মহররম ১৪২৯   ||   জানুয়ারী ২০০৯

স্মৃতির পাতা থেকে

মাওলানা আতাউর রহমান খান

আল্লাহ পাকের অসীম মেহেরবানী যে, আল্লাহ পাক আমাকে একটি ইলমী মারকাযে আসার তওফীক দান করেছেন। হযরত মাওলানা এই এদারা কায়েম করার পর থেকেই আমার ইচ্ছা ছিল যে, আমি যাব দেখার জন্য। কিন্তু সুযোগ হয়ে উঠেনি। গত রমযানে তিনি গেলেন আমার মাদরাসায় দারুল উলূম মিরপুর ৬ নাম্বারে। দীর্ঘ সময় বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হল। আলোচনার মধ্যে প্রধান কয়েকটি বিষয় ছিল : ১. ইলমী কিছু বিষয় যেগুলোর তাহকীক কম, বিশেষ করে বর্তমান যুগে যেগুলোর উপর নতুনভাবে চিন্তা-ভাবনা হওয়া প্রয়োজন বলে আমি মনে করি, এগুলো তাঁর কাছে আমি পেশ করেছিলাম। তিনি নোট করেছিলেন। যমানার পরিবর্তনে এবং যমানার আমলের ধরনের পরিবর্তনে কতগুলো নতুন মাসায়িল সৃষ্টি হয়েছে। এগুলোর শরয়ী সমাধান কী? এ বিষয়ে তাঁর সঙ্গে আমি আলোচনা করেছিলাম এবং তিনি কিছু নোটও করেছিলেন। আমি বলেছিলাম, আপনি যদি সময় পান বা আপনার সাথে আরো যারা আছে তাদের দ্বারা এ বিষয়গুলো তাহকীক করাবেন। এছাড়া  প্রাসঙ্গিকভাবে আমাদের বেশ কয়েকজন আকাবির পূর্বসূরী উলামায়ে কেরাম যাঁরা এখন দুনিয়াতে নেই তাঁদের সঙ্গে আমার সাক্ষাত ও সাহচর্যের বিভিন্ন দিকও আলোচনা করেছিলাম। মাওলানারও এ বিষয়ে আগ্রহ ছিল। তখনও বলেছেন, এখনও ওই বিষয়েই বলতে বলছেন।

আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ তাআলা অনেককেই দেখিয়েছেন এবং আমার স্মরণশক্তি যতটুকু ধারণ করেছে তাদের প্রায় সবারই একটা দুটা কথা বা একটা দুটা কাজ আমার মনে আছে। এগুলো যদি আমরা সংরক্ষণ করতে পারি তবে আজকের জীবনে না হোক পরবর্তী জীবনে কাজে আসবে। সেই হিসেবে আমি সংক্ষিপ্তভাবে কিছু আলোচনা করব।

আজকের নবীন আলেমগণ যে ব্যক্তিত্বদের নাম শুনে থাকেন কিন্তু তাদেরকে দেখেননি এই রকম অনেককেই আমার দেখার সুযোগ হয়েছে এবং তাদের কিছু হালাত, কথা, কাজ আমার স্মরণে আছে। আমি এগুলো আলোচনা করে যাব। আলোচনা করলেই সামনে আসবে। 

মাওলানা কারী তৈয়ব রাহ. দারুল উলূম দেওবন্দের মোহতামিম। হযরত থানভী রাহ-এর একজন খলীফা। দারুল উলূম দেওবন্দ-এর প্রতিষ্ঠাতা কাসেম নানুতভী রাহ-এর নাতী। হযরত কাসেম রাহ-এর পুত্র আহমদ রাহ-এর ছাহেবজাদা হলেন কারী তৈয়ব ছাহেব রাহ.। তাঁকে আমি দেখেছি একেবারে বাল্যকালে। তিনি একবার কিশোরগঞ্জে এসেছিলেন। সঙ্গে তাঁর ছেলে সালেম ছিলেন। তখন তিনি বয়সে তরুণ। আমার বয়সও খুব কম ছিল, কিন্তু তাঁর বয়ানের কিছু কথা এখনো আমার মনে আছে। তিনি একটা কথা বলেছিলেন যে, কিতাব পড়ার মাধ্যমে মানুষ যে ইলম হাসিল করে সেটা তার জন্য তখনই উপকারী হয় যখন তাকে স্বভাবের অংশে পরিণত করে। মানুষের কতগুলো স্বভাব থাকে । মানুষ যদি তার পঠিত ইলমকে জন্মগত স্বভাবের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে তাহলে সে ইলম তার উপকারে আসবে। আর যদি এমন না করতে পারে তবে তা শুধু জ্ঞান ও তথ্য হিসেবেই স্মৃতিতে থেকে যায়। কর্মে পরিণত হয় না।

