যিলহজ্ব ১৪৪১   ||   আগস্ট ২০২০

গওহরডাঙ্গা মাদরাসার নিবেদিতপ্রাণ মুহাদ্দিস
মাওলানা সায়েনুদ্দিন (ফরিদপুরী হুজুর) রাহ.

মাওলানা মুহাম্মাদ রেজাউল হক

৭ শাবান ১৪৪১ হিজরী, ২ এপ্রিল ২০২০ ঈসাব্দ। বৃহস্পতিবার (বুধবার দিবাগত রাত), বাদ এশা। আব্বুর শরীরে প্রচণ্ড জ্বর। সাথে শব্দ করে ঘন ঘন নিঃশ্বাস। জবানে মৃদু আওয়াজে الله الله শব্দ। মা আমাদের চার ভাই ও তাঁর নাতি-নাতনিদের বললেন, তারতীলের সাথে সবাই সূরা ইয়াসীন তিলাওয়াত কর। আমি আব্বুর কাছে বসে একটু আওয়াজ করে সূরা ইয়াসীন তিলাওয়াত করছি। আব্বু শুনছেন। আমার তিলাওয়াত শেষ হল। আব্বুর জ্বর নেমে গেল। নিঃশ্বাসও স্বাভাবিক। মা আগে থেকেই কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন। আমি সবাইকে সরিয়ে মাকে আব্বুর শিয়রে বসিয়ে বললাম, আপনি একান্তে আব্বুকে কুরআন শোনান। আব্বুর পাশে আম্মু কুরআন পড়ছেন এবং আব্বুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।

মাগরিবের পূর্বে আব্বুর ছাত্র, আমাদের বড় মামা মাওলানা মনজুরুল হক আব্বুকে দেখতে এলেন। আব্বুর জন্য দুআ করলেন। আব্বুকে আমাদের হাসপাতালে নেওয়ার পেরেশানী দেখে মামা বললেন, হুজুর তো এখন আখেরাতের সফরে আছেন, তোমরা হাসপাতালের পেরেশানী করছ!

আমরা তখনো বুঝতে পারিনি। মায়ের একান্ত তিলাওয়াত, সন্তানদের দুআ, আব্বুর জিকিরের মৃদু আওয়ায- সব মিলিয়ে যেন আব্বুর ঘরটার ভেতর তখন একটা জান্নাতী আবেশ তৈরি হয়েছিল। আব্বু ডানদিকে মুখটা ঘুরিয়ে মৃদু আওয়াজে الله الله বলছেন। কপালে সামান্য ঘাম। চোখ দুটো আকাশ পানে; যেন রব্বে কারীমের ডাকে সাড়া দেবার জন্যে অধীর প্রতীক্ষা। আমরা সবাই দুআয়ে ছিহ্হাতে। হঠাৎ চোখদুটো বন্ধ হয়ে এল, মনে হল যেন জান্নাতি পাখি উড়াল দিল! এ আমাদের হুসনে যন, গায়েবের ইলম তো আল্লাহর কাছে। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন!!

১৯৩৮ ঈসায়ী সনে ফরিদপুরের নগরকান্দায় হামিদিয়া (বড় লক্ষণদিয়া) গ্রামের সম্ভ্রান্ত এক মুসলিম পরিবারে আব্বুর জন্ম। ছোট থেকেই খুব মেধাবী ছিলেন। পড়াশোনার প্রায় সবটাই করেছেন গওহরডাঙ্গা মাদরাসায়। জামাতে ভালো ছাত্রদের মধ্যে গণ্য হতেন। উস্তাযগণের নযরে সবসময় আব্বু খুব প্রিয় ছিলেন। গওহরডাঙ্গায় দাওরায়ে হাদীস পড়ে ছদর ছাহেব হুজুরের নির্দেশে হাটহাজারী মাদরাসায় যান। ওখানে গিয়ে আবার দাওরায়ে হাদীস পড়েন। এরপর ১৯৬৮ ঈসায়ী সনে ছদর ছাহেব রাহ.-এর নির্দেশে গওহরডাঙ্গা মাদরাসায় উস্তায হিসাবে নিযুক্ত হন।

