জুমাদাল উখরা ১৪৩১   ||   জুন ২০১০

গোনাহের এলাজ হলো তাওবা

হযরত মাওলানা মুফতি তকী উছমানী

আলহামদু লিল্লাহি নাহমাদুহূ ওয়া নাস্তাঈনুহূ ওয়া নাস্তাগফিরুহ .... ওয়াছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া ‘আলা আলিহী ওয়া আছহাবিহী ওয়া বারাকা ও সাল্লামা তাসলীমান কাছীরা, আম্মা বা‘দ। রামাযানের মাকছাদ, তাকওয়া হাছিল করা তাওবা সম্পর্কে হযরত থানবী (রাহ.) অনেক কিছু বয়ান করেছেন, যা আমাদের জন্য যেমন উপকারী তেমনি বর্তমান সময়েরও খুব উপযোগী। কারণ রামাযানের মোবারক মাস হচ্ছে আল্লাহর দিকে ফিরে আসর মাস। বান্দার কর্তব্য হলো এই মহাফযীলতের মাস থেকে পুরা ফায়দা হাছিল করা, অর্থাৎ পিছনের সমস্ত গোনাহ থেকে তাওবা এবং বাকি জীবন আল্লাহর হুকুমমত চলার নতুন প্রতিজ্ঞা করা। আল্ল্লাহ তা‘আলা বলেন, হে ঈমানদারগণ, ফরয করা হয়েছে তোমাদের উপর সিয়াম, যেমন ফরয করা হয়েছিলো তাদের উপর যারা বিগত হয়েছে তোমাদের পূর্বে। (ফরয করা হয়েছে) যেন তাকওয়া হাছিল করো তোমরা। (সূরাতুল বাকারাহ-১৮৩) পুরো রামাযানের এই যে ছিয়াম সাধনা, এর আসল মাকছাদ হলো দিলের মধ্যে তাকওয়া পয়দা করা, আর তাকওয়ার মানে হলো বিগত জীবনের সমস্ত গোনাহ থেকে তাওবা করার তড়প ও ব্যাকুলতা সৃষ্টি হওয়া এবং সামনের জীবনে আল্লাহর হুকুমমত চলার প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করা। দিলের মধ্যে যখন আল্লাহর ভয় ও তাকওয়া পয়দা হয় তখন বান্দা অস্থির হয়ে রোনাযারি করে আর বলে, পিছনে আমার দ্বারা যত গোনাহ হয়েছে তা থেকে আমি তাওবা করছি এবং বাকি জীবন আল্লাহর হুকুমমত চলার প্রতিজ্ঞা করছি। সুতরাং তাকওয়ার মাস এই রামাযানে তাওবার বায়ান খুবই সময়-উপযোগী। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সকলকে তাওবার উপর আমলের তাওফীক দান করুন, আমীন। ইছলাহ ও আত্মসংশোধনের প্রথম কাজ, তাওবা ইহয়াউল উলূম কিতাবে ইমাম গায্‌যালী (রাহ.) লিখেছেন, কেউ যখন নিজের ইছলাহ ও সংশোধনের জন্য আগে বাড়তে চায় তখন তার প্রথম কাজ হলো পূর্ণরূপে তাওবা করা। অর্থাৎ পিছনের সমস্ত গোনাহ থোকে আল্লাহর কাছে মাফ চাওয়া এবং ইসতিগফার করা। এজন্য মাশায়েখ ও বুযুর্গানে দ্বীনের তরীকা এটাই যে, আল্লাহ তা‘আলা যখন কাউকে নিজের ইছলাহ ও সংশোধনের ফিকির দান করেন আর সে ইছলাহের নিয়তে তাদের খেদমতে হাযির হয় তখন প্রথমেই তারা তাকে তাওবার তালকীন করেন, যেন সে খাঁটি তাওবার মাধ্যমে পিছনের সমস্ত গোনাহের নাজাসাত ও গান্দেগি থেকে নিজেকে পাকছাফ করে নেয়। এভাবে তাওবার মাধ্যমে যখন সে নতুন জীবন শুরু করবে তখন তার উপর আল্লাহ তা‘আলার রহমত নাযিল হবে। এজন্যই তাওবার এত গুরুত্ব এবং তাওবাই হচ্ছে ইছলাহে নফস ও আত্মসংশোধনের প্রথম সিঁড়ি। ইজমালি ও সংক্ষিপ্ত তাওবা তাওবা দু’প্রকার। ইজমালি তাওবা ও তাফসীলি তাওবা। ইজমালি তাওবা হলো একসঙ্গে পিছনের সমস্ত গোনাহ থেকে তাওবা করা। অর্থাৎ প্রথমে দু’রাকাত ‘ছালাতে তাওবা’ পড়ে এভাবে দু’আ করবে, ‘হে আল্লাহ! জীবনে আমার যত গোনাহ হয়েছে, যত ভুল-ভ্রান্তি ও পদস্খলন ঘটেছে, সমস্ত কিছু থেকে আমি আপনার কাছে মাফ চাই। হে আল্লাহ, আমি তাওবা করছি, ইসতিগফার করছি, এবং দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করছি যে, বাকি জীবনে কখনো কোন গোনাহ করবো না। আপনি কবুল করুন এবং তাওফীক দান করুন, আমীন।’ এটা হলো ইজমালি তাওবা, যা ইছলাহে নফসের প্রথম কাজ। তাফছীলি তাওবা এর পর হলো তাফছীলি তাওবা। অর্থাৎ প্রতিটি গোনাহ থেকে আলাদা আলাদা তাওবা করা। এই তাওবার নিয়ম এই যে, যে গোনাহ থেকে তাওবা করা হচ্ছে যদি তার ক্ষতিপূরণ করা সম্ভব হয় তাহলে তার ক্ষতিপূরণ করতে হবে। যেমন কারো সম্পদ আত্মসাৎ করা হয়েছে; এখন ক্ষতিপূরণ না করে বসে বসে তাওবা করছে। তো এমন তাওবা কীভাবে কবুল হতে পারে! আগে তো পয়সা ফেরত দিতে হবে, কিংবা যার পয়সা তার কাছ থেকে মাফ নিতে হবে, তারপর তাওবা করতে হবে। তদ্রূপ কাউকে কষ্ট দেয়া। তো মাফ চেয়ে নেয়ার মাধ্যমে এর ক্ষতিপূরণ হতে পারে। এটা না করে শুধু তাওবা করা যথেষ্ট নয়। উপরে যা বলা হলো তা হচ্ছে হুকূকুল ইবাদ বা বান্দার হক থেকে তাওবা করার বিষয়। আল্লাহর হক থেকে তাওবা করা সম্পর্কেও একই কথা। যেমন কেউ যাকাত আদায় করেনি। তো যেহেতু পিছনের