এই কথাটা খুব কঠিন। এই কথার পরে বলেছেন, শরীয়তকে, জানা বিষয়গুলোকে স্বভাবে পরিণত করে নেওয়া উচিত। এটা সম্ভব হলে সে সত্যিকারের আলিম হয়, বা-আমল আলিম হয়। এমনই আলেম সম্পর্কেই বলা হয়েছে যে, তারা হলেন আম্বিয়া কেরামের নায়েব। ইলম কর্মে ও চরিত্রে প্রতিফলিত না করে শুধু জানার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হলে এ জানা আর পূর্বের যুগের কাফের-মুশরিকদের জানা কিংবা বর্তমান যুগের একশ্রেণীর মানুষের জানার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। এই কথা তিনি দীর্ঘ সময় ধরে তার দার্শনিক ভঙ্গিতে বুঝিয়েছেন। এ কথাটা তিনি বলেছিলেন ওলামায়ে কেরামের এক মজলিসে।

তারপর তাঁকে দেওবন্দের ছদছালা শতবার্ষিকী সম্মেলনে দেখেছিলাম। সেখানে অনেক কথা বলেছিলেন, তবে ওলামায়ে কেরামের জন্য তার ঐ কথাটা যা আমি বলেছি, স্মরণ রাখা অতি প্রয়োজন।

তারপর হযরত মুফতী শফী রাহ., যিনি থানভী রাহ-এর খলীফা। পাকিস্তানের মুফতীয়ে আযম। হযরত মাওলানা যফর আহমদ উছমানী থানভী রাহ-এর খলীফা ও তার ভাগিনা। এই দুইজন একবার একসাথে কিশোরগঞ্জে এসেছিলেন। মসজিদের ভিতরে ওলামায়ে কেরামের জন্য বিশেষ মজলিস করেছিলেন। সাধারণ মানুষকে ঢুকতে দেননি। দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। সেখানে হযরত মুফতী শফী সাহেব অনেক কথা বলেছিলেন। তার মধ্যে একটা কথা এই ছিল, আমরা মাদরাসার ভিতরে যে ইলম হাসিল করি কুরআন, হাদীস, ফেকাহ এগুলো মাদরাসার চার দেয়ালের ভিতরেই থেকে যায়। এটাকে আমরা চার দেয়ালের বাইরে নিতে পারি না এবং এজন্য আমাদের অর্জিত ইলম সমাজের মধ্যে কোনো পরিবর্তন আনতে পারে না। তিনি এই কথাটাকে খুব গুরুত্ব দিয়ে বলেছিলেন। তিনি একটা কর্মপদ্ধতি বাতলেছিলেন যে, যারা মাদরাসার ছাত্র হবেন বা উস্তাদ হবেন তারা ছোট  ছোট দলে ভাগ হয়ে মাদরাসার চারপার্শ্বের পরিবেশকে ভাগ করে নিবেন এবং দলবদ্ধভাবে কাজ করবেন। এই নকশার নাম দিয়েছিলেন নিযামে ছালাহ ও ইছলাহ 

হযরত তকী উছমানী তখন যুবক। তিনিও সাথে এসেছিলেন এবং বলেছিলেন, নিজে ভালো হওয়া এবং অপরকে ভালো করার একটা প্রোগ্রাম। যে জ্ঞান (দ্বীনী ইলম) হাসেল হয় তাকে বাইরে সম্প্রসারিত করার জন্য আমাদেরকে বিশেষভাবে কাজ করতে হবে। এভাবে যদি কাজ করা যায় তবে সমাজের সংস্কার হবে। আর তা না হলে ইসলাহে মুআশারা হবে না; বরং আমরা মুআশারার বেষ্টনীর ভেতরে আবদ্ধ হয়ে যাব। এটা তার একটা খেয়াল ছিল।

