যিলহজ্ব ১৪৩৬   ||   অক্টোবর ২০১৫

রসিকতা হোক পরিমিত

মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম

রসিকতা মানব জীবনের এক অনুষংগ। কমবেশি প্রত্যেকেই রসিকতা করে। এটা কেবল হাসিঠাট্টা স্থানীয় আত্মীয়দের জন্যই সংরক্ষিত নয়; বরং দ্বিপাক্ষিক যে-কোনও রকমের সম্বন্ধ এর ভোক্তা হতে পারে এবং হয়েও থাকে। এটা ঠিক যে, রহস্যস্থানীয় আত্মীয়দের মধ্যেই এ রকমের আদান-প্রদান বেশি হয়। অন্যান্য ক্ষেত্রে এর প্রয়োগে সামাজিক বা মানসিক কিছু না কিছু প্রতিবন্ধকতা থাকেই। কিন্তু তা সত্তে¡ও রসিকতার রস সেসব ক্ষেত্রকেও কিছু না কিছু সজীবতা দান করেই থাকে। ভাইবোন, বন্ধু-বান্ধব, সহপাঠী, সমবয়সী ও সহকর্মীকে ছাড়িয়ে, পিতা-পুত্র, শিক্ষক-ছাত্র, নেতা-কর্মী, কর্মকর্তা-কর্মচারী তথা যে-কোনও রকমের অসম-সম্বন্ধের দুজনকেও দেখা যায়, সময়-সুযোগ বুঝে রসিকতার রস খানিকটা আস্বাদন করে নেয়। তা নিতে কোনও বাধাও নেই। অন্তত স্বভাবধর্ম ইসলাম মানবপ্রকৃতির এ প্রবণতায় বাধ সাধে না। তবে হাঁ, ইসলাম যেহেতু ভারসাম্যের ধর্ম এবং সব কিছুতে পরিমিতিবোধ ও মাত্রাজ্ঞানের তালিম তার অনন্য বৈশিষ্ট্য, তাই এখানেও তার শিক্ষা হল, তুমি রঙ্গ-রসিকতা কর ঠিক আছে, কিন্তু সাবধান মাত্রা ছাড়িয়ে যেও না। সীমার মধ্যে থাকার চেষ্টা কর। অর্থাৎ রসিকতার অনুমতিও দিয়েছে, ক্ষেত্রবিশেষে উৎসাহও দিয়েছে, কিন্তু বাড়াবাড়ি ও সীমালংঘন করতে নিষেধ করেছে।

রসিকতা করার অনুমতি যে আছে তার বড় প্রমান প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও কখনও কখনও রসিকতা করেছেন। হাদীসগ্রন্থসমূহে এর একাধিক দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। যেমন হযরত আনাস ইবনে মালিক রা. বর্ণনা করেন যে, একবার এক ব্যক্তি এসে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে একটা বাহনজন্তু চাইল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হাঁ, আমরা তোমাকে একটা উটনীর বাচ্চা দেব। লোকটি বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি উটনীর বাচ্চা দিয়ে কী করব? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আরে উটেরা সব উটনীদেরই বাচ্চা নয় কি? -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪৯৯৮ ; জামে তিরমিযী, হাদীস ১৯৯১