যাকাত আদায় করার মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ করা সম্ভব সেহেতু যাকাত আদায় না করে শুধু তাওবা করলে তা কবুল হওয়ার কথা নয়। তদ্রূপ যদি নামায-রোযা কাযা হয়ে থাকে, আগে সেগুলোর কাযা আদায় করো, তারপর তাওবা করো। এখন তো এমন মাসআলা খুব শোনা যায় যে, উমরী কাযা বলে কোন কিছু নেই। তাদের দলীল হচ্ছে এই হাদীছ- الاسـلام يجب مـاكان قبـلـه ইসলামপূর্ব জীবনের সমস্ত গোনাহ ইসলাম মুছে দেয় অর্থাৎ কেউ যদি নতুন ইসলাম গ্রহণ করে, তবে ইসলাম গ্রহণ করার আগের জীবনে যত গোনাহ সে করেছে, ইসলামের কারণে সেগুলো মুছে যাবে। সুতরাং আশীবছরের বুড়ো নওমুসলিমকে পিছনের নামায আর কাযা করতে হবে না, বরং যেদিন সে ইসলাম গ্রহণ করেছে সেদিন থেকে নামায পড়তে হবে। কিন্তু কথা হলো তাওবা করা, আর ইসলাম গ্রহণ করা এক নয়। সুতরাং একথা বলা ঠিক নয় যে, সারা জীবন নামায তরক করার পর তাওবা করাই যথেষ্ট; তাওবা করার পর পিছনের নামায আর কাযা করতে হবে না, তাওবা দ্বারাই নামায মাফ হয়ে যাবে, যেমন ইসলাম গ্রহণ করার পর পিছনের নামায কাযা করতে হয় না। এটা ভুল চিন্তা। তাওবাকে ইসলাম গ্রহণের উপর কিছুতেই কিয়াস করা যাবে না। কেননা কাফির অবস্থায় তো তার প্রতি শুধু ঈমান আনার এবং ইসলাম কবুল করার দাওয়াত ছিলো। নামায বা অন্য ইবাদত তো তার উপর ফরযই ছিলো না। ইসলাম গ্রহণ করার পরই শুধু তার উপর নামায ও অন্যান্য ইবাদতের হুকুম আরোপ করা হয়েছে। এ জন্য নও মুসলিমের উপর পিছনের যিন্দেগির নামায-রোযা কাযা করা জরুরি নয়। পক্ষান্তরে একজন মুসলিম তো বালিগ হওয়ামাত্র তার উপর নামায (রোযা) ফরয হয়ে যায়। সুতরাং কেউ যদি বালিগ হওয়ার পর নামায-রোযা তরক করে তাহলে তা তার যিম্মায় থেকে যাবে। পরে যখনই সে অনুতপ্ত হবে এবং নামায-রোযা তরক করার গোনাহ থেকে তাওবা করবে, তখন যেহেতু কাযা আদায় করার মাধ্যমে এগুলোর ক্ষতিপূরণ করা সম্ভব সেহেতু নামায-রোযার কাযা করতে হবে। ক্ষতিপূরণ ছাড়া শুধু তাওবা কবুল হবে না। শুধু তাওবায় নামায মাফ হয় না এটা তো কিছুতেই যুক্তিযুক্ত নয় যে, একব্যক্তি আশি বছর লাগাতার নামায পড়লো, আরেক ব্যক্তি আশি বছর নামায তরক করলো, তারপর তাওবা-ইসতিগফার করে নিলো, আর তার সব নামায মাফ হয়ে গেলো এবং দু’জন সমান হয়ে গেলো। এটা তো যুক্তির কথা হলো না, বরং তাওবার সঙ্গে পিছনের নামাযও তাকে কাযা করতে হবে। কিছু লোক আবার বলে, একদিনের কাযা নামায আদায় করতে হয়, একদিনের বেশী হলে কাযা আদায় করতে হবে না, তাওবা করাই যথেষ্ট হবে। এটা তাদের মনগড়া আজব মাসআলা। তাহলে তো বড় সুবিধা! এক দুই ওয়াক্ত কাযা হয়ে গেলে কাযা আদায় করার পরিবর্তে একদিনের বেশী কাযা করে ফেলো এবং তাওবা করে নাও! এগুলো সব বেহুদা কথা, আল্লাহ হেফাযত করুন, আমীন। তাওবার তো নিয়ম এই যে, ‘ক্ষতিপূরণ করা সম্ভব’ ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ ছাড়া শুধু তাওবা করলে তা কবুল হবে না। যেমন মদখোরের তাওবা করার তাওফীক হলো। তো তার জন্য শুধু তাওবা করাই যথেষ্ট। কারণ মদ খাওয়ার যে গোনাহ তার তো ক্ষতিপূরণ করা সম্ভব নয়, সুতরাং শুধু তাওবা করলেই মেহেরবান আল্লাহ মাফ করে দেবেন। পক্ষান্তরে কারো সম্পদ আত্মসাৎ করলে শুধু তাওবা দ্বারা মাফ হবে না। কারণ এর ক্ষতিপূরণ করা সম্ভব, অর্থাৎ সম্পদ ফেরত দেবে, কিংবা মালিক থেকে মাফ করিয়ে নেবে। এছাড়া তাওবা কবুল হবে না। যাকাত আদায় না করার তাওবা নামায-রোযার মত যাকাত সম্পর্কেও একই কথা। বিগত বছরগুলোর যাকাত আদায় না করে শুধু তাওবা করলে তাওবা কবুল হবে না। কারণ যাকাত আদায় করার মাধ্যমে এ গোনাহের ক্ষতিপূরণ করা সম্ভব। নামায, রোযা ও যাকাতের অছিয়ত করে যাওয়া মোটকথা, তাফছীলি তাওবা এই যে, মানুষ নিজের পিছনের জীবনের হিসাব নিয়ে দেখবে যে, তার যিম্মায় আল্লাহর, কিংবা বান্দার কোন হক ওয়াজিব আছে কি না? এবং সেগুলোর ক্ষতিপূরণ করা সম্ভব কি না? যদি সম্ভব না হয় তাহলে শুধু তাওবা করাই যথেষ্ট। আর যদি ক্ষতিপূরণ করা সম্ভব হয় তাহলে অবশ্যই ক্ষতিপূরণ করতে হবে। যেমন নামায আল্লাহর হক। তো হিসাব করে দেখবে যে, আমার যিম্মায় কত ওয়াক্তের নামায কাযা আছে। সেগুলো আদায় করার চেষ্টা-ফিকির শুরু করে দেবে। এর সহজ তরীকা এই যে, খাতায় কাযা নামাযের সংখ্যা