হযরত যফর আহমদ উছমানী ঐ মজলিসে বলেছিলেন, জ্ঞানের পরিধি বাড়ানোর জন্য ওলামায়ে কেরাম বিভিন্ন লেখকের রচনা পড়তে পারেন। পড়া উচিত। কিন্তু আমলের সংশোধনের জন্য কোনো একজনের কিতাবকে বেছে নিতে হবে। তা না হলে মানুষের আমলী যিন্দেগী বিশৃংখল হয়ে যাবে। তিনি বলেছিলেন, নিজের আমলের জন্য কোনো একজনকে ধরতেই হবে। আর দ্বীনী ইলম বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন লেখকের কিতাব পড়া যেতে পারে। ঐ সময়ে আমি একটা স্লিপ দিয়েছিলাম যফর আহমদ উছমানী রাহ-এর হাতে। বলেছিলাম, মাওলানা মওদুদী সম্পর্কে হযরতের মন্তব্য কী? তিনি কয়েকজন লেখকের নাম নিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে মওদুদী সাহেবের নাম ছিল না। তাই আমি স্লিপ দিয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন, হাঁ, ঠিক আছে। তবে তিনি অনেক চালাক মানুষ। এর দ্বারা আমরা বুঝতে পেরেছিলাম যে, জ্ঞান বাড়ানোর জন্যও তিনি মাওলানা মওদুদীর কিতাব পড়তে উৎসাহিত করেননি; বরং নিরুৎসাহিত করেছেন যে, মানুষটা এমন চালাক, সে এমনভাবে কথা বলেছে, পড়লে মানুষ প্রভাবিত হয়ে যায়। প্রভাবিত হলে যে ক্ষতি হবে তার দিকেই তিনি ইঙ্গিত করে বললেন, সে খুব চালাক মানুষ। তারপর দোয়া করে মজলিস শেষ করে দেন।

হযরত মাওলানা যফর আহমদ উছমানীর আরেক সফরের কথা মনে পড়ছে। ঐ সফরটা আরেকটু আগের। তখন আমি দাওরায়ে হাদীস পাশ করেছিলাম। দস্তারবন্দী মজলিস হয়েছিল। সেখানে যফর আহমদ উছমানী রাহ এসেছিলেন এবং পাগড়ী পরিয়েছিলেন। ঐ মজলিসে তিনি কিছু কথা বলেছিলেন। এখনো কিছু কিছু স্মরণ হয়। একটা কথা বলেছিলেন যে, সেনাবাহিনী বহুদিন পর্যন্ত ট্রেনিং নেয় এবং অস্ত্র ব্যবহার করা শেখে। অস্ত্রসজ্জিত হয়, কিন্তু এটিই যথেষ্ট নয়। যখন লড়াই আরম্ভ হবে তখন যদি সে অস্ত্র ধারণ না করে এবং সাহসের সাথে আগে না বাড়ে তবে তার পূর্ববর্তী ট্রেনিং নেওয়া এবং অস্ত্র ধারণ করা বেকার হয়ে যাবে। এই কথাটা বলে তিনি বললেন, তোমরা লেখাপড়া করেছ, ইলম হাসিল করেছ, হাদীস, ফেকহ, কুরআন পড়েছ, এখন পাগড়ী দেওয়া হল। এখন তোমরা সৈনিক হয়েছ। অস্ত্রধারী হয়েছ। কিন্তু লড়াই তো সামনে। ঐ সময় যদি ইলমকে কাজে না লাগাতে পার, এই ট্রেনিং এর যিন্দেগীটাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে না পার তাহলে এটা বেকার হয়ে যাবে। সেনাবাহিনীর ট্রেনিং নেওয়া এবং অস্ত্রসজ্জিত হওয়া এবং যুদ্ধের ময়দানে কাজ করতে  পারা এবং না পারাকে তিনি উদাহরণ হিসাবে পেশ করেছিলেন। এই কথাটি তিনি খুব সুন্দর করে বুঝিয়েছিলেন।

হযরত মাওলানা আবদুল্লাহ দরখাস্তী, মাওলানা আবদুল হক হক্কানী, হযরত মাওলানা উবায়দুল্লাহ আনোয়ার এর কথাও শুনেছিলাম। আল্লামা শামছুল হক আফগানীর বয়ান শুনেছিলাম। তিনি একটা বিষয়ের উপর খুব জোর দিতেন। তিনি বলতেন, পূর্বের যমানায় ফেকহের কিতাবসমূহ ঐ যমানার চাহিদা অনুযায়ী লেখা হয়েছিল। বর্তমানে দেওয়ানী ও ফৌজদারী আইনগুলো দফায় দফায় এবং ধারায় ধারায় আলাদাভাবে বিন্যাস করা দরকার। যদি না করা হয় তবে যখন  প্রশ্ন সামনে আসবে তখন এখানে কোন্ মাসআলা প্রযোজ্য হবে তা বের করা খুব কঠিন হয়ে যাবে। কাজেই নতুন করে বিন্যাস দেওয়ার প্রতি শামছুল হক আফগানী সাহেব খুব জোর দিয়েছিলেন। এই কিতাবগুলো থেকেই তালাশ করে, বর্তমান সময়ে ব্রিটিশ আইনে যেমন দফাওয়ারী সব আছে এভাবে আমাদের ফিকহের কিতাবসমূহকে বিন্যস্ত করে দেওয়া প্রয়োজন। এখন যদি একজন লোক ইসলামী আদালতের বিচারপতি হয় তবে সে এই সমস্ত কিতাব থেকে মাসআলা বের করে ফয়সালা দিতে পারবে না। তার অনেক সময় লেগে যাবে এবং অনেক কষ্ট করতে হবে। তাই তিনি যথারীতি ফিকহের কিতাবসমূহকে তারতীব দেওয়ার উপর জোর দিতেন। পরে আমি দেখলাম যে, শামছুল হক আফগানী রাহ. একটা কিতাবই লিখেছেন। এই কিতাবের মধ্যে ফৌজদারী, দেওয়ানী আইন লিপিবদ্ধ করেছেন।