ফরিদপুরী হুজুর রাহ. গওহরডাঙ্গা মাদরাসার মাকবুল আসাতিযায়ে কেরামের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। সর্বজনপ্রিয় উস্তায ছিলেন। ছাত্র-উস্তায, এলাকাবাসী সবার কাছে ভালবাসার পাত্র ছিলেন। তালীম-তরবিয়াত উভয় ক্ষেত্রে মাদরাসার উস্তাযদের মধ্যে তাঁর একটা উঁচু অবস্থান ছিল। খুব স্নেহের সাথে ছাত্রদের তারবিয়ত করতেন। ছাত্রদের জন্য তিনি খুব নরম-সহজ ও আপন ছিলেন। খুব ভাবগম্ভির ছিলেন না। ভার হয়ে থাকতেন না। যে কারণে সবাই তাঁকে ভালবাসত, আপন করে পেত। দরসে ছাত্ররা বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন করত; যার সাথে দরসের কোনো মুনাসাবাত নেই। তিনি আপত্তি করতেন না। উত্তর দিতেন।

সফরে কখনো সাথে কোনো ছাত্র থাকলে নিজের ব্যাগটা তো নিজে নিতেনই, ছাত্রকেও বলতেন, ‘তোমার ব্যাগটা আমার কাছে দাও। তোমার তো হাঁটার অভ্যাস নেই, আমার হাঁটার অভ্যাস আছেইত্যাদি খুব সহজ করে বলে ফেলতেন। পুরোনো ছাত্ররা মাদরাসায় আসলে, আব্বুর সাথে দেখা করলে, আব্বু তাকে সময় দিতেন। তার আপ্যায়নের ইনতেজাম করতেন। কোথায় খেদমতে আছেন, কেমন আছেন ইত্যাদি খোঁজ-খবর নিতেন। আব্বু ছিলেন একজন শারীফ ইনসান।

আমরা যদ্দুর দেখেছি, জেনেছি, আব্বু ছিলেন একজন খুব আমলী মানুষ। তাঁর তাকওয়া-পরহেযগারী ছিল খুব উচ্চস্তরের। তাহাজ্জুদের এহতেমাম, অন্যান্য নাওয়াফেলের এহতেমাম, সকাল-সন্ধ্যা ও অন্যান্য সময়ের দুআ-যিকির, আওরাদ-ওয়াজায়েফের প্রতিও সবসময় আব্বুর এহতেমাম ছিল।

যৌবনের শুরু থেকেই আব্বুর নিজের এসলাহের খুব ফিকির ছিল। যে কারণে নিজ উস্তায শাইখুল হাদীস হযরত মাওলানা আবদুল মান্নান কাশিয়ানী হুজুর রাহ. (সাবেক শায়খুল হাদীস ও মুহতামিম, গওহরডাঙ্গা মাদরাসা)-এর হাতে বায়আত হন এবং মুজাহাদার সাথে নিজের এসলাহ করতে থাকেন। একপর্যায়ে কাশিয়ানী হুজুর রাহ. থেকে খেলাফতপ্রাপ্তও হন। কাশিয়ানী হুজুর রাহ. খুব কম ব্যক্তিকেই খেলাফত দিয়েছেন। হাতেগোনা তিন-চার জন হবে। ফরিদপুরের হুজুর রাহ. ছিলেন তাঁদের একজন।

আব্বু তো ছাত্রজীবনেই নিজেকে কাশিয়ানী হুজুর রাহ.-এর খেদমতে সোপর্দ করে দিয়েছিলেন। আর পরবর্তীতে বায়আত ও ইজাযতের সম্পর্কও হয়। সেজন্য আব্বুর প্রতিও কাশিয়ানী হুজুর রাহ.-এর সবসময় একটা ভিন্ন দৃষ্টি ছিল। আব্বুকে খুব ¯œহ করতেন। কাশিয়ানী হুজুরের বড় মেয়ে (বর্তমান : খুলনার হুজুরের মুহতারামা আহলিয়া) যখন ছোট, তখন তাঁকে পড়ানোর জন্য কাশিয়ানী হুজুর রাহ. আব্বুকে যিম্মাদারী দিয়েছিলেন। তিনি আব্বুর কাছে উর্দূ পড়েছেন।

