রবিউল আউয়াল-রবিউস সানী ১৪৩৭   ||   জানুয়ারি ২০১৬

তুর পাহাড়ে এক সন্ধ্যা

মুহাম্মদ হাবীবুর রহমান

একদিন এক সহপাঠী ফোন করলেন, হাল পুরসির পর বললেন, মদিনাতুল বুউস থেকে ইত্তেহাদে নাইযিরিয়া (নাইযিরিয়ান ছাত্রদের সংগঠন)-এর পক্ষ হতে একটি রিহলা (শিক্ষাসফর) হতে পারে।  জিজ্ঞাসা করলাম রিহলা কোথায়? তিনি বললেন, ‘তুরে সাইনা। নামটি শোনামাত্র আমার ভিতরে এক অদ্ভত কম্পন সৃষ্টি হলো। জিজ্ঞাসা করলাম, বাংলাদেশী ছাত্র ভাইরা যাচ্ছেন? তিনি বললেন হাঁ। আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি যাচ্ছেন? তিনি বললেন ইনশাআল্লাহ। কোনো পরামর্শ ছাড়াই বেইখতিয়ার বলে ফেললাম, যদি কোনো সুযোগ থাকে তাহলে আমাকে জানাবেন। তিনি বললেন, ঠিক আছে। সফরের একদিন আগে এশার পর মদিনাতুল বুউসের মাযহার ভাই ফোন করলেন এবং কোনো ভূমিকা ছাড়াই বললেন, আপনি কি সফরের জন্য প্রস্তুত? আমিও বলে ফেললাম- ইনশাআল্লাহ।

বাড়িতে ফোন করে আম্মা-আব্বার কাছ থেকে দুআ চাইলাম। তারা শুনে খুশি হলেন এবং সফর কামিয়াব হওয়ার জন্য অনেক দুআ করলেন। এরপর আমার উস্তাযে মুহতারাম ও রাহবার, যাকে দীর্ঘ পাঁচ বছর কাছ থেকে দেখার এবং নিজের অযোগ্যতা সত্তে¡ও সামান্য হলেও খেদমত করার সৌভাগ্য হয়েছে। তাঁর থেকেও দুআ চাইলাম। তিনিও আমার জন্য দুআ করলেন এবং আমাকেও দুআ করতে বললেন।

আমাদের সফর শুরু হওয়ার নির্ধারিত সময় ছিল, ২৩-১০-২০১৪ তারিখ বৃহস্পতিবার বিকাল তিনটায়। গাড়ি ছাড়বে আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কলারশিপপ্রাপ্ত বিদেশী ছাত্রদের ছাত্রাবাস, ‘মদিনাতুল বুউসথেকে। সফরের পূর্বে যারা আগে এই পুণ্যভূমি যিয়ারত করেছেন, তাদের থেকে পরামর্শ নিলাম কী কী সাথে নেওয়া যায়। তারা বললেন, বেশি করে পানি, ফল ও  ফলের জুস সাথে নিবেন এবং শীতের পোশাক ও জুতা নেওয়ার কথাও বললেন। তাদের পরামর্শে সেভাবেই প্রস্তুতি নিলাম। এরপর আল্লাহর উপর ভরসা করে দুই রাকাত নামায আদায় করে একটু আগেভাগেই  মদিনাতুল বুউসের উদ্দেশ্যে বের হলাম।

আশরাফ ভাইয়ের কথামত তার রুমে অপেক্ষা করতে থাকলাম। তিনটা গড়িয়ে এক সময় পাঁচটা বেজে গেলো। এখনও গাড়ির কোনো খবর পেলাম না। হঠাৎ সাড়ে পাঁচটার দিকে আসেম ভাই ফোন করলেন, কী ভাই সফরে যাবেন না? গাড়ি তো ছেড়ে দিল। তার কথা শুনে আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম। বলে কী! বুউসের গেটে উপস্থিত হলাম। দেখি কেবল দুইটা গাড়ি এসেছে, এখনো তিনটা গাড়ি পথে আছে। আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া আদায় করলাম। সেই প্রাচীন কাল থেকেই মিসর সৌন্দর্য্যরে লীলাভূমি হিসাবে স্বীকৃত। যুগে যুগে দর্শনার্থীদের বিচরণভূমি হিসাবে পরিচিত। বর্তমানে পর্যটন খাতটি মিসরের অর্থনীতি সচল রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তাই এখানে পর্যটকদের সব ধরনের সুব্যবস্থা রয়েছে। পর্যটন বাসগুলো দেখে আমার তাই মনে হল।

বাসে বসলাম। আমরা অনেক দেশের ছাত্ররা একসাথে সফরে যাচ্ছি। বাংলাদেশী, ভারতীয়, সিরিয়ান, নাইযিরিয়ান ও আফ্রিকার অন্যান্য দেশের ছাত্ররা রয়েছে। আমরা বাংলাদেশী ছিলাম বারোজন। বাকিরা ছিল অন্যান্য দেশের। সর্বমোট পাঁচশজনের আমাদের এই সফর-যাত্রা।

সবাই আরবী ভাষা জানলেও প্রত্যেকে নিজ নিজ দেশের ভাষায় কথা বলছে। এটাই স্বাভাবিক। নাইজেরিয়ানদের আমির সাহেবকে মনে হল খাঁটি মাটির মানুষ। ব্যবহার মাধুর্যতায় আমাদেরকে মুগ্ধ করে ফেললেন। আমার মনে হল, এই গোত্র ও ভাষার বিভিন্নতা মানুষকে আরো কাছে টেনে নেয়। তাইতো মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, (তরজমা) হে মানব সম্প্রদায়, আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা একে অন্যকে চিনতে পার।  প্রকৃতপক্ষে তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সর্বাপেক্ষা বেশি মর্যাদাবান সেই, যে আল্লাহ তাআলাকে বেশি ভয় করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা সবকিছু জানেন, সবকিছু সম্পর্কে অবহিত।-সূরা হুজুরাত (৪৯) : ১৩

