মহররম ১৪২৯   ||   জানুয়ারী ২০০৯

তাসাওউফের আমল ও শোগল সম্পর্কে আমার বিশ্বাস

মাওলানা মুহাম্মদ মনযূর নূ’মানী রাহ.

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

তাসাওউফের হাকীকত    উদ্দেশ্য

আলহামদুলিল্লাহ! এখন আর আমার এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, তাসাওউফের আমল ও শোগল অর্থাৎ এর সাধনা পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য হল দ্বীনদারীর পূর্ণতা অর্জন করা। তাসাওউফের উদ্দেশ্য কেবল ঐ সকল গুণ ও বৈশিষ্ট্য অর্জন করা, যাকে কুরআন ও হাদীসে ঈমান ও ইসলামের পূর্ণতার জন্য আবশ্যকীয় বলা হয়েছে। যেহেতু অনেকের মনে এ বিষয়ে সংশয় রয়েছে তাই এ প্রসঙ্গে আমি যা বুঝেছি তা একটু সবিস্তারে বর্ণনা করছি। আল্লাহ পাক তাওফীক দিন।

কুরআন ও হাদীস অধ্যয়ন করে বোঝা যায় যে, দ্বীন-ঈমানের পূর্ণতা লাভের জন্য আকীদা ও আমল দুরস্ত করার সাথে সাথে হৃদয় ও আত্মার কিছু গুণ অর্জন করাও আবশ্যক। যেমন আল্লাহ পাকের মুহাববত একটি গুণ। সূরা বাকারার এক আয়াতে বলা হয়েছে-

وَ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْۤا اَشَدُّ حُبًّا لِّلّٰهِ ؕ

অর্থাৎ ঈমানদারগণ  সবচেয়ে বেশি মুহাববত করেন আল্লাহ পাককে।

হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে -

 ثلاث من كن فيه وجد حلاوة الإيمان أن يكون الله ورسوله أحب إليه مما سواهما وأن يحب المرء لا يحبه إلا لله وأن يكره أن يعود في الكفر كما يكره أن يقذف في النار

অর্থাৎ ঈমানের মিষ্টতা ঐ ব্যক্তিই লাভ করবে, যার মধ্যে তিনটি গুণ রয়েছে : ১. তার মধ্যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের মুহাববত অন্য সব কিছু থেকে বেশি হবে। ২. কোনো মানুষের সাথে তার ভালোবাসা হলে সেটাও আল্লাহর জন্যই হবে। ৩. ঈমান গ্রহণের পর কুফরের দিকে ফিরে যাওয়া তার জন্য এমন অপছন্দের ও কষ্টকর হবে যেমন আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়া।

আল্লাহ পাক ইরশাদ  করেন-

اِنَّمَا الْمُؤْمِنُوْنَ الَّذِیْنَ اِذَا ذُكِرَ اللّٰهُ وَ جِلَتْ قُلُوْبُهُمْ وَ اِذَا تُلِیَتْ عَلَیْهِمْ اٰیٰتُهٗ زَادَتْهُمْ اِیْمَانًا وَّ عَلٰی رَبِّهِمْ یَتَوَكَّلُوْنَۚۖ۝۲

অর্থ : সত্যিকারের ঈমানদার কেবল ঐ সকল লোক যাদের অবস্থা এই যে, যখন তাদের সামনে আল্লাহ পাকের যিকর করা হয় তখন তাদের অন্তরে ভীতির সৃষ্টি হয়, আর যখন তাদের সামনে আল্লাহ পাকের আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করা হয় তখন তাদের ঈমানের নূর বৃদ্ধি পায় এবং তারা তদের পরওয়ারদেগারের উপর ভরসা রাখে। -সূরা আনফাল ২