হযরত মাওলানা আবদুল হক হক্কানী রাহ. একবার ময়মনসিংহের বড় মসজিদে বয়ান করছিলেন। তিনি বলেছিলেন, হাদীসের মধ্যে আমরা যে পরিমাণ সময় দেই তার এক দশমাংশও তাফসীরের মধ্যে দেই না। এটা আমাদের একটা অবহেলা। তিনি তাফসীরের উপর অত্যন্ত জোর দিতেন। কুরআনে পাক পড়া, বুঝা এবং কুরআনে পাকে যে বিভিন্ন ধরনের আয়াত আছে এগুলোকে ভিন্ন ভিন্নভাবে বুঝা জরুরি। যেমন আহকামের আয়াত এবং অন্যান্য বিষয়ের আয়াত। হযরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবী রাহ. যে পাঁচ বিষয়ের আয়াতের কথা বলেছেন ঐ আয়াতগুলোকে আলাদা আলাদাভাবে বুঝা এবং কুরআনে বর্ণিত বিভিন্ন কাহিনীগুলোকে সঠিকভাবে আয়ত্বে আনা এবং আল্লাহর নেয়ামত যে সকল আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে এগুলোও বোঝার চেষ্টা করা। আর অতীত যুগের বিভিন্ন জাতির কাহিনী হৃদয়ঙ্গম করা এবং আল্লাহ তাআলার তাওহীদ  সাবেত করার জন্য যে সকল আয়াত এগুলোকেও পৃথকভাবে হৃদয়ঙ্গম করা, এমনিভাবে রিসালাত সম্পর্কে যে সমস্ত আয়াত এগুলোকেও ঠিকভাবে বুঝা। আখেরাত সম্পর্কে যে সমস্ত আয়াত ঐগুলোকে সঠিকভাবে হৃদয়ঙ্গম করা। এভাবে আহকামের আয়াতগুলোকেও ভিন্নভাবে হৃদয়ঙ্গম করা।

তিনি কুরআনে পাকের তাফসীরের আলোচনা করতেন। সেখানে কুরআনে পাকের তাফসীর গ্রন্থসমূহের নাম বলতেন। সেখানে একটা নাম বলেছিলেন। এক হাজার ভলিউমের তাফসীর পাঁচ শ ভলিউমের তাফসীর গ্রন্থের নাম বলতেন। আমার নামগুলো স্মরণ আসছে না। তিনি আলইওয়াকীত নামে এক তাফসীর গ্রন্থের কথা বলেছিলেন। আরো অনেক গ্রন্থের নাম বলেছিলেন। এগুলো যে আছে তাও আমাদের আলেমরা এবং ছাত্ররা জানে না। অথচ নামটা তো অন্তত জানা দরকার। এভাবে তাফসীরের উপর খুব বেশি জোর দিতেন।

তিনি বলেছিলেন, তাফসীর থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণে আমাদের বহু অবনতি হয়েছে। তিনি অবনতিগুলো একটা একটা করে দেখিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি আরো বলেছিলেন, আমরা ফিকহী মাসআলা নিয়ে এমনভাবে লিপ্ত হয়ে পড়েছি যে, কুরআনে পাক দুনিয়াবাসীকে ডেকে ডেকে কী বলছে তা যেন আমাদের কানেই প্রবেশ করে না। এই সময়ই আমার হয় না। কুরআনের উপর তিনি খুব জোর দিয়েছিলেন।

