মহররম ১৪২৯   ||   জানুয়ারী ২০০৯

প্রোপাগান্ডা ও সংবাদ মাধ্যম

মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ

প্রচার প্রচারণার মিডিয়াগত পরিভাষা হচ্ছে প্রোপাগান্ডা। প্রোপাগান্ডা মূলত মনস্তাত্বিক যুদ্ধের একটি অস্ত্র। শত্রুর উদ্দেশ্য থাকে প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে ভীতি ও আতঙ্কের অবস্থা সৃষ্টি করে ব্যক্তি অথবা দলের আচরণে চাহিদা মাফিক পরিবর্তন সাধন করা। ইংলিশে এই অবস্থাটাকেই বলা হয় সাইকোলোজিক্যাল ওয়ার। আধুনিক আরবী পরিভাষায় এর নাম আল হারবুন নাফসী। (ইসলাম আওর যারায়ে এবলাগ, উস্তাদ ফাহমী কুতুবুদ্দীন আননাজ্জার, তরজমা- ড. সাজিদুর রহমান সিদ্দীকী, পৃ : ৪৪০)

প্রোপাগান্ডার এই যুদ্ধে তোপ কামানের ব্যবহার হয় না। বরং যুদ্ধটি চালানো হয় প্রচারমাধ্যমের সাহায্যে। প্রোপাগান্ডার পেছনে দুনিয়া জুড়ে অঢেল অর্থ ব্যয় করা হয়। আর এতে এমন ফলাফল লাভ করা হয় বাস্তব যুদ্ধের মাধ্যমেও যা অর্জিত হয় না। প্রোপাগান্ডার উদ্দেশ্যই থাকে অপর পক্ষকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে দিয়ে তার সাহস ভেঙ্গে দেওয়া। (এবলাগে আম, মাহদী হাসান, পৃ : ১৫৪, মাকতাবায়ে কারাওঁয়া, লাহোর)

প্রোপাগান্ডার মধ্য দিয়ে আদর্শিক, অর্থনৈতিক স্বার্থ-সুবিধা আদায় করে নেওয়া হয় এবং হীনম্মন্যতা সৃষ্টির নানা কার্যকারণকে সক্রিয় করে তোলা হয়। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ। কিন্তু আগুন ও আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার ছাড়া যুদ্ধটি লড়ার কারণে একে বলা হয় Cold War বা ঠান্ডা লড়াই।  প্রোপাগান্ডা নিজেই ভালো মন্দ কোনো বৈশিষ্ট্য ধারণ করে না; বরং উদ্দেশ্য কর্মপদ্ধতির ভালো-মন্দই তাকে ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক বানিয়ে ছাড়ে।

প্রোপাগান্ডার পরিভাষাটি প্রথম ব্যবহার হয় ১৬২২ খৃষ্টাব্দে একটি খৃষ্টীয় মিশনের। রোমের বাইরে ধর্ম-প্রচারের উদ্দেশ্যে ছিল এর ব্যবহার। সেখানকার সরকার প্রোপাগান্ডাকারী খৃষ্টানদের বিরুদ্ধবাদী চিন্তাধারার প্রকাশ প্রচারে তখন তটস্থ ছিল। এটি হচ্ছে আধুনিক যুগের উদ্ধারকৃত তথ্য। কিন্তু ধর্মীয় সূত্রে দেখা যায়, প্রোপাগান্ডার অস্তিত্ব আরো প্রাচীন ও ধারাবাহিক।

প্রোপাগান্ডা এবং মনস্তাত্বিক যুদ্ধের নানারূপ

ইসলামপূর্ব যুগের ইতিহাসে প্রোপাগান্ডা এবং মনস্তাত্বিক লড়াইয়ের বেশ কিছু স্বাক্ষ্য পাওয়া যায়। বিভিন্ন কবিলার সরদার ও নেতারা শত্রুপক্ষের মাঝে ফিৎনা জাগিয়ে তুলতে, আপসে বিভেদ সৃষ্টি করতে এবং অপরের সামনে নিজেকে ত্রাসসৃষ্টিকারী ও শক্তিমান রূপে জাহির করতে বিভিন্ন কলাকৌশল প্রয়োগ করত।

আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম- যারা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে পয়গাম পৌঁছানো ও রিসালাতের নির্দেশপ্রাপ্ত ছিলেন- এর বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডার কুটকৌশলটি গ্রহণ করে বনী ইসরাইল। এছাড়াও কাফের ফাজের শক্তির পক্ষ থেকেও পয়গামে রববানীকে প্রভাব ও ক্রিয়াহীন করতে  মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্রসমূহের ব্যবহার বিভিন্ন চিহ্ন ইতিহাসে পাওয়া যায়।

কুরআনে কারীম স্থানে স্থানে পূর্বযুগের কওমের এসব মিথ্যা প্রচার-প্রচারণার স্বরূপ বর্ণনা করেছে। খোদ জাযীরায়ে আরবের মধ্যেই মুশরিকীন, ইয়াহুদী ও মুনাফেক সম্প্রদায় হযরত খাতামুননাবিয়্যীন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর  বিরুদ্ধে  জবরদস্ত মনস্তাত্বিক লড়াই চাঙ্গা করে রেখেছিল। নেতিবাচক প্রোপাগান্ডা, আয়াতে ইলাহীকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা এবং ত্রাস সৃষ্টির এক সয়লাব সৃষ্টি করেছিল। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এবং তাঁর সাহাবীগণকে সন্ত্রস্ত ও প্রলুব্ধ করতে বহু রকম কলাকৌশল গ্রহণ করা হয়েছিল।

শিবে আবী তালেবে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর গোত্রের লোকদের অবরুদ্ধ করে রাখা, অর্থনৈতিক বয়কটের মধ্যে তিন বছর পর্যন্ত জীবন অতিবাহিত করতে বাধ্য করা ছিল এধরনের মনস্তাত্বিক চাপের এক ঘৃণ্য কৌশল।

 কুরআনে কারীমের প্রভাবসৃষ্টিকারী পয়গামকে না শোনা এবং ঢোল-বাদ্য-গীতের বিনোদনক্ষেত্র আয়োজন করে কুরআনের পয়গামকে অস্পষ্ট ও অগুরুত্বপূর্ণ করে তোলা ছিল হক অস্বীকারকারীদের প্রোপাগান্ডার অংশ। স্বয়ং পবিত্র কুরআনেই এ প্রসঙ্গে ঘোষিত হয়েছে- এবং কাফেররা বলল, এই কুরআন তোমরা শুনো না। যখন তা পাঠ করা হয় তো চিৎকার-চেঁচামেচি কর। হয়তো তোমরা সফলকাম হবে। (হা-মীম সিজদা ৪১ :  ২৬)

ব্যবসায়িক বিভিন্ন মেলা ও নানা উৎসবের উদযাপন বাহ্যিকভাবে ছিল বিনোদন ও আত্মপ্রচারের নিদর্শন, কিন্তু এসবের আড়ালেও থাকত আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একাকী করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র।

কাব্য ও সাহিত্যচর্চা ছিল আরবদের গুরুত্বপূর্ণ গণযোগাযোগ মাধ্যম। ভাষা সাহিত্যের চর্চায় আরবরা ছিল খুব চৌকস। রিসালাতের পয়গামের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডার এ মাধ্যমটিকেও পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়েছে। কাব ইবনে আশরাফ ছিল একজন ধনাঢ্য ইয়াহুদী ও মশহুর কবি। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শানে অপমানজনক ব্যঙ্গ কবিতা বলত এবং বিরুদ্ধবাদীদের মাঝে উস্কানী সৃষ্টি করত। বদর যুদ্ধের পর মক্কায় গিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বহু কবিতা  আবৃত্তি করল এবং বদরে নিহত কুরাইশদের সমবেদনা জানিয়ে এমন সব কবিতা আবৃত্তি করল যেগুলোতে ছিল প্রতিশোধ গ্রহণের উস্কানী ও ইন্ধন। এরপর সেখান থেকে মদীনায় ফিরে এসেও সে কবিতা গেয়ে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিরুদ্ধে কিছু লোককে উত্তেজিত করে চলল।-সীরাতুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- আল্লামা শিবলী নোমানী