লিখে রাখবে। সঠিক সংখ্যা জানা না থাকলে, সতর্কতার সাথে অনুমান করে লিখবে। তারপর এটাও লিখবে যে, অমুক তারিখ থেকে আমি কাযা আদায় করা শুরু করেছি। প্রত্যেক ওয়াক্তিয়া নামাযের সঙ্গে আমি এক ওয়াক্তের কাযা নামায আদায় করছি। এখন সমস্ত নামায আদায় করার আগেই যদি আমার মউত এসে যায় তাহলে আমি ওছীয়ত করছি, ওয়ারিছগণ যেন আমার সম্পত্তি থেকে বাকী নামাযের ফিদয়া আদায় করে। যদি ওছীয়ত করে না যায় তাহলে অঢেল সম্পদ রেখে গেলেও ওয়ারিছদের উপর ঐ নামাযের ফিদয়া আদায় করা ওয়াজিব হবে না। ওছীয়ত করে গেলেই শুধু ওয়াজিব হবে, সেটাও শুধু সম্পত্তির একতৃতীয়াংশের ভিতরে। এর বাইরে ওছীয়ত কার্যকর হবে না। যাকাত-রোযা সম্পর্কেও একই কথা। অর্থাৎ পিছনের জীবনে কত রোযা কাযা হয়েছে তার সঠিক হিসাব, কিংবা সতর্কতার সঙ্গে আনুমানিক হিসাব খাতায় লিখবে এবং আল্লাহর উপর ভরসা করে তা আদায় করা শুরু করবে। তারপর আদায়কৃত রোযার হিসাবও লিখতে থাকবে এবং এভাবে ওছীয়ত লিখে রাখবে যে, আমার যদি মউত এসে যায় তাহলে বাকি রোযার ফিদয়া যেন আমার সম্পত্তি থেকে আদায় করা হয়। এভাবে যাকাতেরও হিসাব করে দেখবে যে, কী পরিমাণ যাকাত যিম্মায় রয়ে গেছে। তা খাতায় লিখবে এবং আল্লাহর উপর ভরসা করে আদায় করা শুরু করবে। তারপর আদায়কৃত পরিমাণও লিখে রাখবে এবং এভাবে ওছীয়ত করবে যে, অবশিষ্ট যাকাত যেন আমার সম্পত্তি থেকে আদায় করা হয়। অবশ্য তার ওছীয়ত শুধু সম্পত্তির একতৃতীয়াংশ পরিমাণের ভিতরেই কার্যকর হবে। এটা হলো তাফছীলি তাওবা। তো ইছলাহে নাফস ও আত্মসংশোধনের জন্য কেউ যখন নিজেকে শায়খের হাতে সোপর্দ করে তখন তাকে দিয়ে ইজমালি ও তাফছীলি এদু’টি তাওবা করানো হয়। তাওবা ভেঙ্গে যাওয়া জনৈক ব্যক্তি হযরত থানবী (রাহ.)-এর কাছে পত্র লিখেছেন যে, প্রতিসপ্তাহেই আমি তাওবা করি, কিন্তু একদিন পার না হতেই সব প্রতিজ্ঞা তছনছ হয়ে যায়। (আনফাসে ঈসা-১৯৪) এ অবস্থা অবশ্য প্রায় প্রত্যেকের জীবনেই দেখা দেয়। মানুষ পিছনের সমস্ত গোনাহ থেকে খাঁটি মনেই তাওবা করে এবং ভবিষ্যতে গোনাহ না করার বিষয়ে খুব দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করে, কিন্তু একদু’দিন পরই নফস ও শয়তানের প্ররোচনায় এবং পরিবেশ ও পরিসি'তির মোকাবেলায় সব সংকল্প ভেসে যায় এবং আবার গোনাহ ও নাফরমানিতে লিপ্ত হয়ে পড়ে। সাধারণত প্রায় প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই এ অবস্থা দেখা দেয়। এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তাওবার তিন শর্ত তো এই পেরেশানির সমাধানের জন্য প্রথমেই আমাদের বুঝতে হবে তাওবার শর্ত কী কী? তাওবাতুন্‌নাছূহ বা খাঁটি তাওবার জন্য শরীয়াতে তিনটি শর্তের কথা বলা হয়েছে। এই শর্ততিনটি পাওয়া গেলেই বলা হবে যে, বান্দা খাঁটি তাওবা করেছে। প্রথম শর্ত হলো অন্তরে গোনাহের প্রতি ঘৃণা থাকা এবং গোনাহ ও নাফরমানির কারণে অন্তরে লজ্জা ও অনুশোচনা আসা। যদি গোনাহের প্রতি ঘৃণাই না থাকে, অন্তরে যদি লজ্জা ও অনুশোচনাই না জাগে, গোনাহকে যদি গোনাইই মনে না করে তাহলে আর তাওবা হলো কোথায়? সেটা তো বরং বড় ভয়ের কথা। আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেক মুসলমানকে তা থেকে হেফাযত করুন, আমীন। তো তাওবার জন্য প্রথম শর্ত হলো গোনাহের কারণে লজ্জিত ও শরমিন্দা হওয়া যে, ইয়া আল্লাহ, আমার তো বড় ভুল হয়ে গেছে! হায়, কেয়ামতের দিন কীভাবে আল্লাহর সামনে মুখ দেখাবো! আয় আল্লাহ, আমি ভুল স্বীকার করছি, আমাকে মাফ করে দিন। দ্বিতীয় শর্ত হলো সঙ্গে সঙ্গে ঐ গোনাহটি ছেড়ে দেয়া। এছাড়া তাওবা পূর্ণ হতে পারে না। এটা কীভাবে সম্ভব যে, মানুষ একদিকে তাওবা করবে, অন্যদিকে গোনাহও করে যাবে! এটা তো আল্লাহর সঙ্গে তামাশার মত হলো! এর পরিণতি তো খুবই ভয়াবহ! তাওবার তৃতীয় শর্ত হলো ভবিষ্যতে গোনাহ না করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করা এবং প্রতিজ্ঞার উপর অবিচল থাকার আন্তরিক চেষ্টা করা। এই তিনটি হলো তাওবার শর্ত। এছাড়া তাওবা পূর্ণ হয় না। প্রতিজ্ঞার দৃঢ়তা সম্পর্কে সন্দেহ তাওবার প্রথম যে শর্ত, অর্থাৎ গোনাহের কারণে লজ্জিত ও শরমিন্দা হওয়া, এটা তো প্রায় প্রত্যেক ঈমানদার ব্যক্তিরই হয়ে থাকে। সামান্য ঈমান যার দিলে আছে সে গোনাহ করার পর অবশ্যই লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়। তারপর দ্বিতীয় শর্ত গোনাহ ছেড়ে দেয়া, এর উপরও সাধারণত আমল হয়ে যায়। মানুষ গোনাহ করার পর কিছু সময়ের জন্য হলেও গোনাহ ছেড়ে দেয়। তবে তৃতীয় শর্তটি সম্পর্কে মনে দ্বিধা-সন্দেহ আসতে পারে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে গোনাহ না করার যে প্রতিজ্ঞা সেটা দৃঢ় প্রতিজ্ঞা হলো কি না তা অনেক সময় বোঝা যায় না। কারণ প্রতিজ্ঞা করার সময়ও মনের মধ্যে এই খটকা লেগে থাকে যে, তাওবা তো করছি, কিন্তু কে জানে, কতক্ষণ এই তাওবার উপর অবিচল থাকতে পারবো? কতটা সময় নিজেকে গোনাহ থেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবো? মনের মধ্যে এই খটকা ও দ্বিধা-সন্দেহ থাকা অবস্থায় কি আর দৃঢ় প্রতিজ্ঞা হয়? আর প্রতিজ্ঞতার দৃঢ়তা সম্পর্কেই যখন দ্বিধা-সন্দেহ, তখন আর তাওবা পূর্ণ হলো কোথায়? এসব কারণে মানুষ খুব পেরেশানির শিকার হয়। খটকা ও উৎকণ্ঠা তাওবার বিরোধী নয় বিষয়টি গভীরভাবে চিন্তা করে বুঝে নিন যে, পাক্কা ও সাচ্চা তাওবার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞা অবশ্যই জরুরি। তবে প্রতিজ্ঞা করার পর মনে এই খটকা ও উৎকণ্ঠা থাকা যে, প্রতিজ্ঞা তো করেছি, কিন্তু কতক্ষণ তা অটুট থাকবে! নফসের কী ভরসা, কখন কী করে বসে! তো এই উৎকণ্ঠা ও দ্বিধা-সন্দেহ তাওবার পূর্ণতার পথে কোন বাধা নয়। যখন দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করেছো তখন খটকা ও উৎকণ্ঠা সত্ত্বেও তোমার প্রতিজ্ঞা দৃঢ়ই থাকবে এবং ইনশাআল্লাহ তাওবার মধ্যে কোন ত্রুটি আসবে না। যেমন, বহুতল ভবন তৈরী করা হলো এবং মযবূত ও সুদৃঢ় করার যথাসাধ্য চেষ্টাও করা হলো, কিন্তু তাসত্ত্বেও এই খটকা ও উৎকণ্ঠ লেগে আছে যে, ভূমিকম্পে তা টিকবে তো! ধ্বসে পড়বে না তো! এধরনের উৎকণ্ঠার মানে এ নয় যে, ভবনটি মযবূত হয়নি। মযবূত ঠিকই হয়েছে, তবে উৎকণ্ঠাও ঠিক আছে, কারণ ভূমিকম্পে কত কিছুই তো ঘটে যায়! এজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা অবশ্যই নিতে হবে, কিন্তু এ কারণে ভবনকে দুর্বল বালা যাবে না। তো ভবিষ্যতে গোনাহ না করার শুধু দৃঢ় প্রতিজ্ঞাই তাওবার জন্য যথেষ্ট। এটা আমার কথা নয়। নিজের পক্ষ থেকে এমন কথা বলার সাহস বা দুঃসাহস আমার নেই। একথা আমি শুনেছি আমাদের বুযুর্গ হযরত বাবা নাজমে আহসান ছাহেব (রাহ.) থেকে, যিনি ছিলেন হযরত থানবী (রাহ.)-এর ‘মুজাযে ছোহবত’। তিনি বড় আশ্চর্যরকম কাশফ ও কারামাতওয়ালা বুযুর্গ ছিলেন। তিনি খুব জোর দিয়ে বলতেন যে, মানুষ মনে করে, দ্বীনের উপর চলা বড় কঠিন। আরে মিয়াঁ, প্রতিদিন তাওবা করে নিয়ো, ব্যস! একদিন আমি আরয করলাম, হযরত! এই যে তাওবার কথা বলছেন, আমার তো তাওবার মধ্যেই সন্দেহ যে, তাওবাটা পাক্কা হলো কি না! কারণ আমি তো বুঝতেই পারি না যে, ভবিষ্যতে গোনাহ না করার যে প্রতিজ্ঞা করেছি তা দৃঢ় হয়েছে কি না! তিনি বললেন, তুমি তোমার দিক থেকে গোনাহ না করার প্রতিজ্ঞা করো, তারপর এই যে, গোনাহ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ও উৎকণ্ঠা, এটা তাওবার খেলাফ নয়। হযরত থানবী (রাহ.)ও স্পষ্ট করে বলেছেন যে, এটা তাওবার খেলাফ নয়। একবার যখন পাক্কা এরাদা করে নিয়েছো যে, ইনশাআল্লাহ এ কাজ আমি করবো না, তো ব্যস তাওবা হয়ে গেছে। তাওবা গোনাহ মুছে দেয় আল্লাহর দরবারে বান্দার তাওবা কবুল হওয়ার অর্থ এই যে, আল্লাহ তা‘আলা দয়া করে পিছনের সমস্ত গোনাহ বান্দার আমলনামা থেকে মুছে দেন। মাওলার দয়া ও মায়া দেখুন, তাওবা মানে শুধু গোনাহ মাফ করে দেয়া এবং শাস্তি না দেয়া নয়, বরং সেই সঙ্গে আমলনামা থেকে গোনাহর চি‎হ্নপর্যন্ত মুছে ফেলা, যাতে গোনাহের কারণে বান্দা আখেরাতে লজ্জায় না পড়ে! শুধু মাফ করার অর্থ হলো, আমলনামায় গোনাহের ঘটনা লেখা থাকবে, তবে সেজন্য শাস্তি দেয়া হবে না, আর আমলনামা থেকে মুছে ফেলার অর্থ হলো, ঐ গোনহটা আমলনামায় লেখাই থাকবে না, যেন তুমি তা করোই নি! শুধু তাই নয়, বান্দা যত গোনাহ করুক, একবার যদি অনুতপ্ত মনে তাওবা করে তাহলে আমলনামা থেকে তিনি তার গোনাহ মুছে তো দেনই, এমনকি তার পরিবর্তে ছাওয়াব লিখে দেন। কত ভালো বাসেন মাওলা তাঁর অবুঝ বান্দাকে! মাওলার কত দয়া তাঁর গোনাহগার