প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ জাতীয় রসিকতার ঘটনা আরও আছে। একটা ঘটনা বড় চমৎকার। বিভিন্ন হাদীসগ্রন্থে তা বর্ণিত আছে। সেটিও হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যাহির নামক এক পল্লীবাসী সাহাবী পল্লীর বিভিন্ন জিনিস নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হাদিয়া দিতেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তাকে শহরের বিভিন্ন জিনিস দিয়ে বিদায় করতেন। তিনি বলতেন, যাহির হল আমাদের গ্রাম, আমরা তার নগর। তিনি তাঁকে খুবই ভালবাসতেন। তো একদিনের কথা। হযরত যাহির রা. বাজারে তার পণ্য বিক্রি করছিলেন। এ অবস্থায় প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে উপস্থিত। তিনি পেছন দিক থেকে প্রিয় সাহাবীকে জড়িয়ে ধরলেন। হযরত যাহির রা. তাঁকে দেখতে পাচ্ছিলেন না। তিনি (বিরক্ত হয়ে) বলে উঠলেন, এই কে? আমাকে ছেড়ে দাও। তারপর পেছন ফিরে তাকালেন। দেখলেন তিনি যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। (প্রিয় নবীর এ রসিকতা যে তার বুকের ভেতর ভালোবাসার কি ঝড় বইয়ে দিয়েছিল তা সহজেই অনুমেয়। সুতরাং সে ঝড়ের কবলে তিনি নিজেকে সঁপেই দিলেন)। কালবিলম্ব না করে নিজেকে আরও পেছন দিকে নিয়ে যেতে থাকলেন। এভাবে একদম সেঁটে গেলেন পরম প্রিয়ের বুকের সাথে। নবীজীও তাঁকে বুকে ধরে রাখলেন। তারপর রসিকতার মাত্রা যোগ করলেন। বললেন, কে কিনবে? এই গোলামটি বিক্রি করব। হযরত যাহির দেখতে সুশ্রী ছিলেন না। বলে উঠলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! দাম বড় সস্তা হবে। প্রিয় নবী (সান্ত¡না দিলেন এবং আসল কথাটিই) বললেন, কিন্তু আল্লাহর কাছে তুমি সস্তা নও। তাঁর কাছে তোমার দাম অনেক।

কুৎসিত হওয়ার কারণে অনেকেরই মনে দুঃখ থাকে। সে দুঃখের ক্ষতে কি মহৌষধই না লাগিয়ে দিলেন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর এ রসিকতাপূর্ণ আচরণ দ্বারা।

বস্তুত রসিকতা একটা মোক্ষম দাওয়াই। এর দ্বারা মানব জীবনের বহু অবাঞ্ছিত পারিপার্শ্বিকতা সারিয়ে তোলা যায়। কোনও অনাকাক্সিক্ষত আপতনে পরিবেশে যখন গুমোট ভাব দেখা দেয়, তাকে সহজ করার জন্য হাল্কা রসিকতা খুবই কার্যকর। এ উপলক্ষে রসিকতার ব্যবহার আবহমান কাল থেকেই চলে আসছে। প্রিয় কোনও ব্যক্তি রেগে গেলে প্রথমত আমরা রসিকতা দ্বারাই তার রাগ নামানোর চেষ্টা করি। এমন কি শোকার্ত ব্যক্তির উপরও এর প্রয়োগ দেখা যায়। সম্ভবত হাস্য-পরিহাস দ্বারা সমস্যা-সমাধানের কিছু না কিছু অভিজ্ঞতা আমাদের সকলেরই আছে। তাই এ বিষয়ে বয়ান করার বিশেষ প্রয়োজন বোধ করছি না। প্রয়োজন যেটা, তা হচ্ছে এ ব্যাপারে মাত্রাজ্ঞানের পরিচয় দেওয়ার। যা আমরা অনেক সময়ই দেই না। ফলে এমন একটা সুন্দর ও সুকুমার বৃত্তি অনেক সময় বহু অনর্থের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যে-কোনও ভালো জিনিসেরই সুফল পাওয়ার জন্য তার নিয়মনিষ্ঠ ব্যবহার জরুরি। ব্যবহার দোষে অতি প্রিয় জিনিসও ভীষণ অপ্রীতিকর হয়ে যায়। আমরা এমন লোকও দেখেছি, যে হাস্য-পরিহাসকে একদম বরদাশত করে না। হয়ত কোনও একদিন কারও বল্গাহীন পরিহাস তাকে পরিহাসের পাত্রে পরিণত করেছিল। যা দ্বারা কেউ কখনও অপমানিত হয়, তাকে সে বরদাশত করবে কেন?

আসলে রসিকতার যথাযথ প্রয়োগ আমরা অনেকেই জানি না। এ বিষয়ে আমাদের সচেতনতার বড় অভাব। রসিকতা করতে গিয়ে আমরা সীমালংঘন করে ফেলি। যদ্বারা আমি নিজেও ক্ষতিগ্রস্ত হই এবং অন্যকেও করি ক্ষত-বিক্ষত। তা করি বলেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধাজ্ঞা জারি করেন যে,

 لا تمار أخاك ولا تمازحهতোমার ভাইয়ের সাথে বাক-বিতণ্ডা করো না এবং তার সাথে পরিহাস করো না। এ নিষেধাজ্ঞা এজন্যই করেছেন যে, সাধারণত আমাদের রসিকতা হয় লাগামহীন। হয় তাতে মিথ্যা কথা বলি, নয়ত কাউকে আহত করি। কাউকে সমাজ চোখে হেয় করি কিংবা পৌনঃপুনিক রসিকতা দ্বারা বিরক্ত করি। এসবই কবীরা গুনাহ-মহাপাপ।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও রসিকতা করতেন, যেমনটা পূর্বে বলা হয়েছে, কিন্তু তার রসিকতায় মিথ্যার কিছু থাকত না। একবার তো সাহাবায়ে কিরাম প্রশ্নই করে বসলেন যে, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি যে আমাদের সাথে রসিকতা করেন (অথচ এক হাদীসে আপনি আমাদেরকে এটা করতে নিষেধ করেছেন)? তিনি বললেন, হাঁ, তবে আমি (রসিকতাচ্ছলেও মিথ্যা বলি না) কেবল সত্যই বলি। -জামে তিরমিযী, হাদীস ১৯৯০আশ শামাইল, হাদীস ২৭

তাঁর প্রতিটি রসিকতার প্রতি দৃষ্টিপাত করলে দেখা যাবে মিথ্যার লেশমাত্র নেই। যেমন একবার তিনি হযরত আনাস রা.-কে বলেছিলেন, ‘ওহে দুকানওয়ালা’! (প্রাগুক্ত, হাদীস ২৩৫) কান তো মানুষের দুটিই হয়। তা সত্তে¡ও যখন কাউকে মজা করে দুকানওয়ালা বলা হবে, প্রথম যাত্রায় সে চমকেই উঠবে। কিন্তু রসজ্ঞ হলে পরক্ষণেই সে বুঝতে পারবে এর দ্বারা পরোক্ষভাবে তার প্রশংসাই করা হয়েছে যে, তুমি নিখুঁত শোন এবং বুঝতেও পারো বেশ। সত্য কথার কি অপূর্ব রসিকতা!

কেবল সত্য হওয়াই যথেষ্ট নয়; উদ্দেশ্যও সাধু হওয়া চাই। অসদুদ্দেশ্যে রসিকতা করা হলে যত সত্য কথা দ্বারাই হোক না কেন, তাকে কিছুতেই জায়েয বলা যাবে না। তা হবে সম্পূর্ণ সীমালংঘন ও না-জায়েয। অনেক সময়ই রসিকতার উদ্দেশ্য হয় কারও চরিত্রহনন করা বা ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করা। আজকাল এ জাতীয় পরিহাস বাক্য ব্যবহার অনেকটা সামাজিক কালচারে পরিণত হয়েছে। সভা-সমিতিতে প্রতিপক্ষকে লক্ষ করে যে যত বেশি তা উদ্গীরণ করতে পারে, সুবক্তা হিসেবে সে ততটাই সমাদৃত হয়ে ওঠে। নিঃসন্দেহে এটা আমাদের নৈতিক অবক্ষয়ের বহিঃপ্রকাশ। ব্যঙ্গ-পরিহাসে মজা পাওয়া ও ব্যঙ্গকারীকে পিঠ চাপরানি দেওয়া- একধরনের হীনতা বা মানসিক বিকৃতি সে কথা আমরা ভুলে গেছি। এই মানসিক বিকৃতি সমাজের সর্বস্তরে ক্রমবিস্তার লাভ করছে আর এর ফলে বাড়ছে পারস্পরিক অবিশ্বাস, আত্মকলহ ও নানারকম অশান্তি। এর থেকে নিস্তার লাভ করতে হলে হাস্য-পরিহাসকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, অন্যকে আহত করে- এমন কোনও রসিকতা শরীআত অনুমোদন করে না। কুরআন মাজীদে ইরশাদ, হে মুমিনগণ! পুরুষগণ যেন অপর পুরুষদেরকে উপহাস না করে। তারা (অর্থাৎ যাদেরকে উপহাস করা হচ্ছে, তারা) তাদের চেয়ে উত্তম হতে পারে। এবং নারীগণও যেন অপর নারীদেরকে উপহাস না করে। তারা (অর্থাৎ যে নারীদেরকে উপহাস করা হচ্ছে) তাদের চেয়ে উত্তম হতে পারে। তোমরা একে অন্যকে কটাক্ষ করো না এবং একে অন্যকে মন্দ উপাধিতে ডেকো না। (এসব ফাসেকী কাজ। আর) ঈমানের পর ফাসেকী নামযুক্ত হওয়া বড় খারাপ কথা। যারা এসব থেকে বিরত না হবে তারাই জালেম-সুরা হুজুরাত  (৪৯) : ১১

