মুহাররম ১৪৪০   ||   অক্টোবর ২০১৮

মুহাররম ও আশুরা : কিছু কথা, কিছু প্রশ্নের উত্তর

মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক

মুহাররম মাসের হেলাল দেখা গেছে এবং নতুন চান্দ্রবর্ষ শুরু হয়েছে। সকল প্রশংসা ওই আল্লাহর, যিনি আমাদের হায়াত বৃদ্ধি করেছেন এবং নতুন একটি মাস ও বছরের সূচনায় আমাদেরকে পৌঁছে দিয়েছেন। নতুন বছর, নতুন মাস, নতুন সপ্তাহ এবং প্রতিটি নতুন দিন ও রাত আমাদের জীবনের অংশ। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের স্বতন্ত্র নিআমত। এগুলোর জন্য স্বতন্ত্রভাবে শোকর আদায় করা দরকার। নতুন নতুন সংকল্প ও প্রত্যয়ে এগুলোকে বরণ করা দরকার।

কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছে-

وَ هُوَ الَّذِیْ جَعَلَ الَّیْلَ وَ النَّهَارَ خِلْفَةً لِّمَنْ اَرَادَ اَنْ یَّذَّكَّرَ اَوْ اَرَادَ شُكُوْرًا.

এবং তিনিই সেই সত্তা, যিনি রাত ও দিনকে পরস্পরের অনুগামী করে সৃষ্টি করেছেন। (কিন্তু এসব বিষয় উপকারে আসে কেবল) সেই ব্যক্তির জন্য, যে উপদেশ গ্রহণের ইচ্ছা রাখে কিংবা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে চায়। -সূরা ফুরকান (২৫) : ৬২

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

الطّهُورُ شَطْرُ الْإِيمَانِ، وَالْحَمْدُ لِلهِ تَمْلَأُ الْمِيزَانَ، وَسُبْحَانَ اللهِ وَالْحَمْدُ لِلهِ تَمْلَآَنِ مَا بَيْنَ السّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ، وَالصّلَاةُ نُورٌ، وَالصَدَقَةُ بُرْهَانٌ وَالصّبْرُ ضِيَاءٌ، وَالْقُرْآنُ حُجّةٌ لَكَ أَوْ عَلَيْكَ، كُلّ النَّاسِ يَغْدُو فَبَايِعٌ نَفْسَهُ فَمُعْتِقُهَا أَوْ مُوبِقُهَا.

পবিত্রতা ঈমানের অংশ। ‘আলহামদু লিল্লাহ’ মীযানের পাল্লাকে ভরে দেয়। ‘সুবহানাল্লাহ ও আলহামদু লিল্লাহ’ আসমান-যমীনের মধ্যস্থ শূন্যতাকে ভরে দেয়। সালাত হল নূর। সদকা হল দলীল। সবর হচ্ছে আলো। কুরআন তোমার পক্ষে কিংবা বিপক্ষে প্রমাণ। প্রতিটি মানুষ সকাল যাপন করে; অতপর কেউ নিজেকে (আল্লাহর আনুগত্যে) নিয়োজিত করে জীবনকে রক্ষা করে। আর কেউ (নফস ও শয়তানের আনুগত্যে নিয়োজিত করে) নিজেকে ধ্বংস করে। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৩, কিতাবুত তাহারাতের প্রথম হাদীস

সৌভাগ্যবান তো সেই ব্যক্তি যে প্রতিটি নতুন সময় ও সূচনায় নিজেকে এমন কাজে নিয়োজিত করে, যার মাধ্যমে আখেরাতে মুক্তি পাওয়া যায়। দুর্ভাগা সেই ব্যক্তি, যে নতুন সময় ও সূচনায় এমন কাজকর্মে লিপ্ত হয়, যা তার ধ্বংস টেনে আনে।

 

। ২।

মুহাররম চান্দ্রবছরের প্রথম মাস। সম্মানিত চার মাসের তৃতীয় মাস। হাদীস শরীফে এ মাসের অনেক ফযীলতের কথা উল্লেখিত হয়েছে। এ মাসে বেশি বেশি নফল রোযা ও তাওবা ইসতিগফারের প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে-

أَفْضَلُ الصِّيَامِ، بَعْدَ رَمَضَانَ، شَهْرُ اللهِ الْمُحَرّمُ، وَأَفْضَلُ الصَلَاةِ، بَعْدَ الْفَرِيضَةِ، صَلَاةُ اللَّيْلِ.

অর্থাৎ, রমযানের পর সবচে উত্তম রোযা হল আল্লাহর মাসের রোযা, যে মাসকে তোমরা মুহাররম নামে চেন। আর ফরয নামাযের পর সবচে উত্তম নামায হল রাতের নামায। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ১১৬৩, কিতাবুস সওম, ফাযলু সওমি মুহাররম

এই হাদীসে লক্ষণীয় বিষয় হল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুহাররম মাসকে বলছেন ‘শাহরুল্লাহ’ বা আল্লাহর মাস। জানা কথা, সকল মাসই আল্লাহর মাস। এর পরও কোনো এক মাসকে আল্লাহর মাস বলার রহস্য কী? রহস্য হল, এই মাসের বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। সেজন্যই তাকে আল্লাহর মাস বলা হয়েছে। যেমন দুনিয়ার সব ঘরই আল্লাহর ঘর। কিন্তু সব ঘরকে বাইতুল্লাহ বলা হয় না।

মুহাররমের গুরুত্বপূর্ণ একটি ফযীলত হল, এর সঙ্গে তাওবা কবুলের ইতিহাস যুক্ত। মুসনাদে আহমাদ ও জামে তিরমিযীতে বর্ণিত একটি হাদীসে আছে- এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে জিজ্ঞেস করল,

يَا رَسُولَ اللهِ، أَيّ شَهْرٍ تَأْمُرُنِي أَنْ أَصُومَ بَعْدَ رَمَضَانَ؟

আল্লাহর রাসূল! রমযানের পর আপনি আমাকে কোন্ মাসে রোযা রাখার নির্দেশ দেন? উত্তরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-

إِنْ كُنْتَ صَائِمًا بَعْدَ شَهْرِ رَمَضَانَ فَصُم المُحَرّمَ، فَإِنّهُ شَهْرُ اللهِ، فِيهِ يَوْمٌ تَابَ فِيهِ عَلَى قَوْمٍ، وَيَتُوبُ فِيهِ عَلَى قَوْمٍ آخَرِينَ.