বান্দার প্রতি! বান্দার গোনাহ লুকিয়ে রাখা সাত্তার হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলার একটি গুণবাচক নাম, যার অর্থ হলো গোপনকারী, যিনি লুকিয়ে রাখেন, প্রকাশ করেন না। আল্লাহ তা‘আলা সাত্তার বলেই বান্দাকে তিনি লজ্জিত ও অপদস্থ করেন না, দুনিয়াতেও না আখেরাতেও না। বান্দা যত গোনাহ করুক, তাওবা করলে আল্লাহ মাফ করে দেন এবং তার গোনাহকে লোকচক্ষুর আড়াল করে রাখেন। আখেরাতেও তিনি বান্দার গোনাহ লুকিয়ে রাখবেন যাতে সে লজ্জিত না হয়। বুখারী শরীফে আছে- আখেরাতে এক বান্দাকে ডেকে চুপিসারে বলার মত করে বলবেন, বান্দা, তুমি কি দুনিয়াতে এ গোনাহ করেছিলে? সে স্বীকার করবে। আল্লাহ বলবেন, অমুক গোনাহ করেছিলে? হাঁ, করেছি? অমুক গোনাহ করেছিলে? হাঁ, করেছি। এভাবে বিভিন্ন গোনাহের স্বীকারোক্তি নিয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলবেন, দুনিয়াতে আমি তোমার গোনাহ গোপন রেখেছি, তাই কেউ তা জানতে পারেনি। শুধু আমি জানি, আর তুমি জানো। আজ আমি তোমার ঐসব গোনাহ মাফ করে দিচ্ছি। সুতরাং আখেরাতেও আল্লাহ তা‘আলা সেগুলো প্রকাশ করবেন না। এমনই সাত্তারি করবেন তিনি বান্দার! মোটকথা, অনুতপ্ত মনে একবার যদি পাক্কা তাওবা হয়ে যায় তাহলে ইনশাআল্লাহ ঐ গোনাহ মাফ হয়ে যাবে এবং আমলনামা থেকে মুছে দেয়া হবে। তাওবার উপর অবিচলতা আল্লাহর কাছেই চাও তাওবা করার পর এখন যদি তোমার দিলে এই খটকা ও উৎকণ্ঠা এবং দ্বিধা-সংশয় আসে যে, আবার না গোনাহ হয়ে যায়! আবার না নাফরমানিতে পড়ে যাই! তাহলে এর জন্য আল্লাহর কাছেই দু‘আ করো, আল্লাহর কাছেই চাও, হে আল্লাহ! তাওবা তো করেছি, কিন্তু আপনার তাওফীক ছাড়া তাওবার উপর অবিচল থাকার শক্তি তো আমার নেই। দয়া করে, অনুগ্রহ করে হে আল্লাহ, আপনি আমাকে অবিচলতা দান করুন। আমাদের পেয়ারা নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবে দু‘আ করেছেন- اللـهم ان قلوبنـا و نواصيـنا و جوارحنـا بيدك, لم تمـلكنـا منهـا شيـئا, فاذا فعـلت ذلك بنـا فكـن أنت وليـنا و اهـدنـا الى سوآء السبيـل হে আল্লাহ! আমাদের কলব, আমাদের কপাল এবং আমাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আপনারই কুদরতি হাতে, আমাদের আপনি এর কোন কিছুরই মালিক বানাননি। আমাদের সঙ্গে এই যখন আপনার আচরণ, তো আপনিই আমাদের অভিভাবক হোন এবং আমাদের সোজা-সরল পথে পরিচালিত করুন। কত আব্দার ও ফরিয়াদপূর্ণ দু‘আ এবং কত সান্ত্বনা ও তাসাল্লির দু‘আ! এমন দু‘আ কি মাওলা কখনো ফিরিয়ে দিতে পারেন! সুতরাং পেয়ারা নবী যেভাবে শিখিয়েছেন সেভাবেই আল্লাহর কাছে আব্দার করো। আরেকটি দু‘আ এই- اللهم إنك سألتنا من أنفسنا مـا لا نملكـه إلا بك فأعطنا منها مـا يرضيك عنـا হে আল্লাহ! আপনি আমাদের এমন সব বিষয়ের আদেশ করেছেন, আপনার তাওফীক ছাড়া যার সাধ্য আমাদের নেই। সুতরাং হে আল্লাহ! আমাদের তাই দান করুন যা আপনাকে আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট করবে। তো প্রথমে তাওবা করো, পাক্কা তাওবা; তারপর দিলের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা যা আছে তা আল্লাহর হাওয়ালা করে দাও। তখন তিনিই তোমাকে তাওবার উপর অবিচল থাকার তাওফীক দান করবেন। এ পথে প্রয়োজন দীর্ঘ সফরের বারবার তাওবা ভেঙ্গে যায়, এ অনুযোগের জবাবে হযরত থানবী (রাহ.) তিনটি কবিতা-পংক্তি লিখে দিয়েছিলেন। প্রথমটি মাওলানা জামী (রাহ.)-এর কবিতা থেকে- صوفي نه شود صافي تا در نه كشد جامي بسيـار سفـر بايـد تا بخته شود خامي অর্থাৎ কোন ছূফী ও সাধক সত্যিকার সাধক কখনো হতে পারে না যতক্ষণ না সে কঠিন সাধনায় আত্মনিয়োগ করবে। কঠিন সাধনার পরই আল্লাহ তাকে ইছলাহ ও সংশোধনের উচ্চ স্বরে উপনীত করেন। মানুষের মধ্যে যত দোষ-ত্রুটি ও দুর্বলতা রয়েছে সেগুলো থেকে মুক্ত হয়ে পরিশুদ্ধ ও পরিপক্ব মানুষ হওয়ার জন্য একদু’-দিনের পথচলা যথেষ্ট নয়, এজন্য চাই বহু দিনের বহু দীর্ঘ সফর এবং লাগাতার মেহনত মোজাহাদা। মওত পর্যন- ‘ফারাগাত’ নেই দ্বিতীয় পংক্তিটি মাওলানা রূমী (রাহ.)