কায়রো থেকে তুরে সাইনা যাওয়ার দুইটা পথ। একটা পথ হল সোজা। সোজা পথটির দূরত্ব কায়রো থেকে তুরে সাইনা ৪৩০ কিলোমিটার। কিন্তু নিরাপত্তার কারণে এটা এখন বন্ধ আছে। অন্যটি হল, প্রথমে কায়রো থেকে শারমুশ শাইখ ৫৩৫ কিলোমিটার। শারমুশ শাইখ থেকে তুরে সাইনা ২০৫ কিলোমিটার। মোট ৭৪০ কিলোমিটার। গাড়ি ছাড়ার পর থেকে আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দুআ করতে থাকলাম, হে আল্লাহ! তুমি সফরকে সহজ করে দাও। তুমি যেটা পছন্দ কর সফর যেন সেই উদ্দেশ্যে হয়। এভাবে হাদীসে বর্ণিত বিভিন্ন দুআ করছি এবং সাথে সাথে মূসা আলাইহিস সালামের সম্পর্কে কুরআনে যে আয়াতগুলো নাযিল হয়েছে তাও পড়ছি এবং চিন্তা ভাবনা করছি।

কুরআনে মূসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে অনেক আলোচনা করা হয়েছে। অনেক উপমা ও বিভিন্ন আঙ্গিকে তাঁর ঘটনা বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। যাতে মানুষ এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।

একটি আয়াত- (তরজমা) মূসা যখন মেয়াদ পূর্ণ করল এবং নিজ স্ত্রীকে নিয়ে রওয়ানা হয়ে গেল, তখন সে তুর পাহড়ের দিকে এক আগুন দেখতে পেল। সে নিজ পরিবারবর্গকে বলল, তোমরা অপেক্ষা কর। আমি এক আগুন দেখেছি, হয়ত আমি সেখান থেকে তোমাদের কাছে আনতে পারব কোনো সংবাদ অথবা আগুনের একটা জ্বলন্ত কাঠ, যাতে তোমরা উত্তাপ গ্রহণ করতে পার। সুতরাং সে যখন আগুনের কাছে পৌঁছল, তখন ডান উপত্যকার কিনারায় অবস্থিত বরকতপূর্ণ ভূমির একটি বৃক্ষ থেকে ডাকা হল, হে মূসা! আমিই আল্লাহ, জগৎসমূহের প্রতিপালক।  -সূরা কাসাস (২৮) ২৯-৩০

এই পাহাড়েই মূসা আলাইহিস সালাম তাওরাত লাভ করেছিলেন। মহান আল্লাহ তাআলা সূরা আরাফে তা  উল্লেখ করেছেন- (তরজমা) আমি মূসার জন্য ত্রিশ রাতের মেয়াদ স্থির করেছিলাম (যে, এ রাতসমূহে তুর পাহাড়ে এসে ইতিকাফ করবে)। তারপর আরও দশ রাত বৃদ্ধি করে তা পূর্ণ করি। এভাবে তার প্রতিপালকের নির্ধারিত মেয়াদ চল্লিশ দিন হয়ে গেল এবং মূসা তার ভাই হারুনকে বলল, আমার অনুপস্থিতিতে তুমি সম্প্রদায়ের মধ্যে আমার প্রতিনিধিত্ব করবে, সবকিছু ঠিকঠাক রাখবে এবং অশান্তি সৃষ্টিকারীদের অনুসরণ করবে না। মূসা যখন আমার নির্ধারিত সময়ে এসে পৌঁছল এবং তার প্রতিপালক তাঁর সাথে কথা বললেন, তখন সে বলল, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে দর্শন দিন আমি আপনাকে দেখব। তিনি বললেন, তুমি আমাকে কিছুতেই দেখতে পাবে না। তুমি বরং পাহাড়ের প্রতি দৃষ্টিপাত কর। তা যদি আপন স্থানে স্থির থাকে, তবে তুমি আমাকে দেখতে পারবে। অতপর যখন তার প্রতিপালক পাহাড়ে তাজাল্লী ফেললেন ( জ্যোতি প্রকাশ করলেন) তখন তা পাহাড়কে চূর্ণ-বিচর্ণ করে ফেলল এবং মূসা সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে গেল। পরে যখন তার সংজ্ঞা ফিরে আসল, তখন সে বলল, আপনার সত্তা পবিত্র। আমি আপনার দরবারে তওবা করছি এবং (দুনিয়ায় কেউ আপনাকে দেখতে সক্ষম নয়- এ বিষয়ের প্রতি) আমি সবার আগে ঈমান আনছি। -সূরা আরাফ (৭) : ১৪২-১৪৩

গাড়ি রাতের অন্ধকারে শোঁ শোঁ করে সামনের দিকে ছুটে চলেছে। জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরের পরিবেশটা উপভোগ করতে চেষ্টা করলাম।

একসময়  গাড়ি আমাদের নিয়ে প্রসিদ্ধ সুয়েজ ক্যানেলের কাছে পৌঁছল। গাড়ির দায়িত্বশীল আমাদেরকে জানালেন যে, এটাই সেই প্রসিদ্ধ সুড়ঙ্গ পথ। এই সুড়ঙ্গ পথটির নামকরণ করা হয়েছে শহীদ আহমদ হামদীর নামে। এই ব্যক্তি মিসরের তৎকালীন সেনাবাহিনীর একজন কর্ণেল ছিলেন। ১৯৭৩ সালে মিসর ও ইসরাঈলের সাথে যে যুদ্ধ হয়েছিল, তাতে তিনি শহীদ হন। যুদ্ধে শহীদ আহমাদ হামদীর বীরত্বপূর্ণ ভমিকার স্মৃতি স্বরূপ তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদাত এর নামকরণ করেন শহীদ আহমাদ হামদী ক্যানেল। আফ্রিকা ও এশিয়া সংযোগ স্থাপনকারী এই সুড়ঙ্গটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ইসরাঈলের সাথে শান্তি প্রক্রিয়া চালু হলে । এটা সুয়েজ খালের তলদেশ দিয়ে অতিক্রমের দ্বিতীয় পথ। কায়রো থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এই সুড়ঙ্গ পথটি সাইনা উপদ্বীপের সাথে সুয়েজ শহরসহ মিসরের বাকি অংশের সাথে সংযোগ সৃষ্টি করেছে। প্রতিদিন প্রায় বিশ হাজারেরও অধিক গাড়ি পার হয় এই সুড়ঙ্গ পথ দিয়ে। এটা নির্মাণের অন্যতম উদ্দেশ্য হল পর্যটন বিকাশ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। নির্মাণে ইউরোপীয় দেশগুলো অংশ নেয়। একটি বৃটিশ কোম্পানীর পরিকল্পনা মোতাবেক আরব ঠিকাদার কোম্পানি এর নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করে। সুড়ঙ্গ পথটি চালু করার পর ফাটল দেখা দিলে জাপানের এক কোম্পানীর মাধ্যমে তা মেরামত করা হয়। সুড়ঙ্গ পথটি লম্বায় ৫৯১২ মিটার। পশ্চিমের অনুপ্রবেশদ্বার থেকে ১৯৮৪ মিটার, মাঝখানে ১৬৪০ মিটার। এই সুড়ঙ্গটা অনেক সুন্দর। এটা দেখার জন্য অনেক পর্যটক আসে। আমরা মাত্র কয়েক মিনিট  চলন্ত গাড়ি থেকে দেখেছি।