আসলে রসিকতা তো এমন অকৃত্রিম আচরণকেই বলে যা অন্যের মনে প্রাণরস জোগায়। যে অসুস্থ আচরণ অন্যকে বিতৃষ্ণ করে তাকে আর যাই বলা হোক রসিকতা বলা যায় না কিছুতেই। সুতরাং কারও চরিত্র, অংগ-প্রত্যংগ, বংশ-পরিচয় বা সামাজিক অবস্থান নিয়ে যদি রসিকতাচ্ছলে এমন কিছু বলা হয়, যা তার মনোবেদনার কারণ হতে পারে, তবে তা ইসলাম অনুমোদিত রসিকতা নয়; বরং কুরআন মজীদের ভাষ্যমতে তা হবে ফাসেকী কাজ, যা অবশ্যই পরিত্যাজ্য।

রসিকতাকে পরিমিত করে তোলার জন্য সত্যকথন ও সদুদ্দেশ্যের সাথে আরও দরকার স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনায় রাখা। একই কথা এক স্থানে বা এক সময়ে আনন্দদায়ী হলেও অন্য স্থান ও অন্য সময়ে তা বিরক্তকরও হতে পারে। ফলে আনন্দদানের লক্ষে বলা কথা হয়ে ওঠবে বেদনাদায়ক। যে কথা একাকী বলা যায় সব সময় তা মজলিসে বলা যায় না। এমনও দেখা গেছে যে, একজনের সামনে কাউকে লক্ষ করে বলা কথা যখন অন্য কারও সামনে বলা হয়েছে সে তাতে বিব্রত বোধ করেছে, অথচ প্রথম ক্ষেত্রে সে আনন্দই বোধ করেছিল। যে রসিকতা কারও সাথে তার বন্ধুদের সামনে করা যায়, তা কি তার পিতা বা অন্য কোনও গুরুজনের সামনে করাটা সুখকর হয়?

এমনিভাবে পাত্র বিবেচনাও জরুরি। সব রসিকতাই সকলের সাথে করা যায় না। রস গ্রহণের যোগ্যতা সকলের সমান থাকে না। একজন একটা কথাকে সানন্দে গ্রহণ করলেও অন্যজন তাতে ক্ষিপ্তও হতে পারে। দেদার তা হয়ে থাকে। কাজেই কারও সাথে পরিহাস করতে চাইলে আগে বিবেচনা করতে হবে রস গ্রহণের ক্ষমতা তার কতটুকু। নচেত হিতে বিপরীত হবে। এমনকি ফুর্তি করতে গিয়ে লাঞ্ছিত হয়ে ফেরাও অসম্ভব নয়।

