাদের জীবনের সাধারণ ব্যাপার; কিন্তু বাস্তবে এর মূল্য অনেক। মূল্যটা বুঝে আসে- এর বিপরীত চিত্রটা সামনে এলে। অর্থাৎ পরস্পর সাক্ষাতে সালাম ও হাসিমুখের পরিবর্তে যদি একজন অপরজন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন বুঝে আসে- এ সাধারণ বিষয়টি কত মূল্যবান এবং এর বিপরীত বিষয়টি কত নিন্দনীয়।

এ বিপরীত দিকটিকে ইসলামে কঠিনভাবে নিন্দা করা হয়েছে। একে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে-

لاَ يَحِلّ لِمُسْلِمٍ أَنْ يَهْجُرَ أَخَاهُ فَوْقَ ثَلاَثَةِ أَيّامٍ.

কোনো মুসলিমের জন্য বৈধ নয় যে, সে তার ভাইকে তিন দিনের বেশি সময় পর্যন্ত বর্জন করবে। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৬০৬৫

পরস্পরে মনোমালিন্য হতে পারে, মান-অভিমান হতে পারে; কিন্তু এ কারণে তিন দিনেরও বেশি সময় নিজ ভাইকে বর্জন করা- এটা মুসলিমের জন্য সাজে না।

আরেক বর্ণনায় এ বর্জনের চিত্র সামনে আনা হয়েছে এবং এ অবস্থা থেকে প্রথমে যে বেরিয়ে আসে অর্থাৎ সালাম দিয়ে মিলে যায় তার প্রসংশা করা হয়েছে। আবু আইয়ূব আনসারী রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

لاَ يَحِلّ لِرَجُلٍ أَنْ يَهْجُرَ أَخَاهُ فَوْقَ ثَلاَثِ لَيَالٍ، يَلْتَقِيَانِ: فَيُعْرِضُ هَذَا وَيُعْرِضُ هَذَا، وَخَيْرُهُمَا الّذِي يَبْدَأُ بِالسّلاَمِ.

কোনো ব্যক্তির জন্য বৈধ নয় যে, সে তার ভাইকে তিন রাতের বেশি সময় পর্যন্ত বর্জন করবে; দেখা হলে এ ওর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, ও এর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এদের মধ্যে সে-ই শ্রেষ্ঠ, যে প্রথমে সালাম দেয় (এবং মিলে যায়)।  -সহীহ বুখারী, হাদীস ৬০৭৭

হাঁ, আরো কঠোর ভাষায় নিন্দা করা হয়েছে এ মন্দ কর্মের; এমন ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার সাধারণ ক্ষমা থেকে বঞ্চিত হয়। এক হাদীসে ইরশাদ হয়েছে-

إِنّ يَوْمَ الِاثْنَيْنِ وَالْخَمِيسَ يَغْفِرُ اللهُ فِيهِمَا لِكُلِّ مُسْلِمٍ، إِلّا مُتَهَاجِرَيْنِ، يَقُولُ: دَعْهُمَا حَتَّى يَصْطَلِحَا.

সোম ও বৃহস্পতিবারে আল্লাহ প্রতিটি মুসলিমকে ক্ষমা করে দেন। তবে ঐ দুই ব্যক্তি ছাড়া, যারা একে অপরকে বর্জন করেছে। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘তারা পরস্পর মিলে যাওয়া পর্যন্ত এদেরকে আপন অবস্থায় ছেড়ে দাও।’ -সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ১৭৪০

হাঁ, একে অপরকে বর্জন করার দ্বারা বান্দা আল্লাহ্র সাধারণ ক্ষমা থেকেও বঞ্চিত হয়। পক্ষান্তরে সালাম দেওয়া, হাসিমুখে উত্তম কথা বলার দ্বারা ক্ষমা লাভ হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

إِنّ مِنْ مُوجِبَاتِ الْمَغْفِرَةِ بَذْلُ السّلَامِ، وَحُسْنُ الْكَلَامِ.

যেসকল আমলের মাধ্যমে মাগফিরাত লাভ হয় এর মধ্যে অন্যতম প্রধান হল, বেশি বেশি সালাম দেওয়া এবং ভালো কথা বলা। -আলমুজামুল কাবীর, তবারানী, হাদীস ৪৬৯; মাজমাউয যাওয়ায়েদ, হাদীস ১২৭২৩; মাকারিমুল আখলাক, খারাইতী, হাদীস ১৪৬

 

 

advertisement