আমাদের বাসে এক সিরিয়ান ভাই ছিলেন। একেবারে সাদাসিধে। কারোর সাথে কোন কথাবার্তা নেই, চুপচাপ থাকছেন। হয়ত সাথে নিজের দেশের কেউ নেই, তাই সংকোচবোধ করছেন, অথবা স্বদেশ ভূমিতে যে ধ্বংসলীলা ও হত্যা  চলছে তাতে তার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। জানা নেই, মানবতা কবে মুক্তি পাবে এই অন্যায় জুলুম - নির্যাতনের শিকল থেকে? হে আল্লাহ সেই সুন্দর দিনটির আশায় বুক বেঁধে আছি, যে দিন সকল মজলুমের ঠোঁটে বিজয়ের হাসি দেখতে পাব।  এক যাত্রাবিরতিতে সে গাড়ি থেকে  নেমে হাম্মামে গেল, এদিকে গাড়ি ছাড়ার সময় হয়ে গেছে। গাড়ি ছেড়ে দিলো। আমরা আওয়াজ দিলাম। এক ভাই রয়ে গেছেন। আমাদের আওয়াজ শুনে চালক সাহেব তাড়াতাড়ি গাড়ি থামালেন। কিন্তু তখনও তার কোন দেখা নেই। চালক সাহেব একটু বিরক্ত হয়ে আবার গাড়ি ছেড়ে দিলেন তখনই আমি একটু দূরে তাকে দেখতে পেলাম। সাথে সাথে উঁচু আওয়াজে বললাম, ঐ যে সিরিয়ান ভাইকে দেখা গেছে। চালক সাহেব খুব  জোরে ব্রেক কষলেন। গাড়ি থামলো এবং তাকে গিয়ে নিয়ে আসা হলো। আমরা তাকে বললাম, আপনার সাথীসঈী কেউ নেই? মোবাইল নাম্বার থাকলে আমাদের দিন, যাতে কোন সমস্যা হলে যোগাযোগ করতে পারি। তিনি বললেন, আমার কাছে মোবাইল নেই। মোবাইল নেই শুনে আশ্চর্য হলেও ভালো লাগল। বিনীত কন্ঠে অনুরোধ করলাম গাড়ী ছাড়ার সময়টা একটু খেয়াল করবেন।

প্রত্যেকবার গাড়ি ছাড়ার সময় নতুন করে সফরের দুআগুলো পড়ে নিচ্ছি। আমার মনে হল, এক সফরে কয়েকটি সফর করছি। আর হায়াত মউতের সময়তো কারো জানা নেই। তাই প্রত্যেকবার নতুন করে মউতের প্রস্তুতি নেওয়ার চেষ্টা করছি।

মুসাফিরের দিল থাকে কোমল, চোখ থাকে সজল, আর কোমল অন্তর ও সজল চোখ আল্লাহর প্রিয়।

সূর্যোদয়ের কিছুক্ষণ আগে আমাদের গাড়ি শারমুশ শাইখ শহরের একটি চেকপোস্টের কাছে থামলো। আমরা খুব তাড়াতাড়ি ওজু করে ফজরের নামায পড়ে নিলাম। এই শহরটি সম্পর্কে অনেক কিছু লেখা যায়। শুধু এতটুকুই বলি, এই শহরটা পৃথিবীর চতুর্থতম সুন্দর শহর হিসাবে গণ্য। খুব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। এখানে বাহরুল আহমার নামক সমুদ্র সৈকত(সী বিচ) আছে। অনেক পর্যটক এখানে ঘুরতে আসে। অবসর সময় যাপন করে। যতই সুন্দর হোক ওটা এখন গোনাহের আখড়া হয়ে গেছে।

আমাদের গাড়ি শরমুশ শাইখ শহরকে ডানে রেখে বাম দিকে তুরে সাইনার দিকে অগ্রসর হলো। একটু একটু করে শেষ রাতের ছায়া বিদায় নিচ্ছিল। আর সকালের স্নিগ্ধ আলো আজনবী মুসাফিরদের স্বাগত জানাচ্ছিলো। গাড়ি তুরে সাইনা পৌঁছতে এখনও অনেক বাকি। গাড়ি যতই তুরে সাইনার নিকটবর্তী হচ্ছে ততই আমি আল্লাহর নিআমত অবলোকন করছি। একদিকে আল বাহরুল আহমার। তার অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করছি আর মনে মনে চিন্তা করছি, এই সেই সমুদ্র যাতে মহান আল্লাহ তাআলা তার দুশমনকে চুবিয়ে মেরেছেন এবং তার প্রিয় বান্দাদের বাঁচিয়েছেন। কুরআনে তা বর্ণিত হয়েছে এভাবে- আমি মূসা ও তার সাথে যারা ছিল সকলকে রক্ষা করেছি। অতপর অন্যদের ডুবিয়ে মেরেছি।