তুমি যদি রমযানের পর আরও কোনো মাসে রোযা রাখতে চাও তাহলে মুহাররমে রোযা রাখ। কেননা সেটি আল্লাহর মাস। সেই মাসে এমন একটি দিন রয়েছে, যেদিন আল্লাহ তাআলা অনেকের তাওবা কবুল করেছেন। ভবিষ্যতেও সেদিন আরও মানুষের তাওবা কবুল করবেন। -জামে তিরমিযী, হাদীস ৭৫১ (ইমাম তিরমিযী বলেন- هذا حديث حسن غريب ); মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৩২২, খ. ১ পৃ. ১৫৪

এই হাদীসে যেই দিনের দিকে ইশারা করা হয়েছে খুব সম্ভব সেটি আশুরার দিন। তবে বান্দার উচিত বছরের সব দিনেই তাওবা ইসতিগফারের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া। বিশেষ করে এই মাসের প্রতিটি দিনেই তাওবা ইসতিগফারের প্রতি বেশি গুরুত্ব দেওয়া। আর আশুরার দিন অনেক বেশি ইসতিগফার করবে।

ইসতিগফারের জন্য সবচে’ উত্তম হল কুরআন ও হাদীসে  বর্ণিত ইসতিগফার বিষয়ক দুআগুলো বুঝে বুঝে মুখস্থ করবে। সেই দুআগুলোর মাধ্যমে রাব্বে কারীমের দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করবে। তবে নিজের ভাষায় নিজের মতো করে ইসতিগফার করলেও ঠিক আছে। কারণ আল্লাহ সকল ভাষারই ¯্রষ্টা। তিনি সবার কথা বুঝেন। সকলের আরজি কবুল করেন। 

ইসতিগফারের কয়েকটি দুআ এখানে উল্লেখ করা হল-

১.

رَبَّنَا ظَلَمْنَاۤ اَنْفُسَنَا، وَ اِنْ لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَ تَرْحَمْنَا لَنَكُوْنَنَّ مِنَ الْخٰسِرِیْنَ .

হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের ওপর জুলুম করে ফেলেছি। আপনি যদি আমাদের ক্ষমা না করেন ও আমাদের প্রতি রহম না করেন তাহলে অবশ্যই আমরা অকৃতকার্যদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। -সূরা আরাফ (৭) : ২৩

২.

وَ اِلَّا تَغْفِرْ لِیْ وَ تَرْحَمْنِیْۤ اَكُنْ مِّنَ الْخٰسِرِیْنَ.

 (হে আমার প্রতিপালক!) আপনি যদি আমাকে ক্ষমা না করেন ও আমার প্রতি দয়া না করেন তাহলে আমিও ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। -সূরা হুদ (১১) : ৪৭

৩.

رَبِّ اِنِّیْ ظَلَمْتُ نَفْسِیْ فَاغْفِرْ لِیْ

হে আমার রব! আমি নিজের প্রতি জুলুম করেছি। আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন। -সূরা কাসাস (২৮) : ১৬

৪.

لَاۤ اِلٰهَ اِلَّاۤ اَنْتَ سُبْحٰنَكَ ، اِنِّیْ كُنْتُ مِنَ الظّٰلِمِیْنَ.

হে আল্লাহ! আপনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। আপনি সকল ত্রæটি থেকে পবিত্র। নিশ্চয়ই আমি অপরাধী। -সূরা আম্বিয়া (২১) : ৮৭

৫.

رَبَّنَا اغْفِرْ لِیْ وَ لِوَالِدَیَّ وَ لِلْمُؤْمِنِیْنَ یَوْمَ یَقُوْمُ الْحِسَابُ .

হে আমাদের প্রতিপালক! যেদিন হিসাব প্রতিষ্ঠিত হবে সেদিন আমাকে, আমার পিতা মাতা ও সকল ঈমানদারকে ক্ষমা করুন। -সূরা ইবরাহীম (১৪) : ৪১

৬.

رَبِّ اغْفِرْ لِیْ وَ لِوَالِدَیَّ وَ لِمَنْ دَخَلَ بَیْتِیَ مُؤْمِنًا وَّ لِلْمُؤْمِنِیْنَ وَ الْمُؤْمِنٰتِ.

হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ক্ষমা করে দিন এবং আমার পিতা-মাতাকেও এবং প্রত্যেক এমন ব্যক্তিকেও, যে মুমিন অবস্থায় আমার ঘরে প্রবেশ করেছে আর সমস্ত মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীকেও। -সূরা নূহ (৭১) : ২৮

৭.

رَبِّ اغْفِرْ وَ ارْحَمْ وَ اَنْتَ خَیْرُ الرّٰحِمِیْنَ .

হে আমার প্রতিপালক! আমার ত্রæটিসমূহ ক্ষমা করুন এবং আমার প্রতি দয়া করুন। আপনি তো দয়ালুদের শ্রেষ্ঠ দয়ালু। -সূরা মুমিনূন (২৩) : ১১৮

৮.

رَبَّنَاۤ اٰمَنَّا فَاغْفِرْ لَنَا وَ ارْحَمْنَا وَ اَنْتَ خَیْرُ الرّٰحِمِیْنَ.

হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা ঈমান এনেছি। সুতরাং আমাদেরকে ক্ষমা করে দিন এবং আমাদের প্রতি দয়া করুন। আপনি দয়ালুদের শ্রেষ্ঠ দয়ালু। -সূরা মুমিনূন (২৩) : ১০৯

৯.