অন্যত্র আল্লাহ পাক তার সফল বান্দা সম্পর্কে ইরশাদ করেন-

اِنَّ الَّذِیْنَ هُمْ مِّنْ خَشْیَةِ رَبِّهِمْ مُّشْفِقُوْنَۙ۝۵۷ وَ الَّذِیْنَ هُمْ بِاٰیٰتِ رَبِّهِمْ یُؤْمِنُوْنَۙ۝۵۸ وَ الَّذِیْنَ هُمْ بِرَبِّهِمْ لَا یُشْرِكُوْنَۙ۝۵۹
وَ الَّذِیْنَ یُؤْتُوْنَ مَاۤ اٰتَوْا وَّ قُلُوْبُهُمْ وَجِلَةٌ اَنَّهُمْ اِلٰی رَبِّهِمْ رٰجِعُوْنَۙ
۝۶۰ اُولٰٓىِٕكَ یُسٰرِعُوْنَ فِی الْخَیْرٰتِ وَ هُمْ لَهَا سٰبِقُوْنَ۝۶۱

অর্থ : নিশ্চয়ই যারা স্বীয় প্রতিপালকের ভয়ে ভীত থাকে এবং যারা স্বীয় রবের নিদর্শনসমূহের প্রতি ঈমান রাখে এবং যারা স্বীয় রবের সাথে (অন্য কিছুকে) শরীক করে না এবং যারা (আল্লাহর রাহে) যা কিছু দান করে (এভাবে দান করে যে,) তাদের অন্তরসমূহ সেজন্য ভীত থাকে যে, তাদেরকে স্বীয় রবের নিকট ফিরে যেতে হবে। এরাই দ্রুত (স্বীয়) কল্যাণসমূহ অর্জন করছে এবং তারা এর প্রতি (দ্রুত) ছুটে চলেছে। -সূরা মুমিনুন ৫৭-৬১

কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছে -

تَقْشَعِرُّ مِنْهُ جُلُوْدُ الَّذِیْنَ یَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ ۚ ثُمَّ تَلِیْنُ جُلُوْدُهُمْ وَ قُلُوْبُهُمْ اِلٰی ذِكْرِ اللّٰهِ ؕ

অর্থ : যার দ্বারা (যে কুরআন দ্বারা) স্বীয় রবের ভয়ে ভীত লোকদের দেহ কেঁপে উঠে অতঃপর তাদের দেহ ও মন নরম হয়ে আল্লাহর যিকরের প্রতি মনোনিবেশকারী হয়। -সূরা যুমার ২৩

সূরা আল ইমরানে এসেছে-

الَّذِیْنَ یَذْكُرُوْنَ اللّٰهَ قِیٰمًا وَّ قُعُوْدًا وَّ عَلٰی جُنُوْبِهِمْ

যারা দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে (সর্বাবস্থায়) আল্লাহর যিকর করে। -সূরা আল ইমরান ১৯১

সূরা মুযযাম্মিলে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্বোধন করে ইরশাদ হয়েছে-

وَ اذْكُرِ اسْمَ رَبِّكَ وَ تَبَتَّلْ اِلَیْهِ تَبْتِیْلًاؕ۝۸

অর্থ : স্বীয় রবের নামের যিকর করুন এবং সবকিছু হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে তাঁরই প্রতি মনোনিবেশ করুন। -সূরা মুযযাম্মিল ৮

উপরোক্ত আয়াতসমূহে হৃদয়ের যে সকল গুণ ও অবস্থা অর্জন করা ঈমানদারের জন্য আবশ্যকীয় করা হয়েছে তা নিম্নরূপ :

১. আল্লাহ পাকের মুহাববত সব কিছুর উপরে প্রবল হতে হবে।

২. অন্তরের অবস্থা এমন হতে হবে যে, যখন আল্লাহ পাককে স্মরণ করবে তখন যেন তার অন্তরে আল্লাহ পাকের ভয় সৃষ্টি হয় এবং অন্তর কেঁপে উঠে।

৩. যখন আল্লাহ পাকের আয়াত তেলাওয়াত করা হয় তখন যেন ঈমানের নূর বৃদ্ধি পায়।

৪. আল্লাহ পাকের উপর ভরসা করবে। আর এটাই হবে তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় অবলম্বন। 