আসলে আল্লাহর কুদরতের সামনে দুনিয়ার সব শক্তিই তুচ্ছ। তারপরও মানুষ এই নিদর্শন থেকে কেন শিক্ষা গ্রহণ করে না? কোথায় সেই দাম্ভিক ফেরাউন ও তার বিশাল সৈন্য বাহিনী? আল্লাহর এক ইশারাতেই মুহূর্তের মধ্যে তাদের সলিল সমাধি হয়েছে। এই সেই সমুদ্র, যুগ যুগ ধরে সেই সত্যের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। বাস যত সামনে অগ্রসর হতে লাগলো মনে হলো পাহাড়ের বেষ্টনি থেকে বের হওয়ার জন্য আমরা পথ খুঁজছি। পাহাড়ের পর পাহাড়। উঁচু-নিচু, ছোট-বড়, রং বেরংয়ের পাহাড়। হঠাৎ  দুদিকে কাটা খাড়া পাহাড় দেখে গা ছমছম করে ওঠে। বিরাট বিরাট পাথরখণ্ড পাহাড়ের গায়ে এমন ভাবে লেগে রয়েছে, যেন একটু নাড়া খেলেই গাড়ীর উপর এসে আছড়ে পড়বে এবং যাত্রীশুদ্ধ গাড়ী দুমড়ে মুচড়ে দিবে।

পথের দূরত্ব যত কমে আসছে মনের ব্যাকুলতা তত বেড়ে চলেছে। এ কি স্বপ্ন! এ কি সত্যি! আবারো পাহাড়ের সৌন্দর্য অবলোকন করতে থাকলাম। মনের মাঝে এক আশ্চর্য অনুভূতি হচ্ছিল এই সকল পাহাড় পর্বতে কত নবীদের আগমন ঘটেছে তার কোনো হিসাব নেই।

আমার জানা ছিলো হযরত হারুন আলাহিস সালামের কবর এদিকে কোনো এক জায়গায়। তাই আমি সকাল থেকে জানালার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে ছিলাম। গাড়ি যখন দেড়টার দিকে তুরে সাইনার কাছে চলে আসলো তখনই আমি সর্বপ্রথম দেখতে পেলাম হারুন আলাইহিস সালামের কবর। আনন্দে উচ্চস্বরে সবাইকে বলতে লাগলাম। ঐযে হযরত হারুন আলাইহিস সালামের কবর। আমার কথারই সত্যায়ন করলো রাস্তার পাশের একটি কাষ্ঠফলক। যাতে আরবীতে লেখা ছিল "قبر سيدنا هارون"আল্লাহ তাআলার অশেষ শুকরিয়া আদায় করলাম। মনে মনে বললাম ইনশাআল্লাহ অতি শীঘ্রই-ই যিয়ারত করবো। কিছুক্ষণ পরই গাড়ি তুর পাহাড়ের পাদদেশে এসে থামলো। আমরা সবাই আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া আদায় করলাম। দীর্ঘ পনেরো ঘণ্টা বাসে কাটিয়ে অবশেষে তুরে সাইনায় পৌঁছলাম। আমরা যার যার মত প্রস্তুতি নিয়ে বাস থেকে নেমে পড়লাম এবং যোহরের নামায আদায় করলাম। আমি বললাম, প্রথমে আমরা হারুন আলাইহিস সালামের কবর যিয়ারত করি। কিন্তু ফয়সালা হলো আগে তুরে সাইনায় উঠবো। সেখান থেকে ফিরে এসে যিয়ারত করব।

তুর পাহাড়ের কাছাকাছি কয়েকটি পাহাড় আছে। তার মধ্যে একটি পাহাড়ের নাম সানত কার্তিন। এই পাহাড়টি দক্ষিণ সাইনা জেলায় অবস্থিত এবং মিসরের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়। এই পাহাড়টি মূসা আলাইহিস সালামের পাহাড়ের সাথে একেবারে লাগানো। খ্রিস্টানরা এটাকে মহা পবিত্র স্থান মনে করে। তাই পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকে খ্রিস্টান পর্যটকরা এই পাহাড় যিয়ারত করতে ছুটে আসে। পাহাড়টি মূলত খ্রিস্টান সন্ন্যাসীদের আবাসস্থল ছিল। বড় বড় ধর্মযাজকরা এখানে এসে বসবাস করত। যার ফলে খ্রিস্টানদের কাছে এটার গুরুত্ব অনেক বেশি। এর উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৬০০ মিটার। এই পাহাড়টি দেখতে অনেক সুন্দর। সোনালি রংয়ের।

তুর পাহাড় দক্ষিণ সাইনা জেলায় অবস্থিত। সাইনার মূল শহরের নাম আত তুর। বড় শহর হলো শারমুশ শাইখ। জনসংখ্যা ১৭৭৯০০। এই পাহাড়ের উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২২৮৫ মিটার। এই পাহাড়কে জাবালে মূসা নামে নামকরণ করা হয়েছে।

সাইনা অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি জেলা এবং এই এলাকার নাম কুরআন মাজীদে উল্লেখ হয়েছে। এই পাহাড়ি এলাকায় এক প্রকার গাছ হয় যা থেকে তেল তৈরি হয়। সাইনা নবীদের বরকতময় ভূমি। এই এলাকায় অনেক নবী রাসূলের আগমন ঘটেছে। এখানে রয়েছে সেই ঐতিহাসিক জাবালে মূসা’, অনেক নবীদের কবর, বনী ইসরাঈলের তীহ নামক ময়দান। আরো অনেক ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে এই মাটি ও পাহাড় সম্পৃক্ত। সুতরাং এই ভূমির বরকত ও নিআমত কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে ইনশাআল্লাহ। এলাকাটি মিসরবাসী ও  মিসর সরকারের কাছে বরং পুরো মুসলিম উম্মাহর কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা। ইসরাঈল সবসময় এটা দখল করতে চায়, যে কোনো মূল্যে। যার ফলে অনেক সময় হামলা করে বসে এবং বিভিন্ন গ্রæপও এই এলাকাটা দখল করার জন্য বিভিন্ন সময় সেনাবাহিনীর উপর হামলা করে থাকে।  অনেক সেনাও এতে হতাহত হয়। আমরা রাতে ফেরার সময় এক সেনা চৌকিতে হামলা হয়েছিল এবং এতে ৩২জন সেনা মারা যায়। যার কারণে মিসর সরকার তিন মাসের জন্য সকল ধরনের সফর বন্ধ ঘোষণা করেছিল।

