শাবান-রমযান ১৪২৯   ||   আগস্ট ২০০৮

জী বি কা : আবার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব কতটা গ্রহণযোগ্য

আবু তাশরীফ

অল্প কদিন আগে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বাড়ানোর পর এখন পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে গৃহস্থালি এবং শিল্প ও বাণিজ্যসহ সবক্ষেত্রে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। গত ১৮ জুলাইয়ের পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে- আগের দিন কারওয়ান বাজারের বিইআরসি কার্যালয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় গ্রাহক ও পেট্রোবাংলার মুখোমুখি আলোচনা শেষে বিইআরসি পেট্রোবাংলার এই প্রস্তাব গ্রহণ করে নিয়েছে। জানানো হয়েছে, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এ বিষয়ে পর্যালোচনা করে গণশুনানির পর সিদ্ধান্ত নেবে। বিভিন্ন রিপোর্ট থেকে জানা গেছে, পেট্রোবাংলা বর্তমানে প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাস বিক্রি করছে গড়ে ৯২ টাকা ৮৩ পয়সায়। এ হার বাড়িয়ে এখন ১৪২ টাকা ৭৫ পয়সা করার

প্রস্তাব করা হয়েছে। এর আগে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয় ২০০৫ সালের ১ জানুয়ারি। এরপর গ্যাসের দাম বাড়ানোর জন্য পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে মোট ৫ বার জ্বালানি মন্ত্রণালয়কে প্রস্তাব দেয়া হলেও সরকার তা বাড়ানোর কোনো পদক্ষেপ নিতে যায়নি। পেট্রোবাংলার এবারের প্রস্তাবে বিভিন্ন খাতে প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের মূল্য বাড়ানোর সুনির্দিষ্ট হার উল্লেখ করে দিয়ে গৃহস্থালি ব্যবহারের ক্ষেত্রে এক বার্নারের চুলা ৩৫০ টাকা থেকে ৫৫০ টাকা এবং দুই বার্নারের চুলা ৪০০ টাকা থেকে ৬০০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

বর্তমানে ক্রমবর্ধমান চড়া দ্রব্যমূল্য, রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস ও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রতিক্রিয়ায় সাধারণ মানুষ যেখানে কঠিন টানাপড়েনের মধ্যে আছেন সেখানে আবার ব্যাপকহারে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি (বিশেষত গৃহস্থালি ক্ষেত্রে) নাগরিক সাধারণের জীবন যাপন ও জীবনমানকে বিপর্যস্ত করে তুলবে। এতে নিম্নবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত শহুরে মানুষ (যাদের সংখ্যা মোট নাগরিকের প্রায় অর্ধেক) প্রচন্ড বিরক্তি ও অসহায়ত্বের শিকার হতে পারেন। অবশ্য গ্যাসের দাম বাড়ানোর  

প্রস্তাবকারী পেট্রেবাংলার চেয়ারম্যান জালাল আহমদ বলেছেন, দাম না বাড়ালে পেট্রোবাংলা দেউলিয়া হয়ে যাবে। গ্রাহকদেরকে মানসম্পন্ন গ্যাস সরবরাহ আরো কঠিন হয়ে পড়বে। তবে একই সঙ্গে এ সিদ্ধান্তও হয়েছে যে, দামবৃদ্ধির এ প্রস্তাব পর্যালোচনা করতে আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর গণশুনানির দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে নাম তালিকাভুক্ত করে যে কোনো নাগরিক সেই গণশুনানিতে অংশ নিতে পারবেন বলে বলা হয়েছে। একদিকে পেট্রোবাংলা অপরদিকে দামবৃদ্ধির বিরোধিতাকারীদের অবস্থান থেকে যার যার মতের সঙ্গে উপযুক্ত যুক্তি-প্রমাণ সেদিন পেশ করতে হবে বলেও বলা হয়েছে। এ পর্যায়ে গণশুনানির বিষয়টি নিয়ে একটি সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। গ্যাস সম্পদের স্টক ও ক্ষয়, বাজার অর্থনীতির চলমান পর্যায়, নাগরিক সাধারণের আয় ও ক্রয়ক্ষমতাসহ এতদসংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নাগরিক মতামতের পরিবর্তে কেবল যে যেমন ইচ্ছা গণশুনানিতে মতামত প্রদান করলে আর তার উপর ভিত্তি করে কোনো সিদ্ধান্ত দাঁড় করালে সেটা কতটুকু ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়। এজন্য গণশুনানির বিষয়টিকে একটি ফলপ্রসূ ও অর্থবহ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মহলই পালন করতে পারেন।

সবকিছুর পর এ ধরনের যুক্তি ও মতামতের গ্রহণযোগ্যতাই সবচেয়ে

বেশি হওয়ার কথা যে, গ্যাসের দাম একান্ত বাড়ানোর প্রয়োজন হলেও তা হওয়া উচিত সহনীয় পর্যায়ে। হঠাৎ করে বেশি না বাড়িয়ে ধাপে ধাপে তা বাড়ানো যেতে পারে। (মতবিনিময় সভায় আসা ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ এ কথাটি বলেছেন।) নিঃসন্দেহে বর্তমান দ্রব্যমূল্যের চড়া পরিস্থিতি এবং সাধারণ নাগরিকদের আয় ও ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে এ কথাটির

যৌক্তিকতাই ব্যাপক। কারণ চাল, ডাল, চিনি, ভোজ্যতেল থেকে নিয়ে জরুরী সব খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে বিশ্ব বাজারের চড়ামূল্যের তথ্য সরবরাহ, রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস ও জ্বালানী তেলের মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও বিশ্ব বাজারের উসিলা প্রদান এবং গৃহস্থালি গ্যাসের ক্ষেত্রে ব্যাপকহারে মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও পেট্রোবাংলার দেউলিয়াত্বের আশংকাধ্বনি উচ্চারণের কোনোটাই হয়তো অবাস্তব নয়, নয় অযৌক্তিকও। কিন্তু একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অল্প মেয়াদের মধ্যেই এতগুলো খাতের আর্থিক চাপ সীমিত সাধ্যের নাগরিক সাধারণকে বিরক্ত, ক্ষুব্ধ ও হতাশ করে দিতে বাধ্য। সামর্থ যেখানে হাঁটুভাঙ্গা সেখানে যৌক্তিক কারণেও কিলোমিটারখানেক হেঁটে যাওয়ার প্রস্তাব অন্তরে ভীতি জাগিয়ে দেয়। তাই নতুন করে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত (বিশেষত গৃহস্থালি ব্যবহারে) গ্রহণ করার কোনো পথে যাওয়ার আগে আরো ভাবনা-চিন্তা জরুরি বলেই মনে করি। 

 

 

advertisement