رَبَّنَا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوْبَنَا وَ كَفِّرْ عَنَّا سَیِّاٰتِنَا وَ تَوَفَّنَا مَعَ الْاَبْرَارِ، رَبَّنَا وَ اٰتِنَا مَا وَعَدْتَّنَا عَلٰی رُسُلِكَ وَ لَا تُخْزِنَا یَوْمَ الْقِیٰمَةِ ،  اِنَّكَ لَا تُخْلِفُ الْمِیْعَادَ.

হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের গোনাহসমূহ ক্ষমা করে দিন। আমাদের মন্দসমূহ মিটিয়ে দিন এবং আমাদেরকে পুণ্যবানদের মধ্যে শামিল করে নিজের কাছে তুলে নিন।

হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে সেই সবকিছু দান করুন, যার প্রতিশ্রæতি আপনি নিজ রাসূলগণের মাধ্যমে আমাদেরকে দিয়েছেন। আমাদেরকে কিয়ামতের দিন লাঞ্ছিত করবেন না। নিশ্চয়ই আপনি কখনও প্রতিশ্রæতির বিপরীত করেন না। -সূরা আলে ইমরান (৩) : ১৯৩-১৯৪

১০.

رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَاۤ اِنْ نَّسِیْنَاۤ اَوْ اَخْطَاْنَا،  رَبَّنَا وَ لَا تَحْمِلْ عَلَیْنَاۤ اِصْرًا كَمَا حَمَلْتَهٗ عَلَی الَّذِیْنَ مِنْ قَبْلِنَا،  رَبَّنَا وَ لَا تُحَمِّلْنَا مَا لَا طَاقَةَ لَنَا بِهٖ،  وَ اعْفُ عَنَّا،  وَ اغْفِرْ لَنَا، وَ ارْحَمْنَا،  اَنْتَ مَوْلٰىنَا فَانْصُرْنَا عَلَی الْقَوْمِ الْكٰفِرِیْنَ.

হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের দ্বারা যদি কোনো ভুল-ত্রæটি হয়ে যায়, সেজন্য আমাদের পাকড়াও করবেন না।

হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের প্রতি সেই রকমের দায়িত্বভার অর্পণ করবেন না, যেমন অর্পণ করেছিলেন আমাদের পূর্ববর্তীদের প্রতি।

হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের ওপর এমন ভার চাপিয়ে দিবেন না, যা বহন করার শক্তি আমাদের নেই।

আপনি আমাদের ত্রæটিসমূহ মার্জনা করুন। আমাদেরকে ক্ষমা করুন এবং আমাদের প্রতি দয়া করুন। আপনিই আমাদের অভিভাবক ও সাহায্যকারী। সুতরাং কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে সাহায্য করুন। -সূরা বাকারা (২) : ২৮৬

১১.

رَبَّنَاۤ اِنَّنَاۤ اٰمَنَّا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوْبَنَا وَ قِنَا عَذَابَ النَّارِ.

হে আমাদের রব! আমরা আপনার প্রতি ঈমান এনেছি। সুতরাং আমাদের পাপরাশি ক্ষমা করে দিন এবং আমাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন। -সূরা আলে ইমরান (৩) : ১৬

১২.

رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا ذُنُوْبَنَا وَ اِسْرَافَنَا فِیْۤ اَمْرِنَا، وَ ثَبِّتْ اَقْدَامَنَا وَ انْصُرْنَا عَلَی الْقَوْمِ الْكٰفِرِیْنَ.

হে আমাদের রব! আমাদের গোনাহসমূহ এবং আমাদের দ্বারা আমাদের কার্যাবলিতে যে সীমালঙ্ঘন ঘটে গেছে তা ক্ষমা করে দিন। আমাদেরকে দৃঢ়পদ রাখুন এবং কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে বিজয় দান করুন। -সূরা আলে ইমরান (৩) : ১৪৭

১৩.

اللهُمّ أَنْتَ الْمَلِكُ، لَا إِلهَ إِلّا أَنْتَ، أَنْتَ رَبِّي، وَأَنَا عَبْدُكَ، ظَلَمْتُ نَفْسِي، وَاعْتَرَفْتُ بِذَنْبِي، فَاغْفِرْ لِي ذُنُوبِي جَمِيعًا، إِنّهُ لَا يَغْفِرُ الذّنُوبَ إِلّا أَنْتَ.

হে আল্লাহ! আপনিই মালিক। আপনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। আপনি আমার প্রতিপালক। আমি আপনার বান্দা। আমি নিজের ওপর জুলুম করেছি। আমি আমার অপরাধ স্বীকার করছি। সুতরাং আমার সকল পাপ ক্ষমা করে দিন। আপনি ছাড়া পাপ ক্ষমাকারী কেউ নেই। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ৭৭১, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৭৬০

১৪.

اللّهُمّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي ظُلْمًا كَثِيرًا، وَلاَ يَغْفِرُ الذّنُوبَ إِلّا أَنْتَ، فَاغْفِرْ لِي مَغْفِرَةً مِنْ عِنْدِكَ، وَارْحَمْنِيْ إِنّكَ أَنْتَ الغَفُورُ الرّحِيمُ.

হে আল্লাহ! আমি নিজের ওপর অনেক জুলুম করেছি। আপনি ছাড়া আমার পাপরাশি ক্ষমা করার কেউ নেই। আপনি আপনার পক্ষ থেকে আমাকে পূর্ণ মাগফিরাত নসীব করুন। আর আমার প্রতি দয়া করুন। নিশ্চয় আপনি ক্ষমাশীল, চিরদয়াময়। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৮৩৪, সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৭০৫

১৫.

أَسْتَغْفِرُ اللهَ الّذِي لَا إِلهَ إِلّا هُوَ الْحَيّ الْقَيّوم، وَأَتُوبُ إِلَيْهِ.