আল্লামা শিবলী নোমানী লিখেছেন, আরবদের মধ্যে কবিতার প্রভাব ছিল এমন ইউরোপে এখন বড় পন্ডিতদের বক্তৃতা এবং প্রসিদ্ধ সংবাদপত্রগুলোর রচনায় যেমন প্রভাব থাকে।

যখন ইসলামী প্রচারমাধ্যম বাতিলের প্রোপাগান্ডার জাল ছিঁড়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নিল তখন গণচেতনা থেকে ইসলাম বিরোধী নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াকে নিঃশেষ করে ইতিবাচক প্রভাব স্থাপন করার ক্ষেত্রে হযরত হাস্সান ইবনে ছাবিত রা., হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রা., হযরত কাব ইবনে মালেক রা. ও হযরত ছাবিত ইবনে কায়েস রা. প্রমুখ সাহাবীগণ সেই গুরুত্বপূর্ণ খেদমত আঞ্জাম দিলেন, যা আজকের মুসলিম সংবাদকর্মীদের জন্য নমুনা হয়ে উঠতে পারে।

কাফের-মুশরিকরা তাদের বাপ-দাদাদের ধর্মের অন্যায় পক্ষপাতিত্বের কারণে কেবল আসমানী সত্য আর  একমাত্র বাস্তবতাকে অবজ্ঞাই করেনি বরং নিজেদের মিথ্যা প্রোপাগান্ডার আগুনে সে সত্যকে ভস্ম করে দিতে অক্লান্ত চেষ্টাও ব্যয় করেছে।

ইহুদীদের ষড়যন্ত্র

হযরত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিরুদ্ধে ইহুদীদের প্রোপাগান্ডার কারণে মক্কার কুরাইশদের প্রতিশোধ-প্রবণতা এতই চরমে উঠেছিল যে, কুরাইশরা বনী নযীর গোত্রের কাছে এ পয়গাম পর্যন্ত পাঠিয়ে দিয়েছিল যে, তোমরা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করে ফেল। অন্যথায় আমরা নিজেরা এসে তোমাদের শেষ করে ছাড়ব। (সীরাতুন্নবী-আল্লামা শিবলী নোমানী)

ইবনে জারীর তাবারী লেখেন, ইহুদী কাব ইবনে আশরাফ মক্কার কাফের-মুশরিকদের কাছে গেল এবং তাদেরকে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিরুদ্ধে উত্তেজিত করল এবং তাদেরকে নবীজীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হতে প্ররোচিত করল।         (তাফসীরে ইবনে জারীর তাবারী)

কাব ইবনে আশরাফের প্রোপাগান্ডার সবচেয়ে মারাত্মক বিষয়টি ছিল এই যে, বদর যুদ্ধের আগুন তখনও ঠান্ডা হতে পারেনি তার আগেই সে নতুন আগুন জ্বালানোর প্রকাশ্য ষড়যন্ত্র শুরু করে দেয়। মক্কায় গিয়ে কুরাইশদের উদ্বুদ্ধ করতে শুরু করে। এরই প্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলার নির্দেশে তাকে হত্যা করে দেওয়া হয়। (তারীখে ইবনে হিশাম)

এ ঘটনার পর ইহুদীরা কিছুটা সন্ত্রস্ত হয়ে যায় এবং এ ধরনের প্রোপাগান্ডার ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করে। এরপর প্রোপাগান্ডার এ প্রক্রিয়ায় ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করে মুনাফেক সম্প্রদায়। ইহুদী সম্প্রদায় বনু নযীরকে নির্বাসনে পাঠানোর সময়ও এই মুনাফেকরা তাদের সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দেয়। ইয়াহুদীদের প্রতি মুনাফিকদের এই সহযোগিতামূলক আচরণের বর্ণনা পবিত্র কুরআনের সূরায়ে হাশরেও দেওয়া হয়েছে।