সেই মজলিসে হযরত উবায়দুল্লাহ আনোয়ার, যিনি আহমদ আলী লাহোরী রাহ.-এর ছাহেবজাদা, তার বয়ানের মধ্যে কুরআনে পাকের একটা ইংরেজি তাফসীরের নাম বলছিলেন যা ইউরোপের বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিতে রয়েছে। এই তাফসীরটি পড়ে (যদিও তা তেমন নির্ভরযোগ্য ও নিখুঁত নয়) বহু বড় বড় শিক্ষিত লোক ইসলাম কবুল করেছে। ঐ তাফসীরটা কি আবদুল্লাহ ইউসুফ আলীর ঐড়ষু ছঁৎধহ না অন্য কারো তা আমার ঠিক স্মরণ নেই। কুরআনে পাকের যে আবেদন তা অন্য রকম। দায়ী সূলভ ভঙ্গিতে কুরআন কথা বলে। এজন্য কুরআনে পাকের সামনে যদি কেউ আসে তবে কুরআনের ডাক তার অন্তরে প্রবেশ করে এবং তার হেদায়াত নসীব হয়।

একটা কথা বলেছিলেন, যা আমার কানে এখনও স্পষ্ট বাজে -উলামায়ে কেরাম কো আংরেজী যবান ছীখনে কী জরুরত হ্যায়। আমরা যে দ্বীনী ইলম, কুরআন-হাদীস শিখি তা যদি ইংরেজি ভাষায় পাশ্চাত্যের সামনে পেশ করতে সক্ষম হতাম তবে অনেক মানুষ ইসলামের ডাকে সাড়া দিত। কিন্তু আমরা এটা পারি না। আমরা ঐ সকল দেশে যদিও বা যাই তবে উর্দুতে কথা বলি। অন্য একজন ইংরেজিতে অনুবাদ করে দেয়। কিন্তু স্বয়ং বক্তা যদি ইংরেজি ভাষায় কথা বলতেন তবে এর যে প্রভাব হত অনুবাদের দ্বারা সেই প্রভাব হয় না। এইজন্য তার বক্তব্য এই ছিল যে, উলামায়ে কেরাম কো আংরেজী যবান হাসীল করনা চাহিয়ে, তাবলীগকে লিয়ে, ইশায়াতে দ্বীন কে লিয়ে আওর গায়রোঁ কো ইসলাম কি তরফ বুলানে কে লিয়ে।

হযরত মাওলানা তাকী উছমানী সাহেব তখন তার পিতার সাথে এসেছিলেন। বর্তমানে বিশ্বে বলতে গেলে তিনিই সবচেয়ে বড় ফকীহ। তিনি মুসলমানদের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে একটা কথা বলেছিলেন যে, বর্তমানে মুসলমান সংখ্যায় অনেক বেশি কিন্তু মুসলমানের মধ্যে যে বিষয়টা থাকা উচিত ছিল  তা বর্তমান নেই। সেই জিনিসটা কী? তা হল রূহে ঈমানী। রূহে ঈমানী মুসলমানোঁ মে নেহী হ্যায়।

এটার দৃষ্টান্ত দিতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, মানুষ ফসলের ক্ষেত  বিভিন্ন প্রাণী থেকে রক্ষা করার জন্য খড় দিয়ে মানুষের একটা আকৃতি তৈরি করে। তার হাতে একটা লাঠি দিয়ে দেয়। কিন্তু পরে যখন ঐ প্রাণীগুলো টের পায় যে, এটা মানুষ না তখন আর ভয় করে না। তারপর বলেছিলেন, মুসলমানদের বর্তমান দেহ-অবয়ব আছে কিন্তু প্রাণ না থাকার কারণে দুশমনরা মুসলমানদেরকে লাশের মতো মনে করে।

তারপর তিনি রূহে ঈমানী কী তা বুঝাতে গিয়ে কয়েকটি কথা বলেছিলেন। একটি কথা এই যে,   সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে যে বিশেষ কয়েকটি গুণ ছিল সেগুলো আমাদের মাঝে নেই। জ্ঞানের দিক থেকে যদিও কোনো কোনো সাহাবী থেকেও আমরা বেশি জানি। সাহাবীরা এত বেশি জানতেন না। কিন্তু তাদের মধ্যে রোব বা প্রতাপ ছিল শুধু রূহে ঈমানী থাকার কারণে।