অনেকে রসিকতাচ্ছলে এমন কথা বলে বা এমন আচরণ করে যা নিতান্তই কদর্য। একবার মজলিস থেকে গাত্রোত্থানকালে এক ব্যক্তি অপর একজনের সাথে এমন আচরণ করেছিল যা যথারীতি তার বিবমিষা জাগিয়েছিল। এ জাতীয় আচরণকে কি নামে অভিহিত করা যায়? সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুবাদে অনেকে এ ধরনের কাজ করতে উৎসাহ বোধ করে। মনে রাখতে হবে এর কুফল হয় সুদূরপ্রসারী। এর দরুণ ব্যক্তির ভাবমূর্তি নষ্ট হয় এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা-ভক্তি ও ভাব-ভালোবাসায় টান পড়ে। পরিশেষে ভাব বিতৃষ্ণায় ও ভক্তি ঘৃণায় পর্যবসিত হয়। স্বামী-স্ত্রীরও এদিকে নজর রাখা দরকার। মোটকথা রসিকতায় কোনওরকমের নোংরামীকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। বরং আনন্দের আদান-প্রদান হতে হবে সম্পূর্ণ শূচিশুদ্ধ পন্থায়।

রসিকতায় সীমালংঘনের আরেক রূপ হল শরীরে আঘাত করা। সে আঘাত সহনীয় পর্যায়ের হলে তো কথা থাকে না। কিন্তু অনেকে এমন সজোরে আঘাত করে যা রীতিমত যুলুম। হয় মাথায় জোরসে গাট্টা মারল, নয়ত চুল ধরে টান দিল, অথবা চামড়া ধরে দলন করল কিংবা জোর চিমটি কাটল। সে তো মেরে আরাম পেল, কিন্তু যাকে মারল তার কষ্টের সীমা থাকে না। এ যেন তোমাদের খেলা আমাদের মরণ’-এরই প্রতিরূপ। বিশেষত শিশুদের সাথে এ জাতীয় রসিকতা নির্মম নিষ্ঠুরতা ছাড়া কিছু নয়।

আঘাত করার ও মারধরের রসিকতা কখনও মর্মান্তিক পরিণতিও বয়ে আনে। প্রাণহানিকর পরিহাস শেষে বর হেসে কর ঠাট্টা- কেবল কবি কল্পনাই নয়; বাস্তবেও তা মাঝেমধ্যে ঘটে। পত্রিকা পাঠকদের তা অজানা থাকার কথা নয়। এ ব্যাপারে সামাজিক সচেতনতাও জরুরি।

একটি বিরক্তিকর রসিকতা হল একই কথা বারবার বলা। এটা কখনও হয় নির্বুদ্ধিতাবশত এবং কখনও হয় ইচ্ছাকৃত উত্যক্ত করার লক্ষে, প্রকৃতপ্রস্তাবে তাও নির্বুদ্ধিতাই বটে। একই কথার পৌনঃপুনিক উচ্চারণ কারওই ভালো লাগে না। ভালো কথাও বারবার অসহ্য প্যাচাল হয়ে যায়। কিন্তু উত্যক্ত করাই যাদের উদ্দেশ্য সেদিকে তাদের খেয়াল করার কথা নয়। বিরক্ত ব্যক্তি যতক্ষণ না মারমুখো হয় ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের হুশ হয় না। এটাও রসিকতার চরম বাড়াবাড়ি। অহেতুক অন্যকে বিরক্ত করা কোনও সুস্থ মানসিকতার লক্ষণ নয়। কাজেই তা পরিত্যাজ্য। যারা নির্বুদ্ধিতাবশত করে, তাদেরও নিজেদের মধ্যে বোধোদয় ঘটানো উচিত। সমঝদারদের কর্তব্য পরিণামের কথা স্মরণ করিয়ে তাদের বোধোদয়ে সহযোগিতা করা।