যুগ যুগ ধরে সাইনার  ভৌগলিক অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এটা এশিয়া মহাদেশ ও আফ্রিকা মহাদেশের একমাত্র স্থলভাগ যেখানে দুটি মহাদেশ পাশাপাশি মিলিত হয়েছে।

প্রাচীন কাল থেকেই মিশর ও গোটা আফ্রিকার মানুষ হিজায, প্রাচীন রোম ও পারস্যের সাথে স্থল যোগাযোগের জন্য সাইনা উপত্যকা ব্যবহার করত। আকাশ ও সমুদ্রপথে যোগাযোগ সহজ হওয়ার আগে এই সাইনাই ছিল গোটা আফ্রিকা ও এশিয়ার বাণিজ্যিক,  কূটনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আদান প্রদানের গুরুত্বপূর্ণ পথ।

৬৪০ খ্রিস্টাব্দে আমর বিন আছ রা.-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনীও এই সাইনা হয়েই মিশরে আসে এবং ওখানেই বাইজেন্টাইনদের প্রতিরোধের মোকাবেলা করে। দ্বাদশ শতকের ক্রুসেড বাহিনীর সাথেও মিসরের আইয়ুবিদের সাথে অনেক যুদ্ধ হয় এই সাইনাতে।

১১৮৭ সালে যে ঐতিহাসিক হিট্টিনের যুদ্ধে সালাহউদ্দিন আইয়ুবির নেতৃত্বে মুসলিমবাহিনী কর্তৃক ক্রুসেডারদের পরাজয় ঘটে, সে হিট্টিনও ঐতিহাসিক সাইনার অংশ, যা বর্তমানে ফিলিস্তিনের অংশ। ত্রয়োদশ শতকের মাঝামাঝি ১২৬০ ঈ. মিসরের মামলুকি আমলে তাতারিদের সাথে যে ঐতিহাসিক আইন জালুত যুদ্ধ হয় তাও এই সাইনাতে।

এভাবে সব যুগের সাম্রারাজ্যবাদীদের লোলুপ দৃষ্টি থাকত এই সাইনার দিকে। এখানে অধিকার বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা নিয়ে অনেক যুদ্ধ হয়েছে। আধুনিককালের অন্যতম যুদ্ধ হল মিসর-ইসরাঈল যুদ্ধ। ১৯৬৭ সালে সুয়েজখাল পর্যন্ত গোটা সাইনা অঞ্চল মিশর থেকে ইইসরাঈল ছিনিয়ে নিয়েছিল। পরে ১৯৭৩ সালের ৬ অক্টোবর এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে মিশর তা পুনরুদ্ধার করে।

আর আধুনিককালে সাইনা উপদ্বীপের বুক চিরে সুয়েজখাল খনন করে ভুমধ্যসাগর ও লোহিত সাগরের মাঝে সংযোগ ঘটানোর ফলে আন্তর্জাতিক সমুদ্র যোগাযোগে যে গতি এসেছে তাও ভৌগোলিক দিক থেকে সাইনার গুরুত্ব অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই সাইনা হলো ইসলাম ও প্রাগ-ইসলামিক যুগ থেকেই মিশর ও আফ্রিকার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল।

যাক আগের কথায় ফিরে আসি। তুর পাহাড়! কী মধুর অনুভূতি। যখন তুর সম্পর্কিত আয়াতগুলোর তরজমা বুঝতে পেরেছি, তখন থেকেই তুর পাহাড়ের প্রতি এক অজানা মহব্বত তৈরি হয়েছে। এই সেই তুর পাহাড় যার কথা কুরআনে কয়েক জায়গায় এসেছে। (তরজমা) এ কিতাবে মূসার বৃত্তান্তও বিবৃত কর। নিশ্চয়ই সে ছিল আল্লাহর মনোনীত বান্দা এবং (তাঁর) রাসূল ও নবী। আমি তাকে তুর পাহাড়ের ডান দিক থেকে ডাক দিলাম এবং তাকে আমার অন্তরঙ্গরূপে নৈকট্য দান করলাম। আর আমি তার ভাই হারুনকে নবী বানিয়ে নিজ রহমতে তাকে (একজন সাহায্যকারী) দান করলাম। -সূরা মারইয়াম (১৯) ৫১-৫৩ 

অতপর আমরা সবাই সেই পবিত্র উপত্যকার দিকে রওনা হলাম। মনের মাঝে তোলপাড় সৃষ্টি হলো। মহান আল্লাহ তাআলার দরবারে বললাম, হে আল্লাহ! তুমি তো জান আমি কত গুনাহগার। তুমি আমাকে পবিত্র করে দিও।

আবারো কুরআনে মূসা আলাইহিস সালাম সর্ম্পকে এই পাহাড় নিয়ে যে আয়াতগুলো নাযিল হয়েছে তা স্মরণ করছিলাম। কিছুদূর হাঁটার পর সেই বরকতময় গাছের কাছে এসে গেলাম। যে গাছের কাছে মহান আল্লাহ তাআলার সাথে মূসা আলাইহিস সালাম কথা বলেছিলেন এবং যে গাছের কথা আল্লাহ তাআলা কুরআনে উল্লেখ করেছেন।

একদিন জামেয়া আযহারে আমাদের দরসে এক ডক্টর এই গাছ সম্পর্কে বলেছিলেন যে, আমি নিজে এই গাছের কাছে গিয়েছি এবং দেখেছি, তার পাতা ধরেছি। আমার কাছে মনে হয়েছে পাতা থেকে নূর বের হচ্ছে। গাছটি অনেক অনেক সুন্দর। হাজার হাজার বছর ধরে এভাবে গাছটা বেঁচে আছে। এটা আল্লাহ তাআলার অনেক বড় কুদরত। এই বরকতপূর্ণ গাছ দুনিয়ার অন্য কোথাও পাওয়া যাবে না এবং এর পাতা কখনো মরে না। সেখানে লেখা আছে এই গাছের পাতা ছেঁড়া নিষেধ। গাছটা আমাদের দেশের লতা গাছের মত। এ জন্যই তো এই গাছটার নাম আশশাজারাতুল উল্লিকা অর্থাৎ ঝুলন্ত গাছ। গাছটা এখন একটি গির্জার মধ্যে। সেখানে নিচের দিকে দেয়াল দিয়ে বেষ্টনী করে রাখা হয়েছে। গির্জা বন্ধ ছিল, ফলে ঐ বৃক্ষটি দেখা সম্ভব হয়নি! আফসোস করছিলাম আর বলছিলাম এই গাছ কতই না সৌভাগ্যশালী। যেখানে মহান আল্লাহ তাআলা মূসা আলাইহিস সালামকে ডেকেছেন এবং কথা বলেছেন। এই গাছ ও স্থান কতই না বরকতময় এর ধুলিকণা কতই না দামী?