৫. তারা সর্বদা আল্লাহ পাকের বড়ত্ব ও মহত্ত্বের অনুভূতিতে ভীত-সন্ত্রস্ত থাকবে।

৬. আল্লাহ পাকের ভয় তাদের  অন্তরে প্রবল হবে। এমনকি নেক কাজ করার সময়ও তারা এই ভেবে ভীত সন্ত্রস্ত থাকবে যে, আমাদের এই কাজ আল্লাহ পাকের দরবারে কবুল হবে তো।

৭. কুরআনুল কারীম তেলাওয়াতকালে অথবা তেলাওয়াত শ্রবণকালে তাদের শরীর কেঁপে উঠবে। তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং অন্তর আল্লাহর স্মরণে বিনীত হয়ে যাবে।

৮. তারা সর্বাবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করবে, কোনো অবস্থাতেই অমনোযোগী হবে না।

৯. সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে সকল অবস্থায় আল্লাহর দিকে মনোযোগী হওয়াই হবে তাদের বৈশিষ্ট্য।

শুধু পবিত্র কুরআনই নয়, সহীহ হাদীসসমূহেও স্পষ্ট ও পরিষ্কারভাবে ঐ সকল গুণ ও বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয়েছে, যার দ্বারা ঈমান পূর্ণতা লাভ করে। এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-

من أحبَّ لله، وأبغض لله،وأعطى لله،ومنع لله،فقد استكمل الإيمان

অর্থ : যে আল্লাহর জন্য (অন্যকে) ভালোবাসে, আল্লাহর জন্যই (কারো সাথে) বিদ্বেষ পোষণ করে, (কাউকে কিছু দিলে) আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্যই দেয়, আর কাউকে কোনো কিছু দেওয়া থেকে বিরত থাকলে সেটাও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই করে, সে স্বীয় ঈমানকে পূর্ণ করল। -মিশকাত

তদ্রূপ হাদীসে জিব্রাঈল নামক প্রসিদ্ধ হাদীসে ঈমান ও ইসলামের পূর্ণতাকে ইহসান নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আর ইহসান-এর সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এভাবে-

أَنْ تَعْبُدَ اللَّهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تَرَاهُ، فَإِنَّهُ يَرَاكَ. وفي رواية : أن تخشى مكان أن تعبد الله.

অর্থ : ইহসান ঐ মাকামকে বলে যে, তুমি আল্লাহ পাকের ইবাদত-বন্দেগী এমনভাবে করবে (অথবা সর্বদা তাকে এমনভাবে ভয় করবে) যেন তুমি তাকে দেখছ। কেননা, যদিও তুমি তাকে না দেখ, তিনি কিন্তু তোমাকে (সর্বক্ষণ, সর্বাবস্থায় ও সর্বস্থানে) দেখছেন।

পূর্বের হাদীসে ইখলাস-এর কথা বলা হয়েছে, এ হাদীসে ইহসান-এর আলোচনা করা হয়েছে। ইখলাস এবং ইহসান দুটোই অন্তরের এমন গুণ ও অবস্থার নাম যার দ্বারা ঈমান পূর্ণতা লাভ করে। ইসলামে এ সকল বৈশিষ্ট্যের গুরুত্ব এত বেশি যে, স্বয়ং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও এগুলোর জন্য আল্লাহর দরবারে দুআ করেছেন।

এ সম্পর্কিত কয়েকটি দুআ এ অধমের দৃষ্টিতে বিশেষ মনোযোগ ও চিন্তা-ভাবনার দাবি রাখে।

اَللّهُمَّ اجْعَلْ حُبَّكَ أَحَبَّ إِلَيَّ مِنْ نَفْسِيْ وَأَهْلِيْ وَمِنَ الْمَاءِ الْبَارِدِ.