উহুদের যুদ্ধে হযরত রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  এর শাহাদাতের গুজব ছড়িয়ে দেওয়াও ছিল এ ধরনের একটি প্রোপাগান্ডা। মুসলমানদের মনোবল ভেঙ্গে দেওয়ার জন্য এই গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এর ফল হয়েছে উল্টো। হযরত আনাস ইবনে নযর রা.-এর মতো সাহাবীগণ এ খবর শুনে বেঁচে থাকা অর্থহীন মনে করে জীবনের বাজি লাগিয়ে লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং শহীদ হয়ে যান।

প্রোপাগান্ডা ও মনস্তাত্তিক লড়াইয়ে মুনাফেকদের আরেকটি অপকৌশল ছিল, অবমাননাকর ও বিভাজনমূলক বিভিন্ন শব্দ ও পরিভাষার ব্যবহার। তারা ইচ্ছাকৃতভাবে উস্কানি দেওয়ার উদ্দেশ্যে আনসারী সাহাবীদেরকে আল আআয বা অধিক সম্মানিত আর মুহাজির সাহাবীদেরকে খেতাব করত আযাল্ল্ বা অধিক অপমানিত শব্দ দিয়ে। এভাবে তারা যুদ্ধে ভূমিকা, যুদ্ধ পরবর্তী গনীমতসহ বিভিন্ন বিষয়ে আনসার  মুহাজির সাহাবীদের মাঝে একটি অসমঝোতামূলক ও দ্বন্দমূলক পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা করত। কিন্তু তাদের পরিকল্পিত প্রোপাগান্ডার সবকিছু ধরা পড়ে যেত এবং ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হত। এসব ঘটনা সূরায়ে মুনাফিকূনে বর্ণিত আছে।

হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে চরম বিব্রত করা এবং মুসলমানদের মাঝে সন্দেহ, অস্থিরতা ও অনৈক্যের বীজ বপন করতে তারা ব্যক্তিগত অপপ্রচারের কোনো সুযোগও হাতছাড়া করত না।

গাযওয়া বনি মুস্তালিকের সময় উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রা. এবং হযরত সাফওয়ান রা.কে জড়িয়ে ভয়ংকর মিথ্যা চারিত্রিক বিষোদগারের ধুঁয়া তুলে তারা মদীনার পরিবেশ ভারী করে তুলেছিল। মুনাফেকদের ছড়িয়ে দেওয়া এই তোহমতে কোনো কোনো মুখলেস সাহাবী পর্যন্ত কিছুটা প্রভাবিত ও দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েছিলেন। মাস খানেক জুড়ে চলেছিল এ কঠিন পরিস্থিতি। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ওহী নাযিল হয় এবং এ প্রচারণার অসারতা ফুটে উঠে ও হযরত আয়েশার পবিত্রতার কথা ঘোষিত হয়। সূরায়ে নূরের প্রথম দিককার আয়াতসমূহের সম্পর্ক এ ঘটনার সঙ্গেই।

আজকের দাবি

প্রোপাগান্ডা যেহেতু যুদ্ধ ও শান্তি উভয় সময়েই সমানভাবে সক্রিয় থাকে; তবে যুদ্ধের সময় প্রোপাগান্ডার মাত্রা থাকে চূড়ান্ত পর্যায়ে তাই সেসময় প্রচারমাধ্যমের দায়িত্ব অনেক বেড়ে যায়। প্রোপাগান্ডার ফলে যেন স্বজন-স্বজাতির মাঝে ভীতি ও দ্বিধা না বেড়ে যায় এবং শত্রুপক্ষ নিজেদের লক্ষ্যে সফল না হয়ে যায় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনের ঘোষণা হল- যখনই তাদের কাছে নিরাপত্তা অথবা যুদ্ধের সংবাদ এসে পৌঁছে তখনই তারা তা ছড়িয়ে দেয়। যদি তারা এ সংবাদকে রাসূলের দিকে অথবা নিজেদের মাঝের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছে দেয় তাহলে তাদের যে ঐসংবাদটি যাচাই করে নিতে পারে সে তার বাস্তবতা অনুধাবন করে নিতে পারে। যদি তোমাদের ওপর আল্লাহর ফযল না হত এবং তার রহম শামিলে হাল না হত তাহলে কিছু লোক ব্যতীত তোমরাও শয়তানের পিছু পিছু ছুটতে। (সূরা নিসা-৮৩)