আমি ওই আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি, যিনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। যিনি চিরঞ্জীব, সমগ্র সৃষ্টির নিয়ন্ত্রক। আমি তার কাছে তাওবা করছি। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৫১৭, জামে তিরমিযী, হাদীস ৩৮৯৪

১৬.

رَبِّ اغْفِرْ لِي، وَتُبْ عَلَيّ، إِنّكَ أَنْتَ التّوّابُ الرّحِيمُ.

হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করুন। আমার তাওবা কবুল করুন। নিশ্চয় আপনি তাওবা কবুলকারী, চিরদয়াময়। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৪৭২৬, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৫১৬

১৭.

اللّهُمّ أَنْتَ رَبِّي لاَ إِلهَ إِلّا أَنْتَ، خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ، وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ، أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ، أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيّ، وَأَبُوءُ لَكَ بِذَنْبِي فَاغْفِرْ لِي، فَإِنّهُ لاَ يَغْفِرُ الذّنُوبَ إِلّا أَنْتَ.

হে আল্লাহ! আপনি আমার প্রতিপালক। আপনি ছাড়া কোনও মাবুদ নেই। আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন। আমি আপনার বান্দা। আমি যথাসাধ্য আপনার সাথে কৃত অঙ্গীকার ও আপনার প্রতিশ্রæতির উপর রয়েছি। আমি আমার কৃতকর্মের অনিষ্ট থেকে আপনার আশ্রয় গ্রহণ করছি। আমার প্রতি আপনার নিআমতের কথা স্বীকার করছি। আপনার কাছে আমি আমার গোনাহের কথা স্বীকার করছি। আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন। নিশ্চয় আপনি ছাড়া কেউ গোনাহ ক্ষমা করতে পারে না। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৩০৬

১৮.

أَسْتَغْفِرُ اللهَ رَبِّيْ مِنْ كُلِّ ذَنْبٍ وّأَتُوْبُ إِلَيْهِ، لَا حَوْلَ وَلَا قُوّةَ إِلّا بِاللهِ الْعَلِيِّ الْعَظِيْمِ.

আমি আমার প্রতিপালক আল্লাহর কাছে সকল গোনাহ থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তাঁর কাছে তাওবা করছি। সুমহান আল্লাহ ছাড়া আমাদের কোনো সাধ্য নেই, শক্তি নেই। [আল্লাহর কোনো বুযুর্গ বান্দার শেখানো ইসতিগফারের বাক্য। যার অর্থ ঠিক আছে।]

মনে রাখতে হবে, ইসতিগফারের প্রাণ হল তাওবা। আর তাওবার হাকীকত হল, মানুষ আল্লাহ তাআলার নাফরমানী ছেড়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসবে। পিছনের অন্যায়গুলোর কাফফারা আদায় করবে। যেখানে যে কাফফারার কথা বলা হয়েছে সেখানে তা-ই আদায় করবে। বিশেষ করে মানুষের কোনো হক নষ্ট হয়ে থাকলে সেগুলো আদায়ের ব্যাপারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিবে।

একথাও মনে রাখবে, ইসতিগফারের গুরুত্বপূর্ণ একটি সুরত হল, কুরআনে কারীমে কিংবা হাদীস শরীফে যে আমল ও ইবাদাতের প্রসঙ্গে মাগফিরাতের ওয়াদা করা হয়েছে সেগুলোর প্রতি বেশি গুরুত্ব দিবে।

প্রত্যেক মুমিনের যেহেনেই সেই আমলগুলোর একটা তালিকা থাকা উচিত। এই তালিকায় সর্বপ্রথম রয়েছে ফরয নামায ও অন্যান্য ফরয ইবাদাত। এরপর মাগফিরাত পাওয়ার আমলগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল কবীরা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকা। তাছাড়া দান-সদকা, যিকির-আযকার ও অন্যান্য নফল ইবাদতগুলো তো রয়েছেই।

যিকির ও দুআর মধ্যে সবচে বরকতপূর্ণ আমল হল দরূদ শরীফ। এটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শাফাআত এবং আল্লাহ তাআলার রহমত ও মাগফিরাত লাভের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

মা’ছূর দরূদ শরীফের মধ্যে সংক্ষিপ্ত একটি দরূদ হল-

اللّهُمّ صَلِّ عَلَى مُحَمّدٍ النّبِيِّ الْأُمِّيِّ.

এখানে আরও দুটি শব্দ বাড়িয়ে এভাবেও পড়া যায়-

اللّهُمّ صَلِّ عَلَى مُحَمّدٍ النّبِيِّ الْأُمِّيِّ وَآلِه وَسَلِّمْ.

দৈনিক কমপক্ষে দুই বেলা দরূদ শরীফের আমল জারি রাখা উচিত। সেটা দশবার দশবার করেও হতে পারে। একেবারে না হওয়ার চেয়ে এটাও ভালো।

 

। ৩।

মুহাররমের দশ তারিখকে আশুরা বলা হয়। আশুরার দিন রোযা রাখা মুস্তাহাব।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কা মুকাররমায় ছিলেন তখনও আশুরার দিন রোযা রাখতেন। এরপর যখন মদীনা মুনাওয়ারায় গেলেন তখন নিজেও রোযা রাখতেন অন্যদেরকেও রোযা রাখার নির্দেশ দিতেন। তাছাড়া রমযানের রোযা ফরয হওয়ার আগে এই রোযা ফরয ছিল।

যখন রমযানের রোযা ফরয হল তখন আশুরার রোযা কেবল নফল রোযা হিসাবে নির্ধারিত হল। তবে সাধারণ নফল রোযার চেয়ে তার গুরুত্ব বেশি। হযরত আবু কাতাদা রাযি. থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আশুরার রোযা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-

أَحْتَسِبُ عَلَى اللهِ أَنْ يُكَفِّرَ السّنَةَ الّتِي قَبْلَهُ.