-এর এবং তা এই- اندرين ره مي تراش و مي خراش تـا دم آخر دمى فـارغ مبـاش এ পথে ‘তারাশ-খারাশ’ ও মেহনত-মোজাহাদা করতেই থাকো। শেষ জীবন পর্যন্ত মুহূর্তের জন্য ফারেগ হয়ে বসে থেকো না। এমন যেন না হয় যে, তুমি নিশ্চিন্ত বসে আছো যে, আমার তো ইছলাহ ও সংশোধন হয়ে গেছে, আমি তো কামেল হয়ে গেছি, অথচ ভিতরে তোমার নফস ফণা তুলে বসে আছে, সুযোগ বুঝে ছোবল দেয়ার জন্য। সুতরাং কখোনই বে-ফিকির হয়ে বসে থেকো না। নফসকে সর্বদা কঠিন পাহারার ভিতরে রাখো। শেষ মুহূর্তে দয়া হয়েই যায় তৃতীয় পংক্তিটি ছিলো এই- تـا دم آخـر دمى آخـر بود كه عنايت با تو صاحب سر بود অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা যদি তাওফীক দান করেন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁর অভিমুখী হয়ে থাকার তাহলে একসময় না একসময় তাঁর দয়া ও দান এসেই যায়। কারণ কেউ যদি দাতার দুয়ারে দাঁড়িয়ে চাইতে থাকে, চাইতেই থাকে তবে সকালে, বা দুপুরে, কিংবা সন্ধ্যায়, একসময় না একসময় দাতার দয়া হবেই এবং কিছু না কিছু দান করবেই। আর আল্লাহ তো সকল দাতার বড় দাতা, সকল দয়ালুর বড় দয়ালু! সুতরাং বান্দা যদি তাঁর দুয়ারে হাত পেতে দাঁড়িয়ে থাকে এবং চাইতে থাকে, তিনি কীভাবে দান না করে পারেন! তাওবা ভঙ্গ হলে আবার প্রতিজ্ঞা করো উপরের তিনটি পংক্তি নকল করে থানবী (রাহ.) লিখেছেন- ‘খোলাছা এই যে, ফিকির ও মেহনত এবং চিন্তা ও চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। এভাবেই ইনশাআল্লাহ সফলতা ও কামিয়াবি আসবে। (আনফাসে ঈসা অর্থাৎ এই নিগূঢ় রহস্যটি বুঝে নাও যে, বারবার তাওবা ভেঙ্গে যায় বলে নিরাশ হয়ে চেষ্টা মেহনত ছেড়ে দেয়া যাবে না। বরং তখন নফসের মোকাবেলা এভাবে করতে হবে যে, যখনই তাওবা ভেঙ্গে যাবে আবার তাওবা করবে, আবার প্রতিজ্ঞা করবে। এভাবে ‘ভাঙ্গা-গড়ার’ মুজাহাদা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জারি রাখতে হবে। ‘এতবার তাওবা ভাঙ্গে, আর কত তাওবা করবো! এ চিন্তায় নিরাশ হয়ে নফসের সামনে হাল ছেড়ে দেয়া কিছুতেই ঠিক নয়। মানুষের ইচ্ছাশক্তি অনেক বড় শক্তি মানুষের ইচ্ছার মধ্যে আল্লাহ তা‘আলা অনেক বড় শক্তি রেখেছেন। এই ইচ্ছাশক্তি দ্বারা মানুষ হিমালয়ের মত পাহাড় জয় করেছে, সাগর-মহাসাগর ও দিগন্ত-হীন মরুভূমি পাড়ি দিয়েছে এমনকি চাঁদের বুকে পা রেখেছে এবং মঙ্গলগ্রহের দিকে ছুটে চলেছে। এটাকে কাজে লাগিয়েই মানুষ আজ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চরমোৎকর্ষ সাধন করেছে। তো এই ইচ্ছাশক্তিকে তুমি নফস ও শয়তানের মোকাবেলায় ব্যবহার করো, গোনাহ ও নাফরমানি থেকে বেঁচে থাকার কাজে ব্যবহার করো। একবার যদি পরাস্ত হও, নতুন শক্তিতে বলীয়ান হয়ে আবার উঠে দাঁড়াও এবং ভিতরের ইচ্ছা শক্তিকে জাগ্রত করো যে, এবার দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে আমি নফসের মোকাবেলা করবো এবং গোনাহ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করবো। আত্মসমর্পণ করলে সর্বনাশ বুযুর্গানে দ্বীনের মুখে মানুষ যখন কোরআন-হাদীছের কথা শোনে তখন দিলের মধ্যে গোনাহ ছেড়ে দেয়ার এবং নেকীর পথে চলার আবেগ ও জাযবা পয়দা হয়। কিন্তু গোনাহে আসক্ত নফস তাকে নাফরমানির পথে নিয়ে যেতে চায়। এভাবে মানুষের ভিতরে ভালো ও মন্দ উভয় শক্তির দ্বন্দ্ব শুরু হয়। প্রথম দিকে নফসেরই জয় হয়, কারণ নফসের মধ্যে গোনাহ করার পূর্ণ শক্তি রয়েছে। অন্যদিকে নেকির ইচ্ছা তখনো অতটা শক্তিশালী হয়ে উঠেনি। ফলে দ্বন্দ্বযুদ্ধে নফসই জয়ী হয় এবং নেকির ইচ্ছাশক্তির পরাজয় ঘটে। এখন হেরে গিয়েছে বলে নেকির শক্তিটি যদি হাতিয়ার ফেলে দেয় এবং আত্মসমর্পণ করে যে, এখন আর মোকাবেলা করা নিরর্থক, তাহলে নেকির শক্তি শেষ হয়ে যাবে এবং নফসের হাতে তার চূড়ান্ত পরাজয় ঘটবে। পক্ষান্তরে নিজেকে এবং নিজের ভিতরে বিদ্যমান নেকির শক্তিকে তুমি যদি বোঝাতে পারো যে, যতবারই তুমি পরাস্ত হবে তোমার মধ্যে আরো শক্তি তৈরী হবে এবং নতুন বলে বলীয়ান হয়ে তুমি নফসের বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়াবে। তখন নফসের বিরুদ্ধে কিছু সময়ের জন্য হলেও তুমি লড়াই করতে পারবে, অন্তত আগের মত অত সহজে পরাস্ত হবে না। তখন দেখবে, প্রতিবারই তুমি আগের চেয়ে বেশী লড়াই করতে পারছো। একসময় দেখবে, নফস তোমার ভিতরের নেকি ও কল্যাণের শক্তির কাছে দু’একবার পরাস্ত হচ্ছে এবং তুমি জয়ী হচ্ছো। তো এ লড়াই সারা জীবন চলতে থাকবে। কখনো নফস জয়ী