জুমাদাল উখরা ১৪৩১   ||   জুন ২০১০

সম্পাদকের দৃষ্টি ও অর্ন্তদৃষ্টি

মাওলানা আবু তাহের মেসবাহ

‘বাইতুল্লাহর মুসাফির’ গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হওয়ার আগে ধারাবাহিকভাবে ‘আলকাউসারে’ প্রকাশিত হয়েছিলো। লেখক তখন প্রতিটি কিস্তি আলাদা আলাদা সম্পাদনা করে পাঠাতেন। একবার দু’বার নয়, সম্পাদনা হতো বারবার এবং বহুবার। আমাদের তাগাদার কারণে তিনি লেখা পাঠিয়ে দিতেন, আর বলতেন, এখনো ঠিক মনের মত সম্পাদনা হয়নি। গ্রন্থাকারে প্রকাশের সময় তিনি আবার সম্পাদনা করেছেন এবং যথারীতি কয়েকবার, তাতেও এসেছে বহু পরিবর্তন। আল্লাহ তা‘আলার ফয্‌ল ও করমে এ মূল্যবান সফরনামাটি এখন গ্রন্থাকারে আমাদের হাতে। কিন্তু সুন্দর থেকে সুন্দরতরের দিকে লেখকের যে অভিযাত্রা, তার চিত্রটি আমাদের সামনে নেই, যাকে আমরা বলতে পারি, কলব ও কলমের দীর্ঘ এক ‘সফরনামা’। তো এই সফরনামাটও যদি কাগজের পাতায় সংরক্ষণ করা যেতো তাহলে নিঃসন্দেহে তা হতো এ বিষয়ে বাংলা-সাহিত্যের প্রথম, বা অন্যতম প্রথম গ্রন্থ। এবং নতুন লেখকদের জন্য হতো মহামূল্যবান এক পাথেয়। তবে সৌভাগ্যের বিষয়, কোন এক মজলিসে লেখক বাইতুল্লাহর মুসাফিরের ছোট্ট একটি অংশের সম্পাদনা সম্পর্কে কিছু আলোচনা করেছিলেন, যা বাণীবদ্ধ করা হয়েছিলো। আমার মতে এটি হচ্ছে একজন লেখকের আত্মসমালোচনার একটি শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত। আমরা মাননীয় লেখকের অনুমতিক্রমে আলোচনাটি আলকাউসারের পাতায় পরিবেশন করছি।- উপসস্থাপক) মাননীয় লেখক বলেন- গতসংখ্যার জন্য যে পরিমাণ লেখা পাঠিয়েছিলাম সৌভাগ্যক্রমে সবটুকু ছাপা হয়নি, কিছু অংশ রয়ে গিয়েছিলো। ‘সৌভাগ্যক্রমে’ বললাম কেন?! কারণ তাতে ঐ অংশটুকু আবার দেখার সুযোগ হয়েছে, ফলে লেখাটির ভাষা ও মর্মসৌন্দর্য অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। নীচের অংশটুকু দেখুন- আলকাউসারে প্রকাশের আগে ‘‘পরদিন তথ্যমন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কর্মসূচী দেয়া হলো মাদায়েন পরিদর্শনের। হযরত অস্থির হয়ে বললেন, তাহলে কি ছদরের সাথে মুলাকাত হবে না? আমি সান্ত্বনার সুরে বললাম, হযরত, মনে হয় সময় ঘনিয়ে এসেছে। মনে হলো, হযরত কিছুটা তাসাল্লি লাভ করলেন। তিনি বললেন, দেখা যাক। ‘‘মাদায়েনে ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় বস্তু হলো ‘কাখে কিসরা’। তাছাড়া রয়েছে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয় ছাহাবী হযরত সালমান ফারসী এবং আরো দু’জন ছাহাবীর মাযার। ‘‘এখন মাদায়েন একটি ছোট শহর, কিন্তু সুদূর অতীতে তা ছিলো পারস্যের রাজধানী।’’ আলকাউসারে প্রকাশিত রূপ ‘‘পরদিন তথ্যমন্ত্রণালয় থেকে কর্মসূচী দেয়া হলো মাদায়েন পরিদর্শনের। হযরত অস্থির হয়ে বললেন, ‘তাহলে কি ছদরের সাথে মুলাকাত হবে না?’ আমি সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, ‘আশা করি, দু’একদিনের মধ্যেই হবে।’ ‘‘হযরত শুধু বললেন, ‘আচ্ছা, দেখা যাক।’ ‘‘মাদায়েনে ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় বস্তু হলো ‘কাখে কিসরা’। তাছাড়া রয়েছে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রিয় ছাহাবী হযরত সালমান ফারসী (রা.) এবং আরো দু’জন ছাহাবীর মাযার। ‘‘এছাড়া মাদায়েনের মাটিতে আছে নাম না-জানা আরো অসংখ্য ছাহাবা ও মুজাহিদীনের কবর। কারণ কাদেসিয়ার যুদ্ধ তো ছিলো শুধু রক্তের স্রোত! মাদয়েনে, ইরাকে, ইরানে, ইস্পাহানে এবং মুসলিম জাহানের সবখানে রক্তের স্রোত পার হয়েই তো আমরা পৌঁছেছিলাম! ‘‘এখন মাদায়েন একটি ছোট শহর, কিন্তুসুদূর অতীতে তা ছিলো পারস্যের রাজধানী।’’ উপরে ছোট ও বাঁকা টাইপের অংশটি আগে ছিলো না, পরে সংযোজিত হয়েছে। আবার সম্পাদনার সুযোগ পেয়ে লেখাটি বারবার দেখছিলাম, এমন সময় হৃদয়ের গভীরে হঠাৎ যেন একটি আলোর ঝলকানি অনুভব করলাম। ভিতর থেকে কে যেন আমাকে প্রশ্ন করলো, ‘তুমি যে লিখেছো, ‘তাছাড়া রয়েছে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয় ছাহাবী হযরত সালমান ফারসী (রা.) এবং আরো দু’জন ছাহাবীর কবর।’ তারপরই চলে গিয়েছো অন্য প্রসঙ্গে, ‘এখন মাদায়েন ছোট একটি শহর, কিন্তুসুদূর অতীতে তা ছিলো পারস্যের রাজধানী।’ আচ্ছা বলো দেখি, মাদায়েনে কি শুধু এই তিন ছাহাবীরই কবর আছে! আর কিছু নেই! কাদেসিয়ার যুদ্ধ তাহলে কীভাবে হলো? মাটির উপর তিনটি কবর দেখেই যদি মনে করো, বাস্তুবেও এখানে শুধু তিন ছাহাবীর কবর তাহলে তোমার অর্ন্তদৃষ্টি গেলো কোথায়! তোমার দেখা এবং একজন সাধারণ পর্যটকের দেখার মধ্যে পার্থক্য থাকলো কোথায়!’ ভিতরের এই যে তিরস্কার, তাতে সত্যি আমি খুব লজ্জিত হলাম। চিন্তা না করলে তো মনে হয়, লেখাটা ঠিক আছে। কোন খুঁত নেই। কিন্তু কেউ যদি হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে পারে তাহলে কত বড় খুঁত এটা! মাওলানা তাকী উছমানীও ইরাক সফর করেছেন। তাঁর সফরনামায় ‘ফোরাত নদীর তীরে’ তিনিও এমনই লিখেছেন। অর্থাৎ আমাদের উভয়ের লেখাতেই বড় ধরনের ত্রুটি আছে। আমরা শুধু মাটির উপর দিয়েই দেখে গেছি। মাটির উপরে শুধু এই তিন কবরের চিহ্ন আছে, এজন্য আমরা তিন কবরের কথা বলেছি, কিন্তুকেউ যদি অন-র্দৃষ্টিতে তাকায় তাহলে দেখতে পাবে নাম না-জানা কত অসংখ্য ছাহাবা-মুজাহিদীনের কবর, যাদের রক্তের বিনিময়ে মাদায়েন-ইরাক মুসলমানদের আবাসভূমি হয়েছে! অথচ এত বড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমার দৃষ্টি এড়িয়ে গিয়েছিলো। এটি ভাষাগত ত্রুটি নয়, তবে ভাব ও মর্মগত বিরাট ত্রুটি, যা অনেক দেখা ও সম্পাদনা করার পরও নযরে আসেনি। এর দ্বারা বোঝা যায়, সম্পাদনার শেষ নেই। যত দেখবে ততই খুঁত ও ত্রুটি দূর হতে থাকবে এবং সৌন্দর্য বৃদ্ধি পেতে থাকবে। আমার স্ত্রী একটি মূল্যবান বাক্য বলেছেন, ‘যত সম্পাদনা করবে তত সম্পদ বাড়বে।’ তো এখন সম্পাদনা করাতে একটি সম্পদ বাড়লো। উপরের নতুন চিন্তা থেকে আমি লিখলাম- ‘এছাড়া মাদায়েনের মাটিতে আছে নাম না-জানা আরো অসংখ্য ছাহাবা ও মুজাহিদীনের কবর। কারণ কাদেসিয়ার যুদ্ধ তো ছিলো শুধু রক্তের স্রোত!’ কেমন একটি রক্তে চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী বাক্য, যদি রক্ত চাঞ্চল্য গ্রহণ করার যোগ্যতা রাখে! তারপর মনে হলো, এটা তো শুধু মাদায়েনের ঘটনা নয়, গোটা মুসলিম জাহানের ঘটনা। যত জায়গাতেই মাটির উপর কিছু কবরের চিহ্ন দেখবেন, ভাববেন না যে, শুধু এঁরাই এখানে এসেছিলেন, এঁরাই শুধু এখানে মাটি গ্রহণ করেছেন, বরং এখানে মাটির সঙ্গে মিশে আছে নাম না-জানা আরো কত মুজাহিদের রক্ত, অস্থি ও মাংস! তাই লিখলাম- ‘মাদায়েনে, ইরাকে, ইরানে, ইস্পাহানে এবং মুসলিমজাহানের সবখানে রক্তের স্রোত পার হয়েই তো আমরা পৌঁছেছিলাম!’ আপনিই বলুন, কী বিপুল ভাব সৃষ্টি হলো এখানে এখন! তো যারা এই অংশটি গত সংখ্যায় না ছাপিয়ে রেখে দিয়েছিলো তাদেরকে ‘মেরা সালাম!’ আরো কিছু সম্পাদনা (ক) ‘সান্ত্বনার সুরে বললাম,’ অন্যখানে কথাটা ঠিক হলেও রুচি বলছে, এখানে তা উপযুক্ত নয়। তাই লিখলাম, ‘সান্ত্বনা দিয়ে’। (খ) ‘হযরত, মনে হয় সময় ঘনিয়ে এসেছে। মনে হলো, হযরত কিছুটা তাসাল্লি লাভ করেছেন।’ ‘মনে হয়’ এবং ‘মনে হলো’ এর কাছাকাছি অবস্তুান শ্রুতিকটু, তাই লিখলাম, ‘হযরত, সম্ভবত সময় ঘনিয়ে এসেছে।’ এখন দেখেন তো কেমন হয়েছে! মনে হয়/হয়ত/খুব সম্ভব/সম্ভবত এই চারটিকে সামনে রেখে ‘সম্ভবত’কে নির্বাচন করা হয়েছে। তারপর মনে হলো সূক্ষ্ম একটি কথা; ‘সময় ঘনিয়ে এসেছে’ কথাটা সুন্দর, কিন্তুএর উপযুক্ত ব্যবহার হলো হৃদয় ও আবেগের ক্ষেত্রে। আলোচ্য মুলাকাত যতই জরুরি হোক, এর সঙ্গে হৃদয় ও আবেগের সম্পর্ক নেই। তাই শেষ পর্যন্ত এটা পরিবর্তন করে সাধারণভাবে লিখলাম, ‘আশা করি, দু’একদিনের মধ্যেই হবে।’ এখন আর ‘হযরত, এই খেতাবের প্রয়োজন নেই। এত চিন্তা ও যত্ন করে যে বাক্যটি সাজালাম তাকেই এখন নতুন চিন্তা করে বিদায় জানালাম! এমন হয়। (গ) ‘মনে হলো তিনি কিছুটা তাসাল্লি লাভ করেছেন। বললেন, দেখা যাক।’ আগে ছিলো, ‘মনে হলো হযরত কিছুটা তাসাল্লি লাভ করলেন, তিনি বললেন...। এখানে ‘হযরত’ এর পরিবর্তে তিনি হলে ভালো হয়। তাই যামীরটি সেখানে নিয়ে গেলাম। এখন করলেন/বললেন-এর পাশাপাশি উচ্চারণ ভালো মনে হচ্ছে না, তাই ছীগা পরিবর্তন করে লিখলাম, মনে হলো তিনি কিছুটা তাসাল্লি লাভ করেছেন, বললেন, ...। তারপর মনে হলো, তিনি তাসাল্লি লাভ করেছেন কি করেননি, তা এখানে না বললেও চলে, বিষয়টি প্রচ্ছন্ন থাকাই ভালো, হযরতের ছোট্ট একটি শব্দ ‘আচ্ছা’ থেকে পাঠক যা বোঝার বুঝে নিক। তাই এটি বাদ দিয়ে লিখলাম, ‘আচ্ছা, দেখা যাক।’ দেখুন, হযরতের শব্দ কী ছিলো তা তো এখন মনে নেই। এই রকমের কিছু ছিলো। তবে ‘দেখা যাক’ কথাটা ভালো মনে না হওয়ায় লিখেছিলাম, ‘আচ্ছা ঠিক আছে’ পত্রিকায় এবং বইয়ে এটাই আছে। কিন্তুএখন মনে হয়, ‘আচ্ছা’ এই একশব্দের উত্তরটি অধিকতর ভাবগম্ভীর, যা হযরতের শান-উপযোগী। তাই এমন হলে ভালো হতো, তিনি শুধু বললেন, ‘আচ্ছা’! (ঘ) সান্ত্বনা দিয়ে বললাম (এখন মনে হচ্ছে, কোন ‘বড়’ সম্পর্কে ‘সান্ত্বনা দিয়েছি’ বলাটা আদবের ততটা অনুকূল নয়। বরং ‘দেয়া’ শব্দটি বাদ দিয়ে, পরোক্ষ শব্দ ব্যবহার করে বলা যায়, ‘সান্ত্বনার উদ্দেশ্যে বললাম’। পত্রিকায় এবং বইয়ে কিন্তু‘সান্ত্বনা দিয়ে’ই ছাপা হয়েছে।) (ঙ) একটি মারাত্মক ত্রুটি দেখুন, ‘মাদায়েনের ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় বস্তু হলো ‘কাখে কিসরা’। তাছাড়া রয়েছে ... ছাহাবীর মাযার। অর্থাৎ ইসলাম পূর্বযুগের একটি ধ্বংসাবশেষ, আর তিন ছাহাবীর মাযার, দু’টো বিষয়কে একই কাতারে নিয়ে আসা হয়েছে! অথচ প্রথমটির সঙ্গে সম্পর্ক হলো শুধু ইবরত গ্রহণের, আর দ্বিতীয়টির সঙ্গে সম্পর্ক হলো কলবের মুহব্বতের! পত্রিকায় এবং বইয়ে এভাবেই আছে। এটা অমার্জনীয় ভুল। লেখা উচিত ছিলো এভাবে- ‘মাদায়েনে ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় বস্তু হলো ‘কাখে কিসরা’। তবে আমাদের জন্য সৌভাগ্যের বিষয় হলো, এখানে রয়েছে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রিয় ছাহাবী হযরত সালমান ফারসী (রা.) এবং আরো দু’জন ছাহাবীর কবর। এছাড়া মাদায়েনের মাটিতে আছে.. (এখন ‘তাছাড়া’ ও ‘এছাড়া’ এর তাকরারের শ্রুতিকটুতাও দূর হয়ে গেলো।) (চ) ‘এছাড়া মাদায়েনের মাটিতে আছে নাম না-জানা আরো অসংখ্য ছাহাবী ও মুজাহিদীনের কবর।’ এখানে ‘আরো’ শব্দটি বাদ দিয়ে পড়ে দেখুন তো, শব্দটিকে অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় মনে হয় কি না! যাই হোক, আমার প্রতিটি সম্পাদনার সঙ্গে আপনার একমত হতে হবে, এটা অবশ্যই জরুরি নয়, এখানে ভিন্ন চিন্তারও অবকাশ আছে। তবে এতটুকু তো বোঝা গেলো যে, লেখার প্রতি লেখকের কী পরিমাণ যত্ন ও পরিচর্যা থাকা উচিত এবং কীভাবে একটি লেখা সুন্দর থেকে সুন্দরতর হয়! আজকের আলোচনা থেকে আপনি যদি এইটুকু বুঝতে পারেন তাহলেই মনে করবো, আমাদের সময় কাজে লেগেছে। যদি সুযোগ হয় এবং যদি আপনি মনে করেন, এর প্রয়োজন আছে তাহলে ‘বাইতুল্লাহর মুসাফির’-এর সম্পাদনা সম্পর্কে সামনে আরো আলোচনা করবো, ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তাওফীক দিন এবং কবুল করুন, আমীন। (উপস্থাপক, যাকারিয়া আব্দুল্লাহ)

 

advertisement