অর্থ : ইয়া আল্লাহ! আপনি আমাকে এমন বানিয়ে দিন যে, আপনার ভালোবাসা যেন আমার নিজ সত্ত্বার চেয়ে, পরিবার-পরিজনের চেয়ে এমনকি (প্রচন্ড পিপাসার সময়) ঠান্ডা পানির চেয়েও অধিক প্রিয় হয়।

اَللّهُمَّ اجْعَلْ حُبَّكَ أَحَبَّ الْاَشْيَاءِ إِلَيَّ كُلِّهَا، خَشْيَتَكَ أَخْوَفَ الْاَشْيَاءِ عِنْدِيْ، وَاقْطَعْ عَنِّيْ حَاجَاتِ الدُّنْيَا بِالشَّوْقِ إِلَى لِقَائِكَ، وَ إِذَا أَقْرَرْتَ أَعْيَنَ أَهْلِ الدُّنْيَا مِنْ دُنْيَاهُمْ، فَأَقْرِرْ عَيْنِيْ مِنْ عِبَادَتِكَ .

অর্থ : ইয়া আল্লাহ! আপনি আমাকে এমন বানিয়ে দিন, যাতে প্রত্যেক বস্তর চেয়ে আপনার ভালোবাসা আমার কাছে অধিক প্রিয় হয় এবং সকল ভীতিকর বস্ত্তর চেয়ে আপনার ভয় আমার মধ্যে অধিক হয়। আর আপনার সাথে সাক্ষাতের এমন প্রবল আকাংখা আমাকে দান করুন যেন দুনিয়ার সকল প্রয়োজন আমার কাছে তুচ্ছ হয়ে যায়। আর যখন দুনিয়াদারদের চোখ দুনিয়ার বস্ত্ত-সামগ্রী দিয়ে শীতল করেন তখন আমার চোখ আপনার ইবাদতের মাধ্যমে শীতল করুন এবং আপনার ইবাদতের মাধ্যমে আমার অন্তরে শান্তি ও শীতলতা দান করুন।

اَللّهُمَّ اجْعَلْنِيْ أَخْشَاكَ كَأَنِّيْ أَرَاكَ أَبَدًا حَتَّى أَلْقَاكَ.

অর্থ : ইয়া আল্লাহ! আপনি আমাকে এমন বানিয়ে দিন যাতে আমি আপনাকে ভয় করি, যেন সর্বক্ষণ আপনাকে দেখছি। আর এ অবস্থায় যেন আপনার কাছে পৌঁছতে পারি।

     اللَّهُمَّ إِنِّيْ أَسْأَلُكَ إِيمَانًا يُبَاشِرُ قَلْبِي، وَيَقِيِنَاً صَادِقَاً حَتَّى أَعْلَمَ أَنَّهُ لاَ يُصِيِبُنِي إِلاَّ مَا كَتَبْتَ لِي، وَرِضًا مِنَ الْمَعْشِيَةِ بِمَا قَسَمْتَ لِي 

অর্থ : ইয়া আল্লাহ! আমি আপনার নিকট এমন ঈমান চাই যা আমার অন্তরে বদ্ধমূল হয়ে যায় এবং এমন ইয়াকীন চাই যা আমার    অন্তরে এই প্রশান্তি দান করে যে, শুধু তাই আমার নিকটে পৌঁছে যা আমার জন্য লিপিবদ্ধ করেছেন। আর এ দুনিয়াতে আপনি আমার জন্য যে জীবিকা নির্ধারণ করেছেন তার প্রতি সন্তুষ্টি কামনা করি।

اللَّهُمَّ إِنِّيْ أَسْأَلُكَ التَّوْفِيْقَ لِمَحَابِّكَ مِنَ الْاَعْمَالِ وَصِدْقَ التَّوَكُّلِ عَلَيْكَ وَحُسْنَ الظَّنِّ بِكَ.