হবে, কখনো নেকির শক্তি। এভাবে লড়তে লড়তে অবশেষে ইনশাআল্লা নেকির জাযবা এত শক্তিশালী হবে যে, নফস তার সামনে চূড়ান্তভাবে পরাজিত হবে। নফস থেকে তবু সাবধান! কিন্তু আমাদের জীবন হলো নফসের সঙ্গে যুদ্ধের ময়দান। আর একজন যোদ্ধা যুদ্ধে জয়লাভ করার পর উদাসীন হয়ে বসে থাকে না, বরং যুদ্ধের নিত্যনতুন কৌশল ও অস্ত্রচালনা শিখতে থাকে, যাতে আগামী যুদ্ধেও জয়ী হতে পারে। কারণ সে জানে, তার পরাজিত শত্রু বসে নেই। নতুন যুদ্ধের জন্য সে নতুন শক্তি অর্জন করছে। তো তোমার পরাজিত শত্রু নফস ও শয়তান বসে নেই, বরং প্রতিশোধ নেয়ার জন্য নতুন কৌশল ও নতুন শক্তি অর্জন করে চলেছে। সুতরাং তোমারও বসে থাকার সুযোগ নেই। এজন্যই রোমের মাওলানা বলেন- تـا دم آخـر دمى فـارغ مبـاش জীবনের শেষ পর্যন্ত মুহূর্তের জন্য ফারেগ অবস্থায় বসে থেকো না। মোটকথা, যে কোন সময় যে কারো তাওবা ভেঙ্গে যেতে পারে এবং নফস ও শয়তানের মোকাবেলায় পরাস্ত হয়ে সে গোনাহে লিপ্ত হয়ে যেতে পারে। এতে নিরাশ হওয়ার কিছু নেই, বরং নতুন উদ্যমে লড়াই অব্যাহ রাখো এবং যতবার তাওবার ভঙ্গ হবে নতুন মনোবলে আবার তাওবা করো এবং- أستـغفر الله ربي من كل ذنب و أتوب إليه পড়ো। কবি বড় সান্ত্বনার কবিতা বলেছেন- جام مى توبه شكن توبه ميري جام شكن سامنى دهير هين توتى هوى بيمانون كى অর্থাৎ মদের পেয়ালা সামনে আসে, আর তাওবা ভেঙ্গে যায়; আবার তাওবা সামনে আসে, আর মদের পেয়ালা চূর্ণ হয়। আমার সামনে তাই ‘পায়মান’-এর ভগ্নস্তূপ! কবি বড় কুশলতার সঙ্গে ‘পায়মানোঁ’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এটি পায়মান ও পায়মানা, উভয়ের বহুবচন। পায়মান অর্থ ওয়াদা, আর পায়মানা অর্থ পাত্র। সুতরাং পায়মান ও পায়মানা-উভয়েরই ভগ্নসতূপ এখানে উদ্দেশ্য। অর্থাৎ একবার পায়মান ও প্রতিশ্রুতি ভাঙ্গে, একবার পায়মানা ও পানপাত্র ভাঙ্গে। তবে ভাঙ্গাভাঙ্গির এ লড়াই যদি চলতে থাকে তাহলে একসময় পায়মান ও প্রতিশ্রুতিকে আল্লাহ তা‘আলা এত শক্তি দেবেন যে, তখন শুধু পায়মানা ও পানপাত্রই ভাঙ্গবে, পায়মান ও প্রতিশ্রুতি আর ভাঙ্গবে না। তবু তুমি ফিরে এসো হে বান্দা, তোমার মাওলা বড় মেহেরবান। তাওবা ভেঙ্গে গেছে বলে ভয় পেয়ো না এবং নিরাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিয়ো না। আবার তাওবা করো, আবার তাওবা করো; যতবার তাওবা ভাঙ্গে ততবার তাওবা করো এবং নতুন প্রতিজ্ঞা করো। এটাই এ রোগের চিকিৎসা। তোমার দয়ালু মাওলার দরবার তো এমন যে, কবি বলছেন- ‘ফিরে এসো! ফিরে এসো! যেমনই হও তুমি, ফিরে এসো!/ কাফির হও, বা অগ্নিপূজক, কিংবা মূর্তিপূজক, তুমি ফিরে এসো!/ আমার দুয়ার নয় হতাশা ও নিরাশার দুয়ার/শতবার তাওবা ভেঙ্গেছো? ফিরে এসো! দুনিয়ার মুআমালা তো এই যে, একবার, দু’বার, তিনবার হয়ত তোমার অপরাধ মাফ করা হবে, কিন্তু তারপর কান ধরে বের করে দেয়া হবে। কিন্তু এই দুয়ারে বারবার তোমাকে কান ধরে টেনে আনা হবে। নাফরমানির পথে যত দূরেই তুমি চলে যাও তোমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকা হবে যে, একশ বার যদি তাওবা ভেঙ্গে থাকো, আমার কাছে ফিরে এসো, আমি তোমার তাওবা কবুল করবো। মৃত্যুর গরগরা শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত তাওবার দুয়ার খোলা আছে, সুতরাং দুশ্চিন্তার কিছু নেই, বরং চেষ্টা মেহনত জারি রাখতে হবে, তাহলে ইনশাআল্লাহ কামিয়াবি ও সফলতা অর্জিত হবেই হবে। আল্লাহর সঙ্গে কথা বলো আমাদের হযরত ডাক্তার আব্দুল হাই (রাহ) বলতেন, মিয়াঁ, আল্লাহর সঙ্গে এভাবে আব্দার করে কথা বলো, হে আল্লাহ! গোনাহের সায়লাব থেকে আমার তো বেঁচে থাকার শক্তি নেই। সুতরাং আমি আপনার কাছেই সাহায্য চাই। আমার সবকিছু তো আপনারই কুদরতের হাতে। নিজেকে আমি আপনার হাওয়ালা করছি। আপনি আমাকে হেফাযত করুন। পরে কিন্তু আমাকে পাকড়াও করবেন না। তো তোমার মাওলার সঙ্গে তুমি এভাবে অবুঝ শিশুর মত আবদারের কথা বলো। আল্লাহ তা‘আলার সুন্নত এই যে, বান্দার এমন আবদারের দু‘আ তিনি রদ করেন না। হযরত ইউনুস (আ.) থেকে সবক নাও কোরআন শরীফে আল্লাহ তা‘আলা যত ঘটনা বয়ান করেছেন, প্রতিটি ঘটনায় রয়েছে কোন না কোন শিক্ষা। হযরত ইউনুস (আ.)