অর্থাৎ আল্লাহর কাছে আমার আশা, তিনি এই রোযার মাধ্যমে বিগত এক বছরের গোনাহ ক্ষমা করে দিবেন। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ১১৬২, জামে তিরমিযী, হাদীস ৭৫২

হাদীস শরীফ থেকে আশুরা সম্পর্কে আমরা এই হেদায়েতও পাই যে, আশুরার সঙ্গে ৯ মুহাররমের রোযা রাখাও ভালো। বরং আশুরার সঙ্গে যদি ৯ বা ১১ মুহাররমে রোযা রাখা যায় তাহলে আরও ভালো। আশুরার রোযা সংক্রান্ত হাদীস সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য তলাবায়ে কেরাম ইমাম ইবনে রজব হাম্বলী রাহ.-এর কিতাব ‘লাতাইফুল মাআরিফ ফীমা লিমাওয়াসিমিল আমি মিনাল ওয়াযাইফ’ মুতালাআ করতে পারেন।  (দ্রষ্টব্য উক্ত কিতাবের ১০২-১২৩ পৃষ্ঠা, প্রকাশক : দারু ইবনে কাসীর, বৈরুত, ১৪২৪ হিজরীর সংস্করণ)।

 

। ৪।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতিকালের প্রায় ৫০ বছর পর ৬১ হিজরীর ১০ মুহাররমে কারবালায় হযরত হুসাইন রাযি.-এর শাহাদাতের ঘটনা ঘটে। নিঃসন্দেহে তাঁর শাহাদাত তাঁর উঁচু মাকাম ও উচ্চ মর্যাদার বিষয়। কিন্তু উম্মতের জন্য তা হয়ে গেছে অনেক বড় ইমতিহান ও মুসিবতের বিষয়। সে ঘটনা মানুষ ভুলতে চাইলেও ভুলতে পারে না।

তবে আমাদের স্মরণ রাখতে হবে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতিকালের আগেই আমাদের শরীয়ত পূর্ণ হয়ে গেছে। কিয়ামত পর্যন্ত এই শরীয়ত পূর্ণাঙ্গরূপেই সংরক্ষিত থাকবে।  আল্লাহ তাআলা নিজে এই শরীয়ত, শরীয়তের দলীল ও দলীলের উৎসসমূহ হেফাযত করার ঘোষণা দিয়েছেন। সেজন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতিকালের পর এখন আর এই শরীয়তের কোনো হুকুম মানসূখ হওয়ার অবকাশ নেই। এই শরীয়ত যেভাবে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে আজ পর্যন্ত সেভাবেই সংরক্ষিত আছে। সে অনুযায়ীই সবার আমল করা জরুরি। তাতে কোনো ধরনের সংযোজন-বিয়োজনের সুযোগ নেই। অতএব রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতিকালের পরে সংঘটিত কোনো মুসিবত বা আনন্দের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোনো দিন বা কোনো মাসের নতুন কোনো ফযীলত বা নতুন কোনো বিধান আবিষ্কার করা যাবে না। এমন করা হলে তা হবে পরিষ্কার বিদআত ও গোমরাহী, যার ঠিকানা জাহান্নাম।

দুঃখ ও আনন্দ উভয়টির বিধান শরীয়তে আছে। উম্মতের উপর ওয়াজিব হল সেই হুকুম অনুযায়ীই আমল করা। উদাহরণস্বরূপ- মুসিবতের সময় একজন বান্দার কী করণীয়, কী বর্জনীয় তার বর্ণনা আছে কুরআন মাজীদ ও সুন্নাতে নববীতে। বিস্তারিতভাবে বর্ণনা আছে। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে-

وَ لَا تَقُوْلُوْا لِمَنْ یُّقْتَلُ فِیْ سَبِیْلِ اللهِ اَمْوَاتٌ،  بَلْ اَحْیَآءٌ وَّ لٰكِنْ لَّا تَشْعُرُوْنَ، وَ لَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَیْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَ الْجُوْعِ وَ نَقْصٍ مِّنَ الْاَمْوَالِ وَ الْاَنْفُسِ وَ الثَّمَرٰتِ، وَ بَشِّرِ الصّٰبِرِیْنَ، الَّذِیْنَ اِذَاۤ اَصَابَتْهُمْ مُّصِیْبَةٌ،  قَالُوْۤا اِنَّا لِلهِ وَ اِنَّاۤ اِلَیْهِ رٰجِعُوْنَ، اُولٰٓىِٕكَ عَلَیْهِمْ صَلَوٰتٌ مِّنْ رَّبِّهِمْ وَ رَحْمَةٌ، وَ اُولٰٓىِٕكَ هُمُ الْمُهْتَدُوْن.

আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদেরকে মৃত বলো না। প্রকৃতপক্ষে তারা জীবিত, কিন্তু তোমরা (তাদের জীবিত থাকার বিষয়টা) উপলব্ধি করতে পার না। আর আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব (কখনও) কিছুটা ভয়-ভীতি দ্বারা, (কখনও) জান-মাল ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতির দ্বারা। সুসংবাদ শোনাও তাদেরকে, যারা (এরূপ অবস্থায়) সবরের পরিচয় দেয়। যারা কোনো মুসিবত দেখা দিলে বলে ওঠে, আমরা সকলে আল্লাহরই এবং আমাদেরকে তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে। এরাই তারা, যাদের প্রতি তাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে বিশেষ করুণা ও দয়া রয়েছে এবং এরাই আছে হিদায়াতের উপর। -সূরা বাকারা (২) : ১৫৪-১৫৭

বুঝা গেল, শাহাদাতের মতো বিরাট মুসিবতেও শরীয়তের হুকুম হল, মুসিবতগ্রস্ত লোকেরা সবর করবে। ‘ইন্না লিল্লাহ..’ পড়বে এবং আল্লাহ তাআলার কাছে সওয়াবের আশা করবে।

কারো ইনতিকালে শরীয়তের হুকুম হল সবর করা। শরীয়ত সবরের দুআও শিখিয়ে দিয়েছে। যেমন-

১.