সাহাবায়ে কেরামের আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, সাহাবীরা একে অপরকে জিজ্ঞাসা করতেন, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কী বলেছেন। তারপর শোনার সাথে সাথে আমল শুরু করে দিতেন। কিন্তু বর্তমানে; বরং আরও আগ থেকে ওলামায়ে কেরাম-হুযুর নে ক্যায়া ফরমায়া-ইয়ে নেহী পুঁছতে, বলকে ইয়ে পুঁছতে হ্যায় কে হুযুর নে ইয়ে কেউ ফরমায়া। মাযা লিমাযা ছে তাবদীল হো গ্যায়া, ইছি ওজাহ ছে রূহে ঈমানী খতম হো গায়া।

যখন থেকে হুযুরের বাণীর তাৎপর্য খোঁজা আরম্ভ হয়েছে, তখন থেকে রূহে ঈমানী শেষ হয়ে গেছে। এখন অনেক কিছু জানলেও আমাদের মধ্যে কিছুই নেই। যখন থেকে মুসলমানদের মুখে এ কথা এসেছে যে, হুযুর কেন বলেছেন তখন থেকেই মুসলমানের অধঃপতন আরম্ভ হয়েছে। কাজেই তাৎপর্য, রহস্য আর তত্ত্ব তালাশ করা আমাদের মাকসাদ নয়। আমাদের মাকসাদ হল, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কী বলেছেন তার উপর আমল করা এবং করানো।

হযরত মাওলানা ইহতেশামুল হক থানবী রাহ. একজন বড় আলেম ছিলেন এবং দুনিয়া সম্পর্কেও খবর রাখতেন। তিনি একবার এসেছিলেন এবং মসজিদের চত্বরে দাঁড়িয়ে ওয়াজ করেছিলেন। তার হাতে একটা লাঠি ছিল। চেহারাও ছিল খুব সুন্দর। তিনি একটা কথা বলেছিলেন যে, একটা রাষ্ট্র হওয়ার জন্য কয়েকটি জিনিসের প্রয়োজন হয়। প্রথমত একটা ভূখন্ড লাগে এবং বসবাস করার মতো কিছু মানুষ লাগে। এরপর এই মানুষের জন্য একটা আইডোলজি একটা ধর্ম, বা আদর্শের প্রয়োজন হয়। এই তিনটা ছাড়া রাষ্ট্র হয় না। কাজেই রাষ্ট্রের আইডোলজি বা আদর্শ যেমন হবে রাষ্ট্রও তেমন হবে। রাষ্ট্রের নিজস্ব কোনো রং নেই। কমিউনিজম যদি আইডোলজি হয় তবে তা কম্যুনিস্ট রাষ্ট্র হবে। ক্যাপিটালিজম যদি আইডোলজি হয় তবে তা ক্যাপিটালিস্ট রাষ্ট্র হবে। আর গণতন্ত্র যদি আইডোলজি হয় তবে তা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হবে। আর ইসলাম আইডোলজি হলে ইসলামী রাষ্ট্র হবে। কোনো ভূখন্ডের মানুষ যদি মুসলমান হয় আর তার আইডোলজি যদি ইসলাম হয় তবে তা হবে ইসলামী রাষ্ট্র। হ্যাঁ, যদি কোনো ভূখন্ডের অধিবাসীরা মুসলমান এবং তাদের আইডোলজি ইসলাম, কিন্তু কোনো কারণে তা বাস্তবায়িত নয় তবে ঐ ভূখন্ডের শরয়ী হুকুম হল ঐ মসজিদের মতো, যাতে নামায আদায় করা হয় না এবং জামাতের কোনো ইন্তিজাম নেই। তবে মুসলমানদের উপর ঐ মসজিদকে রক্ষা করা ফরয, ঐ ভূখন্ডকে রক্ষা করাও মুসলমানদের উপর ফরয।

মাওলানা মসীহুল্লাহ খান সাহেবের একটা কথা মনে পড়ে। তিনি বলেছিলেন, বাহ্যিক জিনিসগুলো ঐ সময়ই অর্থবহ ও উপকারী হবে যখন এগুলোর পিছনে হাকীকত থাকবে। হাকীকত না থাকলে বাহ্যিক চাকচিক্য কোনো কাজে আসবে না।

তার এই কথাটার সাথে থানভী রাহ.-এর একটা কথার মিল পাওয়া যায়। তিনি বলেছিলেন, কোনো মানুষের লেবাস-পোশাক খুব জাকজমকপূর্ণ ও কেতাদুরস্ত হলে আমার কেন যেন মনে হয় লোকটার মধ্যে হাকীকত নেই।