এই আয়াতখানা মুনাফেকদের অনিষ্টপ্রবণতা সম্পর্কে নাযিল হয়েছিল। এরা বিভিন্ন গুজব ও প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে মুসলিম সমাজের মধ্যে ভীতি ও  ত্রাস সঞ্চার করত। এই আয়াত থেকে এ সত্যটি স্পষ্ট  হয়ে উঠে যে, উদ্দেশ্যমূলক গুজব ছড়ানো একটি শয়তানি কাজ এবং মুনাফেকদের চিহ্ন। (তাফহীমুল     মাসাইল : মাওলানা গাওহার রহমানী)

সুতরাং প্রচারমাধ্যমের প্রতিনিধি এবং মিডিয়া-ব্যবস্থাপকদের জন্য জরুরি হল, তারা সংবাদ এবং গুজব অর্থাৎ News এবং Disinformation এর মাঝে পার্থক্য করবেন। প্রয়োজনে এ কাজের জন্য কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান অথবা সেকশন গড়ে তুলবেন, যারা হবে যাচাই-বাছাইয়ের দায়িত্বশীল। তারা সংবাদের বাস্তবতা অনুধাবন করবে। এ ধরনের গবেষণা ও বিশ্লেষনধর্মী প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি। তাই আর্থিক স্বার্থে, অপরাপর সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে প্রতিযোগিতার স্বার্থে গুজবের শিরোনামগুলো একত্রিত করা এবং যাচাইহীনভাবে খবর ছড়িয়ে দেওয়া কোনো প্রশংসাযোগ্য কাজ হতে পারে না। এ ধরনের যাচাইহীন দ্রুততাপ্রবণতা শয়তানকে অনুসরণেরই নামান্তর। যার ফলশ্রুতিতে কেবল অনিষ্টপ্রবণতা ও অনিষ্টসৃষ্টির ঘটনাই ঘটতে পারে।

শত্রুপক্ষের প্রোপাগান্ডার লক্ষ যাই হোক, সর্বাবস্থায় সমূহঅবস্থা ও সংবাদসমূহের একটি সাধারণ ও স্থির বিশ্লেষণ সম্পন্ন করা দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যমের জন্য অপরিহার্য। সংবাদমাধ্যমের অবস্থান যেহেতু ইমেজ বৃদ্ধিকারীর হয়ে থাকে তাই তার সততা, ন্যায়পরায়ণতার দ্বারা সে গণমতকে প্রভাবিত করে সমাজের ইতিবাচক পথ নির্দেশনা দিতে পারে এবং নেতিবাচক প্রবণতা থেকে সমাজকে বাঁচাতে পারে। পক্ষান্তরে দায়িত্বহীন হলে সে সমাজকে কল্যাণ ও ইতিবাচকতার পরিবর্তে নিকৃষ্ট পরিণতির দিকেও টেনে নিয়ে যেতে পারে। কেননা তথ্য (Information) হচ্ছে সেই শক্তি যা কল্যাণও উপহার দিতে পারে, দিতে পারে ক্ষতিও।

মিডিয়া আসলে প্রচারকে ব্যাপক করা ও তথ্যকে বিকশিত করার মাধ্যম। যে মাধ্যমে নিত্যনতুন টেকনোলজি ও নতুনত্ব এসে দুনিয়ার পরিধিকে ছোট করে দিয়েছে এবং গ্লোবাল ভিলেজের ধারণাকে পোক্ত করে দিয়েছে। এ জন্যই মুসলিম প্রচার বা সংবাদমাধ্যমগুলোর ভূমিকা নিতান্তই দায়িত্বশীল, ইতিবাচক এবং কুরআন-সুন্নতের হেদায়েতের বাস্তব অনুসারী হতে হবে। তাহলেই কেবল শত্রুদের অনিষ্টপ্রবণ প্রোপাগান্ডার নেতিবাচকতাকে কল্যাণ দিয়ে বদলে দেওয়া যেতে পারে। #

 

 

advertisement