মনের মধ্যে আল্লাহর বড়ত্ব ও আযমতের কথা স্বরণ করে এবং নিজের আবদিয়াত ও দাসত্বের অনুভূতি অন্তরে জাগরুক রেখে, তুর পাহাড়ে আরোহণের জন্য হাঁটতে থাকলাম। রাস্তার পাশেই বেশ কিছু উট দেখতে পেলাম। উট চালকরা তাদের উটকে টুরিস্টদের কাছে ভাড়া দেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। উটে আরোহণ করে পাহাড়ের একটা নির্দিষ্ট জায়গায় ওঠা যায়। সেই পর্যন্ত ওঠার ভাড়া মিসরীয় একশ পাউন্ড। এরপর সেখান থেকে পায়ে হেটে পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছতে আরো প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা সময় লাগে।

এই পাহাড় সম্পর্কে যত আয়াত নাযিল হয়েছে তা স্মরণ করতে করতে উঠতে থাকলাম। যতই উপরের দিকে উঠছি ততই আল্লাহ তাআলার নিআমতের সৌন্দর্য অবলোকন করছি। আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া আদায় করছি। জীবনে আগে কখনো পাথরের পাহাড়ে উঠিনি। আমাদের দেশের মাটির পাহাড়ে ওঠার সৌভাগ্য হয়েছে। তাতে রয়েছে সবুজ রংয়ের বাহার। পক্ষান্তরে পাথরের পাহাড়ে রয়েছে বিভিন্ন রংয়ের মেলা। বড় বড় পাথর কী চমৎকার সাজে সজ্জিত। মহান আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি কত সুন্দর! আসলে আল্লাহর কুদরত নিয়ে তেমন ভাবা হয় না। যার ফলে আমাদের মাঝে ঈমানের দুর্বলতা সৃষ্টি হয়। এজন্যই তো মহান আল্লাহ তাআলা সৃষ্টি সর্ম্পকে বলেছেন, তোমরা পাহাড়ের দিকে তাকাও। কীভাবে তা নিপুণভাবে স্থাপন করা হয়েছে।

পাহাড়ের চূড়ায় উঠার জন্য পাথর কেটে কেটে ছোট করে রাস্তা বানানো হয়েছে। এই রাস্তা ছাড়া বেয়ে উপরে ওঠা খুবই কঠিন। রাস্তা অনেক ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে করা হয়েছে। এতে পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে অনেক সময় লাগবে এবং রাত হয়ে যাবে। তাই আমি ভাবছি সংক্ষেপে কীভাবে উঠা যায় । ইতিমধ্যে দেখি নাইযিরিয়ানরা সংক্ষেপে সুন্দর করে পাহাড় বেয়ে উপরে উঠে যাচ্ছে। আমি তখন ঔ পথ ধরে উঠতে থাকলাম। দেখাদেখি আমাদের অনেক সাথী ভাইরা এপথে উঠতে লাগলেন। আল্লাহর কাছে কাকুতি মিনতি করে খুব দুআ করছি আর উপরের দিকে উঠে যাচ্ছি। এক জায়গায় উঠে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করছি, এমতাবস্থায়  নিচের দিকে  তাকিয়ে দেখি এক নাইযিরিয়ান মহিলা উপরের দিকে উঠছে। সে যখন আমাদের কাছাকাছি চলে এলো তখন দেখি মহিলাটি খুব হাঁপাচ্ছে। তাড়াতাড়ি করে আমি তার কাছে গিয়ে একটি জুসের প্যাকেট দিয়ে বললাম, পান করুন, ইনশাআল্লাহ ক্লান্তি দূর হয়ে যাবে। তিনি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে জুসটা নিলেন এবং পান করে তৃপ্ত হলেন। আমার হৃদয়ে তখন অন্য রকম অনুভূতি জাগরুক হলো। মনে মনে বললাম এক পিপাসার্ত মুসলিম নারীকে পবিত্রস্থানে, সামান্য হলেও পিপাসা নিবারণের ওসিলায় মহান আল্লাহর কাছে এই আশা তো করতে পারি, তিনি আমাকে ক্ষমা করে দিবেন। হে আল্লাহ! তুমি আমাকে এবং সফরের সবাইকে ক্ষমা করে দাও। আমাদেরকে তোমার মাকবুল বান্দা হিসাবে কবুল কর।