মালেক কান্দলভী রাহ. হাদীস শরীফের একটা বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছিলেন, যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মুজিযার অন্তর্ভুক্ত। তা হল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একখানা হাদীসের উপর যদি কেউ সঠিকভাবে আমল করে তবে তাকে অন্যান্য হাদীসের উপরও আমল করতে হয়। উদাহরণস্বরূপ এই হাদীসটি বলেছিলেন, তুমি নিজের জন্য যা পছন্দ কর তা যদি অন্য লোকের জন্য পছন্দ না কর তবে তুমি পূর্ণ মুমিন নও। এই হাদীসের উপর কেউ যদি পূর্ণভাবে আমল করে তবে সে অন্য সকল হাদীসের উপর আমল করতে পারবে। এমন কয়েকটি হাদীসের উদাহরণ তিনি দিয়েছিলেন।

হাদীস আর কুরআনের মধ্যে পার্থক্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছিলেন, হাদীসের শব্দ থেকেই বোঝা যায় এটা রসূল অর্থাৎ প্রেরিত ব্যক্তির কথা। আর কুরআনের আয়াত শুনলে বোঝা যায়, এটা স্বয়ং মালিকের কথা। চাই যত ছোট আয়াতই হোক। এটাকে তিনি ব্যাখ্যা করেও বুঝিয়েছিলেন। কিন্তু তার মূল বিষয় ছিল এটাই। আহলে আরব হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আফছাহুন নাস বলে জানত, কিন্তু কোথাও এমন পাওয়া যায় না যে, তারা কুরআনের আয়াত শুনে তাৎক্ষণিকভাবে বলেছিল এটা তো তারই কথা। কারণ তারাও বুঝত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন কথা বলতে পারেন না। এজন্যই তারা কুরআন শোনার জন্য যেত। যদি এটিকে আলাদা মনে না করত তবে শোনার জন্য যেত না।

হযরত মাওলানা মুফতী শফী রাহ.-এর আরেকটা কথা আমার মনে পড়ে। তিনি বলেছিলেন, ইমাম আবু হানীফা সম্পর্কে অনেকে অনেক কথা বলে যে, আবু হানীফা হাদীস বেশি জানতেন না। এ প্রসঙ্গে তিনি একটা উদাহরণ দিয়েছিলেন যে, একজন মানুষ গাছের উপর বসে প্রয়োজন মতো ফল আহরণ করছে। আরেকজন গাছ থেকে ফল পাড়ার জন্য খুব চেষ্টা করছে, লাঠি দিয়ে বা ঢিল দিয়ে কষ্ট করে ফল সংগ্রহ করছে। এখন কেউ দেখলে মনে করবে নিচের ব্যক্তিই ফল পাড়ার জন্য বেশি কষ্ট করছে। কিন্তু যদি প্রশ্ন করা হয় বেশি ফল পেয়েছেন কে?

তাহলে উত্তর হবে, যিনি গাছে আরোহন করেছেন তিনিই বেশি ফল পেড়েছেন। আর যিনি গাছের নিচে ছিলেন তিনি ফল পেড়েছেন কম। আবু হানীফা ছিলেন হাদীসের যামানার লোক। তিনি হাত বাড়ালেই হাদীস পেতেন। তিনি হাদীস কম জানতেন এটা একটা অবাস্তব কথা।

মাওলানা ইউসুফ বিন্নুরী রাহ. হযরত আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী রাহ.-এর নমুনা ছিলেন। তিনি এক বয়ানে হাদীস শরীফের নির্ভরযোগ্যতার উপর বলেছিলেন, মুনকেরীনে হাদীস বলে কুরআনের হিফাযত করা হয়েছে। কিন্তু হাদীসের হেফাযত করা হয়নি। হাদীস সংকলন করা হয়েছে অনেক পরে। তাই এতে সন্দেহের বহু কিছু আছে। (নাউযুবিল্লাহ)। এ প্রসঙ্গে বলতে  গিয়ে তিনি বলেছিলেন, সাহাবায়ে কেরাম হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থুথু নিক্ষেপ করলে সেই থুথু পর্যন্ত নিয়ে নিতেন। মাথার চুল, শরীরের ঘাম সংরক্ষণ করেছেন। আর হুযুর যে জন্য দুনিয়াতে এসেছেন অর্থাৎ রিসালাতের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি যে সকল কথা বলেছেন ও যে সকল কাজ করেছেন তা তারা সংরক্ষণ করবেন না, এমন যারা মনে করে তারা আহমক ছাড়া আর কিছুই নয়। অপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলোও যারা হিফাযত করতেন তারা প্রয়োজনীয় বিষয় হিফাযত করবে না এমন যারা মনে করে তারা আহমক।

