রবিউস সানী ১৪৪১   ||   ডিসেম্বর ২০১৯

হকের পথে ফিরে আসা মুমিনের এক মহৎ গুণ

মুহাম্মাদুল্লাহ মাসুম

সত্যকে সমর্পিতচিত্তে গ্রহণ করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য। সত্যের সামনে সমর্পিত হওয়ার দ্বারা-ই তো মুমিন ‘মুমিন’ হয়। তার অস্তিত্ব-ই বিকশিত হয় এ স্বীকারোক্তির মাধ্যমে যে, মিথ্যা ও শিরক বর্জন করেছি, সত্য ও তাওহীদকে গ্রহণ করেছি। তাওহীদের কালিমা- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’রও দাবি- শিরকের মলিনতা ঝেড়ে তাওহীদের আলোয় আলোকিত হওয়া। মিথ্যা ও বাতিলকে অগ্রাহ্য করে সত্যের সামনে নতশীর হওয়া। দ্বীনী কোনো বিষয়ে যখন-ই সত্য উদ্ভাসিত হয়, কায়মনোবাক্যে তা গ্রহণ করা, সর্বান্তকরণে সত্যের অনুগত থাকা।

এর দৃষ্টান্ত প্রচুর! ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন নবীজীর পুণ্যাত্মা সাহাবীগণ। পেয়েছেনও মহান প্রভুর পক্ষ থেকে সন্তুষ্টির ঘোষণা-

رَضِيَ اللهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ.

দুনিয়াতেই যারা জান্নাতের সুসংবাদ পেয়ে ধন্য হয়েছিলেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম রা. তাঁদের অন্যতম। ছিলেন ইহুদীদের ধর্মগুরু। মেধা ও প্রতিভা, জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় ওই মহলে তাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল সর্বজনস্বীকৃত। খ্যাতি ছিল তুঙ্গস্পর্শী। তাঁর ইসলাম গ্রহণের ঘটনাটিও জগতজোড়া মশহুর। নবুওতের সত্যাসত্য যাচাইয়ের জন্য নবীজীর খেদমতে নিবেদন করেছিলেন তিনটি প্রশ্ন। নবীজী তাঁর নবীসুলভ ঐশী জওয়াব দিয়ে পরিতৃপ্ত করে দিলেন ইবনে সালামের অনুসন্ধিৎসু হৃদয়কে। ঈমানের ঢেউ খেলে গেল ইবনে সালামের হৃদয়-আত্মায়। হকের পিপাসু এই ইহুদী ধর্মগুরুর আর তর সইল না। ঈমানদীপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা দিয়ে দিলেন ‘আশহাদু আন্নাকা রাসূলুল্লাহ’-সাক্ষ্য দিচ্ছি, নিশ্চয় আপনি আল্লাহ্র রাসূল। (দ্র. সহীহ বুখারী, হাদীস ৩৩২৯; সিয়ারু আলামিন নুবালা ৪/৬৬)

হাঁ, এভাবেই সত্যকে মাথা পেতে বরণ করে নিতে হয়।

সত্যের সামনে নিজেকে নিঃশর্তভাবে সপে দেয়ার বহু ক্ষেত্র-উপলক্ষ আসে মুমিনের জীবনে। নিজের মতের ভ্রান্তি নিশ্চিত হওয়ার পর তা বর্জন করতে কুণ্ঠিত না হওয়া মুমিনের এক মহিমান্বিত গুণ, চারিত্রিক এবং আদর্শিক বৈশিষ্ট্য। দীর্ঘদিন যাবৎ, এমনকি জীবনভর চলে আসা পথের ভ্রষ্টতা শরীয়তের দলীলের আলোকে যখন প্রমাণিত হয়ে যায়, সকল যুক্তি-তর্ক, স্বার্থচিন্তা এবং মনোবাসনাকে পিছনে ঠেলে মুমিন স্বতঃস্ফূর্তভাবে সঠিক পথটি-ই বেছে নেয়। সত্যি বলতে কী, এর জন্য প্রয়োজন তাকওয়ায় উজ্জীবিত একখানা হৃদয়। এবং বলতে দ্বিধা নেই, তাকওয়ার এই ধন যার হৃদয়ে যত বেশি সঞ্চিত হবে, তত সহজেই সে হক এবং সত্যের সন্ধান পেয়ে যাবে। এক্ষেত্রে কুরআনের সেই অমোঘ বাণীও স্মরণ করা যেতে পারে-

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْۤا اِنْ تَتَّقُوا اللهَ یَجْعَلْ لَّكُمْ فُرْقَانًا وَّ یُكَفِّرْ عَنْكُمْ سَیِّاٰتِكُمْ وَ یَغْفِرْ لَكُمْ  وَ اللهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِیْمِ .

হে ঈমানদারগণ! তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় কর, তবে তিনি তোমাদের দান করবেন (সত্য-মিথ্যার মধ্যে) পার্থক্যকারী বস্তু। তোমাদের থেকে তোমাদের গোনাহ দূর করে দেবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করবেন। আর আল্লাহ মহা অনুগ্রহশীল। -সূরা আনফাল (৮) : ২৯

হক ও সত্য চিহ্নিত হয় শরীয়তের দলীলের আলোকে, বিজ্ঞ ও খোদাভীরু আলেমগণের হাতে, যারা দলীলের যথাযথ বিশ্লেষণ এবং দলীলের মাধ্যমে সঠিক সমাধানের যোগ্যতা রাখেন। যদিও বিজ্ঞ আলেমগণের মাঝে শরীয়তের বিভিন্ন বিষয়ে মতভিন্নতা হয়ে থাকে, কিন্তু সেটি সর্বদা দলীল নির্ভর এবং শাখাগত বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকে।

চতুর্থ শতাব্দীর প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ইবনু বাত্তাহ আলউকবারি রাহ. (৩৮৭ হি.) ‘আলইবানা’য় (১/২০৫-২১১) এবং পঞ্চম শতাব্দীর ইমাম আবুল মুযাফফর আসসামআনী রাহ. (৪৮৯ হি.) ‘আল ইনতিসার লিআসহাবিল হাদীস’ গ্রন্থে গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টি অত্যন্ত চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন।

আবুল মুযাফফর রাহ.-এর বক্তব্যের কিছু অংশ-

وَبِهَذَا يظْهر مُفَارقَة الاخْتِلَاف فِي مَذَاهِب الْفُرُوع اخْتِلَاف العقائد فِي الْأُصُول، فَإنَّا وجدنَا أَصْحَاب رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم وَرَضي الله عَنْهُم من بعده اخْتلفُوا فِي أَحْكَام الدّين، فَلم يفترقوا وَلم يصيروا شيعًا، لأَنهم لم يفارقوا الدّين، ونظروا فِيمَا أذن لَهُم، فاختلفت أَقْوَالهم وآراؤهم فِي مسَائِل كَثِيرَة ...

এতে বোঝা যায়, দ্বীনের শাখাগত বিষয়ে মতভেদ আর মৌলিক আকীদার মধ্যে মতভেদ এক নয়। কেননা আমরা নবীজীর সাহাবী রা.-কে দ্বীনের শাখাগত বিষয়ে মতভেদ করতে দেখেছি। কিন্তু এতে তাঁরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাননি এবং বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়েননি। কারণ তাঁরা (দ্বীনের মৌলিক নীতিতে মতভেদ করে) দ্বীন থেকে সরে যাননি। আর ইজতিহাদ এবং মত প্রকাশ করেছেন যেখানে শরীয়ত ইজতিহাদ ও মতপ্রকাশে অনুমোদন করে সেখানে। ফলে (এজাতীয়) প্রচুর মাসআলায় তাঁদের বক্তব্য এবং সিদ্ধান্ত ভিন্ন ভিন্ন হয়েছে।

(বিস্তারিত দেখুন- উম্মাহর ঐক্য : পথ ও পন্থা, মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক)

এজন্য আলেমদের দলীলভিত্তিক ইখতেলাফকে দলীলপরিপন্থী বলে উড়িয়ে দেওয়া কিংবা দ্বীনের মৌলিক বিষয়ে ভিন্নমতকেও গ্রহণযোগ্য মতভিন্নতা সাব্যস্ত করার অপচেষ্টা দুটোই প্রান্তিকতা ও গোমরাহী।