ইয়া আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আপনার পছন্দনীয় কর্মের তাওফীক কামনা করি, সত্যিকারের তাওয়াক্কুল কামনা করি এবং আপনার প্রতি সুধারণা রাখার তাওফীক কামনা করি।

اَللّهُمَّ إِنِّيْ أَسْأَلُكَ نَفْسًا بِكَ مُطْمَئِنَّةً تُؤْمِنُ بِلِقَائِكَ وَتَرْضَى بِقَضَائِكَ وَتَقْنَعُ بِعَطَائِكَ.

অর্থ : ইয়া আল্লাহ! আমি আপনার নিকট এমন অন্তর চাই, যা আপনার মাধ্যমেই প্রশান্তি লাভ করে। আপনার সাথে সাক্ষাতের দৃঢ় বিশ্বাস রাখে। আপনার ফয়সালা ও আপনার নির্ধারিত তাকদীরের উপর সন্তুষ্ট থাকে আর আপনার দানকে যথেষ্ট মনে করে।

اَللّهُمَّ افْتَحْ مَسَامِعَ قَلْبِيْ لِذِكْرِكَ

অর্থ : ইয়া আল্লাহ! আপনার যিকরের জন্য আমার হৃদয়ের কান খুলে দিন।

اَللّهُمَّ إِنِّيْ أَسْأَلُكَ قُلُوْبًا أَوْ أَهْلَةً مُخْبِتَةً مُنِيْبَةً فِيْ سَبِيْلِكَ.

অর্থ : ইয়া আল্লাহ! আমি আপনার নিকট এমন হৃদয় চাই যা নরম দয়ার্দ্র হবে, যা থাকবে ভগ্ন এবং আপনার দিকে প্রত্যাবর্তনকারী।

اَللّهُمَّ اجْعَلْ وَسَاوِسَ قَلْبِيْ خَشْيَتَكَ وَذِكْرَكَ وَاجْعَلْ هَمَّتِيْ وَهَوَايَ فِيْمَا تُحِبُّ وَتَرْضَى.

মঅর্থ : ইয়া আল্লাহ! আমার অন্তরের সংশয় ও সন্দেহকে আপনার ভয় এবং স্মরণে পরিণত করুন এবং আমার সকল মনোযোগ ও কামনা ঐ সকল জিনিসের প্রতি করুন যা আপনার কাছে পছন্দনীয়।

اَللّهُمَّ اجْعَلْ فِيْ قَلْبِيْ نُوْرًا وَأَعْطِنِيْ نُوْرًا وَاجْعَلْنِيْ نُوْرًا.

অর্থ : ইয়া আল্লাহ! আমার হৃদয় নূর দিয়ে ভরে দিন। আমাকে নূর দান করুন এবং আমার সমগ্র সত্ত্বাকে নূরানী বানিয়ে দিন।

এ সকল দুআ এবং এ ধরনের আরো অনেক মাসনুন দুআ হাদীসের কিতাবে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত আছে। তিনি নিজেও এ সকল দুআ করেছেন এবং উম্মতকেও শক্ষা দিয়েছেন এতে যে বিষয়গুলো প্রার্থনা করা হয়েছে তার সবই মানুষের অভ্যন্তর তথা অন্তরের বিশেষ অবস্থা ও গুণাবলি। যেমন সব কিছুর চেয়ে আল্লাহ পাকের মুহাববত বেশি হওয়া। সকল কিছুর চেয়ে আল্লাহ পাকের ভয় বেশি হওয়া। আল্লাহ পাকের সাথে সাক্ষাতের আগ্রহ এত প্রবল হওয়া যে পার্থিব সকল প্রয়োজন এবং পার্থিব আশা-আকাংখা তুচ্ছ হয়ে যায়। ইবাদতে চোখের শীতলতা এবং অন্তরের প্রশান্তি লাভ হওয়া। সর্বদা আল্লাহ পাককে এমন ভয় করা যেন তিনি তাঁর সকল ক্রোধ ও প্রতাপসহ তাকদীরে বিশ্বাস রাখা। আল্লাহ পাকের ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা। আল্লাহ পাকের প্রতি আস্থা সুধারণা রাখা। আল্লাহ পাকের সাথে ও মুহাববত সৃষ্টি হওয়া। আল্লাহ পাকের দানে সন্তুষ্ট থাকা। আল্লাহর স্মরণে অন্তর অনুগত হওয়া। অন্তর দয়ার্দ্র, সহানুভূতিশীল, ভগ্ন ও বিনীত হওয়া। আল্লাহ পাকের সাথে   অন্তরের সম্পর্ক এমন মজবুত হওয়া যে, সকল চিন্তা ও সংশয় বিদূরিত হয়ে আল্লাহর ইয়াদ ও স্মরণ বদ্ধমূল হয়। আল্লাহ পাক যা পছন্দ করেন, বান্দার কামনাও তা-ই হওয়া। আল্লাহ পাকের নূরে   অন্তর পরিপূর্ণ হয়ে যাওয়া।