আসরের নামাযের সময় হল। আমরা বড় একটা পাথরের উপর জামাতের সাথে নামায আদায় করলাম। জীবনে এই প্রথম পাথরের উপর নামায পড়লাম। অনেক ভালো লাগল। আমরা পাহাড়ের পথ বেয়ে উপরে উঠতে থাকলাম। পথ যেন শেষ হয় না। হঠাৎ দেখি, আমাদের বাসে যে সিরিয়ান ভাই ছিলেন সে আমাদের পিছনে পিছনে আসছে। আমাদের এক সাথী বললেন, সে ভুলে প্রথমে অন্য এক পাহাড়ে উঠেছিলো পরে সেখান থেকে নেমে আবার তুর পাহাড়ে ওঠা শুরু করেছে এবং অনেক তাড়াতাড়ি সে আমাদের কাছে চলে এসেছে। এক ভাই মজা করে বললেন, মনে হয় জিন হবে। কেননা যেখানে আমরা এক পাহাড়ে উঠতে হাঁপিয়ে যাচ্ছি সেখানে সে অনায়াসে এক পাহাড়ে উঠে, আবার  সেখান থেকে নেমে আমাদের কাছে চলে এসেছে। চোখে মুখে কøান্তির কোনো ছাপ নেই। আমি বললাম, মনে হয় তিনি মুজাহিদ হবেন। মুজাহিদরা এভাবে কষ্ট করতে পারে। আর সিরিয়ানরা এমনিতেও অনেক মেহনত ও মুজাহাদা করতে পারে। তাকে জিজ্ঞাসা করলাম। আপনি কেন খালি পায়ে উঠছেন? তিনি উত্তর দিলেন, কুরআনের সেই আয়াত পাঠ করে, যাতে মহান আল্লাহ তাআলা মূসা আলাইহিস সালামকে বলেছিলেন, আপনি আপনার জুতাদ্বয় খুলে ফেলুন। নিশ্চয় আপনি তুওয়া নামক পবিত্র ভূমিতে অবস্থান করছেন। তার উত্তর শোনার পর আমার কাছে নিজেকে অপারাধী মনে হল। এই ব্যক্তি পাহাড়ে উঠছে আমিও উঠছি। তার ঈমান কত মজবুত আর আমার ঈমান কত দুর্বল। আমি দেখলাম তার পায়ের নিচে ফেটে গেছে। তারপরও সে আমাদের আগেই পাহাড়ের চূড়ায় উঠেছে। তার ঈমানী মজবুতি দেখে আমার মনে হলো আমিতো দুর্বল ঈমানওয়ালা তারপরও আমি তো কিছু সাদৃশ্য অবলম্বন করতে পারি। এরপর আল্লাহর উপর ভরসা করে জুতা খুলে হাতে নিলাম এবং আস্তে আস্তে উপরের দিকে উঠতে থাকলাম। ২

এভাবে আল্লাহ তাআলার অশেষ মেহেরবানীতে একপর্যায় চূড়ায় পৌঁছলাম। তখন মনের অজান্তে আনন্দে চোখ থেকে অশ্রæ বইতে লাগলো। আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া আদায় করতে থাকলাম। তিনি আমাকে গায়েব থেকে সাহায্য করেছেন। তিনি সাহায্য না করলে আমি কখনই উঠতে পারতাম না। দিল থেকে বললাম আল্লাহু আকবার।

পাহাড়ের চূড়াটা ঘুরে দেখলাম। যেখানে বসে মূসা আলাইহিস সালাম আল্লাহকে পাওয়ার জন্য ইবাদতে রত ছিলেন সেই গুহার উপরে একপাশে বসে কিছু জিকির ও দুআ করলাম এবং সেই সময়কার অবস্থা অনুভব করার চেষ্টা করলাম। এখানেই মূসা আলাইহিস সালাম পবিত্র তাওরাত কিতাব লাভ করেছিলেন।

ইতিমধ্যে কিছু সাথী গুহার নিচে গিয়ে ছবি তুলতে লাগলো, যেখানে মুছা আলাইহিস সালাম বসে আল্লাহ তাআলার ইবাদতে নিমগ্ন ছিলেন। যা দেখে আমার এত খারাপ লাগলো যে একপর্যায়ে এক সাথী ভাইকে বলে ফেললাম, ভাই ভিতরে যাওয়ার দরকার নেই। এটা বেয়াদবী হবে। আমাদের বেয়াদবীর কারণে যদি খালি হাতে ফিরতে হয় তাহলে তো এই কষ্টের কোনো লাভ হলো না। কিন্তু আমার কথা সেই ভাই শুনলেন না।

অতপর দুআ ইস্তেগফার পড়ে মাগরিবের নামায আদায় করলাম। পাহাড়ের গুহায় ছোট একটি মসজিদ আছে এবং ছোট একটি গির্জা আছে। অনেকে বলে থাকে মসজিদটি ফাতেমি খেলাফতের সময় করা হয়েছে। তাতে সবাই নামায আদায় করলাম। নামাযের পর মহান আল্লাহ তাআলার দরবারে অনেক দুআ করলাম। যিন্দেগীর গোনাহ মাফের জন্য প্রার্থনা করলাম। পিতামাতা আত্মীয় সজন ও উস্তায, মুহিব্বীনসহ সকল মুসলমানের জন্য দুআ করলাম। দুনিয়ার সব জায়গায় আল্লাহ তাআলা হেদায়েতের আলো ছড়িয়ে দেন সেই দুআ করলাম। মসজিদ ছোট, একদল নামায শেষ করলে আরেক দল প্রবেশ করছে। তাই সংক্ষেপে মুনাজাত শেষ করলাম। কিছুক্ষণ পর সাথী ভাইরা ডাকতে লাগলেন, আমরা এখন নেমে যাবো।

যে পাহাড়টিতে আল্লাহ তাআলার নূরের তাজাল্লিতে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়েছিলো তা তুর পাহাড় থেকে উত্তর-পূর্বে অবস্থিত। আমাদের সেখানে আর যাওয়া সম্ভব হয়নি।

চারদিকে অন্ধকার। আল্লাহর নাম নিয়ে খুব সাবধানে পা ফেলতে লাগলাম। সাথে থাকা মোবাইলের আলোর সাহায্য নিলাম। এভাবে আস্তে আস্তে ঘন্টা দুই নামার পরে সমতল ভূমি পেলাম। এরপর আরো আধা ঘন্টা হাঁটার পর বাসের কাছে পৌঁছলাম। মহান আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সহী সালামতে তুর পাহাড়ে আরোহণ করার এবং নিরাপদে ফিরে আসার তৌফিক দান করলেন। সব প্রশংসা মহান আল্লাহ তাআলার।

এখনও আমাদের  সামনে আরো একটি বড় নিআমত বাকি আছে। তা হল হারুন আলাইহিস সালামের কবর যিয়ারত করা। তুর পাহাড় থেকে নেমে এসে কমবেশি আমরা সবাই ক্লান্ত। বিশেষ করে আমার অবস্থা খুব খারাপ। আমার পা আর চলছিলো না। তারপরও আমার সামনে যে সৌভাগ্য তা কোনভাবে হাত ছাড়া করতে মন সায় দিলো না।