যাহোক কথা হল, সঠিক পথে ফিরে আসা মুমিনের সহজাত গুণ। মুমিনের জন্য শোভনীয় নয়- ভুল পথে হাঁটা এবং অন্যকেও ভুলের দাওয়াত দেয়া।

আমর ইবনে উবাইদ রাহ. একজন মু‘তাযিলী আলেম ছিলেন। একটি বিষয়ে মত প্রকাশ করতে গিয়ে একদিন তিনি ভুল করে ফেললেন। মজলিসে উপস্থিত ছিলেন তার ঘনিষ্ঠ ওয়াসেল ইবনে আতা নামক আরেক মু‘তাযিলী। তিনি তাঁর সাথে একমত পোষণ না করে পাল্টা প্রশ্ন এবং তর্ক জুড়ে দিলেন। একপর্যায়ে আমর ইবনে উবাইদের নিকট ওই বিষয়ে নিজের ভুল ধরা পড়ে গেল। আর দেরি নয়; স্বভাবজাত অহমকে জয় করে সাথে সাথেই নিজের মতটি পরিত্যাগ করে সঠিক মতের দিকে ফিরে আসলেন এই বলে- “হক আর আমার মাঝে কোনো দুশমনি নেই। সভাসদকে সাক্ষী রেখে আমি ঘোষণা করছি, এই বিষয়ে আমার যে অবস্থান ছিল তা থেকে আমি সরে এসেছি এবং সঠিক অবস্থানটি গ্রহণ করছি।” -আলমুনইয়াতু ওয়াল আমাল, ইবনুল মুরতাযা, পৃ. ৫১; (রিসালাতুল মুসতারশিদীন, টীকা : শায়েখ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ পৃ. ১০৯)

একজন মু‘তাযিলী বিদআতী হওয়া সত্ত্বেও নিজের ভুল স্পষ্ট হওয়ার সাথে সাথে ফিরে এলেন ভুল থেকে। শুধু ফিরেই আসেননি; জনতার সামনে ঘোষণা দিয়ে ফিরে এসেছেন এবং সকলকে বুঝিয়ে দিয়েছেন- ‘ভুল’ আঁকড়ে থাকার কোনো বিষয় নয়; ফিরে আসাটাই বাহাদুরি। হকের সাথে দুশমনি আর ভুল আঁকড়ে থাকার মাঝে নিজেরই ক্ষতি। বহু ভালো হতো, তিনি যদি এতেজালের বিদআত থেকেও ফিরে আসতে পারতেন!

আরেকটি ঘটনা। উবাইদুল্লাহ ইবনুল হাসান আলআম্বরী রাহ.। দ্বিতীয় শতাব্দীর শুরুতে জন্মগ্রহণ করেন, মৃত্যুবরণ করেন ১৬৮ হিজরীতে। তিনি ছিলেন তৎকালীন বসরার বিজ্ঞ আলেম ও ফকীহ। একসময় কাজির পদেও অধিষ্ঠিত হয়েছেন। সে কারণে লোকজনের অন্তরে ছিল তাঁর প্রতি বিশেষ এক শ্রদ্ধাবোধ। তাঁর একান্ত শিষ্য বিশিষ্ট মুহাদ্দিস আব্দুর রহমান ইবনুল মাহদী রাহ. বর্ণনা করেন, তখন আমি ছোট। একদিন এক জানাযায় অংশগ্রহণ করলাম, উস্তাদজীর সাথে সাক্ষাৎ। তাঁকে একটি মাসআলা জিজ্ঞাসা করা হল, কিন্তু তিনি ভুল বললেন। আমি বললাম, আল্লাহ আপনাকে সঠিক বিষয়ের রাহনুমা করেন, বিষয়টি মনে হয় এমন নয়, সঠিক হল এই। ক্ষণিক মাথা নিচু করে একদম চুপ হয়ে গেলেন। তারপর মাথা তুলে বললেন, ‘বৎস! তুমিই ঠিক বলেছ। কাজেই আমি নমনীয়তার সাথে আমার মত থেকে ফিরে আসলাম। তারপর বললেন-