-এর ঘটনায়ও রয়েছে বিরাট শিক্ষা। তিনি মাছের পেটে তিনদিন ছিলেন। সেখানে ছিলো অন্ধকার, আর অন্ধকার। মাছের পেটের সেই অন্ধকারে হযরত ইউনুস (আ.) আল্লাহকে এভাবে ডেকেছেন- لا الـه الا انت سبحنك اني كنت من الظلمين কোন ইলাহ নেই আপনি ছাড়া। আপনি চিরপবিত্র। নিঃসন্দেহে আমি ছিলাম যালিমানের দলে। তখন আল্লাহ তা‘আলা বড় মিষ্টি এক ‘সন্দেশ’ দান করলেন এভাবে- فاستجبنا له و نجينـه من الغم, و كذلك ننجي المؤمنين (যখন সে আমাকে ডাকলো) তখন আমি তার ডাকে সাড়া দিলাম এবং তাকে উদ্ধার করলাম দুর্দশা থেকে। এভাবেই উদ্ধার করবো মুমিনদের। ‘এভাবেই উদ্ধার করবো মুমিনদের’ কথাটির উদ্দেশ্য কী? উদ্দেশ্য এই যে, যখনই তুমি কোন অন্ধকারে ঘেরাও হবে, গোনাহের অন্ধকার, কিংবা পরিবেশ, পরিসি'তির অন্ধকার, কিংবা বিপদ-মুছীবতের অন্ধকার তখন অপরাধ স্বীকার করে অনুতপ্ত হয়ে আমাকে ডাকো- لا اله الا انت سبحنك اني كنت من الظلمين যখন তুমি আমাকে এভাবে ডাকবে তখন ইউনুসকে আমি যেভাবে উদ্ধার করেছিলাম, তোমাকেও সেভাবে উদ্ধার করবো। তো আমরা যে দিনরাত নফস ও নপসানিয়াতের এবং গোনাহ ও নাফরমানির অন্ধকারে ঘেরাও হয়ে আছি তা থেকে উদ্ধার পাওয়ার একমাত্র উপায় হলো আমাদের মাওলাকে সেভাবে ডাকা যেভাবে হযরত ইউনুস (আ.) মাছের পেটের অন্ধকারে ডেকেছিলেন। আমাদের নফস তো তাঁরই সৃষ্টি! আলো ও অন্ধকার এবং খায়র ও শর বা কল্যাণ ও অকল্যাণ তো তাঁরই সৃষ্টি! সুতরাং তাঁকেই ডাকো এবং বলো, হে আল্লাহ আপনিই আমাকে এই সব অন্ধকার থেকে উদ্ধার করুন। তখন তিনি অবশ্যই তোমার ডাক শোনবেন এবং তোমাকে উদ্ধার করবেন। নবীজীর সত্তরবার ইসতিগফার! খোলাছা কথা এই যে, তাওবা এমন জিনিস নয় যে, একবার তাওবা করার পর তা ভেঙ্গে গেলো, আর তুমি নিরাশ হয়ে বসে পড়লে, বরং সারা জীবন তাওবার আমল জারি রাখতে হবে। ভাই, আমার তোমার অস্তিত্বই কী! আমরা তো দিন-রাত গোনাহের গান্দেগিতে ডুবে আছি। স্বয়ং জানাবে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল বলেছেন- ‘আমি আমার প্রতিপালকের কাছে দিনে সত্তরবার ইসতিগফার করি।’ অথচ তিনি তো মা‘ছূম ও নিষ্পাপ। যদিও কোন ভুলত্রুটি থাকতো, সে সম্পর্কেও তো আল্লাহ তা‘আলা আগেই ঘোষণা করেছেন যে, আপনার আগের পিছের সব গোনাহ মাফ! তাসত্ত্বেও তিনি বলছেন, আমি সত্তরবার ইসতিগফার করি! অবশ্য ওলামায়ে কেরাম বলেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইসতিগফারের রহস্য এই যে, প্রতিমুহূর্তে তাঁর দারাজাত বুলন্দ হতো; তাই তিনি যখন পিছনের দিকে তাকাতেন, উচ্চতর দরজার তুলনায় সেটাকেই ত্রুটি মনে হতো, আর সেই ‘ত্রুটি’ থেকে তিনি ইসতিগফার করতেন। সুতরাং আমাদের তো ইসতিগফারেই মগ্ন থাকা উচিত। যখনই গোনাহ হবে, তাওবা করো, ইসতিগফার করো। তাওবা ও ইসতিগফার দ্বারা তুমি যখন নফস ও গোনাহের মোকাবেলা করতে থাকবে তখন আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে এমন শক্তি দান করবেন যে, নফস ও শয়তান তোমার কাছে পরাস্ত হবে এবং কাবু হয়ে যাবে। শর্ত এই যে, তুমি যেন নিরাশ হয়ে হাল ছেড়ে না দাও, বরং মোকাবেলায় অবিচল থাকো। শয়তানের চক্রান্ত দুর্বল কোরআনে করীম ইরশাদ করছে- ان كيد الشيطن كان ضعيفا নিঃসন্দেহে শয়তানের চক্রান্ত দুর্বল এমনিতে তো শয়তানের বড় দাপট, তখন মনে হয়, এর মোকাবেলা করা বড় কঠিন। কিন্তু হাকীকত এই যে, মানুষ একবার যদি শয়তানের সামনে মযবূত হয়ে রুখে দাঁড়ায় তখন তার সমস্ত ‘শর-মকর’ কর্পুর হয়ে যায়। সুতরাং শয়তানকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ব্যস, শুধু বুক চিতিয়ে তার সামনে একবার দাঁড়িয়ে যেতে হবে। শয়তানের প্ররোচনায় যতবারই গোনাহ হয়ে যাবে, তুমি তাওবার মাধ্যমে তোমার মাওলার কাছে ফিরে এসো। শয়তানের কোন মকর-ফেরেব তখন আর কাজে আসবে না। তাওবা মানেই তো ফিরে আসা। অর্থাৎ গোনাহ ও নাফরমানির দ্বারা তুমি পথ থেকে সরে গিয়েছিলে এবং বহু দূরে চলে গিয়েছিলে, তাওবার মাধ্যমে তুমি তোমার মাওলার কাছে আবার ফিরে এসেছো। আল্লাহ তা‘আলা বলছেন, তুমি আমার দিকে ফিরে আসবে তো আমিও তোমার দিকে ফিরে আসবো। অর্থাৎ তুমি তাওবা করবে, আর আমি তোমার তাওবা কবুল করবো। আল্লাহ তা‘আলা আমাকে, আপনাকে এবং সবাইকে ছহীহ তরীকায় তাওবা করার তাওফীক দান করুন, আমীন। و آخر دعوانا ان الحمد لله رب العلمين ভাষান্তর : আমাতুল্লাহ তাসনীম

 

advertisement