জানা কথা যে, এ সকল বিষয়ের সম্পর্ক ঈমান-আকীদার সাথেও নয়, আমলের সাথেও নয়। বরং এগুলো হচ্ছে অন্তরের কিছু অবস্থা ও গুণ। তবে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলোর গুরুত্ব এত বেশি যে, স্বয়ং মাহনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তাআলার কাছে এসকল গুণ প্রার্থনা করেছেন।

সুতরাং তাসাওউফ মূলত এ সকল মানসিক গুণ ও বৈশিষ্ট্য অর্জনেরই উপায়। আর তাসাওউফের বিশেষ কাজগুলো (যেমন- শায়খের সান্নিধ্য লাভ করা, অধিক পরিমাণে যিকর ও ফিকির করা)  হচ্ছে ঐ সকল বিশেষ গুণ ও অবস্থা লাভের এমন উপায় যা অভিজ্ঞতা দ্বারা পরীক্ষিত এবং নিরপেক্ষ বিচার-বিবেচনার মাধ্যমে এর মনস্তাত্তিক ও যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যাও কঠিন কিছু নয়। ১

এখানে আরেকটি কথা বলে দেওয়া সম্ভবত উপকারী হবে যে, উপরোক্ত আয়াতসমূহ, হাদীসসমূহ এবং দুআর দ্বারা অন্তরের যে সকল গুণ ও বিশেষ অবস্থা অর্জন করা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে লক্ষ্য  ও উদ্দেশ্য বলে সাব্যস্ত হয়েছে তার মধ্য হতে কয়েকটি বিষয় যেমন- খোদাপ্রেম, দৃঢ় বিশ্বাস, অন্তরের বিনয়-নম্রতা, মহানুভবতা, দয়ার্দ্রতা হচ্ছে মৌলিক পর্যায়ের গুণ। এগুলো অর্জিত হয়ে গেলে অন্যান্য গুণও ধীরে ধীরে অর্জিত হয়ে যায়। এজন্য তাসাওউফের ঐ সকল আমল ও শোগল দ্বারা এ মৌলিক গুণগুলোই  অন্তরে সৃষ্টি করার চেষ্টা করা হয়। এরপর অবশিষ্ট গুণাবলি ও অবস্থা নিজে নিজেই অর্জিত হয়। এটাই ঐ মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি যার উপরে তাসাওউফের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত । এ দিক থেকে এটাকে ধর্মীয় পরিপূর্ণতা অর্জনের উপায় মনে করা হয়।

এ অধম কোনো প্রকার লৌকিক বিনয় প্রকাশের জন্য নয়; বরং বাস্তবতা প্রকাশের জন্য বলছি যে, আমার মানসিক দুর্বলতা এবং কিছুটা উদ্ধতভাব এবং বিশেষ কিছু অবস্থার কারণে আমি এ ব্যাপারে অভিজ্ঞতা অর্জনের দিকে মনোযোগ দিতে পারিনি, ফলে আমি নিজে এ সকল গুণ ও অবস্থা থেকে রিক্তহস্ত ও বঞ্চিত। কিন্তু নামকেওয়াস্তে যেটুকু মনোযোগ দিতে পেরেছি এবং এ পথের পথিক কতিপয় মুরববীর খেদমতে কোনো কোনো সময় উপস্থিত হওয়ার তাওফীক হয়েছে এর দ্বারাই এই বিশ্বাস অর্জিত হয়েছে যে, তাসাওউফ ও তার শোগল-সাধনার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য-হাকীকত সম্পর্কে এ সকল বুযুর্গ যা বলেছেন সত্য  বলেছেন।