لأن أكون ذنبا في الحق أحب إلي من أن أكون رأسا في الباطل

হক ও সত্যের একজন সাধারণ অধীনস্ত হয়ে থাকা আমার নিকট অধিক প্রিয় মিথ্যা ও বাতিলের সরদার হওয়ার চেয়ে। -হিলইয়াতুল আউলিয়া ৯/৬; তাহযীবুত তাহযীব ৭/৭

সুবহানাল্লাহ! তাকওয়ার ধন ছাড়া এসব কীভাবে সম্ভব! এটাই মুমিনের ভূষণ এবং তাকওয়ার নিদর্শন। হক স্পষ্ট হওয়ার পর ঘৃণাভরে বাতিলকে প্রত্যাখ্যান করে হকের পানে ছুটে আসা এক ঈমানী আদর্শ। ঐক্য এবং ভ্রাতৃত্বের বন্ধন গড়ে তোলার এটি একটি কার্যকারী উপাদান। সর্বোপরি এটি ঈমানের অঙ্গও বটে। হাজারো প্রলোভন-প্ররোচনার সামনে মুমিন যেমন টলে যায় না, তেমনি শরীয়তের দলীলের আলোকে হক প্রমাণিত হয়ে যাওয়ার পর মুমিন মাথা পেতে তা বরণ করে নিতে কোনো সংকোচবোধ করে না। হক গ্রহণে বিলম্ব করে না এবং বাতিলকে ছুড়ে ফেলতে কুণ্ঠাবোধ করে না। কারণ মুমিনের দোস্তী হকের সাথে, বাতিলের সাথে নয়। তার বন্ধুত্ব ও অন্তরঙ্গতা সত্যের সাথে, মিথ্যার সাথে নয়।

অস্বীকার করব না- ‘ভুল’ মানব জীবনের অনাকাক্সিক্ষত বাস্তবতা। কিন্তু মুমিনের গুণ হল ভুল থেকে ফিরে আসা। ভুলের অনুসরণে মুমিন ক্ষণিকের জন্য পথ হারিয়ে বসতে পারে; কিন্তু ভুলকেই ‘পথ’ হিসাবে গ্রহণ করে না মুমিন। ভুল আর মুমিনের সম্পর্ক হল অজ্ঞতার। ভুলকে ‘ভুল’ হিসাবে জানার সাথে সাথে মুমিন তা থেকে ফিরে আসে, সমর্পিত হয় হকের সামনে। এখন এ ভুল হতে পারে নিজের বা (আল্লাহ্র পানাহ) তার অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বের; যার হাত ধরে সে পথ চলছে। এক্ষেত্রে মুমিন অনুসরণ করে হকের; ব্যক্তির নয়। কারণ, সে তো ব্যক্তির হাত ধরেছিল হকের অনুসরণের জন্য, হক থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার জন্য নয়। তাই এক্ষেত্রে মুমিন স্মরণ রাখে নবীজীর প্রিয় ফকীহ সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর এ উপদেশ-

أَلَا لَا يقلدنّ أَحَدُكُمْ دِينَهُ رَجُلًا، إِنْ آمَنَ آمَنَ، وَإِنْ كَفَرَ كَفَرَ، فَإِنّهُ لَا أُسْوَةَ فِي الشر.

সাবধান! কেউ যেন তার ঈমান অন্যের কাঁধে ন্যস্ত না করে যে, ও ঈমান আনলে এ-ও ঈমান আনে। ও কুফরি করলে এ-ও কুফরি করে। কারণ মন্দের ক্ষেত্রে কেউ আদর্শ নয়। -আলই‘তিসাম, শাতিবী ২/৩৫৯

আসুন, সালাফ ও পূর্বসূরিদের জীবনচরিত থেকে শিক্ষা গ্রহণ করি। হককে বরণ করি এবং হকের সঙ্গে থাকি। বাতিল ও গোমরাহী পরিহার করি। সকল ভ্রান্তি ও ভ্রষ্টতা বর্জনের শপথ করি। কুরআন-সুন্নাহ্র ধারক বাহক হক্কানী আলেম-উলামা যা কিছু বাতিল বলে চিহ্নিত করে দেন- দ্বিধা-সংকোচ ছাড়া তা বর্জন করি, হককে গ্রহণ করি। কারণ হকের সাথে মুমিনের কোনো দুশমনি নেই। হকই মুমিনের পথ, হকই পাথেয়।

 

 

advertisement