রসিকতা ছোট-বড়র মধ্যেও হতে পারে। সেক্ষেত্রে লক্ষণীয় হল, ছোটর রসিকতায় যেন বড়র সাথে আদরের গণ্ডি-অতিক্রম করা না হয় আর বড়র রসিকতা যেন ছোটকে স্পর্ধিত করে না তোলে। বড়দের সাথে ছোটদের রসিকতার শীলিত দৃষ্টান্ত হিসেবে জনৈক সাহাবীর ঘটনা উল্লেখ করা যায়। একবার প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি তাঁবুর ভেতর অবস্থান করছিলেন। সেই সাহাবী এসে তাঁর সংগে দেখা করতে চাইলেন। নবীজী তাঁকে ভেতরে প্রবেশ করতে বললেন, কিন্তু তাঁবুটি ছিল বেশ ছোট। সাহাবী রসিকতা করে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পুরো শরীরটাই প্রবেশ করাব, না আংশিক? প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, পুরোটাই। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৫০০০

অপূর্ব অন্তরংগতা। ইদানিং লক্ষ করা যায়, গুরুজনদের সাথে, এমনকি পিতা ও শিক্ষকের সংগে এমন-এমন রসিকতা করা হয়, যা কোন শিষ্টাচারের পর্যায়ে পড়ে না। এরকম আচরণ অবশ্যই পরিহার্য।

ছোটদের পক্ষ থেকে এরূপ স্পর্ধিত আচরণ ক্ষেত্রবিশেষে বড়দেরই ভুলের খেসারত। তারাও অনেক সময় এমন রসিকতা করে বসে, যা ছোটদেরকে  মাথায় চড়ে বসতে উৎসাহ যোগায়। ক্ষতি দুজনেরই হল। ছোটর চোখে বড় হয়ে গেল গুরুত্বহীন আর ছোট নিজে হয়ে গেল আদব ভংগে অভ্যস্ত। তাই সতর্কতা অবলম্বন উভয়েরই জরুরি।

লক্ষ রাখতে হবে রসিকতা যেন কিছুতেই ভাঁড়ামি না হয়ে যায়। পরিহাস করতে গিয়ে বেফাঁস মন্তব্য করা বা মাত্রাতিরিক্ত রসিকতা করার দ্বারা ব্যক্তির ভাবমূর্তি নষ্ট হয় এবং সমাজ চোখে সে একজন ভাঁড় সাব্যস্ত হয়। আসলে রসিকতা নিত্যচর্চার মত কোনও জিনিস নয়। এটা কখনও-সখনওই করা যায়। অর্থাৎ এমনই এক বিষয় যা সম্পূর্ণরূপে পরিহার করাও ভালো নয়, আবার বেশি করাও সমীচীন নয়। মধ্যপন্থায়ই শ্রেয়।

মোটকথা রসিকতাকে সব রকম ক্ষতি থেকে রক্ষা করে সুফলদায়ী করে তোলার জন্য কর্তব্য স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনায় রেখে ভাষা, পরিমাণ বিষয়বস্তু ধরণ-ধারণ ইত্যাদিতে পরিমিতিবোধের পরিচয় দেওয়া। এ সম্পর্কে বিখ্যাত সাহাবী হযরত সাঈদ ইবনুল আস রা.-এর একটি উক্তি প্রণিধানযোগ্য। তাঁর সে উক্তি দিয়েই এবারের আলোচনার সমাপ্তি টানা যাচ্ছে। হযরত সাঈদ ইবনুল আস রা. নিজ পুত্রকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন, বাছা! রসিকতায় পরিমিতিবোধের পরিচয় দিও। এতে বাড়াবাড়ি ভাবমূর্তি নষ্ট করে ও মূর্খদের অন্তরে ধৃষ্টতার জন্ম দেয়। আবার এর অভাবে প্রিয়জনেরা তোমার থেকে দূরে সরে যাবে এবং সংগী-সাথীরা তোমাকে নিয়ে অস্বস্তি বোধ করবে। -আদাবুদ দুনয়া ওয়াদ-দীন, পৃ. ২৭১ 

 

 

advertisement