যারা এই আপত্তি উত্থাপন করে যে, হাদীসের কিতাব অনেক পরে লিপিবদ্ধ হয়েছে তাদের জবাব দিতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন-

প্রয়োজনই উদ্ভাবনের দ্বার উন্মোচন করে। কুরআনে পাক ঐ সময়ই সংকলন হয়েছে যখন প্রয়োজন হয়েছে। এভাবে যখন যেভাবে হাদীস সংকলনের প্রয়োজন হয়েছে তখন সেভাবেই তা সংকলিত হয়েছে। পূর্বে হাদীস শরীফের ব্যাপক চর্চা ছিল। মানুষ ব্যক্তিগতভাবে হাদীস জানত, গ্রাম ভিত্তিক জানত। শহরভিত্তিক জানত। এভাবে প্রদেশ ভিত্তিক হাদীস জানত। গোলাম, আযাদ, শিশু, বৃদ্ধ, স্বামী-স্ত্রী সকলেই হাদীস জানত হাদীস  তাই ঐ সময়ে রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে ব্যাপক আকারে। হাদীস  সংকলনের কোন প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু পরবর্তীতে যখন হাদীসের মধ্যে প্রক্ষেপ শুরু হল তখন হাদীসের কিতাবের তাদবীন প্রয়োজন দেখা দিল এবং সরাসরি খলীফাতুল মুসলিমীনের তত্ত্বাবধানে হাদীস শরীফ লিপিবদ্ধ হল।

হাদীসের কিতাব তাসনীফ হওয়ার আগে মানুষ হাদীস জানত না, হাদীসের চর্চা ছিল না আর হাদীস জানা না থাকার কারণে আইম্মায়ে কেরাম রায় তথা কিয়াসের সাহায্যে মাসআলা বয়ান করতেন-এই কথাটাকে তিনি অবাস্তব ও অযৌক্তিক সাব্যস্ত করেছিলেন।

ঐ সময়ের মুনকিরে হাদীস গোলাম আহমদ পারভেজের রদে তিনি অনেক কাজ করেছিলেন। উলামায়ে কিরামের দস্তখত সম্বলিত একটা রিসালা তিনি প্রকাশ করেছিলেন। যাতে এই কথার উপর দস্তখত নিয়েছিলেন যে, গোলাম আহমদ কাফের।

তিনি তার বিরুদ্ধে বলতে গিয়ে বলেছিলেন যে, মানুষ কেন হাদীস অস্বীকার করে। কারণ হাদীসকে যদি অস্বীকার করা যায় তবে কুরআনকে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। আর এভাবেই দ্বীন থেকে আযাদী হাসিল করা যায়। দ্বীন থেকে আযাদী হাসিল করার জন্যই তারা হাদীস অস্বীকার করে।

আর একজন ছিল গোলাম জিলানী বারক। সে একটা কিতাব লিখেছিল। দো কুরআন (কুরআন একটা নয়, দুইটা)। সে বলেছিল, এক কুরআন তো  কুরআন শরীফ যা আমরা দেখি। আর এক কুরআন হল, আল্লাহ তাআলার সৃষ্টিজগত। সুতরাং কোনো ব্যক্তি কুরআনে কারীমের তেলাওয়াত করলে, গবেষণা করলে, আমল করলে যেভাবে সওয়াবের অধিকারী হবে তেমনি কেউ যদি সৃষ্টি জগতের উপর গবেষণা করে তাহলে সেও ওই সওয়াব পাবে। উলামায়ে কেরাম যেভাবে কুরআনকে নিয়ে গবেষণা করে কামিয়াব হয়েছেন তেমনি বৈজ্ঞানিকরা যারা সৃষ্টি জগত নিয়ে গবেষণা করে তারাও কামিয়াব।

এর জবাবে হাকীমুল ইসলাম ক্বারী তৈয়ব সাহেব রাহ. এক কিতাব লিখেছিলেন। এর নাম হল, এক কুরআন।

তিনি প্রমাণ করেছিলেন ইলমী কুরআন এবং আমলী কুরআন দুটোই ঠিক, কিন্তু আমলী কুরআন এই সৃষ্টিজগত নয়; বরং আমলী কুরআন হলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। এই কিতাব পড়ার পর গোলাম জ্বীলানী বারক তওবা করে তার মত থেকে ফিরে এসেছিলেন। তারা কোন মানের আলেম ছিলেন তা বুঝানোর জন্যই এই কথাটি বললাম।

(চলবে ইনশাআল্লাহ)

 

 

advertisement