إِنّ لِلهِ مَا أَخَذَ، وَلَهُ مَا أَعْطَى، وَكُلّ عِنْدَهُ بِأَجَلٍ مُسَمّى، (فَلنَصْبِرْ، وَلْنَحْتَسِبْ).

অর্থাৎ নিঃসন্দেহে আল্লাহ যাকে উঠিয়ে নিয়েছেন সে তাঁরই। যাকে রেখে দিয়েছেন সেও তাঁর। তাঁর কাছে প্রত্যেক জিনিসেরই নির্ধারিত মেয়াদ রয়েছে। (তাই আমাদের উচিত সবর করা এবং আল্লাহ তাআলার কাছে সওয়াবের আশা করা।) -সহীহ বুখারী, হাদীস ১২৮৪

২.

إِنّ العَيْنَ تَدْمَعُ، وَالقَلْبَ يَحْزَنُ، وَلاَ نَقُولُ إِلّا مَا يَرْضَى رَبّنَا.

চোখ অশ্রæ বর্ষণ করছে। মন অস্থির হয়ে উঠছে। তবে আল্লাহর অসন্তুষ্টি ডেকে আনে এমন কোনো কথা আমরা বলবো না। (আল্লাহর ফায়সালা যথার্থ। আমরা তাঁর ফায়সালায় পূর্ণ সন্তুষ্ট।) -সহীহ বুখারী, হাদীস ১৩০৩

৩.

إِنّا لِلهِ وَإِنّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ، اللهُمّ أْجُرْنِي فِي مُصِيبَتِي، وَأَخْلِفْ لِي خَيْرًا مِنْهَا.

নিশ্চয় আমরা সকলেই আল্লাহর। তাঁর কাছেই আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে। হে আল্লাহ! আমাকে এই মুসিবতের সওয়াব দান করুন। যা হারিয়েছি আমার জন্য তার চেয়ে উত্তম কিছুর ব্যবস্থা করুন। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ৯১৮

৪.

إِنّا لِلهِ وَإِنّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ، اللهُمّ أْجُرْنِي فِي مُصِيبَتِي وَاخْلُفْنِي خَيْرًا مِنْهُ.

নিশ্চয় আমরা সকলেই আল্লাহর। তাঁর কাছেই আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে। হে আল্লাহ! আমাকে এই মুসিবতের সওয়াব দান করুন। যা হারিয়েছি আমাকে তার চেয়ে উত্তম কিছু দান করুন। -মুসনাদে আহমাদ ৪/২৭, হাদীস ১৬৩৪৪

৫.

إِنّا لِلهِ وَإِنّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ، اللهُمّ عِنْدَكَ أَحْتَسِبُ مُصِيبَتِي، فَأْجُرْنِي فِيهَا، وَأَبْدِلْنِي بِهَا خَيْرًا مِنْهَا.

নিশ্চয় আমরা সকলেই আল্লাহর। আমাদেরকে তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে। হে আল্লাহ আমি আপনার কাছেই আমার মুসিবতের বদলা চাই। সুতরাং আমাকে এর বিনিময়ে সওয়াব দান করুন এবং এর বিনিময়ে এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করুন। -মুসনাদে আহমাদ ৪/২৭, হাদীস ১৬৩৪৩

অধৈর্য হয়ে অভিযোগপূর্ণ কোনো কথা বলা, বিলাপ করা, হাত পা আছড়ানো, বুক চাপড়ানো, চেহারা খামচানো, শোকের পোশাক পরা এসবই হারাম। শরীয়তে খুব কঠোরভাবে তা থেকে বারণ করা হয়েছে। হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে-

لَيْسَ مِنّا مَنْ لَطَمَ الخُدُودَ، وَشَقّ الجُيُوبَ، وَدَعَا بِدَعْوَى الجَاهِلِيّةِ.

যে ব্যক্তি মুখে আঘাত করে, জামার বুক ছিঁড়ে, জাহিলী যুগের বিলাপ করে সে আমাদের দলভুক্ত নয়। -সহীহ বুখারী ১/১৭২, হাদীস ১২৯৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৬৫

অন্য একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

أَنَا بَرِيءٌ مِمّنْ حَلَقَ وَسَلَقَ وَخَرَقَ.

অর্থাৎ, আমি ঐ ব্যক্তি থেকে মুক্ত, যে শোকে মাথা মুণ্ডায়, বুক চাপড়ায়, কাপড় ছিঁড়ে। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৬৭, সহীহ বুখারী, হাদীস ১২৯৬

সংক্ষিপ্তাকারে শরীয়তের শিক্ষা এই-

مَهْمَا كَانَ مِنَ العَيْنِ وَالْقَلْبِ، فَمِنَ اللهِ، وَمِنَ الرّحْمَةِ، وَمَا كَانَ مِنَ اليَدِ وَاللِّسَانِ، فَمِنَ الشّيْطَانِ.

চোখ আর দিল থেকে যা কিছু আসে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং তা রহমতের অংশ। কিন্তু যা কিছু হাত ও জিহŸা থেকে আসে তা আসে শয়তানের পক্ষ থেকে। -মুসনাদে আহমাদ ১/২৩৮, হাদীস ২১২৭

অর্থাৎ কেবল চোখ বেয়ে অশ্রæ ঝরা কিংবা পেরেশান হওয়ায় কোনো সমস্যা নেই। এটা মানুষের স্বভাবজাত বিষয়। এটা ঐ রহমতের প্রকাশ, যা আল্লাহ বান্দার হৃদয়ে দান করেছেন। কিন্তু পেরেশানীর কারণে যদি মানুষ তার হাত কিংবা মুখ ব্যবহার শুরু করে তাহলে এটা হয় শয়তানের আনুগত্য থেকে। এর দ্বারা আল্লাহ তাআলা নারায হন।

 