আমরা এশার নামায আদায় করে যিয়ারতের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। পাহাড়ের কাছে গিয়ে দেখি অন্ধকারে রাস্তা বের করা মুশকিল। আলহামদু লিল্লাহ, এক ভাই উপরে উঠার একটা পথ পেয়ে গেলেন। তিনি বললেন আমার কাছে আলো আছে আমি আগে উপরে উঠি আপনারা পিছনে পিছনে আসেন। তার কথামত আমরা আল্লাহর রহমতে অনেক সহজে পাহাড়ের উপর উঠে গেলাম। এই পাহাড়টি এত বেশি উঁচু নয়। ছোট একটি পাহাড়। পাহাড়ে উঠে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলাম, আমার মত গোনাহগার বান্দাকে তার প্রিয় বান্দার কবরের পাশে আসার তাওফিক দান করেছেন। সালাম পেশ করার এবং যিয়ারতের তাওফিক দান করেছেন।

পাহাড়ের আশেপাশে অনেক পুরাতন কবর দেখতে পেলাম। পাহাড় থেকে নেমে আমরা গাড়িতে এসে বসলাম।

গাড়ি কায়রোর উদ্দেশ্যে ছুটে চলল। এক সময় তুর পাহাড় দৃষ্টির আড়াল হয়ে গেল। আমরা পরদিন দুপুর বারোটায় কায়রোয় এসে পৌঁছলাম। সহী সালামতে আমাদের আটচল্লিশ ঘণ্টার সফর শেষ হল। সকল প্রশংসা মহান আল্লাহ তাআলার। যিনি আমাদের সফরকে বরকতময় করেছেন এবং কুদরতিভাবে আমাদের সফরকে সহজ করেছেন। আল্লাহর খাছ মেহেরবানীতে এই কষ্টকর সফর সহজ হয়েছে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সফরের সব ভুলত্রæটি ক্ষমা করে দেন এবং সফরকে কবুল করুন। আমীন

 

[নোট : মুহাম্মাদ হাবীবুর রহমান আমার অপ্রাতিষ্ঠানিক শাগরিদ। সে আমার বিভিন্ন কাজে অনেক সহযোগিতা করেছে। আমার জন্য একটি কিতাব তালাশ করতে গিয়ে একসিডেন্ট করে তার পা ভেঙে গেছে। এজন্য তিনবার অপারেশন করতে হয়েছে। আলহামদু লিল্লাহ, এখন সুস্থতার পথে। আল্লাহ তাআলা তাকে পূর্ণ শেফা দান করুন। আমীন

রে সাইনার এ সংক্ষিপ্ত সফরনামা সে বেশ দীর্ঘ আকারে লিখেছিল। আমি তা সংক্ষেপ করার চেষ্টা করেছি। তারপরও কিছু লম্বা রয়ে গেছে। এখানে এ বিষয়টি লক্ষ্যণীয়, রে সাইনা হোক বা যে কোনো ঐতিহাসিক স্থানের সফর হোক সবই সাধারণ সফরের অন্তর্ভুক্ত। কোনো ঐতিহাসিক স্থান পরিদর্শনের জন্য সফর করা দুই শর্তের সাথে জায়েয। এক. ঐ স্থানটি র্শিক-বিদআত ও বিভিন্ন অপকর্ম থেকে পবিত্র হতে হবে। দুই. সফরটি শুধু পরিদর্শন বা শিক্ষাসফর হতে হবে; এই নিয়তে হতে পারবে না যে, ওখানে গিয়ে দুআ-ইবাদতের আলাদা ফযীলত বা গুরুত্ব রয়েছে। এই নিয়তও করা চলবে না যে, শরীয়ত এসকল ঐতিহাসিক স্থান যিয়ারতের প্রতি উৎসাহিত করেছে।

হাদীসের বিভিন্ন কিতাবে বর্ণিত এ হাদীসটি মনে রাখা চাই- সাইদ মাকবুরী রাহ. আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি তর পাহাড়ের উদ্দেশ্যে সফর করেন এবং সেখানে গিয়ে নামায আদায় করেন। ফেরার পথে হুমাইল ইবনে বাসরাহ গিফারী রা.-এর সাথে সাক্ষাৎ হলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কোথা থেকে এলেন? তিনি বললেন, র পাহাড় থেকে। তখন হুমাইল রা. বললেন, আমার সাথে যদি যাওয়ার আগে আপনার সাক্ষাৎ হতো তাহলে আপনার যাওয়া হত না। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি,

"لَا تُضْرَبُ أَكْبَادُ الْمَطِيِّ إلَّا إلَى ثَلَاثَةِ مَسَاجِدَ : الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ، وَمَسْجِدِي هَذَا، وَمَسْجِدِ بَيْتِ الْمَقْدِسِ."

 ভ্রমণ শুধু তিনটি মসজিদের উদ্দেশ্যে করা যেতে পারে; মসজিদে হারাম, আমার মসজিদ (মসজিদে নববী) ও মসজিদে বায়তুল মাকদিস। -শরহু মুশকিলিল আছার, খ. ২ পৃ. ৫৫, হাদীস ৫৮২ ও পৃ. ৫৬, হাদীস ৫৮৪

সিন্দী রাহ. বলেন,

أي: لا تُركَب المَطِي إلى مسجدٍ إلا إلى ثلاثة مساجد، وأبو هريرة قَصَد الصلاةَ في الطور فصار سفره كالسفر إلى المسجد، وإلا فالحديث لا يمنع السفر إلى البلاد وغيره.

অর্থাৎ, তিন মসজিদ ব্যতিত অন্য কোনো মসজিদের উদ্দেশ্যে সফর করা যাবে না। আর আবু হুরাইরা রা.-এর সফর ছিল তর পাহাড়ে নামাযের উদ্দেশ্যে, ফলে সেটা মসজিদের উদ্দেশ্যে সফরের মত ছিল। অন্যথায় এই হাদীস দেশ-বিদেশ সফর করা বা অন্য কোনো সফর থেকে বারণ করে না। (মুসনাদে আহমাদ, খ.৩৯ পৃ. ২৬৭-২৬৯-এর টীকা দ্রষ্টব্য, তাহকীক : শুআইব আরনাউত)

-মুহাম্মাদ আবদুল মালেক]

 

     

 

 

advertisement