সকল উস্তায ও মুরব্বীদের প্রতিই আব্বুর অত্যন্ত ভক্তি-শ্রদ্ধা ও মান্যতা ছিল। মুরব্বীরাও তাঁকে খুব ভালো জানতেন। গওহরডাঙ্গা মাদরাসার সেসময়ের প্রথম সারির মুরব্বী যারা ছিলেন- কলাখালী হুজুর মাওলানা আশরাফ আলী রাহ., কোটালীপাড়ার হুজুর মাওলানা হেলালুদ্দীন রাহ., চৌমুহনী হুজুর মাওলানা শফীউল্লাহ রাহ., বরিশালী হুজুর মাওলানা আবদুল মুকতাদির রাহ., কাশিয়ানী হুজুর মাওলানা আবদুল মান্নান রাহ., বগুড়ার হুজুর মাওলানা মুশাররফ হুসাইন রাহ.- সকলেই আব্বুর উস্তায ছিলেন।

আব্বুর আরেকটা বৈশিষ্ট্য ছিল,আব্বু ভালো ওয়াজ করতেন। ওয়াজের বিষয়বস্তু চয়ন ও উপস্থাপন খুব সুবিন্যস্ত ও সুচিন্তিত হত। যে এলাকায় ওয়াজ করতেন, সেখানকার হাল-চাল, অবস্থা-পরিস্থিতি অনুযায়ী আলোচনা করতেন। আর আব্বুর ওয়াজের আওয়াজও সুন্দর ছিল। ওয়াজের কারণে গওহরডাঙ্গাভিত্তিক যে বিশাল একটা অঞ্চল- খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া, বরিশাল, ফরিদপুর- এ পুরো অঞ্চল জুড়ে আব্বুর একটা ব্যাপক পরিচিতি ছিল। ফরিদপুরী হুজুরএই নামটার সাথে এ পুরো অঞ্চলের মানুষ পরিচিত ছিল। ফরিদপুরী হুজুরযেখানেই বয়ান করতেন, চাতক পাখির মত মানুষ তাঁর বয়ান শুনত।

পরিবারের প্রতিও আব্বু সবসময় খুব খেয়াল রেখেছেন। নিজের ছেলে-মেয়ে ও নাতি-নাতনিদেরকে ইলমেদ্বীন শেখাবার এবং একেই তাদের একমাত্র গন্তব্য বানাবার জন্য সবসময় সচেষ্ট থেকেছেন। জানি না, আব্বু আমাদেরকে কেমন পেয়েছেন। আল্লাহ যেন আমাদেরকে তাঁর জন্য ওয়ালাদে সালেহহিসাবে কবুল করেন- আমীন!

আম্মার প্রতিও সবসময় আব্বু যত্ন ও ভালবাসার আচরণ করেছেন। আম্মুর কঠিন অসুস্থতা ছিল। সেই গ্রাম থেকে আম্মুকে চিকিৎসার জন্য বারবার ঢাকা নিয়ে আসতে হয়েছে। বড় বড় ডাক্তার দেখাতে হয়েছে। আর সেই সময়ে আব্বুর অর্থিক অবস্থাও খুব ভালো ছিল না। কিন্তু আব্বু কোনোদিন যতেœ কমতি করেননি। কখনো বিরক্ত হননি।

এসকল গুণ- আখলাকের শারাফাত, ছাত্রদের প্রতি মহব্বত, উস্তাদ ও মুরব্বীদের সাথে তাযীম ও তাকরীমের সম্পর্ক, পরিবারের প্রতি সযত্ন দৃষ্টি, এলাকাবাসীর সাথে অত্যন্ত ভালো সম্পর্ক, আমলের প্রতি পাবন্দী, সবসময় নিজের ইসলাহের ফিকির, ওয়াজ ও নসীহতের একটা বিশেষ সালাহিয়্যাত- এ সবগুলোই ছিল আব্বুর অনন্য বৈশিষ্ট্য। এসকল ক্ষেত্রে আব্বু আমাদের জন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে, আলো নিয়ে আমরাও যেন আমাদের জীবনটাকে সুন্দর ও পুণ্যময় করতে পারি। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাওফীক দান করেন।