। ৫।

শরীয়তের এইসমস্ত বিধি-বিধান লঙ্ঘন করে শিয়া সম্প্রদায় হযরত হুসাইন রাযি.-এর শাহাদাতের দিনকে মাতমের দিন বানিয়ে নিয়েছে। অথচ ইচ্ছাকৃতভাবে মুসিবতের দিনকে স্মরণ করতে থাকা এবং আহাজারি, কান্নাকাটি করা শরীয়তে নিষেধ। শরীয়ত তো তিন দিনের বেশি শোক পালনকেই নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। শুধু স্ত্রীর জন্য তার স্বামীর ইনতিকালে ইদ্দত সমাপ্ত হওয়া পর্যন্ত শোক পালন করার অনুমতি দিয়েছে।

মুসিবতের দিনকে মাতমের দিন বানিয়ে নেওয়া একেবারেই জাহিলী পদ্ধতি। এমন কিছু করা যদি জায়েয হত তাহলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতিকালের দিনকে মাতমের দিন হিসাবে নির্ধারণ করা হত। হযরত আলী রাযি.-এর শাহাদাতের দিনকে মাতমের দিন হিসাবে নির্ধারণ করা হত...।

শিয়ারা তাদের মাতম জলসায় সেসব কাজই করে, যাকে হাদীস শরীফে পরিষ্কারভাবে নিষেধ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মতকে মনে রাখতে হবে, তারা যদি শিয়াদের সাথে এইসব হারাম কাজে যোগ দেয় তাহলে উম্মতের কাতার থেকে বের হয়ে যাবে।

আশ্চর্যের বিষয় হল, খোদ শিয়াদের কিতাবেও কোনো ধরনের মুসিবতে এমন চিৎকার আহাজারি করা, চেহারা বা বুক চাপড়ানো ইত্যাদি কাজকে নিষেধ করা হয়েছে। মাতম নিষিদ্ধ হওয়ার প্রসঙ্গে তাদের নির্ভরযোগ্য কিতাবগুলোতেও বেশকিছু হাদীস রয়েছে। সেখানে তাদের ইমামদের বক্তব্যও রয়েছে। (ইনশাআল্লাহ সামনের মুহাররমে আমরা তাদের কিতাবাদি থেকে সেসব আলোচনা পেশ করার চেষ্টা করব।)

এর চেয়েও আশ্চর্যের বিষয় হল, খোদ পণ্ডিত শিয়াদের নিকটও একথা স্বীকৃত যে, মাতমের এই পদ্ধতি শিয়া ধর্মে বিদআত।

হযরত হুসাইন রাযি.-এর শাহাদাতের পর থেকে তিন শ বছর পর্যন্ত ১০ মুহাররমে কান্নাকাটি, আহাজারি, চিৎকার ও বুক চাপড়ানোর প্রথার কোনো অস্তিত্ব ছিল না। সর্বপ্রথম ৩৫২ হিজরীতে মুঈযযুদ দাওলা দাইলামী (একজন শিয়া) দশ মুহাররমে শুধু বাগদাদে হযরত হুসাইন রাযি.-এর জন্য মাতম করার হুকুম জারি করে। এরপর ৩৬৩ হিজরীতে আল-মুঈযযু লিদীনিল্লাহি ফাতিমী  (বেদ্বীন কট্টর শিয়া) মিশরেও এই হুকুম জারি করে। একথা সত্যান্বেষী ইতিহাসবিদদের কাছে প্রসিদ্ধই আছে। উদাহরণস্বরূপ ইবনুল আসীর কর্তৃক রচিত ‘আল-কামেল ফিত তারীখ’ ৭/২৭৯, ইবনে কাসীর রাহ. কর্তৃক রচিত ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ ‘১৫/২৬১ (৩৫২ হিজরীর ঘটনাবলী) ও হযরত মাওলানা হাবীবুর রহমান আযমী রাহ. কৃত ‘ইবতালে আযাদারী’ কিতাবে এর সুস্পষ্ট বিবরণ দেখা যেতে পারে।

খোদ শিয়া মুসান্নিফগণও একথা সুস্পষ্টভাবে লিখেছেন। আমীর আলী শিয়া তার ‘স্পিরিট অফ ইসলাম’ বইয়ে যেমন লিখেছেন-

Muiz ud-dowla also instituted the yeum-i-aashura, the day of mourning, in commemoration of the martyr-dom of Hussain and his family on the plains of kerbela.

 

তিনি তার দ্বিতীয় বই ‘হিস্ট্রি অফ দ্য সারাসেনস’-এ লিখেছেন-

He was a shiah; and it was he who established the 10th day of the moharram as a day of mourning in commemoration of the massacre of kerbala.

আরো দ্রষ্টব্য শিয়া ইতিহাসবিদ শাকির হুসাইন নাকভীর কিতাব ‘মুজাহিদে আযম’ পৃষ্ঠা : ৩৩২

বিদআতের নিন্দা বিষয়ে খোদ শিয়াদের কিতাবে যেই কঠিন বক্তব্য রয়েছে সেগুলোকে স্মরণ করেও যদি শিয়ারা এই ভয়ংকর বিদআত থেকে ফিরে আসে তাহলে সবার জন্যই ভালো।

 

। ৬।

আফসোস! শিয়া সম্প্রদায় এইসব হারাম বিদআত থেকে ফিরে আসার পরিবর্তে তার সঙ্গে একেবারে শিরক ধরনের এক ভয়াবহ বিদআতকে যুক্ত করেছে, যার নাম রেখেছে ‘তাযিয়া’। এই বিদআতের আবিষ্কার হয়েছে হযরত হুসাইন রাযি.-এর শাহাদাতের প্রায় এক হাজার বছর পর। হায়াত থাকলে পরবর্তীতে কখনো খোদ শিয়া লেখকদের উদ্ধৃতিতে এর ইতিহাস আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ। এখানে শুধু এতটুকুই উল্লেখ করছি যে, তাযিয়া প্রথা পরিষ্কার শিরকী প্রথা। তাওহীদের কালিমায় বিশ্বাসী কোনো মুসলমান, যার তাওহীদের হাকীকত জানা আছে, আবার তাযিয়া সম্পর্কেও ধারণা আছে, সে এই তাযিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারে না। সংক্ষিপ্ত ধারণার জন্য তলাবায়ে কেরাম হযরত মাওলানা হাবীবুর রহমান আযমী রাহ. কর্তৃক রচিত ‘ইবতালে আযাদারী’ রিসালাটি মুতালাআ করতে পারেন।

 

কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর

প্রশ্ন ১ : পেছনের যুগে আশুরার দিনে কী কী ঘটনা ঘটেছে? ভবিষ্যতে কী কী ঘটনা ঘটবে? এ বিষয়ে যে লম্বা তালিকা তাম্বীহুল গাফিলীন ও মকসুদোল মোমেনীন ইত্যাদি কিতাবে উল্লেখিত হয়েছে সেগুলো কি ঠিক?