আমার মন-মস্তিষ্ক এটা মেনে নিয়েছে যে, তাসাওউফের মাধ্যমে কলবের যে অবস্থা ও যোগ্যতা অর্জন করার চেষ্টা করা হয় তার ওপর ঈমানী মিষ্টতা ও ধর্মীয় জীবনের পরিপূর্ণতা নির্ভরশীল।

এটাও বুঝে এসেছে যে, তাসাওউফ ঈমান ও ইসলামের পূর্ণতাবিধান ছাড়াও (মানুষের মধ্যে) একধরনের প্রাণশক্তি সৃষ্টিরও উপায়। সাধকের যোগ্যতা ও রুচি তাসাওউফ-সাধনার অনুকূল হলে তাসাওউফদ্বারা তার মধ্যে বিশ্বাস ও ইয়াকীন, হিম্মত ও সাহস, ধৈর্য্য ও তাওয়াক্কুল ও আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুকে ভয় না করা ইত্যাদি মহা গুণাবলি (যা শক্তির মূল উৎস) সৃষ্টি করা ও জাগ্রত করা সম্ভব। এজন্য আমাদের দৃষ্টিতে তাসাওউফের পথে ঐ সকল লোকদেরই অগ্রসর হওয়া বেশি প্রয়োজন যারা বেদ্বীনীর সয়লাবে ভেসে যাওয়া পরিবেশের পরিবর্তন ও পরিশোধনে কাজ করছেন এবং নবী-রাসূলগণের পথ ও পন্থায় মেহনত অব্যাহত রেখেছেন। বস্ত্তপূজার পরিবেশকে আল্লাহ পাকের ইবাদতের পরিবেশে রূপান্তরিত করার প্রচেষ্টা যাদের জীবন-সাধনা।

তাসাওউফের সম্পর্কে যখন আমার পর্যাপ্ত ধারণা ছিল না তখন আমার এই মত ছিল যে, তাসাওউফের কাঠামোতে পরিবর্তন আনা উচিত এবং মূল আবেদনকে অক্ষুণ্ণ রেখে নতুন ছাঁচে ঢেলে সাজানো উচিত। কিন্তু পরবর্তীতে যখন তাসাওউফ ও তার ধারক-বাহকদের নৈকট্য অর্জিত হল তখন জানতে পারলাম যে, তাসাওউফের আকৃতি ও প্রকৃতিতে পরিবর্তন ও পরিবর্ধন বরাবরই অব্যাহত রয়েছে। আমাদের এ যুগেও হযরত মাওলানা রশীদ আহমদ গাংগুহী রাহ., হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রাহ.সহ অনেকে স্বীয় অভিজ্ঞতা ও উদ্ভাবনী যোগ্যতা দ্বারা কিছু পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের কাজ করেছেন এবং বর্তমান কালের চাহিদা অনুযায়ী একে একেবারে সংক্ষিপ্ত ও বিজ্ঞানসম্মত বানিয়ে ফেলেছেন।

তরজমা : মাওলানা মুহাম্মদ হাবীবুর রহমান খান 

১ এ বিষয়গুলোর যৌক্তিকতা সম্পর্কে অবগতি লাভের জন্য শাহ ইসমাঈল শহীদ রাহ. সংকলিত সীরাতে মুস্তাকীম নামক কিতাব পাঠ করা কিছুটা হলেও যথেষ্ট হবে ইনশাআল্লাহ।

 

 

 

advertisement