গত ১ মার্চ ২০২০ ঈসায়ী ফরিদপুরে নিজ বাড়িতে আব্বু স্ট্রোক করেন। সাথে সাথে আমরা ঢাকায় ডা. দ্বীন মুহাম্মদের অধীনে ঝ.চ.জ.ঈ হাসপাতালে, পরে রাতে শমরিতা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ২২ দিন চিকিৎসা নিয়ে আমার ভাইদের রূপনগরের বাসা হয়ে সাভারে আমার বাসায় আসেন। মা, আমার স্ত্রী, ভায়েরা নিয়মিত আব্বুর খেদমতে ছিলাম। আশা ছিল বরকতের এ বটবৃক্ষ আমাদের আরো অনেক দিন ছায়া দিবেন।

কিন্তু...! ছাত্র গড়ার কারিগর, বিশেষভাবে গওহরডাঙ্গার ইলমের বাগানের নিষ্ঠাবান মালীস্ত্রী, ২ মেয়ে, ৬ ছেলে ও নাতি-নাতনির পরম আপনজন, অসংখ্য মুহিব্বীন-মুরিদানের ভালবাসার পাত্র, ইলম পিপাসু, আল্লাহ প্রেমিক, সাদাসিধে এই মহান ব্যক্তিত্ব নিজ দায়িত্বগুলো পালন করে আখেরাতের সফরে রওয়ানা হয়ে গেলেন। তাঁর বিশেষ ওসিয়ত ছিল- হালাল খাবে। আখরাতের সওদা করবে। দুনিয়ার লোভে পড়বে না। আমানতের খেয়ানত করবে না। আর যাবার আগে বলে গেছেন তাঁর শেষ তামান্নার কথা- গওহরডাঙ্গা যদি সুযোগ দেয়, তাহলে ছদর ছাহেব রাহ. ও কাশিয়ানী হুজুর রাহ.-এর পরশে আমার শেষ বিছানার ইনতেযাম করবে। আমরা চির কৃতজ্ঞ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি; আলহামদু লিল্লাহ, আব্বুর সে আরজী আল্লাহ কবুল করেছেন।

শেষের দিকে কয়েক বছর আব্বু অসুস্থতার কারণে দরস করতে পারেননি। এই অসুস্থকালীনও গওহরডাঙ্গার বার্ষিক মাহফিলে আব্বু নিয়মিত যেতেন। মাহফিলের তিন দিন গওহরডাঙ্গা থাকতেন। আব্বুর ছাত্রবৃন্দ, মুহাব্বতের মানুষ তখন আসতেন। আব্বুর সাথে সাক্ষাৎ করতেন।

আব্বুর অসুস্থতায় গওহরডাঙ্গার মুহতামিম ছাহেব, উস্তায-ছাত্ররা নিয়মিত দুআ করেছেন এবং অনেকে হাসপাতালে দেখতে এসেছেন। আর বিশেষভাবে খুলনার হুজুর মুফতী মাহমুদুল হাসান ছাহেব, আলমারকাযুল ইসলামীর মুফতী শহিদুল ইসলাম ছাহেবসহ অনেকেই আমাদের পাশে থেকে সব বিষয়ে খোঁজ রেখেছেন। আর সবশেষে মাকবারায়ে শামছিয়াতে আব্বুর কবরের ব্যবস্থা হয়েছে। মাদরাসার উস্তায-ছাত্র ও এলাকাবাসী রাত জেগে কবর প্রস্তুত করেছেন এবং অন্যান্য কাজ আঞ্জাম দিয়েছেন; আমরা সকলের প্রতি কৃতজ্ঞ। আমাদের পক্ষ থেকে সবাইকে-

جزاهم الله أحسن الجزاء.

রাব্বে কারীম আমাদের আব্বুকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসীব করেন। তাঁর কবরকে নূর দ্বারা ভরে দেন। তাঁর সন্তান-সন্ততীকে তাঁর জন্য সদকায়ে জারিয়া বানান। হযরত কাশিয়ানী হুজুরের দুআয় ও মুরব্বীদের সহযোগিতায় নিজ গ্রামে প্রতিষ্ঠিত এমদাদুল উলূম মাদরাসাএবং তাঁর সন্তানদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত মুহাম্মাদী কমপ্লেক্স ও মাওলানা সায়েনুদ্দিন ফাউন্ডেশন মাদরাসাকে আল্লাহ কবুল করেন- আমীন!

 

 

advertisement