উত্তর : কিছুতেই না। ওইসব বর্ণনা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরোটাই বাতিল এবং মনগড়া। মওযু রেওয়ায়েতের পর্যালোচনা করার উদ্দেশ্যে যেসব কিতাব লেখা হয়েছে সেগুলোতে একথা পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে।

 

প্রশ্ন ২ : একথা কি ঠিক যে, আশুরার দিনেই কিয়ামত হবে?

উত্তর : না। একথাও ওইসব মওযু রেওয়ায়েতের মধ্যে রয়েছে। নির্ভরযোগ্য কোনও রেওয়ায়েতে একথার কোনও আলোচনাই আসেনি।

 

প্রশ্ন ৩ : কোনো কোনো রেওয়ায়েতে আমরা দেখতে পাই যে, আশুরার দিনেই হযরত আদম আলাইহিস সালামের তাওবা কবুল হয়েছে। এইসব রেওয়ায়েত কি সহীহ?

উত্তর : একথা আবুল কাসিম ইস্পাহানী রাহ. কর্তৃক সংকলিত ‘আত-তারগীব ওয়াত তারহীব’-এর ১৮৬৮ নং রেওয়ায়েতে এসেছে। কিন্তু এই রেওয়ায়েতের সনদ খুবই দুর্বল। এছাড়া আরও কিছু রেওয়ায়েতে এই কথা এসেছে, সেগুলো মওযু।

ইস্পাহানী রাহ. কর্তৃক বর্ণিত ওই রেওয়ায়েতের সনদে দিরার ইবনে আমর নামে একজন রাবী আছেন, যার সম্পর্কে ইমাম ইবনে মায়ীন রাহ. বলেছেন- لا شيء। -লিসানুল মীযান ৪/৩৪০

অবশ্য কোনো কোনো তাবিয়ী থেকে এই কথা বর্ণিত হয়েছে যে, তাঁরা হযরত আদম আলাইহিস সালামের তাওবা কবুল হওয়া সম্পর্কে আশুরার দিনের কথাই বলতেন। দেখুন- ইমাম ইবনে রজব রাহ.কৃত লাতাইফুল মাআরিফ, পৃষ্ঠা : ১১৩-১১৫ এবং আবদুল্লাহ ইবনে ইমাম আহমাদ রাহ.কৃত আল-ইলাল ওয়া মারিফাতির রিজাল, বর্ণনা নম্বর : ৩৭৯৫

 

প্রশ্ন ৪ : শুনেছি একথা প্রমাণিত যে, হযরত নূহ আলাইহিস সালামের কিশতী যেদিন জূদী পাহাড়ে থেমেছিল সেই দিনটি ছিল আশুরার দিন। এই রেওয়ায়েতের সনদ কি সহীহ?

উত্তর : একথা মুসনাদে আহমাদের একটি রেওয়ায়েতে এসেছে। কিন্তু তার সনদ দুর্বল। দেখুন- মুসনাদে আহমাদ ১৪/৩৩৫, হাদীস ৮৭১৭ (শায়েখ শুয়াইব আরনাউতকৃত হাশিয়াযুক্ত নুসখা।)

 

প্রশ্ন ৫ : ঈসা আলাইহিস সালামের জন্ম কি আশুরার দিন হয়েছে?

উত্তর : একথাও প্রমাণিত নয়। আবুল কাসিম ইস্পাহানী রাহ.-এর কিতাব ‘আত-তারগীব ওয়াত তারহীব’-এর পূর্বোক্ত রেওয়ায়েতেই একথা এসেছে। আগেই বলা হয়েছে, এর সনদ খুবই দুর্বল।

 

প্রশ্ন ৬ : তাহলে কোন্ কোন্ ঘটনা আশুরার দিন ঘটেছে বলে প্রমাণিত?

উত্তর : কেবল দুটি ঘটনা :

১. হযরত মূসা আলাইহিস সালাম ও তাঁর সাথীদের ফেরাউন ও তার সৈন্যদের থেকে মুক্তি পাওয়ার ঘটনা; যেখানে দরিয়ায় রাস্তা বানিয়ে আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকে নিরাপদে পৌঁছে দিয়েছেন।

২. এই রাস্তা দিয়ে অতিক্রম করার সময় ফেরাউন ও তার সৈন্যদেরকে দরিয়ায় ডুবিয়ে ধ্বংস করার ঘটনা।

এই দুটি ঘটনা বিভিন্ন সহীহ হাদীসের মাধ্যমে প্রমাণিত। সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিমসহ হাদীসের অনেক কিতাবে বর্ণিত হয়েছে।

আপাতত এই কয়েকটি কথা আর এই কয়েকটি প্রশ্নোত্তরের মধ্যেই আজকের আলোচনা শেষ করছি। হায়াত যদি সঙ্গ দেয় তাহলে ইনশাআল্লাহ আরও কিছু জরুরি কথা ভবিষ্যতে লেখার ইচ্ছা আছে।

وما توفيقي إلا بالله، عليه توكلت وإليه أنيب.

 

-বান্দা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক গুফিরালাহু

১১/০১/১৪৪০ হিজরী

ভোর চারটা

আলমাকতাবাতুল মারকাযিয়্যাহ

মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা

 

 

advertisement